ব্ল্যাক করিডর ১.২৯

দুবার ডোরবেল বাজার পর মরিয়ম রশিদা নাইটগাউন পরে নিলেন। দরজার আইহোলে চোখ রেখে দেখলেন একটি বেশ লম্বা লোক দাঁড়িয়ে। গোঁফ আছে। মুখটা চ্যাপ্টা টাইপের। পুলিশের ইউনিফর্ম। মরিয়ম একটু ভাবলেন। বুঝলেন নিশ্চয়ই তাঁর অ্যাপ্লিকেশনের কোনো ফিডব্যাক আছে। দরজা খুলে ভিতরে আসার পর জানা গেল সামনের লোকটি ইনস্পেক্টর বিজয়ন। লোকটি জানতে চাইছে ম্যাডাম আপনি ওভারস্টেইং করছেন কেন? ভিসা শেষ হয়ে গিয়েছে। তাও আপনি এদেশে থাকছেন। এটা তো বেআইনি। কারণটা কী? মরিয়ম অবাক হলেন। কারণটা তিনি একাধিকবার ত্রিবান্দ্রম পুলিশ কমিশনারের অফিসে গিয়ে জানিয়েছেন। অ্যাপ্লাই করেছেন ভিসা এক্সটেনশনের। কিন্তু পুলিশ ভেরিফিকেশন হচ্ছে না। দেরি হচ্ছে। তাই তাঁকে এই হোটেলে থাকতে হচ্ছে। এমনকী ব্যাঙ্গালোরে তাঁর মেয়ে পড়াশোনা করে। সেখানেও যেতে পারছেন না এই ভিসা পাওয়ার ব্যাপারে আটকে যাওয়ায়। মরিয়ম ভেবেছিলেন তাঁর আবেদনের প্রেক্ষিতেই পুলিশ এসেছে ভেরিফিকেশনে। কিন্তু লোকটি এমনভাবে প্রশ্ন করছে যেন কিছুই জানে না। মরিয়ম বললেন, আমার ইন্ডিয়ান এয়ারলাইন্স ফ্লাইট পরপর ক্যান্সেল হয়ে যাচ্ছে। গুজরাটে নাকি প্লেগ দেখা দিয়েছে। আর সেই কারণেই মালদ্বীপের রুট ক্লোজড। দুবার টিকিট ক্যান্সেল করেছি। এখন কনফার্মেশনও পাচ্ছি না যে কবে নাগাদ যেতে পারব। আমি তো এসবই আমার অ্যাপ্লিকেশনে বলেছি আপনাদের। এখনও পুলিশ ভেরিফিকেশন নাকি ক্লিয়ারড হয়নি। তাই ভিসা এক্সটেনশন হচ্ছে না। বিজয়ন হাসলেন। মরিয়ম প্রায় ৬ ফুটের কাছাকাছি। গায়ের রং ফরসা না হলেও বেশ উজ্জ্বলতা আছে। চোখে একটা নীল আভা। পুরো নাম মরিয়ম রশিদা। মালদ্বীপের বাসিন্দা। নাইটগাউন পরে অস্বস্তি হচ্ছে। লোকটি যে অনেকক্ষণ ধরে প্রশ্ন করবে তা আন্দাজ ছিল না। তাহলে অন্তত ফর্মাল একটা পোশাক পরে নেওয়া যেত। মরিয়ম লেন, আপনি কিছু নেবেন? চা কফি? আমি একটু আসছি। দ্রুত ওয়াশ রুমে গিয়ে মরিয়ম একটা জিনস আর টপ পরে নিলেন। ফিরে এসে দেখলেন ইনস্পেক্টর বিজয়নের মুখ থেকে হাসিটা যাচ্ছে না। চাপা হাসি ঠোঁটের কোণে। তিনি বললেন, আপনার প্রবলেম সলভ হয়ে যাবে। বুঝতে পারছি কোনো একটা সেগমেন্ট থেকে হ্যারাস করা হচ্ছে। আশা করছি আগামীকাল কমপ্লিট হয়ে যাবে। মরিয়ম বেশ খুশি। যাক! এবার নিশ্চিন্ত। একটা অনিশ্চয়তা তাড়া করে বেড়াচ্ছিল। তিনি বললেন, কফি? ইনস্পেক্টর হাসছেন। বলছেন, আপনার কাজটা আমি করে দিচ্ছি। বাট হোয়াট উইল বি দ্য রেসিপ্রোকেশন? ডিল কী হবে? মরিয়ম জিজ্ঞাসুদৃষ্টিতে তাকালেন।

বিজয়ন বললেন, মানে আপনি সম্পূর্ণ ইললিগ্যালি ইন্ডিয়ায় রয়ে যাচ্ছেন। কোনো এভিডেন্সও নেই আপনার কাছে। আপনি তো অ্যারেস্ট হয়ে যাবেন। এই যে হেল্প করছি, তার কোনো দাম নেই? কিছু একটা তো…..। মরিয়ম রেগে গেলে সর্বাগ্রে তাঁর ঘাড় শক্ত হতে শুরু করে। সেটা হচ্ছে। কারণ আগাগোড়া লোকটা তাঁর গোটা শরীরে চোখ বোলাচ্ছে। আসার পর থেকেই। প্রথমে তিনি ব্যাপারটা গায়েই মাখেননি। কারণ পুলিশ অফিসার। তার উপর বিদেশ। কিন্তু এটা তো স্পষ্ট ইঙ্গিত। মরিয়ম বললেন, আপনার হেল্প করার প্রয়োজন নেই স্যার। আমার পক্ষে এর বেশি কিছু বলা সম্ভব নয়। আমি অন্য ব্যবস্থা করে নেব। প্লিজ..। ইনস্পেক্টর বিজয়ন চেয়ারে সোজা হয়ে বসলেন। আর চিবিয়ে চিবিয়ে বললেন, এই কেসটা আমাকে হ্যান্ডল করতে বলা হয়েছে। তাই অন্য কার কাছে বলবেন? কারও ক্ষমতাই নেই। আমার হেল্প ছাড়া ইউ উইল বি ইন আ ডিপ ট্রাবল ম্যাম। মরিয়ম ঠোঁট কামড়ে ভাবলেন দু সেকেন্ডে। উঠে দাঁড়ালেন। এবং বললেন, কিন্তু আপনি যে অ্যাপ্রোচ করছেন সেটা কোনো সিভিল গভর্নমেন্ট সার্ভেন্ট করতেই পারে না। এটা আপনার জানা উচিত। ইভন, আমি কমপ্লেন করতে পারি। অ্যান্ড আপনার জানা নেই আপনি আসার এক ঘণ্টা আগে আমি কার সঙ্গে কথা বলেছি। বিজয়ন থমকালেন। জানতে চাইলেন, কার সঙ্গে? মরিয়ম এবার একটু হাসছেন। বললেন, আপনার আইজির সঙ্গে। সো ডোন্ট ক্রস ইওর লিমিট। বিজয়ন উঠে দাঁড়ালেন। পিছনে ঘুরলেন। মরিয়ম ভাবলেন, এবার ভয় পেয়ে ইনস্পেক্টর চলে যাচ্ছেন। আসলে নয়। দরজাটা বন্ধ কিনা একবার দেখে নিয়ে বিজয়ন সোজা এগিয়ে আসছেন। মরিয়মের কাঁধে হাত রেখে বললেন, লুক ম্যাম..আপনি বুঝতে ভুল করছেন। ওসব আই জি ফাই জি দেখিয়ে কী হবে? এটা তো সহজ ডিল। আপনি একটা ট্রাবলে আছেন। আমি সেই ট্রাবল থেকে আপনাকে রক্ষা করছি। আর এটা ডিল হিসাবে ভাবছেন কেন? জাস্ট ফ্রেন্ডলি ফান! বলে কাঁধে রাখা হাতটা শক্ত করলেন।

শান্ত ভঙ্গিতে কাঁধে রাখা হাতটা সরিয়ে দিলেন মরিয়ম। কয়েক পা পিছিয়ে গেলেন। বিজয়ন ভাবলেন পুওর লেডি! এভাবে বাঁচা যায় নাকি! নিশ্চয়ই মরিয়ম এবার পালানোর চেষ্টা করবে। তিনি রিল্যাক্সড। কিন্তু মরিয়ম সেরকম কিছুই করলেন না। তাঁর ডান পাটা সমকোণে আচমকা উঠে এল। সোজা বিজয়নের চিবুকে হিট করল। এতটাই আকস্মিক যে বিজয়নের গোটা মাথা ঝনঝন করে উঠল এবং তাঁর চোখে তীব্র বিস্ময়। টাল সামলাতে না পেরে পড়ে যেতে যেতে বিজয়ন ফের এক ঝটকায় সোজা হলেন এবং ডানহাত মুষ্ঠিবদ্ধ করে একটা প্রবল ঘুসি ছুড়লেন। এবং তৎক্ষণাৎ বুঝলেন মেয়েটি শুধু যে ক্যারাটে জানে তাই নয়, বক্সিংও জানে। কারণ বিজয়নের ওই চোখের পলকের ঘুসিটা অবশ্যই ওর কানের ডানদিকে লাগার কথা। কিন্তু চোখের নিমেষে মরিয়ম একটা স্টেপ পিছিয়ে গিয়েছে। আর সামনে জায়গা তৈরি করে নিয়ে এবার মাথা নীচু করে এগিয়ে এসে একটা নিখুঁত বক্সিং জ্যাব! সেই ধাক্কা ইনস্পেক্টর সামলাতে পারলেন না। ফ্লোরে পড়ে গেলেন। এবং সঙ্গে সঙ্গে উঠেও পড়লেন। উঠেই একটা ধাক্কা মারার চেষ্টা। কিন্তু সেই সময় দেওয়া হল না। মরিয়ম অকল্পনীয় একটা কাজ করলেন। প্রথমেই দরজাটা খুলে দিলেন। আর পিছিয়ে এসেই বিজয়নের কোমরের নীচে একটা হাত দিয়ে অন্য হাতে হাঁটুর জয়েন্ট ধরলেন। আর তুলে ধরলেন বিজয়নকে শূন্যে। স্রেফ ছুড়ে ফেললেন দরজার বাইরে। বিজয়ন ওঠার চেষ্টা করছেন না। কারণ তিনি বিশ্বাস করছেন না এসব যে সত্যিই ঘটছে! এটা অবশ্যই কোনো দুঃস্বপ্ন।

তাঁর রাগ হওয়ার কথা। কিন্তু একটা প্রবল অপমানবোধ আর বিস্ময় স্তব্ধ করে দিচ্ছে। ত্রিবান্দ্রম পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চের সিকিউরিট ফরেন অ্যাফেয়ার্সের ইনস্পেক্টর বিজয়নকে যে কোনো মহিলা এভাবে দু হাতে তুলে ছুড়ে দিতে পারে এটা গোটা ডিপার্টমেন্ট বিশ্বাস করবে না। বিজয়নের দিকে তাকিয়ে এবার হাঁফাতে হাঁফাতে মরিয়ম বললেন, আই থিংক ইউ বেটার আন্ডারস্টুড! বিজয়ন ধীরেসুস্থে উঠলেন। ইউনিফর্ম কুঁচকে গিয়েছে। একটু ধুলোও লেগেছে। সেসব ঠিক করলেন। আর সোজা মরিয়মের দিকে তাকিয়ে শীতল কণ্ঠে বললেন, ইউ উইল বি রুইনড! জাস্ট ওয়েট অ্যান্ড ওয়াচ। আপনার ভিসা তো অনেক দূরের কথা। দেশে ফিরতে পারবেন তো? আপনার জানাই নেই কার সঙ্গে আর কোথায় শত্রুতা করলেন। সি ইউ ম্যাম! ভেরি সুন!

মরিয়ম তখনও হাঁফাচ্ছেন। শুধু বললেন, গেট লস্ট!

তিনদিন পর ত্রিবান্দ্রমের সমস্ত সংবাদপত্রে জানা গেল মরিয়ম রশিদা নামক এক মালদ্বীপের মহিলা গ্রেপ্তার হয়েছেন। তিনি পাকিস্তানের গুপ্তচর সংস্থা আইএসআই এর রিক্রুট। তাঁর কাছে পাওয়া গিয়েছে একটা কালো রঙের ডায়েরি। যে ডায়েরিতে এমন কিছু তথ্য আর নাম পাওয়া যাচ্ছে যা বিস্ফোরক! ভারতের স্পেস রিসার্চ প্রোগ্রামের গোপন নথিপত্র সাপ্লাই হয়ে যাচ্ছে বিদেশের হাতে! কে করছে? কারা এর পিছনে? সত্যিই কি মরিয়ম স্পাই? মালদ্বীপের স্পাই একজন ভারতীয় পুলিশ অফিসারের সঙ্গে এরকম আগ্রাসী আচরণ করবেন কেন? সেই স্পাই তো বরং এমন কিছু ব্যবহার করবেন যাতে তাঁর উপর কেউ রাগ না করে। স্পাই তো সকলকে তুষ্ট করে চলে? তাহলে?

এটা একটি পরিত্যক্ত চার্চ। সেন্ট মেরি ম্যাগডালেন। ত্রিবান্দ্রমের অনতিদূরে। জায়গার নাম থুম্বা। একদিকে রেললাইন। একদিকে সমুদ্র উপকূল। দরকার প্রায় তিন কিলোমিটার লম্বা কোনো প্লট। একসঙ্গে। পাওয়া গেল। তবে চার্চের জমির পাশাপাশি বাকি জমির সিংহভাগই স্থানীয় মৎস্যজীবীদের। হু হু করে হাওয়া দিচ্ছে। ষাটের দশকের শুরু। বিজ্ঞানী বিক্রম সারাভাই ভাবছেন জায়গাটা আইডিয়াল। কারণ আর্থ ইকুয়েটর আছে কাছেই। এরকম স্থানেই তো একটা মহাকাশ গবেষণা কেন্দ্র করে তোলা উচিত। বিক্রম সারাভাই দেখা করলেন বিশপের সঙ্গে। রেভারেন্ড পিটার বার্নার্ড পেরেইরা। তাঁকে অনুরোধ করা হল, আমাদের জন্য আপনাদের এই জমিটা চাই। এখানে একটা স্পেস রিসার্চ সেন্টার হবে। বিশপ রাজি নন। তিনি বললেন, আপনাদের দেব কেন? এটা কত পুরোনো একটা চার্চ আপনাদের কোনো আইডিয়া আছে? বিক্রম সারাভাই শুরুতেই ধাক্কা খেলেন। এতদূর এসে শেষ পর্যন্ত কি তীরে এসে তরী ডুববে? জমিটা পাওয়া না গেলে আবার খুঁজতে হবে। কিন্তু এরকম আদর্শ স্থান আর কোথায় পাব? বিশপ এবার বিক্রম সারাভাইয়ের দিকে তাকিয়ে হাসছেন। বললেন, ওই যে বললেন, আপনাদের জন্য দিতে হবে। তাই ঠাট্টা করলাম। এই জমি আমরা ভারতের জন্য দেব সানন্দে। ভারতের জন্য মানে শুধু আপনারা নয়, গোটা দেশবাসীর জন্য। কারণ আপনারা যে কাজটা করছেন, করবেন তা গোটা দেশবাসীর মুখ উজ্জ্বল করবে। শুনে হেসে ফেললেন বিক্রম সারাভাই। তাঁর বুক থেকে একটা ভার নেমে গেল। তবে একটা শর্ত আছে। বললেন, রেভারেন্ড। তিনি বললেন, একটা চার্চ তো আমাদের সম্পত্তি নয়। সকলের। তাই সকলের মতামত নেওয়া দরকার। আপনারা বরং সানডে মাসে আসুন।

রবিবারের ওই প্রার্থনাসভায় আমরা সিদ্ধান্ত নেব সম্মিলিতভাবে। তাই হল। রবিবার গোটা স্পেস সায়েন্স টিম এলেন চার্চে। উপস্থিত খ্রিস্টান ভক্তদের বুঝিয়ে বললেন রেভারেন্ড পেরেইরা। সকলেই রাজি। এলাকার জেলেদের সঙ্গেও কথা বলা হল। তাঁদের বলা হল স্পেস সেন্টারে তাঁরা কাজ পাবেন। সুতরাং জমি দিতে আপত্তি থাকার কথা নয়। সেই সেন্ট মেরি ম্যাগডেলান চার্চেই প্রথম গঠিত হল থুম্বা ইক্যুয়াটোরিয়াল রকেট লঞ্চ স্টেশন। পরবর্তীকালে তার নাম হয় বিক্রম সারাভাই স্পেস সেন্টার। পরবর্তী সময়ে অন্য জমিতে দুটি চার্চ তৈরি করে দেওয়া হয় কৃতজ্ঞতাস্বরূপ। চার্চের অভ্যন্তর ভারতের প্রথম স্পেস সেন্টারের অফিস। ১৯৬৩ সালের ২১ নভেম্বর। এই স্পেস স্টেশন থেকেই প্রথম রকেট লঞ্চিং হল। নাম নিক অ্যাপাচে। আমেরিকার নাসায় তৈরি। পাঠানো হয়েছিল মার্স অরবিটে। চার্চ বিল্ডিং থেকে লঞ্চ প্যাডে কীভাবে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল সেই রকেট? ট্রাকে। আর প্রেয়ার রুম ছিল ল্যাবরেটরি। সারাদিন সারারাত মাঝেমধ্যেই ওই প্রেয়ার রুমের ল্যাবরেটরিতে বসে কাজ করতেন এক মনোযোগী তরুণ। বিশপস রুম ছিল সেই তরুণের ডিজাইন আর ড্রইং রুম। তাঁর নাম এ পি জে আবদুল কালাম। পরবর্তীকালে সবথেকে ছোট মডেলের স্যাটেলাইট লঞ্চ ভেহিকেল এখানে বসে নির্মাণ করেন কালাম। এসএলভি থ্রি। সেটি ছিল ১৭ টন। আর ৪০ কেজির রোহিণী স্যাটেলাইট স্থাপন করেছিল সাফল্যের সঙ্গে কক্ষপথে। সেটি কীভাবে আনা হয়েছিল লঞ্চ প্যাডে? সাইকেলে! সেটি ছিল ১৯৮০।

এ পর্যন্ত হল। কিন্তু এরপর? আরও এগোতে হবে তো? এবার লক্ষ্য পোলার স্যাটেলাইট লঞ্চ ভেহিকল (পিএসএলভি)। তার জন্য অপেক্ষা করতে হয়েছে আরও ১৪ বছর। ১৯৯৪ সালের ১৫ অক্টোবর। সেদিন কক্ষপথে স্থাপিত হয়েছিল রিমোট সেন্সিং স্যাটেলাইট। কিন্তু মহাকাশ গবেষণার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মহল, বিশেষ করে আমেরিকা আর রাশিয়া যেখানে পৌঁছে গিয়েছে সেখানে তখনও অনেক পথ চলা বাকি। একটি স্বপ্নই আপাতত সামনে রাখা হল। জিএসএলভি। জিওসিনক্রোনাস লঞ্চ ভেহিকল। যা আরও ভারী পে লোড বহন করতে সক্ষম আরও উচ্চতম কক্ষপথে। জিএসএলভির জন্য সর্বাগ্রে দরকার ক্রায়োজেনিক ইঞ্জিন। যা ভারতের কাছে নেই তখন। কিন্তু ক্রায়োজেনিক ইঞ্জিন ছাড়া কি এতবড় একটা গবেষণা বন্ধ হয়ে যাবে? বিদেশের উপরই নির্ভর করে ভারতের মহাকাশ গবেষণা চালাতে হবে বছরের পর বছর, যুগের পর যুগ? ভারতীয় বিজ্ঞানীরা মনেপ্রাণে চাইছেন সরকার আন্তর্জাতিক বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলে এ ব্যাপারে একটা কিছু করুক। তাই হল। এগিয়ে এল ভারতের বন্ধু রাশিয়া। তারা জানাল ক্রায়োজেনিক ইঞ্জিন তো দেবেই এবং তারই সঙ্গে প্রযুক্তি হস্তান্তরেও রাজি তারা। অর্থাৎ ক্রায়োজেনিক টেকনোলজি ট্র্যান্সফার। এই প্রযুক্তি পারবে হেভি কমিউনিকেশন স্যাটেলাইটকে স্থাপন করতে ৩৬ হাজার কিলোমিটার কক্ষপথে। দীর্ঘদিন ধরে ভারতকে নির্ভর করতে হয় ইওরোপীয়ান স্পেস এজেন্সির উপর। ফ্রেঞ্চ গায়ানা লঞ্চ প্যাড ব্যবহার করতে হয়। আর তার জন্য ইওরোপীয়ান স্পেস এজেন্সিকে দিতে হয় বছরে ৩০০ বিলিয়ন ডলার। ভারত যদি নিজেরাই ক্রায়োজেনিক প্রযুক্তি পেয়ে যায় তাহলে তো নিজেদের মতোই লঞ্চ প্যাড আর সম্পূর্ণ ভারতীয় প্রযুক্তির স্যাটেলাইট কমিউনিকশেন ব্যবস্থা অর্জন করে ফেলবে। বিপুল ক্ষতি মিসাইল টেকনোলজি কন্ট্রোল রেজিমের। এই কন্ট্রোল রেজিমের নেতৃত্বে বিগ ব্রাদার! আমেরিকা। সুতরাং যেই গোপন সূত্রে খবর পাওয়া গেল ভারত নিজস্ব টেকনোলজির দিকে এগোচ্ছে, তখনই সতর্ক হয়ে গেল মিসাইল টেকনোলজি কন্ট্রোল রেজিম। যেভাবেই হোক ভারতকে এই প্রযুক্তি পাওয়া থেকে রুখতেই হবে। অপারেশন শুরু। প্রথমেই রাশিয়াকে কঠোর বার্তা দিল আমেরিকা। ওই রেজিমের পক্ষ থেকে রাশিয়াকে বলা হল, ভারতকে তোমরা ক্রায়োজেনিক দিতে পারবে না। যদি দাও তাহলে তোমাদের মহাকাশ গবেষণায় নানাবিধ প্রতিবন্ধকতার জন্য তৈরি হও। সোজা থ্রেট!

পৃথিবী থেকে ৩৬ হাজার কিলোমিটার উচ্চতায় কক্ষপথে জিওস্টেশনারি অরবিটে প্রতি কেজি পে লোড স্থাপনের জন্য ইওরোপীয়ন স্পেস এজেন্সি মূল্য নির্ধারণ করেছে ২০ হাজার ডলার। প্রতি কেজিতে ২০ হাজার ডলার। বিপুল মুনাফা। আর ভারত যে প্রযুক্তি হাতে নিয়ে এগোতে পারে সেটা অনায়াসে এর থেকে অনেক সস্তায় হয়ে যাবে স্যাটেলাইট লঞ্চ। যা ভারতীয় দুর্ধর্ষ মেধার বিজ্ঞানীরা পারবে বলেই ধারণা আন্তর্জাতিক মহলের। সুতরাং মহাকাশকে কেন্দ্র করে আমেরিকা ও ইওরোপের বিপুল বাণিজ্য বিরাট ধাক্কা খাবে। কারণ একবার ভারত যদি ওই প্রযুক্তি অর্জন করে তাহলে অন্যান্য দেশও আগামীদিনে ভারতের দ্বারস্থ হবে সস্তায় মহাকাশ গবেষণার জন্য। কোনো দেশই রাজকোষের ঘটিবাটি বিক্রি করেও পশ্চিমী দেশগুলির শরণাপন্ন হবে না। সুতরাং ভারতকে আটকাও। ভারত তার অনেক আগেই রাশিয়ার সঙ্গে ২৩৫ কোটি টাকা দিয়ে একটি সমঝোতা পত্র স্বাক্ষর করেছে। রাশিয়াই দেবে প্রযুক্তি। কিন্তু আমেরিকা সেই একই প্রযুক্তির জন্য চাইছে ৯৫০ কোটি টাকা। আর ফ্রান্স দর দিয়েছে ৬৫০ কোটি টাকা। সেই অতিরিক্ত দামের প্রযুক্তি ভারত নেবে কেন? সুতরাং রাশিয়ার থেকেই নেওয়া হবে সব স্থির হয়ে গেল। কিন্তু আমেরিকার প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশ সরাসরি রাশিয়াকে হুমকি দিলেন। ভারতকে ওই প্রযুক্তি ট্র্যান্সফার করা হলে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষময় হয়ে যাবে। আর রাশিয়াকে তার ফল ভুগতে হবে। সবেমাত্র সমাজতন্ত্র থেকে বেরিয়ে আসার প্রক্রিয়ার ফলাফল তখনও জানা নেই। রাশিয়ায় উদারীকরণের হাওয়া শুরু হয়েছে। আর ঠিক এই মুহূর্তে আমেরিকাকে চটানোর ক্ষমতাও নেই ওই নতুন রাশিয়ার। অতএব রাশিয়া পিছু হটল। ভারতীয় বিজ্ঞানীরা দমলেন না। তাঁরা সরকারকে বললেন, ঠিক আছে প্রযুক্তি চাই না। শুধুমাত্র ক্রায়োজেনিক ইঞ্জিন কেনা হোক। টেকনোলজি ট্র্যান্সফার করতে হবে না। তাহলে কোনো সমস্যা নেই তো? রাশিয়া এতে রাজি। তারা চারটি ক্রায়োজেনিক ইঞ্জিন পাঠাল ভারতকে। সেগুলি পাঠানো হল রাশিয়ান উড়াল এভিয়েশনে। ঠিক দেড় বছরের মধ্যে গ্রেপ্তার হলেন মরিয়ম রাশিদা। কারণ তাঁর কালো ডায়েরিতে দেখা যাচ্ছে দুটি নাম। নাম্বি নারায়ণ এবং শশী কুমারণ। যাঁরা দুজনেই ইন্ডিয়ান স্পেস রিসার্চ অর্গানাইজেশনের দুই মহাকাশ বিজ্ঞানী। তাঁরাই এই বিশেষ গবেষণার প্রধান হোতা। ভারতের নিজস্ব ক্রায়োজেনিক প্রযুক্তি। তাঁরা কাজ করেন তামিলনাড়ুর গবেষণাগারে। লিকুইড প্রোপালসন সিস্টেমস সেন্টারে। ক্রায়োজেনিক ফুয়েল প্রযুক্তি গবেষণার ভরকেন্দ্র। জানা গিয়েছিল তাঁরা দুজনে ভারতের নিজস্ব প্রযুক্তি নির্মাণের খুব কাছে পৌঁছে গিয়েছেন। যা জেনে ফেলেছিল আমেরিকান স্পাই এজেন্সি সিআইএ।

পুলিশ জেরার পর মিডিয়াকে জানাল, এই দুই বিজ্ঞানীকে অনেকবার ফোন করেছেন মরিয়ম রশিদা। জানা গেল তাঁর একজন সঙ্গীও আছে। নাম ফজিয়া হাসান। মালদ্বীপের বাসিন্দা এই দুই নারী আদতে হানি ট্র্যাপ। তাঁরা আসলে আইএসআই এর গুপ্তচর। ভারতের মহাকাশ গবেষণার গোপন তথ্য চুরি করতে এসেছে। আর টার্গেট করেছে দুই বিজ্ঞানীকে। নারায়ণ এবং শশী। তাঁরা দুজনেই সেই ফাঁদে পা দিয়েছেন। অর্থাৎ ভারতের সবথেকে মূল্যবান মহাকাশ গবেষণা যাঁদের হাতে তাঁরাই দেশের সঙ্গে শত্রুতা করে পাকিস্তানের হাতে তুলে দিচ্ছিলেন যাবতীয় গোপন নথিপত্র! গোটা কেরলে আগুন জ্বলে গেল। ইন্ডিয়ান স্পেস রিসার্চ সেন্টারের কোনো কর্মী বিজ্ঞানীকে রিকশচালক নেবেন না। দোকানি মালপত্র বিক্রি করবেন না। সাধারণ মানুষ সাহায্য করবেন না। কারণ এঁরা সকলেই দেশদ্রোহী। গ্রেপ্তার করা হয়েছে বিখ্যাত বিজ্ঞানী নাম্বি নারায়ণ আর তাঁর সহকর্মী সহকারী শশী কুমারণকে। স্তম্ভিত বিজ্ঞানীমহল। শশী আর নারায়ণ এরকম করবে? বিশ্বাস করা শক্ত! এবং গোটা চক্রান্তের সঙ্গে যুক্ত চারজন পুলিশ অফিসারও। তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ ছিল ওই মরিয়ম রশিদার। সুতরাং খোদ সরকারের পুলিশই এই কাজে যুক্ত? কেরলের মুখ্যমন্ত্রী করুণাকরণকে ইস্তফা দিতে হল। নতুন মুখ্যমন্ত্রীর নাম এ কে অ্যান্টনি। তিনি এসেই গোটা ঘটনার তদন্ত করার জন্য একটি তদন্ত কমিটি গঠনের নির্দেশ দিলেন। যাকে বলা হল এসআইটি। স্পেশাল ইনভেস্টিগেশন টিম। ইনচার্জের নাম শিবি ম্যাথিউ। রাজ্য পুলিশের ডিআইজি। গ্রেপ্তার নারায়ণ আর শশীকে জেরা করার জন্য দিল্লি থেকে এসেছেন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা বাহিনী। ইনটেলিজেন্স ব্রাঞ্চ।

শুরু থেকেই নাম্বি নারায়ণ আর শশী কুমারণ নির্বাক। স্তব্ধ। তাঁরা ভালো করে কথাও বলতে পারছেন না। তাঁদের একটাই কথা আমরা নির্দোষ। সব অপরাধীই এরকম বলে। তাই বোঝা গেল এভাবে এঁরা মুখ খুলবেন না। জেরার জন্য স্পেশাল ব্রাঞ্চের একটি রিট্রিটে নিয়ে যাওয়া হল। নাম্বি নারায়ণকে একটা খাটিয়ায় শুইয়ে লেদারের তৈরি অদ্ভুত একটা চাবুক দিয়ে পিঠে মারা হচ্ছে। শপ..শপ…শপ…শব্দ। পিঠের জায়গাগুলো ফুটে যাচ্ছে নিমেষে। কিন্তু রক্ত জমাট বাঁধছে না। শশী কুমারণকে সোজাসুজি রড দিয়ে পেটানো হচ্ছে। কিন্তু তাঁরা যন্ত্রণায় নীল হয়ে গেলেও কিছুতেই স্বীকার করছেন না আসল মাথা কারা? কী কী প্রযুক্তি তাঁরা সাপ্লাই করেছেন? তাঁদের মাঝেমধ্যেই একটা প্রশ্ন করা হচ্ছে। যেটা বেশ বিস্ময়কর! বলা হচ্ছে আর এই রিসার্চের আউটকাম কে কে জানে? আর কাউকে বলেননি তো? জামিন পেলে ওই একই রিসার্চে আবার যাবেন? নাকি অন্য কোথাও ট্র্যান্সফার নিতে চাইবেন? এইসব প্রশ্নের মানে কি? কিন্তু দুই বিজ্ঞানী ওই অমানুষিক অত্যাচারে বারংবার জ্ঞান হারাচ্ছেন। তাই এসব সম্যকভাবে বোঝার অবস্থায় নেই।

মাসের পর মাস। বছরও ঘুরে যায়। মহাকাশ গবেষণা স্পাইং মামলার তদন্ত আর এগোচ্ছে না। এবার পালটা চাপ সৃষ্টি হচ্ছে জনমমে। এত ঢাকঢোল পিটিয়ে যেখানে গ্রেপ্তার করা হল, এত অভিযোগের ফিরিস্তি দেওয়া হল, সেখানে কেন কোনো চার্জশিট নেই? কেন কোনো মামলার শুনানিতে সামান্য নতুন কোনো তথ্য দেওয়া যাচ্ছে না? অবশেষে প্রবল রাজনৈতিক চাপে মুখ্যমন্ত্রী এ কে অ্যান্টনি বাধ্য হলেন তদন্ত সিবিআইকে দিতে। ঠিক এক বছরের মধ্যেই সিবিআই জানিয়ে দিল গোটা মামলায় কোনো মেরিট নেই। যাঁদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে তাঁদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগই এস্ট্যাবলিশ করতে পারেনি কেরল পুলিশের স্পেশাল ইনভেস্টিগেশন টিম। যে দুই মহিলাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে তাঁদের একজন নিছক অসুস্থতার কারণে চিকিৎসা করতে ইন্ডিয়াতে এসেছেন। সেটা মালদ্বীপে ভারতীয় দূতাবাস আর বিদেশমন্ত্রকের তথ্য থেকেই কনফার্ম করা যাচ্ছে। আর মরিয়ম রশিদার মেয়ে ব্যাঙ্গালোরের স্কুলে পড়ে। তিনি এর আগেও এসেছেন। বিজ্ঞানী নাম্বি নারায়ণ আর শশী কুমারণ মহিলাকে চেনেনই না। কালো ডায়েরির গল্পটাই সাজানো। সুতরাং গ্রেপ্তার হওয়া সকলেই আদালত থেকে সিবিআই রিপোর্টের ভিত্তিতে মুক্তি পেলেন। কিন্তু বিজ্ঞানী নাম্বি নারায়ণ আর শশী কুমারণকে পুরোনো পদে ফিরিয়ে নেওয়া হয়নি। কার্যত তাঁদের কেরিয়ার নষ্ট হয়ে গেল। তার থেকে বেশি ক্ষতি হয়ে গেল ভারতের মহাকাশ গবেষণার। বহুদূর পিছিয়ে গেল ক্রায়োজেনিক প্রযুক্তি নির্মাণের কাজ। স্রেফ একটা পরিকল্পিত ষড়যন্ত্রে। পালটা মামলা করলেন নাম্বি নারায়ণ। আজও তাঁরা সুবিচার পাননি।

কেন? নিছক মরিয়ম রশিদা কেরল পুলিশের এক ইনস্পেক্টরকে হোটেলের রুম থেকে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছেন বলেই এত বড় একটা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্তরের বিস্ফোরক ঘটনার চক্রান্ত হতে পারে? না। হতে পারে না। গোটা ঘটনার পিছনে আমেরিকার সেন্ট্রাল ইনভেস্টিগেশন এজেন্সির প্ল্যান। কারণ নাম্বি নারায়ণ আর শশী কুমারণকে এভাবে স্পাই সাজিয়ে বদনাম করে ভারতের ক্রায়োজেনিক প্রযুক্তি গবেষণা চিরতরে বন্ধ করে দেওয়ার কৌশল। আর সেই কাজে আমেরিকার এই গুপ্তচর সংস্থাকে কে সাহায্য করেছেন? ভারতের কেন্দ্রীয় গুপ্তচর সংস্থা আইবির এক স্পেশাল ডিরেক্টর। আইবির মধ্যে সিআইএর চর!

ভারতের গুপ্তচর সংস্থা আইবির অ্যাডিশনাল ডিরেক্টর রতন সেহগল একা বসে আছেন তাজ মান সিং হোটেলের কফি শপে। একটা আমেরিকানো ব্ল্যাক কফি অর্ডার করা হয়েছে। বারংবার রতন সেহগল দেখছেন সামনের কাচের জানালার বাইরেটা। সেটা প্রকৃতি দেখার জন্য নয়। দিল্লির প্রকৃতি অবশ্যই দেখার মতো। বিশেষ করে এরকম সব বড় হোটেলগুলি এমন লোকেশনে করা হয়েছে যে চারদিক. সবুজে সবুজে ছয়লাপ। প্রচুর পাখিও আসে। তাই এরকম এক মনোরম বিকেলে বেশ লাগছে দেখতে ধীরে ধীরে অস্ত যাওয়া সূর্যের দিল্লিকে। রতন সেহগল এসব কিছুই দেখছিলেন না। তিনি বারবার জানালার বাইরে তাকাচ্ছেন, কারণ একজন আসবে। সামনেই হোটেলের এন্ট্রি পয়েন্ট। গাড়িটা তিনি চেনেন। ওই যে আসছে। মেয়েটির নাম আগস্ট। হাতে দুটো প্যাকেট। সেহগলের আছে এসে বসলেন তিনি। সেহগল জানতে চাইছেন গস্ট কী খাবেন? আগস্ট হেসে বললেন, আমি কাপুচিনো। সেহগলকে দুটো প্যাকেট দিলেন আগস্ট। এতক্ষণ বোঝা যায়নি। সেহগলের পাশেই টেবলের কাছের টবের আড়ালে একটা ব্রিফকেন রাখা আছে। সেটা থেকে একটা এনভেলাপ বের করলেন সেহগল। বেশ মোটা। সেটি ছিলেন আগস্টকে। খুব বেশি হলে ১০ মিনিট। তারপর দুজনেই উঠে পড়লেন। এবং দুটি আলাদা সিঁড়ি দিয়ে নামলেন। খুব স্বাভাবিক একটি দৃশ্য। সন্দেহের অবকাশই নেই। তবে কিছু দূরে আর একটি চেয়ারে বসে থাকা এক কালো শার্ট পরা সারাক্ষণ ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল দিয়ে মুখ ঢাকা ব্যক্তি গোটা ঘটনাটি যে নিছক পর্যবেক্ষণ করলেন তাই নয়। ওই ওয়াল স্ট্রিট জার্নালে একটা ফুটো করা আছে। সেখান থেকেই একটি মাইক্রো মুভি ক্যামেরায় সেহগল আর আগস্টের গোটা ১০ মিনিটের পর্বটি তুলে রাখছিলেন এই লোকটি।

লোদি রোড। এই বাংলো আর আধুনিক ফ্ল্যাটগুলিতে সাধারণত থাকেন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী, এমপি আর সরকারের উচ্চপদস্থ অফিসাররা। ইনটেলিজেন্স ব্রাঞ্চের অ্যাডিশনাল ডিরেক্টর রতন সেহগলের বাসভবন এখানে। প্রথমে একটা বড় রাস্তা। তারপর বাইলেন। বাংলোর সামনেটা লন আর বাগান। গেটের বাইরে বোগেনভিলিয়া। একটি সাদা কন্টেসা ক্লাসিক অনেকক্ষণ ধরে দাঁড়িয়ে। দুই মহিলা আর এক ব্যক্তি ভিতরে গিয়েছেন। প্রায় সাড়ে তিন ঘণ্টা পর তাঁরা বেরিয়ে এলেন। দুজন বিদেশি। একজনকে দেখে মনে হল ভারতীয়। অনেক রাত। প্রায় ১১টা। গাড়িতে ওঠার আগে তাঁরা তিনজনেই সন্দিগ্ধ চিত্তে এদিক ওদিক তাকালেন। অত রাতে ওই অভিজাত পাড়ায় আর কাউকে দেখার কথাও নয়। কেউ ছিল না। তাই নিশ্চিন্তে তিনজনই বেরিয়ে এসে গাড়িতে বসলেন। ঠিক পাঁচ মিনিট পর বোগেনভিলিয়ার পাশের ঝোপ থেকে একটি যুবক গায়ে মাথায় পাতা আর পোকা ঝাড়তে ঝাড়তে বেরিয়ে এলেন। আর নোট করলেন গাড়ির নম্বর। টাইম। হাঁটতে হাঁটতে পকেটে ঢোকালেন একটা ছোট ইলেকট্রনিক ডিভাইস।

দিল্লি গলফ ক্লাবে এক বিদেশির সঙ্গে একটা বিয়ার নিয়ে হাসতে হাসতে রতন সেহগল বলছিলেন, স্যার আমার সারাদিন খুব সহজ সরলভাবে কাটে। সকালে আমি গলফ খেলি। দুপুরে সন্ধ্যায় আমি জ্যাজ শুনি। আর মাঝখানে একটু স্কচ খাই। জীবনের কাছে আমার ডিমান্ড খুব অল্প স্যার। সেই বিদেশি ভদ্রলোক হেসেছিলেন। একটু পর জানা গেল তাঁর সঙ্গে এক মহিলাও ছিলেন। একটু দূরে। যিনি একটু পর নিজের গাড়ির পরিবর্তে রতন সেহগলের গাড়িতে উঠে কোথাও একটা চলে যাবেন। ওই গাড়িতে ওঠার দৃশ্য তাঁদের অজান্তেই ভিডিওতে উঠে গেল।

১৯৯৭ সালের ৩০ নভেম্বর ইনটেলিজেন্স ব্রাঞ্চের ডিরেক্টর অরুণ ভগত ডেকে পাঠালেন তাঁর দপ্তরের অ্যাডিশনাল ডিরেক্টরকে। রতন সেহগল। রতন সেহগল যে সে অফিসার নয়। তিনি কাউন্টার ইনটেলিজেন্স ইউনিটের ইনচার্জ। অরুণ ভগতের ঘরে ঢুকে সেহগল স্বাভাবিক স্বরে বললেন, কী ব্যাপার স্যার! এনিথিং সিরিয়াস?

অরুণ ভগত বললেন, বসুন! আপনাকে সিআইএ কত টাকা দেয়? সিআইএ, অর্থাৎ আমেরিকার গুপ্তচর এজেন্সি।

সেহগল থমকে গেলেন। মুখ থেকে বাক্য সরছে না। শুধু বললেন, স্যার..হোয়াট আর ইউ টকিং অ্যাবাউট?

অরুণ ভগত, ঠান্ডা কণ্ঠে বললেন, হাউ মাচ সেহগল সাব? কত দেয়? কীভাবে দেয়? ডলারে নাকি টাকায়?

সেহগল বললেন, আমি এসব কথা কিছুই বুঝতে পারছি না স্যার। আপনি কী বলছেন? আমি কিন্তু কমপ্লেন করব উপরে।

অরুণ ভগত জানালেন, কমপ্লেন অলরেডি করা আছে। পি এম (প্রাইম মিনিস্টার) জানেন। এইচ এম (হোম মিনিস্টার) জানেন। আপনাকে বরং একটা ভিডিও দেখানো যাক। বলে তিনি বেল টিপলেন। সঙ্গে সঙ্গে আর্দালির পরিবর্তে আরও দুজন আইবি অফিসার এলেন। তাঁদের কাছে একটা ভিডিও ক্যাসেট। সেটা চালানো হল। দেখা গেল মোট ৯টি ভিডিও। সেখানে দেখা গেল আমেরিকার দূতাবাসের অফিসারদের সঙ্গে এবং অচেনা দুই বিদেশির সঙ্গে দিল্লি, আগ্রা আর মুম্বইয়ে যেখানে যেখানে সেহগল মিট করেছেন, তার সব ভিডিও করা আছে। অরুণ ভগত জানালেন, আমরা জানি এরা কারা। আপনি বলুন। দুটো রাস্তা আছে। একটা হল আজই রিজাইন করুন। অথবা তদন্ত শুরু করা হবে। সেহগল সেদিন ইস্তফা দিলেন। সেহগল ছিলেন সিআইএ এজেন্ট। পরবর্তীকালে যা নিয়ে প্রবল ঝড় ওঠে। কারণ যেভাবেই হোক ভারতের ক্রায়োজেনিক প্রযুক্তি গবেষণাকে আটকানোর জন্য সিআইএ যে প্ল্যান করেছিল তার প্রধান অপারেটর হিসাবেই বাছাই করা হয়েছিল রতন সেহগলকে। এই অভিযোগটি পরবর্তীকালে করেছেন স্বয়ং সেই বিজ্ঞানী নাম্বি নারায়ণ। তাঁর অভিযোগ তাঁকে জেরা করা হয় যখন তখন গোটা জিজ্ঞাসাবাদ পর্ব পিছন থেকে পরিচালনা করেন এই রতন সেহগল। সুতরাং তিনি যে আদতে সিআইয়ের হয়ে কাজ করছিলেন তা নিয়ে সন্দেহ নেই। এবং সেই সঙ্গেই তিনি যুক্ত করেছিলেন কেরল পুলিশের কিছু পুলিশ অফিসারকেও। ইনস্পেক্টর বিজয়ন তাঁর এক পুলিশকর্তাকে বলেন, মরিয়ম রশিদাকে গ্রেপ্তার করা হলে এক বিশেষ পুলিশ অফিসারের ডিরেক্টর জেনারেল হওয়া আটকে দেওয়া যাবে। কারণ মরিয়ম সেই আইজিকে ফোন করেছে এরকম প্রমাণ আছে। কেরল পুলিশ আর কেরল রাজনীতির লবির কারণেই এরপর চক্রান্ত তৈরি হয় গভীর। আর কেরল পুলিশের এক কর্তাই রতন সেহগলকে যখন জানান মালদ্বীপের এক মহিলার কাছে বৈধ ভিসা নেই, তখনই প্ল্যান করা হল ওই মহিলাকে পাকিস্তানের চর সাজাতে হবে। আর দুই বিজ্ঞানীকে হানি ট্র্যাপ আর স্পাইংয়ের ফাঁসে জড়িয়ে দেওয়া হোক। রতন সেহগলের বিরুদ্ধে সন্দেহ প্রথম তৈরি হয় ১৯৯৪ সালেই। একটি গোপন ও রহস্যময় ফোন এসেছিল আইবি দপ্তরের এক আধিকারিকের কাছে। সেই প্রথম শুরু সন্দেহ। কিন্তু কেন রতন সেহগলের বিরুদ্ধে কোনো আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি? তিনি নির্বিঘ্নে আমেরিকা চলে গিয়েছেন। কীভাবে? কারা সাহায্য করলেন তাঁকে? এই প্রশ্ন আজও তাড়িয়ে নিয়ে চলেছে ভারতের মহাকাশ বিজ্ঞানীদের। ওই প্ল্যান সম্পূর্ণ সফল। কারণ এই স্পাই স্ক্যান্ডালের ফলে ভারতের ক্রায়োজেনিক প্রযুক্তি গবেষণা সম্পূর্ণ বিভ্রান্ত হয়ে গিয়েছিল বহু বছরের জন্য। বিপুল আর্থিক লাভ হয়েছিল আমেরিকা আর ইওরোপের।

১৯৬৬ সালের ২৪ জানুয়ারি ফ্রান্সের উপরে মঁ ব্লাঁ পর্বতশিখরের কাছে এয়ার ইন্ডিয়ার বম্বে থেকে নিউইয়র্ক ফ্লাইটের রহস্যময় দুর্ঘটনায় মারা গিয়েছিলেন ভারতের প্রথম পরমাণু প্রযুক্তি বিজ্ঞানী হোমি জাহাঙ্গির ভাবা। কখন হয়েছিল ওই এয়ারক্র্যাশ? ঠিক যখন ভারত একটি পরমাণু বিস্ফোরণ পরীক্ষা করবে। সেটা চিনের পরমাণু বিস্ফোরণের পালটা জবাব। সব স্থির হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু সেই সময়ই রহস্যময় বিমান দুর্ঘটনায় মৃত্যু হল ওই পরীক্ষার প্রধান পুরোহিত ডক্টর হোমি জাহাঙ্গির ভাবার।

১৯৭১ সালের ৩০ ডিসেম্বর। কোভালামের এক হোটেলের রুমে মাত্র ৫২ বছর বয়সি এক মহাকাশ বিজ্ঞানীর মৃতদেহ পাওয়া গেল। তাঁর কোনোরকম হার্টের রোগ ছিল না। ছিল না কোনো দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতা। সেই বিজ্ঞানীর নাম বিক্রম সারাভাই। ভারতের মহাকাশ বিজ্ঞান গবেষণার পথিকৃৎ।

এরকম আরও কত রহস্য লুকিয়ে আছে গোপন চক্রান্তের অজানা ফাইলে? এসব রহস্য মৃত্যুর গোপন ফাইলগুলো খুলবে কবে?

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *