জামশেদজি টাটা এবং তাঁর পরিবারের পছন্দের বেড়ানোর জায়গা হল হার্ডেলট। ফ্রান্সের এক অপরূপ সি বিচ টাউন। ঘটনাচক্রে সেখানে ছিল লুই ব্রেরিওটের বাড়ি। ব্রেরিওট হলেন প্রথম পাইলট যিনি ১৯০৯ সালে ইংলিশ চ্যানেলের উপর থেকে ফ্লাই করেছিলেন। সুতরাং তিনি ছিলেন সেই সময়ের এক সুপারহিরো। একটানা বহু বছর তাঁকেই রোলমডেল করেছে বিশ্বের যুবকবৃন্দ। একটা সময় সেই বন্দনায় ভাগ বসান চার্লস লিন্ডবার্গ। যিনি ১৯২৭ সালে আটলান্টিকের উপর দিয়ে প্লেন চালিয়ে বিশ্ববাসীকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন। এবং তারপর থেকে লিন্ডবার্গ পরিণত হন নতুন এক আকাশনায়কে। তাঁকে ঘিরে মিথের জন্ম হয় একঝাঁক। লুই ব্রেরিওটের ছোট্ট বিমান মাঝেমধ্যেই যেখানে ল্যান্ড করত সেটি ছিল ফ্রান্সের হার্ডেলটে। যেখানে তাঁর নিজের বাড়ি ছিল। আর যেখানে ল্যান্ডিংটা হত সেটির অনতিদূরেই ছিল জামশেদজি টাটাদের বাড়ি। প্যারিস থেকে মাঝেমধ্যেই যেখানে টাটা পরিবার চলে আসতেন ছুটি কাটাতে। সুতরাং যখনই লুই ব্রেরিওট তাঁর প্লেন ল্যান্ড করাতেন, তখনই ওই ছোট্ট সমুদ্রতীরবর্তী শহরের শিশুকিশোরযুবকের দল ভিড় করেছে। তাঁকে ঘিরে থাকত সম্ভ্রমের চোখ। সেই তালিকায় ছিলেন জামশেদজি টাটা। জামশেদজি সেই থেকে স্বপ্ন দেখতেন তিনি একদিন পাইলট হবেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর তিনি প্রথমবারের জন্য বিমানে চাপলেন। সেটি ছিল কদ্রোঁ ব্যাগেট নামক একটি ফ্রেঞ্চ বিমান। ওই অল্প বয়সেই প্লেনে চাপা একটা প্যাশনে পরিণত হল তাঁর। এবং বম্বেতে ফিরে এসে তিনি প্রথম যে কাজটি করেছিলেন সেটি হল ফ্লাইং ক্লাবে ভর্তি হওয়া। এবং নিয়মিত প্র্যাকটিসের পর ১৯২৯ সালে তিনি সেই বম্বে ফ্লাইং ক্লাব থেকে স্বীকৃতি পেলেন সার্টিফিকেটপ্রাপ্ত পাইলটের। তবে শুরুতে দুজনের সঙ্গে ফ্লাই করতে হবে। একা নয়। একা ফ্লাইংয়ের অনুমতি পাওয়া খুব কঠিন। একদিন এল সেই বহু প্রতীক্ষার দিন। সাড়ে তিন ঘণ্টার বেশি ডুয়েল ফ্লাইং পরীক্ষার পর একদিন জামশেদজি টাটা পেলেন একা ফ্লাই করার অনুমোদন। ১৯২৯ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি ফেডারেশন এরোনেটিক ইন্টারন্যাশনালের পক্ষ থেকে এরোক্লাব অফ ইন্ডিয়া অ্যান্ড বার্মা তাঁকে দিল এ গ্রেড লাইসেন্স। গোটা ভারতের মধ্যে সেই প্রথম কোনো ভারতীয় এ গ্রেড পাইলটের স্বীকৃতি পেলেন আন্তর্জাতিক সংগঠনের পক্ষ থেকে। লাইসেন্সপ্রাপ্ত পাইলট হওয়ার পর সাধারণত সকলেই ভাববে একটা কোনো পাইলটের চাকরি পাওয়ার কথা। সেটাই স্বাভাবিক। অন্তত প্রাথমিকভাবে। আর তখন এরকম একটা সার্টিফিকেট থাকা মানে ভারতে নয়, বিদেশেও যে কোনো সংস্থায় পাইলটের অথবা কো পাইলটের কাজ পাওয়া অসম্ভব নয়। বরং সহজ। কিন্তু জামশেদজি টাটা অন্য গোত্রের। ওই সার্টিফিকেট পাওয়ার মাত্র ৬ সপ্তাহের মধ্যে ভাবলেন এক অদ্ভুত স্বপ্নের কথা। নিজের বিমান সংস্থা হবে।
নেভিল ভিনসেন্ট টাটার বন্ধু। তিনি ছিলেন আরব দুনিয়ার রয়্যাল এয়ার ফোর্সের হেভিওয়েট বক্সিং চ্যাম্পিয়ন। ১৯২৯ সালের ২০ মার্চ টাটা গোষ্ঠী ব্রিটিশ সরকারকে চিঠি লিখে জানাল তারা করাচি আর বম্বের মধ্যে মেল সার্ভিস (চিঠি, পার্সেল) বিমান চালু করতে আগ্রহী। সরকারের থেকে টাটা গোষ্ঠী ১ লক্ষ ২৫ হাজার টাকার একটা সাবসিডি চাইল। কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকে কোনো উচ্চবাচ্যই নেই। অথচ টাটার ওই চিঠি পাওয়ার পরই ব্রিটিশ ইন্ডিয়ার সরকার ইম্পিরিয়াল এয়ারওয়েজ মেল সার্ভিস চালু করে দিল দিল্লি ও করাচির মধ্যে। টাটাকে কিন্তু পারমিশন দেওয়া হচ্ছে না। জামশেদজি হতাশ হলেন না। অপেক্ষা করছেন। এবং বারংবার লন্ডনে গিয়ে তিনি চেষ্টা করলেন ব্রিটিশ সরকারকে প্রভাবিত করার। ফল মিলল। অনুমতি পাওয়া গেল। ১৯৩২ সালের অক্টোবর মাসের এক ভোরে করাচি থেকে একটি ‘পজ মথ’ বিমান অখণ্ড ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে পৌঁছে দেওয়ার জন্য কয়েক বস্তা চিঠি আর পার্সেল নিয়ে টেক অফফ করেছিল। ভারতবর্ষের নিজস্ব কোম্পানির একান্ত ভারতীয় এক বিমান সংস্থার যাত্রা শুরু হয়েছিল কিছু চিঠি নিয়ে। টাটার সঙ্গী সেই বন্ধু। নেভিল ভিনসেন্ট। সংস্থার নাম টাটা এভিয়েশন সার্ভিস। তাঁর আত্মজীবনীতে জামশেদজি বলেছেন, মাঝ আকাশে ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনায় বসেছিলাম সাফল্য কামনায়। ঘণ্টায় ১০০ মাইল ছিল স্পিড। তিনি নিজেই ছিলেন সেই প্রথম বিমানে। এবং প্রথম ডেলিভারি ছিল আমেদাবাদ। তাই ল্যান্ড করা হল। এবং রিফুয়েলিংয়ের জন্য বলা হয়। বিমান থেকে কয়েক বস্তা চিঠি ও পার্সেল নামানো হয় রানওয়েতে। একটু দূরেই দাঁড়িয়ে ছিল একটি গোরুর গাড়ি। সেই গোরুর গাড়িতে তোলা হল গুরুত্বপূর্ণ সরকারি, বেসরকারি চিঠি আর পার্সেল। সেসব নিয়ে সেই গোরুর গাড়ি রওনা হল। কী অদ্ভুত একটি ভারতের আধুনিকতার পথে যাত্রা শুরুর দৃশ্য। ভারতীয় সংস্থার প্রথম বিমান থেকে নামা চিঠি টিপিক্যাল ভারতীয় পরিবহণ গোরুর গাড়িতে চেপে যাচ্ছে হাজারো গন্তব্যে! নতুন ও পুরোনোর মেলবন্ধন। আর বিমানের ট্যাংক রিফুয়েলিংয়ের জন্য চার গ্যালন পেট্রল ঢালা হয়েছিল আমেদাবাদ এয়ারপোর্টে। সেই প্রথম ফ্লাইট ৫৫ পাউন্ড ওজনের চিঠির বস্তা নিয়ে ‘পজ মথ’ স্বচ্ছন্দে ল্যান্ড করেছিল বম্বে এয়ারপোর্টে।
এরপর থেকে নিয়মটি ড়য়ে গেল ইম্পিরিয়াল এয়ারওয়েজ (যা পরবর্তীকালে হবে ব্রিটিশ এয়ারওয়েজ) বিদেশ থেকে প্রতি শুক্রবার করাচিতে নামবে। আর সেই বিমানে আসা যাবতীয় চিঠি আর পার্সেল নিয়ে পরদিন সকালে টাটাদের পজ মথ বিমান উড়বে বম্বের উদ্দেশে। এরপর করাচি এয়ারপোর্টে দাঁড়িয়ে থাকবে সেই ইম্পিরিয়াল এয়ারওয়েজ। অপেক্ষা করবে টাটাদের বিমানের। কখন আসবে ফিরতি বিমান। যতদিন না ভারতে সেইসব চিঠি আর পার্সেল ডেলিভারি করে আবার বিভিন্ন দেশে যাওয়ার জন্য চিঠি পার্সেল নিয়ে টাটাদের বিমান করাচি ফিরছে বম্বে থেকে ততদিন রানওয়েতে অপেক্ষা করেছে ইম্পিরিয়াল এয়ারওয়েজ। সেটা সাধারণত হত ঠিক পরের বুধবার পর্যন্ত। ১৯৩৯ সালে এই রুটিন ভেঙে গেল। কারণ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। যুদ্ধের কারণে ব্রিটিশ সরকার সমস্ত এভিয়েশন সেক্টরই নিজেদের হাতে নিয়ে নিল। ফলে টাটা এভিয়েশন সার্ভিসও সরকারের হাতে গেল। কিন্তু বিশ্বযুদ্ধের সুযোগটি নিতে ছাড়লেন না জামশেদজি। তিনি একটি এভিয়েশন ইন্ডাস্ট্রি গড়ার দিকে এগোলেন। এবারও তাঁর প্রিয় বন্ধু সেই ভিনসেন্টই প্রধান পরামর্শদাতা এবং সঙ্গী। যিনি রয়্যাল এয়ারফোর্সের পাইলট ছিলেন। ততদিনে যাবতীয় যুদ্ধবিমান ছিল ভারী মেটালের তৈরি। টাটার কোম্পানি অফার করল হালকা বিমান তৈরির। সেইমতো যে বিমান তৈরি হল তার নাম দেওয়া হল মসকুইটো। দেখতে ছোট। সাংঘাতিক কার্যকরী। হু হু করে গিয়ে বোমা ফেলে চলে আসবে! সেটাই ছিল কনসেপ্ট। শুধু ইঞ্জিন আমদানি করা হবে। আর বডি তৈরি হবে ভারতে। গোটা প্ল্যান ছিল বার্লিনে বোমা ফেলার। এই প্রস্তাবে রাজি ব্রিটিশ সরকার। তারা ইয়েস বলল প্রথমে। আর জামশেদজি সেই বিমান তৈরির কারখানা বানালেন পুণের কাছে আগা খান প্যালেসে। আশ্চর্য! অর্ডার দেওয়ার কয়েক সপ্তাহ পর ব্রিটিশ সরকার সেই অর্ডার ক্যান্সেল করে দেয়। সম্ভবত ব্রিটিশ কোম্পানির সঙ্গে এই ভারতীয় সংস্থা যদি প্রতিযোগিতা করে জিতে যায়! এই ভয়ে! তাহলে? প্রজেক্ট হবে না? এবার দায়িত্ব নিলেন নেভিল ভিনসেন্ট। তিনি জামশেদজিকে বললেন, ডোন্ট ওরি জেআরডি (এই নামেই টাটা পরিচিত)! তুমি ভেবো না। আমার অনেক বন্ধু ব্রিটিশ সরকারে আছে। দেখছি কী করা যায়। ভিনসেন্ট ব্রিটিশ সরকারের সঙ্গে কথা বলে ডিল সম্পূর্ণ করলেন এবং ফিরছেন ভারত। চুক্তি সফল। ভারতে যাচ্ছিল একটি আমেরিকান ফাইটার বিমান। ব্রিটেন হয়ে। ভিনসেন্ট সেই বিমানেই বসে পড়লেন। তাঁকে সবাই চেনে। আপত্তির প্রশ্ন নেই। তিনি নিজেই পাইলট। সুতরাং পাইলটের পাশেই বসে গেলেন আড্ডা মারতে। সেই বিমানের নাম ছিল হাডসন বম্বার। ফ্রান্সের সীমারেখা ক্রস করার পরই একটি তীব্র শব্দ, আগুন। হিটলারের শিবির গুলি করে নামিয়ে দিল সেই হাডসন বিমানকে। আটলান্টিকে চিরতরে হারিয়ে গেলেন নেভিল ভিনসেন্ট। ভারতের নিজস্ব বিমান সংস্থা নির্মাণে যাঁর অবদান অনস্বীকার্য! যাঁকে ছাড়া সম্ভবত জামশেদজি পারতেনই না বিমান সংস্থা গঠন করতে।
১৯৪৭ সালে স্বাধীনতা পাওয়ার চার মাস পর জামশেদজি টাটা স্বাধীন ভারতের প্রথম সরকারকে একটি প্রস্তাব পাঠালেন। তিনি সরকারের সঙ্গে যৌথ ভেঞ্চারে একটি বিমান পরিবহণ সংস্থা গঠন করতে চান। তখন দেশ গঠনের কাজে উৎসাহিত নয়া সরকার। অতএব এই প্রস্তাবের মাত্র আট সপ্তাহের মধ্যেই অনুমতি পাওয়া গেল। ১৯৪৮ সালের ৮ জুন একটি জয়েন্ট ভেঞ্চারের বিমান সংস্থা প্রথম ফ্লাইট নিয়ে রওনা দিল লন্ডন। বম্বে থেকে। কোম্পানির নাম এয়ার ইন্ডিয়া ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর তাদের ডাকোটা বিমানগুলি আর ফিরিয়ে নিয়ে যায়নি আমেরিকা। সেগুলি ভারতের এয়ারবেসেই রয়ে গেল। সেগুলির স্ট্যান্ডার্ড ছিল অনেক উন্নত। সেগুলি জোগাড় করলেন টাটা। সংস্কার করার পর সেগুলি নিয়ে যাত্রা শুরু হল। এবং দ্রুত এয়ারইন্ডিয়া হয়ে উঠল দেশে নয়, বিদেশেও এক বহু আলোচিত নাম। এরকম দুর্দান্ত প্রফেশনাল সার্ভিস একটি ভারতীয় সংস্থা আয়ত্ত করল কীভাবে? ঠিক চার বছর কাটল। ১৯৫২ সালে ভারত সরকার স্থির করল কোনো বেসরকারি হাতে আর নয়। ভারতীয় বিমান সংস্থাকে রাষ্ট্রীয়করণ করা হবে। কিন্তু যাঁর হাত ধরে এই সংস্থার জন্ম, উত্থান এবং সাফল্যের উড়ান তাঁকে ছাড়া যাবে না। অতএব সেই ১৯৫২ সাল থেকে এয়ার ইন্ডিয়ার চেয়ারম্যান হলেন জামশেদজি টাটা। কতদিন পর্যন্ত? ১৯৭৮! গোটা বিশ্বে এরকম নজির নেই। এতদিন ধরে চেয়ারম্যান। আর সেই সময়সীমায় এয়ার ইন্ডিয়ার খ্যাতি কেমন ছিল? জনপ্রিয়তা আর আভিজাত্যের তুঙ্গে। ১৯৬৮ সালে লন্ডনের ডেইলি মেলের সাংবাদিক জুলিয়েন হল্যান্ড এয়ার ইন্ডিয়ার পরিষেবাকে বিশ্বের মধ্যে অন্যতম শ্রেষ্ঠ আখ্যা দিয়ে একটি আর্টিকল লিখেছিলেন। একটি সমীক্ষায় বলা হয়েছিল, এয়ার ইন্ডিয়া বিশ্বের প্রথম সারির বিমান সংস্থাগুলির মধ্যে শীর্ষস্তরের তালিকায়। জুলিয়েন লিখেছিলেন, একবার রোমে কয়েকঘণ্টা হপিং ফ্লাইটে এয়ার ইন্ডিয়ার বিমান দাঁড়িয়ে ছিল। আমি যাত্রী। একটু বাইরে বেরিয়েছিলাম। সিটে রেখে গিয়েছিলাম কিছু চকোলেট। বেশ কয়েক ঘণ্টা পর যখন ফিরে এলাম, তখন দেখি সেগুলি সরানো হয়নি। তবে আমার সিটের পাশের জানালার ব্লাইন্ড নামানো। যাতে রোদ এসে চকোলেটগুলিকে গলিয়ে না দেয়! এয়ারহোস্টেস এই কাজটি করেছিলেন আমি কিছু না বললেও! এটাই হল সার্ভিস! আর ওই ঘটনার ঠিক ৪০ বছর পর কোন কোন বিমান সংস্থা কেমন তার একটি বিশ্বজোড়া সমীক্ষক সংস্থা জেট এয়ারলাইনার ক্র্যাশ ডেটা ইভ্যালুয়েশন সেন্টারের পক্ষ থেকে সমীক্ষা রিপোর্ট প্রকাশ করা হল। যেখানে বলা হয়েছে, বিশ্বের প্রথম তিনটি বিপজ্জনক বিমান পরিষেবা সংস্থার মধ্যে এয়ারইন্ডিয়া অন্যতম! সুরক্ষা আর পরিষেবা দুটি নিরিখেই এই সংস্থার রেটিং সর্বকালীন নিম্নে। কীভাবে হল এই অবনতি? কাদের জন্য? সবটাই হয়তো এক গভীর চক্রান্ত।
সংস্থার লাভ যখন কমছে, যখন বেসরকারি সংস্থাগুলি হু হু করে এগোচ্ছে, তখন প্রফুল্ল প্যাটেল ইউপিএ সরকারের অসামরিক পরিবহণ মন্ত্রী হঠাৎ ৬৮টি নতুন এয়ারক্র্যাফটের অর্ডার দিলেন কেন? কেন এয়ার ইন্ডিয়া আর ইন্ডিয়ান এয়ারলাইনসের মার্জার হল? কাদের স্বার্থে? ঠিক এই দুটি সিদ্ধান্তের পরই দেখা গেল যে সংস্থার আয় ৭ হাজার কোটি টাকা বছরে, তাকে বলা হল নতুন এয়ারক্র্যাফট কেনার জন্য ৫০ হাজার কোটি টাকা লোন নিতে। ১৫ বছর আগে যে এয়ার ইন্ডিয়া ছিল গোটা এভিয়েশন ইন্ডাস্ট্রির ৪২ শতাংশের মালিক একা। তাকে এখন বিক্রি করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
২০১২ সালের সেপ্টেম্বর মাসে সরকার এফডিআই-এর একটি নীতি ঘোষণা করেছিল। সেই নীতিটি ছিল ভারতীয় বিমান সংস্থার ৪৯ শতাংশ পর্যন্ত শেয়ার নিতে পারবে যে কোনো বিদেশি কোম্পানি। এক বছরের মধ্যে সৌদি আরবের বিখ্যাত বিমান সংস্থা এতিহাদ ভারতের জেট এয়ারলাইন্সের ২৪ শতাংশ শেয়ার কিনে নিল। আর ঠিক তারপরই তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং সৌদি সরকারের সঙ্গে একটি চুক্তি করলেন। সেটি হল ভারত ও গালফ দেশগুলির মধ্যে চলা ফ্লাইটের সাপ্তাহিক বিমান আসনের সীমা ১৩৩০০ থেকে বাড়িয়ে করা হল ৫০ হাজার! এতে সবথেকে লাভবান হল কারা? জেট ও এতিহাদের যৌথ কোম্পানি। সংসদে ঝড় উঠেছিল। বিরোধীরা প্রশ্ন তুলেছিল। কিন্তু সেই বিরোধীরা যখন নিজেরা ক্ষমতায় ছিলেন তারা কী করেছেন? অথবা এখনও বা কী করছেন? অটলবিহারী বাজপেয়ীর সরকারের একটি বিখ্যাত দপ্তর ছিল। তার নাম ডিসইনভেস্ট মিনিস্ট্রি। সরকারের সংস্থাগুলিকে বিক্রি করার কাজ। সেই সংস্থা একটি কমিশন গঠন করেছিল এয়ার ইন্ডিয়া নিয়ে। ডিসইনভেস্টমেন্ট কমিশন। তাদের সুপারিশ হয়েছিল এয়ার ইন্ডিয়া পরিচালিত দুটি খ্যাতনামা হোটেল দিল্লি ও মুম্বইয়ের সেন্টুর বিক্রি করা হবে। পরবর্তীকালে সেটি কত টাকায় বিক্রি হয়েছিল? মাত্র ৮৩ কোটি টাকায়! কে কিনেছিল? বটরা হসপিটালিটি প্রাইভেট লিমিটেড। কে তারা? খুব কম লোকই জানে কে তারা? কেন তাদেরই বাছাই করা হল! তারও উত্তর নেই। সেই একই হোটেল এরপর সংস্থাটি বিক্রি করে দিল সাহারা গ্রুপের কাছে। কত টাকায়? ১১৫ কোটি টাকায়। সোজা মুনাফা! অল্প টাকায় কেনো, বেশি টাকায় বেচে দাও। উদয়পুরের ২৯ একর জমি নিয়ে থাকা বিলাসবহুল লক্ষ্মী বিলাস হোটেল কত টাকায় বিক্রি করা হয়েছিল? ৭ কোটি ৫২ লক্ষ টাকায়! দক্ষিণ দিল্লি বা মুম্বইয়ের যে কোনো পশ এলাকার বাড়ির দাম তার থেকে বেশি। কিন্তু শুধুই কী কম্পিটিশনে টিকে থাকতে না পেরেই লোকসানে ডুবে গেল এয়ার ইন্ডিয়া? না। এয়ার ইন্ডিয়ার নিজস্ব রিপোর্টে দেখা যাচ্ছে বিদেশমন্ত্রক যতবার বিদেশে মন্ত্রীদের নিয়ে বিভিন্ন ট্যুরে গিয়েছে তার সিংহভাগ খরচই মেটায়নি। সব বকেয়া হয়ে রয়েছে। কখনও কোনো প্রধানমন্ত্রীর ৬টি দেশ ভ্রমণের জন্য ৪৮ কোটি টাকা মেটায়নি বিদেশমন্ত্রক। কখনও রাষ্ট্রপতিদের ২২টি বিদেশ সফরের খরচ ২০৬ কোটি টাকা বাকি রয়ে গিয়েছে বছরের পর বছর। কখনও ভাইস প্রেসিডেন্টদের এয়ারক্র্যাফট মেইনটেন্যান্সের জন্য ব্যয় হওয়া ১৪৬ কোটি টাকা মেটানো হয়নি। এভাবে লোকসানের সমুদ্রে ডোবানো হয়েছে এয়ার ইন্ডিয়াকে। আর এভাবে প্রায় ইচ্ছাকৃতভাবে দেশের সবথেকে নিজস্ব ব্র্যান্ডের এয়ারলাইন্সকে কোমায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। ভাবা হয়েছিল বিরোধী দল এসে আবার সেটিকে বাঁচিয়ে তুলবে। কিন্তু নতুন সরকার কোনো দ্বিধা করেনি। তারা এসেই ঘোষণা করে দিয়েছে এয়ার ইন্ডিয়াকে বিক্রি করা হবে। কারা কিনবে? দৌড়ে ইন্ডিগো, টাটা গোষ্ঠী এবং স্পাইস জেট।
এয়ার ইন্ডিয়ার লোকসানের পাশাপাশি কাদের লাভ ক্রমেই বাড়তে শুরু করল? বেসরকারি বিমান সংস্থাগুলির। আর তাদের মধ্যে সবথেকে ইউনিক ঘটনা ঘটল একটি বিশেষ সংস্থার ক্ষেত্রে। সেই সংস্থার মালিক কলকাতার লা মার্টিনিয়ার স্কুলে আসতেন বিদেশি গাড়িতে চেপে। বিভিন্ন ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের প্রতিটি ক্লাসে থাকে একটি করে হাউস। তাদের নানারকম নাম হয়। ষাটের দশকে লা মার্টিনিয়ার স্কুলের এরকম একটি হাউস ছিল হেস্টিংস হাউস। সেই হাউসের ফ্ল্যাগের রং লাল। টকটকে লাল। ওই হাউসের এক সদস্য ওই লাল রঙটিকে প্রচণ্ড পছন্দ করে ফেলেছিলেন সেই স্কুল জীবন থেকেই। তাই তাঁর প্রতিষ্ঠিত প্রতিটি কোম্পানির সিগনেচার কালার হয় লাল। কলকাতার লা মার্টিনিয়ার স্কুল থেকে ১৯৭২ সালে পাশ করা ছাত্রদের মধ্যে সবথেকে প্রতিষ্ঠিত, বিখ্যাত, চর্চিত এবং ধনী সেই ছাত্রের নাম বিজয় মালিয়া। দ্য ম্যান অফ রেড…
৪ অক্টোবর ২০১২ সালে দিল্লি এয়ারপোর্টের কাছে একটি অ্যাপার্টমেন্টে বসে থাকা সুস্মিতা চক্রবর্তী সকাল থেকে কিছুই খাননি। তাঁর মন অস্থির। ঝড় চলছে। স্বামী মানস চক্রবর্তী সকাল থেকে বারংবার ফোন করছেন। তিনি ধরছেন না। তাঁর ভালো লাগছে না কিছুই। তারপর দুপুর দেড়টার সময় তিনি ধীরে সুস্থে চোখের জল মুছে বেডরুমে ঢুকে সিলিং ফ্যানে শাড়ি পেঁচিয়ে গলায় লাগালেন। এবং আত্মহত্যা করলেন। সুস্মিতা চক্রবর্তী ছিলেন প্রচণ্ড টেনশনে। তাঁর স্বামী মানস চক্রবর্তী অবসরপ্রাপ্ত এয়ার ফোর্স অফিসার। অবসরের পর চাকরি নিয়েছিলেন কিংফিশার এয়ারলাইনসে। স্টোর ম্যানেজার। ৬ মাস ধরে বেতন পাচ্ছেন না। সুস্মিতা চক্রবর্তী এই টেনশন আর নিতে পারলেন না। অবশ্য সেই একই সময় কিং ফিশার এয়ারলাইন্সের মালিক বিজয় মালিয়ার ছেলে সিদ্ধার্থ মালিয়াও টেনশনে খুব। কারণ এই প্রথম তিনি টিভি শোতে নামছেন। কয়েক সপ্তাহ পরই শুটিং। কেমন হবে কে জানে। অনুষ্ঠানের নাম ‘হান্ট ফর দ্য কিংফিশার ক্যালেন্ডার গার্লস সিজন ফোর’। আবার তাঁর পিতা বিজয় মালিয়াও বেশ টেনশনে। না না..নিজের কোম্পানির হাজার হাজার কর্মী বেতন পাচ্ছেন না সেই কারণে নয়। এয়ারলাইন্স ডুবছে সেই কারণেও নয়। দক্ষিণ কোরিয়ায় ফরমুলা ওয়ান গ্রাঁ পিঁ রেসিং কার প্রতিযোগিতায় মালিয়ার টিম অংশ নেবে। যেদিন বিজয় মালিয়ার সংস্থা কিং ফিশারের একজন অখ্যাত স্টোর ম্যানেজার মানস চক্রবর্তীর স্ত্রী সুস্মিতা চক্রবর্তী আত্মহত্যা করলেন স্বামীর ৬ মাস বেতন না পাওয়ার টেনশনে, তার ঠিক একদিন পরই বিজয় মালিয়া প্রাইভেট এয়ারক্র্যাফটে চেপে দক্ষিণ কোরিয়ায় গিয়েছিলেন ওই ফরমুলা ওয়ান টিম নিয়ে। কিন্তু এসব ঘটনা অনেক পরের। তার আগের একটি ঘাত প্রতিঘাতে ভরা সোপ অপেরা রয়েছে এসবের আড়ালে। যার ইংরাজি নাম হওয়া উচিত কর্পোরেটাইজশন অফ ইন্ডিয়ান পলিটিক্স। ভারতীয় রাজনীতির কর্পোরেটকরণ!
একে বলা যেতে পারে একটা যুগলবন্দি। ভারতের রাজনীতি আর কর্পোরেট মহলের। ২০০২ সালে বিজয় মালিয়া কৰ্ণাটক থেকে একজন নির্দল সদস্য হিসাবে রাজ্যসভায় এমপি হয়ে গেলেন। তাঁকে সকলেই সব দলই সমর্থন করেছিল। একজন লিকার ব্যারণ (ইউ বি গ্রুপ বিজয় মালিয়ার সবথেকে বড় মুনাফার শিল্প) বিজনেসম্যানকে কেন সব দল ভোট দিয়ে রাজ্যসভায় পাঠাল? জানা নেই। এটা নতুন কিছু নয়। বেশ কয়েক দশক ধরে চলছে এই প্রবণতা। ভারতীয় শিল্পপতিরা রাজ্যসভায় আসছেন বিভিন্ন দলের হয়ে। এমপি হলে কী কী সুবিধা পাওয়া যায়? বিভিন্ন দপ্তরের স্থায়ী কমিটি, সিলেক্ট কমিটি, কনসালটেটিভ কমিটির সদস্য হওয়া যায়। সরকারের প্রতিটি মন্ত্রকের প্রতিটি সিদ্ধান্ত সম্পর্কে প্রশ্ন তোলা যায় কিংবা আলোচনা করা যায় অথবা রিভিউ করার সুযোগ আছে। রয়েছে সংসদে প্রশ্ন তোলা, সরকারকে কোণঠাসা করার সুবিধা। এবং মতামত দেওয়ার সুবিধা। সরকারের প্রতিটি মন্ত্রকই যাবতীয় শিল্পের নীতি নির্ধারণের পিছনে প্রধান চালিকাশক্তি। বিজয় মালিয়া এমপি হিসাবে তাঁর প্রথম টার্মেই কোন সংসদীয় কমিটির সদস্য হয়েছিলেন? সিভিল এভিয়েশন, ডিফেন্স এবং ইন্ডাস্ট্রি। সিভিল এভিয়েশন অর্থাৎ অসামরিক বিমান পরিবহণ। সোজা কথায় দেশের বিমান পরিবহণে যুক্ত সরকারি ও বেসরকারি কোম্পানিগুলির কাজকর্মের রিভিউ করা, নীতি নির্ধারণের প্রক্রিয়ায় অংশ হলেন তিনি। যে কোনো সময় ওই মন্ত্রকগুলির সর্বোচ্চ আধিকারিকদের ডেকে পাঠানো যায়। জেরা করা যায়। সাফাই চাওয়া যায়। চাপ সৃষ্টিও করা যায়। এবং সিভিল এভিয়েশনের সংসদীয় কমিটির সদস্য হওয়ার ঠিক এক বছরের মধ্যে ২০০৩ সালে বিজয়া মালিয়া পুত্র সিদ্ধার্থ মালিয়াকে জন্মদিনে পছন্দসই একটি উপহার দিলেন। কিংফিশার এয়ারলাইন্স। অর্থাৎ তিনিই একটি বিমান সংস্থার মালিক। আবার তিনিই পার্লামেন্টের বিমান পরিবহণ সংক্রান্ত স্ট্যান্ডিং কমিটির সদস্য! এই প্রবণতা নতুন নয়। তিনিও প্রথম নয়। কল্পতরু দাস ওড়িশা থেকে নির্বাচিত এমপি। তাঁর পারিবারিক বাণিজ্য হল মাইনিং। আর তিনিই ছিলেন ২০১৫ সালে সংসদে পেশ হওয়া নতুন মাইনিং বিল ক্লিয়ার করার বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা পার্লামেন্টের সিলেক্ট কমিটির সদস্য। চন্দ্রপাল সিং যাদব কেমিক্যাল অ্যান্ড ফার্টিলাইজার সংক্রান্ত স্ট্যান্ডিং কমিটির সদস্য। আবার তিনিই একটি ফার্টিলাইজার কোম্পানির চেয়ারম্যান ছিলেন তখন। ডি আর মেঘে, পি বি কোরে, এম এ এম রামস্বামী সকলেই প্রাইভেট মেডিকেল কলেজের পরিচালক। প্রত্যেকেই এমপি। আর তাঁরাই ছিলেন স্বাস্থ্য মন্ত্রক সংক্রান্ত স্ট্যান্ডিং কমিটির সদস্য। এই তালিকা শেষ হবে না। সুতরাং বিজয় মালিয়া যে একদিকে কিং ফিশার এয়ারলাইন্সের মালিক এবং লাগাতার ব্যাংক থেকে লোন পেয়ে গেলেন, আবার তিনিই পার্লামেন্টের বিমান পরিবহণ সংক্রান্ত স্ট্যান্ডিং কমিটির সদস্য-এর মধ্যে কোনো বিস্ময় নেই। এটাই স্বাভাবিক হয়ে গেল। এখানেই শেষ নয়। বিজয় মালিয়া দ্বিতীয় বারের জন্য রাজ্যসভায় এমপি হওয়ার পর ২০১২ সালে তিনি হয়েছিলেন পার্লামেন্টের কেমিক্যাল অ্যান্ড ফার্টিলাইজার মন্ত্রকসংক্রান্ত স্ট্যান্ডিং কমিটির সদস্য। অথচ তিনিই ম্যাঙ্গালোর কেমিকেলস অ্যান্ড ফার্টিলাইজার নামক বিপুল লাভদায়ক একটি সংস্থার চেয়ারম্যান। যে সংস্থা দেশের মধ্যে সবথেকে বেশি সার উৎপাদন করে। মালিয়া গ্রুপের শেয়ারের পরিমাণ ৩০ শতাংশ।
একটা সময় পর্যন্ত বিজয় মালিয়ার সবথেকে বড় বাণিজ্যিক প্রতিপক্ষের নাম ছিল মনু ছাবরিয়া। কলকাতার বিজনেস ম্যাগনেট। মালিয়ার ইউনাইটেড ব্রুয়ারিজের পাশাপাশি ওই শ ওয়ালেশের তৈরি বিয়ারের চাহিদা আকাশছোঁয়া ছিল। মনু ছাবরিয়ার আচমকা মৃত্যু হল। এবং তারপরই মাত্র ১৩০০ কোটি টাকার একটি ডিলে শ ওয়ালেস কিনে নিলেন বিজয় মালিয়া। সেই যৌথ সংস্থাকে মালিয়া দেশের মধ্যে শীর্ষে নিয়ে গেলেন ব্রিটিশ বিয়ার কোম্পানি স্কটিশ অ্যান্ড নিউক্যাসলের সঙ্গে চুক্তির মাধ্যমে। কারণ ওই সংস্থা ৯৪০ কোটি টাকা দিয়ে মালিয়ার থেকে ৩৭ শতাংশ শেয়ার কিনে নিয়েছিল। এরপর মালিয়া চাইলেন আকাশ কিনতে। অর্থাৎ একটি নিজের এয়ারলাইন্স। কিং ফিশার। ব্যাংকের লোন চাই। প্রথম প্রস্তাব গেল আইডিবিআই কমিটির লোন স্যাংশন কমিটির কাছে। কিন্তু আইডিবিআই ব্যাংক রাজি নয়। কারণ এই কোম্পানির সঙ্গে ডিল করতে আর রাজি নয় তারা। কারণ ম্যাঙ্গালোর কেমিকেলস অ্যান্ড ফার্টিলাইজারস নিয়ে তিক্ত অভিজ্ঞতা আছে। সুতরাং লোন অনুমোদন হবে না।
কিন্তু কিছু বছর পর আচমকা দেখা গেল পরিস্থিতি বদলে গিয়েছে। কেন কে জানে সেই আইডিবিআই কিং ফিশারকে ৯০০ কোটি টাকা লোন দিতে রাজি হয়ে গেল। অথচ তখন থেকেই এই এয়ারলাইন্স সেক্টরে লোকসান ঢুকেছে। সেই সময় বিশ্বজুড়ে চলছে মন্দা। তার ঠিক আগেই মালিয়া ৫৫০ কোটি টাকা দিয়ে এয়ার ডেকান কিনে নিয়েছেন। অথচ লাভ হচ্ছে না। ২০০৮ সালের মার্চে দেখা গেল কিং ফিশারের ক্ষতির ঋণের পরিমাণ ৯৪০ কোটি টাকা। পরের বছর? ৫৬৬৫ কোটি টাকা ঋণ। বার্ষিক লোকসান ২০০৭ সালে ছিল ১৮৮ কোটি টাকা। সেটা পরবর্তী বছরে হয়ে গেল ১৬০৮ কোটি টাকা। সেই লোন যখন ৭ হাজার কোটি টাকা অতিক্রম করছে তখন সরকার এগিয়ে এসেছিল তাঁকে বাঁচাতে। স্টেট ব্যাংকের নেতৃত্বে ব্যাংকারদের একটি কমিটি একজোট হয়ে মালিয়াকে ১৩৫৫ কোটি টাকার ঋণকে ইক্যুইটিতে পরিণত করে দিল। সেটাও আবার ৬১ শতাংশ প্রিমিয়ামে। কিন্তু যাঁর জন্য এতকিছু করা হচ্ছে তিনি কী করছেন? তিনি তখনও ফরমুলা ওয়ান রেসিং টিম চালাচ্ছেন। আইপিএল চালাচ্ছেন। ফুটবল টিম চালাচ্ছেন। এবং কিং ফিশার ক্যালেন্ডার তৈরির জন্য ইওরোপের দ্বীপপুঞ্জে নিয়ে যাচ্ছেন মডেলদের। সাধারণ এয়ারহোস্টেসরা নয়, তাঁর এয়ারলাইন্সে সিকিউরিটি ফিচারস টেক অফের আগে যাত্রীদের দেখানোর জন্য ভিডিও রেকর্ডিংয়ে চুক্তি করা হয়েছিল আন্তর্জাতিক মডেল আর ফিল্মস্টার ইয়ানা গুপ্তার সঙ্গে। কিং ফিশারে সোজা কথায় ইয়ানা গুপ্তার মতো ভারচুয়াল এয়ারহোস্টেজ কাজ করতেন। সবথেকে বেশি লোন দিয়েছে এসবিআই। ১৬০০ কোটি টাকা। সবথেকে কম ৫০ কোটি টাকা। অ্যাক্সিস ব্যাংক। মোট ৯ হাজার কোটি টাকার বেশি। আইডিবিআই, পিএনবি, ব্যাংক অফ ইন্ডিয়া, ব্যাংক অফ বরোদা, সেন্ট্রাল ব্যাংক, ইউকো ব্যাংক, ইন্ডিয়ান ওভারসিজ ব্যাংক…..।
২০১০ সালে যখন বিজয় মালিয়া একপয়সাও আগের ঋণ পরিশোধ না করে আবার লোন চাইলেন তখন কমিটি অফ লেন্ডারসের মধ্যে তীব্র মতান্তর ছিল। একদলের বক্তব্য ছিল আর কেন ঋণ দেওয়া হবে? পাবলিকের টাকা। আয়করদাতার টাকা। এভাবে শিল্পপতিদের কেন উদারহস্তে বিলিয়ে দেওয়া হবে? কিন্তু কোনো এক জাদুবলে ওসব মতান্তর হাওয়ায় উড়ে যায়। দেখা যায় মালিয়া আবার লোন পাচ্ছেন। ২০১২ সালের মার্চ থেকে বিজয় মালিয়া সুকৌশলে প্ল্যান করছিলেন কীভাবে রেহাই পাওয়া যায়। সবটাই হচ্ছিল সরকারের বিরোধীদের চোখের সামনে। তিনি কিং ফিশারের ইন্টারন্যাশনাল ফ্লাইট কমিয়ে আনলেন ৷ ডোমেস্টিক ফ্লাইট কমানো শুরু হল প্রবলভাবে। কর্মীরা মাইনে পাচ্ছেন না। ২০১২ সালে বন্ধ হয়ে গেল।
২০১৫ সালে মুম্বই ইন্টারন্যাশনাল প্রাইভেট লিমিটেড তাদের হ্যাঙ্গারে থাকা মালিয়ার প্রাইভেট জেট (ভিটি ভি জে এম) বিক্রি করে দিল বকেয়া কিছু পাওয়ার আদায়ের আশায়। কত টাকায় বিক্রি হল একটি আস্ত প্রাইভেট এয়ারক্র্যাফট? মাত্র ২২ লক্ষ টাকায়। ২০১৬ সালের ২ মার্চ বিজয় মালিয়া ভারত ছেড়ে লন্ডনে পালালেন। কীসের জোরে? ডিপ্লোম্যাটিক পাসপোর্টের জোরে। সেটি কারা পায়? এমপি মন্ত্রীরা। সুতরাং ২০০২ সালে বিজয় মালিয়া সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন যে রাজ্যসভার এমপি হতে হবে। ১৪ বছর পর সেই সিদ্ধান্ত তাঁকে রক্ষা করল। তিনি পালালেন এমপি হিসাবে পাওয়া ডিপ্লোম্যাটিক পাসপোর্টের সাহায্যে! তার আগে ভারতীয় ব্যাংকে থাকা সিংহভাগ টাকা ও সম্পদ বিদেশের ব্যাংকে তাঁর ট্রান্সফার করা হয়ে গিয়েছে। এবং শিফট করার আগে লন্ডনের অভিজাত এলাকায় বাংলো কিনে রেখেছেন। সেই বাংলোর নাম ‘লেডি ওয়াক’! দাম ৪৫ কোটি টাকা! নিজের টাকায় নয়। ভারতীয় ব্যাংকের টাকা। অর্থাৎ? ব্যাংকে কষ্টার্জিত আমাদের জমানো টাকা!!
