দাদাকে ভালোবাসে দাউদ। কিন্তু এসব তার পছন্দ হচ্ছে না। সরাসরি কেউ বলেনি। কিন্তু দাউদের কানে এসেছে দাদা আজকাল মাঝেমাঝেই রাতে বাড়ি থাকে না। সন্ধ্যার পর বেরিয়ে যায়। ফেরে পরদিন সকালে। অথচ ভাবী প্রেগন্যান্ট। এমনিতে বাড়িতে দেখভালের জন্য সবাই আছে। সেরকম রিস্ক নেই। তবু নিজের স্বামীর তো পাশে থাকা উচিত এসব সময়। তাছাড়া এমন নয় যে বিজনেসের কাজে দাদা বাইরে রাত কাটাচ্ছে। কোথায় যাচ্ছে, কার সঙ্গে দেখা করছে এসবও দাউদের জানা। তাই বিরক্ত লাগছে। রাগ হচ্ছে। দু একদিন বাড়িতে ঢোকার সময় ভাবীর কান্না আর দাদার চিৎকার তার কানে এসেছে। কিন্তু এই দাদা তাকে ছোট থেকে সবসময় সবরকম ঝামেলা থেকে বাঁচিয়েছে। একবার একটা লোক মাহিমের রাস্তায় দাঁড়িয়ে টাকা গুনছিল। বাড়িতে চরম অভাব তখন। দাউদ সেটা দেখতে পেয়ে টাকাটা হাত থেকে কেড়ে নিয়ে পালিয়েছিল। কিন্তু লোকটা তাকে চিনতে পেরে গেল কীভাবে যেন। সোজা বাবাকে এসে বলে দেয়। বাবা তখন চাকরি থেকে সাসপেন্ড হয়ে বসে আছেন। সংসারে এতই টানাটানি যে সবার খাওয়া জুটছে না রোজ। তাই দাউদ ওই বাচ্চা বয়সেই প্রথম ক্রাইমটা করেছিল। বাবা সেদিনই ঘরে ঢুকে রাতে তাকে একের পর এক থাপ্পড় দিলেন। কান থেকে রক্ত বেরিয়ে যায়। সকলেই বাবাকে ভয় পায়। তাই কেউ কিছু বলতে পারছিল না। দিদি হাসিনা শুধু কাঁদছিল খুব। একমাত্র দাদা এগিয়ে এসে বাবাকে বলেছিল, ওর দোষ নেই, আমিই ওকে চ্যালেঞ্জ করেছিলাম। ও রাজি হয়নি। আমিই জোর করি। বলি ডরপোক। আর তাই ও ওরকম একটা কাজ করে ফেলেছে। বাবা ইব্রাহিম কাসকর শুনে অগ্নিমূর্তি হয়ে যান। এবং বড় ছেলেকে বেল্ট দিয়ে পেটান। একটুও নড়েনি দাদা সাবির ইব্রাহিম। ভাইয়ের অপরাধ নিজের ঘাড়ে নিয়েছিল। রাতে পাশাপাশি শোয়ার পর দাউদ দাদার পিঠে মলম লাগাতে লাগাতে কাঁদছিল। দাদা তাকে বলে ধুস, কিচ্ছু হয়নি। চিন্তা করিস না। তবে এরপর আব্বুর কানে যেন এসব না যায়! সেই দাদাকে তাই অন্যায় দেখলেও দাউদের পক্ষে কিছু বলা সম্ভব নয়। সে জানে এ দুনিয়ায় আম্মা ছাড়া এই লোকটা তাকে পাগলের মতো ভালোবাসে। কিন্তু ভাবীর সঙ্গে দাদা এটা কী করছে? এটা ঠিক নয়।
সাবির ইব্রাহিম চিত্রাকে ভালোবেসে ফেলেছে। দক্ষিণ মুম্বইয়ের কংগ্রেস হাউস নামক বিল্ডিং আসলে একটি রেডলাইট এরিয়া। দেহোপজীবিনীদের বসবাস। সেখানেই থাকে চিত্রা। সাবির আগেও একবার ভালোবেসেছে। শাহনাজকে। তাকেই বিয়ে করেছে সে। ভালোই তো দিন কাটছিল। দুজনের একটি সন্তানও হয়েছে। ভাইয়ের বিজনেস বাড়ছে। সবথেকে বড় কথা গত বছর পাঠান গ্যাংয়ের সঙ্গে সবরকম বিবাদ সমাপ্ত হয়েছে। একটা ডিল হয়েছে।
পাঠান আর তাদের গ্যাং একসঙ্গেই কাজ করবে। এই মিলন ঘটিয়েছে হাজি মস্তান। ফলে বিজনেসও বাড়ছে। বিজনেসের কাজে একবার এই কংগ্রেস হাউসে আসতে হয়েছিল। সেবারই প্রথম মুখোমুখি দুজন দুজনকে দেখে। চিত্রা আর সাবির। এবং ভালোবাসা তৈরি হল। আর ঠিক সেই সময় দ্বিতীয়বারের জন্য সন্তানসম্ভবা হল স্ত্রী শাহনাজ। প্রথম সন্তান পুত্র। সিরাজ। দ্বিতীয়টি কন্যা হোক। এটাই চায় দুজনে। চিত্রার সঙ্গে আলাপের পর সাবিরের আচরণ কি বদলে গেছে? সে কি আর ভালোবাসে না শাহনাজকে? একদমই নয়। শাহনাজের প্রতি তার প্রেম অটুট। সেটা শাহনাজও জানে। কিন্তু একটি বিশেষ কারণে চিত্রাকে ভুলতে পারে না। সাবির। সেটি হল যতই আন্ডারওয়ার্ল্ডের জগতে যাতায়াত হোক, সাবিরের মধ্যে একটা যেন অন্য মনও আছে। সে গজল শুনতে ভালোবাসে। বেশ কিছু শায়েরিও লিখেছে। আর চিত্রার সেগুলোই বেশি পছন্দ। সে ওখানে গেলে চিত্রা বলে, নতুন কী লিখেছ? আমাকে শোনাতে হবে কিন্তু! এভাবে কখনও কেউ সাবিরের কাছে শায়েরি শুনতে চায়নি। গজলের অর্থ জানতে চায়নি। ক্র্যাফোর্ড মার্কেট থেকে কেনা একটা চামড়ার হোলস্টারে কোমরে পিস্তল রাখা থাকে সাবিরের। কারণ চারদিকে শত্রু। সেই হোলস্টারে পিস্তল রাখা অবস্থায় দক্ষিণ মুম্বইয়ের কংগ্রেস হাউসের একটি ছোট্ট ঘরে এক দেহোপজীবিনীকে এক মাফিয়া গ্যাংস্টার শায়েরি শোনাচ্ছে এই দৃশ্যটি একেবারেই হিন্দি সিনেমার চিত্রনাট্য বটে। তবে ঠিক এরকমই ঘটে চলেছে দিনের পর দিন। সকলের অলক্ষে!
কিন্তু সাবির কিংবা তার ভাই জানেই না যে দুই পাঠান ভাই আমীরজাদা আর আলমজেব এক বছর মিত্রতার পরই বুঝে গিয়েছে ওই দাউদ গ্যাংয়ের সঙ্গে হাত মেলানোয় তাদের কোনো লাভই হয়নি। বিজনেসের সব লাভ ঘরে তুলছে দাউদ একাই। তাদের সিন্ডিকেট ইউজ করে দাউদ। মুনাফার লাভ দেয় না। তারা কিছুদিন ধরেই চাইছিল দাউদের পোর্টে আসা মালের একাংশের বিজনেস যেন তাদের দেওয়া হয়। দাউদ রাজি নয়। সে শুধু কমিশনই দিতে রাজি। ডাইরেক্ট বিজনেস নেটওয়ার্ক সে তুলে দেবে না এদের হাতে। কারণ কী? কারণ তার আগে কেউ এই স্মাগলিং বিজনেসকে ইন্টারন্যাশনাল লেভেলে নিয়ে যায়নি। সকলে দেশের মধ্যেই পাচার করত বাইরে থেকে আসা মাল। দাউদ একাই নিজের প্রচেষ্টায় দুবার দুবাই গিয়ে নেটওয়ার্ক করে এসেছে। সুতরাং তার ফল এখন পাওয়া যাচ্ছে। এসব সে ভাগীদার করবে কেন? অতএব দূরত্ব বাড়ল। পাঠান ভাইয়ারা অবশেষে স্থির করল একটাই প্ল্যান। এই দুই ভাইকে খতম করতে হবে। তাহলে গোটা গ্যাং তাদের হাতে আসবে। এটাই একমাত্র পথ। সুতরাং প্রথমে অপারেশন সাবির!
সাবিরের সঙ্গে চিত্রা নিজের বদ্ধ জীবন থেকে মুক্তির পথ পেয়েছে। সাবির এলেই কিছুক্ষণ পরই তারা বেরিয়ে পড়ে বাইরে। গোটা মুম্বই চক্কর খায় গাড়িতে। সাবির গজল শোনায়। চিত্রা শোনে। সাবির স্পিড তোলে ফাঁকা জুহুবিচকে পাশে রেখে সমুদ্রতীরে। চিত্রা স্টিয়ারিংয়ে হাতে হাত রাখে। ছোট্ট গাড়ি। ছোট্ট পরিসর। চিত্রার প্রিয় তাদের এই ছোট্ট গাড়ি-সংসার। গাড়ির নাম প্রিমিয়ার পদ্মিনী। ১৯৮১ সালের মুম্বই অনেক ফাঁকা। সন্ধ্যায় শাহনাজের মেডিকেল চেক আপ ছিল। দুজনে ফিরে এসেছে। আজ বেরোবে না তো সাবির? ভাবছিল শাহনাজ। সেই সময়ই ফোনটা বাজল। সাবির ধরল। ওপ্রান্তে চিত্রা। চিত্রা শুধু বলল, আমার ভালো লাগছে না। তোমাকে দেখতে ইচ্ছে করছে। আজ আসবে একবার? সাবির একটু ইতস্তত করছে। আজ তার বেরনোর প্ল্যান বা ইচ্ছা কিছুই ছিল না। কিন্তু এভাবে তো কখনও চিত্রা ডাকে না। কী হয়েছে? অতএব একবার যাবে সাবির। আমি একটু বেরোচ্ছি। বলে বেরিয়ে গেল সাবির। শাহনাজ বিষণ্ন হয়ে পড়ল আবার। চোখে জল এল। কিন্তু কিছু বলল না।
না। আজ ঘরে বসা হবে না। চিত্রা চায় একটু খোলা বাতাস। বাইরে চলো। গেল তারা বাইরে। ঠিক হাজি আলি দরগার বাইরের রাস্তায় ফাঁকা সড়কে সাবির রিয়ারভিউ আয়নায় দেখতে পেল তার গাড়ির পিছনে একটি অ্যামবাসাডর। দেখে হাসল। বিয়ের মরশুম চলছে। ওই গাড়িতে নতুন বরবধূ বসে। গোটা গাড়ি ফুলে ঢাকা। আর সঙ্গে বেশ কিছু বিয়েবাড়ির লোক। অবশ্য ফুলে মুখ ঢাকা বরবধূর। এবার আচমকা চোখ পড়ল গাড়ির ফুয়েল মিটারে। যাহ! তেল তো প্রায় নেইই। পেট্রল ভরতে হবে। কাছেপিঠে পেট্রল পাম্পও নেই। কোথায় যাওয়া যায়? প্রভাদেবীতে একটা আছে। সাবির সেদিকেই গাড়ি ঘুরিয়ে দিল। এবং মিনিট দশেকের মধ্যেই পেট্রল পাম্পে পৌঁছে ট্যাংক ফুল করে দিতে বলে চিত্রার দিকে তাকিয়ে কিছু একটা বলতে যাবে। তখন আচমকা আবার জানালা থেকে দেখা গেল সেই সাদা অ্যামবাসাডর। বিয়ের বরকনেকে নিয়ে। বাইরে দাঁড়িয়ে আছে। এবার সাবিরের সিক্সথ সেন্স কিছু একটা বলল তাকে। এটা তো খুব স্বাভাবিক নয়! কারা এরা? সাবির চিত্রাকে বলল গাড়ির জানালা তুলে দাও। নিজেও তুলে দিল। হোলস্টার থেকে আচমকা বের করে আনল পিস্তল। কিছু একটা হচ্ছে, কিন্তু কী হচ্ছে? বুঝতে পারছে না চিত্রা। আজ পর্যন্ত কোনোদিন পিস্তল বের করেনি সাবির তার সামনে। সর্বদাই সেটা আড়াল করে রেখেছে। আজ কী হল? এটা ভাবার সঙ্গে সঙ্গে পেট্রল পাম্পের ছেলেটি এসে জানালায় মুখ বাড়িয়ে বলল, সাব, হো গয়া…। অ্যাক্সিলেটারে প্রবল শব্দে একটা গাড়ি ঢুকে এল। সোজা ব্লক করে দাঁড়াল সাবিরের গাড়িকে। চারজন লাফ দিয়ে সামনে। একজন প্রথমেই ড্রাইভিং সিটের পাশে এসে এক ঝটকায় দরজা খুলে চিত্রাকে বলল, নেমে যাও যদি বাঁচতে চাও…। চিত্রার মুখে কথা নেই। কী হচ্ছে? কেন হচ্ছে? সাবির স্তব্ধ । হাতে পিস্তল কিন্তু চোখের সামনে চিত্রাকেও তো পিস্তলের সামনে ধরে আছে একটি যুবক। যুবককে চেনে সাবির। মনোহর সুরভে। সবাই ডাকে মান্যা। অন্যরা আরও বেশি চেনা। আমিজাদা, আলমজেব। তাদের গ্যাংয়ের নতুন বিজনেস পার্টনার। পাঠান ভাই। নিজের মৃত্যু নয়, সম্ভবত সাবিরের চোখের সামনে প্রথম ভেসে উঠল ভাইয়ের মুখটা। ভাই দাউদ এই সময় পাশে থাকলে…সে যখন জানবে তখন…। ড্রাইভিং ডোর খুলেই বেরিয়ে আসার চেষ্টা করল সাবির। আর তৎক্ষণাৎ ঝাঁকে ঝাঁকে গুলি। রক্ত, রক্ত, রক্ত। সাদা রঙের প্রিমিয়ার পদ্মিনীর ভিতরটা লাল হয়ে গেল। চিত্রা ঠিক বুঝতে পারছে না এসব যে সত্যিই হচ্ছে! এও হয়! চোখের সামনে? একটু আগেই সাবিরের হাতে তার হাত ধরা ছিল। আর সাবির এখন নেই? চিত্রা জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে পড়ে গেল। সাবির মারা গিয়েছে। দাউদ ইব্রাহিমের বড় ভাই, সবথেকে প্রিয় মানুষকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। আলমজেব এখানেই শেষ করল না ব্যাপারটা। সাবিরের মাথা স্টিয়ারিং এ ঠেকেছে। সে মৃত। কিন্তু এখানেই রাগ শেষ হচ্ছে না। আলমজেব এগিয়ে এসে পকেট থেকে একটা ছুরি বের করল। সাবিরের রিস্ট কেটে দেওয়া হল এক ঝটকায়! আবার। রক্ত..রক্ত..রক্ত!
সাবিরকে খুন করে অবশ্য শেষ হয়নি পাঠান গ্যাংয়ের সেদিনের অপারেশন। তারা এরপর আরও বড় আত্মবিশ্বাস নিয়ে গাড়িতে উঠল। এত সহজে এত বড় একটা অভিযান হয়ে যাওয়ায় তারা ভাবল “ভ কাজে দেরি কেন? আসল লোকটাকেও উড়িয়ে দেওয়া যাক। তাই সেই অ্যামবাসাডর সোজা এল পাকমোড়িয়া স্ট্রিট। বাড়ির নাম মুসাফিরখানা। লোহার গেট বন্ধ। দাউদ ভিতরে। বাইরের সিকিউরিটি গার্ডকে দুটো গুলিতে স্তব্ধ করে দেওয়া হল। এবার ঢুকতে হবে। আজ বংশ নিকেশ করা হবে এই কাসকরদের। এটাই টার্গেট। আর তৎক্ষণাৎ হঠাৎ ভিতরের দিক থেকে ধেয়ে এল উপর্যুপরি গুলিবৃষ্টি। পাঠান গ্যাং হতচকিত! একী ? এত রাতে এভাবে ভিতর থেকে গুলি চালাচ্ছে কে? এরা প্রত্যাশাই করেনি যে এভাবে কেউ গুলি চালানোর মতো এই মধ্যরাতে জেগে থাকতে পারে। ফলে শুরু হল গুলির লড়াই। যে গুলি চালাচ্ছিল তার নাম খালিদ পেহলওয়ান। দাউদের একনম্বর দক্ষিণ হস্ত আর শার্প শুটার। কিছুক্ষণ পরই পিছু হটে গেল পাঠান বাহিনী। কারণ তাদের গুলি শেষ। ছুটে আসছে দাউদ.. ছুটে আসছে আনীস, ছুটে আসছে খালিদ…। পালাচ্ছে পাঠানরা। পিছনে বাইক নিয়ে তাড়া করছে দাউদ। গুলি চলছে পাকমোড়িয়া স্ট্রিটে। এবার আচমকা দাউদের বাইকের স্পিড কমে গেল। কারণ তার মাথায় এল একটা অদ্ভুত বিস্ময়। দাদা কোথায়? গুলির শব্দ শুনে তারা সকলেই বেরিয়ে এল। দাদা নেই কেন? সে কোথায় ? বাড়িতে নেই? ততক্ষণে পাঠানদের অ্যামবাসাডার পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছে। আর দাউদ খালিদকে জিজ্ঞাসা করেছে ভাইয়া কোথায়? খালিদ বাইক থেকে নেমে চোখ নামাল। মুখে কথা নেই। দাউদ বুঝল। ভাইয়া আজও বেরিয়ে গিয়েছে রাতে। সেই মেয়েটার সঙ্গে দেখা করতে। ঠিক তখন একটা বাইক আসছে উর্ধ্বশ্বাসে। কে আসছে? রঞ্জিত। দাউদের আর এক সাথী। রঞ্জিত কাঁদছে। রঞ্জিত কথা বলতে পারছে না। কেন? কী হয়েছে? রঞ্জিত কাঁদতে কাঁদতে শুধু বলল, সাবির ভাইকো মার দিয়া কিসিনে! দাউদের বিশ্বাস হল না যেন কানকে। সে ঝাঁকাচ্ছে রঞ্জিতকে। তার মাথা কাজ করছে না। সাবির ভাই নেই?
দাউদ যেন এবার কোনো বদলা না নেয়! তার বাবা তাকে বোঝাচ্ছেন। ইব্রাহিম কাসকর জানেন দাউদ গোটা মুম্বইকে শ্মশান করে দিতে চাইছে। কারণ দাদাকে সে ভালোবাসে প্রাণের থেকেও বেশি। মুম্বই ক্রাইম ব্রাঞ্চের এক সময়ের হেড কনস্টেবল ইব্রাহিম কাসকর সোজা নিজের কর্মস্থলে গেলেন। সেখানে হাতজোড় করে বললেন, আমার বড় ছেলের খুনের তদন্ত করুন স্যার। দোষীদের সাজা না হলে আপনাদের চোখের সামনে শহরে রক্তের স্রোত বইবে কিন্তু। দাউদ এসব জানছে। দেখছে। কিন্তু এতদিন বাবা আর তার মধ্যে ছিল দাদা। বরাবর দাদা তাদের দুজনের মধ্যে হাজির হয়ে সবরকম ঝামেলা মিটিয়েছে। এখন দাদা নেই। সে তাই আর বাবার কথা শুনবে না। প্রতিশোধ নিতেই হবে। নাহলে তার স্বপ্ন ভেঙে যাবে। স্বপ্ন হল নিজের সাম্রাজ্য গড়ে তোলা। সে হবে বেতাজ বাদশা। মুম্বই থেকে পাঠানদের উধাও করে দেওয়া হবে। একটাই গ্যাং থাকবে। তার গ্যাং। আর তার জন্য দরকার প্রতিশোধ। তার জন্য দরকার ভয়। সাম্রাজ্যের হাতিয়ার একমাত্র ত্রাস সঞ্চার করা। সুতরাং সুযোগ খুঁজছে সে। তবে ইব্রাহিম কাসকরের বারংবার পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সে যাওয়া আর তার সতর্কবাণী এই কেসের ব্রেক থ্রু না হলে মুম্বইয়ের রক্তস্রোত বন্ধ করা যাবে না শুনে সত্যিই মরিয়া হয়ে ঝাঁপাল ক্রাইম ব্রাঞ্চ। কিন্তু কোথায় দুই পাঠান ভাই? তারা ততদিনে পালিয়েছে গুজরাতে। আমেদাবাদে কালুপুরা এলাকায়। সেখানে কী আছে? তাদের ওখানেও কি কোনো হাইড আউট আছে নাকি? তখনও পুলিশ জানে না এই দুই পাঠান ভাইকে কে আশ্রয় দিয়েছে? আমেদাবাদের মতো জায়গায় ক্রাইম শুধু আবর্তিত হয় মদ সাপ্লাই নিয়ে। বেআইনি মদের ভাণ্ডারের দখলদারি প্রধান অপরাধ। এছাড়া জুয়া আর মটকা ডন আছে কিছু। আলমজেব আর আমিরজাদার কি তাহলে আমেদাবাদেও কোনো নেটওয়ার্ক আছে? এখনও পর্যন্ত পুলিশ জানে না সেটার সন্ধান।
দাউদের সবথেকে বড় শত্রুদের মুম্বই থেকে অনেক দূরে আমেদাবাদের এক গলির মধ্যে গোপন ঘরে যে আশ্রয় দিয়েছে সে লোকটির নাম আবদুল লতিফ। ১৯৫১ সালের ২৪ অক্টোবর জন্ম। বাবা আবদুল ওয়াহাব শেখ এলাকায় তামাক আর বিড়ি বিক্রেতা। সাত সন্তান। লতিফের স্কুলে পড়া বেশিদিন হল না। বাবার দোকানে সে বিড়ি তৈরি করতে শুরু করল। প্রতিদিন তার মজুরি ২ টাকা। কিন্তু এই টাকায় চলে না তার। আরও বেশি টাকা চাই। অতএব অন্য ধান্দা। মনজুর আলির মদ আর জুয়ার আড্ডায় যাওয়া আসার ফাঁকেই একদিন আবদুল লতিফ প্রবেশ করল মদের দুনিয়ায়। বেআইনি মদের ব্যবসা করলে টাকা যে জলের মতো আসবে সেটা প্রথম বুঝেছিল লতিফ। তাই শুরুতেই লতিফের প্রথম কাজ হয়েছিল যেভাবেই হোক পথের ছোটখাটো কাঁটা সরানো। হঠাৎ করেই দেখা যেত গুজরাত আর দিউর মধ্যে চলাচল করা ফেরি, ডিঙিতে একের পর এক মৃতদেহ ভেসে আসছে। কখনও সমুদ্রের চরে এসে ঠেকছে মৃতদেহ। কেন এই মৃত্যুমিছিল? কারণ লতিফ। গোটা গুজরাত জুড়ে এক ত্রাস সৃষ্টি হয়ে গেল। বেআইনি মদের ব্যবসা করলেই লতিফের হাতে মরতে হবে। কারণ সে কোনো ছোট গ্যাংকেও এই ব্যবসা করতে দেবে না। এই সাম্রাজ্য তার একার। এভাবেই তার এই একচ্ছত্র সাম্রাজ্য চালাতে দরকার অন্তহীন অস্ত্র। সেসব কোথা থেকে আসবে? অস্ত্রের খোঁজে লতিফ গিয়েছিল মুম্বই। সেখানে তার সঙ্গে আলাপ হয়েছে দুই পাঠান ভাইয়ের। আলমজেব আর আমিরজাদা। তারা অস্ত্র দেবে লতিফকে। আর বিনিময়ে গুজরাতের কাছে দমন পোর্টে আরব থেকে ইলেকট্রনিক গুডস আর রুপোর বাট নিয়ে এসে সমুদ্রপথে মুম্বই পাঠাবে লতিফ। সেই বিজনেসের কমিশনও পাবে লতিফ। শুধু একটাই শর্ত। ওই আরব, দমন আর মুম্বই….এই রুটের মধ্যে আর যেন কোনো গ্যাং নাক গলাতে না পারে। আর কোন গ্যাংকে ভয়? দাউদ। সে মাঝেমাঝেই যায় দুবাই। তার নজর আছে গুজরাত উপকূলের দিকে। সুতরাং সাবধান। লতিফ অবজ্ঞাভরে হেসেছিল। সে নাম শুনেছে দাউদের। কিন্তু পরিচয় নেই। চেনেও না। আর দেখেওনি। একটা জিনিস শুধু জানে। গুজরাতে সেই ডন। আর কেউ নেই। সুতরাং আলমজেব আর আমিরজাদা যখন সাবিরকে হত্যা করে মুম্বই থেকে পালানোর কথা ভাবল, তাদের একমাত্র মাথায় এল একটাই নাম। আমেদাবাদ। আবদুল লতিফ।
প্রেস্টিজ থাকছে না মুম্বই পুলিশের। সাবিরকে এভাবে হত্যা করার পর একজনও ধরা পড়ল না। ঠিক সেই সময়ই একজন প্রযোজককে কিডন্যাপ করা হল। মুশির আহমেদ। মুক্তিপণ নিয়ে ছাড়াও পেয়ে গেলেন তিনি। কিন্তু ব্যতিক্রম ঘটল একটু। মুক্তি পেয়েও ভয় পেলেন না। সোজা ক্রাইম ব্রাঞ্চে গিয়ে জানালেন কীভাবে অপহরণ হয়েছিলেন। কোন কোন রাস্তায় তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। দুদিক থেকে দুজন ধরে রেখেছিল। তার মধ্যেই যেটা
তিনি দেখেছিলেন তা হল একটা জায়গায় শোলের বিরাট পোস্টার। তারপর ১৫ মিনিট পর এমন একটা বাড়িতে ঢোকানো হল যেখান থেকে বাচ্চাদের কোরান পাঠের শব্দ শোনা যায়। আর বাড়িটা কাঠের ছিল। পুরোনো দিনের। ব্যস! আর কিছু নয়। ক্রাইম ব্রাঞ্চে একটা ফোন এসেছে। কোনো এক ইনফর্মার। সেই রহস্যময় ফোনটি জানিয়ে দিল প্রযোজক মুশির আহমেদকে কোথায় লুকিয়ে রাখা হয়েছিল। যেখানে রাখা হয়েছিল সেটি কুখ্যাত পাঠান আলমজেবের অফিস। ট্রান্সপোর্টের। সেটাই তার ক্যামোফ্লেজ করা ব্যবসা। সবাইকে সে বোঝানোর চেষ্টা করে সে ট্রান্সপোর্টের ব্যবসা করে। আসল ব্যবসা আড়ালে। সেই ফোনটিই ব্রেক থ্রু। তৎক্ষণাৎ ক্রাইম ব্রাঞ্চ বেরিয়ে পড়ল। কিন্তু আলমজেবের অফিসে গিয়ে কাউকেই পাওয়া গেল না। শুধু কেয়ারটেকার একটি ছেলে একাই ছিল। সেলিম। তাকে জেরা করে অবশেষে সন্ধান পাওয়া গেল একটি নতুন ঠিকানার। আমেদাবাদ। কালুপুরা। পুলিশ দেখল একটি হোটেল। সাদা পোশাকে গিয়ে কিছুই পাওয়া গেল না। কয়েকজন শুধু খাওয়া দাওয়া করছে। অপেক্ষা করতে হবে। এই হোটেল আবদুল লতিফের। পিছনেই আছে গেস্ট হাউস সেখানে চারটি ঘর। চার ঘণ্টা অপেক্ষার পর সন্ধ্যা সাতটা নাগাদ একটা সাদা অ্যাম্বাসাডর আসছে। গাড়ির নম্বর GUJ ৭৯৯৯। নামছে এক ব্যক্তি। আমিরজাদা। গ্রেপ্তার করা হল তাকে সাবিরকে হত্যা আর মুশির আহমেদকে কিডন্যাপের অপরাধে। পিছনের গাড়িটি একটু দেরি করছিল। একটা বাড়িতে রাখা মদের ক্রেট লুকিয়ে আনতে হবে। সেই গাড়ি সেখান থেকে ফিরে দূর থেকে দেখতে পেল কী কারা যেন আমিরজাদাকে ধরে একটা অন্য গাড়িতে তুলছে। গাড়িতে বসা আবদুল লতিফ। আকবর নামের বাচ্চা একটা ছেলে খাবার জল ভরে আনে টিউবওয়েল থেকে। হোটেলের কর্মী। সে পিছনের গেট থেকে এসে লতিফকে জানাল পুলিশ এসেছে। বম্বে থেকে।
আর ঠিক সেই সময়ই আর একটি ফোন গিয়েছে পাকমোড়িয়া স্ট্রিটে। গুজরাত থেকে। ফোন ধরেছে খালিদ পেহলওয়ান। ফোনটি কানে নিয়ে ওদিক থেকে কোনো একটি সংবাদ শুনেই খালিদের মুখে হাসি ফুটে উঠল। সে শুধু বলল, শুক্রিয়া! এক দৌড়ে ভিতরের ঘরে গিয়ে দাউদকে বলল, পাঠানকো পাকড় লিয়া পুলিশ! দাউদের মুখটা এক নিমেষে শক্ত হয়ে গেল। এবার! এবার টাইম এসেছে।
এমন কাউকে চাই যার কোনো পিছুটান নেই। যে এনকাউন্টারে মারা গেলে কোনো আফশোস নেই। যে ধরা পড়লেও জেরায় কোনো ডিটেইলস জানাতে পারবে না। সর্বোপরি যে হবে প্রচণ্ড শার্প শুটার। এরকম কাকে পাওয়া যাবে? চেনা আর অভিজ্ঞ ক্রিমিন্যালকে দিয়ে এটা করানো যাবে না। কারণ কার নার্ভ কতক্ষণ স্ট্রং থাকবে তা অনিশ্চিত। সব ফাঁস করে দেবে। অতএব আনকোরা কেউ করুক। যে প্রায় কিছুই জানে না। সেই আনকোরা নতুন ক্রিমিন্যালের নাম ডেভিড পরদেশি। রাজন নায়ার অর্থাৎ বড়া রাজন তাকে বাছাই করেছে। দাউদের কন্ট্রাক্ট। ছেলেটিকে তৈরি করতে হবে। ট্রেনিং দিতে হবে। টার্গেট আমিরজাদা। আমিরজাদা? তাকে তো অলরেডি পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে। তাহলে তাকে আর কীভাবে খতম করা ম্ভব? দাউদ জানে, যা সম্ভব না, সেটাই সে করে দেখাবে দুনিয়ায়। অতএব আমিরজাদাকে খতম করার প্ল্যান হয়েছে আদালতের মধ্যেই! যা ভূভারতে কখনও ঘটেনি।
১৯৮৩ সালের ৬ সেপ্টেম্বর ডেভিড পরদেশিকে গাড়ির পিছনে বসিয়ে রাজন আর দুই শাগরেদ বলরাম বেণুগোপাল ও আলি আন্তুলে সিটি সিভিল কোর্টে নিয়ে গেল। গাড়ি চালাচ্ছে বলরাম। সেদিন আমিরজাদাকে কোর্টে প্রোডিউস করা হবে। প্ল্যান কী? প্ল্যান হল কোর্টের মধ্যে আমিরজাদাকে গুলি করবে ডেভিড। ঠিক যেখানে কাঠগড়া তার পাশেই একটা জানালা আছে। গুলিটা করেই ডেভিড সেই জানালা থেকে ঝাঁপ দেবে নীচে এমনভাবে যাতে একটা গাড়ির বনেটের উপর বা ছাদে সে পড়ে। সেই গাড়িতে বসে থাকবে রাজন নায়ার, বলরাম গাড়ি স্টার্ট দিয়ে রাখবে আর বাইরে থাকবে আলি। যদি গড়িয়ে মাটিতে পড়ে যায় ডেভিড তাহলে আলি তাকে তুলে ধরে ঢুকিয়ে দেবে গাড়িতে। এবং গাড়িটি জোরে চালিয়ে ৩ নং গেট থেকে পালানো হবে। নিখুঁত প্ল্যান। কারণ এই একই জিনিস দিনের পর দিন ট্রেনিং দেওয়া হয়েছে। মহড়ার সময় ডেভিড এখন আর দোতলা থেকে নীচে ঝাঁপ দিলে গড়িয়ে পড়ে না। সোজা গাড়ির বনেটেই নামতে পারে রোগা চেহারায়। চড়া সিকিউরিটি তেমন একটা নেই। কারণ পুলিশের গাড়িতে চাপিয়ে আদালতে আনা হবে এবং শুনানির পর জানা কথা জামিনের আবেদন ক্যান্সেল হবে। তাই আবার পুলিশ নিয়ে যাবে জেলে। সুতরাং রিস্ক নেই। ঢলঢলে জামা, হালকা প্যান্ট। ডেভিডের জামার মধ্যেই রাখা আছে রিভলভার। আমিরজাদাকে কোর্টে আনা হয়েছে। কাঠগড়ায় নয়। পাশে একটা জায়গায় দাঁড়ানো সে। কিন্তু একী ? এত ভিড় কেন? এটা তো আগে ভাবা হয়নি। ডেভিড দেরি করে ঢুকেছে। তাই পিছনে পড়ে গেল। সামনে অসংখ্য পুলিশ। উৎসাহী জনতা। কালো কোটের উকিল। ঘরটা এমন কিছু বড়ও নয়। তবু আমিরজাদাকে দেখা যাচ্ছে না। ভিতরে মাথায় ঢেকে যাচ্ছে সে। কী করবে ডেভিড? সে তো এগোতেই পারছে না! উত্তেজনায় ঘাম জমছে তার কপালে। এখন কি আগে থেকেই রিভলবার বের করে রাখবে? কিন্তু পাশের লোকজন দেখে ফেললে? আগেই ধরা পড়ে যেতে হবে। জোর করে সামনে দাঁড়ানো পুলিশের মাথা সরানো সম্ভব নয়। তাহলে সন্দেহ হবে। বের করে দেওয়া হতে পারে। কোর্টের বিচারক এসে গিয়েছেন। সরকারপক্ষের আইনজীবী পুলিশের চার্জ জানালেন। আমিরজাদার উকিল পালটা বলছেন, কোনো প্রমাণই তো নেই পুলিশের কাছে। সম্পূর্ণ মিথ্যা অভিযোগে…। ঠিক এই সময় দুজন পুলিশ বেরিয়ে আসছে বাইরে। সামনে কিছুটা জায়গা পেল ডেভিড। নিমেষে সামনের দিকে এগিয়ে আসতে আসতেই জামার ভিতর থেকে রিভলবার হাতে নিয়েছে। এবার আমিরের মাথা টার্গেট করবে? নাকি বুক? মাথায় রিস্ক আছে। যদি একটু এদিক ওদিক হেলিয়ে দেয়? ডেভিডের নিজেরই মাথা ব্ল্যাংক হয়ে যাচ্ছে টেনশনে। সে পেশাদার অপরাধী নয়। প্রচুর টাকার লোভে রাজি হয়েছে। এরকম সময় একবার যেন তারই দিকে তাকাল আমিরজাদা। সোজা। ডেভিড আর দেরি না করে রিভলভার তুলে নিশানা স্থির করল। এদিকে কোর্ট প্রসিডিংস চলছে। দুই উকিল মুখোমুখি। বিচারক কিছু একটা নোট করছেন। পেশকারের হাতে একটা কিছু কাগজ, তিনি দেবেন বিচারককে। যে কোনো সাধারণ কোর্টরুমের স্বাভাবিক দৃশ্য। আমিরজাদার মুখে যেন একটু অবিশ্বাস! এটা হতে পারে নাকি? কিন্তু কয়েক সেকেন্ড! ডেভিড গুলি ছুঁড়ল। আমিরের কপালের মাঝখানে! বিস্ফারিত নেত্রে কাঠগড়ার কাঠের রেলিংয়ে ধাক্কা লেগে পড়ে গেল আমিরজাদা। আর নিমেষের মধ্যে ডেভিড জানালার কাছে। কিন্তু তার থেকেও তৎপর ছিলেন ক্রাইম ব্রাঞ্চের পুলিশ অফিসাররা। তাকে লক্ষ্য করে পালটা গুলি করল পুলিশ। ছিটকে পড়ে গেল ডেভিড। ঠিক জানালার নীচে তখন অপেক্ষা করছে রাজন নায়ারের টিম। কখন ঝাঁপ দেবে ডেভিড? আলি বাইরে দাঁড়িয়ে। সে বুঝে নিয়েছে কী হয়েছে। বলল, ডেভিড ধরা পড়েছে। গুলিও খেয়েছে। আর পাঠান? পাঠান খতম! ব্যস! এটাই তো জানার ছিল। এবার পালাও! কিন্তু ডেভিড কি বেঁচে আছে? নাকি মারা গিয়েছে সেও?
ডেভিড বেঁচে গেল শুধু তাই নয়। ক্রাইম ব্রাঞ্চের জেরায় বলেও দিল রাজন নায়ার আর দাউদের নাম। গ্রেপ্তার করা হল দাউদকে। এর আগে তার বিরুদ্ধে ছিল কনসারভেশন অফ ফরেন এক্সচেঞ্জ অ্যান্ড প্রিভেনশন অফ স্মাগলিং অ্যাক্ট (কফেপোসা) আইনের মামলা। ১৯৮০ সালে তাকে ওই মামলায় একবার গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। এবার আবার সেই মামলার পাশাপাশি খুনের চক্রান্তে জড়িত থাকার অভিযোগ। কফেপোসা মামলায় যেহেতু দাউদ গুজরাত থেকে স্মাগলিংয়ের রুট তৈরি করেছিল তাই তাকে বারংবার হাজির করানো হত বরোদা আদালতে। পুলিশকে ক্রয় করা দাউদের বরাবরের শখ। এরকম সাফল্য আর কোনো অপরাধীর আছে কিনা তা নিয়ে সন্দেহ আছে। কাফেপোসা মামলায় তাকে মুম্বই থেকে আমেদাবাদে আনা হত। আমেদাবাদের জেল থেকে বরোদা আদালতে যাওয়া একপ্রকার নিত্য রুটিনে পরিণত হয়েছিল কিছুদিন অন্তরই। সাব ইনস্পেক্টর বিশনয়কে হাত করেছিল দাউদ। সাব ইনস্পেক্টর বিশনয় ‘আর টিমই দাউদকে বরোদা আদালতে নিয়ে আসা যাওয়া করত। আর দাউদের গুজরাতের নেটওয়ার্ক এতই স্ট্রং ছিল যে এই গোটা রুটে নারোল হাইওয়েতে একটি হোটেল চালাত তারই এক স্মাগলিং পার্টনার। সুতরাং আদালতে যাওয়া আসার পথে ওই হোটেলে পুলিশের জিপ ঢুকে যেত। দাউদ খাওয়া দাওয়া, পানীয় সহ রিলাক্স করত সেখানে। এজন্য অবশ্যই সাব ইনস্পেক্টর বিশনয় পারিশ্রমিক পেতেন। তিনি খুশি মনেই তাই দাউদকে সাহায্য করতেন।
সেদিন ছিল প্রচণ্ড ট্রাফিক জ্যাম। জামালপুর মোড়। নারোলা হাইওয়ে। বরোদা আদালতে হাজিরা দিয়ে দাউদ ফিরছে। স্বাভাবিক ভাবেই দাউদ সেই হোটেলে ঢুকবে। একটু পরই আসবে হোটেলে। কিন্তু এত জ্যাম কেন? একটা লরি আড়াআড়ি রাখা আছে রাস্তার উপর। তাই জ্যাম। সাব ইনস্পেক্টর বিশনয় গাড়ি থেকে নেমে এগিয়ে গিয়ে তদারকি করছেন জ্যাম যাতে কেটে যায়। দাউদ আর তিনজন গাড়িতে। হঠাৎ পাশের গাড়িটির দরজা খুলে গেল। একটি লোক বেরিয়ে এল। দাউদকে লক্ষ্য করে আচমকা গুলিবৃষ্টি। চমকে উঠে দাউদ সিটের নীচে। তার সঙ্গে থাকা একজন পুলিশ হাতে রাখা লাঠি ছুঁড়ে মারলেন। কিন্তু লোকটা গুলি থামাচ্ছে না। দাউদ অন্যদিকের দরজা খুলেই ছোটা শুরু করল। ততক্ষণে ছুটে আসছেন সাব ইনস্পেক্টর বিশনয়। কে এভাবে প্রকাশ্য দিবালোকে দাউদকে টার্গেট করেছে? যে লোকটা গুলি করছিল তার নাম লিয়াকৎ মাস্টার। আর অন্য গাড়িতে যে বসে ছিল অর্থাৎ লিয়াকৎ মাস্টার যার অঙ্গুলিহেলনে এই অপারেশন করতে নেমেছে তার নাম আবদুল লতিফ। সেই আবদুল লতিফ যে আমিরজাদা আলমজেবের বন্ধু। আমিরজাদাকে খুনের বদলা নিতে নেমেছে সে। তাই এই দুঃসাহসিক টার্গেট। দাউদ বেঁচে গেল। কিন্তু দাউদ বুঝে গেল ভারত তার পক্ষে আর নিরাপদ নয়। পালাতে হবে। আপাতত তাকে পালাতে হবে আবদুল লতিফের থেকে। এই লোকটা তো ভয়ংকর! যে কোনোদিন মেরে দিতে পারে! দাউদ বনাম আবদুল লতিফের এই লড়াইয়ে শেষ পর্যন্ত কী হল? কে এই আবদুল লতিফ যে দাউদকে খতম করার কথা ভাবছে? তাকে আমরা দেখেছি সবাই। একটা সিনেমায়। রইস! শাহরুখ খান সেজেছিলেন আবদুল লতিফ! কিন্তু সে তো সিনেমা! অনেকটাই চিত্রনাট্য। আসলে আবদুল লতিফের স্টোরিটা কী? চূড়ান্ত নাটকীয় !
