ব্ল্যাক করিডর ১.১৫

ডেডবডিটা একটু আগে দেখা গেল। কয়েক ঘণ্টা আগে কিন্তু ছিল না। ভাবছিল লছমন। অসম্ভব ঠান্ডা পড়েছে। আর তেমন কুয়াশা। ইন্দোরের ট্রেনটা একটু আগেই চলে গেল। তবে লেট। আপাতত এরকমই চলবে। অন্তত এই দেড় মাস তো টাইমের কোনো ঠিক থাকবে না জানা কথা। প্রায় সব ট্রেনই তিন চার পাঁচ ঘণ্টা মিনিমাম লেট। কী করা যাবে? এত কুয়াশা। প্রায় জিরো ভিজিবিলিটি। এক হাত দূরের দৃশ্যও দেখা যাচ্ছে না। সেই কুয়াশা ভেদ করে গ্যাংম্যান লছমন ভাঙ্গি ছুটছে। ছুটতে ছুটতে আসছে মাকসি স্টেশনের ১ নং প্ল্যাটফর্মের দিকে। পড়িমড়ি করে। একটু পর আবার একটা ট্রেন আসবে আপ লাইনে। তার আগেই কিছু একটা করতে হবে। প্রাণপণ দৌড়নোর ফলে লছমনের কপালে, মুখে ঘাম জমছে। শ্বাস দ্রুত। রেললাইন ধরেই ছুটছে লছমন। উজ্জয়িনীর কাছে এই মাকসি স্টেশনের স্টেশনমাস্টার সবেমাত্র চা নিয়ে বসেছেন। শীতকালে সমস্যা হল এত তাড়াতাড়ি পেপার আসবে না। ৯ টার প্যাসেঞ্জারে পেপার পাওয়া যেতে পারে। ততক্ষণ অপেক্ষা। একটু আগেই খবর এসেছে আপ ট্রেনটা আরও ৫০ মিনিট লেট। হাতে টাইম আছে। সকালের দিকটাই যা একটু চাপ বেশি। দিল্লি, জম্মু, ভোপাল থেকে ট্রেন রাতের দিকে ছেড়ে আসে, সেগুলো এই ভোর ভোর এখান থেকে পাস করে। বেশিরভাগ অবশ্য স্টপেজ নেই। তবে সিগন্যালিংটা ইমপরট্যান্ট। বিশেষ করে এই শীতকালে। ৭ জানুয়ারি ২০১২। লছমন ভাঙ্গিকে ঊর্ধ্বশ্বাসে ঘুরে ঢুকে আসতে দেখে ভুরু কুঁচকে গেল স্টেশনমাস্টারের। আবার কী হল? লছমন জানাল, সাব, বডি পড়ি হ্যায়..ট্র্যাককে বাহার। লেড়কি! স্টেশনমাস্টার চা শেষ করছেন। আবার বডি? এই এক জ্বালাতন। সবাই হয় সুইসাইড করতে ট্রেনকেই বেছে নেয়, আর নয়তো মার্ডার করে ট্রেনের লাইনে ফেলে রেখে যায়। যত ঝামেলা রেলের। এখন হ্যাপা সামলাতে হবে। বড়ি তোলা, জিআরপি ডাকা, হসপিটালে পাঠানো। সবথেকে বড় কথা মেমো তৈরি করে পাঠাতে হবে এখনই। কতক্ষণ লাইন বন্ধ রাখতে হবে কে জানে! যন্ত্রণার একশেষ! লছমন জানাল, বেশি বয়স না সাব। জওয়ান লেড়কি! কিছুক্ষণের মধ্যে জিআরপির সাব ইনস্পেক্টর, স্টেশনমাস্টার, গ্যাংম্যান লছমনরা এসে ভালো করে লক্ষ করল। মেয়েটির পরনে লাল কুর্তা। তার উপর ভায়োলেট আর গ্রে রঙের একটা পিউমা জ্যাকেট। দেখে তো মনে হচ্ছে আত্মহত্যাই। তবে জায়গায় জায়গায় জামা কাপড় ছেঁড়া। ঝাঁপ দিয়েছে? নাকি মার্ডার? রেপও হতে পারে। আজকাল তো এসবই হচ্ছে। কিন্তু লাইনের এতটা বাইরে কেন? ছিটকে গিয়েছে? তাই হবে! ইসস! এত বাচ্চা বয়সে এসব যে কেন করে আজকালকার মেয়েগুলো? ভাবছিলেন স্টেশনমাস্টার। বডি পাঠানো হল মর্গে। দুদিন পর পোস্ট মর্টেম রিপোর্ট জানাল ফিমেল, ২১ থেকে ২৫ বছরের মধ্যে বয়স। নাকের নীচে শুকনো ব্লাড জমা। জিভ চোয়ালের মাঝখানে বেঁকে আছে। উপরের দিকে দুটো দাঁত মিসিং। ঠোঁট আড়াআড়ি ফাটা। মুখে কিছু ফিঙ্গারপ্রিন্ট পাওয়া যাচ্ছে। পোস্ট মর্টেমের শেষ বাক্য, ইন আওয়ার ওপিনিয়ন, মৃত্যু হয়েছে শ্বাসরুদ্ধ হয়ে। কোনোভাবে সাংঘাতিক দমবন্ধ করে রাখা হয়েছিল মৃতকে। সুতরাং আইনের পরিভাষায় একে বলা হয় হোমিসাইড। হত্যা। অর্থাৎ মেয়েটি আত্মহত্যা করেনি। কিন্তু কে এই মেয়ে? এক সপ্তাহ, দু সপ্তাহ ধরে আন আইডেন্টিফায়েড। নামপরিচয়হীন। কেউ আসছে না খোঁজ করতে। আর কতদিন রাখা সম্ভব মর্গে? বেওয়ারিশ হয়েই থাকবে? ঠিক ২৩ দিনের মাথায় মেহতাব সিং দামোর নামের এক অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক এলেন উজ্জয়িনী হাসপাতালের মর্গে। দেখলেন সেই বড়ি। এবং কান্নায় ভেঙে পড়লেন। ওই মৃতদেহ তাঁর কন্যার। ১৯ বছরের নম্রতা। ইন্দোরের কলেজ থেকে সে ছিল নিখোঁজ। কলেজ থেকেই বাড়িতে খবর পাঠানো হয়েছিল যে মেয়েকে পাওয়া যাচ্ছে না। ইন্দোরের মহাত্মা গান্ধী মেডিকেল কলেজের ডাক্তারির ছাত্রী নম্রতা জানুয়ারি মাসের দ্বিতীয় দিনে একদিন আচমকা উধাও হয়ে যায়। মেহতাব দামোর মেয়ের বড়ি বাড়িতে নিয়ে গিয়ে শেষকৃত্য সম্পন্ন করলেন। এবং এক সপ্তাহ পর আবার পুলিশের কাছে এসে বললেন, আমার মেয়ের হত্যাকারী কে? তদন্ত করছেন না কেন? আমি এফআইআর করতে চাই। পুলিশ জানাল একটা কেস তো হয়েই আছে। আমরা দেখছি। ১০ দিন পর তাঁকে ডেকে পাঠানো হল। এবং পুলিশ জানাল, আগের পোস্টমর্টেম ভুল। খুনটুন কিছু না। দেখা যাচ্ছে মেয়েটি আত্মহত্যা করেছিল। মেহতাব দামোর বিস্মিত। বললেন, খামোখা আত্মহত্যা করবে কেন? প্রবলেম তো কিছু থাকলে জানতে পারতাম আমরা। আমাদের জানায়নি কিছু। এমনকী খ্রিস্টমাসে এসে বাড়িতে আনন্দ করলাম সবাই মিলে। হঠাৎ কী হবে? পুলিশ অফিসার হেসে জানালেন, সব কিছু কী আর বাবা মাকে জানায় ছেলেমেয়ে? কতরকম ব্যাপার থাকে। অযথা আর ঘাঁটাঘাঁটি করে লাভ কী? যান বাড়ি যান। মেহতাব দামোর মাথা নীচু করে ফিরলেন। কেস ক্লোজ হয়ে গেল।

তিন বছর পর। ২০১৫ সালের জুলাই মাসে হঠাৎ মধ্যপ্রদেশের মফসসল এলাকার মেহনগরে এসে হাজির ৩৮ বছরের এক যুবক। নাম অক্ষয় সিং। এসেছে দিল্লি থেকে। আজ তক টিভি চ্যানেলের সাংবাদিক। পরিচিত মুখ। এনার্জেটিক। তিনি হলেন আজ তকের ইনভেস্টিগেশন টিমের সদস্য। যে কোনো রহস্যময় ঘটনার তদন্তমূলক রিপোর্ট করতে সিদ্ধহস্ত। সেই তিনি মেহতাব দামোরের বাড়ির ঠিকানা জানতে চান। দেখা হল। নম্রতার মৃত্যু নিয়ে কথা বলতে চান অক্ষয়। কীভাবে মৃত্যু হল মেয়ের? নম্রতা কবে এবং কীভাবে মেডিকেল কলেজে চান্স পেয়েছিল? মেহতাব দামোর ভেবেছিলেন এবার বোধহয় মেয়ের অস্বাভাবিক মৃত্যু নিয়ে কোনো সুরাহা হবে। তিনি যা জানেন সব বললেন। সমস্ত কাগজপত্র দিতে চাইলেন অক্ষয় সিংকে। মেহতাব সিং দামোর বসেছিলেন একটি আর্মচেয়ারে। সামনে বেতের সোফায় বসলেন অক্ষয়। সামনে টিভি চলছে। চলছে ইন্টারভিউ। কাগজগুলো ফোটোকপি করাতে হবে। স্থানীয় দোকান থেকে ফোটোকপি করে আনাও হল। ইন্টারভিউ শেষ। এবার চা আসছে। একটি ট্রেতে করে এল চা। কয়েক চুমুকেই প্রায় চা শেষ করলেন অক্ষয় সিং। এবার যেতে হবে গোয়ালিয়র। সেখানে একটি যুবকের অস্বাভাবিক অন্তর্ধান হয়েছে। এই একই তদন্তের অঙ্গ সেটিও। তাই চলে যাওয়ার জন্য রেডি অক্ষয় সিং। শেষ প্রশ্ন করতে যাবেন। হঠাৎ তাঁর মুখ থেকে ফেনা বেরোতে শুরু করল। চোখ বিস্ফারিত।বুক চেপে বসে পড়লেন। দামোর হতভম্ব। এ কি হল! হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার আগেই অক্ষয় সিং মারা গেলেন। সম্পূর্ণ সুস্থ ছিলেন আগের মুহূর্তেও। অক্ষয় সিং কীসের তদন্ত করছিলেন? মধ্যপ্রদেশ ব্যবসায়িক পরীক্ষা মণ্ডলের অধীনে যত চাকরি ও উচ্চশিক্ষায় ভর্তির পরীক্ষা হয় সেই পরীক্ষা ব্যবস্থার ভয়াবহ দুর্নীতি আর অনিয়মের অভিযোগের তদন্ত করতে চাইছিলেন অক্ষয় সিং। তিন বছর আগে উজ্জয়িনীর কাছে রেললাইনে পড়ে থাকা মৃত নম্রতা দামোরের সঙ্গে সম্পর্ক কী এই তদন্তের? তাঁর বাড়িতে কেন এলেন তিনি? কারণ হিসাবে জানা গেল বিস্ফোরক তথ্য। নম্রতা নাকি ঘুরপথে দুর্নীতির মাধ্যমে কীভাবে মেডিকেল কলেজে চান্স পাওয়া যায় তা জানত। যখন জেনেছিল যে তাঁকে পুলিশ জেরাও করতে পারে, তারপরই কি সে উধাও হয়ে গেল? কিন্তু ১৯ বছরের মেয়েটির মৃত্যু হল কীভাবে? কে হত্যা করল? আত্মহত্যা কি সম্ভব? এসব প্রশ্ন সঙ্গে করে সেই মৃত্যুরহস্যের তদন্ত করতে এসেছিলেন অক্ষয়। আর একইভাবে রহস্যময়ভাবে মারা গেলেন সেই সাংবাদিক। বিচ্ছিন্ন ঘটনা? কাকতালীয়? একেবারেই নয়। কারণ ২০১০ সাল থেকে আজ পর্যন্ত মধ্যপ্রদেশ এই নিয়োগ পরীক্ষার অনিয়ম আর দুর্নীতির সঙ্গে যাঁরাই যুক্ত হয়েছে অভিযুক্ত হিসাবে, সন্দেহভাজন হিসাবে, অপরাধী হিসাবে, মিডলম্যান হিসাবে, এজেন্ট হিসাবে…তাঁদের মধ্যে একের পর এক ছাত্র, পুলিশ, কলেজের ডিন, অধ্যাপক, রাজ্যপালের সচিবের পুত্র, মুখ্যমন্ত্রীর দপ্তরের ঘনিষ্ঠ আমলা, ডাক্তারের রহস্যময় মৃত্যু হয়েছে। কতজন? অন্তত ৪৮! সেই তদন্তে নেমেছিলেন অক্ষয় সিংও। নম্রতা সিং দামোরের মৃত্যুকে প্রথমে হত্যা বলা হয়েছিল। পরে সেটি আত্মহত্যা হয়ে গেল কীভাবে? তদন্তে জানা গেল মধ্যপ্রদেশ পুলিশ নম্রতা দামোরের দ্বিতীয় পোস্ট মর্টেম রিপোর্ট তৈরি করেছিল। বাবা মেহতাব দামোর মেয়ের বডি নিয়ে এসে শেষকৃত্য সম্পন্ন করা সত্ত্বেও দ্বিতীয়বার কীভাবে সম্ভব পোস্টমর্টেম? এখানেই শেষ নয় রহস্য। গোটা বিশ্বের অপরাধের ইতিহাসে সম্ভবত এটাই একমাত্র ঘটনা যেখানে কোনো পোস্টমর্টেমে লেখা হয়েছে বিস্ময়কর কজ অফ ডেথ! কজ অফ ডেথ মানে মৃত্যুর কারণ কী। পোস্টমর্টেমের সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ অংশ তো ওটাই! নম্রতার দ্বিতীয় পোস্ট মর্টেমের রিপোর্টে লেখা ছিল, মৃত্যুর কারণ আত্মহত্যা…প্রেমে ব্যর্থ হয়ে আত্মহত্যা করেছে এই মেয়েটি! পোস্টমর্টেমে কখনও জানা সম্ভব কেউ আত্মহত্যা করেছে প্রেমে ব্যর্থ হয়ে?

একটি চাকরি আর হায়ার স্টাডিজের পরীক্ষা কেলেঙ্কারি এরপরই ঘুরে গেল এক ভয়ংকর ক্রাইম থ্রিলারের দিকে! স্বাধীন ভারতের অপরাধ ইতিহাসে ভয়াবহ এই সিরিয়াল ক্রাইম থ্রিলারেরই নাম ব্যাপম মিস্ট্রি!!

সিস্টেমটার নাম ইঞ্জিন-বগি সিস্টেম! জানা গেল ২০১৩ সালে। সকাল সাড়ে ৮টা। ইন্দোর শহরের বাইরেই হোটেল পথিক। রুম নম্বর ১৩। স্নান করে রেডি হচ্ছে এক যুবক। দ্রুত বেরোতে হবে তাকে। বেরনোর মুখেই আচমকা তিনজন পুলিশ অফিসার দোতলায় উঠে এসে দরজা আগলে দাঁড়ালেন। কী ব্যাপার স্যার?

রুমে চলো বলছি। বললেন, শীতল কণ্ঠের পুলিশ অফিসার।

তোমার নাম কী?

ঋষিকেশ ত্যাগী স্যার।

আইডি দেখি!

এই যে স্যার। আইডি দেখা গেল। নাম ঠিকই আছে। কোথায় যাচ্ছ?

স্যার পরীক্ষা আছে।

কীসের?

ডাক্তারি এন্ট্রান্স স্যার।

বাবার নাম কী? ডেট অফ বার্থ?

ঋষিকেশ আমতা আমতা করছে। পুলিশ অফিসার ধমকে বললেন, কী হল? বলো! স্যার মনে পড়ছে না।

মনে পড়ছে না? বাবার নাম, জন্মতারিখ মনে পড়ছে না? চলো থানায়। মনে পড়বে। গ্রেপ্তার করা হল তাকে। ঋষিকেশ ত্যাগী নয়। ঠিক দু ঘণ্টা লাগল তাকে ভাঙতে। বাচ্চা ছেলে। কতক্ষণ পারবে পুলিশের জেরা সামলাতে! অতএব ভেঙে পড়ল। জানা গেল তার আসল নাম রমাশংকর। উত্তরপ্রদেশের কানপুরে সে ডাক্তারির ছাত্র। ইন্দোরে এসেছে কোনো এক ঋষিকেশ ত্যাগীর হয়ে পরীক্ষা দিতে। সে একা নয়। হোটেল পথিকে আরও ১৮ জন তরুণ এসে উঠেছিল। প্রত্যেকেই উত্তরপ্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ, বিহারের কোনো না কোনো মেডিকেল কলেজের পড়ুয়া কিংবা ইনস্টিটিউটে পড়ে। তাদের কাজ কী? কিছুই না। স্রেফ ডাক্তারির কোর্সে ভর্তি হওয়ার জন্য পরীক্ষার হলে গিয়ে বসে যতটা ভালো সম্ভব পরীক্ষাটা দিয়ে দেওয়া। আই কার্ড নিয়ে ভাবনা নেই। সেসব হয়ে যায়। স্বাভাবিকভাবেই যাঁরা ডাক্তারির ভালো ছাত্র তাঁদের কাছে প্রবেশিকা পরীক্ষা দেওয়া কোনো সমস্যাই নয়। এসব কী নতুন কথা নাকি? আমরা তো দেখেছি মুন্নাভাই এমবিবিএসে? মুন্নাভাইয়ের হয়ে দিনের পর দিন পরীক্ষা দিয়ে গিয়েছেন ডক্টর রুস্তম। এবং তিনি ছিলেন দুর্দান্ত ছাত্র। সুতরাং রুস্তম যা লিখেছেন, তাতেই ফার্স্ট হয় মুন্না।

মধ্যপ্রদেশের ব্যাপম পরীক্ষায় এরকম অসংখ্য ডক্টর রুস্তমের সাপ্লাই ছিল। কেউ আসে বিহার থেকে। কেউ আসে কানপুর থেকে। কেউ আসে লখনউ থেকে। ৫০ হাজার টাকা পায় একটি করে পরীক্ষার জন্য। এই অল্পবয়সি ছাত্রদের কাছে সেটা অনেক টাকা। কাজ কিছুই নেই। পরীক্ষার আগের দিন রাতে নিজেদের এলাকা থেকে ট্রেনে চলে আসে। যেখানে পরীক্ষার সেন্টার পড়ে সেই শহরে। স্টেশনে থাকে রিসিভ করার লোক। তারা নিয়ে সোজা ঢুকিয়ে দেয় হোটেলে। অন্তত থ্রি থেকে ফোর স্টার হোটেল। কোনো কষ্ট নেই। নিয়মটা কী? কাকে টার্গেট করা হবে? ভারতবর্ষের প্রায় সব শহরেই সরকারি চাকরি আর ডাক্তারি ও ইঞ্জিনিয়ারের কোর্সে ভর্তির পরীক্ষায় চান্স পেতে টিউটরিয়াল ইনস্টিটিউট আছে। সমস্ত মফসসল শহরেও আছে। আর বড় জেলা সদরে তো আছেই। নিশ্চয়ই লক্ষ করেছেন এসব ইনস্টিটিউটের একটি কমন বৈশিষ্ট্য আছে? সেটি হল মাঝেমধ্যেই ইনস্টিটিউটের বাইরে বোর্ড টাঙিয়ে দেওয়া হয়। সেখানে নাম, ঠিকানা, ছবি দেওয়া থাকে কিছু ছাত্রছাত্রীর। উপরে লেখা থাকে এ মাসের ক্লাস টেস্ট কিংবা ইউনিট টেস্টে এই ছাত্রছাত্রীরা সব কোশ্চেনের আন্সার দিতে পেরেছে। এরাই টপার। আর যেসব ছাত্রছাত্রী ডাক্তারি আর ইঞ্জিনিয়ারিং কিংবা সরকারি চাকরির পরীক্ষায় চান্স পেয়ে গিয়েছে তাদের নাম, ছবি বোর্ডে বড়বড় করে টাঙানো কিংবা সংবাদপত্রেও বিজ্ঞাপন দেওয়া তো একেবারেই সাধারণ প্রবণতা। সর্বত্রই এটা দেখা যায়। কিন্তু এসবের আসল কারণ কী? একটা কারণ ওইসব টিউটোরিয়ালে যাতে নতুন নতুন ছাত্রছাত্রী ভর্তি হতে আসে সেই লক্ষ্যে এই সাফল্যের বিজ্ঞাপন। সেটা তো হতেই পারে। কোনো আপত্তি নেই। কিন্তু কানপুর, লখনউ, রক্সৌল, পাটনা, ভোপালের এরকম বেশ কিছু ইনস্টিটিউট আছে যাদের এই ভালো সফল ছাত্রছাত্রীদের নাম ছবি টাঙিয়ে দেওয়ার জন্য রয়েছে বিশেষ গোপন এক ডিল। এসব ইনস্টিটিউটের বাইরে নিয়ম করে ঘোরাফেরা করে দালাল। তারাই আইডেন্টিফাই করে এই সফল ছাত্রদের। এবং তারপর খোঁজ করে কাদের বাড়ির আর্থিক অবস্থা তেমন জোরালো নয়। সোজা কথায় টাকার দরকার কাদের বেশি। সেইসব ছেলেদের টার্গেট করা হয়।

আর দ্বিতীয় টার্গেট মেডিকেল কলেজের হোস্টেলে থাকা তুলনামূলক দরিদ্র ডাক্তারি পাঠরত ছাত্র। যারা চায় ঘর ছেড়ে থেকে একটু টাকার মুখ দেখতে। বড়লোক বন্ধুদের হাতে দামি ফোন। দামি পোশাক। তারা কুঁকড়ে থাকে। আর বাড়িতেও পাঠানো যেতে পারে টাকা। বলবে এখানে টিউশন করে আদায় করা টাকা। এই দুটি টার্গেটকে দেওয়া হয় বিপুল টাকার অফার। পরীক্ষা প্রতি ৫০ হাজার থেকে ১ লক্ষ টাকা। যাতায়াত সব খরচ দালালদের। তারা শুধু একটি শহরে যাবে। তিন ঘণ্টা চার ঘণ্টার পরীক্ষা দেবে। ফিরে আসবে। টাকা অ্যাডভান্স। যাবতীয় পরীক্ষা দিতে হবে অন্য কোনো ছাত্রছাত্রীর হয়ে। সেই নামে আই কার্ড হয়ে যাবে। এই হল সোজাসাপটা ব্যবস্থা। পাশাপাশি ছিল আর একটি সিস্টেম। যেকথা বলেছি আগেই। ইঞ্জিন বগি সিস্টেম। পরীক্ষার হলে প্রকৃত পরীক্ষার্থী থাকবে। তার পাশে অথবা আগের বেঞ্চে সিট ফেলা হবে জাল পরীক্ষার্থীর। প্রশ্নপত্র পাওয়া মাত্র জাল পরীক্ষার্থী লিখতে শুরু করবে। এবং পরীক্ষা শেষে তার খাতাই জমা পড়বে অন্যের নামে। পাশে বা পিছনে থাকা প্রকৃত পরীক্ষার্থীর খাতা জমা পড়বে বটে। কিন্তু উধাও করে দেওয়া হবে খাতা তালিকাভুক্ত করে বান্ডিল হওয়ার আগেই। জাল পরীক্ষার্থীর খাতাই হয়ে যাবে প্রকৃত পরীক্ষার্থীর নামাঙ্কিত আসল খাতা। এবং জাল পরীক্ষার্থী নিজে ডাক্তারি বা ইঞ্জিনিয়ারিং ছাত্র। তার কাছে এসব এন্ট্রান্স পরীক্ষা কিছুই না। তাই তার উত্তরপত্র হান্ড্রেড পার্সেন্ট ত্রুটিহীন হবেই। এরই নাম ইঞ্জিন বগি সিস্টেম। ইঞ্জিন টেনে এগিয়ে নিয়ে যাবে বগিকে। তার জন্য বগিকে দাম দিতে হবে অন্তত ৩ থেকে ৫ লক্ষ টাকা করে। কখনও তারও বেশি। পরীক্ষার পরই ইঞ্জিন উধাও হয়ে যাবে। বগির নাম জ্বলজ্বল পরীক্ষা পাশের লিস্টে। ধরা যাক সেই নামটি র‍্যাঞ্চো শামলালদাস চাঞ্চের।!! থ্রি ইডিয়টসের প্লট!

মধ্যপ্রদেশ পুলিশের টাস্ক ফোর্স ধীরে ধীরে তদন্ত এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। একজন নয়… …দুজন নয়…তিন জন নয়….। নাম জড়িয়ে যাচ্ছে অসংখ্য। একজনকে জেরা করা হলেই নাম বেরোচ্ছে আরও চারজনের। সেই চারজনকে জেরা করে আরও আটজনের নাম পাওয়া যাচ্ছে। কেউ মিডলম্যান। কেউ দালাল। কেউ প্রক্সি পরীক্ষাদাতা। কেউ ডাক্তারি পড়ুয়া কিন্তু জাল পরীক্ষা চক্রের সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিয়ে কমিশন নিয়েছে। টাকা দিয়ে পরীক্ষায় পাশ করেছে। নাম বাড়ছে। অভিযুক্ত বাড়ছে। গ্রেপ্তারি বাড়ছে। কিন্তু জামিনও পাচ্ছে একে একে অনেকেই। কারণ সাংঘাতিক কোনো অপরাধ নয় যে জামিন আটকে যাবে। তাই জামিন হয়েই যায়। সকলের বিরুদ্ধে মামলা চলবে। কিন্তু আপাতত জামিনে মুক্তি। নতুন করে তদন্তে নেমে এদের সকলকেই আবার দরকার পড়বে। তাই সকলের খোঁজ করা হচ্ছে। এবং ঠিক তখন থেকে কেঁচো খুঁড়তে বেরোতে শুরু করল একের পর এক কেউটে।

ঝাঁসির আয়ুর্বেদিক মেডিসিন অ্যান্ড সার্জারি কলেজ থেকে পাশ করা নরেন্দ্র রাজপুতের নাম জড়িয়েছে। সে ছিল মিডলম্যান। বাড়ি উত্তরপ্রদেশের মাহোবা জেলার পারপতার গ্রামে। নিজের ক্লিনিক খুলেছে সে। মাঝেমধ্যেই সে যায় ঝাঁসি আর বীণায়। সেখানে কীসের জন্য যাচ্ছে তা বাড়িতে জানায়নি কখনও। ২০১৪ সালের ১৩ এপ্রিল সকাল ৭টায় নরেন্দ্র রাজপুত বাড়ি থেকে বেরিয়ে ঝাঁসি যাওয়ার সময় আচমকা বাস আসার আগেই বুকে ব্যথা অনুভব করল। ঠিক সাত মিনিটের মধ্যে মৃত্যু। তিন মাস পর পুলিশ তার খোঁজে এসেছিল গ্রামে। তার বিরুদ্ধে ব্যাপম পরীক্ষায় প্রশ্নপ্রত্র সাপ্লাই এর অভিযোগ। তাকে জেরা করতে চায় পুলিশ। কিন্তু পুলিশ আসার তিন মাস আগেই নরেন্দ্র মারা গেল। আচমকা! তার পোস্ট মর্টেম রিপোর্ট পাওয়া যায়নি। বারংবার চেয়েও।

সাগর মেডিকেল কলেজের ছাত্র অনুজ উইকে, বাবাকে বলেছে গাড়িটা লাগবে। দুজন বন্ধুকে নিয়ে একটু মেলায় যাবে। সপ্তাহান্তিক ছুটি ছিল। তাই ডাক্তারি পড়ার প্রবল পরিশ্রম থেকে একটু রিলাক্স করতে মেলায় ঘুরতে যাওয়া। অনুজ নিজেই চালাচ্ছিল গাড়ি। ২০১০ সালের ১৪ জুন। মধ্যপ্রদেশের বিভিন্ন অঞ্চল দিয়ে বয়ে গিয়েছে একটি বিখ্যাত নদী। তার নাম বেতোয়া। এই নদী খুব জনপ্রিয়। তাই লক্ষ করবেন মধ্যপ্রদেশের চম্বল এলাকার অসংখ্য হোটেলের নাম হয় বেতোয়া হোটেল। ধাবার নাম বেতোয়া ধাবা সেন্টার। মেলার নাম বেতোয়া ফেয়ার। বেতোয়া মেডিকেল স্টোর। হোশঙ্গাবাদ রোডে এরকম এক ‘বেতোয়া ধাবা’ থেকে কিছু খেয়ে বেরনোর পরই আচমকা উলটোদিক থেকে আসা একটা ট্রাক ধাক্কা মারল সেই গাড়িকে। অনুজ তো বটেই। তার বন্ধুরাও স্পট ডেড। অনুজ উইকে কী সম্পূর্ণ নিরীহ এক ডাক্তারি ছাত্র? না। তার নামে ততদিনে অভিযোগ ছিল ডাক্তারির পরীক্ষায় জাল পরীক্ষার্থী সাপ্লাই দেওয়ার সঙ্গে সে ছিল সহায়ক। অর্থাৎ দালাল চক্র তাকে পাকড়াও করে বলেছিল দুজন অন্তত মেডিকেল স্টুডেন্ট যোগাড় করে দিতে। যারা অন্য পরীক্ষার্থীদের হয়ে একটা এক্সাম দিয়ে দেবে। পুলিশ সবেমাত্র প্রস্তুতি নিচ্ছিল অনুজকে জিজ্ঞাসাবাদের। ঠিক এক সপ্তাহের মধ্যেই ওই দুর্ঘটনা।

১৯ বছরের তরুণ মাচ্ছন ভোপালে প্রি মেডিকেল টেস্ট দিয়েছিল। এবং চান্স পেয়েছিল ডাক্তারি পরীক্ষায়। কিন্তু তদন্তে জানা গেল তার হয়ে পরীক্ষা দিয়েছিল অন্য কেউ। কে সে? কীভাবে তার সঙ্গে যোগাযোগ হল? পুলিশ ডেকে পাঠিয়েছিল তাকে। জেরা করা হয়। লাগাতার। কিন্তু তরুণ স্বীকার করেনি। ভোপালের গান্ধী মেডিকেল কলেজের ছাত্র। ২০১৩ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর মধ্যরাত। ভোপালের কোলার রোডে বাইক নিয়ে যাচ্ছিল তরুণ। পিছনে তার এক বন্ধু। পরদিন তরুণের যাওয়ার কথা পুলিশের কাছে হাজিরা দেওয়ার জন্য। সকালে মৃতদেহ আবিষ্কৃত হল রাস্তার পাশে। বন্ধুটি জানাল একটি গাড়ি পিছন থেকে এমনভাবে এসেছিল যে তরুণ ভারসাম্য হারিয়ে ডিভাইডারে ধাক্কা মারে এবং ছিটকে পড়ে। তরুণের তৎক্ষণাৎ মৃত্যু হয়।

মেডিকেল স্টুডেন্ট জ্ঞান সিং জাটবের বিরুদ্ধে সব মিলিয়ে আটটি মামলা রয়েছে। সে ছিল জাল পরীক্ষার্থী সংগ্রহ করে দেওয়া আর মেডিকেল কোর্সে চান্স পাওয়ার জন্য ব্যাকুল দরকার হলে টাকা দিয়ে ভর্তি হতে প্রস্তুত ছেলেমেয়েদের খোঁজ রাখার গোপন এজেন্ট। ভিন্দ জেলার লাহার গ্রামের জ্ঞান সিং জাটব মেডিকেল কোর্স পড়তে পড়তেই বাড়ির অমতে একটি মেয়েকে বিয়ে করে বসেছিল। তাই সে গ্রামে থাকতে পারেনি। আলাদা থাকতে হয়েছে। গোয়ালিয়রে। হঠাৎ একদিন জ্ঞান বমি করতে শুরু করে। যা খাচ্ছে তাই বমি হয়ে যাচ্ছে। স্থানীয় ডাক্তার জানালেন জন্ডিস। কিংবা কোনো ইনফেকশন। সারল না সেই অসুখ। জ্ঞানের মৃতদেহ আচমকা গ্রামে ফিরে এল। কীভাবে মারা গেল? সামান্য এক ইনফেকশনে? ভোপালের পুলিশ গ্রামে এসে খোঁজ করার পর জানা গেল জ্ঞানের প্রধান উপার্জন ছিল প্রি মেডিকেল টেস্টে চিটিং করার জন্য। তার নাম যখনই পুলিশের টাস্ক ফোর্সের সন্দেহের তালিকায় ঢুকে গেল তার চার সপ্তাহের মধ্যে জ্ঞান সিং জাটবের ইনফেকশনে মৃত্যু।

বিজয় ছোটেলাল সিং সাজাপুর জেলে অর্ডার সাপ্লাই করতেন। মূলত জেল হাসপাতালে মেডিসিন। নবোদয় বিদ্যালয়ের ছাত্র বিজয় প্রি মেডিকেল টেস্টে ভর্তি হতে চেষ্টা করেছিলেন দ্বাদশ শ্রেণির পরীক্ষার পর। পারেননি। শেষ পর্যন্ত ফার্মেসি ডিগ্রি পেয়েই সন্তুষ্ট হতে হয়েছিল। এরপর বাড়ি থেকে কিছু টাকা নিয়ে রেওয়া জেলার সিহড়ে চালু করেন মেডিসিন শপ। ২০১৫ সালে তাকে হঠাৎ স্পেশাল টাস্ক ফোর্স ডেকে পাঠাল থানায়। আর গ্রেপ্তার করা হল। কারণ তিনি নাকি যুক্ত ছিলেন কোন কারাগারে নতুন নিয়োগের সম্ভাবনা রয়েছে সেই খবর আগাম বের করে আনতে। সেই নিয়োগ পরীক্ষার বিজ্ঞাপন তারপরই কোনো এক সময় প্রকাশিত হত সরকারিভাবে। ততদিনে স্থির করা হয়ে যেত কতজন জাল পরীক্ষার্থী কোন কোন পোস্টের জন্য কোন কোন সেন্টারে পাঠানো হবে। ঠিক সেই অনুযায়ী প্ল্যান করা হত। তিন মাস পর জেল থেকে জামিন পেলেন ৩৫ বছরের বিজয় ছোটেলাল সিং। পরের বছর আবার ডেকে পাঠানো হল । এবার কয়েকজন অভিযুক্তকে আইডেন্টিফাই করতে হবে। ধরা হয়েছে তাদের। শুধু চিহ্নিত করা দরকার। তাই বিজয়কে সেই কাজটি করতে হবে। ২৮ এপ্রিল ২০১৬। ছত্তিশগড়ের কাংকের জনপদের একটি লজে পাওয়া গেল বিজয় ছোটেলাল সিং এর মৃতদেহ। স্থানীয় ডাক্তার পরীক্ষা করে বললেন, কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট। কাংকেরের কাছে একটি সরকারি স্কুলে বিজয় সিং এর স্ত্রী শিক্ষিকা ছিলেন। কিন্তু কী আশ্চর্য তাঁর স্ত্রী অথবা রেওয়ায় পরিবারের বাকি সদস্যরা এবং নিজের মেডিকেল শপের কর্মচারীরাও কেউ জানে না কেন তিনি কাংকেরে এসেছিলেন। কবে এসেছিলেন? কেনই বা কাউকে না জানিয়ে এরকমভাবে একা একা একটি লজে উঠলেন? স্ত্রীর কোয়ার্টারেই তো উঠতে পারতেন! কেন তিনি ব্যাপম কেলেঙ্কারিতে গ্রেপ্তার হওয়া তিনজন অভিযুক্তকে চিহ্নিত করতে থানায় যাননি? এই প্রশ্ন নিয়ে ক্রুদ্ধ পুলিশবাহিনী যখন রেওয়ায় তাঁর বাড়িতে হানা দেয় তখন তাঁরা বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যায় যে হাজিরা দেওয়ার কয়েকদিন আগেই সম্পূর্ণ অন্য রাজ্য ছত্তিশগড়ের এক লজে বিজয়ের রহস্যময় মৃত্যু হয়েছে। হার্ট অ্যাটাক। যার কোনোদিনই হার্টের অসুখ ছিল না।

দীপক গোলারিয়ার কাছে ভাইয়ের ফোন এল। ভাইয়ের নাম ললিত। ভাইয়া……আমার এখনই ৩ হাজার টাকা চাই…ভাইয়া বহোৎ আর্জেন্ট হ্যায়..ভাইয়া প্লিজ…যিতনে জলদি হো সকে। দীপক ফোনে চিৎকার করছেন, তুম হো অভি…ললিত…ললিত…ললিত!! চিন্তা মাত করো…পয়সা ভেজ রহে হ্যায়…ললিত…ললিত……!

ওপ্রান্ত থেকে হঠাৎ সব স্তব্ধ। ফোন কানেকটেড। বোঝা যাচ্ছে। শুধু শোঁ শোঁ শোঁ একটা শব্দ। কিন্তু ললিতের সাড়া নেই। কী হল? ঠিক বিকেলে দীপক গোলারিয়াকে পুলিশ ফোন করে জানাল আপনার ভাই ললিত গোলারিয়ার বডি পাওয়া গিয়েছে স্যাংক রিভারের ব্রিজের নীচে। এখনই চলে আসুন। হতভম্ব দীপক মোরিনা জেলার নুরাবাদে ছুটে এলেন। পুলিশের হাতে একটা ভেজা কাগজের টুকরো। সেখানে লেখা। ‘আমার মৃত্যুর জন্য কেউ দায়ী নয়। প্রি মেডিকেল টেস্টের স্ক্যামের বোঝা আমি আর নিতে পারছি না।’ দীপক বিস্মিত। তিনি পুলিশকে বললেন, আমি তো বুঝতে পারছি না পিএমটি স্ক্যামের সঙ্গে ওর কি সম্পর্ক? এবার পুলিশের হাসার পালা। তাঁরা বললেন, দীপকজি আপনি কী ঠাট্টা করছেন? আপনি জানেন না আপনার ভাই তো একবার অ্যারেস্ট হয়েছিল! দীপক স্তম্ভিত। সত্যিই তিনি জানেন না। ২০১৪ সালের ১৯ জুন ললিতকে অ্যারেস্ট করা হয়েছিল। কারণ ব্যাপমের মেডিকেল পরীক্ষায় ওই দুই বন্ধুকে দিয়ে অন্য দুই ছাত্রের নামে পরীক্ষা দেওয়ানোর ব্যবস্থা করেছে। আর ও পেয়েছে কমিশন। দীপক এসব কিছুই জানেন না। তিনি শুধু জানতে চাইলেন, কিন্তু স্যার, আজ সকালে যে ভাই আমাকে ফোন করে ৩ হাজার টাকা চাইছে। আমি বললাম কীভাবে পাঠাব বলে দে… পাঠিয়ে দিচ্ছি। এই কথা বলতে বলতে ফোন থেমে গেল। আমার সঙ্গে কথা বলতে বলতে কেন সুইসাইড করবে? কেন আচমকা ব্রিজ থেকে নদীতে ঝাঁপ দেবে? পুলিশ গম্ভীর হয়ে যায়। কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি।

এরকম অসংখ্য রহস্যমৃত্যুর খবর আরও শুনব আমরা ধীরে ধীরে। অপেক্ষা করুন। মধ্যপ্রদেশের ২০ লক্ষ যুবকযুবতী সরকারি নিয়োগ ও ভর্তি পরীক্ষার দিকে তাকিয়ে থাকে বছরের পর বছর ধরে। সেই পরীক্ষাটি আয়োজন ও মনিটর করে ব্যাপম। ২৭ রকম পরীক্ষা আছে। ২০১৩ সালে ৪১ হাজার পরীক্ষার্থী বসেছিল প্রি মেডিকেল টেস্টে ডাক্তারিতে চান্স পাওয়ার জন্য। সিটের সংখ্যা ১৬৫৯। ড্রাগ ইন্সপেক্টরের পদে নিয়োগ পরীক্ষার জন্য প্রায় ১০ হাজার পরীক্ষার্থী। ৭২২৬ পুলিশ কনস্টেবলের পদে চাকরি পাওয়ার লক্ষ্যে পরীক্ষা দেয় সাধারণত সাড়ে ৪ লক্ষ যুবকযুবতী। ২ হাজার রাজ্য বন দপ্তরের কর্মীর শূন্যপদের জন্য ২০১৩ সালে চাকরির পরীক্ষা দিয়েছিল ২ লক্ষ ৯০ হাজার পরীক্ষার্থী।

আর এই সব পরীক্ষায় সাধারণ, নিরীহ, প্রকৃত পরীক্ষার্থীদের পাশাপাশি চলেছে এক গোপন খেলা। ঝাঁকে ঝাঁকে জাল পরীক্ষার্থী এসে পরীক্ষা দিয়েছে অন্যদের হয়ে। শুধু সেটাই? না। নির্দিষ্ট জায়গায় টাকা জমা দিলে পরীক্ষার হলে বসে দুটি সেটের খাতা পাওয়া গিয়েছে। একটি সেটে যা ইচ্ছে লিখে সময় কাটিয়ে দাও। অন্য সেট ওই সেটের মধ্যেই রেখে জমা দিয়ে দাও। সেটি নির্দিষ্ট সময় অন্য কেউ সলভ করে দেবে। আর ফাইনাল ট্যাবুলেশনের আগে কম্পিউটারে ঢুকে যাবে ওই আনসার শিট। পুরো নম্বর পাওয়া কেউ আটকাতে পারবে না। কীভাবে সম্ভব? সম্ভব। যদি ওই পরীক্ষার আয়োজক সরকারি দপ্তরের খোদ অন্যতম কর্তা নিজেই এই অবৈধ চাকরি ও ভর্তি নাটকের প্রধান পরিচালক হন। সেই পদের নাম প্রিন্সিপ্যাল সিস্টেম অ্যানালিস্ট। সরকারি দপ্তরে চুড়ান্ত সুরক্ষার আবরণে থাকা মাদার সার্ভার কম্পিউটারে পরীক্ষার আগে ও পরে রোল নম্বর বদলে দেওয়া হত। কতটা গভীরে এই ব্যাপক দুর্নীতির কালো করিডর? মধ্যপ্রদেশ সরকারের এক মন্ত্রীকে জেলে যেতে হয়েছে। আর এক মন্ত্রী স্রেফ উধাও হয়ে গিয়েছেন। সরকারের প্রথম সারিতে থাকা মন্ত্রী ও তাঁদের স্ত্রীদের নাম জড়িয়েছে। কীভাবে পাওয়া গেল তাঁদের নামের সন্ধান?

একটি রহস্যময় পেন ড্রাইভে। তারপর?

পঙ্কজ ত্রিবেদী : স্যার একটা কথা ছিল। মিনিস্টার সাব, সেক্রেটারিরা, বারবার করে ফোন করছে। সবাই চায় নিজেদের ক্যান্ডিডেট ঢোকাতে। এত নাম কীভাবে হ্যান্ডল করব? আর কয়েকজন চাইছে পরীক্ষায় না বসেও যেন ক্লিয়ার করা যায় এক্সাম। এটা কি পসিবল স্যার?

নীতীন মহিন্দ্ৰ : এভরিথিং ইজ পসিবল। ডোন্ট বি সিলি। তার জন্য আলাদা আলাদা দাম আছে। তবে মিনিস্টার, সেক্রেটারিদের জন্য তো আলাদা কোনো রেট নেওয়া যায় না। সেসব ম্যানেজ হয়ে যাবে অন্যভাবে। তুমি একটা লিস্ট বানাও। নর্মাল একটা লিস্ট। সেখানে ডক্টরসাবের ক্যান্ডিডেট। আর এইসব ভিআইপিদের ক্যান্ডিডেটের আলাদা লিস্ট হবে। একটায় রেড অ্যালার্ট দেবে। আর একটায় গ্রিন। করে টাইপ করে রাখো। আমাকে এক কপি দেবে। ইজ দ্যাট ক্লিয়ার ত্রিবেদী?

পঙ্কজ ত্রিবেদী নিশ্চিন্ত হয়ে ঘাড় নাড়লেন। ইন্দোরের একটি কলেজের লেকচারার ছিলেন। হয়েছেন কন্ট্রোলার অফ এক্সামিনেশন। ব্যাপমের। মধ্যপ্রদেশের পরীক্ষা নিয়ামক সংস্থা ব্যাপম। সব পরীক্ষার রেজাল্ট শিট তাঁর মাধ্যমেই যাবে ট্যাবুলেশনে। আর কার সঙ্গে এতক্ষণ কথা বলছিলেন তিনি?

এই যে নীতীন মহিন্দ্ৰ । হাইট কম। ভুঁড়িও আছে। মোটা একটা গোঁফ। মাথার চুল অনেকটা কমে এসেছে। মধ্যপ্রদেশের সরকারি কর্মচারী। খুবই সাধারণ চেহারা। তেমন কেষ্টবিষ্টুর মতো দেখতেও না। চুপচাপ থাকেন। একটাই শখ। নিত্যনতুন জামা চেঞ্জ। আর একটু ব্র্যান্ডেড। তবে ২০১০ সালের পর সহকর্মীরা অন্যরকম পরিবর্তন দেখলেন । প্রথমে হন্ডা সিটি। তারপর আবার রেনল্ট ডাস্টার। পরপর দুটি গাড়ি কেনা হয়ে গেল। নীতীন মধ্যপ্রদেশের সরকারি নিয়োগ ও উচ্চশিক্ষার ভর্তি পরীক্ষা বিভাগ ব্যাপম দপ্তরে ১৯৮৬ সালে চাকরিতে প্রথম ঢুকেছিলেন। পদের নাম ছিল ডেটা এন্ট্রি অপারেটর। আজ ২০১৮ সালে ডেটা এন্ট্রি অপারেটর শুনলে তেমন প্রতিক্রিয়া না হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু ভারতে কম্পিউটারের সেই আদিযুগে ডেটা এন্ট্রি অপারেটর মানে কিন্তু ওই লোকটা সাধারণ সরকারি কর্মচারীর থেকে অনেক আলাদা। সোজা কথায় সেই শুরুতে দু রকম সরকারি কর্মচারীর জ হল। কম্পিউটার জানে আর কম্পিউটার জানে না। মন্ত্রী থেকে আমলা সকলেই এই কম্পিউটার জানাদের বিশেষ খাতির করতেন। তাই নীতীন মহিন্দ্রের উত্থান হল দ্রুত। ক্রমে তিনিই হয়ে উঠলেন ব্যাপম পরীক্ষার সবথেকে শক্তিশালী ভরকেন্দ্র। প্রাইম সিস্টেম অ্যানালিস্ট। গোটা পরীক্ষা ব্যবস্থা, ফলাফল, ট্যাবুলেশন শিট এবং রোল নম্বর সব বস্তুত তাঁর অধীনে। অনিয়ম আগেও হয়েছে। কিন্তু গোটা ব্যাপারটা আরও আধুনিক, আরও টেকনিক্যালি স্ট্রং হয়ে গেল ২০১১ সাল থেকে। নীতীন জানেন ইন্দোরের সরকারি কলেজের এক লেকচারারকে নিয়োগ করা হয়েছে কন্ট্রোলার অফ এক্সামিনেশন হিসাবে। তারও কারণ আছে। দুজন মন্ত্রীকে ওই লেকচারার সম্পর্কেই রিপোর্ট দেওয়া হয়েছিল যে, সে আমাদের লোক হয়ে যাবে। তাই ওঁকেই করা হোক। এরপর একমাসের মধ্যে অ্যাপয়েন্টমেন্ট। তিনি জানেন কার সঙ্গে সবার আগে দেখা করতে হবে তাই এসেছেন সোজা ভোপাল। নীতীশের চেম্বারে। এবং তারপরই জানালেন তাঁর প্রথম সমস্যার কথা। একের পর এক ভিআইপি তাঁর কাছে পরীক্ষার্থীদের লিস্ট পাঠিয়েছেন। তাঁদের কথা না রাখলে চাকরিটাই রাখা মুশকিল। আর তাছাড়া পেমেন্টও খুব মোটা এসবের জন্য। তবে এইমাত্র ত্রিবেদী শুনলেন একটা নাম। ডক্টর সাব। নীতীন বললেন, ডক্টর সাবের লিস্ট আলাদা রাখতে। আর ভিআইপি লিস্ট অন্যরকম হবে। কে এই ডক্টর সাব? ভয়ে অবশ্য সেকথা জিজ্ঞাসা করতে পারলেন না ত্রিবেদী। আপাতত জানা দরকার তাঁকে কী করতে হবে।

নীতীন জানিয়ে দিলেন ফরমুলাটি। খুব সোজা। টাকা দিয়ে চাকরি পাওয়া কিংবা ডাক্তারি কোর্সে চান্স। যারাই টাকা দিয়েছে তাদের মধ্যে দুটি ভাগ আছে। একটি অংশ হল ইঞ্জিন বগি সিস্টেম। অর্থাৎ যে চাকরিপ্রার্থী বা ডাক্তারি পড়তে ইচ্ছুক ছাত্রছাত্রীরা সামান্য পড়াশোনাও করেনি তাদের জন্য ব্যবস্থা হল ওই ইঞ্জিন বগি। অর্থাৎ তারা নিজেরা পরীক্ষার হলে যাবে না। তাদের হয়ে অন্য কেউ হলে গিয়ে পরীক্ষা দেবে। মুন্নাভাই স্টাইল অথবা তারা পরীক্ষার হলে যাবে। কিন্তু তাদের আগের বেঞ্চে অথবা পিছনের বেঞ্চে থাকবে যে কোনো প্রশ্নপত্রের সব কোশ্চেন দারুণভাবে আনসার দেওয়ার মতো ছাত্ররা। এই তালিকার পরীক্ষার্থীরা নিজেদের খাতায় যা ইচ্ছে করতে পারে। অনেক সময় ধরে। ছবি আঁকো। উত্তর লেখার অভিনয় করো। লেখার অভিনয়টা যেন ভালো হয়। ধরা না পড়লেই হল। অন্যদিকে আর একদল পরীক্ষার্থীর ক্ষেত্রে ফরমুলা অন্য। সেইসব ছাত্রছাত্রীদের বলে দেওয়া হয় পরীক্ষার হলে প্রশ্নপত্র হাতে পেয়েই কোনো টেনশন না করতে। সবার আগে দেখে নাও কোন কোন প্রশ্নের উত্তর জানা আছে। সেইসব প্রশ্ন অ্যাটেম্পট করো। বাকি প্রশ্ন নিয়ে সামান্য সংশয় থাকলে কোনো চান্স নেওয়ার দরকার নেই। ফাঁকা রেখে দাও। ফাঁকা রেখে দাও মানে কী? তারপর কী হবে? ব্যাপম পরীক্ষার যত কম্পিউটার আছে তার একটি কমন অফিস নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছিল। সেই ব্যবস্থার মাধ্যমে নীতীন মহাজন সমস্ত আনসার শিটের নাগাল পাবেন। সুতরাং মাল্টিপল চয়েস পরীক্ষার আনসার শিট যখনই স্ক্যানড করে কম্পিউটারে ঢুকে গেল, তখন সেখানে রেজাল্ট এবং আনসার শিট ইচ্ছামতো পরিবর্তন করা কোনো সমস্যাই নয়। ঠিক তাই করা হয়েছিল। বেছে বেছে সেই তালিকা অনুযায়ী নামগুলির আনসার শিটের উত্তরপত্র পরিমার্জিত করার সুযোগ এসে গেল। সেটাই সবথেকে বড় অস্ত্র। যে প্রশ্নের আনসার একজন লেখেনি সে ওই অংশ ফাঁকা রেখেছে। কিন্তু তারপর ওই কম্পিউটার অ্যাকসেস করে সব শূন্যস্থানই সঠিক উত্তর লিখে ভরাট করে আবার স্ক্যান করে আপলোড করে দেওয়ার প্ল্যান কার্যকর করা হল। নিখুঁত ব্যবস্থা। কোনো ঝামেলা নেই। কিন্তু অরিজিন্যাল আনসার শিটে যে সেইসব শূন্য স্থানগুলি রয়েই গেল? যদি কোনো ঝামেলা হয় কিংবা কেউ চ্যালেঞ্জ করে যে সব আনসার শিট প্রকাশ করতে হবে? তাহলে তো বিরাট সংকট! এই সম্ভাবনা আগে থেকেই মাথায় রাখা আছে। তাই যেই রেজাল্ট প্রকাশ হল সেদিনই পরীক্ষা অবসারভারের কাছে অরিজিন্যাল আনসার শিট চেয়ে পাঠানো হবে। সব আনসার শিট নয়। বাছাই করা। বলা হবে রাইট টু ইনফরমেশন আইনের মাধ্যমে পরীক্ষার্থী তাদের খাতা দেখতে চেয়েছে। সেটাই দেখানো হবে। এটা নিয়মের মধ্যেই পড়ে। তাই কোনো সন্দেহের অবকাশই নেই। প্রতিটি চাকরি ও কোর্সের পরীক্ষার পরই এরকম হাজার হাজার পরীক্ষার্থী আশাব্যঞ্জক ফলাফল না হলে খাতা রিভিউ করতে চায়। সেইসব আসল পরীক্ষার খাতা একবার হাতে চলে এলে কোনো একটি গোপন জায়গায় বসে কম্পিউটারে ঠিক যেভাবে সঠিক আনসার ঢোকানো হয়েছিল, অবিকল সেই একইভাবে একই হাতের লেখায় অরিজিন্যাল আনসার শিটেও বসে যাবে সেইসব উত্তর। আর তারপর কম্পিউটারের স্ক্যানড কপির সঙ্গে এই অরিজিন্যাল হাতে লেখা কপির কোনো ফারাক খুঁজে পাওয়া সম্ভব নয়। সুতরাং এই হল হান্ড্রেড পার্সেন্ট নিখুঁত অপারেশন। ত্রিবেদি চমৎকৃত। কী দারুণ প্ল্যান। সেই ২০১১ সাল থেকে সুতরাং এই হাই প্রোফাইল টেকনিক্যাল সিস্টেমে শুরু হয়ে গেল নতুন ধরনের চিটিং। টাকা দাও। পরীক্ষা দাও। কী লিখলে কতটা ঠিক লিখলে ওসব ভুলে যাও। টেনশনের কিছুই নেই। কারণ পাশ করানোর দায় নেওয়ার লোক আছে। তাই হত। কিন্তু সব প্ল্যান কী আজ পর্যন্ত নিখুঁতভাবে প্রযুক্ত হয়েছে দিনের পর দিন, বছরের পর বছর? তা হয়? হয় না। ভুলভ্রান্তি এবং তা থেকে বিপদের সম্ভাবনা থেকেই যায়। এক্ষেত্রেও যে হয়নি তা নয়। তবে তারও ব্যবস্থা হয়েছিল। পরীক্ষার্থীর নাম ছিল অনিতা প্রসাদ। বাবার নাম প্রেমচাঁদ প্রসাদ। সেই অনিতা ২০১২ সালে ঠিক এই পদ্ধতিতেই ব্যাপম পরীক্ষায় পাশ করে ডাক্তারি কোর্সে ভর্তি হয়েছিল। কিন্তু নীতীন এবং ত্রিবেদীর নির্দেশ সে পুরোপুরি মনে রেখে ফলো করতে ভুল করেছিল। সেই নির্দেশ হল যে প্রশ্নের উত্তর পারবে না, সেই প্রশ্নের পোর্শন ফাঁকা রাখো। ব্ল্যাংক ছেড়ে দাও। ওটা পরে ঠিক করে নেওয়া যাবে। শুধু যেসব প্রশ্নের উত্তর জানো সেগুলিই লিখতে ট্রাই নাও। এটাই হল মন্ত্রগুপ্তি। কিন্তু এই নিরীহ মন্ত্র মনে রাখতে পারেনি অনিতা প্রসাদ। সে ভুল করে সমস্ত প্রশ্ন ট্রাই করেছে। এবং বেশিরভাগই ভুল উত্তর ছিল। মহা বিপদ। যখন মধ্যপ্রদেশ পুলিশের স্পেশাল টাস্ক ফোর্স তদন্ত করছে তখন এই অনিতা প্রসাদের উত্তরপত্র তাদের হাতে এসেছিল। সেই উত্তরপত্রে কী ছিল? বেশিরভাগ উত্তর কারেকশনাল ফ্লুইড দিয়ে মুছে ফেলা হয়েছিল। তার উপর পেনসিল দিয়ে সঠিক উত্তর লেখা। অর্থাৎ খাতায় আগাগোড়া ভুল উত্তর লিখেও কোনো সমস্যায় পড়েনি সংশোধনের ক্ষেত্রে। শুধু যাঁরা ওই সংশোধনীর দায়িত্বে ছিলেন তাঁদের একটু অসুবিধা হয়েছিল। সাদা ফ্লুইড শোকাতে হবে খাতায়, তারপর আবার লেখা পেনসিল দিয়ে। তারপর সেটাকে পুনরায় স্ক্যান করা। তাতে অনিতা প্রসাদের আটকায়নি ডাক্তারির কোর্সে চান্স পাওয়া।

পরবর্তী দু বছরে ঠিক এই ফরমুলায় ১৩ রকমের পরীক্ষায় বহু পরীক্ষার্থী চাকরি পেয়ে গিয়েছে। বহু ছাত্রছাত্রী ডাক্তারিতে ভর্তি হয়ে গিয়েছে। পরীক্ষাগুলি ছিল ডাক্তারি কোর্স, ফুড ইনস্পেক্টর, ট্রান্সপোর্ট কনস্টেবল, পুলিশ কনস্টেবল, পুলিশ সাব ইনস্পেক্টর, স্কুল শিক্ষক, ডেয়ারি সাপ্লাই অফিসার এবং ফরেস্ট গার্ড।

বলতে ভুলে গেলাম। অনিতা প্রসাদের পরিচয়। আগেই অবশ্য বলেছি তার বাবার নাম। প্রেমচাঁদ প্রসাদ। তিনি কে ছিলেন? অন্যতম পার্সোনাল সেক্রেটারি মধ্যপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রীর। শিবরাজ সিং চৌহানের।

বা প্রশ্ন হল সেই যে বারবার নীতীশ মহাজন যাঁর নাম বলছিলেন ডক্টর সাব, তিনিই তাঁর লিস্ট নিয়ে এত মাথাব্যথা কেন? আর কীসের লিস্ট? তিনি কেন লিস্ট পাঠাতেন? এবার বলার সময় এসেছে। তিনিই হলেন ব্যাপম দুর্নীতির সবথেকে বৃহৎ কিংপিন। যাকে বলা হয়েছে মাস্টারমাইন্ড। ইন্দোরের এক বিখ্যাত ডাক্তার। জগদীশ সাগর।

তিনিই তৈরি করেছিলেন এক বিরাট চক্র। সেই চক্র ছড়ানো ছিল মধ্যপ্রদেশ, বিহার, উত্তরপ্রদেশ, ঝাড়খণ্ড, দিল্লি…। কারও কাজ মিডলম্যান ঠিক করা। কারও কাজ ডাক্তারি কলেজের হোস্টেলে গিয়ে গিয়ে লোভী ও দরিদ্র ডাক্তারি ছাত্রদের চিহ্নিত করা। কারও দায়িত্ব বিভিন্ন টিউটোরিয়াল ইনস্টিটিউশনে গিয়ে বাইরে টাঙানো হোর্ডিং দেখে কোন কোন ছাত্রছাত্রী ভালো রেজাল্ট করছে এমনকী নিছক ক্লাস টেস্টে তা খুঁজে বের করে ডায়েরিতে লিখে রাখা। এরপর সেই ইনস্টিটিউশনের মালিকের সঙ্গে দেখা করে ডিল করা। সেইসব ভালো ছাত্রদের/ছাত্রীদের সাধারণত বাদ দেওয়া হয়। কারণ তারা এই অনিয়মটি নিখুঁতভাবে করতে পারবে কিনা সেই আত্মবিশ্বাস থাকত না। এবং হঠাৎ করে দু’একদিন হোস্টেল বা কলেজ থেকে উধাও হয়ে অন্য শহরে গিয়ে ছদ্মনামে ভুয়ো আই কার্ড নিয়ে পরীক্ষা দেওয়ার মতো মনের জোর বেশি মেয়ের নেই। এর পাশাপাশি সরকারি চাকরির পরীক্ষায় চান্স পাওয়ার জন্য দরকার অন্তত এমন এক বিরাট সোর্স যার হাতের কাছেই থাকবে ‘আনসার কি’। কাকে বলে ‘কি’ (answer key)। প্রতিটি প্রশ্নপত্রের সেটের জন্য থাকে একটি করে ‘আনসার কি’। সেটি সাধারণত রাখা হয় একটি সীলবন্ধ খামের মধ্যে। একমাত্র ট্যাবুলেশনের সময়ই সেটা খোলা হবে। অবসার্ভারদের উপস্থিতিতে তাঁদের সাক্ষী রেখে ত্রিবেদী সেইসব খাম সীলবন্ধ করতেন। কিন্তু তারপর সকলে চলে গেলে সেই খাম আবার খুলে আনসার কির ফোটোকপি করে আবার সেই অরিজিন্যাল নথিটি নতুন একটি খামে ঢোকানো হত। এভাবে প্রতিটি প্রশ্নের সঠিক উত্তর হস্তগত হয়ে যেত পরীক্ষার অনেক আগেই। এবং এই ত্রিবেদীকে ব্যাপম পরীক্ষার কন্ট্রোলার অফ এক্সামিনেশন করার পিছনে রয়েছে একজনের ইনপুট। ডক্টর জগদীশ সাগর। যিনি নিজে ইন্দোরের ডাক্তার। আর ওই ত্রিবেদীও ইন্দোরেরই কলেজের লেকচারার। আর এসবের অনেক আগেই জগদীশ সাগর সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ মানুষটির সঙ্গে যোগাযোগ করে ফেলতে পারলেন। বেশ কয়েক বছর আগেই। তার নাম নীতীশ মহাজন। সুতরাং এগিয়ে চলল ব্যাপম স্ক্যান্ডাল। নীতীশ মহাজনের কাছে ব্যাপম নেটওয়ার্ক সিস্টেমের মাদার সার্ভার ও কম্পিউটার। ইঞ্জিন বগি সিস্টেমের চাবিকাঠি কী? রোল নম্বর। অর্থাৎ কোন ছাত্র কোথায় বসবে সেটি ঠিক করা হয় রোল নম্বর অনুযায়ী। নীতীশ মহাজনের গবেষণা এতটাই নিখুঁত থাকত যে তিনি লিস্ট ধরে ধরে রোল নম্বর এমনভাবে চেঞ্জ করতেন যাতে মূল পরীক্ষার্থী আর জাল পরীক্ষার্থীর সিট হয় পাশাপাশি অথবা সামনে পিছনে থাকত। এবং তার থেকেও মারাত্মক প্ল্যান হল যাতে যে কোনো পরীক্ষাকেন্দ্রের পরীক্ষা হলের একেবারে পিছনের দুটি বেঞ্চেই এই সিটগুলো পড়ে। যাতে ইনভিজিলেটরের চোখ বেশি না পড়ে পিছনের দিকে। আর এই গোটা প্রক্রিয়ার আর একটি ফরমুলা ছিল। সেটি সর্বদা গ্রহণ করা হয় না। কারণ খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। সেটি হল আগেই প্রি মেডিকেল টেস্টের প্রশ্ন বের করে এনে সলভারদের কাছে পৌঁছে দেওয়া। সলভার মানে হল যে ডাক্তারি পাঠরত ছাত্ররা ওইসব প্রশ্নের উত্তর আগে থেকেই লিখে রেখে দেবে। সেইমতো ডাক্তারি পরীক্ষার আগে প্রশ্ন প্লাস উত্তর বিক্রি করা হবে মোটা দামে। পরীক্ষার হলে যাওয়ার তিনদিন আগেই ঘরে বসে যদি আসল প্রশ্নপত্র পাওয়া যায় তাহলে আর চিন্তা কী। কারণ দাম বেশি নয়। ৫০ হাজার থেকে ১ লক্ষ টাকা!

কোথাও তো কোনো খুঁত নেই। তাহলে কীভাবে সন্দেহ দানা বাঁধল? কে এই ব্যাপম কেলেঙ্কারির প্রথম গন্ধ পাওয়া ব্যক্তি? লোকটির নাম ডক্টর আনন্দ রাই। ১৯৯৪ সালে এই যুবক ডাক্তারিতে ভর্তি হওয়ার জন্য পরীক্ষায় বসেছিলেন প্রি মেডিকেল টেস্টে। যাকে বলা হয় পিএমটি। তিনি লক্ষ করলেন হঠাৎ সেই বছর জুলজি পেপার গোয়ালিয়র থেকে ফাঁস হয়ে গেল। সেই বছরগুলিতে প্রি মেডিকেল টেস্টে প্রতিটি পেপার পৃথকভাবে নেওয়া হত। অর্থা আজকাল যেমন সিঙ্গল পেপার টেস্ট হয় তেমন নয়। ডক্টর আনন্দ রাই এবং তাঁর বন্ধুরা দল বেঁছে প্রতিবাদ করলেন। কারণ তাঁরা পরীক্ষার প্রস্তুতি নিয়ে এসেছেন। অথচ প্রশ্ন ফাঁস হয়ে যাচ্ছে। আবার পরীক্ষা হবে। যে পরীক্ষা হয়েছে সেটি ক্যান্সেল। এটা কী অত্যন্ত মানসিক চাপ দেওয়া নয় ছাত্রছাত্রীদের ওপর? সারা বছর এত কষ্ট করে যারা প্রস্তুতি নিয়েছে। তদন্ত শুরু হয়েছিল। দেখা গেল সেই প্রশ্ন ফাঁসের প্রধান অভিযুক্তের নাম ডক্টর গৌড় গোয়ালিয়র কলেজেরই অধ্যাপক। কিন্তু তাঁকে গ্রেপ্তার করা গেল না। কারণ তাঁর নাম যখন সামনে এল তার ঠিক আগেই ১৯৯৫ সাল। ডক্টর গৌড়কে কে অথবা কারা খুন করে গেল হঠাৎ। সেই শুরু প্রশ্ন ফাঁসের সঙ্গে হত্যা আর অস্বাভাবিক মৃত্যুর। কিন্তু সেভাবে হইচই হল না। ডক্টর আনন্দ রাই এমবিবিএস পাশ করে ডাক্তারি শুরু করেছিলেন। কিছুদিন কাজ করার পর তাঁর মনে হল এবার পোস্ট গ্রাজুয়েশন করে নেওয়া উচিত। ২০০৫ সালে তিনি ডাক্তারিতে পোস্ট গ্রাজুয়েশন দিলেন। এবং লক্ষ করলেন সেই পরীক্ষায় টপ টেনে যে ছাত্রছাত্রীরা আছে তাদের অন্তত ডাক্তারির এই কঠিনতম পরীক্ষায় শীর্ষস্থান পাওয়ার কথাই নয়। কারণ তার আগের যাবতীয় পরীক্ষায় তারা সকলেই অ্যাভারেজ গড় নম্বর পেয়েই উতরে গিয়েছে। এটা জানা অস্বাভাবিক নয়। ডাক্তারি ছাত্রদের কাছে আগেপরের ব্যাচের কারা কেমন ছাত্রছাত্রী, কে কেমন রেজাল্ট করেছে, কাদের মেধা বেশিকম সেটা জানা অত্যন্ত স্বাভাবিক । এবং আশ্চর্যের বিষয় হল যে ১০ জন সেই ডাক্তারির পোস্ট গ্রাজুয়েশনের শীর্ষস্থান পেয়েছিল, তারা প্রত্যেকেই কোনো না কোনো সরকারি উচ্চপদস্থ আমলার পুত্রকন্যা। ডক্টর আনন্দ রাই পোস্ট গ্রাজুয়েশনের জন্য একটি ডিপ্লোমা কোর্সের সঙ্গে যুক্ত হলেন ইন্দোরের মহাত্মা গান্ধী মেমোরিয়াল মেডিকেল কলেজে। যাঁরা ডাক্তারিতে পোস্ট গ্রাজুয়েশন করছেন তাঁদের মধ্যপ্রদেশে একটি বৃহৎ সংগঠন আছে। বলা হয় জুনিয়র ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন। ডক্টর রাই সেই সংগঠনের প্রেসিডেন্ট। বিভিন্ন দাবিদাওয়ার কারণে ভোপালে নিয়ম করে এই সংগঠনের সম্মেলন ও বৈঠক হত। ঠিক এরকমই বৈঠকের মধ্যে দীপক যাদবের সঙ্গে পরিচয় হল আনন্দের। ওই দীপক যাদবের সম্পর্কে কানাঘুঁষো শোনা যেত সে নাম ভাঁড়ানোর ব্যবসায় যুক্ত। দীপক যাদবের প্রিয় বন্ধুর নাম জগদীশ সাগর। তিনিও ডাক্তার। ইন্দোরের। মেডিসিন ডাক্তার। জগদীশ সাগরের সঙ্গে ইন্দোরে এসে আলাপ হয়েছিল। সেই আলাপ বেড়েছে ঘনিষ্ঠতায়। কারণ ডক্টর আনন্দ রাই আরএসএস সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত। আবার জগদীশ সাগর বিজেপির মন্ত্রী নেতাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ। এভাবেই এই চেনাশোনার পরিধি এগিয়ে চললো। স্বাভাবিক গতিতে। কিন্তু জগদীশ সাগরের সবথেকে বেশি যে বিষয়টি সকলের চোখে পড়তে শুরু করল সেটি হল তাঁর চূড়ান্ত শখ শৌখিনতা। তিনটি গাড়ি, সোনার চেন, সোনার বালা, সোনার আংটি আগেই ছিল। তার সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে হীরে। ভোপালে এক নেতার মেয়ের বিয়ে। নিমন্ত্রণ করা হয়েছে ইন্দোরের ডাক্তারদেরও।

নিমন্ত্রিত ডক্টর সাগর এবং ডক্টর আনন্দ দুজনেই। জগদীশ সাগর ডক্টর আনন্দ রাইকে বললেন, আমার গাড়িতে চলুন একসঙ্গে যাওয়া যাক। রাজি আনন্দ রাই। ভোপালে একটি হোটেলে রাখা হল তাঁদের। একটি রুম। দুজনে রুমমেট। সেখানে চেক ইন করার পরত দুপুরে ডক্টর জগদীশ সাগর বললেন, আমাকে একটা কাজে যেতে হবে। আপনি থাকুন। আমি বিকেলের আগেই ফিরছি। তারপর প্রোগ্রামে যাব। কোনো অসুবিধা নেই। জগদীশ সাগর বেরিয়ে গেলেন। কিন্তু আনন্দ রাই আপাতভাবে অবশ্যই একটি নীতিহীন কাজ করলেন। তিনি তার আগেই শুনেছেন জগদীশ সাগরের আয় সিধে পথে নয়। এবং তার বিশেষ কিছু গোপন কম্মো আছে। যে কারণে ইন্দোরের মতো এরকম একটি মফসসল শহরেও ওই বিরাট মাপের লাইফস্টাইল যাপন সম্ভব হচ্ছে সামান্য একটা দুটো চেম্বার চালিয়ে। তাঁর থেকে অনেক ভালো ডাক্তার আছেন। কই, তাঁদের তো এত রমরমা নয়? ব্যাপার কী? আনন্দ রাই জানতে চান ব্যাপার কী? অতএব ঘরেই হোটেলের রুমে আলমারিতে রেখে যাওয়া জগদীশ সাগরের ব্রিফকেসের দিকে নজর গেল আনন্দ রাইয়ের। কী আছে ওটায়? খুলবেন? নিয়ে এলেন ব্রিফকেস। রাখলেন টেবিলে। হাত কাঁপছে। কিন্তু খুলছে না। কারণ লক করা। এখন উপায়? লক খুলতে তো একটা পাসওয়ার্ড চাই। কী হতে পারে? ওয়ান ওয়ান ওয়ান?…… ওয়ান টু থ্রি?….না হচ্ছে না…। তাহলে?

হঠাৎ বিস্ময়করভাবে একটি নম্বর কীভাবে যেন ভেসে উঠল ডক্টর আনন্দ রাইয়ের মাথায়। যা আপাতভাবে শুনলে মনে হবে সম্পূর্ণ অবিশ্বাস্য। সিনেমার সস্তা চিত্রনাট্যের মতো। কিন্তু কে না জানে ট্রুথ ইজ স্ট্রেঞ্জার দ্যান ফিকশন! অতএব মিরাকল ঘটে গেল! ডক্টর আনন্দ রাইয়ের মাথায় এসেছিল একটি নম্বর-৭৮৬। সাতশো ছিয়াশি! এটা যে শুভ নম্বর মুসলিম সম্প্রদায়ের কাছে তা জানা ছিল। কিন্তু হিন্দুদের মধ্যেও নাকি নম্বর যথেষ্ট শুভ হিসাবেই দেখা হয় অনেক স্থানে। সেটা জানা ছিল আনন্দ রাইয়ের। তিনি নিজের পরিবারের মধ্যেও দেখেছেন এরকম উদাহরণ। অতএব তিনি লাস্ট চেষ্টা করলেন। ব্রিফকেসে ওপেন পাসওয়ার্ড দিলেন সেভেন এইট সিক্স! আশ্চর্য! খুলে গেল! শুধু ব্রিফকেস খোলেনি। খুলে গেল আর স্বাধীন ভারতের এক অত্যাশ্চর্য দুর্নীতি আর ক্রাইম স্টোরির প্রথম পৃষ্ঠা।

ব্রিফকেস খুলে স্তম্ভিত ডক্টর আনন্দ রাই। ভেতরে অসংখ্য পিএমটি ফর্ম। অর্থাৎ ডাক্তারিতে ভর্তি পরীক্ষার ফাঁকা এবং পূরণ করা আবেদনপত্র। আর একটি এনভেলাপের মধ্যে প্রচুর ছেলেমেয়ের পাসপোর্ট সাইজের ছবি। তখনই ক্লিয়ার হল অনেকটা। তার মানে জগদীশ সাগর নাম রোল নম্বর, ছবি সব অলটার করে দেয়। অন্য কারও ছবি পেস্ট করে দেয় আসল পরীক্ষার্থীর ফর্মে! কিন্তু এতে করে কোনো কিছুই প্রমাণ করা যায় না। অতএব সেদিন সবটা জেনেও ব্রিফকেস আবার বন্ধ করে যথাস্থানে রেখে দিলেন আনন্দ রাই। ইন্দোরে ফিরে এসে শুধু নজর রাখা শুরু করলেন ডক্টর সাগরের উপর। ঠিক দেড় বছর পর ইন্দোরের ইনডেক্স মেডিকেল কলেজে অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসরের চাকরিতে ঢুকলেন জগদীশ সাগর। তখনও আনন্দ রাই যুক্ত মহাত্মা গান্ধী মেডিকেল কলেজে। গোপন সূত্রে জানা গেল কয়েকজন বিহারী ছাত্র তাদের বন্ধুদের থেকে ফোন পেয়েছে। সেইসব বন্ধুরাও বিহারের কয়েকটি আলাদা কলেজে কেউ ভেটেরিনারি কেউ ডেন্টিস্ট্রি পড়াশোনা করে। তারা ফোন করে বলেছে আমাদের কাছে প্রি মেডিকেল টেস্টের কোশ্চেন পেপার আছে। যদি কোনো ক্যান্ডিডেট চায় কিনতে পারে। তোমরা ক্যান্ডিডেট জোগাড় করো কমিশন পাবে। খবরটি আনন্দ রাই গোপনে জানিয়ে দিলেন পুলিশের ডেপুটি সুপারের (ক্রাইম) কাছে সঙ্গে কয়েকটি ফোন নম্বর। সেই সূত্র ধরেই হল একটি হোটেলে রেইড। এবং ধরা পড়ে গেল ৪০ জন অভিভাবক ও ছাত্র। যারা এসেছিল পরীক্ষা দিতে এবং তাদের হেফাজতেই পাওয়া গেল। পরদিন সকালে হতে যাওয়া মেডিকেল পরীক্ষা হওয়ার আগের রাতেই তাদের কাছে পৌঁছে গিয়েছিল প্রশ্নপত্র। কিন্তু আশ্চর্যের ঘটনা হল এই ৪০ জনের বিরুদ্ধে হওয়া উচিত ছিল এফআইআর। অর্থাৎ এরা টাকা দিয়ে প্রশ্নপত্র কিনেছে। সেই অপরাধে গ্রেপ্তার করে জেরা করার দরকার ছিল। কিন্তু এদের করে দেওয়া হল অভিযোগকারী। যেন এরা কিছুই জানে না! থামলেন না আনন্দ রাই। তিনি সরাসরি সমস্ত লিংক জানিয়ে সোজা শিক্ষাদপ্তরের কাছে জমা দিলেন লিখিত অভিযোগ। নথিপত্র সহ। আর শিক্ষা দপ্তর এরপরই বাধ্য হয়ে চার সদস্যের একটি বিশেষ তদন্ত কমিটি সরকারি স্তরে গঠন করা হল। শুরু হল ব্যাপম কেলেঙ্কারির প্রথম তদন্ত।

সেই তদন্তের সূত্র ধরেই জবলপুর মেডিকেল কলেজের ডিন ডক্টর এস কে সাকাল্লে পাঁচজন ছাত্রকে চিহ্নিত করলেন। যারা জবলপুর মেডিকেল কলেজে অবৈধ উপায়ে ভর্তি হয়েছিল। সেই পাঁচজনকে কলেজ থেকে শুধু যে চলে যেতে হল তাই নয়, তারা কীভাবে এই দুর্নীতির সন্ধান পেল তা নিশ্চিত জানতে পুলিশ গ্রেপ্তারও করল। আর তারপরই ডক্টর এস কে সাকাল্লেকে তাঁর নিজের বাড়ির লনে একদিন পাওয়া গেল মৃত। তিনি লনে বসে খবরের কাগজ পড়ছিলেন। পুলিশ এসে তদন্ত করে কী জানাল? এই অধ্যাপক তথা ডিন নাকি নিজের গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছিলেন। অর্থাৎ আত্মহত্যা।. আশ্চর্য! একজন ডাক্তার যদি আত্মহত্যা করতে চান তাহলে তাঁর পক্ষে কি বিষাক্ত কোনো উপাদান পাওয়া ও ব্যবহার করা শক্ত? তাহলে অযথা তিনি নিজেকে তীব্র কষ্ট দিয়ে গায়ে আগুন দেবেন কেন? উত্তর পাওয়া গেল না। উত্তর খোঁজার চেষ্টাও হল না ।

ভুল বললাম। উত্তর খোঁজার চেষ্টা শুরু হল ঠিক এক বছর পর। কারণ তিনি গায়ে আগুন দিয়ে আত্মহত্যার পর জবলপুর মেডিকেল কলেজের ডিন হিসাবে যোগ দিয়েছিলেন ডক্টর অরুণ শর্মা। ২০১৫ সালের জুলাই মাসে ডক্টর অরুণ শর্মার যাওয়ার কথা আগরতলায়। একটি মেডিকেল কলেজে ইনস্পেকশন আছে। জবলপুর থেকে ডক্টর শর্মা দিল্লিতে এসেছিলেন। আগরতলার ফ্লাইট পরদিন সকালে। দিল্লির দোয়ারকা এলাকার একটি হোটেলে উঠলেন তিনি। কেন? জানা নেই। কারণ তাঁর ওঠার কথা ছিল এয়ারপোর্টের কাছের কোনো হোটেলে। দোয়ারকার সেই হোটেলের কর্মচারী সকালে অরুণ শর্মার ঘরের দরজা নক করে কোনো সাড়া পায়নি। কয়েক ঘণ্টা পর আবার নক করা হল। এবারও কোনো সাড়া নেই। রিসেপশন থেকে ইন্টারকম রুমে ফোন করা হয়। কেউ রেসপন্স করেনি। কী হল? অবশেষে ঠিক হল ডুপ্লিকেট চাবি দিয়ে ঢোকা হবে। কারণ সেদিন সকালেই তো তাঁর ঘর ছেড়ে দিয়ে আগরতলা যাওয়ার কথা। ডুপ্লিকেট চাবি দিয়ে রুমে ঢুকে দেখা যায় ডক্টর অরুণ শর্মার মৃতদেহ পড়ে আছে। কার্পেটে। পাশে হুইস্কির বোতল খোলা। অর্ধেক গ্লাসে জল। মুখের পাশে রক্ত। একই কলেজের দুজন ডিন এক বছরের মধ্যে মারা গেলেন। যাঁরা ছিলেন ব্যাপম তদন্তের সঙ্গে যুক্ত। এই মৃত্যুটির পরই আবার নতুন করে দাবি উঠেছিল তাহলে আগের ডিন ডক্টর সাকাল্পের মৃত্যুর তদন্তও করতে হবে নতুনভাবে। কারণ ওটাও যে হত্যা নয় কে বলতে পারে?

২৯ বছরের দেবেন্দ্র নাগর ছিলেন মিডলম্যান। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ তিনি পরীক্ষার জন্য জাল ক্যান্ডিডেট ধরে আনতেন। আর বিনিময়ে কমিশন। পুলিশ তাঁকে ডেকে পাঠাল। তিনদিন পর ২০১৩ সালের ২৬ ডিসেম্বর মোটরবাইক দুর্ঘটনার তাঁর মৃত্যু হয়।

২৯ বছরের রামেন্দ্র সিং ভাদোরিয়া চারবার চেষ্টা করেছিলেন ডাক্তারি কোর্সে চান্স পাওয়ার। কিছুতেই হচ্ছে না। পঞ্চমবার কী আশ্চর্য! তাঁর এতদিনের ইচ্ছে পূর্ণ হল। এবং চান্স পাওয়া গেল। এবং নিশ্চিন্তে এমবিবিএস পাশ করে ডাক্তার হওয়ার পর তিনি চাকরি পেলেন ঝাঁংসির বিড়লা হাসপাতালে। সঙ্গে শুরু করলেন পোস্ট গ্রাজুয়েশনের পড়াশোনা। পরীক্ষা সামনে। কিন্তু একটা সমস্যা। তার যাবতীয় স্কুলের সার্টিফিকেটগুলো সেই মেডিকেল কলেজেই রয়ে গিয়েছে। দিচ্ছে না। কেন? গোয়ালিয়রের সেই কলেজে গিয়ে অবশেষে রামেন্দ্র জানতে পারলেন তাঁকে খুঁজতে পুলিশ আসছে। আগেও একবার তদন্ত চালিয়েছে তাঁর অজ্ঞাতে। আর পুলিশের বারণ আছে। তাই তাঁর স্কুলের নথিপত্র আটকে রাখা আছে। কিন্তু সে কী করেছে? পুলিশ জানাল তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ আছে অবৈধভাবে ডাক্তারি কোর্সে যারা পরীক্ষা দেয় তাদের। রামেন্দ্র নিজেই একজন প্রক্সি পরীক্ষার্থী। ঠিক দুমাস পর রামেন্দ্রকে আবার কে পাঠিয়ে বলা হল তোমার বিরুদ্ধে সেকেন্ড কেস করা হচ্ছে। তুমি নিজেও টাকা দিয়ে ডাক্তারিতে ভর্তি হয়েছ। চারবার যে চান্স পেল না। সে পঞ্চমবার এত ভালো নম্বর পেয়ে কীভাবে পেতে পারে চান্স। রামেন্দ্রকে গ্রেপ্তার করা হলেও জামিনও হয়ে যায়। তিনমাস পর রামেন্দ্র পুলিশকে জানায় সে যতটা জানে সব বলতে রাজি। কিন্তু তার কেরিয়ার যেন নষ্ট না হয়। পুলিশ রাজি হয়। তবে একটাই শর্ত। সমস্ত নেটওয়ার্ক জানাতে হবে। কারা যুক্ত? কাদের সঙ্গে তাঁর প্রথম আলাপ হয়? কে তাঁকে চিহ্নিত করে? আর অন্য কোন কোন ডাক্তার জড়িত? রামেন্দ্র রাজি। ঠিক দুদিন পর পুলিশ এসেছিল । তবে অন্য খবর পেয়ে। রামেন্দ্র ভাদোরিয়াকে সিলিং ফ্যানে ঝুলতে দেখা যাচ্ছে। মুখ ঢাকা বালিশের কভারে। আর গলায় পেঁচানো টিভির কেবল লাইনের মোটা তার। আত্মহত্যা? হত্যা? জানা যাচ্ছে না। ঠিক পাঁচদিন পর রামেন্দ্র ভাদোরিয়ার মা কুসমা দেবী অ্যাসিড খেয়ে আত্মহত্যা করলেন। পুত্র হারানোর যন্ত্রণায়।

বান্টি সিকরেওয়ার, অরবিন্দ শাক্য, নরেন্দ্র তোমর, অনন্তরাম ঠাকুর, আশুতোষ তিওয়ারি…ব্যাপমে রহস্যময় মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে। আপাতত ৪৮। লখনউতে মৃত্যু হল শৈলেশ যাদবের। রাজ্যপালের পুত্র। যার নাম ব্যাপমে যুক্ত হয়ে পড়েছিল। কী হয়েছিল? বলা হচ্ছে ব্রেন হেমারেজ! মাত্র ৫০ বছর বয়স।

প্রশান্ত পান্ডের সাইবার কাফের নাম টেকনো সেভেন। একঝাঁক পুলিশ এসেছে তাঁর কাফেতে। একটা হার্ড ড্রাইভ আছে। পুলিশ স্টেশনে ডেটা কেবল নেই এরকম। তাই কানেক্ট করা যাচ্ছে না। একজন গ্রেপ্তার হওয়া অভিযুক্তের থেকে পাওয়া গিয়েছে এই হার্ড ড্রাইভ। প্রশান্ত যেন সেটি কানেক্ট করে জানায় কী আছে। সেই হার্ড ড্রাইভেই আবিষ্কার হল সেটি কার? নীতীন মহিন্দ্রের। খোদ ব্যাপমের প্রিন্সিপাল সিস্টেম অ্যানালিস্ট। মানে সর্ষের মধ্যেই ভূত? চোখ কপালে ওঠার তখনও বাকি আছে। কারণ নীতীনকে গ্রেপ্তার করার পর তাঁর চেম্বারে হানা দিয়ে যে পেন ড্রাইভ পাওয়া গেল সেখানে একটি রহস্যময় লিস্ট। নামের তালিকা। যেখানে অনেকবার লেখা একটি এন্ট্রি। সিএম। সিএম মানে? চিফ মিনিস্টার? মধ্যপ্রদেশ বিধানসভায় বিরোধীরা প্রতিবাদে ফেটে পড়লেন। মুখ্যমন্ত্রী শিবরাজ সিং চৌহান স্পষ্ট জানিয়ে দিলেন তাঁর কোনো কিছুই রাখঢাক করার নেই। পুরোদমে তদন্ত চলুক। সিবিআই হাতে নিল ব্যাপম তদন্তের। মুখ্যমন্ত্রীর বিরুদ্ধে কোনো প্রমাণ মেলেনি। তবে গ্রেপ্তার হলেন আসল মাথা। ডক্টর জগদীশ সাগর। তাঁর বাড়িতে হানা দিয়েছিল পুলিশ। বেডরুমে ঢোকা হয়েছিল তল্লাশির জন্য। যদি কোনো সূত্র পাওয়া যায়। পাওয়া গেল।

জগদীশ সাগরের বিছানার গদিটি অদ্ভুত শক্ত। নরম নয়। কারণ তোষকের ওপর অন্যরকম একটি তোশক বিছিয়ে রেখেছিলেন তিনি। তাঁর নাকি ভালো সুখের ঘুম হত ওরকম গদিতে শুলে। কেন? কারণ সেটি ছিল টাকা দিয়ে তৈরি গদি। ১৫ লক্ষ টাকা তোশকের উপরে সাজিয়ে রেখে রাতে ঘুমাতে যাওয়া অভ্যাস ছিল তাঁর! ওপরে শুধু হালকা একটা চাদর।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *