চন্দ্র ভান দুয়া সই করতে পারেন না। টিপছাপ দিয়ে ব্যাংকে টাকা জমা করেন। যদিও ব্যাংকের অ্যাকাউন্ট সবেমাত্র কয়েকমাস খোলা হয়েছে। কী হবে অ্যাকাউন্ট দিয়ে? ব্যাংক অ্যাকাউন্টে রাখার মতো টাকা কোথায়? প্রায় দিন আনা দিন খাওয়া। পুরোনো দিল্লির দরিয়াগঞ্জে ফলের রসের দোকান। সবথেকে বেশি ভিড় হয় শুক্রবার। জামা মসজিদে নমাজে আসা মানুষরা নমাজ সেরে দরিয়াগঞ্জের এই দোকানে ভিড় জমায়। মিক্সড ফ্রুট জুস দেড় টাকা। বেশি চলে মসুম্বি জুস। কিন্তু আজকাল ব্যাংক অ্যাকাউন্টের দরকার পড়ছে। কারণ ছেলে গুলশন সারাদিন দোকান চালানোর পর সন্ধ্যা হলেই আবার বেরিয়ে পড়ে। অক্লান্ত পরিশ্রম করতে পারে। সবথেকে ভালো দিক হল দারুণ মধুরভাবে মানুষের সঙ্গে কথা বলে ছেলেটা। আর সরলতা আছে স্বভাবে। অন্তত মুখেচোখে একটা নিরীহ ছাপ স্পষ্ট। আর কেউ জানে না যে এই ছাপের আড়ালে আসলে রয়েছে একটা প্রচণ্ড জোরালো জেদ। দোকানের উলটোদিকেই ফিরোজ শাহ কোটলা গ্রাউন্ড। রবি শাস্ত্রী, কপিলদেবরা খেলে যায় এখানে। কিন্তু দেখার পয়সা নেই। গুলশন সেই দুঃখ চেপে রাখে। সে ভাবে একদিন আমি এইসব করতে পারব। কীভাবে যে এত বেশি বড় করে ভাবে কে জানে! চন্দ্র ভান মনে মনে ভয় পান। এত উচ্চাশা ছেলেটাকে খারাপ পথে না নিয়ে যায়। কী দরকার! আমরা যেমন থাকি, তেমনই তো ভালো আছি। কিন্তু এসব কথা ওর সামনে বলা যায় না। শুনলে বলে, পিতাজি আপনি একটু সময় দিন আমাকে। দেখুন আমি কী করতে পারি! হাসেন চন্দ্র ভান। এই পুরানি দিল্লিতে কত এরকম স্বপ্নের সওদাগর ঘুরছে। সবাই ভাবে তারা একদিন বেতাজ বাদশা হবে। কিন্তু কিছু বছর পর দেখা যায় কেউ বাল্লি মারানের গলিতে মির্জা গালিবের হাভেলির পাশে চপ্পলের দোকান খুলেছে। আবার কাউকে দেখা যায় টাউন হলের সামনে দিনের বেলা ঘুরছে সস্তা শাড়ি নিয়ে দোকানে দোকানে। তবে দিল্লির চাঁদনি চক এক মজার জায়গা। এখানে হেন জিনিস নেই যা পাওয়া যায় না। বিশেষ করে ডুপ্লিকেট। গুলশন আজকাল ওই চাঁদনিতেই বেশি ঘোরাঘুরি করে। আপাতত অর্ডার সাপ্লাই করছে। কোথা থেকে যে সস্তার সব জিনিস নিয়ে আসে কে জানে। ডিটারজেন্ট, বোতল ভরা জুস, পুরোনো সিলিং ফ্যান। যেমন ধরা যাক আসল ড্রিংকসের কোম্পানির নাম রসনা। কিন্তু ও কোথা থেকে যেন এমন এক প্যাকেট জোগাড় করে যার গায়ে লেখা ‘রসন’। এক ঝলকে দেখে যে কেউ ভাববে রসনা। খুব ভালো করে প্যাকেট পড়লে বোঝা যাবে চালাকিটা। কিন্তু আপাতভাবে কোনো দোষ নেই। যে কেউ কোম্পানির নাম ‘রসন’ দিতেই পারে। এসব যেখানে তৈরি হয় তার কোনোটা গ্রেটার নয়ডা, কোনোটা সুরযপুর, কোনোটা অর্জুনপুর, অথবা হয়তো হরিদ্বারের আগের স্টেশন জোয়ালামুখিতে। অসম্ভব পরিশ্রম আর কষ্ট করছে গুলশন। আর হ্যাঁ। সত্যি বলতে কী টাকাও রোজগার করছে। তাই ব্যাংক অ্যাকাউন্ট। কিন্তু ব্যবসা করে ও। অ্যাকাউন্ট বাবার নামে।
নয়ডা সেক্টর সিক্সটি টু থেকে সোজা গিয়ে একটা মন্দির। তার পিছনে একটা ঘর ভাড়া নিয়েছে ২১ বছরের গুলশন। সেখানে একটা অদ্ভুত পরীক্ষা করছে সে। ওল্ড দিল্লির বিভিন্ন ছোটখাটো গানের স্কুলে যারা গান শেখে কিংবা সাঁইবাবা আর মাতা বৈষ্ণোদেবীর জাগরণ অনুষ্ঠানে টাকা নিয়ে গান গায় যে ভাড়াটে শিল্পীরা, তাঁদের নিজের একটা স্কুটারে চাপিয়ে নিয়ে আসে এখানে। ঘরে ঢুকে দেখা যাবে সেখানে একটাই দরজা। আর কোনো জানালা নেই। শুধু একটা ফলস সিলিং আছে। একটিও আসবাব না থাকায় জোরে কথা বললে সামান্য প্রতিধ্বনি হয়। বেশ গমগম করে ঘরের আওয়াজ। ফিলিপসের একটা টেপ রেকর্ডার রাখা একটা চেয়ারে। সিঙ্গল ক্যাসেট। তার সামনে উবু হয়ে বসে রেকর্ডিং এর সুইচ টিপে দিতে হবে। আর হাতে রাখা কাগজ নিয়ে গান গাইতে হবে ওভাবেই উবু হয়ে বসে। যতটা সম্ভব ওই বেসিক টেপ রেকর্ডারের প্রান্তে থাকা দুটি ছোট ফুটোর কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে গাইতে হবে। ওটাই রেকর্ডার। খোলা গলায়। বেশিটাই ভজন। টেপে থাকবে ব্ল্যাংক ক্যাসেট। সেটাই যা দামি। বাকি সব সস্তা। গুলশন সস্তার পূজারি। সে জানে বেঁচে থাকতে হলে আর ব্যবসা করতে হলে একটা জিনিসের বন্দনা করতে হবে। সস্তা। মানুষ, সে যত বড়লোকই হোক আর যত গরিবই হোক, জিনিসের দাম কমাতে চায়। যে যার নিজের মতো করে। তাই সে বেশি খরচ করছে না এসব পরীক্ষায়। ওই শিল্পীদের ২৫ টাকা করে দেওয়া হয়েছিল। ক্যাসেটের দুই পিঠে ৬টা ভজন থাকবে। একজনের কাজ শুধু টেপ রেকর্ডারের অনেকটা দূরে বসে হারমোনিয়াম বাজানো। যাতে গানকে ছাপিয়ে না যায় হারমোনিয়াম। তাই দূরে বসে বাজানো। রেকর্ডিংটা বেশ গমগমে হয় এই ফাঁকা ঘরে। এত গোপনীয়তা কীসের? কারণ এই কনসেপ্ট সম্পূর্ণ নতুন। কেউ ভাবেনি এভাবে যে গান বিক্রি করা যায়। আসলে এই ক্যাসেট সস্তায় বিক্রি করা হবে। পাড়ার মন্দিরে মন্দিরে। বিভিন্ন সংগঠনের দপ্তরে। গিয়ে বলা হবে শুনে ভালো লাগলে কিনতে পারেন। সস্তায় পাবেন ১০ টাকা। কোনো নামীদামি শিল্পী নেই। খরচও নেই। আর ব্র্যান্ড শিল্পী নয়। ভক্ত পুণ্যার্থীরা চাইবেন ভগবানের নামগান। সে যে কোনো গায়ক গায়িকাই করুক। কভারও আছে। শিব, দুর্গা, সরস্বতী, বৈষ্ণোদেবীর কালার ছবি। সেসব তো করোলবাগের ফুটপাথে পাওয়া যায় একসঙ্গে। অতএব মন্দির, সভা, জমায়েত, সংগঠনের অনুষ্ঠানে সারাদিন বাজবে ভজন গান। নামজাদা কোম্পানির দামি ক্যাসেট কেনার দরকারই নেই। কনসেপ্ট জনপ্রিয় হতে দেরি হল না। যাকে বলা হয় ভিনি ভিডি ভিসি! এলেন দেখলেন জয় করলেন। গুলশনের এই ব্যবসা বুদ্ধি মারাত্মক হিট করল। এভাবে হাতে গরম ভজনসংগীত পেয়ে গিয়ে এই আনপ্রফেশনালভাবে ঘরে রেকর্ড করা ক্যাসেট মুড়িমুড়কির মতো বিক্রি হতে লাগল। কারণ গিয়ে কিনতে হয় না। একটি সাইকেল করে এসে একটি ছেলেই দিয়ে যায় ক্যাসেট। মাত্র ১০ টাকা। এটা শুরু। তার সঙ্গে চাঁদনি চকের সেইসব অর্ডার সাপ্লাইয়ের ব্যবসাও চলছে পুরোদমে। সুতরাং ঘরে টাকা আসছে। কিন্তু আচারব্যবহার আর জীবনযাপনে মাথা ঘোরেনি গুলশনের। সে জানে এসব স্রেফ শুরু। এখনও আসল কাজ বাকি। বহু পথ বাকি। তাঁর লক্ষ্য বহু নামজাদা ব্র্যান্ডকে ধুলোয় মিশিয়ে দেওয়া। অর্ডার আসছে হরিয়ানা থেকে। অর্ডার আসছে পশ্চিম উত্তরপ্রদেশ থেকে। অর্ডার আসছে আগ্রা থেকেও। অর্ডার আসছে গাজিয়াবাদ থেকে। দরিয়াগঞ্জের ফলের রসের দোকানের একটি ছেলে কাউকে জানায়নি এলাকায় যে কীভাবে সে এসব করছে। কারণ তাহলে কনসেপ্ট চুরি হবে। সে সকলকে বলে মুম্বই গিয়ে রেকর্ডিং করিয়ে আনতে হয়। যারা মুম্বইয়ে সিনেমায় কোরাসে গান করে, রেডিও আর্টিস্ট তাঁদের দিয়ে গাওয়ানো হয়। কিন্তু আসলে যে এইসব শিল্পীরা দিল্লির মধ্যেই হেঁটে চলে ঘুরে বেড়াচ্ছে তা বোঝা যাবে না। তাঁদের আপত্তি নেই। টাকা তো আসছে।
বেদ চানানা গুলশনের বন্ধু। সে জানে গুলশনের কাজটি কী। একদিন পুরোনো দিল্লিতে সন্ধ্যা হচ্ছে। লালকেল্লার উলটোদিকের মন্দিরের সামনের পাঁচিলে বসে দুজনের আড্ডার মধ্যেই বেদ চানানা বলল, এক কাম করতে হ্যায়..কিউ না হাম খুদ শুরু কর দেতে হ্যায় আপনে কোম্পানি! গুলশন চমকে উঠল। তারই মনের কথা এটা। কীভাবে জানল বেদ? অতএব লালকেল্লার সামনের মার্কেটে চা খেতে খেতে এক সন্ধ্যায় জন্ম নিল একটি স্বপ্ন। যা ছিল আসলে ভারতের মিউজিক বিজনেসের একটি ইতিহাসের নাম। সুপার ক্যাসেট ইন্ডাস্ট্রিজ। যে ইতিহাস সম্পূর্ণ ওলটপালট করে দেবে গোটা দেশের সংগীত জগৎকে। ঠিক দু বছরের মধ্যে আত্মপ্রকাশ করল একটি ঝড়! ঝড়ের নাম টি সিরিজ! কোম্পানি নয়ডার ঠিকানায়। উত্তরপ্রদেশ। আর ক্যাসেট তৈরির কারখানা গ্রেটার নয়ডার সুরযপুরে। স্টুডিও ভাড়া করা হয় মুম্বইয়ে। দরিয়াগঞ্জের এক ফলের রসের দোকানে বসে থাকা গুলশনের নাম গোটা ভারতে ছড়িয়ে পড়বে এরপর। নতুন ব্র্যান্ডের জন্ম হবে। নাম গুলশন কুমার! বাবা ভেবেছিলেন কী হবে ব্যাংক অ্যাকাউন্টে? টাকা কোথায় বাড়তি যে ব্যাংকে রাখতে হবে! আর সেই বাবার বড় পুত্রটি মাত্র ১০ বছরের মধ্যে দেশের এক নম্বর ট্যাক্স দাতা হয়েছিলেন। সম্পত্তির পরিমাণ ছিল সরকারিভাবে ৩৫০ কোটি টাকা!
আজ যাকে বলে কভার ভার্সন, তার প্রকৃত আবিষ্কর্তার নাম গুলশন কুমার। ভারতীয় কপিরাইট আইনের সেকশন ৫২ (১) (জে) অনুযায়ী যে কোনো গানের আবার নতুন রূপে রেকর্ড করতে হলে একটা অনুমতি সম্বলিত চিঠি চাই প্রকৃত গায়ক গায়িকা আর সংশ্লিষ্ট রেকর্ডিং সংস্থার। কিন্তু এক্ষেত্রে সেরকম কোনো নিয়ম পালিত হল না। তবে চিঠি দেওয়া হল শিল্পীদের। সে তো হাজার হাজার ফ্যান দেয়। কজন খুলে পড়েন? সাপও মরল, লাঠিও ভাঙল না। মূলত দুজন নতুন গায়ক ও গায়িকার সন্ধান পেলেন সংগীতের অসাধারণ কানসম্পন্ন গুলশন কুমার। ওই দুই শিল্পীর একজনকে দিয়ে তিনি গাওয়াতে শুরু করলেন লতা মঙ্গেশকরের পুরোনো গানগুলি। আর অন্যজন গাইলেন কিশোর কুমারের সমস্ত হিট গান। দুই শিল্পীরই সত্যিকারের অত্যন্ত ভালো কণ্ঠ। এবং এতদিন তাঁদের কেউ সেভাবে কেন গুরুত্ব দেয়নি এটা এক রহস্য। তাঁরা দুজনেই রীতিমতো বছরের পর বছর ধরে স্ট্রাগল করছেন তখন। অথচ ব্লেক পাচ্ছেন না। একটি মাত্র লোক তাঁদের মধ্যে থাকা গুণের গন্ধ পেয়েছিলেন। এবং তিনিই সুযোগ দিলেন। কিশোর কুমারের সুপারহিট গানগুলি গাইলেন কুমার শানু নামের এক নতুন অজানা গায়ক। আর লতা মঙ্গেশকরের গান নিয়ে অ্যালবাম তৈরি হল, যেগুলির গায়িকা একটি ফ্রেশ কুণ্ঠ, অনুরাধা পাড়ওয়াল। এবারও ভুল করেননি গুলশন কুমার। মার্কেটে আসার সঙ্গে সঙ্গে সেইসব গান সুপারহিট। নতুন এক শব্দ এল ভারতীয় সংগীতজগতে। রিমেক! কেন জনপ্রিয় হল? কারণ ততদিনে এইচএম.ভি, মিউজিক
ইন্ডিয়ার মতো ব্র্যান্ডেড সংস্থাগুলির ক্যাসেটের দাম সাধারণ গরিব আর মধ্যবিত্ত ভারতীয়ের নাগালের বাইরে রয়ে যাচ্ছিল। গান শোনার প্রবল ইচ্ছা। অথচ ক্যাসেট কিনতে পারছি না। এই অবস্থায় মনখারাপের দিন কাটাতেন কোটি কোটি ভারতবাসী। বিশেষ করে কিশোর, তরুণ ও বেকার যুবকযুবতীর দল। ঠিক এই অংশকে টার্গেট করেছিল টি সিরিজ। প্রধান মন্ত্রই হল সস্তায় গান পৌঁছে দিতে হবে। কতটা পাবলিক রিলেশন করতে সিদ্ধহস্ত ছিলেন গুলশন কুমার? একটি ছোট উদাহরণ। অনুপ জালোটাকে দিয়ে তিনি নিজের কোম্পানির হয়ে আবার একই ভজন গানগুলি গাওয়াতে রাজি করিয়ে ফেলেন যেগুলি ততদিনে সুপারহিট হয়ে গিয়েছে মিউজিক ইন্ডিয়ার ব্যানারে। সেটা বড় কথা নয়। তার থেকে অবিশ্বাস্য হল সেই একই গানের রি-রেকর্ডিং সম্বলিত নতুন অ্যালবামের নাম পর্যন্ত হয়েছিল একই। ‘ভজনসন্ধ্যা’। যা নিয়ে তীব্র আতঙ্কিত হয়ে পড় মিউজিক ইন্ডিয়া। কারণ স্বাভাবিক। টি সিরিজের অ্যালবামের দাম অর্ধেকের কম। সুতরাং শুধু যে ক্যাসেট বিক্রি হল মুড়িমুড়কির মতো তাই নয়, অনুপ জালোটার ফাংশনের কন্ট্রাক্ট একটা সময় গোটা দেশে সবথেকে শীর্ষস্থানে পৌঁছে গেল। উদ্বিগ্ন মিউজিক ইন্ডিয়া দিনের পর দিন একটি বিজ্ঞাপন দিতে বাধ্য হয়েছিল। যার বয়ান ছিল ‘ডুপ্লিকেট থেকে সাবধান।’ ‘একই রকম দেখতে ক্যাসেট কিনবেন না।’ ‘আসল মিউজিক ইন্ডিয়া কিনুন।’ ‘মিউজিক বাঁচান।’ কে বাঁচাবে? বরং তাঁর ভক্তকুল বললেন, অসলে গানকে জনপ্রিয় করলেন গুলশন কুমার। তিনি মিউজিককে ড্রইংরুম থেকে বের করে ফুটপাথের দোকানে নিয়ে এলেন। কজন ইয়ং ছেলেমেয়ে পুরোনো গান শুনত এতদিন? এই রিমেকের জন্যই তো শুনছে? সেই বিতর্ক আজও চলছে। আজও আমাদের বাংলায় রিমেক ভক্তরা বলেন, রিমেক না হলে কজন মনে রেখেছিলেন সুবীর সেনের ‘পাগল হাওয়া, কী আমার মতো তুমিও হারিয়ে গেলে’! বিশুদ্ধপন্থীরা বললেন, প্রকৃত গানকে ভুলিয়ে দিচ্ছে এই বিপজ্জনক রিমেক প্রবণতা। নতুন প্রজন্ম জানবেই না আসল গানটি কে গেয়েছিলেন! এই তর্ক থামার নয়। আমরা সেই বিতর্কে যাচ্ছি না। বরং গুলশন গাথায় ঢুকে পড়া যাক।
গুলশন কুমারের ফরমুলা হয়ে দাঁড়াল এক মার্কেট গুরুর ম্যানেজমেন্ট কোর্স। লো প্রাইস হাই ভলিউম। সস্তায় বিক্রি করো, প্রচুর বিক্রি করো। মুনাফা সাংঘাতিক। যে কোনো ফুটপাথেও পাওয়া যেতে লাগল টি সিরিজ। কেন? কারণ কোম্পানি থেকে ক্যাসেট কিনতে কোনো পেপার ওয়ার্ক নেই। কোনো ট্রেড লাইসেন্স দেখাতে হবে না। যে কেউ বিক্রি করতে পারবে।
আর পুরোনো সুপারহিট গানের রিমেক বিক্রি সর্বকালের সব রেকর্ডকে ছাড়াতে শুরু করল। সেলুনে, পানের দোকানে, সবজি বাজারে এবং সর্বোপরি নতুন প্রজন্মের ছেলেমেয়েদের মাথার কাছে সারাদিন ধরে বাজতে লাগল রিমেকের শিল্পীদের কণ্ঠে খিলতে হ্যায় গুল ইয়াহাঁ…দো ঘুঁট মুঝে ভি পিলা দে শরাবি….তেরে বিনা জিন্দেগী সে কোই….. জিন্দেগী কা সফর…..মানা জনাব নে পুকারা নেহি…..না কোই উমঙ্গ হ্যায়…..মেরে ন্যায়না শাওন ভাদো…।
বম্বে ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির সংস্পর্শে একবার যে এসেছে তার পক্ষে আর সেই মোহময়ী আকর্ষণ থেকে নিজেকে বাঁচানো সম্ভব হয় না। এখানে বহু স্বপ্নের জাহাজডুবি হয়েছে। আবার বহু দিন আনা দিন খাওয়া স্ট্রাগলার দেশের রোলমডেল হয়ে উজ্জ্বল নক্ষত্রেও পরিণত হয়েছে।
ড্রিমটাউন। স্বপ্ননগরী। অসম্ভব শীতল মাথার হলেও গুলশন কুমারও ভাবলেন এই গ্ল্যামার জগতের অঙ্গ হতে হলে নক্ষত্রদের হর্তাকর্তাবিধাতা হতে হবে। অর্থাৎ প্রোডিউসার। ‘লাল দুপাট্টা মলমল’ নামের একটি বি গ্রেড ফিল্ম প্রযোজনা করলেন। তাঁর বৃহস্পতি তুঙ্গে। সেটাও হিট। বিশেষ করে উত্তর ভারতের মফসসল টাউনগুলিতে চলল রমরম করে। এবং তারপর নতুন দুই নায়ক নায়িকা আর তাঁর প্রিয় গায়ক গায়িকাকে দিয়ে লো বাজেটের একটি সিনেমা প্রযোজনা করবেন ভাবলেন। পরিচালনার জন্য অবশ্য একজন পরিচিত মানুষকেই ডাকা হল। নতুনদের নিয়ে কাজ করতে একমাত্র তিনিই রাজি হলেন। বাকিরা কেউ রিস্ক নেবেন না। সেই লোকটির নাম মহেশ ভাট। আর সিনেমার নাম ‘আশিকি’। গুলশন কুমার আর পিছনে ফিরে তাকাননি তারপর। পিছনে তাকাতে হয়নি সেই নতুন গায়ক গায়িকাকেও। তাঁদের নাম আগেও বলেছি। কুমার শানু ও অনুরাধা পাড়ওয়াল। এবং গুলশন কুমার যেমন রাজা মিডাসের স্পর্শের মতো যা ছুঁয়েছেন তাই সোনা হয়েছে, তেমনই তিনি এই সিনেমাটির মাধ্যমে জন্ম দিলেন একটি নতুন সংগীত পরিচালক জুটির। যাঁরা গোটা নব্বই দশকের সেরা জুটি হিসাবে পরিচিত। একের পর এক হিট গান। তাঁদের নাম নাদিম-শ্রাবণ। নাদিম ধীরে ধীরে গুলশন কুমারের সবথেকে প্রিয় বন্ধু। দুজনেই হরিহর আত্মা হয়ে উঠলেন অল্পদিনের মধ্যেই।
টি সিরিজের ক্যাসেট সস্তায় হাতের কাছে চলে আসায় বেড়ে গেল এক ধাক্কায় টেপ রেকর্ডারের কোম্পানির ব্যবসাও। সস্তার টেপ রেকর্ড চলে এল বাজারে। সস্তার টেপ, সস্তার ক্যাসেট, সস্তার অ্যালবাম, এসে গেল নতুন এক ভার্সান। তার নাম টু ইন ওয়ান। আর ডাবল অ্যালবাম। এসবের যোগফলে সস্তাই হয়ে গেল গান। গান আর অধরা রইল না। অসংখ্য নতুন নতুন শিল্পীর আত্মপ্রকাশ হতে শুরু করল। যাঁদের কোনো রেডিও অডিশন চান্স দেয়নি। সব বড় বড় ক্যাসেট সংস্থা পাত্তাই দেয়নি। তাঁরা ডাক পেলেন। আর এই অসামান্য এক লাভনজক বিজনেস মডেল দেখে সংগীতজগতে হাজির হল টি সিরিজের উত্তরসূরি একের পর এক কোম্পানি। গণেশ জৈন নিয়ে এলেন নিজের সংস্থা। তার নাম ভেনাস। থোরানি গ্রুপ নিয়ে এল টিপস কোম্পানি। কেবল ভিডিও ব্যবসায় তুখড় মুনাফা করে ধনী হয়ে যাওয়া গুজরাতি ব্যবসায়ী ধীরুভাই শাহ শুরু করলেন তাঁর সংস্থা টাইম ভিডিও। আর এই প্রবল সস্তার বন্যায় এবং একাধিক বিকল্প সংগীত উৎপাদন সংস্থার আগমনের ফলে ব্র্যান্ডেড সংস্থাগুলির অস্তিত্ব সংকটে পড়ল। নিজেদের ভাসিয়ে রাখতে, গুরুত্ব বজায় রাখতে, বিক্রি ঠিক রাখতে সেইসব একদা উন্নাসিক সংস্থাগুলি হু হু করে নিজেদের দামি ক্যাসেট ও ডাবল অ্যালবামের দামও কমিয়ে দিতে শুরু করল বাধ্য হয়ে।
কয়েকশ কোটি টাকার টার্নওভার হয়ে যাওয়ার ঠিক পরই বিজনেস মডেল চেঞ্জ করতে শুরু করলেন গুলশন কুমার। কারণ প্রতিযোগীরা চলে এসেছে মার্কেটে। সুতরাং তাঁকে এবার অন্যদিকে নজর দিতে হবে। সুপার ক্যাসেট ইন্ডাস্ট্রিজের টেপ কোটিং শাখাকে তিনি আলাদা করে দিলেন। নাম দেওয়া হল টোনি ইলেকট্রনিক্স। এই কোম্পানির দায়িত্ব দিলেন ভাই দর্শন কুমারকে। ততদিনে টি সিরিজের ডিটারজেন্ট ব্র্যান্ড বাজারে এসেছে। এবং সেই একই ফরমুলা। সস্তায় সারা মাস চলার ডিটারজেন্ট। সেই সংস্থাকে আলাদা করে নতুন নাম দেওয়া হল। গোপাল সোপ ইন্ডাস্ট্রিজ। আর এক ভাই গোপাল কৃষ্ণ এই সংস্থার ভার নিলেন। এবং নতুন একটি সংস্থা চালু হল। তার নাম রজনী ইন্ডাস্ট্রিজ। যা তৈরি করবে আগরবাতি। গুলশন কুমার অনেক আগে থেকেই টের পেয়ে যেতেন বিজনেসের নতুন পালস কিছু হওয়া উচিত। সুপার ক্যাসেট ইন্ডাস্ট্রিজের অনেক প্রতিযোগী এসে গিয়েছে। তাই এখন সেই একই কোম্পানি ক্যাসেটের পাশাপাশি নিয়ে এল ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইট টিভি সেট। কেন? কারণ সমাজের যে অংশটির পক্ষে দামি ব্র্যান্ডের কালার টিভি কিংবা নিদেনপক্ষে ছোট পোর্টেবল টিভি কেনাও সম্ভব হচ্ছিল না তাঁদের কাছে গুলশন কুমার টিভি পৌঁছে দিলেন। বস্তিতে, কলোনিতে, ভাঙা টিনের চালের ঘরে। ক্যাসেট ব্যবসা ধীরে ধীরে মুনাফা কম দেওয়ার আগেই যাতে নিজের ব্যবসায়িক বুদ্ধিকে প্রয়োগ করে আরও বেশি করে নতুন ভেঞ্চার করা যায় সেটাই হল গুলশন কুমারের প্রধান টার্গেট। আর এই কাজে তিনি সফল। একদিকে ভিডিও শুরু করলেন বৈষ্ণোদেবী যাত্রা আর ভজনের প্যাকেজ। আবার অন্যদিকে সুরযপুরে শুরু করলেন হাউজিং প্রজেক্ট। আর হৃষীকেশে মিনারেল ওয়াটার প্রকল্প। শুদ্ধ গঙ্গার জল দিয়েই পানীয় জল নির্মাণ করা হচ্ছে এর থেকে বড় মার্কেটিং স্ট্র্যাটেজি আর কী হতে পারে? কিন্তু এত সব বড় বড় সংস্থা থাকতে উত্তরপ্রদেশের এই সব জায়গায় এত একরের পর একর জমি কীভাবে পেয়ে যাচ্ছেন গুলশন কুমার? তার ছোট উত্তর পাওয়া যাবে একটি প্রজেক্টের কথা শুনলে। গুলশন কুমার একটি তথ্যচিত্র প্রযোজনা করলেন। সেই তথ্যচিত্রের নাম দলিত সিংহিনী। এক ঘণ্টার। পরিচালক উদয়শংকর পাণি। তথ্যচিত্রের বিষয়বস্তু কী? এক দলিত সিংহিনীর জীবনকথা। তাঁর নাম মায়াবতী। যিনি তখন উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী! আর রাজ্যের সর্বত্র একটি সামাজিক প্রকল্প চালানোর প্রতিশ্রুতি দিলেন গুলশন কুমার। যার নাম আম্বেদকর গ্রাম বিকাশ যোজনা। মায়াবতী জানিয়ে দিয়েছিলেন গুলশন কুমারকে যেন তাঁর প্রয়োজনমতো সবরকম সাহায্য করা হয়। অতএব গুলশন কুমার নামক ম্যাজিকের এগিয়ে যাওয়া থামল না।
৩৫০ কোটি টাকার টার্নওভার! খাতায় কলমে। তার বাইরে কত? জানা যায় না। ঠিক এরকম একটি সময়ে গুলশন কুমার সম্পূর্ণ ধর্মীয় সংস্কৃতির প্রসারে মনোনিবেশ করলেন। তিনি ১২টি শিবমন্দিরকে অধিগ্রহণ করে সেগুলির ভোল পালটে দিলেন। একটি তাঁর নিজের বাড়ির পিছনে। বম্বের লোখান্ডওয়ালায়। যেখানে সেলিব্রেটি জগতের অনেকেই থাকেন। গুলশন কুমার এই ১২টি মন্দিরে ঘুরে ঘুরে পুজো করেন। নিয়ম করে। সেই মন্দিরে প্রতিদিন পুজো দিয়ে তাঁর অফিসের কাজ শুরু করতেন। এটাই নিয়ম। মন্দিরের পিছনের জায়গাটা আসলে একটি বস্তি। বম্বের যে কোনো সরু, ঘিঞ্জি, নোংরা আর সন্দেহভাজনদের আনাগোনা। ১২ আগস্ট ১৯৯৭ ! আজ যাওয়ার কথা আন্ধেরির জিতেশ্বর মহাদেব মন্দিরে। মন্দিরে যাওয়ার আগে বাধা পড়ল। একটি ফোন এসেছে। কে ? রহস্যময় কণ্ঠটি ওপার থেকে জানাল দুবাই থেকে বলছি?
গুলশন কুমার : হাঁ বোলিয়ে
কণ্ঠ : ১০ খোকা দিতে বললাম যে! কী হল?
গুলশন কুমার : আমি কেন দেব? যথেষ্ট দিয়েছি! এর থেকে মাতা বৈষ্ণোদেবীকে দেব, তাও ভালো। তোমাদের দেব কেন?
কণ্ঠ : এটাই ফাইনাল?
গুলশন : হ্যাঁ, এটাই ফাইনাল।
কণ্ঠ : তুমি জানো আমি কে?
গুলশন কুমার : না জানি না। আর জেনে কী করব?
কণ্ঠ : পুলিশকে বলতে হবে তো! বলে দিও। মেরা নাম সালেম। আবু সালেম! ইয়াদ রাখনা!
মেরুন মারুতি এস্টিম বাংলো থেকে বেরিয়ে এল। সকাল ১০ টা ৩৫। গুলশন কুমার মারুতি এস্টিম থেকে নামলেন পুজোর সামগ্রী হাতে নিয়ে। উত্তরপ্রদেশের কানপুরের এক সিকিউরিটি গার্ড দেহরক্ষী। তাকে কিছুদিন আগেই রাখা হয়েছে। কিন্তু গত দুদিন ধরে সে অসুস্থ। আসছে না। তাই আজ গুলশন কুমার একা! সঙ্গে কেউ নেই। পুজো শেষ হতে বেশি সময় লাগেনি। কারণ পুরোহিত জানেন আজ তিনি আসছেন। সব ব্যবস্থা তৈরিই থাকে। প্রথমে ভজন। তারপর আরতি। এবং সামান্য ধ্যান। পুজো শেষ। সিঁড়ি দিয়ে নামছেন গুলশন কুমার। আর দুটি সিঁড়ি বাকি। একটু দূরেই মেরুন রঙের মারুতি এস্টিম দাঁড়িয়ে। চালক বাইরে গাড়িতে হেলান দিয়ে দাঁড়ানো সেটাও দেখা যাচ্ছে। আচমকা তিনটি যুবক এগিয়ে এল। ঠিক কানের পাশে রিভলভারটা রেখে একটি ছেলে বলল, বহোৎ পুজা করলি..আব উপর যাকে করনা…। গুলশন কুমার তখনও বিশ্বাস করতে পারছেন না এটা হতে পারে। তিনি শুধু বললেন, ইয়ে কেয়া কর রহে হো?…কিঁউ…! ছেলেটি বলল, ভাই কো ইনকার করা থা না? আব ভুগতো! নাইন এম এম পিস্তল হাতে আর একজন গুলি চালাল সঙ্গে সঙ্গে। ঠিক গুলশন কুমারেরই কোনো ছবির দৃশ্য যেন। পুজোর সামগ্রীসহ রূপোর থালা ছড়িয়ে পড়ল রাস্তায়। গুলি খেয়েই ছুটতে শুরু করলেন গুলশন কুমার। কিন্তু পিছন থেকে আবার গুলি? কটা? ১৬ বার। ততক্ষণে স্তব্ধ হয়ে গোটা দৃশ্যটা দেখছিলেন গুলশন কুমারের গাড়ির চালক। নাম রূপলাল সুরয! এবার সম্বিৎ ফিরল। তিনি দেখছেন সাহেব মারা যাচ্ছেন। এটা কী হতে দেওয়া যায়! তাই নিথর ভাবটা কাটিয়ে সক্রিয় হলেন রূপলাল। সাহেবের হাত থেকে পড়ে যাওয়া পুজোর সামগ্রীতেই থাকা একটা কলসী নিয়ে ছুড়ে মারলেন তিনি হত্যাকারীদের লক্ষ্য করে। সেটা গায়ে লাগল লম্বা চুল আর ব্লু জিনস পরা ছেলেটির গায়ে। সেও তৎক্ষণাৎ গুলি চালাল। গুলি লাগল রূপলাল সুরযের পায়ে। তাও তিনি উঠে দাঁড়ালেন। আবার তাড়া করে জাপটে ধরলেন একজনকে। আবার গুলি। এবারও পায়ে। দুটি পায়েই গুলিবিদ্ধ হয়ে ছটফট করছেন রূপলাল। আর সেই মুহূর্তে গুলশন কুমার জিতনগর বস্তির প্রথম ঘরের মধ্যে ঢোকার চেষ্টা করলেন। মুখের উপর দরজা বন্ধ হয়ে গেল। এবার দ্বিতীয় ঘর। পাশেই। একজন মহিলা ছিলেন। তিনিও বন্ধ করলেন ভয়ে দরজা। কোথায় যাবেন গুলশন কুমার? এই বস্তির একটি কমন বাথরুম আছে। আজ পর্যন্ত জীবনে একবারই এই বস্তিতে এসেছিলেন গুলশন কুমার। মাতা বৈষ্ণোদেবীর ভাণ্ডারা দিতে। সেই বাথরুমে ঢুকে দেখলেন এক অদ্ভুত দৃশ্য। দেওয়ালে মাতা অম্বাদেবীর ছবি আঁকা। ইউরিনালের প্রবেশপথের বাইরেই। রাস্তার দেওয়ালে। পিছনে এসে গেল মৃত্যু। তাড়া করে আসা তিন হত্যাকারী আবার গুলি চালাল। গুলশন কুমার মাতা অম্বাদেবীর সেই ছবির ঠিক নীচে মুখ থুবড়ে পড়ে গেলেন। কিন্তু কনফার্ম করতে হবে তো? যদি সত্যিই না মারা যায়? তাই আবার গুলি চালানো হল! একটি ছেলে এক হাতে গুলি চালাচ্ছে আর বাঁ হাতটা উঁচু করে ধরা। সেই হাতে মোবাইল। মোবাইল অন করা। কারণ? কারণ হল ওপ্রান্তে আবু সালেম। সে পুরো হত্যাকাণ্ড লাইভ ব্রডকাস্ট শুনতে চায়। তাই এই ব্যবস্থা। গুলশন কুমার নিথর হয়ে যাওয়ার পর ছেলেটি ফোন কানের কাছে এনে বলেছিল, ভাই..ইসকা তো কাম হো গয়া..। আর সবথেকে রুদ্ধশ্বাস ঘটনা হল এরপর। ওই তিনজনকে দেখা গেল দৌড়ে মন্দিরের পিছনদিকে দাঁড়িয়ে থাকা একটা ট্যাক্সিকে পিস্তল দেখিয়ে দরজা খুলে উঠে পড়ল। চালক পালাতে চাইল। কিন্তু তার মাথায় রিভলভার ঠেকিয়ে বলা হল ঘোড়া দাবাউ কেয়া! অর্থাৎ এই তিনজন বম্বের মাফিয়া গ্যাংয়ের সদস্যই নয়। কারণ তাদের নিয়ম হল নিজেদের গাড়ি অথবা স্কুটার নিয়ে আসা। এরা এতটাই নভিস যে হেঁটে হেঁটে এসেছে। কোনো গাড়িতে পালানোর বন্দোবস্ত আগে থেকে ছিল না। ট্যাক্সি পেয়ে সেটাতেই উঠে পালাল। রক্তাক্ত গুলশন কুমারকে এরপর রাস্তায় থাকা মানুষ নিয়ে গেল ২ কিলোমিটার দূরের কুপার হাসপাতালে। তিন সেকেন্ড পরীক্ষা হল। ইমার্জেন্সিতে থাকা ডাক্তার মাথা নাড়লেন..ডেড়।
আবু সালেমের টার্গেট লিস্টে প্রথমে গুলশন কুমার ছিলেন না। তার আসল লক্ষ্য ছিল দুজন। সুভাষ ঘাই এবং রাজীব রাই। সেই সময়ের সবথেকে গ্ল্যামারাস দুই প্রযোজক পরিচালক। দুজনকেই টার্গেট করা হয়েছিল। কিন্তু দুবারই দুষ্কৃতীরা ব্যর্থ হয় এবং ধরা পড়ে যায়। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের দুর্ধর্ষ এক ক্রাইম রিপোর্টার এবং খ্যাতনামা থ্রিলার লেখক ওই দুই অ্যাটাকের পরই আবু সালেমকে ফোন কে লন। সালেম তাঁকে ঠান্ডা কণ্ঠে বলে, আমি ওই দুই অ্যাটাকের পিছনে নেই। আমার টার্গেট অন্য কেউ। নেক্সট উইকে দ্যাখো কী হতে যাচ্ছে! সেই সাংবাদিক ফোন রেখেই একটা ট্যাক্সি নিয়ে ছুটেছিলেন বম্বের ক্র্যাফোর্ড মার্কেটে। সেখানেই বম্বে পুলিশের হেডকোয়ার্টার। ক্রাইম ব্রাঞ্চ চিফ রনজিৎ সিং শর্মাকে গোটা ঘটনাটা বলে সেই সাংবাদিক অ্যালার্ট করে দেন। ওই সাংবাদিকের ক্রাইম নেটওয়ার্ক যে অত্যন্ত অথেনটিক তা নিয়ে পুলিশের কোনো সন্দেহ নেই। যাই হোক, সেই সাংবাদিকের কথা শুনেই বম্বে পুলিশ তৎক্ষণাৎ ব্যবস্থা নিলেন। বম্বের প্রথম সারির সমস্ত প্রযোজক, পরিচালক আর স্টারকে বিশেষ পুলিশ সিকিউরিটি দেওয়া হল। বাদ গেলেন একমাত্র গুলশন কুমার। কারণ তাঁর কথা কারও মাথাতেই এল না। তিনি এতই নির্বিরোধী আর ধর্মীয় কাজকর্মে নিবেদিত যে তাঁকে হত্যা করার প্ল্যান হতে পারে এরকম ভাবাই যায়নি। আর তিনিই ছিলেন মূল টার্গেট। গুলশন কুমার হত্যার পর আবার আবু সালেমকে ফোন করলেন সেই সাংবাদিক। এবার সালেম অনেক নার্ভাস। আগের মতো আগ্রাসী মনোভাব নেই। কোনোমতে আমতা আমতা করে সে যা বলল তা শুনে চমকে গেলেন সেই সাংবাদিক। কে সুপারি দিয়েছিল গুলশন কুমারের খুনে? আবু সালেম বলল, লালকৃষ্ণ আদবানি। তৎক্ষণাৎ বোঝা গেল সালেম মিথ্যা বলছে। আসলে সালেম টেনশনে পড়ে গিয়েছে এত হইচই শুরু হওয়ায়। তাই এভাবে অবিশ্বাস্য কথা বলে দৃষ্টি ঘোরাতে চাইছে। কারণ ততদিনে ব্যাপক ধরপাকড় চলছে বম্বে জুড়ে। রাজ্য সরকার তো বটেই, কেন্দ্রীয় সরকারও প্রবল চাপ দিচ্ছে এই কেসের ব্রেক-থু করতেই হবে এই দাবিতে। ঠিক তখন ক্রাইম ব্রাঞ্চ চিফ রণজিৎ সিং শর্মার কাছে একটি ফোন এল দুবাই থেকে। একটি রহস্যময় কণ্ঠ তাঁকে বলে আবু সালেম দুবাইতে কিছুদিন আগে একটি ফাংশনের আয়োজন করেছিল। তারপর ছিল একটা পার্টি। সেখানে বম্বে ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির তাবড় তাবড় স্টার হাজির হয়েছিল। অনুষ্ঠানটি ছিল নাদিম শ্রাবণ নাইট! পার্টিও তাঁদেরই। কাদের হাজির থাকার কথা ছিল? শাহরুখ খান, সলমন খান, আদিত্য পাঞ্চোলি আর জ্যাকি শ্রফ। এবং তারপর জানা গেল ভয়ংকর তথ্যটি। ওই ফাংশনেই প্ল্যান করা হয়েছিল গুলশন কুমার হত্যার।
তার মানে তো এই প্রত্যেক স্টারকে জেরা করা ছাড়া উপায় নেই? কিন্তু তারপর? যদি কেউ জড়িত না থাকে? তাহলে বম্বে পুলিশের উপর প্রবল চাপ আসবে। উপায় নেই। সেই ঝুঁকি নিতেই হবে। শাহরুখ খানকে প্রথম ডেকে পাঠানো হল বম্বে পুলিশের হেডকোয়ার্টারে।
“আমি জানতাম দুবাইয়ের কিছু ব্যবসায়ী একটা ফাংশন করছেন। আমার কোনো আইডিয়াই ছিল না আনিস ইব্রাহিম আর আবু সালেম এসবের পিছনে। কিন্তু যখনই আমি জানতে পেরেছি তৎক্ষণাৎ জানিয়ে দিয়েছিলাম আমি হোটেলে পা স্লিপ করে পড়ে গিয়েছি। তাই নাদিম শ্রাবণের পার্টিতে যেতে পারছি না। একথা জানিয়ে সেদিনই আমি ইভনিং ফ্লাইটে চলে আসি বম্বে।”..এই হল পুলিশের কাছে দেওয়া দু পৃষ্ঠায় শাহরুখ খানের স্টেটমেন্ট। সলমন খান, আদিত্য পাঞ্চোলিরাও জানালেন তাঁরা জানতেনই না ওই ফাংশন আর পার্টির আসল আয়োজক কে? তাঁরা তো ফাংশনে পারফর্ম করার জন্য গিয়েছিলেন। সুতরাং প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে কিছুই টের পাওয়া গেল না প্ল্যানটা কে করেছিল! চক্রান্তটা ঠিক কেন হল? ঠিক দু সপ্তাহ পর বম্বে পুলিশ একটি প্রেস কনফারেন্স ডাকলেন। জয়েন্ট কমিশনার রণজিৎ শর্মা কিছু বলবেন। গোটা বম্বে প্রেস ক্র্যাফোর্ড মার্কেটের পুলিশের সদর দপ্তরে ভিড় জমাল। ছোট ঘর। ঠাসাঠাসি। গমগম করছে। কী ব্যাপার? এত ভিড় কেন? কেন সমস্ত স্তরের রিপোর্টারকেই ডাকা হয়েছে? আর কেনই বা এত বেশি কড়াকড়ি? গোটা ঘরে নীরবতা নেমে এসেছিল যখন জয়েন্ট কমিশনার জানালেন বিখ্যাত সুরকার নাদিম সাইফি এই হত্যাকাণ্ডের সুপারি দিয়েছিল। তাঁকে গ্রেপ্তার করা হবে? নাকি হয়েছে? জানা গেল ততদিনে নাদিম লন্ডনে স্ত্রীর চিকিৎসার জন্য। তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছিল। তিনি বলেছেন, কিছুদিনের মধ্যে ফিরবেন এবং পুলিশের সঙ্গে সহযোগিতা করবেন। আজও নাদিম সাইফি ফেরেননি। যে গুলশন কুমার তাঁকে ব্রেক দিয়েছিলেন, যাঁর কারণে তিনি এত বিখ্যাত হলেন, সেই গুলশন কুমারকে হত্যা করার সুপারি দিয়েছিলেন নাদিম? কেন? এর পিছনে আরও কোনো বড় চক্র কাজ করছে না তো?
কীভাবে গোটা প্ল্যান প্রয়োগ করা হল? এটা জানতে চান আর এক দুর্ধর্ষ রিপোর্টার। মুম্বই এর। তিনি ক্রাইম কভার করেন। নাম জ্যোতির্ময় দে। তিনি জানেন কোন গ্রুপের মাধ্যমে এটা করা হয়েছে এবং কোথা থেকে প্ল্যানের খুঁটিনাটি হয়েছে পেতে হলে একটা লোককে ফোন করতে হবে। কে সে? ছোটা রাজন। সুতরাং রাজনকে ফোন করেছিলেন জ্যোতির্ময় দে। রাজন তখন ইন্দোনেশিয়ায়। ফোনে রাজন তাঁকে বললেন, আবু সালেম করেছে গোটা কাজটা। কোথাকার ছেলেদের কাজে লাগানো হয়েছে তাও জানা আছে রাজনের। শুধু সেদিন জানা ছিল না যে ওই কথোপকথনের ঠিক ১৪ বছর পর এই ছোটা রাজনই হত্যা করবে এই ক্রাইম রিপোর্টার জ্যোতির্ময় দে-কে। কীভাবে? কেন?
