ঝগড়া হয়েছে ফয়জল আর তার বাবার মধ্যে। সবেমাত্র ইলেভেন পাশ করা ফয়জল বাবার মুখে মুখে কখনও এভাবে তর্ক করেনি। কিন্তু এবার তার বাবা চাইছেন ফয়জলকে চাচার কাছে পাঠিয়ে দিতে। পুণেতে। টুয়েলভথ পাশ করার পর ওখানে ইলেকট্রনিক্সে ডিপ্লোমা করে নিক ফয়জল। এটাই চাইছেন বাবা। ফয়জল নারাজ। তার আর পড়াশোনা ভালো লাগছে না। আর ওইসব ডিপ্লোমা মানে বিস্তর পরিশ্রম। অত মাথাই নেই। তাই সে যাবে না। সুতরাং তুমুল অশান্তি। কিন্তু যেতে তাকে হলই। প্রথম কারণ টুয়েলভথের রেজাল্ট তেমন ভালো নয়। আর দ্বিতীয় কথা হল আব্বু প্রচণ্ড রাগী। তিনি মানছেন না। এক ভাই রাহিল হার্ডঅয়্যার ইঞ্জিনিয়ার। সবথেকে ছোট ভাই মুজাম্মেল তো এখনও স্কুলে। তারও পড়াশোনায় বেশ মাথা আছে। দুই ভাই যখন এভাবে নিজেদের প্রতিষ্ঠার পথে হাঁটছে তখন ফয়জল কেন এখনও ঠিক করতে পারছে না যে জীবনে সে কী করবে? আব্বু, চাচা, আম্মু সকলেই চিন্তিত আর ক্রুদ্ধ । সুতরাং প্রচুর তর্কাতর্কির পর অবশেষে ফয়জল পুণে গেল। চাচার বাড়িতে থাকা। এবং প্রথম বছরের পরীক্ষাতে ফেল। সুতরাং এরপর আর পড়াশোনার পিছনে সময় আর টাকা নষ্ট করে লাভ নেই। একটা কিছু কাজ করতে হবে। বহুদিন ধরে শখ একটা রে ব্যান সানগ্লাস কেনা। আর লেদার জ্যাকেট। পুণের মোমিনপুরা এলাকা। মারাত্মক ঘিঞ্জি। কাজ পেয়ে গেল ফয়জল। চিমা ট্রান্সপোর্ট কোম্পানি। এক বছর…দু বছর…। কেটে গেল এভাবেই তিন বছর। ২২ বছরের ফয়জল কাজ চেঞ্জ করেছে। এখন সে গার্মেন্ট বিজনেস করে। মুম্বই থেকে জামাকাপড় নিয়ে এসে পুণের মার্কেটে সাপ্লাই। কয়েকমাসের মধ্যে রে ব্যান সানগ্লাস কেনা সম্ভব হয়েছে। এবং লেদার জ্যাকেট। ফয়জল ভাইয়ের ভক্ত। তাঁর ফ্যানদের কাছে সলমন খান এই নামেই খ্যাত। ভাইজান। মাল আনতে মুম্বই গেলে বান্দ্রা ব্যান্ডস্ট্যান্ডে ফয়জল মাঝেমাঝে যায় ভাইজানের ফ্ল্যাটবাড়ির সামনের গেটে। একটু পিছনদিকে হেঁটে গেলে মন্নত। শাহরুখ খানের বাংলো। উলটোদিকে সমুদ্র। হু হু করে বাতাস আসে। সবাই কেমন বসে আছে। এখানে যদি একদিন নুরকে নিয়ে আসা যেত। একটা শ্বাস ফেলল ফয়জল। নুর তার বাগদত্তা।
আমাদের শাদি কবে হবে?
কেন? সময় হলেই হবে। আরে আমাদের কি সময় চলে যাচ্ছে নাকি? বাড়িতে তো এখন থেকেই দেখাশোনা চলছে। ভয় হয় এই বছরেই যদি কিছু একটা ব্যবস্থা করে দেয়!
চিন্তা নেই। আর একটু জমিয়ে নিই বিজনেসটা। একটা দোকান যদি পেতাম ভালো হয়। ক্যাপিটাল চাই বুঝলে তো?
তুমি সেই চেষ্টা করো? আমার তো মনে হয় না!
মানে? আমি চেষ্টা করি না?
না। করো না। তুমি সন্ধ্যার পর যাদের সঙ্গে গল্প করতে যাও তাদের আমার দেখে ভালো লাগে না। ওখানে এত সময় নষ্ট করলে কীভাবে বিজনেস বাড়বে? আরে তুমি ওসব বুঝবে না।
আর বেশি দেরি হলে কিন্তু আমাদের সব স্বপ্ন ভেঙে যাবে ফয়জল। এখনও সময় আছে। কিছু করো।
পুণের পেশওয়ে পার্কের বিকেল। ফয়জল আর নুর এই কথোপকথনের পর কিছুক্ষণ হাত ধরে রইল। চুপ করে। পকেট থেকে একটা রেভলন লিপস্টিক বের করে নুরের হাতে দিয়েছে ফয়জল। ঠিক তখন মোটরবাইকের শব্দ। পার্কের গেটে। জোরে হর্ন দিচ্ছে। সেটা শুনেই ফয়জলের মন চঞ্চল। কারণটা জানে নুর। সেই ছেলেগুলো। ওর বন্ধুরা। এবার ফয়জল উঠে যাবে। অপরাধীর মতো মুখ করে সত্যিই ফয়জল বলে উঠল এবার তাহলে…। নুর বলল, হ্যাঁ, চলো উঠি। তুমি আগে বেরিয়ে যাও। আমি ২ নম্বর গেট দিয়ে বেরোচ্ছি।
সূর্যাস্তের পর তখনও আকাশে আলো আছে। পুণের মোমিনপুরার ঘিঞ্জি গলিগুলোর মধ্যে একটিতে ৪০০ স্কোয়ার ফুটের অফিসঘর। একটি এনজিও। সুহেল মেহমুদ শেখ আর রিজওয়ান দিওয়ারি ফয়জলকে বাইকে চাপিয়ে সেই ঘরে ঢুকল। আগে থেকেই বসে আছে এক অচেনা লোক। এখানে মাস ছয়েক ধরে যাতায়াত করছে ফয়জল। মাঝেমধ্যেই একজন করে অচেনা মানুষ আসে। আর দেশজুড়ে বিভিন্ন এলাকার খবর দেয়। ফয়জল জানতেই পারত না, এই দেশের সব জায়গায় তার কওমের উপর এরকম অত্যাচার চলছে। যেসব ছবি দেখানো হয় তা দেখে রক্ত গরম হয়ে যায়। একদিন কথাটা চাচাকে বলেছিল। রাতের খাবার সময়। চাচা রহমত তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে ছিলেন ফয়জলের দিকে। তারপর জিজ্ঞাসা করলেন, এসব তোকে কে বলছে? কাদের থেকে জানছিস? তৎক্ষণাৎ সতর্ক হয়ে গেল ফয়জল। বন্ধুদের হদিশ আর ওই এনজিও অফিসের খবর বলে দিলে চাচা যদি যেতে না দেয় আর? যদি আব্বুকে নালিশ করে! চাচা বলেছিল, শোন ফয়জল, এরকম অনেক লোকজন ঘুরে বেড়াচ্ছে চারদিকে। তাদের কাজ হল কোথায় কোথায় মুসলিমদের উপর অত্যাচার হচ্ছে, কোথায় কোথায় দাঙ্গায় কতজন মারা গেছে এসব গল্প শোনায়। আর নানারকম ছবি দেখায়। আমার অফিসের এক কলিগ সাবধান করেছে আমায়। এরা কিন্তু আসলে আমাদের উস্কানি দিতে আসে। এরকম উস্কানি দেওয়ার লোক হিন্দু মুসলিম দুই ধর্মেই আছে। এদের চক্করে পড়িস না। লাইফ বরবাদ হয়ে যাবে। ফয়জল চুপ করে সবটা শুনল। তারপর খাবার শেষ করে উঠে গেল, জি চাচা বলে। রহমত নিশ্চিন্ত হয়েছিলেন যে ফয়জল তাঁর কথা শুনে মেনে নিয়েছে। এবং ভুল ভেবেছিলেন। আরও বেশি করে ওই গ্রুপে যাতায়াত করছে ফয়জল। ওরা বলেছে, তার মধ্যে একজন সাচ্চা মানুষ আছে। সেই পারে মসিহা হতে কওমের। এসব শুনে ফয়জলের মনে স্বপ্ন তৈরি হয়। দুই ভাইয়ের সামনে তাকে অবজ্ঞা করে সবাই। যেন পড়াশোনা আর ভালো চাকরি করলেই সবাই জীবনে কিছু একটা হয়ে যাবে। ফয়জল যে এভাবে জামাকাপড়ের ব্যবসা করে এটা পরিবারের কেউ পছন্দ করে না সে জানে। তাদের প্রেস্টিজে লাগে, তাও জানে। তার পরিবারের সকলেই চাকরি করে।
আব্বু সৌদি আরবে চলে গিয়েছেন। সেখানে পেট্রল পাম্পের মেনটেন্যান্স ডিপার্টমেন্টের হেড তিনি। মাঝেমাঝে দেশে ফেরেন। পরিবার থাকে মুম্বইয়ের মীরা রোডে। শুধু মেজ ছেলে ফয়জল পুণেতে। চাচার কাছে। ফয়জল দেখিয়ে দেবে সবাইকে সে মসিহা হতে পারে।
আজ একটা ভিডিও দেখানো হল। কীভাবে যে মানুষগুলোকে মারছে তা চোখে না দেখে বিশ্বাস করা যায় না। এই ভিডিও নিয়ে যে লোকটি আজ এসেছে তার নাম আবদুল কুম্ভার। দারুণ কেটে কেটে ধীরে ধীরে কথা বলে। একটি করে ছবি আসছে টিভি স্ক্রিনে, সে বলে যাচ্ছে কীভাবে এই ঘটনা শুরু হল। ইসস..এভাবে মেয়েগুলোকে রেপ করা হচ্ছে! ফয়জলের চোখ যেন জ্বলছে। আর তার দিকে আড়চোখে মাঝেমাঝে তাকাচ্ছে আবদুল কুম্ভার। তার কাজ এরকমই আগুন জ্বালানো, চোখে আর মনে। নিরীহ যুবকদের মধ্যে যাতে প্রতিহিংসা তৈরি হয়। যাতে তাদের জীবনযাত্রার মোড় ঘুরে যায় অন্যদিকে। ঠিক ৪০ মিনিটের ভিডিও। শেষ হয়ে যাওয়ার পর দরজা খুলে দেওয়া হল। ঘরে ছিল সব মিলিয়ে আটজন। এবার চা বলতে গেল আবুভাই। চা খাওয়ার পর প্রথম যে শব্দটা আবদুল কুম্ভার উচ্চারণ করেছিল সেটি হল, ইন্তেকাম! বদলা! ফয়জলের দিকে তাকিয়ে আবদুল বলল, মিয়াঁ ইয়ে সব দেখকে ভি তুম কেয়া চুপ রহোগে? কুছ করনে কা মন নেহি করতা? তুমহারে বারে মে বহোত সুন চুকা হুঁ। ফয়জল চমৎকৃত! তাকে নিয়ে কথা হয়! সে এতই ইমপরট্যান্ট? অথচ তাকে তার পরিবার পাত্তা দেয় না। নুর তাকে বলে এদের সঙ্গে না মিশতে। আসলে তাকে এরাই সবথেকে ভালোভাবে চিনেছে। এই কথাটা যদি একবার নুর শুনত…। ফয়জল উত্তর দিল, আমাদের কিছু করা উচিত। হাসি ফুটল আবদুল কুম্ভারের মুখে। ব্যস! এই তো! তার কাজ হাসিল। এই কাজগুলোর জন্যই সে পেমেন্ট পায় অজানা জায়গা থেকে।
কী করতে হবে? জানতে চাইল ফয়জল। কুম্ভার বলল, খুব সোজা। তোমায় কিছুই করতে হবে না। আমরা সব বলে দেব। বুঝিয়ে দেব। প্যাহেলে ইয়ে বাতাও, পাকিস্তান যাওগে? ফয়জল চমকে উঠল। পাকিস্তান? তোমার লাইফ বনে যাবে ফয়জল মিয়াঁ। আবদুল কুম্ভারের কণ্ঠে জাদু আছে। ২৩ জুন ২০০১। মোমিনপুরার এক সাধারণ যুবক ফয়জল আতাউর রহমান শেখকে দেখা গেল দিল্লির চাণক্যপুরী এলাকার পাকিস্তান হাইকমিশনের বিরাট বাংলোর পিছনের দিকের লাইনে দাঁড়িয়ে। ভিসার জন্য। সঙ্গে আবদুল কুম্ভার। আবদুলের বোনের নাম শরিফা। তার বাড়িতেই মাঝেমধ্যে যায় আবদুল। তাই তার পক্ষে ভিসা পাওয়া সমস্যা নয়। কিন্তু দুর্ভাগ্য ফয়জলের। ভিসা দেওয়া হল না তাকে। কুম্ভার ভিসা পেল। সে ফয়জলকে জানাল ঘাবড়ানোর কিছু নেই। এসব হতেই থাকে। আবদুল কুম্ভারের কথাই ঠিক। তিন মাস পর ফয়জলের ভিসার আবেদন মঞ্জুর হয়ে গেল। কে কলকাঠি নাড়ল? মাত্র তিনমাস আগে যাকে ভিসা দেওয়া হয়নি, সেই তিনমাসের মধ্যেই পাকিস্তান যাওয়ার যোগ্যতা অর্জন করে ফেলল কীভাবে? নির্দেশ এসেছিল লাহোর থেকে। ফয়জলকে দেওয়া হয়েছিল একটি ফোন নম্বর। এই নম্বরে ফোন করবে। বলবে আবু হরকতের সঙ্গে দেখা করব। যে ফোন ধরবে সে দেখবে প্রথমে বলছে ‘খলিফা’, তারপর অপেক্ষা করবে তোমার উত্তরের জন্য। তুমি বলবে ‘সুফিয়ানা’। তোমার সিক্রেট কোড ওটাই। ফয়জল পাকিস্তানের প্লেনে ওঠার আগে বারংবার জপ করছে একটাই শব্দ, যাতে ভুলে না যায়। সুফিয়ানা। ওই শব্দই তার নতুন জীবনে প্রবেশের আসল পাসপোর্ট।
কোথায় যাচ্ছ এতদিনের জন্য?
একটা কাজ আছে জরুরি
বম্বে?
না একটু দিল্লি যাওয়ার দরকার। ওদিকে কিছু বিজনেসের সন্ধান পাচ্ছি। এই তো তিনমাস আগেই গিয়েছিলাম মনে নেই? শাদি করলে তো বিজনেস বাড়াতে হবে, তাই না! তোমার মুখ দেখে মনে হচ্ছে কেমন যেন টেনশনে? কী হয়েছে ফয়জল! আমাকে বলবে না!
নুরের দুই হাত নিজের হাতে নিয়ে ফয়জল বলল, কোনো টেনশন নেই ইনশাল্লাহ..এসে বলব অনেক গল্প! তোমার কী চাই বলো। করোলবাগে অনেক দোকান আছে। নুর বিষণ্ন হাসি হেসে বলল, দেরি কোরো না। নয়তো এসে দেখবে আমি আর তোমার নেই। নিকাহ হয়ে গেছে।
ফয়জল কেঁপে উঠল। সে সত্যিই জানে না কবে ফিরবে। তবু হাসিমুখে বলল, ভালো থেকো তুমি…
আবু হরকা?
নেহি! আপকি তারিফ?
ম্যায় ইন্ডিয়াসে।
আচ্ছা আচ্ছা খলিফা?
হাঁ জি, সুফিয়ানা।
এয়ারপোর্টের টেলিফোন বুথ। ফয়জল লোকটির প্রতিক্রিয়ার জন্য অপেক্ষা করছে। কয়েক সেকেন্ড। তারপরই ওপ্রান্তের ফোন থেকে লোকটির কণ্ঠে উল্লাসের আভাস পাওয়া গেল। এসো এসো। তোমার জন্য জন্য ওয়েট করছি আমরা। একটু দাঁড়াও অ্যারাইভাল লাউঞ্জের বাইরে। হাতে মনে করে একটা লাল রিবন বেঁধে রাখবে ভাই। তোমাকে তো আগেই বলা হয়েছিল। ফয়জল জানে। আগে থেকেই বাঁ হাতে বাঁধা আছে লাল রিবন। সিগন্যাল। পাঁচ মিনিট পর একটা পুরোনো ফোর্ড এসে দাঁড়াল। যে বাড়ির সামনে এসে দাঁড়াল সেটি একতলা বাড়ি। বাংলো বলা যায়। সামনে অনেকটা লন। তারপর বাড়ি। প্রচুর গাছপালা। ধবধবে সাদা কুর্তা পাজামা পরে এসে ফয়জলকে জড়িয়ে ধরে আবু হরকা নামের লোকটি বলল, একদম ঠিক জায়গায় এসেছ। নিজের বাড়ি বলেই ভাবো একে। আজ বিশ্রাম নাও। কাল সকালে কথা হবে। ফয়জলকে যেখানে থাকতে দেওয়া হয়েছে, সেটি আসলে একটি ডরমিটরি। প্রায় আটটি খাট। তবে আপাতত কেউ নেই। একেবারে শেষ প্রান্তে একটি ছেলে ঘুমাচ্ছে। ওপাশ ফিরে। এই অচেনা ছেলেটির সঙ্গে থাকতে হবে তাকে? ফয়জল ভাবছিল। দরজা বন্ধ করার শব্দ হতেই ছেলেটি লাফ দিয়ে উঠল। মুখে সন্দেহ। তারপরই কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে কেটে গেল সেই মনোভাব। ছেলেটি বলল, কি, নতুন নাকি? আজই? ফয়জল মুখে কোনো কথা বলল না। ছেলেটি উর্দুতে কথা বলছে। তার মানে পাকিস্তানী। কিন্তু ছেলেটি বলল আমি খিদমদ। এর বেশি কিছু না। ফয়জল বলল আমি সুফিয়ানা। এর বেশি কিছু না। এটাই নিয়ম। আসলে ছেলেটির নাম ছিল আবদুল রেজ্জাক। যাকে ফয়জল ভেবেছিল পাকিস্তানী, আসলে সে এসেছে হায়দরাবাদ থেকে। ১৫ দিন আগে। এই যে বাড়িটিতে তারা উঠেছে সেটি মার্কাজ উদ দাওয়া ওয়াল ইরশাদ এর অফিস। যে সংগঠনটি নানারকম সমাজসেবার কাজ করে। এই সংগঠনের নাম কিছু বছর পরই চেঞ্জ হয়ে যাবে। নতুন নামটি হবে দুনিয়া কাঁপানো। জামাত উদ দাওয়া! খিদমদ বলল, তোমার ট্রেনিং কবে? ফয়জল এসব জানে না এখনও। তাকে কিছু বলা হয়নি। খিদমদ ওরফে রেজ্জাকও আর বেশি কিছু ভাঙল না। এখানে অলিখিত নিয়ম হল এক্সট্রা কথা না বলা। কেউ কারও বন্ধু না মনে রাখতে হবে। বলে দেওয়া হয়েছে। সকলেই সকলের অচেনা তোমরা একটা মিশনে এসেছো। ভাই বেরাদরির জায়গা না এটা। কতদিন থাকতে হবে এখানে? ফয়জল জানে না। রাতে চিকেন আর রুমালি রোটি দেওয়া হল। আর বলা হল ঘুমিয়ে পড়তে। সবেমাত্র সাড়ে ৮টা। এখনই ঘুম? আবু হরকা হাসল। যা বলা হচ্ছে করো। তোমার লাভ। রাত সাড়ে ১১টা। আচমকা পিঠে ধাক্কা। জোরে জোরে ঝাঁকাচ্ছে তাকে ওই পাশের বেডের খিদমদ। কী ব্যাপার? কুইক! বেরোতে হবে। কোথায়? ফয়জল ঘুমচোখেই জানতে চায়। খিদমত চাপা স্বরে বলল, আমাকে বলেছ ঠিক আছে। কিন্তু এই প্রশ্নটা কখনও করবে না। কে? কী? কেন? কোথায়? কবে? এই পাঁচটি প্রশ্ন কখনও করতে নেই ব্রাদার এখানে। ফয়জল একসেকেন্ডের জন্য ভাবল ভুল করলাম না তো? কোথায় এসে পড়লাম? বাইরে নিকষ কালো অন্ধকার। আর সেই অন্ধকারে মিশে একটি কালো ভ্যান এল। আগে থেকেই চারজন ছিল সেটায়। এবার উঠল রেজ্জাক আর ফয়জল। ভ্যান চলছে অজানা কোনো গন্তব্যে।
জায়গাটা করাচি। টিপু সুলতান রোড। সাড়ে ৬ ফুট লম্বা যে লোকটির পরনে কালো পোশাক তার নাম আরিফ কাসমানি। করাচির নামজাদা কোটিপতি বিজনেসম্যান। শহরে একটা ইজ্জত আছে তার। তার আর একটি পরিচয় সে হল কমান্ডার পদমর্যাদার। আর্মির? হ্যাঁ। তবে প্রাইভেট আর্মি। আর্মির নাম লস্কর ই তৈবা! আসমানি আর আবু হরকা একসঙ্গে ইন্টারভিউ বোর্ডে। কাদের বাছাই করা হবে সেটা তারাই ঠিক করবে। এভাবে জেহাদে যোগ দিতে সবাই আসতে পারে। তার মানে এই নয় যে সকলেই যোগ্য। যতজন আসে তার থেকে বেশি পালায় কিংবা রিজেক্ট করা হয়। কারণ একটাই। ভয়ংকর কঠিন এক ট্রেনিং। সকলে সেই ট্রেনিং নিতে পারবে না। প্রচণ্ড কষ্টকর। পারবে তুমি? জানতে চায় আরিফ। ফয়জল জানাল পারবে। বহোৎ খুব। চিৎকার করে উঠল আরিফ। আবদুল কুম্ভারের রিক্রুট সবসময় জবরদস্ত হয় সেটা জানে এরা। অতএব সিলেক্ট করা হল ফয়জলকে। রিজেক্ট করতে হলে ফিল্ডেই করা হবে। বড়াসাহিব করবেন! কে বড়া সাহিব? আরও পরে জানতে পারব আমরা।
এই বাংলোটা আরও বড়। একসঙ্গে ১০০র বেশি লোক থাকতে পারে আলাদা আলাদা ঘরে। সেরকমই একটি ঘরে রাখা হল ফয়জল আর রেজ্জাককে। পরদিন থেকে ট্রেনিং।শুধুই ভিডিও দেখা। অসম, গুজরাত, পশ্চিমবঙ্গাল, ইউপি, বিহার, কেরল, সব জায়গায় কীভাবে অত্যাচার করা হচ্ছে মুসলিমদের উপর। তার নানারকম ডকুমেন্টারি। সেগুলো কী ভাষায় তা জানা যাচ্ছে না। কারণ প্রত্যেকটা ডকুমেন্টারির সাউন্ড বন্ধ। শুধু ছবি দেখা যায়। ফয়জলের এক মুহূর্তের জন্য চাচার কথা মনে পড়ল। তিনি বলেছিলেন, এরকম অনেক ভিডিও দেখানো হয় যা নাকি আসলে ইন্ডিয়ারই না। মায়ানমার কিংবা কম্বোডিয়ার। সেগুলোও দেখানো হয় ইন্ডিয়ার নাম করে। মিথ্যা ভিডিও। যাতে উস্কানি দেওয়া যায়। সেই কারণেই কি সাউন্ড বন্ধ? যাতে ভাষা বোঝা না যায়? ভাবল ফয়জল। কিন্তু এতদূর এসে এখন আর এসব ভেবে লাভ নেই। এগুলো কেন দেখানো হচ্ছে? মাথায় আগুন জ্বালাতে আর সেই আগুনটা পুষে রেখে দেওয়ার জন্য। যাতে আরও বেশি করে সকলে উদ্বুদ্ধ হয় জেহাদে। ঠিক আটদিন পর আটজনের একটি টিম পৌঁছল মুজফফরাবাদ। পাকিস্তান অধিকৃত কাশ্মীরের রাজধানী। জায়গাটার নাম আল আকসা ট্রেনিং ক্যাম্প। চারদিকে বিল্ডিং। মাঝখানে একটা বিরাট মাঠ । আর চতুর্দিকে পাহাড় ঘেরা জঙ্গল। আগাগোড়া হয় বম্বে কিংবা পুণেতে থাকা ফয়জল আর হায়দরাবাদের রেজ্জাকের কাছে এই ঠান্ডা সহ্য হওয়ার কথা নয়। হচ্ছিলও না। তারা থরথর করে কাঁপছে প্রথম থেকেই। কারণ ভোর সাড়ে ৪টেয় উঠতে হবে ট্রেনিং-এ। প্রথমে দৌড় দৌড়। এবং দৌড়। তারপর শারীরিক কসরৎ ৮টায় ব্রেকফাস্ট। স্নান, বিশ্রাম। লেকচার সেশন। দুপুর ১২টায় লাঞ্চ। একটু বিশ্রামের পর ফায়ারিং প্র্যাকটিস। দিনের শেষেও আবার লেকচার। চারজন লোক আছে যাদের লেকচার দেওয়ার ডিউটি। কারও কিছু জিজ্ঞাস্য থাকলে তার জবাব দেওয়া হয়। কোনো সংশয় থাকলেও তা দূর করা হবে। এভাবেই দিন কেটে যাচ্ছে ফয়জলের। একই রুটিন। একটা ফোন করা যাবে না বাড়িতে? না। স্পষ্ট নিষেধ আছে। কারণ কোথা থেকে ফোন করা হচ্ছে তা ধরা পড়ে যাবে যদি ইন্ডিয়ান স্পাই বাহিনী ইন্টারসেপ্ট করে ফোনকল। অতএব সম্পূর্ণ যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। ১০ দিনের ট্রেনিং-এর পর একাদশতম দিনে ফয়জল আর রেজ্জাকসহ আটজন প্রথম হাতে নিয়ে দেখল একটি বহু আকাঙ্ক্ষিত বস্তু। একে ফর্টি সেভেন। পাশাপাশি টিটি রিভলবার আর পিস্তল চালানো শেখানোও শুরু হয়েছে। ফয়জল দেখা যাচ্ছে এসব ব্যাপারে এক্সপার্ট। খুব জলদি ধরে ফেলছে গোটা ব্যাপারটা। প্রশিক্ষকরা খুব খুশি। শেষ তিনদিন বোমা বানানোর কৌশল। ১৫ দিন পর ট্রেনিং শেষ। এবার লাহোর। লস্করের একটি ইভেন্ট আছে। খুব বড় ইভেন্ট। যাওয়ার আগে শেষ লেকচার। সেদিন একটি শপথ নেওয়ানো হল। ফিঁদায়ে হওয়ার। আত্মঘাতী বাহিনী। ফিদায়ে হলে শহিদ হওয়া যায়। আর সোজা বেহেস্ত পৌঁছনো সম্ভব। তাই যারাই এই পথে এসেছে তারা সোজা বেহেস্ত গিয়েছে বলে জানানো হল নতুন রিক্রুট আট যুবককে। সকলকে বিদায় জানানো হচ্ছে। একে অন্যকে জড়িয়ে ধরে সাফল্য কামনা আবার এই টিমের দেখা হবে কোথাও একটা নিশ্চয়ই। সেটা কোথায় তা কেউ জানে না।
লাহোরে লস্কর ই তৈবার অনুষ্ঠানের আয়োজন চোখ ধাঁধানো। তবে একেবারে সামনে যে লোকটি বসে আছে তার দিকেই বারংবার চোখ চলে যাচ্ছে ফয়জলের। সাড়ে ৬ ফুটের মতো লম্বা। দুর্দান্ত শারীরিক কাঠামো। এই যে যারা সবেমাত্র ট্রেনিং নিয়ে এসেছে তাদের বসানো হয়েছে একেবারে সামনের সারিতে। সেটাই নিয়ম। গোটা অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার পর আটজনকে ডাকা হল একটি পৃথক রুমে। সেখানে আগে থেকেই উপস্থিত সেই সাড়ে ৬ ফুটের মানুষটি। কে লোকটি? তার নাম আজিম চিমা! সকলের সঙ্গে হাত মেলাচ্ছে। জড়িয়ে ধরছে। ফয়জলের কাঁধে হাত রেখে প্রশংসার ভঙ্গিতে লোকটা তাকাল ফয়জলের ওয়েল বিল্ট বড়ির দিকে। দু হাত দিয়ে কাঁধটা ধরে একটা ঝাঁকুনি দিচ্ছে। আজিম চিমা বলল, আরও বেশি করে তোমাদের মতো যোদ্ধা চাই আমাদের। আরও বেশি করে এরকম ছেলেদের পাঠাও। তোমাদের গর্ব হচ্ছে না? এখন থেকে তোমরা লস্কর বাহিনীর লোক। দুনিয়ার কাউকে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। ফয়জল আনন্দে আত্মহারা। লাঞ্চের সময় সে জেনে নিয়েছে আজিম চিমা হল লস্করের কমান্ডার ইন চিফ। বড়াসাহিবের খাস লোক। কিন্তু বড়া সাহিবের সঙ্গে দেখা হবে না? ভাবছিল ফয়জল? রেজ্জাককে একবার বলেও ফেলেছে। রেজ্জাক একই কথা ভেবেছে। সেও জানতে চায় কে সেই বড়াসাহিব? যার কথা উঠলেই আরিফ কাসমানি কিংবা আবু হরক অথবা আজিম চিমা সকলেই সমীহ অথবা ভয়ে চুপ করে যায়। মুখেচোখে ফুটে ওঠে চাপা সম্ভ্রম। কিন্তু তার সঙ্গে দেখা করতে চাই একথা বলার নিয়মই নেই। তাই কিছুই বলা হচ্ছে না। এদিকে আর মাত্র দুদিন হাতে। এতদিন থাকা হল, কিছুই তো দেখা হল না সেভাবে। কারণ বাইরে যাওয়ার তেমন নিয়ম নেই। তবে আজ আর কাল দুদিন একটু ছুটি পাওয়া যাবে। লাহোরের মার্কেটে যাওয়া যায় না? একবার অন্তত। অনুমতি মিলল। সঙ্গে দেওয়া হল আকবর নামের একটি যুবককে। হাতে সময় মাত্র তিন ঘণ্টা। এই তিন ঘণ্টায় দেখে নেওয়া যেতে পারে। যাওয়া হল লাহোরের বিখ্যাত লিবার্টি মার্কেটে। একদিকে ফুড পয়েন্ট। ভাইজান আপকো লিবার্টি মার্কেটকা মশহুর সামোসা শপমে পহলে লে যাতে হ্যায়। জানাল আকবর। ফয়জল হেসে উঠল। আরে ভাইয়া আপকো পাতা ভি হ্যায় কি মুম্বইকে চেম্বুরমে সামোসা কেয়া চিজ হ্যায়? খায়েঙ্গে তো ইয়ে সব ভুল যায়েঙ্গে। দুজনেই হেসে উঠল। রেজ্জাক শুধু ফয়জলের হাতে জোরে চাপ দিল। কী ব্যাপার? বিস্মিতভাবে তাকাল ফয়জল। কানের কাছে মুখ এনে রেজ্জাক বলছে ভাই, ইন্ডিয়ার কোনো চিজের প্রশংসা এদের কাছে কোরো না। যদি ফিরে গিয়ে বলে দেয় তাহলে আমাদের মুশকিল হয়ে যাবে। ফয়জল সতর্ক হয়ে গেল। তাই তো! সে ঝোঁকের মাথায় বলে ফেলেছে। তার মানে তো সে লাহোরের সামোসার থেকে মুম্বইয়ের সামোসাকে বেশি ভালো বলে ফেলে ভারতপ্রেম দেখাচ্ছে? এটা হতে দেওয়া যাবে না। অবশেষে অনেক দরদাম করে শালওয়ার কামিজ কিনে নিলে নুরের জন্য। গোলাপি। ভালো লাগবে নুরকে এই কালারে।
ফেরার দিন সকলকে বিদায় জানাতে এসেছে আজিম চিমা। ফয়জলের হাতে কিছু বাসন, একটা জামাকাপড় ভর্তি বেডিং আর একতাড়া ইন্ডিয়ান নোট তুলে দিয়ে আরিফ কাসমানি দুটি ভিজিটিং কার্ড দিল। একটি ভিজিটিং কার্ডে দিল্লির চাঁদনি চকের দোকানের নাম ঠিকানা লেখা। আর অন্যটিতে মুম্বইয়ের আন্ধেরির ঠিকানা। নাও। এগুলো নিয়ে সোজা ওয়াঘা বর্ডার পেরোবে। আর অমৃতসর থেকে দিল্লির ট্রেন ধরে দিল্লি নামবে। এই কার্ডে যে ঠিকানা লেখা আছে সেটি সেখানে গিয়ে দেখাবে। সকলের থেকে বিদায় নিয়ে ফয়জল ফিরে গেল ইন্ডিয়া। দরিয়াগঞ্জের হোটেলে উঠে রাত কাটিয়ে পরদিন সকালেই চাঁদনি চক। সেই দোকান। আর কার্ডটি দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে লোকটি তাকে কিছুক্ষণ জরিপ করল। তারপর কোনো কথা না বলে একটা সাদা প্যাকেট দিয়ে দিল ফয়জলের হাতে। মুখে কোনো কথা নেই। শুধু খুদা হাফিজ! বাইরে এসে প্যাকেট খুলে ফয়জল আশ্চর্য! ২০ হাজার টাকার একঝাঁক কড়কড়ে নোট। টাকা রোজগার এত সহজ? শুধু লস্করের খাতায় নাম লেখালেই? কিন্তু অপারেশন কবে করা হবে? এখনও জানে না সে।
এতদিন কোথায় ছিলে?
তোমাকে তো বলেছি নুর! দিল্লিতে কাজ।
তাই বলে এত দিন?
আরে, অনেক কাজ একেবারে মিটিয়ে দিয়ে এলাম। যাতে এর মধ্যে আর যাওয়ার দরকার না হয়।
কী কাজ ওখানে?
কী কাজ আবার কী? আমার যা বিজনেস। কাপড়ের সাপ্লাই। ওটা যে কত বড় একটা মার্কেট তা তোমার জানা নেই নুর। শাদির পর একবার দিল্লিতে বেড়াতে নিয়ে যাব তোমাকে দেখো!
নুরের চোখে জল! সে কাঁদছে। কেন যেন তার মনে হচ্ছে ফয়জল আগের মতো নেই। কেমন যেন বেশি বেশি শান্ত ভাব। কেন? ফয়জল, সত্যিই কি আমাদের শাদি হবে? কবে? ফয়জল নুরের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল, হবে। একটা বড় অর্ডারের জন্য আমাকে হয়তো বাইরে যেতে হবে। ফিরে এসেই ভাবছি শাদি করে নেব।
সত্যি? নুরের চোখে আলো জ্বলে উঠেছে।
সত্যি। বলে ফয়জল নুরের হাতে হাত রাখল।
দিল্লির চাঁদনি চকের দোকানে যাওয়ার একমাস পর যেতে হবে মুম্বইয়ের সেই আন্ধেরির দোকানে। তাই গেল ফয়জল। এবং আশ্চর্য ম্যাজিক এই ভিজিটিং কার্ড। দেখালেই টাকা পাওয়া যায়। এবার কার্ড দেখিয়েই পাওয়া গেল ১ লক্ষ ৮০ হাজার টাকা। তবে এই লাস্ট ইনস্টলমেন্ট। এ বছরের মতো। কিন্তু কাজ হবে কবে? এত ব্যস্ত হওয়ার কিছু নেই। একদিন তাকে জানাল সেই আবদুল কুম্ভার। মোমিনপুরার গলিতে সেই এনজিও অফিস। আবার এসেছে লোকটি। ফয়জলকে বুঝিয়ে দেওয়া হল কী করতে হবে। পাক অধিকৃত কাশ্মীরের লেকচার সিরিজে যা কিছু শেখানো হয়েছে সেগুলি বিশ্বসযোগ্যভাবে সুন্দরভাবে বোঝানোর কাজ। তাই কখনও ফয়জলকে যেতে হচ্ছে নাসিক, কখনও মালেগাঁও, কখনও রায়গড়, কখনও বারামতী। ছোট ছোট রুমে মিটিং হয়। সেখানেই ভিডিও চালিয়ে বলতে হয় হুবহু সেইসব কথা, যা একদিন সে শুনেছে ক্যাম্পে। আরও নতুন ছেলেদের মনে জ্বলে উঠছে আগুন। চোখে জিহাদের স্বপ্ন। ২০০৫ সাল পর্যন্ত এভাবেই কাটছে। শুধু বছরে দুবার তাকে দেওয়া হয় টাকা। আর নিজের ব্যবসা তো আছেই। ২০০৫ সালের জুন। আবার পাকিস্তান যাওয়ার ডাক এল। এবারও লাহোর। ভিসা পাওয়া কোনো প্রবলেম না। যথারীতি পেয়ে গেল ফয়জল। গোটা দেশের থেকে বাছাই করা ৫০ জন যুবককে ডেকে পাঠানো হয়েছে। আলাপ করানো হবে নতুন কিছু লোকের সঙ্গে। এই লোকগুলো ইন্ডিয়ান মুজাহিদিন নামের একটা সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত। দ্বারভাঙা মডিউল তৈরি হবে। তাদের সঙ্গে বাংলাদেশের হুজিকে নিয়ে একটি সামগ্রিক টিমগেম যাতে করা যায় সেটাই হল উদ্দেশ্য। এই নতুন মডিউলে লোক লাগবে। তাই এই ৫০ জন এতদিন যাদের মগজ ধোলাই করেছে তাদের যেন এই মডিউলগুলিতে ঢুকিয়ে দেয়। ওই নতুন ছেলেরা হবে স্লিপার সেল। কাল চলে যাবে আবার ফয়জল ভারতে। দুপুর থেকেই একটা সাজো সাজো রব চলছে দেখা যাচ্ছে। কী ব্যাপার? কোনো প্রোগ্রাম আছে নাকি? আজিম চিমাও হাজির সকাল থেকেই। সকলেই তটস্থ। বাংলোর মাঝখানে একটা বড় প্রাঙ্গণ। সেখানেই ফরাস, চেয়ার পাতা হয়েছে। কোনো নতুন ইভেন্ট? মাগরিব নমাজের পরই সকলকে ডাকা হল সেই প্রাঙ্গণে। বাইরে যেন এখন কেউ না যায়। কারণ সদর দরজা বন্ধ করে দেওয়া হবে। সকলের চোখেমুখে প্রতীক্ষা আর কৌতূহল যে আজ কী এমন বিশেষ প্রোগ্রাম? ঠিক সাড়ে ৬টা নাগাদ একটা মৃদু গুঞ্জন। সাদা পাজামা। সাদা পাঞ্জাবি। কাঁধে একটা চাদর। চোখে হাই পাওয়ারের চশমা। দাড়ি আছে। চুল পাতলা হয়ে আসছে। মাথাতেও সাদা একটা পাগড়ি টাইপ পেঁচানো। আজিম চিমার সামনে লোকটি আসছে। যতক্ষণ না সে নিজের চেয়ারে বসেছে ততক্ষণ কেউ বসছে না। সকলে উঠে দাঁড়িয়েছে আগেই। দেখাদেখি ফয়জলও উঠে দাঁড়িয়েছে। লোকটি বসেই সকলকে স্বাগত জানিয়ে বলল, ভাইসব আপনারা সকলেই খুব ভালো কাজ করছেন। এভাবেই কাজ করতে হবে। মনে রাখবেন আমাদের একটাই টার্গেট ইন্ডিয়ার বরবাদি! সেটা আমরা করতে পেরেছি অনেকটাই। আরও এগোচ্ছি। মিনিট দশেকের এক ছোট ভাষণ দিল লোকটি। তারপর এগিয়ে এসে সকলের সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে কথা বলে হাত জড়িয়ে অভিনন্দন, শুভেচ্ছা জানাল। ফয়জলকে দেখিয়ে আজিম চিমা বলল, এই যে এর কথা বলেছিলাম। একে দিয়ে হবে ওই কাজটা। থমকে গেল লোকটি। ফয়জলকে বলল আমার সঙ্গে এসো। ঠিক পাশের একটি ছোট ঘর। সেখানে তিনজন। ফয়জল, আজিম চিমা আর সেই লোকটি। লোকটি এক দৃষ্টিতে ফয়জলের দিকে তাকিয়ে বলল, শোনো ভাই এতদিন পর তোমার একটা কাজ করার সময় এসেছে। তোমার জন্য আমরা করেছি একটা বিগ প্ল্যান! ইন্ডিয়ার জন্যও এটা একটা বিগ প্ল্যান। এই কাজ তোমাকে নির্ভুলভাবে করতে হবে। কাজটা মুম্বইতে। তবে তার আগে আর একটা জায়গায় তোমায় যেতে হবে। চিমা বাতা দো উসকো। বলে বেরিয়ে গেল লোকটি। ফয়জল হতচকিত। সে বুঝতে পারছে না। লোকটি কে? কী তার প্ল্যান? চিমা ধীরে সুস্থে বলল, এই হল আমাদের বড়াসাহিব। নাম হাফিজ সইদ!!
এই নাও। এখানে যাবে তুমি। বলে একটা খাম হাতে ধরিয়ে দিয়েছে চিমা। সবাই চলে যাওয়ার পর ফয়জল ডরমিটরিতে এসে খামটা খুলেছে। আশ্চর্য! একটা ট্রেনের টিকিট! মুম্বই সেন্ট্রাল থেকে হাওড়া! সঙ্গে একটা ঠিকানা…জায়গাটার নাম স্বরূপনগর। কলকাতা যেতে হবে? কেন?
কিছু একটা ভুল হচ্ছে। এটা আবার কার নামে টিকিট কাটা? মুম্বই থেকে হাওড়া গীতাঞ্জলি এক্সপ্রেসের টিকিটে যাত্রীর নাম লেখা সমীর শর্মা। ফয়জল আগে খেয়াল করেনি। অথচ তাকে যেতে বলা হয়েছে। তার নাম তো ফয়জল আত উর রহমান শেখ। তাহলে এই টিকিট কার? এখন তো চেঞ্জ করতে ফেরাও যাবে না আবার লাহোর! অনেক দেরি হয়ে গিয়েছে! একটু পরই আটারি স্টেশনে ঢুকবে ট্রেন। তারপর দিল্লি। যে কোনো সময় ইন্টারন্যাশনাল ফোন করাও যাবে না। তাহলে উপায়? এরকম বাজে টাইপের ভুলও এরকম একটা নামজাদা গ্রুপ করে নাকি? চূড়ান্ত ক্যালাস ব্যাপার স্যাপার। ফয়জল বিরক্ত হল মনে মনে। এখন কী করবে সে? সেই বিরক্তি চেপেই পুণেতে ফিরে এল। পরদিন সকাল। তখনও ঘুম ভাঙেনি। মোটরবাইকের হর্ন। বারবার। কেউ ডাকতে এসেছে। বাইরে বেরিয়ে দেখা গেল রিজওয়ান। কী ব্যাপার? আবদুল ভাই আজ বিকেলে আসবে। তোমাকে যেতে বলেছে। জরুরি। বলেই বাইকে স্টার্ট। বিকেলে মোমিনপুরার সরু গলির অফিসে গিয়ে দেখা গেল আগে থেকেই বসে আছে সেখানে আবদুল কুম্ভার। তাকে দেখেই হাসল। আর বলল আরে আও মেরে শের। এই নাও তোমার আইডি। আইডি? কীসের? আবার অবাক ফয়জল। একটা ফোটো আইডি কার্ড। তার তো আছে। ভোটার কার্ড। এটা আবার কেন? সেই নতুন ভোটার কার্ডে চোখ পড়তে চমকে উঠল ফয়জল। তার ছবি। অথচ নামের জায়গায় লেখা আছে সমীর শর্মা। ঠিকানা বান্দ্রা, মুম্বই। এটা কী ব্যাপার হল? আবদুল কুম্ভার বলল, তোমাকে চিমা ভাই কলকাত্তার যে টিকিট দিয়েছে সেখানে কী নাম আছে? ফয়জল বলল, সমীর কিন্তু সে তো বুঝলাম। এসবের মানে কী তা বুঝছি না। আবদুল কুম্ভার ফয়জলের কাঁধে হাত রখে বলল, তোমায় এখান থেকে চলে যেতে হবে। মুম্বই। সেখানেই থাকবে। আর তোমার নতুন নাম হবে সমীর শর্মা। বাকি কাজ মুম্বই গেলেই বুঝতে পারবে। আচ্ছা ভাইজান…ফয়জল উজ্জ্বল মুখে বলল। কারণ তার মনে হচ্ছে জীবনে এতদিন পর একটা দারুণ কিছু চ্যালেঞ্জ আসতে চলেছে। মুম্বই..কতদিনের শখ ওই শহরে একা থাকার। তুমি চলে যাবে?
চলে যাব আবার কী? প্রতি সপ্তাহেই তো আসব। ওখানে কাজটা অনেক বড়। তার মানে যখন তখন আর দেখা হবে না, তাই না?
আরে এত চিন্তা করছ কেন? আমাদের আসল চিন্তা কোনটা? যত তাড়াতাড়ি একটা বড় বিজনেস করে ফেলা তাই তো? তারপর শাদি!
নুর মুখ নামিয়ে আছে। এই কথার উত্তর দিল না।
ফয়জল বলছে, এরকম করলে কিন্তু আমি এখানেই থেকে যাব। আর ওরকমই দোকানে দোকানে মাল সাপ্লাইয়ের কাজ। তোমার আব্বু শাদি দেবেই না এরকম ছেলের সঙ্গে। তাই না?
নুর এবার মুখ তুলছে। হ্যাঁ। এটা ঠিক। যাক, যেখানেই হোক যাক ফয়জল। অন্তত আয় করুক ভালোভাবে। তাহলে আর চিন্তা নেই। শাদিতে না করতে পারবে না আব্বু। ভাবছিল নুর। মুখে হাসি এনে বলল, একটা কথা। প্রতি শনিবার কিন্তু আসতে হবে।
ফয়জলের একটা ভার নেমে গেল বুক থেকে। হাসতে হাসতে বলল, তুমি না চাইলেও আসব। এই মুখটা দেখতে হবে না? নুর ভালো লাগা আর লজ্জায় একটু কেঁপে উঠল।
বান্দ্রার কার্টার রোডের কাছাকাছি একটা ছোট ঘর নিয়ে ফয়জল থাকতে শুরু করেছে। জায়গাটার নাম পেরি ক্রস রোড। লাকি ভিলা। এখানে তার নাম ফয়জল নয়। সমীর। সমীর শর্মা। একমাস পর ট্রেন। গীতাঞ্জলি এক্সপ্রেস। এসি থ্রি টায়ার। বি থ্রি ৩৪। বার্থ নম্বর। ঠিক আগের দিন আবার রিজওয়ান এসেছিল। বলে দিয়েছে হাওড়া স্টেশনে থাকবে একজন লোক। সেই লোকটিকে এটা দিয়ে দিও। সেটি একটা সাদা খাম। ভিতরে লেখা আসলাম, লড়কে কো দেখলে না। আর কিছু না। হাওড়া স্টেশনে নেমে যে কোনো কাউকে জিজ্ঞাসা করতে হবে বড় ঘড়িটা কোথায়। সেইমতোই যথারীতি হাওড়া স্টেশনে পৌঁছল ফয়জল। সাড়ে পাঁচ ফুটেরও কম হাইটের একটা লোক দাঁড়িয়ে। তাকে দেখে হাত নাড়ছে। দেখা হতেই একে অন্যের সঙ্গে হাত মেলানোর পরই সাদা খাম তাকে দিল ফয়জল। একটি লাইন অনেকক্ষণ সময় লাগল পড়তে। কিন্তু সেই লাইনটা নয়, খামের একেবারে প্রান্তে একটা স্ট্যাম্প ভালো করে চোখের কাছে এনে পড়ছিল লোকটা। আর তারপরই হাসি ফুটল মুখে। কীসের স্ট্যাম্প? খেয়াল করেনি ফয়জল। তার মানে ওটাই কোড ছিল। লোকটির নাম আসলাম। হাওড়া স্টেশন থেকে একটা ট্যাক্সি ধরে শিয়ালদহ স্টেশন। সেখান থেকে লোকাল ট্রেন। লোকাল ট্রেন মুম্বইতেই বেশি চলে এরকমই জানা ছিল ফয়জলের। কিন্তু বাংলায়ও যে চলে আর এত ভিড় হয় জানত না। ট্রেনের নাম হাসনাবাদ প্যাসেঞ্জার। প্রায় দেড় ঘণ্টা পর একটা জায়গায় নামা হল। এখান থেকে যেতে হবে ট্রেকারে। ততক্ষণে সাইনবোর্ডে দেখা হয়ে গিয়েছে জায়গার নাম। তাহলে এটাই স্বরূপনগর? এই ঠিকানাই দেওয়া হয়েছিল। আসলামের বাড়িতে উঠেছে ফয়জল। বাড়িতে অবশ্য একটি কিশোর ছাড়া কেউ নেই। বাড়ির কাজ করে দেয়। আসলামের আসল বাড়ি অন্য জায়গায়। হিঙ্গলগঞ্জ। আজ বিকেলে দুজন আসবে। অতএব অপেক্ষা। ফিটফাট পোশাক। মুখ ক্লিন শেভ। বয়স ৩৫ এর মধ্যেই দুজনের। এরা এসেছে বর্ডার পেরিয়ে। হুজি মেম্বার। একটা ২০ মিনিটের মিটিং হল। এই দুজনের মধ্যে যে কোনো একজন যাবে মুম্বই। তার আগে ফয়জলের সঙ্গে মোলাকাত হওয়া দরকার। যাতে চিনতে অসুবিধা না হয়। তাকে বলা হল অপারেশনের পর এই পথেই ফয়জলকে বাংলাদেশে ঢুকে যেতে হবে। তাই গোটা যাত্রাপথ আর বর্ডারের চেইনটা তার জেনে নেওয়া দরকার। কী অপারেশন? এখনও সেটা ফয়জলই জানে না। অথচ এরা জানে। ঘোজাডাঙা সীমান্ত থেকে ৩ কিলোমিটার দূরে একটা ধানকলের সামনে আসা হল। হাতবদল হল একটা ব্যাগ। ওই লোকদুটি সঙ্গে করে এনেছিল। তারপর একটা মোটরবাইক এসে দাঁড়ানোর পর তারা সেই বাইকে চেপে বসে চলে গেল কোথাও একটা। ব্যাগ এখন খোলা যাবে না। আজ রাতের ট্রেন। মুম্বই ফেরার। এবার মুম্বই মেল। ফিরে এল ফয়জল সেই ব্যাগটি হাতে নিয়ে। ব্যাগে ছিল তিনটি প্যাকেট। জিলেটিন স্টিক। দুটি সস্তা মোবাইল ফোন। অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট। ছোট প্যাকেটে সামান্য আরডিএক্স। আর চারপাতার কাগজ। সেখানে লেখা আছে একটু ডিজেল লাগবে। তাহলে কমপ্লিট। কীভাবে কোন কোন জিনিস কতটা পরিমাণ মেশাতে হবে সব ওই কাগজে লেখা। তবে এটা ডেমো। আসল জিনিস নিয়ে চিন্তা করতে হবে না। পাঠানো হবে যথাসময়ে। বান্দ্রার অভিজাত লোকালিটি পেরি ক্রস রোডের লাকি ভিলায় পুণের মোমিনপুরার এক গলি থেকে আসা একটি ২৪ বছরের ছেলে গভীর নিমগ্নতায় ঢুকে পড়ল বিস্ফোরক তৈরি শিখতে। ফরমুলাটি মুখস্ত করাই তার ডিউটি। আর সম্পূর্ণ আয়ত্ত হলে একটা টেস্ট করতে হবে। তার জন্য যাওয়া হয়েছিল লোনাভালায়। এসব ব্যাপারে ফয়জল ভালো ছাত্র। টেস্ট সফল। কেঁপে উঠেছিল লোনাভালা যাওয়ার পথের থেকে দূরে এক আধা জংলি এলাকা। বিস্ফোরণে। সেটা তো রিহারসাল ছিল! ফাইনাল টার্গেট তাহলে কী?
টাইম আ গয়া। তৈয়ার হো যাও। বলল যে ছেলেটি সেই চোখেমুখে সবথেকে শার্প। নাম আসিফ বশির খান ওরফে জুনেইদ। স্টুডেন্টস ইসলামিক মুভমেন্ট অফ ইন্ডিয়ার (সিমি) জলগাঁও ইউনিটের এক্স প্রেসিডেন্ট। প্রাক্তন। কারণ ততদিনে সিমিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। আসিফ সিভিল ইঞ্জিনিয়ার। ৯০ হাজার টাকা মাসের বেতন। তার পাশেই বসা লোকটির নাম ইতজিয়াম সিদ্দিকি। সকলে তার নাম দিয়েছে আরটিআই ম্যান। সরকারের যাবতীয় তথ্য জানার জন্য সিদ্দিকির শখ হল নিরন্তর আরটিআই অ্যাপ্লিকেশন ফাইল করা। সিদ্দিকির পিছনে তনভির আনসারি। ইউনানি ডাক্তার। এম এইচ সাবু সিদ্দিকি মেটারনিটি অ্যান্ড জেনারেল হসপিটালের ইউনানি বিভাগের হেড। ২০০৪ সালে পাকিস্তানের ট্রেনিং ক্যাম্পে সে প্রশিক্ষণ নিয়ে এসেছে। চতুর্থ লোকটির পরিচয় সুহেল মহম্মদ শেখ। পুণের। যাকে আমরা আগেই দেখেছি ফয়জলের সঙ্গে। দাঁড়িয়ে আছে আর মুখচোখে কিছুটা ভয় লেগে। সে হল জামির লতিফুর রহমান শেখ। এসবের মধ্যেই একেবারে পিছনে জড়সড় হয়ে সবথেকে কম বয়সি এক তরুণ। মাঝেমাঝেই যে ফয়জলের দিকে আড়চোখে তাকাচ্ছে। মুজাম্মেল। ফয়জলের নিজের ছোট ভাই।
বান্দ্রা, ২০০৬, এপ্রিল। ৬ জন বসে আছে ফয়জলের ফ্ল্যাটের বাইরের ঘরে। জরুরি মিটিং। ওই আসিফ ডেকেছে। বিষয় কী? এখনও কেউ জানে না। আসিফ প্রথম নীরবতা ভঙ্গ করল। টাইম আ গয়া..তৈয়ার হো যাও। আমাদের একটাই টার্গেট। ম্যাক্সিমাম ড্যামেজ৷ কীভাবে সেটা সম্ভব সেরকম কোনো টার্গেট খোঁজা হোক। তোমরা সকলেই ভাবতে শুরু করো। আসিফের কথা শুনে সকলেই উত্তেজিত। সকলেই একটি একটি করে নাম বলতে শুরু করল। কেউ বলল সিনেমা হল…কেউ বলল সরকারি ভবন…কেউ বলল শপিং কমপ্লেক্স। তবে কোন এলাকায় করা হবে? স্বাভাবিকভাবেই এই খেলার নিয়ম হল যতটা বেশি সম্ভব অভিঘাত পড়বে আর প্রচার হবে। সেদিক থেকে কোনো গ্রাম কিংবা মফস্বলে হলে অতটা প্রচার হয় না। অতএব নিশ্চিতভাবেই মুম্বই শহরে করতে হবে। ঠিক যেমন ১৯৯৩ সালের ১২ মার্চ হয়েছিল। এবার হবে দ্বিতীয় ব্লাস্ট। নাম উঠল দালাল স্ট্রিটের বম্বে স্টক এক্সচেঞ্জ, কাফে প্যারেডে ডব্লু টি সি বিল্ডিং, প্রভাদেবীতে সিদ্ধি বিনায়ক মন্দির, হাজি আলির কাছে মহালক্ষ্মী টেম্পল। আর এই তালিকা তৈরির পাশাপাশি লেখা হল দুটি সবথেকে বড় শপিং আর্কেডের নাম। লোয়ার প্যারেলের হাই স্ট্রিট ফিনিক্স আর গোরেগাঁওতে ইনঅরবিট মল৷ এই সব জায়গাগুলো সবথেকে ভালো চিনবে একজনই। জামির। কারণ সে ট্যাক্সি ড্রাইভার। তার সঙ্গে ফয়জল আর সুহেল যাবে প্রথমে আইডেন্টিফাই করতে। তারপর ঠিক হবে কীভাবে এবং কবে অপারেশন। তার আগে প্ল্যান চক আউট করে পাঠাতে হবে লাহোর। সেখান থেকে সবুজ সংকেত এলেই প্রস্তুতি শুরু। মোটামুটি আলোচনা যখন শেষের পথে, আচমকা ফয়জলের ফ্ল্যাটের দরজায় টোকা পড়ল। একবার…দুবার…তিনবার। কেউ যেন বেশি অধৈর্য। কে এই সময়? এখানে কেউই বিশেষ আসা-যাওয়া করে না। কারণ ফয়জল এখানে সেভাবে মেশে না। সকলেই সতর্ক। এক লাফে আসিফ আর সিদ্দিকি চলে গেল বাথরুম আর কিচেনে। ফয়জল দ্বিধা নিয়ে উঠল। দরজাটা অর্ধেক খুলে মুখ বাড়াল এবং স্বস্তির শ্বাস। বাইরে দাঁড়িয়ে আছে মহম্মদ আলম কুরেশি। মুম্বই আসার পর এই একমাত্র ফয়জলের বেস্ট ফ্রেন্ড। মীরা রোডের জামাকাপড়ের খুচরো ব্যবসা। ফয়জল এর সঙ্গেই জামাকাপড় কিনে নিয়ে যেত পুণে। এখনও যায়। তাদের দুজনের একটাই শখ। চেম্বুরের ডিসকভারি ডান্স বারে মাঝেমাঝে সন্ধ্যার পর যাওয়া। ওখানে তন্দুরি চিকেন ফার্স্ট ক্লাস। আর সোনম নামের এক ডান্সারের নাচ দেখতে খুব ভালো লাগে। সুতরাং কুরেশিকে নিয়ে ভয়ের কিছু নেই। জানাল ফয়জল। সকলেই আশ্বস্ত। তবু আসিফ সন্দেহপ্রবণ। বাইরের কাউকে সে বিশ্বাস করে না। সে তাই গোটা মিটিং-এর পর টেবিলে হাত রেখে সকলকে বলল আল্লাহর নামে হাতে হাত রাখো, আর শপথ নাও আজ এখানে যা আলোচনা হয়েছে তা বাইরের কাউকে কখনও বলব না…আজ যা সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে তা জান কবুল করেও শেষ করেই ছাড়ব। সকলেই গোল হয়ে দাঁড়াল। হাত রাখল একে অন্যের হাতে। একজন বাদে। সদ্য আগত কুরেশি। সে জানাল আমি তো জানিই না কী আলোচনা হয়েছে, তোমরা কী করার কথা বলছ.. আমি কেন আল্লাহর নামে শপথ করতে যাব? আমি নেই। আসিফ শীতল চোখে তাকিয়ে রইল কুরেশির দিকে। কুরেশিও।
পরদিন সকাল। প্রথমেই যাওয়া হল দালাল স্ট্রিট। বিএসই। স্টক এক্সচেঞ্জ। অসম্ভব। সেই ১৯৯৩ সালের ব্লাস্টের পর এতদিন পরও গোটা স্টক এক্সচেঞ্জ গিজগিজ করছে সিকিউরিটি। এখানে ট্রাই করা মানে আত্মহত্যা। সুতরাং ক্যান্সেল। এরপর ডব্লটিসি বিল্ডিং। সপুরজি পালানজির এই বিপুল উচ্চতার ভবনটি একটা সময় পর্যন্ত ছিল গোটা বম্বের সর্বোচ্চ। পরে অবশ্য সেই সম্মান আর থাকেনি। কিন্তু না। এখানেও ভয়ংকর কড়াকড়ি। নিরাপত্তা টপকানো যাবে না। এভাবে একের পর এক টার্গেট বাতিল হচ্ছে। আর ফয়জলদের মধ্যে ঢুকছে হতাশা। ১৯৮০ সাল পর্যন্ত প্রভাদেবীর সিদ্ধি বিনায়ক মন্দিরের ভিড় ছিল সাধারণ। সেভাবে বিপুল ভক্তের চাপে মন্দিরে সর্বক্ষণ ভিড় এমন কিছু ছিল না। গোটা চিত্রটা বদলে গেল এক সুপারস্টার ১৯৮৩ সালে ‘কুলি’ নামের সিনেমার শুটিং চলাকালীন আশঙ্কাজনকভাবে আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর। অমিতাভ বচ্চনের দ্রুত আরোগ্য কামনায় সিদ্ধি বিনায়ক মন্দিরে নিয়মিত আসতে শুরু করেন জয়া বচ্চন। তিনি আকুল হয়ে প্রার্থনা করতেন। এবং অবশেষে যখন সত্যিই অমিতাভ বচ্চন সুস্থ হয়ে ফিরে এলেন, তিনি সপরিবারে সিদ্ধি বিনায়ক মন্দিরে এসে গণপতির মূর্তিতে একটি আস্ত সোনার মুকুট পরিয়ে দিয়েছিলেন। তারপর থেকেই এই মন্দিরের খ্যাতি আকাশ ছুঁতে শুরু করে। এবং মুম্বইয়ের একটি অলিখিত নিয়মই হয়ে যায় ধনী দরিদ্র যাই হোক, কোনো শুভ কার্যের আগে ও পরে এই মন্দিরে এসে আশীর্বাদ প্রার্থনা করেন সকলেই। এবং পাল্লা দিয়ে বেড়ে গেল জনপ্রিয়তা সিদ্ধি বিনায়ক টেম্পলের। ২০০৫ সালের মধ্যে মন্দিরের ট্রাস্টির পক্ষ থেকে সাড়ে ৫ কোটি টাকা খরচ করে অত্যাধুনিক ক্লোজ সার্কিট টিভি, ডোর ফ্রেম মেটাল ডিটেক্টর লাগানো হয়। আর তার সঙ্গেই মুম্বই পুলিশের বিশেষ সিকিউরিটি কর্ডন। সুতরাং এখানেও বিস্ফোরক নিয়ে এসে সেটাকে ফিট করার কথা চিন্তা করাই বাতুলতা। তাহলে? হতাশ গোটা টিম। নতুন করে ভাবতে হবে কী করা যায়। সারাদিন ঘোরাঘুরি। সেভাবে খাওয়াই হয়নি উত্তেজনায়। অতএব জামিরকে বলা হল, চলো বান্দ্রা। আগামীকাল আবার বেরব। ভেবে দেখতে হবে নতুন কিছু টার্গেটের কথা। আগে থেকেই কথা হয়ে রয়েছে সন্ধ্যায় বান্দ্রা স্টেশনে সকলে চলে আসবে। মিট করা হবে আজকের রিভিউ নিয়ে। কিছুক্ষণের মধ্যে সকলে চলে এসেছে। বান্দ্রা স্টেশনের ফাঁকা ডাউন প্ল্যাটফর্মে বসে। সিদ্দিকি একটা সিগারেট ধরাল। সঙ্গে সঙ্গে তাকে সতর্ক করল জামির। ভাইজান আজকাল পুলিশ ধরে স্টেশনে সিগারেট খেলে। সিদ্দিকি অগ্রাহ্য করল তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে। ধুস! কোথায় পুলিশ এখন? কাউকে দেখতে পাচ্ছো। ছাড়ো তো! সকলে কমবেশি হেসে উঠল। হাসল না আসিফ। তার চোখে আলো জ্বলে উঠল। তাই তো! পাগলের মতো অন্য টার্গেট খুঁজতে হবে কেন? এই তো আসল টার্গেট চোখের সামনে। কোনো সিকিউরিটিই নেই। এখানেই তো পারফেক্টলি কাজ করা যায়! মুম্বই লোকাল ট্রেনের ওয়েস্টার্ন, সেন্ট্রাল আর হারবার রুট! এর থেকে ম্যাক্সিমাম ড্যামেজ আর কী হবে? আসিফ প্ল্যান বলতেই সকলেই লাফিয়ে উঠল। দুর্দান্ত আইডিয়া! সুতরাং ট্রেন ব্লাস্ট হোক!
ম্যায় আপনে দশ বড়া আদমি অউর আরডিএক্স দোনো ভেজ রাহা হুঁ। এই মেসেজ পেল ফয়জল। পাকিস্তান থেকে। তার মানে এখানে তারা যে ৬ জন আছে তাদের উপর পুরোপুরি দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে না? পাকিস্তান থেকে লোক আসবে? আর তাদের বলা হচ্ছে বড়া আদমি? মানে এখানে তারা যারা আছে তারা ছোটা? ফয়জলের একটু রাগ হল। কিন্তু চিমা ভাই নিশ্চয়ই বুঝেশুনে ডিসিশন নিয়েছে। পরের নির্দেশের জন্য অতএব অপেক্ষা করা ছাড়া উপায় নেই। চারজন আসবে আগে। তারপর বাকিরা। মুম্বই সেন্ট্রাল স্টেশনে সকাল ১১টা। হায়দরাবাদের ট্রেন থেকে যে নেমেই হাত নাড়াল তাকে দেখে চমকে উঠল ফয়জল। এ তো সেই ছেলেটা! যার সঙ্গে ট্রেনিং এ দেখা হয়েছিল। সেই যে কোড নেম খিদমদ! অর্থাৎ সেই রেজ্জাক। লস্করের প্ল্যান তাহলে মারাত্মক ক্যালকুলেটিভ! রেজ্জাকের সঙ্গে আরও দুজন। সেলিম আর আবু উমেদ। দ্বিতীয় টিমটি এল বাংলাদেশ রুটে। তাদের মধ্যে আবার একটি লোকের নাম কামাল আনসারি। সে পাকিস্তানী নয়। বিহারের মধুবনীর। নেপালে তার নেটওয়ার্ক দুর্দান্ত। তাই তাকে দলে নেওয়া হয়েছে। কারণ আরডিএক্স প্রথমে পাঠানো হয়েছে নেপালে। কাঠমান্ডু থেকে এই কামাল নিয়ে এসেছে আরডিএক্স। হাফ কেজি। এই পাকিস্তানীদের কোথায় রাখা হবে? যোগেশ্বরীর পানের দোকানি সাজিদের বাড়িতে। বাড়ি মীরা রোড। আবাসনের নাম পরভীন অ্যাপার্টমেন্ট। এই পাকিস্তানীরা কোথা থেকে এসেছিল? বাংলাদেশ থেকে। রুট কী? দুজন এসেছিল পশ্চিমবঙ্গের উত্তর ২৪ পরগনার বনগাঁ হয়ে। আর তিনজন বসিরহাট হয়ে। তাদের আনার দায়িত্বে ছিল সেই আসলাম। আর গোটা অপারেশনের নেপথ্যে মধ্য কলকাতার এক জুতোর দোকানের মালিক। মহম্মদ মাজিদ শফি। ভারতের যে কোনো বিস্ফোরণ ঘটিয়ে সন্ত্রাসবাদীরা বাংলাদেশ বর্ডার পেরিয়ে ওপারে চলে যায়। আর সেই ব্যবস্থা করে দেয় এই শফি। ফয়জল যখন স্বরূপনগরে এসেছিল তখনও আসলামের মাধ্যমে যাবতীয় নেটওয়ার্ক ঠিক করে দিয়েছিল এই ব্যবসায়ী। যাকে বাইরে থেকে দেখে কখনও কেউ বুঝতেই পারেনি। সে ছিল নিছক এক কলকাতার জুতোর দোকানি।
৮ জুলাই। গোবান্দি বাই লেন। মহম্মদ আলির স্টোররুম। আটটি ব্যাগ রাখা আছে। রেক্সিনের। সাতদিন আগে আসিফ ডেলিভারি দিয়েছে। ব্যাগগুলির মধ্যে আছে, অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট, ডিটোনেটর, মোবাইল ফোন, ঘড়ি। সুহেল আর ফয়জল একসঙ্গে বসে আরডিএক্স আর ডিজেল মিক্স করল। সার্কিট আর তার লাগাল সাজিদ। সব কাজ হল না। পরদিনও কেটে গেল। আটটা রেক্সিন ব্যাগ ভর্তি আরডিএক্স এবার রেডি। সব ব্যাগগুলো নিয়ে যাওয়া হল ফয়জলের বাড়িতে। ১১ জুলাই। ঠিক দুপুর আড়াইটের সময় সকলে এসে গেল ফয়জলের ফ্ল্যাটে। সকলকে আগে থেকেই লাহোর থেকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল যে, কেউ নিজেদের মোবাইল ফোন ক্যারি না করে। তাই সকলেই যে যার আস্তানায় রেখে এসেছে। পাকিস্তানীদের কাছে কোনো ফোন ছিল না। পাকিস্তানী যুবক আম্মু জান সবার আগে দুটো ব্যাগ তুলে নিল হাতে। খুদা হাফিজ! বলে বেরিয়ে গেল সে। সাড়ে তিনটে। তার সঙ্গে থাকবে সিদ্দিকি। ট্যাক্সি নেওয়া হল। যাবে চার্চগেট। চার্চগেটে নেমে সাবওয়ে। প্ল্যাটফর্মে উঠেই সামনে দেখা গেল একটি ট্রেন দাঁড়িয়ে। কিছুক্ষণ অপেক্ষা। তারপর সিদ্দিকি একজন ছুটন্ত যাত্রীকে থামিয়ে জিজ্ঞাসা করল, ভাইয়া পাঁচ উনিশ কা ভিরার লোকাল? ওই যে..এই প্ল্যাটফর্মে আসবে.. জানাল সেই যাত্রী। ওই যাত্রীও সেই ট্রেনেই উঠবে। সেকথা ভেবে হাসল সিদ্দিকি। দুজনে উঠে পড়ল ট্রেনে। এখনও ভিড় নেই। তবে ব্যাগ দুটো বাংকে ধরানো যাবে না। যদি পড়ে যায়। টাইমার আছে। তাই দুজনে একবার চোখাচোখি করে ঠিক করা হল সিটের নীচে রাখা হবে। রেখেই দুজনে বেরিয়ে এল সামনে। পরের স্টেশনে নামতে হবে। ততক্ষণে ভিড় বাড়তে শুরু করেছে। যে সিটের নীচে রাখা হয়েছে ব্যাগ দুটো সেখানেও যাত্রীরা বসে গিয়েছে। সিদ্দিকির রাখা ব্যাগটির সিটে এসে বসেছে একটি অল্প বয়সি ছেলে। স্কুলে বা কলেজে পড়ে।
ফয়জলও চার্চগেটেই এসেছে। তার সঙ্গে কেউ নেই। একা। ফয়জল উঠেছে বোরিভিলি স্লো ট্রেনে। ফার্স্ট ক্লাস কামরায়। আসিফ আর সাবির অবশ্য একটা রিস্ক নিয়েছে। ভিরার ফাস্ট ট্রেনে তাদের ডিউটি। কিন্তু ফাঁকা দেখে প্রথমেই কামরার বাংকে তুলে দিয়েছে দুটো ব্যাগ। যখন মনে হল নীচে নামিয়ে রাখা উচিত, ততক্ষণে বাংক ভরে গিয়েছে ঠাসাঠাসি ব্যাগে। আর যাত্রীরাও বসে গিয়েছে। আসিফ টেনশনে। কারণ তার নিজের উপরই রাগ হচ্ছে। চার্চগেট স্টেশনে ট্যাক্সি থেকে নামার পর সে ট্যাক্সি চালককে ৫০০ টাকার নোট দিয়েছে। অথচ চেঞ্জ নেই ট্যাক্সি চালকের কাছে। সে কোনো কথা না বলেই চেঞ্জ না নিয়েই চলে এসেছিল। ১৮০ টাকা ভাড়া হয়েছে। এটা তো আশাতীত, আর বিশ্বাসযোগ্য নয়। ট্যাক্সিচালক সন্দেহ করতে পারে। এতটা ভুল কেন করল? আগে থেকে পকেটে খুচরো টাকা রাখা উচিত ছিল। কামাল আর সেলিম উঠেছিল পাঁচটা সাতান্নর ভিরার ফাস্ট লোকালে। সঙ্গে হাফিজউদ্দিন আর আসলাম। আসলাম আগেই চলে এসেছে। কারণ পরদিন এই পাকিস্তানীদের নিয়ে যেতে হবে ফের কলকাতা হয়ে বাংলাদেশ বর্ডার। ব্যাগ রেখে তাদের নেমে যাওয়ার কথা। সবই প্ল্যানমাফিক এগোচ্ছে। চার্চ গেট থেকে ট্রেন ছাড়ল। সময়মতো। দাদর স্টেশনে নামতে হবে। টাইমার দেওয়া আছে। কামাল, হাফিজ আর আসলাম দাদর স্টেশন আসতেই জলদি নেমে গেল প্রায় চলন্ত ট্রেন থেকে। কিন্তু দাদর স্টেশন থেকে যে এরকম হুড়মুড় করে যাত্রী উঠতে শুরু করবে, আর নামার সুযোগই পাওয়া যাবে না পিছনে থাকলে, সেটা কল্পনাই করেনি একজন। সেলিম। সেলিম নামতে পারল না। ট্রেন ছেড়ে দিল। কামাল সেদিকে তাকিয়ে মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়ল।
বিকেল ৫টা ৩৫। মোটরম্যান শচীনকুমার সিং গার্ডের কেবিনে ঢুকলেন। কেবিনের মধ্যে দুটো হুক আছে। হ্যাঙ্গারও। কোট ঝোলানোর জন্য। সেখানেই ব্লেজারটা ঝুলিয়ে দিলেন শচীনকুমার সিং। ৫টা ৫৭ মিনিটের ভিরার ফাস্ট লোকালের চালক। ৩০ সেকেন্ড বাকি আছে। এখন হর্ন দেওয়া নিয়ম। যাতে যাত্রীরা অ্যালার্ট হয়ে যায়। সময় মতো ট্রেন ছাড়ল। দাদর স্টেশন। ৬ টা ২২ মিনিট। যাক। একেবারে টাইম মেনটেইন করা যাচ্ছে। দাদর স্টেশন থেকেও ট্রেন ছেড়ে দিল। সিং একটু রিলাক্সড। এবার মাতুঙ্গা আসবে। দু মিনিট বাকি। ঠিক তখনই, মোটরম্যান শচীনকুমার সিং এক ধাক্কায় ছিটকে পড়ে গেলেন কেবিনে। কান ফাটানো কিছু শব্দ । চোখেমুখে অন্ধকার। কী ব্যাপার! ভূমিকম্প নাকি! শচীনকুমার সিং ধাতস্থ হয়ে দরজা খুলে বাইরে তাকালেন। গোটা ট্রেন আর চারপাশ ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন। লাইনের উপর ছিটকে আছে মানুষের মাংস। ট্রেনের গায়ে ছিটকে লেগেছে রক্ত। চারদিকে কান্না আর হাহাকারের রোল। শচীনকুমার সিং জানেনই না, এই প্রথম নয়। মাত্র এক মিনিট আগেই মাহিম রেলস্টেশনের কাছে বিস্ফোরণ হয়েছে বোরিভিলি ফাস্ট ট্রেনে। ভায়েন্দার আর মীরা রোডের মধ্যে আবার একটি ট্রেনে বিস্ফোরণ ঘটল। ছটা পঁচিশে খার সাবওয়ে আসার আগেই একটি ট্রেনে বিস্ফোরণ। সপ্তম বিস্ফোরণটি হল সাড়ে ৬টায়। বোরিভি রেলস্টেশনেই। লস্কর ই তৈবার আজিম চিমা আর হাফিজ সঈদ চেয়েছিল ম্যাক্সিমাম ড্যামেজ। ফয়জলরা পেরেছে। ১৯০ জনের মৃত্যু, ৯৮০ জন আহত, ৪৫ জন চিরতরে অন্ধ, ১৬৭ জন চিরতরে পঙ্গু।
অ্যান্টি টেররিস্ট স্কোয়াডের ইনস্পেক্টর ভীমদেব রাঠোর মুম্বইয়ের সিওন হাসপাতালের মর্গের সামনে দাঁড়ানো। ব্লাস্টের পর চারদিন কেটে গিয়েছে। রাঠোর সিনিয়র পুলিশ ইনস্পেক্টর মুম্বই সেন্ট্রাল রেলওয়ে। মাতুঙ্গা ব্লাস্টের ইনভেস্টিগেশন অফিসার। সিওন হাসপাতালের মর্গে থাকা এই বড়ির কোনো ক্লেইম করার লোক নেই। কে লোকটা? কেন কেউ আসেনি? ডেডবডির পোস্ট মর্টেমের পর গায়ে ট্যাগ লাগানো আনআইডেন্টিফায়েড। চোয়াল উড়ে গিয়েছে। স্কাল কিছুটা খোলা। চিবুকের হাড়। ভাঙা। কীভাবে চেনা সম্ভব? প্রবল বৃষ্টি পড়ছে। একা একা মর্গ থেকে বেরিয়ে ভীমদেব রাঠোর সিগারেট ধরালেন। কীভাবে এই বড়ির মালিকের পরিচয় পাওয়া সম্ভব? বিদ্যুচ্চমকের মতো মাথায় এল ফেসিয়াল রিকনস্ট্রাকশন করা যায় না? এরকম তো আগেও হয়েছে শোনা গিয়েছে। রাঠোর এক সেকেন্ড সময় নষ্ট করলেন না। প্রায় দৌড়ে গেলেন ডিনের কাছে। এম ই ইয়েলোকার। ডক্টর সাব আমরা একটা ফেসিয়াল রিকনস্ট্রাকশন করতে পারি? ডক্টর ইয়েলোকার এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে তারপর বললেন, সার্টেনলি। আমাদের সব করতে হবে আপনাদের হেল্প করার জন্য। সিওন হাসপাতালের ফরেনসিক টিম ঝড়ের গতিতে নেমে পড়েছে। দুজন প্লাস্টিক সার্জন, দুজন ডেন্টাল এক্সপার্ট, তিনজন অ্যানাটমি আর্টিস্ট। আর সকলের নেতৃত্বে প্রফেসর ডক্টর হরিশ পাঠক। ওই ধ্বংসপ্রাপ্ত মুখের রিশেপ করার প্রাণপণ এক চেষ্টা শুরু হল। যতটা নিখুঁত সম্ভব করতে হবে। অবশেষে একটা মুখ পাওয়া গেল। তোলা হল ছবি। ডক্টর পাঠক বললেন, লোকটা খুব পান কিংবা গুটখা খেত বোঝা যাচ্ছে। সেই ছবি টাঙিয়ে দেওয়া হল গোটা মুম্বইতে। কিন্তু কেউ খোঁজ করতে এল না। কারণ লোকটার নাম ছিল সেলিম। যে নিজেই বোমা রেখেছিল। সেই বিস্ফোরণে নিজেই ছিন্নভিন্ন হয়ে গিয়েছে।
ঠিক পরদিন মুম্বই ইনটেলিজেন্স ব্রাঞ্চ ফোন ইন্টারসেপট করে শুনতে পেল একটি নম্বর থেকে ফোন যাচ্ছে করাচিতে। বলা হচ্ছে, মুবারকা। আপনে তো কামাল কর দিয়া। অপারেশন কে লিয়ে বহোত মুবারক বাত আপকো। ঢাকা থেকে করাচিতে ফোন। ঠিক সেই নম্বরটিই আবার অ্যালার্ট দিল। এবার ফোন যাচ্ছে ইন্ডিয়ার কোনো নম্বরে। ভাইজান সব ঠিক হ্যায় না! ও প্রান্ত থেকে কেউ বলল হাঁ, সব ঠিক, খ্যায়রিয়ৎ। নম্বরটি লিখে রাখা হল। এবং সেদিন বিকেলে আবার অ্যালার্ট। একটি মুম্বই লোকালিটি থেকে ফোন যাচ্ছে ওই আগের নম্বরে। চকিতে সার্ভিস প্রোভাইডারকে ধরা হল। কার ফোন? কয়েক ঘণ্টার মধ্যে রাঠোর জানলেন, নভি মুম্বই থেকে ফোন যাচ্ছে। নাম মুমতাজ চৌধুরী। আর যেখানে ফোন যাচ্ছে সেটি বিহার নেপাল বর্ডারে। মুমতাজ সেদিন রাতেই গ্রেপ্তার হয়ে গেল। তাকে জেরা করে জানা গেল জিজাজিকে ফোন করছে সে। জিজার নাম কামাল আনসারি। রাঠোরের মুখে হাসি। তাহলে কি ঠিক পথেই যাচ্ছি? ২০ জুলাই। রাঠোর তাকে জেরা করে ইনস্পেক্টর সুনীল দেশমুখ আর বসন্ত তাজনেকে বললেন, গেট রেডি। তুমহে পটনা যানা চাহিয়ে। বিহার আর নেপালের সীমান্তের গ্রাম বাসুপত্তি। বসন্ত আর সুনীল রাত দুটোর সময় সেই গ্রামে নিঃশব্দে হাজির হলেন। বাড়ি জানা হয়ে গিয়েছে। ঠক ঠক ঠক! দরজা ভিতর থেকে বন্ধ। ধাক্কা। এবার আলো জ্বলে উঠল। দরজা খুলেছে একটি মেয়ে। কামাল হ্যায়? একসঙ্গে দুজন অচেনা মানুষকে দেখে মেয়েটি থতমত খেয়েছে। মেয়েটির নাম তবাসুম সুলতানা। কামালের স্ত্রী। তাকে বেশিক্ষণ টেনশন না দিয়ে সুনীল আর বসন্ত সরাসরি জানাল আমরা পুলিশ। কাঠ হয়ে গেল তবাসুম। কাঁপা কণ্ঠে জানাল কামাল নেই। কোথায়? আসবে। রাত সাড়ে তিনটে। ঘরের দরজা বন্ধ। ভিতর থেকে। আলো জ্বলছে। আবার ঠক ঠক ঠক শব্দ। দরজার আড়ালে পজিশন নিয়ে রেডি মুম্বই পুলিশের দুই ইনস্পেক্টর। কামাল ঘরে ঢুকতেই তার উপর ঝাঁপিয়ে পড়া হল। বাধা দেওয়ার কোনো সুযোগই পেল না কামাল আনসারি। সেভেন ইলেভেন ব্লাস্টের প্রথম অ্যারেস্ট! ঠিক ৮ দিনের মাথায় সুহেল, জামির, ফয়জল আর মুজাম্মেলকে দেখা গেল মুম্বই অ্যান্টি টেররিস্ট স্কোয়াডের লক আপে। নতুন একটা অপারেশন আছে। সব ঝামেলা মিটে গিয়েছে। যেতে হবে লাহোর। এই কথা বলে কামাল আনসারিকে দিয়ে ফোন করে ফাঁদ পাতা হয়েছিল। সেই ফাঁদে পা দিতে পুণে থেকে চলে এসেছিল এই ফয়জল। ব্লাস্টের পরই সে তার মুম্বইয়ের ফ্ল্যাট থেকে চলে যায় বাংলাদেশ। ১০ দিন পর ফিরে আসে। পুণে। এবং সেখানে কাউকে কিছু বুঝতে না দিয়ে জামাকাপড় সাপ্লাই করছিল দোকানে দোকানে। ধরা পড়ে গেল একে একে সাতজন। প্রমাণ কী যে তারাই করেছে? এই চক্রান্তের প্রধান সাক্ষী কে ছিল? ফয়জলের সেই বন্ধু, যে সেদিন প্ল্যান ফাইনাল হওয়ার দিন আল্লাহের নাম করে গোপনীয়তা রক্ষার শপথ নিতে রাজি হয়নি। মহম্মদ আলম কুরেশি!
৮ সেপ্টেম্বর। ফয়জল আত উর রহমান শেখকে যখন আদালত আরও ১৪ দিনের জন্য পুলিশ হেফাজতে থাকার আবেদন মঞ্জুর করেছে, তখন তাকে তোলা হয়েছিল কালো ভ্যানে। শুধু একটা নেট থেকে সেই ভ্যানের মধ্যে আলো আসে। বাতাস আসে। ফয়জল এতদিন পর্যন্ত আদালতে যাতায়াতের পথে কালো ভ্যানের মধ্যে থেকে একবারও বাইরে তাকায়নি। আজ কী মনে হল। তাকাল একবার। একটা মুখ যেন জালের খুব কাছে। ফয়জলের চেনা লাগল। কে? উঠে এল জালের কাছে। মুখ বাড়িয়ে দেখার চেষ্টা করছে। কালো একটা চুড়িদার পরা। মাথা ঢাকা ওড়নায়। শুধু মুখটা দেখা যাচ্ছে। কালো ভ্যান স্টার্ট নিয়েছে। নুরের চোখে জল। সেই শেষবারের মতো ফয়জলের সঙ্গে তার দেখা। কারণ বিচারে দোষী প্রমাণিত ফয়জল। গোটা অপারেশনের মাস্টারমাইন্ড। ফয়জলের কী সাজা হল? মৃত্যুদণ্ড!
