শেষ যে ট্যুইটগুলো পাওয়া যাচ্ছে সেখানে তিনি লিখেছিলেন, কেএমএস থেকে এত নানারকম ইস্যু ডায়াগনোসিস হয়েছে যে, কেই বা বলতে পারবে আমি আর কতদিন আছি….হয়তো চলে যেতে হবে …হাসতে হুয়ে যায়েঙ্গে…। তাঁর চিকিৎসা চলছিল কেরালা ইনিস্টিটিউট অফ মেডিকেল সায়েন্সে (কে এম এস)। দেওয়া হয়েছিল সাতদিনের মেডিসিন কোর্স। কোন কোন বিভাগে তাঁর অনেকরকম পরীক্ষা, স্ক্যান, এমআরআই হয়েছিল? কার্ডিওলজি, ইএনটি, গ্যাসট্রোএনটোলজি, ডেন্টাল এবং রিউমেটোলজি। প্রাথমিকভাবে যে রোগটি সবথেকে বেশি ভোগাচ্ছিল তার নাম লুপুস। এমন একটি ক্রনিক অটোইমিউন রোগ যা দেহের যে কোনো অঙ্গকেই ড্যামেজ করতে পারে। তাই তিনি ছিলেন স্বাভাবিকভাবেই অত্যন্ত নিরাশ আর বিষাদগ্রস্ত। বস্তুত যাতে তিনি স্থায়ী ডিপ্রেশনের মধ্যে চলে না যান, তা ঠেকাতে হালকা ডোজের অ্যান্টিডিপ্রেশেন্ট ড্রাগও দেওয়া হয়। সুতরাং মানসিক ও শারীরিকভাবে ভালো ছিলেন না সুনন্দা পুষ্কর।
দিল্লির সরকারি বাসভবনে কাজ হচ্ছে। কিছু মেরামতি আর সংস্কারের কাজ। কয়েকদিন সময় লাগবে। তাই ২০১৪ সালের জানুয়ারি মাসে চাণক্যপুরীর অভিজাত হোটেল লীলা প্যালেসে স্যুইট নম্বর ৩৪৫ এ এসে উঠেছিলেন সুনন্দা পুষ্কর। ঠিক দুপুর সাড়ে তিনটের সময় সুনন্দা পুষ্করকে দেখা গেল হোটেলের লবিতে। মোবাইল ফোনে কথা বলছেন। বসছেন না লাউঞ্জ সোফায়। অন্যমনস্কভাবে হাঁটতে হাঁটতে…। হোটেল রুমে তিনি একা ছিলেন কারণ সেদিন ভোরে তাঁর স্বামী বেরিয়ে গিয়েছেন। তিনি সারাদিন তালকাটোরা স্টেডিয়ামে। ভারতের জাতীয় কংগ্রেসের সম্মেলন চলছে। সুনন্দার স্বামীর নাম শশী থারুর। কংগ্রেসের এমপি। এই স্বামী স্ত্রী ছিলেন রাজনীতি এবং কর্পোরেটের অন্যতম সেলেব্রিটি দম্পতি। দুজনেই সোস্যালাইট। এবং শুধু দেশে নয়, বিদেশেও তাঁরা জনপ্রিয়। তাঁদের নিয়ে আগ্রহ, কৌতুহল অন্তহীন। সুনন্দা পুষ্কর নামের এক মহিলা আচমকা কেন ভারতীয় রাজনীতি, ক্রিকেট আর বিতর্কে মাসের পর মাস জায়গা করে নিলেন? কীভাবে? সেটা জানার জন্য সামান্য পিছনে তাকাতে হবে।
কাশ্মীরি পণ্ডিত পরিবারের কন্যা সুনন্দার বাবা ছিলেন লেফটেনান্ট কর্নেল পুষ্কর নাথ দাস। ১৯৮৪ সালের এক বসন্ত দিন। ২২ বছরের পিংকি গ্র্যাজুয়েশনের পর স্বাধীন অর্থনৈতিক জীবন শুরু করবেন বলে জানালেন বাবাকে। সেইমতো শ্রীনগরের একটি হোটেলে চাকরিও নিলেন। সেন্টুর লেক ভিউ হোটেল। ফ্রন্ট ডেস্কে কাজ। ঠিক এক মাস আগে সেই হোটেলে ম্যানেজার হিসেবে এসেছিলেন একটি যুবক। সেও কাশ্মীরি। ধবধবে ফর্সা। সুদর্শন। চওড়া গোঁফ। নাম সঞ্জয় রায়না। অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার। পিংকির সবথেকে প্রিয় পোশাক ছিল অলিভ গ্রিন রঙের চুড়িদার আর রাস্ট কালারের কুর্তা। মন ভালো থাকলে ওই রঙের পোশাক পরে আসতেন। হোটেলের যুবক অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার আর সদ্য কাজে যোগ দেওয়া এই ফ্রন্ট ডেস্ক হোস্টেসের মধ্যে মাঝেমধ্যেই চোখে চোখে যুগলবন্দি হতে থাকল। মৃদু চাউনি। চাপা হাসি। একে অন্যকে কাজে অযাচিত সাহায্য করা। যেমন সিনেমায় হয়। যেমন বাস্তবে হয়। সঞ্জয় একদিন কাজ সেরে বাইক নিয়ে বেরোলেন হোটেল থেকে। বাড়ি ফিরছেন। একটু এগোতেই বাস স্টপেজ। সেখানে দাঁড়িয়ে পিংকি। সুনন্দা পুষ্কর। চলো তোমায় পৌঁছে দিই।
কোথায়?
কেন তোমার বাড়ি?
আমি তো এখন বাড়ি যাব না!
মানে? কোথায় যাবে?
আমি ডাল লেকের কাছে যাব। শিকারায় চড়ব।
একা?
হ্যাঁ..একাই তো..আর কে আছে!
আমি যদি সঙ্গে যাই?
চলো..ভালোই তো হবে..
সেই শুরু ২২ বছরের সুনন্দা পুষ্কর এরকমই। প্রথম থেকেই স্বচ্ছ। কোনো ভনিতা নেই। এবং সেই প্রথম শিকারা সফরে সুনন্দা সঞ্জয়কে বলেছিলেন, গান গাইতে পারো। একটা গান শোনাও তো..। সঞ্জয় শোনালেন। এরপর থেকে এই রুটিন মাঝেমধ্যেই ঘটতে শুরু হল। হয় ডাল লেকে শিকারা। নয়তো এয়ারফোর্স মেসে কফি। খুব শীঘ্রই গোটা ব্যাপারটা কর্নেল সাহেবের কানে যেতে দেরি হল না। এমনিতে শ্রীনগর ছোট শহর। আর মিলিটারি অফিসারের পরিবারের সামাজিক পরিচিতি আরও বেশি। সুতরাং অনেকেরই চোখে পড়েছিল এই মেলামেশা। স্বাভাবিক নিয়মে একদিন কর্নেল দাস ডেকে পাঠালেন মেয়েকে। পিংকিকে বললেন, আমি ছেলেটিকে দেখতে চাই। এবং সেটা শুনে সঞ্জয় রায়নার প্রায় হাঁটু কাঁপছে। কারণ কর্নেল দাস প্রচণ্ড রাগী মানুষ। হয়তো সামনে গেলেই ফায়ারিং স্কোয়াড। আজ যাব, কাল যাব বলে সঞ্জয় আসলে এড়িয়ে গিয়ে শক্তি সঞ্চয় করছিলেন। একটা সময় যেতেই হল পিংকির ধমকে। এরপর যদি তুমি না যাও তাহলে কিন্তু আমাকে হারাবে। এটা শুনে আর দেরি করা যায় না। কর্নেল দাস বহুক্ষণ ধরে পাত্রটিকে যাচাই করলেন। এবং অবশেষে হ্যাঁ বললেন, তবে একটাই শর্ত। এই হোটেলের চাকরিতে আবদ্ধ থাকলে চলবে না। একটা কিছু বড় ভাবতে হবে। দরকার হলে দিল্লি যাও। ১৯৮৫ সালে সুনন্দা আর সঞ্জয়ের এনগেজমেন্ট হয়ে গেল। কিছুদিন পর বিয়ে হবে।
সুনন্দার খুব ইচ্ছে নিজে একটা কিছু শুরু করবে। তার সব থেকে আগ্রহের বিষয় হল ফ্যাশন। সঞ্জয় রাজি। তবে সেটা তো আর শ্রীনগরে বা জম্মুতে সম্ভব নয়। সেখানে তখনও এই কনসেপ্টই ছিল না যে এটা একটা পেশা হতে পারে। দিল্লিতে সুনন্দার কাকার বাড়ি। সুতরাং থাকার সমস্যা নেই। নিয়ে এলেন সঞ্জয়ই। ১৯৮৫ সালে ফ্যাশন ডিজাইনারের কোর্স কটা মেয়ে করতে যেতেন? কটাই বা ইনস্টিটিউট ছিল? হাতেগোনা। তার মধ্যেই সাউথ দিল্লির সাউথ এক্সটেনশনে একটি সংস্থা পাওয়া গেল। সেখানে ভর্তি হয়ে গেলেন সুনন্দা। আর সঞ্জয় ফিরে গেলেন। ৮ মাস পর সমাপ্ত হল সেই কোর্স। সুনন্দা ফিরলেন শ্রীনগর। এবং এরপর বিয়ে। সঞ্জয়ের ততদিনে প্রমোশন হয়েছে । এখন ম্যানেজার। তবে একটি নতুন চাকরির অফার এসেছে। হোটেলেই। দিল্লিতে। সুতরাং সবদিক থেকেই সুসংবাদ। কারণ সুনন্দাও একটি ডিজাইনার শপ খুলতে চায়। দুজনের নতুন সংসার হবে দিল্লিতে। কর্নেল দাসের পারিবারিক বাড়ি সোপোরে। সেখানেই বিবাহের আয়োজন। যাকে বলা যেতে পারে পারফেক্ট সামার ওয়েডিং। খুব ধুমধাম হল। সুনন্দা ঠিক কেমন মানসিকতার ছিলেন? তাঁর একটি দুটি সিদ্ধান্তেই সেটা বোঝা যায়। সঞ্জয় আর সুনন্দা মাঝেমধ্যেই চলে যেতেন হরিদ্বার, হৃষীকেশ, দেরাদুনে। একবার হৃষীকেশে গিয়েছেন তাঁরা। হোটেলের ব্যালকনিতে বসে আছেন। স্নান করে বেরোচ্ছেন সঞ্জয়। একটু পর লাঞ্চ। হঠাৎ সুনন্দা বললেন, আমার ব্যানানা স্প্লিট খেতে ইচ্ছে করছে। এ আর এমন কী ব্যাপার? অর্ডার করলেই হয়! সঞ্জয় বলছেন। কিন্তু না। সুনন্দা এখানে খেতে চান না। তাঁর তখনই ইচ্ছা দিল্লির ওবেরয়ের ফ্রুট কাউন্টার থেকে খাবেন। সঞ্জয় জানেন এরকম মুডের কথা। অতএব তক্ষুনি গাড়িতে বসা হল। এবং সোজা দিল্লি। অন্তত সাত ঘণ্টার ড্রাইভ। ঠিক ওবেরয়ে এসে ব্যানানা স্প্লিট খেয়ে আবার গাড়িতে ওঠা। এবং সোজা ড্রাইভ করে ফের হৃষীকেশের সেই হোটেল। মধ্যরাত। ওটাই ছিলেন সুনন্দা। ইমপালসিভ। সারপ্রাইজে পূর্ণ। আর সর্বদাই ফাস্ট লাইফের প্রতি আচ্ছন্ন! কিন্তু এই বিয়ে টিকল না। সুনন্দা বিখ্যাত হতে চান। তিনি তাঁর ব্যবসায়িক নেটওয়ার্ক অনেক বড় আকারে দেখতে চান। আর এখানেই বিরোধ। প্রথমে তর্কাতর্কি। তারপর সংঘাত। এবং অবশেষে আর একসাথে থাকা চলে না। বিচ্ছেদ। পুষ্কর পরিবারটির বিচ্ছেদপর্বও তখন থেকেই শুরু। কারণ ১৯৮৯ সালে পারিবারিক বাড়িতে আগুন লাগিয়ে দিল কাশ্মীরি উগ্রপন্থীরা। বাকি দলে দলে কাশ্মীরি পণ্ডিতদের মতো কর্নেল পুষ্করনাথ দাসের পরিবারও উঠে আসতে বাধ্য হলেন দেশ-ঘর-মাটি-সংস্কৃতি ছেড়ে। দিল্লিতে। এবং সুনন্দাও সেই থেকে মানসিকভাবে ছিন্নমূল হতে শুরু করলেন।
ব্যবসায়িক ফার্মকে সম্প্রসারিত করতে সুনন্দা চলে গেলেন দুবাই। তাঁর প্রথম সংস্থার নাম এক্সপ্রেশনস। মূলত এই সংস্থার কাজ হল ফ্যাশন শো আর বিভিন্ন কর্পোরেট ইভেন্ট আয়োজন করা। আর সেখানে তাঁর সঙ্গে যাঁর পরিচয় হল তাঁর নাম সুজিত মেনন। সুনন্দার ফার্মকে এগিয়ে নিয়ে যেতে সাহায্য করছেন সেই ব্যক্তি। তাঁর উপর অনেকটাই নির্ভরশীল সুনন্দা। তাহলে তিনি যখন প্রপোজ করলেন কীভাবে আর প্রত্যাখ্যান করা সম্ভব? সেই শক্তি ছিল না। অতএব বিবাহ হল। ১৯৯১ সালে। জন্ম হল সুনন্দার প্রথম সন্তানের। শিব মেনন। যাকে বলা যেতে পারে হ্যাপি ফ্যামিলি। দিন কাটছে । দুবাই আর দিল্লির মধ্যে। সুখী সুনন্দা ততদিনে জুয়েলারি এক্সপোর্টেও যুক্ত হয়েছেন। মূল সংস্থাটির দেখভাল করছেন স্বামী। আর সুনন্দা আরও আর্থিক সচ্ছলতার জন্য একটি অ্যাড এজেন্সিতে মার্কেটিং ম্যানেজার হিসাবে যোগ দিলেন। তাঁর বহুদিনের শখ বম্বে ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির নায়ক-নায়িকাদের সঙ্গে একবার অন্তত পরিচিত হওয়া। ছবি তোলা। সেই শখও মিটল। কারণ তখন প্রায় সকল সেলেব্রিটি দুবাই যেতেন নিয়ম করে। ফাংশন হত। ক্রিকেট ছিল শারজায়। নতুন সংস্থার নাম বোজেল প্রাইম অ্যাডভার্টাইজিং। সৌদি দুনিয়ায় তাদের ব্র্যান্ডনেম মোটামুটি বেশ খ্যাতনামা। সুজিত মেনন দিল্লিতে এলেন একদিন। ১৯৯৭ সাল। এখানে একটি অফিস আছে। করোল বাগে। আজমল খান মার্কেট থেকে বেরিয়ে সোজা বাঁদিকে টার্ন দিতে হবে। গাড়ি চালাচ্ছেন সুজিত। একবার ঝান্ডেওয়ালায় একটা কাজ আছে। লোনের ব্যাপার। মন ভালো নেই সুজিত মেননের। কারণ সবেমাত্র একটা ইভেন্ট আয়োজন করতে গিয়ে অনেক টাকা লোকসান হয়েছে। কেরলের সুপারস্টার মামুঠি নাইট করার কথা ছিল। সেটার আয়োজক ছিলেন তাঁরা দুজনে। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার। টিকিটের চাহিদা নেই। টেনশন বাড়ছে। অথচ যেদিন শো, সেদিন দেখা গেল গোটা অডিটোরিয়াম পূর্ণ। একটিও সিট ফাঁকা নেই। মালায়ালিদের ভিড়ে ঠাসা। অথচ টিকিট বিক্রি হয়নি। এটা কীভাবে হয়? জানা গেল আসল কারণ। আগে থেকেই কেউ জাল টিকিট তৈরি করে হুবহু এই সংস্থার লেটারহেড নকল করে সব টাকা তুলে নিয়েছে। আর সিংহভাগ মানুষই সেদিন শো দেখেছিলেন ওই জাল টিকিট নিয়ে। ফলে একদিকে যেমন হয়েছিল বিপুল লোকসান। আবার অন্যদিকে তুমুল বদনাম। কারণ যাঁরা সত্যিকারের টিকিট কেটে সেই শো দেখতে এসেছিলেন তাঁদের মধ্যে বহু দর্শক সিটই পেলেন না। আগেই তো জাল টিকিটের লোক এসে বসে আছে। ফলে আপাতত এক বছর যে কোনো শো আয়োজন থেকে ব্যান করা হল। অন্যমনস্ক ছিলেন সুজিত। আচমকা একটা উলটোদিক থেকে আসা গাড়ি ধাক্কা মারল। করোল বাগের রাস্তায় সুজিত মেনন মারা গেলেন। সুনন্দা পুষ্কর সেই সময় অনেক দূরে দুবাইয়ের একটি হোটেলে একটি বিজনেস মিটিং এ। লোকসান হয়েছে ২২ লক্ষ টাকা। তাই তিনি ঝাঁপিয়ে পড়েছেন একটা কোনো ইভেন্টের বরাত পাওয়ার জন্য।
স্বামীর মৃত্যু কিছুদিন স্তব্ধ করে দিল সুনন্দাকে। তাঁর দুবাইতে আর থাকা হবে না। এই বিপুল লিভিং কস্ট সামলানো কি সম্ভব একা? যদিও একটা ভালো চাকরি করেন। কিন্তু কীভাবে সম্ভব চাকরি আর সন্তান পালন একসাথে? কেউ তো নেই! চার বছরের ছেলেকে তাই ননদের বাড়িতে রেখে এলেন দিল্লিতে। বললেন কিছুদিন চাকরিটা সামলে নিই। নিজের একটা কিছু সংস্থান না করলে ছেলেকে নিয়ে থাকা সম্ভব নয়। ছেলে বড় হতে লাগল দূরে। কিন্তু সুনন্দা খবর পেলেন ছেলে সুস্থ নয়। কমিউনিকেশন ডিসঅর্ডার আছে। মা ছাড়া আর কে পারবে এই সময় তাকে সঙ্গ দিয়ে সুস্থতার দিকে নিয়ে যেতে? তাই সুনন্দা নিয়ে গেলেন আবার ছেলেকে দুবাই। এবার আর চাকরি করা সম্ভব নয়। নিজের জুয়েলারি ব্যবসা চালু করলেন তিনি। নাম দেওয়া হল র্যাভিসেন্ট ট্রেডিং। শুধু নিজের সংসার চালানো নয়। ভাইয়ের ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের ফি দিতে হয় তাঁকে। কিন্তু এতকিছু সামলানো যাচ্ছে না। কারণ যত দিন যাচ্ছে ততই ওই ব্যবসাটি সম্প্রসারিত হচ্ছে সর্বত্র। আজকাল সকলেই মিডল ইস্টে প্রথম যে ব্যবসাটি শুরু করে সেটি হল জুয়েলারি। এর অন্য কারণও আছে। হাওলার কারবার। জুয়েলারি হল সবথেকে সহজ রাস্তা । তাই সুনন্দার প্রয়োজন মিটল না। তাহলে উপায়? ছেলে শিব মেননের উন্নতমানের একটি স্পিচ থেরাপি চাই। সেটা সবথেকে ভালো হয় যদি বিদেশে করা যায়। সুনন্দার কয়েকজন বন্ধু থাকে কানাডায়। কাশ্মীরের বন্ধু। তাঁরাই প্রস্তাব দিল এখানে চলে এসো। কানাডায় এসেই যথাসর্বস্ব দিয়ে একটা শেষ চেষ্টা শুরু। সেটি হল একটি আই টি ফার্মের পার্টনার হওয়া। ভ্যালি রিসোর্স। সান ফ্রান্সিসকোতে থাকা এক বন্ধু সব ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। সত্যি বলতে কী বেশ ভালোই চলছিল। এদিকে কানাডা হেলথকেয়ারের মাধ্যমে ছেলের স্পিচ থেরাপিও বেশ কার্যকরী হচ্ছে। ভালো হয়ে ওঠার লক্ষণ দেখাচ্ছে শিব। এর থেকে ভালো আর কী হতে পারে। সুনন্দা ওয়ার্ক পারমিট নিয়ে এসেছিলেন। এবং কিছু বছর পর পেয়ে গেলেন পার্মানেন্ট রেসিডেন্ট তকমা। কিন্তু সুনন্দা পুষ্করের ভাগ্য তাঁকে কখনও থিতু হতে দেয়নি। সবই যখন ঠিকঠাক চলছে তখন সম্পূর্ণ অন্য এক প্রান্ত থেকে আঘাত এল। ওসামা বিন লাদেন নামে এক সন্ত্রাসবাদী নিউইয়র্কে এমন এক আক্রমণ করল যে তার জেরে আমেরিকা মানসিকভাবে সবথেকে বড় ধাক্কা খেল শুধু তাই নয়, ৬ মাসের মধ্যে অর্থনৈতিক মন্দা শুরু হয়ে গেল। আর সবথেকে বড় আঘাত ইনফরমেশন টেকনোলজিতে। যার প্রত্যাশিত প্রভাব এসে পড়ল কানাডায়। কারণ কানাডার আইটি ফার্মগুলি নির্ভরই করে থাকে আমেরিকার ব্যবসার উপর অতএব সুনন্দার জীবনে আবার নেমে এল অনিশ্চয়তার আঁধার। কেমন চলছিল ব্যবসা? যথেষ্ট ভালো। নিজের জন্য একটা অ্যাপার্টমেন্ট আর একটা বি এম ডব্লু কেনা হয়ে গিয়েছে। কিন্তু আবার ছিন্নমূল হতে হল। এবার কোথায়? যে শহর তিনি সবথেকে বেশি চেনেন। সেই দুবাই। এবং অবশেষে…। অবশেষে সাফল্য এসে দেখা দিল স্থায়ীভাবে। বেস্ট হোমস নামের একটি সংস্থার সঙ্গে যুক্ত হলেন প্রথমে। এরপর টেকম ইনভেস্টমেন্টস। এই সংস্থাটি ইন্টারন্যাশনাল মিডিয়া জোনের সঙ্গে যুক্ত। আর তারপর তিনি মুখোমুখি হলেন এমন একটি সেক্টরের সঙ্গে যে ইন্ডাস্ট্রি ভারত, দুবাই, পাকিস্তানে সবথেকে গ্ল্যামারাস এবং আর্থিক লেনদেনের মেলবন্ধন। সেই বম্বে ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি, ফ্যাশন দুনিয়া ওই জগতের কাছে নগণ্য। অন্তত প্রভাব, প্রতিপত্তি, আর্থিক এবং রাজনৈতিক ক্ষমতায়। ওই সেক্টরটিকে ভরকেন্দ্র হিসাবে গ্রহণ করে এগিয়ে গেলেন সুনন্দা পুষ্কর। আর সেভাবেই তাঁর স্বপ্নের শহরে সুনন্দা পুষ্কর পেলেন তিনটি বহু আকাঙ্ক্ষিত প্রত্যাশা।
১) খ্যাতি
২) আর্থিক প্রতিষ্ঠা
৩) মনের মানুষ।
কী সেই সেক্টর যা এত শক্তিশালী? ক্রিকেট!
কৈলাশনাথ কাটজু কখনও ছিলেন ওড়িশার রাজ্যপাল। কখনও হয়েছিলেন পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যপাল। কখনও ছিলেন মধ্যপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী। কখনও ভারতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী। একইসঙ্গে ভারতের অন্যতম খ্যাতনামা ও সফল এক আইনজীবী। ছিলেন স্বাধীনতা সংগ্রামী। বহুবার জেলে গিয়েছিলেন ব্রিটিশ আমলে। তাঁর নাতনি কলকাতার লরেটো হাউসের এক অত্যন্ত কৃতী ছাত্রী। উজ্জ্বল, বুদ্ধিদীপ্ত এবং মেধাবী। মেয়েটির পিতা ও মাতা ছিলেন বাঙালি এবং কাশ্মীরি পরিবারের। নাম তিলোত্তমা মুখার্জি। সেই তিলোত্তমা মুখার্জির সঙ্গেই বিয়ে হয়েছিল কেরলের ছেলে শশী থারুরের। যাকে বলা যায় আদর্শ দম্পতি। কারণ দুজনেই মেধাবী এবং উজ্জ্বল কেরিয়ার গ্রাফ। যথাসময়ে তাঁদের যমজ পুত্র হয়েছিল। কনিষ্ক এবং ইশান। এঁদের পিতা ও মাতার বংশে প্রায় সকলেই লেখক, সাহিত্যিক। সুতরাং সেই ট্রাডিশন বজায় রেখেই এই দুই যমজ ভাইও আজ নিজেদের পেশার পাশাপাশি লেখকও। দুজনেই সাংবাদিকতাকে পেশা হিসাবে বেছেছেন। কখনও ওয়াশিংটন পোস্ট কখনও ওপেন ডেমোক্রেসি, কখনও টাইম ম্যাগাজিনে তাঁরা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদে কাজ করে চলেছেন। একটা সময় পরে ব্যক্তিগত কারণে তিলোত্তমা মুখার্জি এবং শশী থারুরের মধ্যে বিবাহবিচ্ছেদ হয়ে গেল। এবং তাঁদের পথ চলার রাস্তাও পৃথক হয়ে যায়। তিলোত্তমা মুখার্জি নিউইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপিকা। এবং একই সঙ্গে তিনি সামাজিক আন্দোলনের সঙ্গে অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে যুক্ত। বিচ্ছেদ সত্বেও সম্পর্ক কখনও তিক্ত হয়নি।
২০০৭ সালে থারুর বিবাহ করেছিলেন রাষ্ট্রসংঘের ডিপার্টমেন্ট অফ কমিশনের ডেপুটি সেক্রেটারি ক্রিস্টা গেইলজকে। কিন্তু তারপরই থারুর আরও বেশি করে ভারতীয় রাজনীতিতে যুক্ত হতে চাইলেন। তিনি কংগ্রেসের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে নিলেন নিজেকে। তাঁর মতো একজন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক এবং রাষ্ট্রসংঘের বিশ্লেষককে দলে পেয়ে কংগ্রেসও লাভবান হয়েছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক কেরিয়ার থেকে সরে এসে ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে নিজেকে সীমাবদ্ধ করবেন শশী এটা ক্রিস্টার পছন্দ হয়নি। এটা নিয়ে দুজনের মধ্যে অনেক আলোচনাও হল। টানাপোড়েন চলল। তাহলে কী সম্পর্ক ভাঙনের মুখে? শেষবার সম্পর্কটিকে টিকিয়ে রাখা যায় কিনা তার প্রাণপণ প্রয়াস করেছেন দুজনেই। সেই লক্ষ্যে রাজস্থানের উদয়পুরে এসে থাকলেন আর এক বার শেষ চেষ্টার লক্ষ্যে। কিন্তু সেরকম লাভ হয়নি। দ্বিতীয় বিবাহও স্থিত হল না।
দুবাইয়ে সবথেকে ধনীদের ঠিকানা হল এমিরেটস হিলস। বেনজির ভুট্টোর পুত্রকন্যাদের বাড়িও যেমন সেখানে, আবার ব্রিটেনের রয়্যাল ফ্যামিলির অ্যাপার্টমেন্টও আছে। ২০০৯ সালের জুন মাসে মালয়ালি ব্যবসায়ী সানি ভারকে একটি পার্টি থ্রো করলেন। উপলক্ষ্য ভারতীয় রাজনীতিক কেরলের গর্ব শশী থারুরের দুবাই আগমন। সবেমাত্র থারুর তখন হয়েছেন ভারত সরকারের বিদেশমন্ত্রকের রাষ্ট্রমন্ত্রী। সেখানেই প্রথম দেখা সুনন্দা পুষ্করের সঙ্গে শশী থারুরের। ঠিক পাঁচ মাস পর সুনন্দাকে দেখা গিয়েছিল মাসকাটে। ওমানের রাজধানীতে। তাঁর বিজনেসের কাজে। আর গিয়েই দেখলেন যে হোটেলে তিনি উঠেছেন সেখানেই সরকারি কাজে এসে রয়েছেন বিদেশ প্রতিমন্ত্রী শশী থারুর। এবং সেই শুরু। তাঁদের দুজনের কাছে আসা নিয়ে শুরু হয় অন্তহীন জল্পনা। বিজেপির এক মুখপাত্র সেই সময় বিবৃতি দিয়ে বলেছিলেন কংগ্রেস তো বিদেশমন্ত্রককে মিনিস্ট্রি অফ লাভ অ্যাফেয়ার্সে পরিণত করেছে। এসব উপেক্ষা করে বিয়ে হয়ে গেল তাঁদের। দুজনেরই এর আগে দুবার বিবাহ হয়েছে। দুজনেরই রয়েছে সন্তান। এবং গোটা বিবাহপর্বটি বস্তুত ফেয়ারি টেইলসের মতোই যেন হয়েছিল। প্রতিটি ফেয়ারি টেইলে একজন রাক্ষস আসে। যে রাজকন্যা রাজপুত্রের সুখের দিনে অন্ধকার আনে। এক্ষেত্রেও ব্যতিক্রম হয়নি। আধুনিক যুগের সেই নয়া অন্ধকারের নাম আইপিএল ৷ সুনন্দা ও শশী থারুর যখনই আইপিএল নামক গ্ল্যামার জগতে পা রাখলেন, সেটাই যেন হয়েছিল এই সুখসফরের শেষের শুরু।
ললিত মোদি ট্যুইট করে গোটা দুনিয়াকে প্রথম জানালেন কোচি টাস্কার নামক নয়া আইপিএল টিমের পিছনে আসল মেন্টর শশী থারুর। যদিও সেটা কোনো গোপন তথ্যই নয়। সকলেই জানে। ললিত মোদি তার সঙ্গে যোগ করলেন কোচি টাস্কারের ৪.৯ শতাংশ সোয়েট ইক্যুইটি আসল সুনন্দা পুষ্করের নামে। যার মূল্য নাকি ৭০ কোটি টাকা। যদিও সেই অঙ্ক প্রমাণ করা যায়নি। তৎক্ষণাৎ সুনন্দা পুষ্কর এবং শশী থারুর প্রতিবাদ করলেন। কিন্তু লাভ হয়নি। রাজনৈতিক ঝড় ওঠে। কেন শশী থারুরের উপর রাগ ললিত মোদির? তাঁরা তো বন্ধু ছিলেন! কারণ একটাই। সেই সময় তিনটি দল আইপিএলের ফ্র্যাঞ্চইজি নিতে আগ্রহী ছিল। সুব্রত রায়ের সাহারা, সঈফ আলি খান আর করিনা কাপুরের পুণে টিম এবং আমেদাবাদের জন্য আদানি গ্রুপ। সাহারা প্রথমেই ৩৭ কোটি ডলারের বিপুল অঙ্ক হেঁকে সবাইকে হারিয়ে দিয়েছিল। পুণে প্রথম ধাক্কায় সরে গেল। রইল বাকি দুজন। কোচি টাস্কার এবং আদানির আমেদাবাদ টিম। এই সময় ললিত মোদি চাইছিলেন বাকি থাকা একটি ফ্র্যাঞ্চাইজি যেন পায় আমেদাবাদ। কারণ রাজস্থান ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশন থেকে তিনি পদচ্যুত তখন। মরিয়া হয়ে তিনি একটি কোনো ক্রিকেট বডি চাইছিলেন যেখানে নিজেকে যুক্ত করবেন। তাই স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়েই আমেদাবাদ টিমের জন্য আদানিকে সহায়তা করতে চাইছিলেন। আর সেই লক্ষ্যপূরণে তাঁর সবথেকে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায় কোচি টাস্কার। যার পিছনে শশী থারুর। এবং শত প্ররোচনা বা চাপেও পিছু না হটে কোচি টাস্কার ১৫০০ কোটি টাকার দরপত্র হেঁকে ফ্র্যাঞ্চাইজি আদায় করে নিল। আর ললিত মোদি প্রচণ্ড ক্ষিপ্ত হলেন। তারপরই তাঁর থারুরকে আক্রমণ ও বদনাম করার লাগাতার প্রবণতা শুরু হয়ে যায়। একের পর এক ট্যুইট। একের পর এক অভিযোগ। শেষ পর্যন্ত মন্ত্রিত্ব থেকে ইস্তফা দিতে বাধ্য হলেন থারুর। সুনন্দা পুষ্কর বলেছিলেন, যে ইক্যুইটি নিয়ে এত বিতর্ক ছড়াল আদতে তা ভারতের কয়েকজন ক্রিকেটারের হয়ে আমার কাছে রাখা হয়েছিল। কারা তারা? সেকথা তিনি কখনও জানাননি। তবে একটা কথা জানা হয়েছিল আইপিএলকে মাঝখানে রেখে ব্যবসা করে সহজে কোটি কোটি টাকা আয়ের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন সকলেই। কর্পোরেট, ক্রিকেটার, রাজনীতিক সবাই। টাকা ও সময় খরচ হয়েছে শুধু একটি শ্রেণির। পাবলিকের।
১৭ জানুয়ারি ২০১৪। বিকেল সাড়ে চারটের সময় সুনন্দা পুষ্কর একটি প্রেস কনফারেন্স করবেন। প্রেস ক্লাব অফ ইন্ডিয়ায়। দিল্লির সংবাদমাধ্যমগুলিতে বেশ কৌতূহল আর আগ্রহের বাতাবরণ। কী হয় কী হয়! ততদিনে যেটা জানা হয়ে গিয়েছে সেটি হল পাকিস্তানের সাংবাদিক মেহের তারারের সঙ্গে শশী থারুরের কোনো বিশেষ যোগাযোগ রয়েছে এই সন্দেহ দানা বেঁধেছে সুনন্দা পুষ্করের মধ্যেও। কিছুদিন ধরেই চলছে লাগাতার ট্যুইট যুদ্ধ। গোপনে শশী ও মেহর তারার দেখাসাক্ষাৎ করেন বলে জল্পনা। যদিও দুপক্ষই প্রবল অস্বীকার করেছেন। কিন্তু মিডিয়া চুপ করে নেই। তাঁরা যতকম অ্যাঙ্গেল সম্ভব সবই দেখাচ্ছে। সবটাই মিডিয়ার গুজব বলে অভিহিত করা হচ্ছে। তাহলে কি সুনন্দা নিজেই এবার প্রকাশ্যে মুখ খুলবেন? নাকি অন্য কোনো বিষয়ে সেই প্রেস কনফারেন্স? কতটা ক্ষিপ্ত ও নিরাশ ছিলেন সুনন্দা? তিনি একটি ট্যুইটে মেহর তারারকে আইএসআই এজেন্টেও আখ্যা দিয়েছিলেন। সাড়ে চারটের অনেক আগে থেকেই প্রেস ক্লাবে ভিড় জমতে শুরু করেছে। পরে এলে জায়গা পাওয়া যাবে না। ক্যামেরা রাখার স্থানের সংকুলান। এই প্রেস কনফারেন্সের আইডিয়া কার? বিখ্যাত সাংবাদিক নলিনী সিংয়ের। তিনি ছিলেন সুনন্দার বন্ধু। অনেকদিন ধরেই। তাঁকে বিশ্বাস করে বলতেন অনেক কথা। চারটে বাজে। এখনও আসছেন না কেন সুনন্দা? নলিনী সিং ফোন করছেন? ফোন বেজে যাচ্ছে। কেউ ধরছে না। হোটেল রুমে আর কেউ নেই। একা সুনন্দা। শশী থারুর ভোর সাড়ে ৬ টায় বেরিয়ে গিয়েছেন। কারণ তালকাটোরা স্টেডিয়ামে কংগ্রেসের সম্মেলন চলছে। সারাদিন সেখানেই তিনি। কী ব্যাপার? হোটেল লীলা প্যালেসে একবার কি যাওয়া দরকার? অনেকক্ষণ অপেক্ষা করে মিডিয়া চলে যাচ্ছে। সুনন্দা যে অসুস্থ সেটা অবশ্য অনেকে জানেন তাই সকলকে বলা হল। এআইসিসি মিটিং সমাপ্ত হওয়ার পর শশী থারুর তাড়াতাড়ি বেরোলেন। একটি হোটেলে তাঁর বক্তৃতা ছিল। সেখান থেকে সোজা হোটেল। এবং রুমে ঢুকলেন। ডুপ্লিকেট কি দিয়ে। সুনন্দা বিছানায় শুয়ে আছেন। এগিয়ে গেলেন শশী। এই সন্ধ্যায় অসময়ে ঘুমাচ্ছেন কেন? কিন্তু সুনন্দা নিথর! চমকে গেলেন শশী। তাঁর সঙ্গেই এসেছিলেন প্রাইভেট সেক্রেটারি অভিনব কুমার। তাঁকে বললেন, এখনই ডাক্তারকে ডাকতে হবে। তিনি নিজেই পরিচিত ডাক্তারকে কল করলেন। ততক্ষণে হোটেলের ইন হাউস ডক্টর এসে গিয়েছেন। তিনি জানালেন সুনন্দা পুষ্কর মৃত! ঠিক সাড়ে তিনটের সময় লবিতে এসে ফোন কলের পর রুমে ফিরেছিলেন তিনি। খাবারের অর্ডার করেছিলেন। তারপর থেকে তাঁর রুম থেকে কোনো সাড়াশব্দ ছিল না। তাহলে কি খাবার খাওয়ার পর? নাকি অনেক পর?
প্রথম বিতর্ক দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ল ঠিক তিনদিন পর। ২০ জানুয়ারি দিল্লি পুলিশ ঘোষণা করল প্রাথমিক তদন্তের পর মনে হচ্ছে মার্ডারের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না! সম্ভবত বিষপ্রয়োগে। কিন্তু কে খুন করবে তাঁকে? অজস্র সম্ভাবনা আর কাহিনির জটাজালে আচ্ছন্ন হল আকাশ বাতাস। ১০ অক্টোবর প্রকাশ করা হল সুনন্দার শরীরে ১২ টি ইনজুরি মার্কস পাওয়া গিয়েছে। কিন্তু সেটা যথেষ্ট গুরুতর নয়। তবুও? কীভাবে হল ওই আঘাতচিহ্নগুলো? তবে তার থেকে বড় রহস্য বেশ কয়েকটি সিরিঞ্জ ঢোকানোর চিহ্ন রয়েছে। যদিও সেগুলি হতেই পারে একের পর এক রক্তপরীক্ষার জেরে। অল ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউট অফ মেডিকেল সায়েন্সের পোস্ট মর্টেম রিপোর্ট, ভিসেরা রিপোর্টের নানাবিধ সংশয় আরও বেশি রহস্যকে ঘনীভূত করে দিল। কারণ যারা মৃত্যুর পর অটোপসি রিপোর্টে লিখেছিলেন ড্রাগ ওভারডোজের কারণে মৃত্যু, তারাই কীভাবে বললেন বিষক্রিয়ায়? কী কী নমুনা পাওয়া গেল সুনন্দার শরীরে? যে বিষগুলি থাকে নেরিয়াম ওলেন্ডার, স্নেক ভেনোম, হেরোইন, পলোনিয়াম ২১০ এবং থালিয়ামের মধ্যে। তাহলে এর মধ্যে কোনটা ঢুকেছিল তাঁর শরীরে? সে সম্পর্কে তিন সদস্যের একটি কমিটি তাদের অটোপসি রিপোর্টে কিছুই বলল না। অর্থাৎ ধোঁয়াশা। জিইয়ে থাকল। এসব চক্রান্তে থিওরির পাশাপাশি সিম্পল অন্য যে অ্যাঙ্গেলটি মোটামুটি বিশ্বাস করা হচ্ছিল সেটি হল আত্মহত্যা করেছেন ওভারডোজ ওষুধ খেয়েই। যদিও প্রশ্ন হল আত্মহত্যা কেন করবেন? যিনি মাত্র কয়েকঘন্টা পর প্রেস কনফারেন্স করবেন বলে স্থির করেছেন তিনি আচমকা তো আর সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না আত্মহত্যা করার? ইতিমধ্যেই আত্মহত্যায় প্ররোচনার মামলা করে শশী থারুরের নামে চার্জ এনেছে পুলিশ। থারুর বলেছেন, আমি শেষ পর্যন্ত লড়তে চাই। সুনন্দার মৃত্যু আমি চাইব এটা অবিশ্বাস্য! এই চার্জ রাজনৈতিক চক্রান্ত।
তাহলে আর কোনো পয়েন্টে কী তদন্ত এগোয় নি? এগিয়েছে। জানা গেল তিনজন বিদেশি পাসপোর্ট নিয়ে আসা ব্যক্তি দুবাই থেকে দিল্লি এসেছিলেন। ১৬ জানুয়ারি তাঁরা হোটেল লীলা প্যালেসে চেক ইন করেন। কারা তারা? তাদের নাম বিদেশমন্ত্রকের কাছে গিয়ে জমা দেওয়ার পর জানা যায় ওই নামে কোনো পাসপোর্ট ইস্যু করা হয়নি। ঠিক সেদিনই হোটেল ছেড়ে তারা চলে যায়! কারা ছিল তাঁরা? সুনন্দা-মৃত্যু আজও এক রহস্য।
