ব্ল্যাক করিডর ১.৭

ওয়ান্টেড, ওয়ার্দার্ত, সাহস। পরপর তিনটি সিনেমার হিরোর চরিত্রটি হল গান মাস্টার জি নাইন। এক স্পাই এজেন্ট। আজকাল যাকে বলা হয় সিক্যুয়েল। প্রথম দুটি সিনেমার পর অবশেষে এসেছে এই সিরিজের সর্বশেষ সিনেমাটি। সাহস। আশির দশকের প্রথম ভাগ। মুম্বইয়ের তিলক নগরের শংকর সিনেমায় স্বাভাবিকভাবেই প্রথম দিনেই হাউসফুল। না হয়ে উপায় নেই। এই সিনেমাগুলির হিরোর ভূমিকায় যে যুবক অভিনয় করেন, তাঁর সঙ্গে তরুণ ও যুবকরা অনেকটাই নিজেদের মিল খুঁজে নেয়। তাই প্রবল ভিড় হয় এই নতুন নায়কের ছবি রিলিজ করলেই। ছেলেটি দুর্দান্ত ডান্স করতে পারে। দারুণ শারীরিক কাঠামো। ফর্সা নয়। কিন্তু বেশ লম্বা। সোজা কথায় সেই আদি অকৃত্রিম সুদর্শন পুরুষের সংজ্ঞা টল, ডার্ক, হ্যান্ডসাম। মুখে একটা চাপা সারল্য আছে। আশির দশকে ওই নায়কের নতুন নাম হয়েছে পুওর ম্যানস অমিতাভ। অর্থাৎ অমিতাভ বচ্চনের ক্যারিশমা আর স্টারডম যে উচ্চতায় গিয়েছে, তার ধারেকাছে না গেলেও একটি নতুন উঠে আসা প্রজন্ম, নিম্নবিত্ত কিশোর, শহর ও ছোট জনপদের উঠতি যুবকবৃন্দ এই হিরোকে নিজেদের সঙ্গে রিলেট করে। বহুদিন পর হিন্দি সিনেমা জগতে কোনো বাঙালি নায়কের উত্থান হচ্ছে। এই হিরোর নাম মিঠুন চক্রবর্তী। সকাল সকালই টিকিট শেষ কেন? কারণ কাউন্টার খোলার আগেই একগুচ্ছ টিকিট দিয়ে দিতে হয় নানাকে। রাজেন্দ্র নিকলজে নামের এক ২৫ বছরের যুবক। নানা তার ডাক নাম। বাইকুল্লা, চেম্বুর, লালবাগ এসব এলাকায় ঘুরে ঘুরে দাদাগিরি করে। আর প্রধান আয় হল ব্ল্যাকে টিকিট বিক্রি। চার পাঁচজনের একটি টিম আছে তার। শুক্রবার, শনিবার আর রবিবার আসল মুনাফার দিন। বাকি দিনগুলিতে সিনেমা দেখতে সচরাচর ফ্যামিলি আসে না। তাই একসঙ্গে অনেক টিকিট ব্ল্যাকে কেনার লোক কমে যায়। এমনিতে শুক্রবার সিনেমা রিলিজের দিনই টিকিট কাটা নিয়ে বিরাট ঝামেলা হয়েছে। মারামারি, সংঘর্ষ। তাই শনি আর রবিবার যে মারাত্মক ভিড় বাড়বে তা জানা কথা। সেই কারণে পুলিশ পোস্টিং করা হয়েছে। একঝাঁক মিঠুন ফ্যান এসে হাজির সিনেমা দেখতে। তারা ইভনিং শো দেখবে। আর কাউন্টারে টিকিট না পেয়ে যথারীতি ব্ল্যাকেই কাটার ইচ্ছে। কিন্তু এত বেশি দাম বাড়িয়ে রাখা হয়েছে যে তারা দরাদরি শুরু করেছে। নানা এক পয়সাও কমাতে রাজি নয়। কারণ কী? কারণ অন্য মিঠুন ফ্যানের থেকে সে নিজে কয়েকশো গুণ বড় মিঠুন ফ্যান। তার জীবনের প্রধান টার্গেট হল একদিন মিঠুন দাদার পাশে দাঁড়িয়ে একটা ছবি তোলা। নানার চুলের স্টাইল, জামাকাপড়। পড়ার ধরন, সবই মিঠুন চক্রবর্তীর মতো। সে কথা বলার চেষ্টাও করে ওরকম মিঠুন কণ্ঠে। তাই মিঠুনের সিনেমার টিকিটের দাম ব্ল্যাকে কমানোর মানে হল মিঠুনদার বাজার ভালো নয়। এটা নানা মানবে কেন? কিন্তু সেই যুবকের দলও ছাড়বে না। তারা ঝামেলায় জড়িয়ে পড়ল। তাদের এই প্রতিবাদ দেখে সাধারণ পাবলিক, যারা এতক্ষণ কোনো প্রতিবাদ করতে পারেনি এই ব্ল্যাকারদের বিরুদ্ধে, তাঁরাও এগিয়ে এসে হট্টগোল শুরু করেছে। পাঁচজন পুলিশ কনস্টেবল উপস্থিত। তাঁরা গোলমাল থামাতে হাজির। কিছুক্ষণ পরই পাবলিকের মুড বুঝে পুলিশ বেধড়ক লাঠি চার্জ শুরু করল। বিশেষ করে ব্ল্যাকারদের ধরে ধরে পেটানো শুরু। সঙ্গে সঙ্গে ব্ল্যাকার ছেলেগুলো এদিক ওদিক ছুটে পালাতে লাগল। পুলিশের সামনে আর কী করা যাবে? কিন্তু একজন পালাচ্ছে না। নানা। রাজেন্দ্র নিকলজের মাথা গরম হয়ে গেল। সে হঠাৎ এগিয়ে এসে একজন কনস্টেবলের হাত থেকে লাঠি কেড়ে নিয়ে সেই কনস্টেবলকেই পেটাতে শুরু করল। মুহূর্তের মধ্যে গোটা চিত্রটি বদলে গেল। মানুষ পালাতে লাগল আতঙ্কে। কারণ একজন পাড়ার গুন্ডা, টিকিট ব্ল্যাকার পুলিশকে মাটিতে ফেলে পেটাচ্ছে এই দৃশ্য মারাত্মক। হতবাক বাকি কনস্টেবলরা প্রচণ্ড রেগে লাঠি নিয়ে এগিয়ে আসার আগেই মিঠুন চক্রবর্তীর স্টাইলে নানা জাম্প খেয়ে একটু পিছনে গেল। আর পরক্ষণেই আবার একটা ভল্ট দিয়ে একেবারে সামনে এসেই আরও এক পুলিশের হাতের লাঠি কেড়ে নিয়ে তাঁকে পিছন থেকে মারল পায়ে। এবং একা নানা পাঁচ পুলিশকে পিটিয়ে পালাচ্ছে।

পালাবে আর কোথায়? পরদিনই ধরা পড়ল। পুলিশ নানা আর তার সঙ্গীদের গ্রেপ্তার করে নিয়ে গেল। প্রোডিউস করা হল কোর্টে। কয়েকমাসের জেল। নানা জেলে গেল বটে। কিন্তু তার নাম ছড়িয়ে পড়ল বম্বে আন্ডারওয়ার্ল্ডে। আশির দশকের শুরুর সেই দিনগুলিতে তখন এই এলাকাগুলির ডন ছিল রাজন নায়ার নামে এক দক্ষিণ ভারতীয়। তার শাগরেদ রমা নায়েক। এক দুর্ধর্ষ শাপশুটার। সবাই আলোচনা করছে কে এই নানা ছেলেটি? এর তো মারাত্মক সাহস! পুলিশকে পেটাল? এরকম সাহস আগে কেউ দেখায়নি। এমনকী হাজি সাহেবের ছেলেরাও না (হাজি মস্তান)। ছোট বড় সব মাস্তান দলই চাইছে জেল থেকে বেরোলেই নানাকে দলে টানতে হবে। কিন্তু জেলেই নানার কাছে খবর পাঠানো হল মেয়াদ খাটার পরই একবার আন্নার সঙ্গে দেখা করতে হবে। আন্না হল রাজন নায়ারের কোড নেম। রাজেন্দ্র নিকলজে বুঝে গেল তার দিন আসছে। জেল থেকে বেরিয়ে সে গেল আন্নার সঙ্গে দেখা করতে। আন্না প্রথমেই বলেছিল, ও দিন আচ্ছা কাম কিয়া থা..হামারে সাথ কাম করোগে? রাজি রাজেন্দ্র। হেক্সট নামের ওষুধ কোম্পানির এক সামান্য কর্মীর ছেলে ক্লাস ফাইভ পাশ করার পর আর পড়াশোনা না করা রাজেন্দ্র নিকলজের সামনে একটি সিঁড়ি খুলে গেল পুলিশ পিটিয়ে।

নানা হয়ে উঠল রাজন নায়ারের বিশ্বস্ত এক সৈন্য। বুধবার। সেদিন কোনো কাজ নেই। ডায়মন্ড ক্রিকেট ক্লাবের সামনের মাঠে আন্ডার আর্ম ম্যাচ হচ্ছে। নানার টিম বনাম গুঙ্গার টিম। গুঙ্গা হল জগদীশ শর্মা। এই দুজন আপাতত ব্যবসা চালাচ্ছে রাজন নায়ারের। আচমকা একটি বাচ্চা ছেলে ছুটে এল মাঠে। ছেলেটি চা বানিয়ে এই লোকাল ক্লাবগুলিতে বিক্রি করে। হাঁফাতে হাঁফাতে বলল, আন্না কো গোলি মার দিয়া কিসিনে..। ব্যাট ফেলে দৌড়চ্ছে রাজেন্দ্র নিকলজে। দৌড়চ্ছে জগদীশ। জানা গেল এসপ্ল্যানেড কোর্টে যাওয়ার সময় আন্নাকে এক রিকশচালক এসে মেরেছে। কার সুপারি ছিল? আবদুল কুঞ্জুর। যে রাজন নায়ারের দীর্ঘকালের শত্রু। কারণ ঘাটকোপার থেকে পন্থনগর, চেম্বুর থেকে তিলকনগরের দোকান আর বেআইনি বিজনেসের কোনো কমিশন সে পায় না। দখলে রেখেছে আন্না। অতএব পথের কাঁটাকে সরাও। রাজন নায়ারকে তার অনুগামীরা আন্না বলে ডাকলেও বম্বে মাফিয়া জগৎ তার সম্পর্কে সম্বোধন করে বড়া রাজন। এই মাফিয়া জগতে সবথেকে সিনিয়র ছিল সে। রাজন নায়ারের গ্যাং-এর হেড কে হবে? শূন্যস্থান পূরণ করবে কেন? সমস্ত গ্যাং মেম্বারদের দাবি রাজেন্দ্র নিকলজে হোক। গুঙ্গাও বলল, তুমিই গ্যাং চালাও। আমি টিম মেম্বার বাড়ানোর চেষ্টা করছি। আমাদের একেবারে নতুন এক টিম হবে। রাজেন্দ্র নিকলজে গ্যাং এর দায়িত্ব নিল। এবং নানার পাশাপাশি তার একটি নতুন পরিচয় হল। বড়া রাজনের স্থলাভিষিক্ত হওয়ার কারণে তাকে দেওয়া হল নতুন পরিচয়। ছোটা রাজন!

দায়িত্ব নিলেই তো হল না। গুরু হত্যার প্রতিশোধ নিতে না পারলে মাফিয়া জগতে সম্মান থাকে নাকি! অতএব ছোটা রাজনের প্রধান টার্গেট হয়ে দাঁড়াল যেভাবেই হোক আবদুল কুঞ্জুকে খুন করতে হবে। শুরু হল এক অবিস্মরণীয় চেজিং! আবদুল কুঞ্জু যেখানেই যাচ্ছে, রাজন, ঠিক খবর পাচ্ছে। কুঞ্জুকে কিন্তু আক্রমণ করছে না রাজন। সে শুধু দেখে যাচ্ছে কুঞ্জুর লুকানোর জায়গা কোথায় কোথায় আছে। এক মাস, দু মাস, ছয় মাস…কুঞ্জু পালাচ্ছে.. রাজন, ঠিক খুঁজে বের করছে। এ যেন একপ্রকার সাইকোলজিক্যাল চাপ। কুঞ্জু ভেঙে পড়ছে। আর পালানোর জায়গা নেই। বম্বের বাইরের জগৎ সে বেশি চেনে না। এরপর আর কোথায় পালাবে? ১৯৮৩ ালের অক্টোবর মাসে কুঞ্জু নিজের গোপন আস্তানা থেকে বেরিয়ে সোজা একটা ট্যাক্সি নিয়ে হাজির হল ক্র্যাফোর্ড মার্কেটের সামনে। বম্বে ক্রাইম ব্রাঞ্চের অফিসে সোজা ঢুকে সে বলল, স্যার আমি আবদুল কুঞ্জু.রাজন নায়ারকে মার্ডার করেছে আমার লোক। সারেন্ডার করছি! চমকে গেল পুলিশ বাহিনী? মোটেই না। তাদের ইনফর্মার আগেই খবর দিয়েছে যে ছোটা রাজন পাগলের মতো ফলো করছে কুঞ্জুকে। আজ নয় কাল অ্যাটাক করবে। আর তা না হলে কুঞ্জু সারেন্ডার করবে। তাই হয়েছে। কুঞ্জু নিশ্চিন্ত। জেলে সে নিরাপদ। স্বস্তির শ্বাস ফেলল সে। কিন্তু ভুল। আসলে নিরাপদ নয়। একজন সাধারণ পাড়ার গুন্ডা হিসাবে ছোটা রাজন আগেই দেখিয়ে দিয়েছে সে কতটা ডেয়ারিং আচরণের। ভয় আর আশঙ্কা বস্তুটা তার মধ্যে নেই। ১৯৮৪ সালের ২২ জানুয়ারি পুলিশ কুঞ্জুকে ভিকরোলি কোর্টে নিয়ে যাবে। চতুর কুঞ্জু জানে এই সুযোগটি নিতে পারে রাজন। তাই সে আগেভাগেই পুলিশ কনস্টেবলদের টাকা দিয়ে বলল পুলিশ ভ্যানে না। আমি আমার গাড়িতে যাব কোর্টে। তোমরা পুলিশের গাড়িতে পিছনে বা সামনে আসবে। কথা দিলাম আমি পালাব না। তোমরাও জানো পালালে রাজন আমাকে মারবেই। সেই মতোই নিজের অ্যামবাসাডার গাড়িতে চেপে কোর্টে গিয়ে আবার সেই গাড়িতে ফিরছে কুঞ্জু। চেম্বুর সিগন্যাল। সামনে পুলিশ ভ্যান। পিছনে কালো কাচে ঢাকা কুঞ্জুর গাড়ি। সিগন্যালে গাড়ি আটকে। আচমকা চারজন যুবক অ্যাম্বাসাডারের জানালার সামনে। ভয়ার্ত কুঞ্জু কাঁপতে কাঁপতে দেখল উইন্ডস্ক্রিনের সামনেই দাঁড়িয়ে আর কেউ নয়, ছোটা রাজন। মুহুর্মুহু গুলিবর্ষণ। সামনে দাঁড়ানো পুলিশ ভ্যান থেকে দ্রুত নেমে পুলিশকর্মীরা দেখলেন বেঁচে আছে কুঞ্জু। কাঁধে লেগেছে গুলি। ছোটা রাজন ততক্ষণে গ্যাং নিয়ে উধাও। এরপর কিছুদিন হঠাৎ সব চুপচাপ। জেলে কুঞ্জু। সে খবর পাচ্ছে আর কোনো খোঁজখবরই করছে না রাজন। তার মানে কি হাল ছেড়ে দিল? হ্য়তো তাই। ঠিক চারমাস পর। কাঁধে এখনও গুলির জখম আছে কুঞ্জুর। একবার করে ড্রেসিং আর চেক আপ করাতে হয়। জে জে হাসপাতালের আউটডোর ক্লিনিকে যেতে হবে। চারজন পুলিশ কুঞ্জুকে নিয়ে জে জে হাসপাতালে পৌঁছল। পুলিশ কেস। তাই বেশি দেরি হবে না। আরও দুজন পেশেন্ট সামনে। কুঞ্জু বসল বেঞ্চে। দুজন পুলিশ ভিতরে গেল। কুঞ্জু পকেট থেকে যখন সিগারেট বের করছে ঠিক তখনই পাশের পেশেন্ট বলল, ভাই একটা সিগারেট হবে? কুঞ্জু হেসে আবার পকেটে হাত ঢোকাল। এই পেশেন্টের দেখা যাচ্ছে আবার হাত ভাঙা, হাতে পুরোটাই প্লাস্টার। সিগারেট এক হাতে ধরাবে কীভাবে? জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে সিগারেট দিয়ে তাকিয়ে রইল কুঞ্জু। আর তখন বিস্ফারিত নেত্রে দেখতে পেল পেশেন্ট উঠে দাঁড়াচ্ছে। হাতে বাঁধা প্লাস্টার হঠাৎ এক টানে খুলে ফেলেই পিছনের পকেট থেকে বের করে আনা হল রিভলভার। কুঞ্জু এক সেকেন্ডে বুঝতে পারল কী হতে যাচ্ছে। পরপর গুলি মারল সেই পেশেন্ট সেজে আসা যুবক। কিন্তু তড়িৎ গতিতে কুঞ্জু ডাক্তারের চেম্বারে ঢুকে ভিতরের অ্যান্টি চেম্বারে চলে যেতে পারল। তবে আবার গুলি লেগেছে হাতে। একাধিক। কিন্তু আশ্চর্য কুঞ্জুর জান! এবারও বেঁচে গেল। অর্থাৎ প্রমাণ হয়ে গেল ছোটা রাজন হাল মোটেই ছাড়েনি। কুঞ্জুকে হয়তো হত্যা করা সম্ভব হল না। কিন্তু জে জে হাসপাতালের মধ্যে ঢুকে এরকম একটি আক্রমণের প্ল্যান করা রাজনের নাম বম্বের মাফিয়া জগতের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ল। আগামীদিনে এই ছেলেটি যে এই শহরের বিধাতা হতে যাচ্ছে, এরকম একটি ধারণা দ্রুত ছড়াচ্ছে। সকলেই চাইছে এই ছেলেটি নিজের গ্যাং নিয়ে তাদের হয়ে কাজ করুক।

সান্তাক্রুজ ওয়েস্টের থেকে বেরিয়ে যে রাস্তাটি সোজা খার পুলিশ স্টেশনের দিকে যায়, সেখানে থাকা একটি কাপড়ের দোকানের মালিকের সঙ্গে ছোটা রাজনের বন্ধুত্ব অনেকদিনের। আগস্ট মাসের প্রবল বৃষ্টিতে রাজন সেই বন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছে। বম্বেতে ছড়িয়ে থাকা কাপড়ের মিলগুলির নিজস্ব জমি তখন একটু একটু করে বিক্রি হচ্ছে। অনেক এলাকা নিয়ে জমি। কিন্তু মিলের ব্যবসা তেমন আগের মতো নেই। শোনা যাচ্ছে কয়েকজন মিলমালিক জমি বিক্রি করবে। এসব প্রাইম লোকেশনে জমি মানে সোনার থেকে দামি। সেই খোঁজখবর তাবৎ মাফিয়া ডনই রাখছে। ক্রাইমের সাফল্যে ছোট হলেও রাজনও আগ্রহী। তাই এই বৃষ্টি উপেক্ষা করে মিটিং করতে যাচ্ছে সে। মিটিং শেষ। তখন বৃষ্টি ধরেছে। রাজন আর তার দুই শাগরেদ বেরিয়ে কুলফির দোকানে দাঁড়িয়ে কুলফির অর্ডার দিল। হঠাৎ একটি মোটরবাইক ৷ ইয়াজদি মডেল। দুটি যুবক নেমে এল। স্বাভাবিক রিফ্লেক্সে রাজন সতর্ক। সঙ্গের দুই যুবকেরও শ্যেন দৃষ্টি। এবং সেই নবাগত দুই যুবক সোজা রাজনের সামনে। নানা? রাজন মাথা নেড়ে বলল তুম কৌন? আজ রাত আট বাজে কোই ফোন আয়েগা আপকে পাস। কৌনসি নম্বরপে লাগানা হ্যায়? রাজন বলল, কেন? কার ফোন? ছেলেদুটি হাসল। বলল, তখনই জানতে পারবে নানা। চিন্তার কোনো ব্যাপার নেই। বিজনেস ডিল। নানা নম্বর দিল একটি। তখন তো আর যত্রতত্র ফোন আর মোবাইল নেই। তাই এই বিশেষ নম্বরটি একটি আস্তানার। ডায়মন্ড ক্রিকেট ক্লাবের অফিসরুমের। চলে গেল ছেলেদুটি। রাজন চিন্তায়। কীসের ফোন? কোনো নতুন সুপারি? কোন গ্যাং এটা? রাত আটটায় ডায়মন্ড ক্রিকেট ক্লাবে।

ফোনটি এল। রাজন জানতে চাইল কে বলছেন? অন্যপ্রান্ত থেকে একটি গম্ভীর গলা। ইব্রাহিম ভাই বলছি…কেমন আছো নানা? রাজন তখনও বুঝতে পারছে না কে ইব্রাহিম ভাই। সে আবার জানতে চাইছে ইব্রাহিম ভাই? মতলব..। হাসির শব্দ। দাউদ ভাই..। রাজনের শিরদাঁড়া থেকে একটা ঠান্ডা স্রোত বয়ে যাচ্ছে। সে তখনই ভাবতে শুরু করছে কী এমন কাজ করেছে যা দাউদ ভাইকে খেপিয়ে দিয়েছে! তা না হলে দাউদ নিজেই ফোন করবে কেন? দাউদ ইব্রাহিম কে? আশির দশকের সেই প্রথমভাগে ক্রমেই কণ্টকহীন হয়ে ওঠা এক নতুন সম্রাট। দাঙ্গার কারণে বম্বের পুলিশ কমিশনার ঠিক করলেন নটোরিয়াস ক্রিমিনাল আর তাদের বসদের আগে গ্রেপ্তার করা হোক। সেইমতো ন্যাশনাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট (নাসা) অনুযায়ী সবার আগে জুহুর বাংলো থেকে গ্রেপ্তার করা হল হাজি মস্তানকে। গ্র্যান্ট রোডের তাহির মঞ্জিলে লুকিয়ে থাকা করিম লালাকে গ্রেপ্তার করা হল। মাসের পর মাস থানে জেল থেকে ইয়েরাডা জেল তাদের ঘোরানো হল। আর মাঝের এই সময়টায় স্মাগলিং এর গোটা ব্যবসা সরাসরি আয়ত্তে চলে এল ঝড়ের গতিতে মাফিয়া রাজ্যে উঠে আসা এক যুবকের কাছে। করিম লালা আর হাজি মাস্তান স্মাগলিং করত এজেন্ট মারফত। এই নতুন যুবক সরাসরি আরব আর আফগানিস্তানের কিছু ব্যবসায়ীর সঙ্গে কীভাবে যেন যোগাযোগ করে তাদের সঙ্গেই আদানপ্রদান শুরু করে দিয়ে অনেক বেশি মুনাফা করে। কারণ মাঝপথে কোনো এজেন্ট রাখেনি সে। এভাবে বম্বে আন্ডারওয়ার্ল্ডের দুই সেরা ডন ক্রমেই জেলে গিয়ে শক্তিহীন হয়ে যাওয়ায় বম্বে তখন খোলা মাঠ। অতএব একজনের নামই স্পেশাল ব্রাঞ্চের খাতায় সবথেকে উজ্জ্বল হয়ে উঠল দিনের পর দিন। ইব্রাহিম কাসকর। ডাক নাম দাউদ। যাকে পাকোমোড়িগ স্ট্রিটের যুবকেরা সম্বোধন করে একটি অদ্ভুত নামে। সেই নাম পরবর্তীকালে বম্বে মাফিয়া জগতের কাছে একটি ব্র্যান্ডনেমে পরিণত হবে। নামটি হল—ভাই!

এহেন দাউদ নিজেই ফোন করে রাজনকে বলল, আমার সঙ্গে কাজ করবে? রাজন আপ্লুত মনে মনে। এরকম একটা অফারের জন্য সে কবে থেকে অপেক্ষা করছে। দাউদ ভাইয়ের সঙ্গে কাজ করার সুযোগ পাওয়া মানে বম্বে হাতের মুঠোয়। কারণ দাউদ ভাই সব ডনের তুলনায় সবথেকে বেশি শার্প আর সাহসী। রাজন সাহস পছন্দ করে। কিন্তু বাধা এল ঘর থেকেই। রাজন নায়ারের দলের পুরানো সদস্য এবং গুঙ্গার দল বলল, আমরা কেন অন্যের গ্যাং এর চাকরবাকর হতে যাব? আমরা ছোট গ্যাং ঠিক আছে। কিন্তু অন্তত নিজেদের মর্জির মালিক। দাউদের মতো গ্যাং-এ ঢুকলে আমাদের নিজেদের কোনো সম্মান থাকবে না। দাউদের ঘরে থাকা বাকি সব সদস্যদের মধ্যে বরং আমাদের হাল হবে নতুন আসা ছোকরা লোগ । আমাদের নিজেদের কিছু করার ক্ষমতা থাকবে না। আমরা যেমন আছি তেমন থেকেই বরং নিজেদের কাজের এরিয়া বাড়ানো দরকার। তাহলে আমরা তোমার লিডারশিপে অনেক কিছু পাব। রাজন এরকম বিপাকে পড়েনি। কারণ একদিকে দাউদের গ্রুপে কাজ করার সুযোগ। আবার অন্যদিকে নিজের গ্রুপের এতদিনের বন্ধুদের চাপ। সবথেকে বড় সমস্যা হল, দাউদকে আবার না বলা যায় নাকি? একবার না বলা হলে দাউদের বিষনজরে পড়তে হবে। সেই ঝুঁকি নিয়ে কি সম্ভব বম্বেতে কাজ করা? এই দোলাচলে সময় নিল রাজন। এবং বেশ কয়েক সপ্তাহ ধরে নিজের টিম মেম্বারদের বুঝিয়ে অবশেষে স্থির হল রাজনের টিম যোগ দেবে দাউদের দলে। তবে পাশাপাশি নিজের টিমটির অস্তিত্বও থাকবে তার। এই মধ্যপন্থাতেও দাউদ রাজি। কারণ সে জানে একবার রাজন গ্রুপে এলে তার দক্ষিণ বম্বে নিয়ে আর ভাবতে হবে না। ছোটা রাজন আর দাউদ ইব্রাহিমের মধ্যে দোস্তি হল। যা সবথেকে বেশি চিন্তায় ফেলল, বম্বে পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চকে। শুরু হল এক নতুন অপরাধের অধ্যায় বম্বের মাফিয়া সাম্রাজ্যে।

দাউদের গ্রুপে সবার আগে ছোটা রাজন কী করল? নিজের মেন্টর রাজন নায়ারের খুনি কুঞ্জুকে ছেড়ে দিল রাজন? তাহলে তো কুঞ্জুর জয় হল! ১৯৮৬ সালে দাউদ ইব্রাহিম আর বম্বেতে থাকতে পারল না। তার লক্ষ্য আন্তর্জাতিক মাফিয়া হওয়া। আরব দেশ, আফগানিস্তান আর পাকিস্তানের ড্রাগ লর্ড ও মাফিয়াদের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ রক্ষা করতে দরকার দুবাই যাওয়া। আর বম্বে পুলিশ জাল গোটাচ্ছে এরকম খবরও পাওয়া যাচ্ছে। অতএব দাউদ পালালো দেশ ছেড়ে। যাওয়ার কারণ বম্বে থাকছে সুরক্ষিত এক বিশ্বস্ত হাতে। ছোটা রাজন। অবশেষে একক ভাবে বম্বে শহরের রাজত্বের ভার এল রাজনের হাতে। সবার প্রথম কাজটি কী? চেম্বুর গ্রাউন্ডে জানুয়ারির সকালে ক্রিকেট ম্যাচ হচ্ছে। সাধারণ ক্যাম্বিস বলের নয়। রীতিমতো ক্রিকেট প্যাড, ব্যাট, কোকাবুরা বল নিয়ে। সাদা পোশাক দুই প্রতিপক্ষ দলের। লাঞ্চের পর খেলা জমে উঠেছে । তবে প্রথমে লক্ষ্য করা যায়নি যে কিছু নতুন প্লেয়ার হিসাবে উঠে এসেছে মাঠে। এরা কারা? ফার্স্ট স্লিপে দাঁড়িয়ে আছে আবদুল কুঞ্জু । বাউন্ডারি লাইনে একবার বল গেল। একটি ছেলে বলটি তুলে সেখান থেকে চিৎকার করে উঠল বল ছুড়ে, কুঞ্জু ভাইয়া ইয়ে কছু বাহার কে লেড়কে কাহাসে আ টপকা? কুঞ্জু ক্যাচটি নিল। বাইরের ছেলে মাঠে ঢুকেছে? সাদা পোশাক পরা ফিল্ডার সেজে? কারা? এরা কেউ তার টিমের নয়। তাহলে? বেশি ভাবার সময় দেওয়া হল না তাকে। পিচের ডান ও বাঁদিকে ফিল্ড করা তিনটি ছেলে আচমকা ছুটে এল স্লিপে। পকেট থেকে দুটি রিভলবার আর ছুরি বের করে প্রথমে পায়ে গুলি, তারপর পেটে উপর্যুপরি গুলি চালাতে শুরু করল। গুলি যখন আছেই, তখন আবার ছুরির দরকার কেন? কারণ কুঞ্জু এর আগে একের পর এক অ্যাটাকে গুলিতে বেঁচে গিয়েছে। অতএব এবার কোনো ঝুঁকি নিতে চায়নি ছোটা রাজন। নিজে শার্প শুটারদের বলে দিয়েছে সঙ্গে ছুরিও নিতে। টার্গেট এবার যেন মিস না হয়। হয়ওনি। কুঞ্জ স্পট ডেড। রাজন এতদিন পর প্রতিশোধ নিতে পেরে আরও বেশি করে ভীতির সঞ্চার করে দিল প্রতিপক্ষ গ্যাংদের কাছে। কারণ এতদিন বম্বে সাম্রাজ্যের একটি অলিখিত নিয়ম ছিল। করিম লালা, হাজি মাস্তান, আমিরজাদা, আওরঙ্গজেব, রমা নায়েক, অরুণ গাউলি, মনোহর ওরফে মানিয়া সুরভে সকলের নিজেদের এলাকা ছিল। যা কিছু গ্যাং ওয়ার হয়েছে সবই এই এলাকা দখল নিয়ে। কিন্তু তাও কারও মনোপলি ছিল না। ছোটা রাজন নামক এক ডেয়ার ডেভিল চরিত্র এসে সেই নিয়মটি কি ভেঙে দিতে চায়? গোপন মিটিং ডাকল তার পালটা মাফিয়া জগৎ। ঠিক তখনই ১৯৮৭ সালেই দাউদ ঠিক করল রাজনকে তার দুবাইতে দরকার। অতএব বম্বের মায়া কাটাতে হল রাজনকে। দাউদ ফোন করে বলল, চলে এসো। রাজন বলল, ভাই, এখানকার বিজনেস কী হবে? দাউদ জবাব দিয়েছিল, তোমার লোককে দায়িত্ব দাও…তোমাকে এখানে দরকার..আ যাও তুম..। রাজন চলে গেল বম্বে ছেড়ে। মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে দাউদের ডি কোম্পানিতে সবথেকে বেশি গ্যাং মেম্বার হয়ে গেল রাজনের রিক্রুট। কারা তারা? বম্বে পুলিশকে নাজেহাল করে দেওয়া সব নাম। সাধু শেট্টি, মোহন কৈতান, গুরু শাতম, রোহিত ভার্মা, ভরত নেপালি, ও পি সিং এবং ঠান্ডা মাথার মামা। রাজন হয়ে উঠল দাউদের বিজনেস মডেলের প্রধান ম্যানেজার। বম্বের সরকারি সংস্থা সিডকো রাজ্যের বিভিন্ন রাস্তা, সেতু, বিল্ডিং বানানোর টেন্ডার বের করত নিয়ম করে। রাজনের মেম্বাররা সিডকো অফিসারদের ভয় দেখিয়ে আর টাকা দিয়ে প্রথমেই জানিয়ে দিত আমাদের কন্ট্রাক্টর যেন কাজটা পায়। সেরকমই দেওয়া হত। কন্ট্রাক্টের ৩ শতাংশ রাজনের ফান্ডে যায়। প্রতিটি হোটেল আর বার মালিক মাসে ১০ হাজার থেকে ৩০ হাজার টাকা করে দিত রাজনের ফান্ডে। এভাবে মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে একা রাজনের অবদান ডি কোম্পানিতে ২৭৬ কোটি টাকা। ভাই আনিস ইব্রাহিম নয় রাজনই দাউদ কোম্পানির সেকেন্ড ম্যান। সুতরাং গ্রুপের মধ্যেই শুরু হল শত্রুতা। কারণ তিন স্ট্রংম্যান কিছুতেই সহ্য করতে পারে না রাজনের এই রমরমা। দাউদ ভাই রাজনের কথায় যেন ওঠেন বসেন। আর কাউকে কোনো গুরুত্ব দেওয়াই যেন হয় না। এভাবে চলে নাকি? তাই প্ল্যান করা হল রাজনকে ভাইয়ের থেকে সরাতে হবে। একদিন সন্ধ্যায় দাউদ যখন সান্ধ্য ড্রিংক নিয়ে বসেছে তার কাছে গেল, দুই অনুগামী। শারদ শেট্টি আর সুনীল সাওয়ান্ত। শারদের কথার মূল্য দাউদের কাছে বেশি। শারদ শেট্টি সরাসরি বলল, ভাই, রাজন নিজেকে কোম্পানির এক নম্বর ভাবছে?

দাউদ : এসব গল্প তোমায় কে বলছে শারদ ভাই? বিশ্বাস কোরো না। এরকম নয় নানা। শারদ বলল, ভাই নানার ছেলেরা আজকাল বলে আমরা দাউদকে চিনি না। আমরা নানার লোক৷ এই বলে টাকা তুলছে। এর মধ্যে ১২২টা বেনামি প্রপার্টি রাজনের নামে তুমি জানো? আসল বোমাটি ফেলল সুনীল সাওয়ান্ত। যেটি দাউদের অত্যন্ত স্পর্শকাতর জায়গা। সাওয়ান্ত বলল, এখনও ইব্রাহিম ভাইয়ের মার্ডারের বদলা হচ্ছে না কেন? আপনি তো রাজনকে সেই কবে বলেছেন! কিছুই তো করছে না! কেন? আজও গাউলি ওপেন ঘুরছে। বিজনেস করছে।

খটকা লাগল দাউদের। সত্যিই তো! তার বোন হাসিনা পার্কারের স্বামী ইব্রাহিম পার্কারকে অরুণ গাউলির টিম খুন করেছে। নিছক ভগ্নিপতি নয়। ইব্রাহিম ছিল দক্ষিণ বম্বের প্রধান শক্তি। তাকে খুন করার পর রাজন বলেছিল, বদলা নেবে। কেন নেওয়া হচ্ছে না? তাহলে কি এরা যা বলছে তাই ঠিক? রাজনের মনে আসলে তাকে সরিয়ে কোম্পানির এক নম্বর হওয়ার স্বপ্ন? দাউদ পরদিন সেই রাতেই ফোন করল রাজনকে।

রাজন : হাঁ ভাই!

দাউদ : সকালে একবার এসো! কথা আছে! ভাইয়ের গলা ঠান্ডা। এসব গলা শুনলে ভয় লাগে। কী হয়েছে হঠাৎ? কেন কী হয়েছে ভাই? দাউদ সত্যিই আরও শীতল কণ্ঠে বলল, কাল সকালে এসে যেও কিন্তু…।

কী হল পরদিন সকালে?

ইব্রাহিমকে কে মেরেছে নানা? – দাউদের প্রশ্ন।

ছোটা রাজন একটু বিস্মিত। তবু দাউদ ভাইয়ের কথার উপর সে কখনও কথা বলেনি। উত্তর দিল, ইব্রাহিম ভাইকে গাউলির ছেলেরা মেরেছে।

কবে মেরেছে? দাউদ আরও ঠান্ডা চোখে জানতে চাইল। রাজন আরও বিস্মিত। কারণ দাউদ ভাই তো সবই জানে। তাহলে কেন এই জেরা? রাজন উত্তর দিল, জুলাইতে। দাউদ কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। তারপর বলল, এটা কোন মাস নানা? রাজনের কণ্ঠস্বর নেমে এল। এবার আর থাকতে না পেরে জানতে চাইছে সে, কেন ভাই? কী হয়েছে?

দাউদের উত্তর, এটা সেপ্টেম্বর। এই দুই মাসে তোমার কী করার কথা ছিল? রাজন এবার ভয় পেল। সত্যিই তো। দাউদের আদরের বোন হাসিনা পার্কারের স্বামী ইব্রাহিম পার্কারকে তার বাড়ির কাছেই অরুণ গাউলি গ্যাং-এর কয়েকজন গুলি করে মেরে গিয়েছে। হাসিনা আপার সঙ্গে রাজনের সম্পর্ক ভাইবোনের। বোনের বিধবা হওয়া দাউদ মেনে নিতে পারছে না সেটা বলাই বাহুল্য। রাজন নিজেই দাউদকে বলেছিল ভাই যেন চিন্তা না করে। বদলা নেবে সে। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব। কিন্তু দু মাস কেটে গিয়েছে এখনও কোনো প্ল্যান করা যায়নি। আসলে এই দুমাসে রাজন ডি কোম্পানিকে অন্য এক আন্তর্জাতিক স্তরে নিয়ে যাওয়ার জন্য একঝাঁক কাজ করেছে। পাকিস্তানে যারা উদ্বাস্তু হয়ে গিয়েছিল ভারত থেকে, তাদের মধ্যে করাচিতে যাওয়া মোহাজিরদের অবস্থা সবথেকে খারাপ। সরকারি চাকরি, ব্যবসা, কাজকর্ম কিছুই না পেয়ে, দরিদ্র জীবন যাপন করতে করতে তাদের পরিবারগুলির যুবকরা অপরাধের পথে পা বাড়ায়। সেই মোহাজিরদের সঙ্গে যোগাযোগ করে করাচি বন্দরে একটি নেটওয়ার্ক তৈরি করেছে রাজন। এখানেই শেষ নয়। তুরস্ক আর সাইপ্রাসের আন্ডারওয়ার্ল্ড টিমের সঙ্গেও সম্পর্ক স্থাপিত হয়েছে। এসবের কৃতিত্ব রাজনের। আর এই কারণে দাউদ সাম্রাজ্যের প্রায় একচ্ছত্র দু’নম্বর ডন রাজনই। সেটাই সহ্য হয়নি শারদ শেট্টিদের। তাহলে কি তারাই কিছু উস্কানিমূলক কথা বলেছে? রাজন এক মুহূর্ত ভাবল এবং তার চোয়াল শক্ত হল। কিন্তু সঠিক না জেনে কিছু জিজ্ঞাসা করা যায় না। দাউদ বলল, ঠিক আছে। আমার জানার দরকার ছিল প্ল্যান রেডি কিনা। ও কে, আমরা পরে আবার কথা বলব। রাজন শেষ পর্যন্ত মরিয়া হয়ে বলল, ভাই আমিই করাব কাজটা। আর কয়েকদিনের মধ্যে। দাউদের মুখে হাসি।

দাউদের বোন হাসিনা কাসকর বিয়ে করেছিল ইব্রাহিম পার্কারকে। জুনিয়র ফিল্ম আর্টিস্ট। যাকে সিনেমাজগতে বলা হয় এক্সট্রা। তবে সেটা ছিল নেশা। তার আসল পেশা হল কাদরি হোটেল। নাগাপাডার আরব গলিতে। দাউদের সবথেকে বড় প্রতিপক্ষ ছিল অরুণ গাউলি। এই দুই গ্যাং এর লড়াইয়ে, হত্যা পালটা হত্যায় তটস্থ গোটা মুম্বই। ঠিক এভাবেই একদিন গাউলির ভাইকে হত্যা করেছিল দাউদের গ্যাং মেম্বাররা। মাফিয়া দুনিয়ার নিয়ম হল চোখের বদলে চোখ। অতএব এর বদলা তখনই নেওয়া সম্ভব যদি দাউদের পরিবারের কাউকে খুন করা যায়। কিন্তু কীভাবে? কাকে টার্গেট করা সম্ভব? একমাত্র বোন হাসিনা থাকে মুম্বইতে। তাছাড়া তো ভাইয়েরা সবাই দেশের বাইরে। অতএব স্থির করা হল হাসিনার স্বামীকেই সরাতে হবে দুনিয়া থেকে। ২৬ জুলাই ১৯৯২। কাদরি হোটেলের ক্যাশ রেজিস্টারে বসে সারাদিনের আয়ের হিসাব মিলিয়ে বেরিয়ে এসেছিল ইব্রাহিম। বাড়ি কাছেই। তবু গাড়ি থাকে সঙ্গে। সারাদিনে কখন কোথায় যেতে হয়। সেই গাড়ির ড্রাইভার সেলিম প্যাটেল হোটেলে এসে জিজ্ঞাসা করেছিল, ইব্রাহিম ভাই, এখন কোথায় যাওয়া হবে? তখন সন্ধ্যা হয় হয়। এই পাকমোড়িয়া স্ট্রিট আস্তে আস্তে ফাঁকা হচ্ছে। সেলিম প্যাটেলের সঙ্গে হোটেলের বাইরে এসে দাঁড়াতেই চারজন যুবক আচমকা এগিয়ে এল। জামার ভিতর থেকে রিভলবার বের করে তৎক্ষণাৎ গুলি চালাল তারা। সেলিম পালাল। কিন্তু গুলি করে পালাতে পারল না ওই চারজন। তাদের ধরে ফেলা হয়েছিল। এবং পাবলিকের গণপিটুনিতে মারা যাওয়ার আগেই পুলিশ এসে রক্ষা করে তাদের। কিন্তু কতদিন রক্ষা করতে পারল পুলিশ?

ছোটা রাজন দাউদকে বলেছিল, ভাই বদলা নেওয়া হবেই। আর কয়েকদিন। আমিই করাব কাজটি। দাউদ কোনো উত্তর না দিয়ে হেসেছিল। এবং ওই হাসিটির ঠিক চারদিন পর জানা গেল মুম্বইয়ের জে জে হাসপাতালে মারাত্মক এক শুটআউট হয়েছে। হাসপাতালের ইনডোরে ঢুকে সেখানে ভর্তি শৈলেশ হালদাংকর আর দুই পুলিশ কনস্টেবলকে খুন করে পালিয়েছে দুই গ্যাংস্টার। এমনই সাংঘাতিক সেই অ্যাটাক যে শৈলেশ আর বিপিন নামে আর এক অপরাধীকে ৫০০ রাউন্ড গুলি করেছে সেই আক্রমণকারীরা। কে শৈলেশ? কে বিপিন? মুম্বইয়ের সেই সময়ের কুখ্যাত মাফিয়া অরুণ গাউলির অন্যতম প্রধান দুই শাপ শুটার। তারাই খুন করেছিল দাউদের ভগ্নীপতি ইব্রাহিম পার্কারকে। সঙ্গে ছিল পাপ্পু কালানি আর ব্রিজেশ সিং। তারা পালাতে সক্ষম হলেও ইব্রাহিমকে খুন করে দৌড়ানোর সময় শৈলেশ আর বিপিনকে সেদিন ভি পি রোডে ধরে ফেলে জনতা। এবং গণপিটুনি দেয়। এতটা আঘাত ছিল না যে সেদিন থেকে দুমাস ধরে হাসপাতালে ভর্তি থাকতে হবে। আসলে গাউলিই প্ল্যান করেছিল এরকম। তার নিজের চ্যানেল নিয়ে জেল প্রশাসনকে জানিয়েছিল এরা জেলে থাকলে নিরাপদ নয়। হাসপাতালই সুরক্ষিত। কারণ কোনো সন্দেহ নেই দাউদ বদলা নেবেই নেবে। নিজের বোনের স্বামীকে মেরেছে যারা, তাদের দাউদ ছেড়ে দেবে নাকি? তাই এই দুই হিটম্যান সেদিন থেকেই হাসপাতালে ভর্তি। দাউদের নেটওয়ার্ক কতটা শক্তিশালী এবং দুর্ধর্ষ তা সেই ১৯৯২ সালের ১২ সেপ্টেম্বর প্রমাণ হয়েছিল। হাসপাতালে ঢুকে হত্যাকাণ্ড! ভাবাই যায় না। তাও আবার পুলিশি নিরাপত্তা আছে জেনেও। বিপিন অবশ্য জানালা দিয়ে লাফ দিয়ে পালিয়েছিল। শৈলেশ সেই সুযোগ পায়নি। তাদের সুরক্ষার দায়িত্বে থাকা দুই কনস্টেবলও মারা যায়। এত বুলেট বৃষ্টির ফলে একাধিক রোগীও আহত হয়। গোটা মুম্বই এবং মুম্বই পুলিশ স্তব্ধ হয়ে যায়। কিন্তু এসব থেকে অনেক দূরে, দুবাইতে বসে সবথেকে বেশি স্তব্ধ হয়েছিল যে লোকটি, তার নাম ছোটা রাজন। কারণ এই কাজটি সে তার ছেলেদের দিয়ে করায়নি। তার থেকেও বড় কথা হল এই ঘটনাটি যে ঘটবে তার বিন্দুমাত্র আঁচও পায়নি রাজন। কিন্তু জানা গেল হ্যাঁ, দাউদ ভাইই করিয়েছে। রাজনকে না জানিয়ে, সাউথ মুম্বইয়ের গ্যাংস্টার ছাড়া কারা করল এই কাজ? কাদের এত সাহস? সেদিনই দাউদ ভাইয়ের বাড়িতে গিয়ে রাজন জানতে পারল তার গদি টলমল করছে। কারণ কাজটি করেছে সুভাষ সিং ঠাকুর আর সুনীল সাওয়ান্ত। কারা তারা? একদিন এই সুনীল সাওয়ান্তকে হাতে ধরে মাফিয়া জগতে এনেছে রাজনই। আজ সেই সাওয়ান্ত আর ঠাকুর দাউদ ভাইয়ের কাছে হয়ে উঠেছে নতুন সাথী! তাদের দিয়েই কাজটা করিয়েছে দাউদ। তাহলে রাজনের ১০ বছরের আস্থার কোনো দাম নেই। রাজন ভাবছিল। কে এই সাওয়ান্ত আর ঠাকুর? যাদের জন্য দাউদ রাজনকে পর্যন্ত অবহেলা করতে শুরু করেছে? সেই সূত্রপাত মাফিয়া সাম্রাজ্যের ভাঙনের। দাউদ ইব্রাহিমের একান্ত বিশ্বস্ত সেনাপতি ছোট রাজনের মধ্যে দূরত্ব বাড়তে শুরু করল।

এক হাতে কালাশনিকভ নিয়ে ওই এক হাতেই উপর্যুপরি গুলি চালিয়ে স্থিরভাবে চলে যেতে পারে কে? তার নাম সুভাষ সিং ঠাকুর। ছ ফুটের মতো হাইট। দুর্দান্ত কাঠামো। ফর্সা। ছোটা রাজনের টিমের বাইরে মুম্বইয়ে এরকম এক শার্প শুটার বেড়ে উঠছিল গোকুলে। এবং দাউদের কানে সে খবর পৌঁছতে দেরি হয়নি। রাজনও জানে না কবে যেন খোদ দাউদ সুভাষ সিং ঠাকুরকে দুবাইতে ডেকে পাঠিয়েছিল। মুম্বইয়ের নতুন উঠতি গ্যাং স্টারদের একটাই স্বপ্ন। দাউদ ভাইয়ের সঙ্গে একবার অন্তত কথা বলতে পারার সুযোগ। সুভাষ ঠাকুরের স্বপ্ন পূরণ হয়েছে শুধু তাই নয়। তাকে দাউদ ডেকে পাঠাল। আর সে খবর ছড়াতে দেরি হয়নি। সুভাষ সিং ঠাকুর আর সুনীল সাওয়ান্ত ছিল একপ্রকার ক্রাইম পার্টনার। বহু কাজ তারা একসঙ্গে করেছে। আর এই ডাবল শুটার দাউদের কাছে হয়ে উঠল এক দুর্দান্ত অস্ত্র। মাফিয়া সাম্রাজ্যের নিয়ম হল যেকোনও কর্পোরেট অফিস অথবা রাজনৈতিক দল চালানোর মতোই। কোনো একজন ম্যানেজার বা এক্সিকিউটিভ অথবা দ্বিতীয় সারির নেতাকে কোনো সময় পূর্ণ ক্ষমতা দিতে নেই। সর্বদা একজন দুজন করে প্রতিযোগী রেখে দিতে হয়। এই প্রতিযোগীরা সর্বদাই চেষ্টা করে বসকে খুশি করতে। নিজেদের মধ্যে তুমুল প্রতিযোগিতা করে । বসের কাজ একবাক্যে করে দিতে চায় গুডবুকে থাকার জন্য। রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতারাও ঠিক এই স্ট্র্যাটেজি নেন। তাঁরা সর্বদাই নিজেদের দলে দ্বিতীয় ব্যক্তি বলে কিছু রাখেন না। ছদ্ম প্রতিযোগিতার আবহ রেখে দেন। যাতে একাধিক নেতা মনে করে তারাই আসলে দ্বিতীয় স্থানটি পাওয়ার যোগ্য। সেই পদে যেতে জান লড়িয়ে দেয়। প্রচুর খাটাখাটনি করে দলের পক্ষে লাভজনক কাজ করে। এভাবে আদতে সবথেকে নিশ্চিন্ত থাকে নেতা থেকে ডন সকলে। কারণ অন্য কারও সামান্য বেচাল অথবা সন্দেহজনক আচরণ আর একজন নিশ্চিতভাবে বলে দেবে গোপনে। এই একই ফরমুলায় ডি কোম্পানিতে ছোটা রাজনের সঙ্গে শারদ শেট্টি, আনিস ইব্রাহিমের সঙ্গে ছোটা শাকিলের বিরোধ ছিল মারাত্মক। যাকে বলা যেতে পারে ইনার গ্যাং রাইভ্যালরি। এহেন এক কৌশলেই দাউদের দলে দ্রুত উপরে উঠে আসছিল ঠাকুর আর সুনীল।

ঠিক এরকম সময় গোটা ভারতবর্ষের ভবিষ্যৎ এবং ভবিতব্য বদলে ফেলা এক মারাত্মক ঘটনা ঘটে গেল মুম্বই কিংবা দুবাই থেকে অনেক দূরের এক ছোট্ট জায়গায়। উত্তরপ্রদেশের ফৈজাবাদের কাছে অযোধ্যায়। সাড়ে চারশো বছরের একটি মসজিদ আদতে রামমন্দিরের উপর তৈরি হয়েছিল এই বিবাদ অনেকদিনের। সেই মসজিদ ভেঙে পড়ল ১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বর। আর গোটা দেশের বিভিন্ন প্রান্তে শুরু হয়ে গেল সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা। এই সুযোগটির অপেক্ষায় ছিল কারা? দেশভাগের ৪৫ বছর ধরে এরকমই একটি সুযোগের প্রতীক্ষায় ছিল পাকিস্তান। তারা তৎক্ষণাৎ ভারতের মুসলিমদের ক্ষোভকে আরও উসকে দেওয়া এবং বড়সড় ভাবে কোনো একটি পালটা বদলা নেওয়ার প্ল্যান করতে শুরু করে দিল। এমন কাউকে এই কাজের জন্য চাই যে ভারতকে সবথেকে ভালোভাবে চেনে। আর ওই প্ল্যান প্রয়োগ করা হবে বম্বেতে। দেশের অর্থনৈতিক ক্যাপিটাল। দাউদ ইব্রাহিম আদর্শ লোক এই ব্যাপারে। কারণ তার নেটওয়ার্ক তৈরি বম্বে শহরে। আর কী চাই। অতএব ১৯৯২ সালের ২৫ ডিসেম্বর দুবাইতে আইএসআই এর দুই এজেন্ট দাউদ ইব্রাহিমের সাদা বাংলোয় হাজির হল। প্রাথমিক পরিচয়ের পর তাদের প্রশ্ন, দাউদ ভাই, বদলা নেবে না তোমার মুসলিম ভাইবোনদের এই অবস্থার জন্য? এই দ্যাখো কী অবস্থা ওখানে। এটা বলে আই এস আই এজেন্টরা একটি ভিডিও ক্যাসেট চালাল। বলা হল এই দ্যাখো কীভাবে মুসলিম মহিলাদের উপর অত্যাচার করছে হিন্দুরা। এই দ্যাখো এটা হল সুরাটের দাঙ্গা। বাচ্চা বাচ্চা ছেলেকে মারছে। দাউদের বুকে আগুন জ্বলে উঠল। আইএসআই যেসব ভিডিও দেখাচ্ছে তা সত্যি নাকি মিথ্যে এসব কথা তার মাথায় এল না। সে চাইল বম্বে তথা ভারতের মুসলিমদের কাছে একজন মসিহা হয়ে উঠত। যে নিজের সম্প্রদায়ের মান বাঁচাতে বদলা নিয়েছে। আই এস আই-এর প্রথম পদক্ষেপ সফল। তারা বলল, একবার এই কাজটি যদি করতে পারো তোমার ব্যবসার জন্য বালুচ আর আফগান বর্ডার খোলা। দাউদের চোখে স্বপ্ন। কারণ তখন থেকেই তার প্ল্যান ড্রাগের ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত হওয়া। টোপে কাজ হল। ঠিক এরকম সময় ছোটা শাকিল দাউদকে বলেছিল ভাই এই অপারেশনে নানাকে নেওয়া যাবে না। কারণ ও হিন্দু। আমাদের মনের ব্যথা বুঝতে পারবে না। উলটে পুলিশকে জানিয়ে দিলে আমাদের বিপদ বাড়বে। সেই সময় এমনিতে রাজনের উপর দাউদ ক্ষিপ্ত। কিছুদিন আগেই কিম বাহাদুর থাপা নামে এক রাজনীতিককে রাজনের ছেলেরা মঙ্গতরাম পেট্রল পাম্পে প্রকাশ্যে খুন করেছে। অথচ সেই থাপা আসলে দাউদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে চলত। রাজন কি জানে না? জানে। তা সত্ত্বেও শিবসেনার ওই নেতাকে ফোন করে রাজনের ছেলেরা থ্রেট করেছে। টাকা চেয়েছিল। সেকথা থাপা নিজেই বলেছে সুভাষ সিং ঠাকুরকে। আর স্বাভাবিকভাবেই ঠাকুর তৎক্ষণাৎ সেই খবরটি দাউদের কানে দিয়েছিল। দাউদ শুধু চুপ করে শুনেছে। কারণ যে কোনো কারণেই হোক দাউদের মনে বরাবর রাজনের সম্পর্কে দুর্বলতা সামান্য হলেও রয়েছে। কিন্তু খোদ দাউদ ভাইয়ের থেকে আশ্বাস পাওয়ার পর যখন সেই থাপা রাজনের ফোন ধরা বন্ধ করে দিলেন, টাকা দিতেও অস্বীকার করলেন, তখন রাজন ধৈর্য ধরতে পারেনি। তার ছেলেরা গুলি করে দিল থাপাকে। আর এই প্রথম দলে থেকেও রাজন বনাম দাউদের একটি ইজ্জতের লড়াই তথা গ্যাং ওয়ার শুরু হয়ে গেল। কারণ দাউদ এই অপমান মেনে নিতে পারছে না সেটা এক নিমেষে বুঝে যাওয়ার পর সুভাষ সিং ঠাকুর বলেছিল, ভাই থাপাকে যারা খুন করেছে তাদের আমরা খতম করে দিচ্ছি না কেন? এটা দাউদের মনের কথা। সে চুপ করে রইল। একবার বলল, ওরা রাজনের ছেলে। ঠাকুর বলে উঠল, এরা তো আপনাকেও আর মানছে না ভাই। শিক্ষা দেওয়া দরকার। দাউদ মাথা নাড়িয়েছিল। তারই ফলশ্রুতি রাজনের দীর্ঘদিনের সাথী, দুর্দান্ত বন্দুক চালানোয় পারদর্শী তিন সদস্য দিবাকর, সঞ্জয় আর অমরকে সুভাষ সিং ঠাকুর ফোন করিয়ে ডেকে আনিয়েছিল উত্তরপ্রদেশের গোন্দার এক খামার বাড়িতে। বলেছিল তোমাদের ভয় নেই। আমি গোপন জায়গায় রেখে দেব। পুলিশ সন্ধান পাবে না। তারা বিন্দুমাত্র সন্দেহ করেনি। কিন্তু আর ফিরতে পারেনি। সেখানেই তাদের গুলি করে হত্যা করা হয় এবং ওই বাড়ির মধ্যেই পুঁতে ফেলা হয় বডিগুলি। বাড়িটি কার ছিল? এক এমপির!

১৯৯৩ সালের জানুয়ারি মাসের শেষ সপ্তাহে বম্বে থেকে ৩০ জন যুবকের একটি দল গেল করাচিতে। তারপর তাদের নিয়ে যাওয়া হল পাক অধিকৃত কাশ্মীরের এক জনশূন্য স্থানে। সেখানেই শেখানো হয়েছিল আরডিএক্স কীভাবে তৈরি করতে হয় এবং কীভাবে টাইমার রেখে ব্লাস্ট করানো হয় বিস্ফোরণের আগে। প্রায় দেড় মাসের লাগাতার ট্রেনিং এর পর তারা ফিরে এল বম্বেতে। এবার সেই প্ল্যান। এই ৩০ জন যুবক কারা? তারা সকলেই টাইগার মেমনের রিক্রুট। অর্থাৎ রাজনকে জানানো বা যুক্ত করা হবে না। দাউদের বম্বের নতুন রিমোট কন্ট্রালের নাম টাইগার। দাউদের দুবাইয়ের বাড়িতে হঠাৎ করে অচেনা লোকের আনাগোনা বেড়ে গেল। কিন্তু কারা এরা? রাজন জানতে পারছে না। তাকে কোনো মিটিং এ ডাকা হচ্ছে না। কিছু জানতে চাইলে আনিস ভাই বলছে এটা শাকিল দেখছে। তুমি ছেড়ে দাও। অন্য বিজনেস বাড়ানোর চেষ্টা করো। তোমার ওটাই কাজ। রাজন এভাবে কোনোদিন দেখেনি তাদের কোম্পানি চলতে। একটা গোপন প্ল্যান চলবে, অথচ সে কিছুই জানতে পারছে না! এরকম ভাগাভাগি তো ছিল না! প্ল্যান ছিল এপ্রিল মাসে বম্বেতে বিরাট বড় এক বিস্ফোরণ ঘটানো হবে। কারণ সেই মাসেই শিবসেনার প্রতিষ্ঠা দিবস। আঘাত হানতে হবে তখনই। সব পরিকল্পনা রেডি। ৮ টন আর ডি এক্স রায়গড়ের উপকূল থেকে ঢুকিয়ে আনা হয়েছে। দিন এগিয়ে আসছে। কিন্তু আচমকা সব হিসাব উলটে গেল। ১০ মার্চ গুল নুর মহম্মদ নামের এক পেটি ক্রিমিনাল, যে এলাকায় চুরি ছিনতাই পকেট কেটে বেড়ায়, সে বম্বের নির্মল নগর পুলিশ স্টেশনে সাত সকালে এসে গালগল্প শুরু করল। পুলিশ অফিসার আর কনস্টেবলরা হাসাহাসি করছে। কারণ গুল মহম্মদ বলছে, শীঘ্রই শহরে নাকি সিরিয়াল ব্লাস্ট হবে। কারা করবে? পাকিস্তান করাবে দাউদকে দিয়ে। সামান্য এক পকেটমার গুল। সে এসব কথা বললে ঠাট্টাতামাশা করাই স্বাভাবিক। কিন্তু গুল মহম্মদ যখন জানাল, সে নিজেই ২২ জানুয়ারি থেকে ৪ মার্চ পর্যন্ত পাকিস্তানে ট্রেনিং নিয়ে এসেছে, তখন পুলিশের মধ্যে হইচই পড়ে গেল। গুল মহম্মদকে গ্রেপ্তার করা হল। যতটা সম্ভব সে জানাল কী হয়েছে। কিন্তু ঠিক কোথায় কোথায় বিস্ফোরণ হবে তা সে জানে না। কারণ তখনও জানানো হয়নি। একেবারে শেষ মুহূর্তে সেসব জানানো হবে। গুল মহম্মদ পুলিশের কাছে সারেন্ডার করেছে সেই খবর দ্রুত পৌঁছে গেল দুবাইয়ে। তারও আগে টাইগার মেমনের কাছে। তাহলে? এবার কী করা যাবে? প্ল্যান বন্ধ? একেবারেই না। বরং উলটো। মাত্র একদিন পরই ঘটনা ঘটাতে হবে। যাতে পুলিশ তৈরি হওয়ার সুযোগই না পায়। এবং সত্যিই তাই। গোটা ভারতকে হতচকিত করে ১২ মার্চ একের পর এক বোমা বিস্ফোরণ হয়ে গেল বম্বের সবথেকে দামি জায়গাগুলিতে। ৩০০ ছাড়িয়ে যায় মৃত্যুর সংখ্যা। এটা কী করল দাউদ ভাই? রাজন রীতিমতো ক্রুদ্ধ। নিজের শহরের প্রতি তার টান সাংঘাতিক। দাউদ ভাইও তো বম্বেকে প্রাণের থেকেও বেশি ভালোবাসে। তাহলে? এরকম কেন? আর তাকে কেন কিছুই জানতে দেওয়া হয়নি? শাকিল এক বিকেলে এই প্রশ্নটা শুনে দাউদের সামনেই বলেছিল, তোকে বলা হবে কেন? তুই তো কাফের! হিন্দু! দাউদ কোনো প্রতিবাদ করেনি। ঠিক একমাস পরই রাজনের কানে খবর গেল শাকিল আর সুনীল তাকে হত্যার ছক কষছে। তাকে দুনিয়া থেকেই সরিয়ে দেওয়া হবে। দাউদ ভাইয়ের ডাকা একটি পার্টিতে যাওয়ার জন্য তৈরি হচ্ছিল সে। তখনই ফোন। দাউদের এক গ্যাং মেম্বারই জানিয়ে দিল সেকথা। দাউদ ভাই তাকে খুন করতে চাইছে? এতটা বিশ্বাসঘাতকতা? আর তো থাকাই চলে না। দুবাই আর নিরাপদ নয়। তাই রাজন এক পরিচিত সিন্ধি ব্যবসায়ী বন্ধুর সাহায্য নিয়ে দুবাই থেকে পালানোর সুযোগ পেল। ভায়া নেপাল সোজা কুয়ালালামপুর। মালয়েশিয়া রাজনের চেনা জায়গা। তার একটি বিস্তৃত নেটওয়ার্ক এখানে আছে। আপাতত সুযোগের অপেক্ষা দল গোছানোর। কারণ এবার একটাই লক্ষ্য। খতম দাউদ! তবে মালয়েশিয়ায় থাকলে তাকে ঠিক খুঁজে বের করবে দাউদ বাহিনী। তাই এখানে বেশিদিন নয়। কোথায় যাওয়া যায়? বম্বের তার গ্যাংস্টারদের গোপন আস্তানা একটাই। ব্যাংকক! অতএব রাজন ব্যাংককে গেল। ব্যাংককে থাকার নিয়ম হল নাম পালটে ফেলতে হবে। সেই নতুন নামের পাসপোর্ট পাওয়া যাবে। চিন্তা নেই। বম্বের বাইকুল্লার বাসিন্দা মিঠুন চক্রবর্তীর একসময়ের ডাই হার্ড ফ্যান রাজেন্দ্র নিকলজের ওরফে ছোটা রাজনের নতুন নাম হল বিজয় দমন। কিছুদিন ব্যাংককে থেকে পরিস্থিতিটা বুঝে নিতে হবে। এবং সম্পূর্ণ গোপনে থাকতে হবে। কারণ দাউদের লোকজন এই ব্যাংককে যথেষ্ট। ওয়ান রুম ফ্ল্যাট। ঠিক এক বছর চুপচাপ থাকার পর কাজে নামল রাজন। বম্বের গ্যাং সেভাবে ভাঙেনি। তারা তাদের মতোই কাজ করে যাচ্ছে। সবথেকে আশ্বস্ত হওয়ার মতো ঘটনা হল গ্যাং মেম্বারকে ভাঙাতে পারেনি দাউদ। তারা রাজনের প্রতি এখনও বিশ্বস্ত। ব্যাংককে থেকে নতুন যে ব্যবসায় প্রথম হাত দিল রাজন সেটি হল ড্রাগস। ২০ লক্ষ ডলার দিয়ে ইন্দোনেশিয়ার বট্টামে খোলা হল এক ম্যানড্রাক্স তৈরির কারখানা। মারাত্মক লাভজনক ড্রাগ এই ম্যানড্রাক্স। এর ঠিক পাশাপাশি বিশেষ করে আফ্রিকার দেশগুলিতে সাপ্লাই করার জন্য তৈরি হল আর একটু কড়া ডোজের র মেটিরিয়াল থেকে তৈরি ড্রাগ, যার নাম ‘কোয়ালুড’। কোটি কোটি টাকার বিজনেসে রাজনের সম্পত্তি উত্তরোত্তর আরও বাড়তে লাগল। রাজনের সঙ্গে রয়েছে তার সবথেকে বিশ্বস্ত সাথী সন্তোষ শেট্টি। সে থাকে বম্বেতে। এভাবে কেটে গেল পাঁচ বছর। রাজন নিশ্চিন্ত, তাকে আর হয়তো মারবে না দাউদ। আর কেউ খুঁজছেও না। ঠিক তখনই ২০০০ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর ছোটা রাজনের দুনিয়া কেঁপে উঠল। তার ব্যাংককের বাড়ি ছিল সুখুমবিট সইয়ের চরণ কোর্ট নামক এলাকায়। চারজন যুবক ওইদিন হাতে এক বিরাট কেক নিয়ে হাজির। বিল্ডিং এর সিকিউরিটি গার্ডকে বলা হল, দামন সাহেবকে জন্মদিনের গিফট দিতে হবে। উঠে এল চার যুবক। রাজনের ঘরে তখন ছিল তার আর এক সাথী রোহিত ভার্মা আর রোহিতের স্ত্রী সঙ্গীতা। তারা ছিল বাইরের ড্রইংরুমে। বেডরুমে রাজন। ডোরবেল বাজছে। দরজা খুলে দিল রোহিত। এক মুহূর্তের মধ্যে ভিতরে ঢুকে এল চারজন। তাদের হাতে পয়েন্ট ফোর ফাইভ বোরের পিস্তল। তৎক্ষণাৎ গুলি। গুলি লাগল রোহিতের কাঁধে। গুলি লেগেছে সঙ্গীতার হাতেও। কিন্তু এরা তো টার্গেট নয়! টার্গেট যে সে কোথায়? ততক্ষণে রাজন এক লাফে উঠে দরজা বন্ধ করে দিয়েছে। কিন্তু তা থেকে রক্ষা পাওয়া যায় নাকি? ল্যাচ লকে গুলি করল আগন্তুকরা। একটি..দুটি..তিনটি। আর তার মধ্যেই দুটি গুলি দরজা ভেদ করে রাজনের পেটে। মাটিতে লুটিয়ে পড়েছে রাজন। কিন্তু হাল ছাড়লে চলবে না। ওরা দরজা ভেঙে ঘরে ঢুকলে আর কোনো রক্ষা নেই। অতএব দোতলার ওই ঘরের জানালা থেকে রাজন সোজা নীচে ঝাঁপ দিল। প্রথমেই ভেঙে গেল গোড়ালিটা। পেট থেকে অনবরত রক্ত বেরোচ্ছে। ওই অবস্থায় রাজন সোজা গেল সামনের দিকে। একটি ঝোপ। তার আড়ালে শুয়ে পড়ল সে। ততক্ষণে দোতলায় রাজনের ঘরে ঢুকে পড়েছিল দুষ্কৃতীরা। কিন্তু রাজনকে পায়নি তারা। আর এদিকে প্রবল গুলির শব্দে হইচই, সিকিউরিটিরা ছুটে এসেছে। অতএব পালানো ছাড়া উপায় নেই তাদের।

রাজন হাসপাতালে ভর্তি। পেটের অপারেশনে দুটি গুলি বের করে ফেলা হয়েছে। আরও গুলি থাকতে পারে। তাই বারংবার স্ক্যান করা হচ্ছে। কিন্তু এখনও বিপদ কাটেনি। ইনফেকশন হয়ে যেতেই পারে। ঠিক ২০ দিন পর রাজন যখন আইসিইউ থেকে বেরিয়েছে এবং কেবিনে দেওয়া হয়েছে তাকে, সে ফোন করল বিনোদ শেট্টিকে। বিনোদ, এই অ্যাটাক কে করেছে? আমি বদলা চাই! বলল রাজন। বিনোদ রাজনকে শান্ত করে জানিয়ে দিল, অল্পদিনের মধ্যে সে সব খবর নিচ্ছে। চিন্তা নেই। আর কেউ নয়। জানা গেল গোটা অপারেশনের পিছনে রয়েছে দাউদের সঙ্গী শরদ শেট্টি। অর্থাৎ দাউদের নির্দেশেই। রাজনের মনে বদলার আগুন। রাজন হাসপাতালে। সে চায় হাসপাতালে থাকতেই থাকতেই যেন প্রতিশোধ সম্পন্ন হয়। অন্তত দাউদ জেনে যাক রাজন কতটা ভয়ংকর। বম্বে থেকে পাঠানো হল চার গ্যাংস্টারকে। করণ সিং, মনোজ কোটিয়ান, বিমলা কুমার আর অমর বাম ওরফে নেপালি। দাউদের দুবাইয়ের বিজনেস দেখে শরদ শেট্টি আর ছোটা শাকিল। দুবাইতে শরদের হোটেল চেইনের নাম রামী গ্রুপ অফ হোটেলস। যা আদতে দাউদেরই। তবে দুবাইতে থাকলে শরদ আন্নার (এই নামে পরিচিত সে) প্রিয় জায়গা হল ইন্ডিয়া ক্লাব। চার যুবক সাতদিন ধরে ফলো করল শরদ আন্নাকে। দেখা গেল বেস্ট জায়গা হল ওই ইন্ডিয়া ক্লাব। কিন্তু কীভাবে সম্ভব ইন্ডিয়া ক্লাবে ঢোকা! রাজনের পরিচিত এক বিজনেসম্যান সেই ব্যবস্থা করে দিতে রাজি। ওই চার যুবক পেয়ে গেল অস্থায়ী ক্লাব মেম্বারশিপ। মূল্য? ১২ লক্ষ টাকা! ক্লাবে ঢুকে প্রথম থেকে চেষ্টা করা হল শরদ শেট্টির সঙ্গে আলাপের। তবে সবাই নয়। মনোজ কোটিয়ান। কন্নড় যুবক। দারুণ ইংরাজি বলতে পারে। সহজে তাকে দেখে ভেবে নেওয়া যায় যে ধনী পরিবারের শিক্ষিত সন্তান। হীরের ব্যবসা আছে তার জেড্ডায়। এরকমই বলেছিল কোটিয়ান শরদকে। সেকথা বিশ্বাস করে হীরে ব্যবসায় আগ্রহ হয় শরদ আন্না। ২০০৩ সালের ১৯ জানুয়ারি। রাতে ক্লাব থেকে বেরোচ্ছে শরদ আন্না। সঙ্গে কোটিয়ান। আগে থেকে প্ল্যান ছিলই। শরদ আন্না পোর্টিকোর দিকে যাচ্ছে। আচমকা তিন যুবক সামনে। প্রথমে সামনে থেকে গুলি। আন্না মাটিতে পড়ে যাওয়ার পর পয়েন্ট ব্ল্যাংক রেঞ্জে মাথায় গুলি। কটা? কুড়িটা!! রাজনের বদলা!

রাজনের তো সন্তুষ্ট হওয়ার কথা! দাউদকে এর থেকে বড় ধাক্কা আর কেউ দেয়নি। সত্যিই রাজন খুশি। কিন্তু সেই খুশি বেশিদিনের জন্য নয়। কারণ হঠাৎ জানা যাচ্ছে বম্বে পুলিশ গোপনে আসছে ব্যাংকক। রাজনকে ধরতে। কারণ রাজনের লোকেরা একের পর এক দাউদ সঙ্গীকে হত্যা করছে। আবার পালটা দাউদও নিচ্ছে বদলা। বম্বে হয়ে উঠেছে এক গ্যাং ওয়ারের নগরী। তাই রাজনকে ধরতে চায় বম্বে পুলিশ। ধরা দেওয়া চলবে না। তাহলে কী করা যায়? এবার জানা গেল ছোটা রাজনের নেটওয়ার্ক কতটা স্ট্রং। ২৪ নভেম্বর ২০০৩ সালে রাজন হাসপাতালের বেড থেকে উধাও। কীভাবে সম্ভব? জানালা থেকে ঝুলছে দড়ি, রক ক্লাইম্বিং এর উপকরণ। জানালা থেকে তাকে নামিয়ে এনেছিল থাইল্যান্ডের সামরিক বাহিনীর একটি দল। যাদের সঙ্গে রাজনের আগে থেকেই যোগাযোগ ছিল। জানালা থেকে নামিয়েই তাকে চাপানো হয় মিলিটারি ট্রাকে। সেখান থেকে সোজা কম্বোডিয়ার বর্ডারে। তাকে নামিয়ে দিয়ে চলে গেল মিলিটারি ট্রাক। তারপর? ১৫ মিনিট পর একটি হেলিকপ্টার এল আকাশে। নেমে আসার পর বেরিয়ে এলেন যে ব্যক্তি তিনি কম্বোডিয়ার এক প্রদেশের গভর্নর। রাজন হাঁটতে পারছে না। তাকে স্ট্রেচারে করে নিয়ে বসানো হল চপারে। সেই গভর্নরের পাশে। চপারটি কোথায় পৌঁছে দিল রাজনকে? সিয়েম রিপ প্রদেশের রাজধানী শহর সিয়েম রিপে। আঙ্কোরভাটের গেটওয়ে। ৬ মাস সেখানে সম্পূর্ণ গোপনে চিকিৎসা হল রাজনের। গোটা দুনিয়া জানতে পারছে না রাজন বেঁচে নাকি মারা গিয়েছে! যখন ধরেই নেওয়া হচ্ছে রাজনের আর সন্ধান পাওয়া যাবে না, তখন সে আসলে সিয়েম রিপ থেকে চলে গিয়েছে বিশেষ বিমানে চেপে তেহরান। ইরানের রাজধানী। সেখান থেকে বাগদাদ, ইন্দোনেশিয়া, অস্ট্রেলিয়া, পাপুয়া নিউগিনি…। পালিয়ে বেড়াচ্ছে রাজন। কারণ ইতিমধ্যে দাউদের দক্ষিণ হস্ত ছোটা শাকিল দু বার অ্যাটাক করেছে তার উপর। আরব মাফিয়াদের দিয়ে। আর পালিয়ে পালিয়ে এভাবে ভয়ের জীবন কাটাতে পারছে না ডায়াবেটিসের রোগী ছোটা রাজন। তাই বছর কয়েক আগে অবশেষে সে সারেন্ডার করার প্রস্তাব দেয় ভারত সরকারের কাছে। ছোট রাজন এখন তিহার জেলে।

এবং এবার এক ভয়ংকর চ্যালেঞ্জ উপস্থিত দিল্লি পুলিশ আর তিহার জেল কর্তাদের সামনে। রাজনকে রক্ষা করার পরীক্ষা। কারণ রাজনকে আদালত জেল হেফাজতের নির্দেশ দেওয়ার পরই করাচি থেকে দাউদ সঙ্গী ছোটা শাকিল ফোন করে দিল্লির সংবাদমাধ্যমগুলিকে ঘোষণা করেছে, তিহার জেলে ঢুকে রাজনকে খতম করা হবে! ইন্ডিয়ান পুলিশ ঠেকাতে পারবে না! দাউদ ভাইয়ের চ্যালেঞ্জ!

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *