দাউদ গিলানি হাসল। আশ্চর্য এই ইন্ডিয়ান অথরিটি। এত বড় একটা ভুল কেউ সন্দেহই করল না? তাও আবার একটা নয়। অন্তত তিনটে স্টেপে যেটা ক্রস এক্সামিনেশন করার কথা ছিল, সেসব না করে অনায়াসে স্বাগত জানানো হল দাউদ গিলানিকে। তার পাসপোর্টে বাবার নাম লেখা ছিল না। অথচ ভিসায় বাবার নাম লেখা সেলিম গিলানি। এখন দাউদ গিলানি যে নাম নিয়েছে, তার সঙ্গে এই গিলানি পদবির সম্পর্কই নেই। দাউদ গিলানির এখন নতুন নাম। পাসপোর্টে ভিসায় সেই নতুন নামই জ্বলজ্বল করছে। অথচ আমেরিকায় দাউদ গিলানির সোস্যাল সিকিউরিটি নম্বর যা, এই নতুন পাসপোর্টেও সেই একই সোস্যাল সিকিউরিটি নম্বর। সেটাও একবার চেক করা দরকার ছিল। ভারতীয় ভিসা মঞ্জুর করা দপ্তর সেটাও করল না। মারাত্মক ভুল! সুতরাং স্রেফ নাম পালটে চলে আসা দাউদ গিলানি খুব সহজে ভারতে আসার ভিসা পেয়ে গেল। তাহলে দাউদ গিলানির নতুন নাম কী? কেন তাকে কেউ সন্দেহ করল না? সেটা ক্রমশ প্রকাশ্য। এখনই দাউদ গিলানির নতুন নামটি বলা যাবে না। একটু পরই আমরা জানতে পারব। এয়ারপোর্ট ইমিগ্রেশন ক্রস করার পর মনে মনে সে আবার হেসে একটা বিশুদ্ধ হিন্দি গালাগালি দিয়ে করুণার চোখে তাকাল এয়ারপোর্টে কাউন্টারে কঠোর চোখে দাঁড়িয়ে থাকা ইন্ডিয়ান কাস্টমস অফিসারদের দিকে। করুণার কারণ কী? কারণ এরা ঝকঝকে পোশাকে স্মার্ট কথাবার্তা নিয়ে কড়া কড়া চোখ করে এখানে বসে নিজেদের রাজা উজির ভাবে। আর আমাদের মতো বাইরের লোক এদের বুদ্ধু বানিয়ে অবিরত যখন তখন ঢুকে যাচ্ছে। এটাই ভাবল দাউদ। দাউদ গিলানি ২০০৬ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর মুম্বইয়ের ছত্রপতি শিবাজি ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টে পদার্পণ করল। বাইরে দাঁড়িয়ে আছে বসির নামে এক যুবক। অ্যারাইভাল লাউঞ্জে বেরোতেই বসির হাত তুলল। একবারেই চিনে ফেলেছে। একটা মারুতি এস্টিম এনেছে বসির। সেটায় লাগেজ রেখে দাউদ গিলানি উঠে বসল ড্রাইভিং সিটের পাশে। সেটাই তার পছন্দ। নতুন শহরকে ভালোভাবে চেনা দরকার। এই শহরকে তার আগামী বহুদিন ধরে একেবারে হাতের তালুর মতো চিনতে হবে। এয়ারপোর্ট থেকে বেশিক্ষণ লাগল না। জায়গাটা নাকি সাউথ মুম্বই। চার্চগেট। মারুতি এস্টিম এসে দাঁড়াল হোটেল আউট্রামের সামনে। এটাকে বলা যায় সেমি লাক্সারিয়াস একটা বাজেট হোটেল। প্রধানত পর্যটক আর বিদেশিরা এসে থাকে। হোটেলের মালিক কাম ম্যানেজারের নাম মিস্টার কৃপালনী। মিস্টার আর মিসেস কৃপালনী খুব ভালো মানুষ। বিশেষ করে বিদেশি পর্যটকদের কাছে তাঁরা প্রায় লোকাল গার্জেন। প্রথম দর্শনেই ভালো লেগে গেল এই মাঝবয়সি দম্পতিকে। দাউদ গিলানি বুঝল ইন্ডিয়া জায়গাটা খুব একটা খারাপ নয়। দাউদকে বিশেষভাবে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে কোনো ইলেকট্রনিকস গ্যাজেটস সে ব্যবহার করতে পারবে না। কোনোভাবেই তাকে যেন ইন্ডিয়ান সিকিউরিটি এজেন্সি মনিটর কিংবা ট্র্যাক করতে পারে। বিশেষ করে ইন্টারসেপশন। সুতরাং প্রথমেই যেটা দরকার তা হল একটা ইন্টারনেট কাফে। চার্চগেটের ঠিক উলটোদিকে অনেক কাফেই আছে। তবে দাউদ গিলানির পছন্দ হল একটি বিশেষ কাফে। তার নাম রিলায়েন্স সাইবার কাফে। হোটেলের কাছেই। যখন তখন যাতায়াত করা যাবে। একটা ইমেল করে পৌঁছসংবাদ পাঠাতে হবে। যেখানে পাঠানো হবে সেই ইমেল আইডি হল [email protected]। এই ইমেল কাদের? বলা যায় জয়েন্ট। দুজন মানুষ এই মেল আইডি হ্যান্ডল করেন। একজনের নাম সাজিদ মীর। আর অন্যজন মহম্মদ ইকবাল। এরপর হেঁটে হেঁটে দাউদ গিলানি একটু ঘুরতে চাইল। কিন্তু মেঘলা। আর গুমোট। সমুদ্রের দিক থেকে একটা বাতাস আসছে বটে। তবে সেটা সম্ভবত গুমোটের থেকে একটু দুর্বল। কারণ ঘাম হচ্ছে। দাউদের অভ্যাস নেই এত গুমোট আর ঘামের। সে বহুদিন ধরেই আমেরিকায় থেকে অভ্যস্ত। শিকাগোয়। কখন যেন সমুদ্রের প্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছে দাউদ। এটাই তাহলে গেটওয়ে অফ ইন্ডিয়া! চমৎকার তো! মেঘলা হাওয়ায় জলের বিন্দু মিশে আছে। মাঝেমধ্যেই সেই হাওয়া এসে যেন শরীরকে আর্দ্র করছে সামান্য। অদূরেই বিল্ডিং। দারুণ সুন্দর আর অভিজাত দেখতে। দাউদ মুগ্ধভাবে দেখছে। আজ হবে না। আর কয়েকদিন পর আসতে হবে এই বিল্ডিং দুটোতে। এত দূর থেকে আসা। আর এদুটোর মধ্যে ঢোকা হবে না তাই হয় নাকি? ঠিক চারদিন পর আবার সেখানে এসে প্রথমে বড় আইকনিক বিল্ডিংটায় এসে ঢুকল দাউদ গিলানি। এককাপ কফি আর একটা গ্রিলড হানি স্যান্ডউইচ খেতে। এটা একটা হোটেল। ভারতের সবথেকে সুন্দর হোটেল। তাজমহল। কফিটা খেতে খেতে ক্রাউডের দিকে ভালো করে নজর করল দাউদ। প্রচুর বিদেশি। চামড়ার রং দেখে মনে হচ্ছে ইন্ডিয়ান গেস্টও অনেক। সামনে খোলা ব্যালকনি। সমুদ্র দেখা যাচ্ছে। এরকম একটা হোটেলের কফিশপ যে কোনো শহরের কাছে অলংকারস্বরূপ। পরদিন দাউদ গেল পাশের হোটেলটায়। সেটাও এরকমই। তবে আর্কিটেকচার আলাদা। অন্যরকম একটা লুক। হোটেল ট্রাইডান্ট। দাউদ গিলানির এখনও কোনো বন্ধু হয়নি। মেয়েবন্ধুও হল না। গার্লফ্রেন্ড ছাড়া বেশিদিন থাকা সম্ভব নয় গিলানির পক্ষে। কিন্তু অচেনা শহরে আচমকা গার্লফ্রেন্ড পাওয়া যায় কীভাবে? তাই একটু ডিপ্রেশন আছে। এই কয়েকদিনের মধ্যে বন্ধু তৈরি হওয়াও সম্ভব নয়। বিশেষ করে এখনও তো সে একজন পর্যটক। একাই এসেছে। কিন্তু এভাবে পর্যটক হয়ে থাকা সম্ভব নয়। একটা কিছু কাজ করতে হবে। কতদিন আর সঙ্গে নিয়ে আসা টাকায় চালানো যায়। তবে তার আগে একবার আমেরিকায় ফিরতে হবে। আসলে প্রাথমিক কাজটি ছিল শহরটাকে চেনা। চেনা বলতে নিছক কয়েকটি রাস্তা চিনলাম, লোকালিটি জেনে গেলাম, কোন ট্যাক্সির ভাড়া কত, কটার সময় কোন ট্রেন যায় এসব নয়। শহরটির চরিত্র জানতে হবে। মানুষের আচরণ বুঝতে হবে। আর কোন এলাকায় ঠিক কোন ধরনের লোকজন আসে সেটার একটা সম্পূর্ণ ধারণা করে ফেলতে হবে। সেইমতো বসকে খবর দিতে হবে। দাউদ গিলানির দুজন বস। সাজিদ মীর আর মহম্মদ ইকবাল। আর একজন বন্ধু।
তাওহর রানা। প্রথম পর্বে তিন মাস কেটে গেল। ঠিক তিনমাস পর ১৪ ডিসেম্বর ২০০৬ সালে দুবাই হয়ে আমেরিকা ফিরে গেল দাউদ গিলানি। তবে বেশিদিনের জন্য নয়। মাত্র দুমাসের মধ্যে আবার ভারতে ফিরে এল সে। এটা হল সেকেন্ড ট্রিপ টু ইন্ডিয়া। আবার সেই একই হোটেল। কৃপালনী দম্পতি একটু বিস্মিত। একই লোক তিনমাস হোটেলে থাকছে এরকম তো হয় না। নেহাত ট্যুরিস্ট? হাবভাব দেখে ট্যুরিস্ট মনে হয় না। একটাই জিনিস ছাড়া। ক্যামেরা। লোকটা ক্যামেরা ছাড়া বাইরে বেরোয় না। সত্যিই দাউদ গিলানি শুধু স্টিল নয়, ভিডিও ক্যামেরাও খুব ভালোবাসে। যখনই সে মুম্বইয়ের কিছু স্পটে বেড়াতে যায়, সময় কাটায় তখনই স্টিল ছবি তোলে, ভিডিও করে জায়গাটার। এটা তার শখ। দাউদ গিলানি শিকাগো ফিরে গিয়েছিল ভিসা সমাপ্ত হওয়া ছাড়া আর একটা জরুরি আলোচনার জন্য। মুম্বইয়ে পাকাপাকি বেশ কিছুদিন থাকার জন্য কিছু একটা বিজনেস করা দরকার। কী ধরনের বিজনেস করা যেতে পারে? তাওহর রানার পরামর্শ চাই। রানা দাউদের সেই ছেলেবেলার বন্ধু। একসঙ্গেই স্কুলে পড়াশোনা। সেই থেকে বন্ধুত্ব রয়েই গিয়েছে। শিকাগোর ডেভন অ্যাভিনিউতে রানা তার এক পরিচিত বন্ধু রেমন্ড স্যান্ডার্সের সঙ্গে জয়েন্ট ভেঞ্চারে একটা বিজনেস শুরু করেছিল প্রায় অনেকদিন আগেই। ছোট কোম্পানি। নাম ওয়ার্ল্ড ইমিগ্রেশন সার্ভিস। এই সংস্থার কাজ হল অন্য দেশ থেকে যারা আমেরিকায় আসতে চায় এবং কাজের সন্ধান করে থেকে যেতে ইচ্ছুক এরকম মানুষদের বিভিন্নভাবে আসার ব্যবস্থা করে দেওয়া। পেপার, ডকুমেন্ট তৈরি, কীভাবে ভিসার আবেদন করতে হয়, কোন কোন কাজের জন্য ওয়ার্ক পারমিট কেমন হয় এসব বিষয়ে এক ধরনের কনসাল্টেশন। এদের সিংহভাগ ক্লায়েন্ট হল ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ। এই রানা নিজে আমেরিকার নাগরিক নয়। সে আসলে কানাডার বাসিন্দা। তবে জন্মসূত্রে অন্য দেশের। সেই দেশের নাম পাকিস্তান। রানার ওয়ার্ল্ড ইমিগ্রেশন সার্ভিস সংস্থাই দাউদ গিলানির সমস্ত ভিসার কাগজপত্র ঠিক করে দিয়েছিল। এ ব্যাপারে ওরা এক্সপার্ট। কোনোরকম ভুলভ্রান্তি থাকলেই ভিসা অ্যাপ্লিকেশন ক্যান্সেল হয়ে যায় সবাই জানে। আর আজকাল তো সেই নাইন ইলেভেনের পর আরও কড়াকড়ি। কিন্তু ওই যে শুরুতেই বলেছিলাম দাউদ গিলানি যখন নিজের নতুন নামের পাসপোর্ট তৈরি করে প্রথমবার ভারতে আসতে চেয়ে ভিসার আবেদন করেছিল, তখন তার ভিসা আর পাসপোর্টে বেশ কয়েকটি অসামঞ্জস্য ছিল। দাউদ গিলানি আসলে ২০০৫ সাল পর্যন্ত অনেকবার বছরের পর বছর ধরে আমেরিকা থেকে লাহোর, করাচি থেকে আবার আমেরিকা করেছে। বারংবার সে পাকিস্তান গিয়েছে একই বছরে। দাউদ গিলানি নামের একটি লোক অসংখ্যবার পাকিস্তান গিয়েছে এটা পাসপোর্টে দেখেই ভারতীয় ভিসা দপ্তরের ভুরু কুঁচকে যেতেই পারে। তাই ভারতকে সন্দেহমুক্ত করার জন্য দাউদের নতুন পরিচয় হওয়া দরকার। তাই ২০০৫ সালের এক সেপ্টেম্বর মাসে দাউদ নিজের এতদিনের চেনা আইনজীবীর অফিসে গেল। আইনজীবীর নাম ডোনাল্ড ট্রাম্ফ।
হাই ডোনাল্ড, আমি নাম চেঞ্জ করতে চাই।
মাই গড! কেন?
আমি এই দাউদ গিলানি নাম নিয়ে টায়ার্ড। আর পারছি না এটাকে ক্যারি করতে।
সব জায়গায় সন্দেহ। আর এই নিয়ে তিনবার জেলে গেলাম। এখন আমাদের কেউ আর বিশ্বাস করে না ইউ নো ভেরি ওয়েল।
দ্যাটস আ পয়েন্ট গিলানি। সো হোয়াট উড বি দ্য নিউ ওয়ান?
আমি চাই এমন একটা নাম নিতে যাতে আমাকে আর কেউ প্যাকি (পাকিস্তানী) মুসলিম বলে মনে না করে।
তাহলে বল কী নামে পেপার করব?
দাউদ গিলানি একটু হেসে মাথা নীচু করে সামনে ঝুঁকে, কেটে কেটে উচ্চারণ করল তিনটি শব্দ। তার নতুন নাম।
ডেভিড কোলম্যান হেডলি!
সৈয়দ সেলিম গিলানি পাকিস্তানের এক উচ্চপদস্থ ডিপ্লোম্যাট। বহু জায়গায় পোস্টিং হয়েছে এর আগে। তবে তাঁর পছন্দের পোস্টিং হল অবশেষে ওয়াশিংটনে। ভদ্রলোক অত্যন্ত মরালিস্ট আর ডিসিপ্লিনড। এতটা উচ্চপদে চাকরি করেও কখনও কোনোরকম অন্যায় সুযোগ সুবিধা নেননি কারও কাছে। সরকারের উপরতলার কর্তাদের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ এবং বন্ধুত্ব যথেষ্ট বেশি। অথচ তাঁর আচার আচরণ দেখে তা বোঝা যায় না। পাকিস্তান এমব্যাসিতে এক আমেরিকান মেয়ে কাজ করেন। মেয়েটি মেরিল্যান্ডের। নাম সিরিল হেডলি। সেলিম তাঁর বস। আর বসের প্রেমে পড়া আবহমানের এক প্রবণতা। অতএব সিরিল হেডলি আর সেলিম গিলানি পরস্পরকে ভালোবাসলেন। বিয়েও হল। সুখী সংসার। তাদের সন্তান দাউদ গিলানি। আমেরিকান মা। পাকিস্তানি বাবা। দাউদ জন্মসূত্রে পাকিস্তানি পিতার সন্তান হলেও তাকে দেখে কেউ বলবেই না সেকথা। কারণ তাকে দেখতে অবিকল আমেরিকান। অর্থাৎ মায়ের মতো হোয়াইট। তাই দেখে সর্বদাই সকলে ধরেই নেয় বিদেশি। ছোট থেকেই। ততদিনে ওয়াশিংটন ছেড়ে এই পরিবার চলে এসেছে পাকিস্তান। সেলিম গিলানি পাকিস্তানে হাই স্ট্যাটাসের মানুষ। তাই ছেলেকে তিনি ভর্তি করলেন এলিট স্কুলে। হাসান আবদাল ক্যাডেট কলেজ। রাওয়ালপিন্ডি থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে এক মিলিটারি স্কুল। সেই স্কুলের ক্লাস সেভেনে এক প্রিয় বন্ধুর সঙ্গে প্রথম দেখা। তার নাম তাওহার রানা। এরকম হাই স্ট্যাটাসের স্কুলের সৌন্দর্য স্বাভাবিকভাবেই সুন্দর। নিজেদের স্কুলকে প্রতিটি ছাত্র ভালোবাসে। ক্লাস নাইন। ১৯৭২ ইন্ডিয়া আর পাকিস্তানের মধ্যে যুদ্ধ চলছে। মাঝেমধ্যেই স্কুল ছুটি হয়ে যায়। কেন এই যুদ্ধ? পাকিস্তানের থেকে ভারত চাইছে ইস্টার্ন পাকিস্তানকে ছিনিয়ে নিতে। অর্থাৎ পাকিস্তানকে ভেঙে দিতে ভারত সর্বশক্তি নিয়োগ করেছে। আর যুদ্ধের যা হালচাল, সত্যিই হয়তো তাই হবে। ঠিক এরকমই একদিন শোনা গেল তাদের স্কুলে ইন্ডিয়ান ফাইটার জেট বিমান বোমা ফেলেছে। দুটো। স্কুলে বোমা? দুজনের মৃত্যু হয়েছে। স্কুলের একাংশ উড়ে গেল। আর তার ঠিক পরদিন জরুরি এক মিটিং ডাকা হল সেখানে। এতদিন পর্যন্ত এই স্কুলে কখনওই অ্যান্টি ইন্ডিয়া কোনো ভাষণ দেওয়া হয়নি। নিছক উচ্চমানের পড়াশোনাই হত। অন্য ছোটখাটো স্কুলের মতো কখনওই এখানে ভারতকে শত্রু বানিয়ে অযথা ঘৃণা ছড়ানো হয়নি। দুই ছাত্র দাউদ গিলানি আর তাওহর রানা সেদিন স্কুলের ওই জরুরি মিটিংয়ে গিয়ে জীবনে প্রথমবার শুনতে পেল কীভাবে ভারত পাকিস্তানে হামলা চালাচ্ছে। আর পাকিস্তানকে টুকরো টুকরো করতে প্ল্যান নিয়েছে। সেই টিচার অবশ্যই এটা বললেন না যে পাকিস্তান কীভাবে পূর্ব পাকিস্তানে চরম অমানবিক অত্যাচার চালিয়েছে। আর ভারত নয়, ওই পূর্ব পাকিস্তানের মানুষই চায় পাকিস্তান থেকে বেরিয়ে যেতে। অর্ধেক সত্য শুনল ছাত্ররা। আর তাদের রক্ত গরম হয়ে উঠল ভারতের বিরুদ্ধে। সেই প্রথম দাউদ গিলানির মনে জন্ম নিল একটি বিশেষ বোধ। ইন্ডিয়া আমাদের শত্রু। ইন্ডিয়াকে যেভাবে হোক ধ্বংস করতে হবে একদিন।
দাউদ মোটেই ভালো ছাত্র নয়। মিডিওকার। তবে পড়াশোনা নয়। সবথেকে বড় ধাক্কা এল তার বাবা মায়ের দিক থেকে। কারণ সুখ টিকল না। সিরিল হেডলি ডিভোর্স ফাইল করলেন। হয়েও গেল। এই দম্পতির সন্তান দাউদ গিলানি রয়ে গেল বাবার কাছে। এবং বাবা আবার বিয়ে করলেন। এবার তাঁর স্ত্রী আর বিদেশিনী নয়। এক পাকিস্তানি মহিলা। কিন্তু এই নতুন মায়ের সঙ্গে মোটেই সম্পর্ক ভালো নয় দাউদের। ক্রমেই ওই দম্পতির আরও সন্তানের জন্ম হল। আর দাউদকে সম্পূর্ণ অবহেলা করতে শুরু করলেন বাবা সেলিম গিলানি। বাড়িতে সে অবহেলিত। আর পাড়া প্রতিবেশী তাকে সম্বোধন করে গোরা বলে। কারণ তার গায়ের রং। তাকে পাকিস্তানি নয়, আমেরিকানই মনে হয়। এক চরম আইডেন্টিটি ক্রাইসিসের মধ্যে দাউদকে আচমকা নিজের কাছে ডেকে নিলেন মা সিরিল হেডলি। এবং সেই মুহূর্ত থেকে দাউদের জীবন সম্পূর্ণ অন্যখাতে ঘুরে গেল। শিকাগোর সেকেন্ড স্ট্রিটে একটি পাব চালান মহিলা। জায়গাটার নাম চেস্টনাট। মিক্সড কালচারের কাস্টমার আসে। সেখানে ছেলেকে বসতে বলেন মা। দাউদের ওসব ভালো লাগে না। বরং তার নতুন একঝাঁক বন্ধু হয়ে গেল যাদের সঙ্গে তার নতুন জীবন। সেই জীবনের নাম ড্রাগ পেডলিং। সিরিল শেষ চেষ্টা করেছিলেন আর্মি কলেজে চান্স পাইয়ে দিতে। দাউদ গিলানি ততদিনে নিজের রাস্তা করে নিয়েছিল। ১৯৮৫ সালেই সে জীবনের প্রথম বিবাহটি করে ফেলল। একটি কানাডিয়ান মেয়েকে। পেনসিলভানিয়া ইউনিভার্সিটি থেকে গ্র্যাজুয়েশন করা সেই মেয়েটি বেশিদিন থাকতে পারল না। কারণ ১৯৮৮ সালে শিকাগোর হোটেলে ড্রাগ পাচারের ঠিক মুহূর্তে ড্রাগ এনফোর্সমেন্ট এজেন্সির গোয়েন্দারা হাতেনাতে ধরে ফেলল দাউদকে। আমেরিকায় ড্রাগ পেডলিং। সাংঘাতিক সাজা হবে। তবে ডিইএ গোয়েন্দারা একটা শর্ত দিল। যদি দাউদ ওই ড্রাগ বিজনেসের মাথাদের চিনিয়ে দেয় কিংবা ধরিয়ে দেয় তাহলে তার সাজা কমিয়ে দেওয়া হবে। দাউদ রাজি।
ঠিক দুদিন পর শিকাগোর নিউ স্ট্রিট অ্যাপার্টমেন্টে দাউদ বসে আছে। সে ডেকেছে তার পরিচিত ড্রাগ মাফিয়া দুজনকে। একটা বড় কনসাইনমেন্ট পেয়েছে সে। সেটাই হ্যান্ডওভার করা হবে। রিচার্ড রাউন্ডট্রি আর ডেরিল ট্যাংক। শিকাগোর সবথেকে গোপন কুখ্যাত ড্রাগ মাফিয়া টিম। তারা সঙ্গে করে এনেছিল একটা লাল সুটকেস। কফি এল লিভিং রুমে। দাউদ বলল, ১৫ কেজি আপাতত আছে। বাকি ১৫ কেজি আগামীকাল ডেলিভারি। উঠে ক্যাবিনেট থেকে বের করে আনল ব্যাগ। একটা ফয়েল পেপারে মোড়া প্যাকেট। রিচার্ড সেটি হাতে নিয়ে বলল এটা সব আমাদের? দাউদ হেসে বলল ইয়েস বস! তৎক্ষণাৎ ডলারের প্যাকেট বের করে দাউদের হাতে দিল রিচার্ড হাসতে হাসতে।
তাহলে নেক্সট ডিল কবে? দাউদ বলল, ভেরি সুন। এবার পরস্পরকে হ্যান্ডশেক করে উঠে পড়ল তারা। আর পাশের ঘর থেকে আচমকা বেরিয়ে এল চারজন শক্তসমর্থ লোক। ড্রাগ এনফোর্সমেন্ট এজেন্সির গোয়েন্দা। এই ঘরে তারা আগেই গোপন ক্যামেরা আর অডিও সিস্টেম লাগিয়ে রেখেছিল। কারণ প্রমাণ চাই। দাউদ নিখুঁত অপারেশনে শিকাগোর দুই কুখ্যাত মাফিয়াকে ধরিয়ে দেওয়ায় তার ৮ বছরের জেল অর্ধেক করে দেওয়া হল। চার বছর জেলে। বিচারক বলেছিলেন, মিস্টার গিলানি ইউ আর আ ইয়ং গাই। আপনি এরপর নিজের মতো করে আবার নর্মাল লাইফ কাটান। দাউদ গিলানি হেসেছিল। কারণ সে শোধরায়নি। চার বছর জেলে কাটানোর পর আবার সে ফিরে গিয়েছিল সেই পুরোনো বিজনেসে। তবে অন্য শহরে। শিকাগো আর নয়। এবার নিউ ইয়র্ক। ১৯৯৭ সালে কিন্তু সে আবার লাহোর থেকে নিউইয়র্ক আসার পথে ড্রাগ নিয়েই ধরা পড়ে গেল। আশ্চর্য বিষয় হল আবার সেই একই কাহিনি। এবারও ডিইএ গোয়েন্দাদের সে বলল, আমি আপনাদের আসল ড্রাগ বিজনেসম্যানদের ধরিয়ে দিতে হেল্প করছি। আমার সাজা কমাতে হবে। রাজি গোয়েন্দারা। এবং এবার যে সে নয় আমেরিকার সবথেকে ওয়ান্টেড ড্রাগ মাফিয়া জেমস লুইসকে ধরিয়ে দিল দাউদ। জেমসের ১০ বছর জেল। অথচ দাউদের মাত্র ১৫ মাসের জেল হয়েছিল। একই জেলে থাকাকালীন জেমস বলেছিল ১৫ মাস পর তুমি জেল থেকে রিলিজ হবে। তারপর এই পৃথিবী থেকেই রিলিজ করে দেওয় হবে। আমার সঙ্গে বেইমানি! কেউ বাঁচেনি দাউদ! তুমিও না।
দাউদ মরতে চায় না। অতএব ১৫ মাস পর জেল থেকে বেরিয়ে সবার আগে লাহোরের বিমান ধরল। ১০ দিন পর লাহোরের কাদিশিয়া জামা মসজিদে নমাজ পড়তে ঢুকেছিল দাউদ গিলানি। কী ব্যাপার? এরকম কঠোর নিরাপত্তা কেন? গোটা মসজিদ ঘিরে রেখেছে কার্বাইন আর এ কে ফর্টি সেভেন হাতে একঝাঁক সুরক্ষাবাহিনী। দাউদ ভাবল নিশ্চয়ই টেররিস্ট থ্রেট আছে। তাই এই নিরাপত্তা। কিন্তু তারপরই তার চোখ পড়ল মসজিদের বাইরের রাস্তায় একটি বিরাট বড় বিলবোর্ডে। সেখানে লেখা আছে অদ্ভুত একটা বার্তা। এরকম প্রকাশ্য বার্তা কোনো দেশে থাকতে পারে তা কল্পনাই করেনি দাউদ গিলানি। বিলবোর্ডে লেখা ‘জিহাদের জন্য মুক্তহস্তে দান করুন। জিহাদে অংশ হওয়ার জন্য এখানে যোগাযোগ করুন।’ সঙ্গে একটা মাত্র ফোন নম্বর। প্রকাশ্যে এরকম জিহাদের ঘোষণা? আর জয়েন করতে বলা হচ্ছে টেররিজমে? আশ্চর্য দেশ তো! দাউদ গিলানি নিজের লক্ষ্য স্থির করে ফেলল। ওই পোস্টারে লেখা নম্বরে ফোন করে সে বলল, আমি টাকা ডোনেট করতে চাই! ওপ্রান্তে যে ছিল সে বলল আপনি ফোন রাখুন। আমি কল ব্যাক করছি। এক মিনিটের মধ্যে কলব্যাক।
হাঁ জনাব বলুন।
আমি জিহাদের ডোনেশন করতে চাই। কীভাবে করব?
আপনি কোথায় আছেন বলুন? আমরা লোক পাঠাচ্ছি।
লাহোরের ফ্ল্যাটের ঠিকানা বলল দাউদ। দেড় ঘণ্টার মধ্যে আবিদ আলি সেখানে ডোরবেল বাজাল। ৫০ হাজার টাকা দিল দাউদ। আর বলল আজ খুব ভালো দিন। আপনি বিকেলে আমাদের ওখানে আসতে পারেন। সমাবেশ আছে। আমাদের বড়া সাহেব বলবেন। আসবেন জনাব! দাউদ গিলানি জানাল অবশ্যই যাবে। সে গেল। এবং সেই প্রথম সেই বড়া সাহিবকে দেখে দাউদ মুগ্ধ হয়ে গেল। লোকটা দুর্দান্ত কথা বলতে পারে। কাশ্মীরে ইন্ডিয়া যে এভাবে অত্যাচার চালাচ্ছে তা লোকটা এমনভাবে বলছিল যে মাথায় রক্ত চড়ে যায়। আমাকে কাশ্মীর যেতে হবে। ভাবল দাউদ গিলানি। এগিয়ে গেল সেই লোকটির দিকে। সাদা লং ঝুলের কুর্তা। লোকটার নাম হাফিজ সঈদ। লস্কর ই তৈবার কমান্ডার ইন চিফ! ২০০১। দাউদ গিলানির জীবনের সেকেন্ড ইনিংস শুরু হল ওই লোকটার হাত ধরে।
প্রায় পাঁচ বছরে দাউদ গিলানি লস্কর ই তৈবার বিশ্বাসযোগ্য আন্ডারকভার এজেন্ট। তাকে ততদিনে পাকিস্তান অধিকৃত কাশ্মীরের মুজফফরাবাদে ঘুরিয়ে আনা হয়েছে। এবং একের পর এক ক্যাম্পে বক্তৃতাও দিতে হয়েছে। তার বক্তৃতা কেন গুরুত্বপূর্ণ? কারণ তাকে দেখতে বিদেশির মতো। আর তার পরিচয়ও দেওয়া হয়েছে আমেরিকা থেকে আসা আমাদের এজেন্ট! অতএব বাচ্চা বাচ্চা টেররিস্টরা মুগ্ধ। কিন্তু ওসব বক্তৃতা দিয়ে কোনো মজা নেই। দাউদ চায় অ্যাকশন। সে চাইছে ইন্ডিয়ায় ঢুকে ইন্ডিয়াকে কীভাবে অ্যাটাক করা যায় আর সেই অপারেশনের সে হবে অন্যতম কমান্ডার! সে একদিন হাফিজ সঈদকে বলল আমি কাশ্মীর যেতে চাই। সঈদ হেসে বলল, তুমি এখন লাখভির আন্ডারে। যা বলার ওকে বল। ওর সাথে কথা বলে ঠিক করবে। ও যা বলবে তাই হবে। লাখভি মানে হল জাকিউর রহমান লাখভি। লস্করের সেকেন্ড ইন কমান্ড। তাকে একই কথা বলল দাউদ গিলানি। কাশ্মীর যাব। লাখভি একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে বলল, কাশ্মীরে আমরা শুধু ইয়ং ছেলেদের পাঠাই। ওখানে অপারেশন অনেক কঠিন। আর ফিদায়ে (আত্মঘাতী) ফোর্স। তোমার বয়স অনেক বেশি। তোমাকে কাশ্মীরে পাঠানো সম্ভব নয়। তোমার জন্য অন্য কাজ আছে। কী কাজ? মুম্বই যেতে পারবে? ওখানে থাকতে হবে। গোটা শহরের সবথেকে ফেমাস যে জায়গাগুলোতে সবথেকে বেশি ভিড় থাকবে আর প্রচুর ফরেনার থাকবে সেই জায়গাগুলোর গোটা ছবি, ভিডিও, রিপোর্ট সব চাই আমাদের। বিশেষ করে ইজরায়েল আর আমেরিকান থাকবে এরকম জায়গা। মনে রেখো। ইহুদি আর আমেরিকান ক্রাউড চাই। ইন্ডিয়ান তো আছেই। এক আধদিন নয়। তোমাকে থাকতে হবে বহু দিন। মাসের পর মাস। ওখানে তোমাকে বন্ধু তৈরি করতে হবে। তুমি আস্তে আস্তে হয়ে যাও মুম্বইয়ের লোক। যত টাকা লাগবে আমরা দিচ্ছি। ওসব নিয়ে ভেবো না। যখন জানবে তোমার ওই শহর সম্পর্কে আর কিছুই জানার নেই তখন আমাদের জানাবে। তবে প্রতিদিন তোমাকে জানাতে হবে সারাদিন কী কী করলে। পারবে? তার আগে তুমি ৬ মাসের একটা ট্রেনিং নাও। তোমার ট্রেনার হবেন দুজন। সাজিদ মীর। আমাদের অপারেশন কমান্ডার। আর মেজর ইকবাল। এ লোকটি আইএসআইয়ের। তবে নিখুঁত অপারেশনের প্রশিক্ষণ একজনই নেবে। তার নাম ব্রিগেডিয়ার রিয়াজ। আইএসআই গুপ্তচর ফোর্সের ব্রিগেডিয়ার র্যাংক। দাউদ চমকে গেল! লস্কর তার মানে নিছক কোনো টেররিস্ট গোষ্ঠী নয়! পাকিস্তান আর্মি, পাকিস্তানের গুপ্তচর বাহিনী সকলে মিলেই এই গোটা সন্ত্রাস সাম্রাজ্যটি চালাহে? প্রশিক্ষণ সমাপ্ত করে দাউদ গিলানি জাকিউর লাখভির কাছে জানতে চাইল এবার কী? জাকিউর বলল, এবার তুমি আমেরিকা হয়ে সেখানকার সিটিজেন হিসাবে মুম্বইয়ে যাবে। একবার ইন্ডিয়ায় নামার পর পাকিস্তানের কোনো ফোন নম্বরে একটাও কল করবে না। একমাত্র ইমেল করবে। যা কমিউনিকেশন সব আমেরিকার নম্বরে। আমেরিকায়? আমি তো কাউকেই চিনি না ওখানে তোমাদের গ্রুপের? জাকিউর রহমান লাখভি হাসল। তুমি শিকাগো নিউইয়র্কে ড্রাগ ব্যবসা করলেও এখনও চোখ-কান খোলা রাখতে শেখোনি দাউদ। শিকাগোয় তোমার সবথেকে প্রিয় বন্ধু সেই ছেলেবেলার বন্ধু রানা আমাদের লোক! তার কাছে তোমার সব ডিটেল না নিয়ে কি আমরা তোমাকে গ্রুপে জায়গা দিলাম? যে কেউ এসে ডোনেশন দিতে চাইল আর তাকে আমরা নিয়ে নেব এটা হয়? তুমি জানো এখনও আমরা জানি না আমাদের গ্রুপে কিংবা জৈশের মধ্যে কোনো ইন্ডিয়ান স্পাই আন্ডারকভার এজেন্ট আছে কিনা? হয়তো আছে। তাই আমরা কাউকে বিশ্বাস করি না। দাউদ গিলানি অবিশ্বাস্য চোখে তাকিয়ে রইল! রানা লস্কর এজেন্ট? জাকিউর তার কাঁধে হাত রেখে বলল, মুম্বইয়ে যা যা করতে বললাম শুধু মনে রেখো। কেন, কী জন্য, কবে, কোথায় এসব প্রশ্ন করবে না। সঠিক সময়ে সময়ে ইনফরমেশন তোমাকে দেওয়া হবে। সবার আগে শিকাগো যাও। নাম পালটাও। তুমি এবার থেকে আমেরিকান! মুম্বইয়ে একটাও হিন্দি আর উর্দু বলবে না। ইয়াদ রাখনা দাউদ, ইসবার ইন্ডিয়া কো ইতনা বড়া ঝটকা দেনা হ্যায় কে উও মুলক হিল যায়ে গা! কভি সোচভি নেহি সকতা অ্যায়সা কুছ হোনেবালা হ্যায়। খালি ইন্ডিয়া নেহি, পুরি দুনিয়া আমাদের পায়ে পড়বে দেখো..! জাকিউর রহমান লাখভি দাঁতে দাঁত চেপে হিসহিস করে উঠল! সেই প্রথম জীবনে সামান্য ভয় পেয়ে গেল দাউদ। সে ভাবল কী করতে চাইছে এরা? আমেরিকা ফিরে গিয়ে একমাসের মধ্যে নাম পালটে ফেলল সে। এবং নতুন পাসপোর্ট নিয়ে ইন্ডিয়ায় এসে নামল ডেভিড কোলম্যান হেডলি।
একটা জিমে জয়েন করতে হবে। জিম ছাড়া ডেভিডের চলে না। তার কাছে সবার আগে শরীর। সাউথ মুম্বইয়ে পেয়ে গেল মোটামুটি একটা ভালো জিম। মোক্ষ ওয়েলনেস। একজন বিদেশি তাদের জিমে ওয়ার্ক আউট করতে এসেছে এটা তো বেশ ব্র্যান্ড বিল্ডিংয়ের ব্যাপার। তাই স্বাভাবিকভাবেই ডেভিডকে যথেষ্ট উষ্ণতার সঙ্গে আপ্যায়ন করা হল। এই ফর্মটা ফিল করতে হবে স্যার
হ্যাঁ দিন।
এখানে নাম, লোকাল অ্যাড্রেস আর কন্ট্যাক্ট নম্বর লিখে দিন। ঠিক আছে? ফর্ম ফিল আপের পর বলল হেডলি।
আপনার দুটো ফোটোগ্রাফ লাগবে স্যার।
কিন্তু আমার তো ফোটোগ্রাফ নেই। কী করা যায়? পরে একসময় দেওয়া যায়? রিসেপশনের লোকটি সামান্য কয়েক সেকেন্ড ভাবল। তারপর বলল, আচ্ছা কোনো প্রবলেম নেই স্যার।
হেডলি আবার হাসল। আবার মনে মনে ইন্ডিয়ানদের একটা বিশুদ্ধ হিন্দিতে গালাগালি দিল। কারণ আমেরিকায় হলে এরকম জীবনে হতেই পারে না যে উইদাউট ফোটো একজন বিদেশিকে একটা ক্লাবে জয়েন করতে দেওয়া হচ্ছে। ভাবাই যায় না। আমাকে কেমন দেখতে আগামীদিনে এদের কাছে কোনো প্রমাণই থাকবে না? কী বোকা এরা! ভাবল ডেভিড! কারণ ওই পরে দেব আসলে কথার কথা। কোনোদিনই দেবে না হেডলি নিজের ছবি। জিমে অনায়াসে ভর্তি হওয়া গেল। জিম ইনস্ট্রাকটর বিলাস ওয়ারাক খুব পছন্দ করে ফেলেছে এই নতুন ভর্তি হওয়া আমেরিকানকে। কারণ লোকটাকে সে নিজে কী বডি ওয়ার্ক আউট শেখাবে? লোকটি আগে থেকেই অনেক বেশি জানে। বরং এই হেডলির থেকেই কত কিছু শেখার আছে। দারুণ কথা বলতে পারে। আর সবথেকে বড় কথা খুব সামান্য হিন্দি চট করে শিখে যাচ্ছে। আজকাল কয়েকটি কথা সে বেশ বুঝতে পারে। অল্পদিনের মধ্যেই ডেভিড আর বিলাসের সম্পর্ক নিছক জিমের মধ্যে সীমাবদ্ধ রইল না। তারা বিকেলেও দেখা করতে লাগল পরস্পরের সঙ্গে। কেন এত আগ্রহ ডেভিডের? কারণ ততদিনে জানা হয়ে গিয়েছে যে বিলাস একজন শিবসেনার কর্মী। সে নিয়মিত যায় শিবসেনার সদর দপ্তরে। আর ডেভিডকে যেসব জায়গার ভিডিও করতে হবে, ভিতরের খুঁটিনাটি জানতে হবে সেই তালিকায় রয়েছে শিবসেনার হেডকোয়ার্টারও। সেনাভবন! অতএব বিলাসকে আরও বেশি করে বন্ধুত্বের জালে আটকে ফেলছে ডেভিড। সকালে জিম। দুপুরে লাঞ্চের পরই ডেভিড বেরিয়ে যায় মুম্বই সফরে। হাতে ক্যামেরা। সে ভিডিও তুলছে তাজমহল হোটেলের। ভিডিও তুলছে চার্চগেট রেল স্টেশনের বাইরে। সিএসটি স্টেশনের বাইরে। টাকা আসছে কোথা থেকে? এভাবে মাসের পর মাস থাকা? নিয়ম করে তাহাওয়ার রানা ব্যাংকে টাকা ট্র্যান্সফার করে দিত। ব্যাংকটি ছিল ট্রাইডান্ট হোটেলের কাছে। তবে একটা নিজের কিছু করা দরকার। সবথেকে সোজা কাজ হল ইমিগ্রেশন সংস্থা করা। ইন্ডিয়া, পাকিস্তান আর বাংলাদেশের একটাই কমন ইস্যু। প্রায় সিংহভাগ ইয়ং ছেলে বিদেশে যেতে চায়। তাই ওই ব্যবসার চাহিদা সাংঘাতিক। ডেভিড নতুন একটি অফিস খুলল নিজের। তারদেও এ সি মার্কেটে। অফিসের নাম ফার্স্ট ওয়ার্ল্ড ইমিগ্রেশন! সেই অফিসে একজন সেক্রেটারি রাখা হয়েছে। যাতে কোনো সন্দেহ না হয়। তার নাম মাহরুখ ভারুচা।
সেদিন ছিল বৃহস্পতিবার। জিম বন্ধ। বিলাসের ছুটি। ডেভিড তার আগেই জেনে নিয়েছে একটা বডি বিল্ডিং কম্পিটিশন আছে। শিবাজি মন্দিরের কাছে। সে কি যাবে? বিলাস বলল, আমিও তো যাচ্ছি ওখানে। আমার এক বন্ধু আসবে। চলো। বডি বিল্ডিং ডেভিড কোলম্যান হেডলির এক সাংঘাতিক প্যাশন। ওখানেই কেটে গেল দিনের প্রথম ভাগ। আর দ্বিতীয়ার্ধে একটি ঝকঝকে দারুণ ফিগারের টোনড বডির যুবক এল বিলাসের সঙ্গে দেখা করতে। বিলাস তার সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিল ডেভিডের।
ডেভিড এই আমার বন্ধু রাহুল।
হাই রাহুল, দিজ ইজ ডেভিড।
রাহুলেরও খুব পছন্দ হয়ে গেল ডেভিডকে। রাহুলের পরিচয় শুনে ডেভিডের মুখটি কি সামান্য চকচক করে উঠল?
সেদিন রাতে রিলায়েন্স সাইবার কাফেতে ঢুকে লস্কর ই তৈবা আর আইএসআইয়ের হ্যান্ডলার সাজিদ মীর আর মেজর ইকবালকে ইমেলে জানাল ডেভিড তার নতুন বন্ধুর কথা। বলল, কাজ ভালোই এগোচ্ছে। অনেক ভিডিও হয়ে গিয়েছে। আর এই নতুন বন্ধু দুটি ইয়ং ছেলে বেশ কাজে আসবে মনে হচ্ছে? কারা তারা? বিলাসের কথা তো আগেই বলেছ? সাজিদ মীর জানতে চাইল। এবার ডেভিড লিখল, ছেলেটির নাম রাহুল। রাহুল ভাট। ফিল্ম ডিরেক্টর মহেশ ভাটের ছেলে!
ওপ্রান্ত থেকে সাজিদ মীর শুধু লিখল, মাই গড! কীভাবে করলে এরকম একটা কাজ? ইউ আর ডেঞ্জারাস!
ডেভিড সাইবার কাফেতে বসে হাসল! এবার শুরু হবে আসল অপারেশন!
পাকিস্তানের ফরিদকোটের এই গলিতে কোনো বিদ্যুৎ নেই। জলের পাইপলাইন নেই। প্রতিটি বাড়ি টিনের ছাদ। আর মহল্লার পিছনে কমিউনিটি বাথরুম। যেটা এককথায় জাহান্নামের সমতুল। পুতিগন্ধময় মলমূত্র রাস্তায় নেমে আসছে। সেসবের উপর দিয়েই রোজ গোটা মহল্লার নারীপুরুষ অবর্ণনীয় নরকে গিয়ে প্রাকৃতিক কর্ম থেকে স্নান সবই করছে। ৪৫ বছরের নুর ইলাহি ঠিক ওই আবর্জনাপূর্ণ রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে বড় ছেলেকে একটা চড় মারলেন! শুধু খাওয়ার সময় আসিস। খাওয়াটা কোথা থেকে আসছে জানিস? একবেলার নিজের খাওয়া জোগাড় করতে পারবি? পারবি না! জায়গাটার নাম ওকারা। পশ্চিম পাঞ্জাবের পূর্বপ্রান্তে। এমন একটা লোকেশন যেটা হাজার হাজার বছর আগে ছিল আদতে সিন্ধুসভ্যতার অংশ। এখনও এসব জায়গায় খোঁড়াখুঁড়ি করলে ধ্বংসাবশেষ পাওয়া যেতেই পারে। কিন্তু এখন একদা পৃথিবীর সেই সেরা সভ্যতার উপরে দাঁড়িয়ে রয়েছে শয়ে শয়ে বস্তি। এটাই হল লস্কর ই তৈবার বিশ্বস্ত রিক্রুটমেন্ট সিটি। ওই যে দেওয়ালে দেওয়ালে পোস্টারে যেসব যুবকের ছবি টাঙানো, তারা সেই কিন্তু ওয়ান্টেড ক্রিমিন্যাল নয়। তারা হিরো। ইন্ডিয়ার কাশ্মীরে জিহাদে গিয়ে ইন্ডিয়ান সেনাদের হাতে নিহত হয়েছে। তাই তাদের পরিচয় শহিদ। প্রতিটি মহল্লায় সবথেকে বেশি দেওয়াল লিখন- ‘চলো.. জন্নত চলো…’। শুধু যুবকদের নয়। শিশু কিশোরকেও চাই। ছোট থেকেই ট্রেনিং দিলে সেইসব বাচ্চা একটু বড় হয়ে অনেক পাকাপোক্ত জঙ্গি হয়ে যায়। তাই লস্করের মিডিয়া সেল এই শহরে একটি পত্রিকা চালায়। সেই পত্রিকার কার্টুন স্ট্রিপের নাম ‘জো’। ‘জো’ হল একটি কিশোর চরিত্র, যে বারংবার কার্টুনের নিত্যনতুন গল্পে ইন্ডিয়ায় হামলা করে আর প্রতিবারই জয়ী হয়ে ফিরে আসে। তাই কার্টুন ক্যারেকটর জো প্রবল জনপ্রিয় এই ফরিদকোটে। বাচ্চারা সকলে চায় ‘জো’ হতে। লস্করের কাজটা সহজ হয়ে যায়। কারণ এই শহরের সেই পরিবারই সবথেকে বেশি সম্মান পায়, যাদের ছেলে জিহাদে যোগ দিয়েছে। মাঝেমধ্যে তারা আসে বাড়িতে। পিঠের রুকস্যাকে কার্বাইন। সেই সময় বীরের মতো সম্মান সংবর্ধনা লাভ করে। প্রতিদিন মহল্লায় তাকে ঘুরে ঘুরে বীরত্বের কাহিনি বলতে হয়। আর প্রতিবারই তার সঙ্গে একজন অন্তত নতুন ছেলে যায়। নুর ইলাহির স্বামীর নাম আমির। এই পরিবারের আগে ছিল পশু বিক্রির ব্যবসা। সেটি চলল না। এরপর পশু জবাই করে বিক্রি করার জীবিকায় প্রবেশ করল। সেও প্রায় দুই প্রজন্ম হয়ে গেল। আর তাই তাদের পদবিও হয়ে গেল ওই জীবিকার সঙ্গে সঙ্গতি রেখে। পদবির নাম কাসব। ‘আমির কাসবের চার ছেলেমেয়ে আর স্ত্রীকে নিয়ে সংসার। তবে এভাবে চলছে না। তাই আমির লাহোরের বিল্ডিং কনস্ট্রাকশনের সাইটে কাজ নিয়েছে। সপ্তাহে আয় ৪০০ টাকা। ২০০০ সালে যখন গোটা মহল্লা আনন্দ করছে, কারণ দিল্লিতে জেলবন্দি দুর্দান্ত জঙ্গি নেতা মৌলানা মাসুদ আজহারকে ইন্ডিয়া জেল থেকে ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছে। না ছেড়ে উপায় ছিল না। ইন্ডিয়ান এয়ারলাইন্সের কাঠমান্ডু দিল্লি ফ্লাইট হাইজ্যাক করে কান্দাহারে নিয়ে আসা হয়েছে। আর ওই চাপ সামলাতে পারেনি ইন্ডিয়ার সরকার। তাই মাসুদকে ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছে। মহল্লায় মহল্লায় মিঠাই বিলি হচ্ছে। আর ঠিক তখনই আমির কাসবের ধরা পড়ল এক অসুখ। টিবি। লাহোরে গিয়ে আর কাজ করা সম্ভব নয়। তাই ফরিদকোটেই যা কাজ পাচ্ছে করছে। কিন্তু টিবি নিয়ে কি এসব পরিশ্রমের কাজ সম্ভব? সপ্তাহে ৪০০ থেকে কমে তাদের পারিবারিক আয় দাঁড়াল সপ্তাহে ১৭৫ টাকা। আর পরিবারের বড় ছেলে এসবের ভ্রূক্ষেপ না করে পানমশলা চিবাতে চিবাতে সারাদিন ধরে শুধু ফরিদকোটে বাসস্ট্যান্ডে আড্ডা মারে কিছু লোফার ছেলের সঙ্গে। হাইট শর্ট। লম্বা চুল। আমির কাসবের এই অবাধ্য ছেলেটির নাম আজমল কাসব। ১৯৮৭ সালে জন্ম। মা নুর ইলাহির সেই চড়টি খেয়ে আজমল পরদিনই আব্বার থেকে এক পরিচিত লোকের ঠিকানা নিয়ে চলে গেল লাহোর। সেই কাজেই যোগ দিল, যে কাজ তার বাবা এতদিন করে এসেছে। অর্থাৎ বিল্ডিং কনস্ট্রাকশনের লেবার। ভোর চারটেয় প্রতিদিন ওঠা। আর সারাদিন ওই হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে সপ্তাহে ৩৫০ টাকা! ১৪ বছরের আজমলের আর ভালো লাগেনি। বন্ধু মুজফফরকে একটা বন্দোবস্ত করতে বলল। পড়াশোনা না করা ছেলে আর কীই বা কাজ পাবে? তাই কোনো কাজই নেই। ৬ বছর কেটে গেল ঠিক এইভাবেই। ২০ বছর বয়স আজমলের। মুজফফর একটা ভালো কাজ পেয়েছে। ওয়েলকাম টেন্ট সার্ভিস। ঝিলম শহরে যেতে হবে। ইসলামাবাদ রোডের উপরই জায়গাটা। আজমলকেও একদিন নিয়ে গেল। কাজ হল ক্যাটারিং সার্ভিসের। তাও ওই কনস্ট্রাকশনের লেবারের থেকে ভালো। কিন্তু একমাসের মধ্যে মুজফফর বুঝিয়ে দিল সাদা কাজে তার আটকে থাকার কোনো ইচ্ছাই নেই। একই কাজ করে দুজনে। অথচ মুজফফরের জামা কাপড় ঝকঝক করছে। শুক্রবারে নমাজ থেকে ফিরে হোটেলে খাওয়া দাওয়া করে। কোরমা, বিরিয়ানি, চিকেন রেজালা। কীভাবে হচ্ছে? আজমলের প্রশ্নের জন্য অপেক্ষায় ছিল সে। শিখিয়ে দিল কীভাবে পয়সা রোজগার বাড়াতে হয়। খুব সিম্পল। যদি দেখা যায় কোনো একটি বাড়ি বা অফিস তালাবন্ধ পরপর কয়েকদিন, তাহলে বাথরুমের জানালা থেকে ঢুকতে হয় সেইসব বাড়ি আর অফিসে। আর তারপর কাজটা সহজ। তবে একতলা বিল্ডিং হওয়া দরকার। কাজের সুবিধা হয়। সোজা কথায় চুরি। পরপর সাতটি ঘটনা ঘটাল দুজনে মিলে। একবারও ধরা পড়ল না। কারও সন্দেহই হল না ওয়েলকাম টেন্টে কাজ করা দুটো ছোকরা এলাকায় এলাকায় চুরি করে বেড়াচ্ছে। পকেটে পয়সা আসছে। আজমল আর মুজফফর একটি শুক্রবার ছুটির দিন সিনেমা দেখতে যাবে স্থির হয়েছে। বম্বের সিনেমা। নাম শোলে। একজন পুলিশ অফিসার দুজন চোরকে রিক্রুট করেছে এক ডাকাতকে ধরার জন্য। আর তার জন্য মোটা টাকা দেওয়া হচ্ছে। গোটা সিনেমাটা একবার দেখেও আশ মিটল না। পরপর তিনদিন তিনটে শো দেখার পর তারা করল এটাই পথ। ইন্ডিয়াকে এরা কেউ পছন্দ করে না। কিন্তু ইন্ডিয়ার একটাই জিনিস বেস্ট। মুভি। তাহলে ‘শোলে’ তাদের শিখিয়ে দিল কীভাবে কন্ট্রাক্ট নিয়ে কাজ করা যায়। আর এসব পাবলিককে ক্যাটারিংয়ের খাবার খেতে দেওয়ার মতো ফালতু কাজ পোষায় না। নাম কিনতে হবে। আর তার জন্য দরকার আর্মস। ২০০৭ সালের নভেম্বরের দুপুরে ঝিলম শহর থেকে দুটি যুবক রাওয়ালপিন্ডিগামী বাসে উঠে পড়ল বন্দুক কেনার জন্য। কিন্তু সেখানে তো কিছুই চেনে না এরা। চিন্তার কিছুই নেই। একটা মোবাইল নম্বর দিয়েছে মুজফফরের বস। যার হয়ে সে কাজ করে। আইডিয়া সেই বসের। রাওয়ালপিন্ডি চলে যা। সেখানেই আছে আর্মসের ডিলার। আর সঙ্গে আরও বড় কাজের সুযোগ।
গোটা শহর যেন সেজে উঠেছে। একদিকে ইলেকশন আসছে। আর অন্যদিকে ঈদ। তাই রাওয়ালপিন্ডি শহরের সর্বত্র রংবেরঙের টেন্ট, শামিয়ানা আর মেকশিফট দোকান। যে ঠিকানা পকেটে ছিল সেই ঠিকানা একটি জামাকাপড়ের গোডাউন। সঙ্গে মোবাইল নম্বর। চিঠিটা দেখাতেই দোকানে থাকা মধ্যপঞ্চাশের ব্যক্তি এক ঝলক তাকিয়ে গদি থেকে উঠে পড়লেন। আর হাতের ইশারায় বললেন পিছন পিছন আসতে। অবাক হল আজমল। কী ব্যাপার! এত গোপনীয়তা কেন? তবু পিছনে গেল। প্রায় মিনিট পাঁচেক হাঁটা। একটা বড় প্রাঙ্গণকে ঘিরে নানারকম টেন্ট। তারই একটিতে ঢুকে এক বৃদ্ধের কানে কানে ওই লোকটি কিছু একটা বলছে। আজমল আর মুজফফর সামনে দাঁড়িয়ে। ৩০ সেকেন্ডের ওই ফিসফিসের পর বৃদ্ধ উঠে দাঁড়িয়ে আচমকা এগিয়ে এসে জড়িয়ে ধরলেন দুজনকে। সব হয়ে যাবে। একবার এসেছ যখন। এখন রেস্ট নাও। তারপর খেয়ে বেরিও। মাটন আর ভাত। আশ্চর্য তো! একটামাত্র আর্মস কেনার কাস্টমারকে এত খাতিরদারি! আজমল কাসবের মনে হচ্ছে এই প্রথম তার বেশ দাম আছে। খাওয়া দাওয়ার পর টেন্টের পিছনদিকে নিয়ে যাওয়া হল। আরে! টেন্টের পিছনে এরকম একটা আস্ত অফিস! বাইরে থেকে দেখে বোঝাই যায় না। এক গম্ভীর যুবক বসে। সে শুধু একটা চিরকুট এগিয়ে দিল। কাসব পড়াশোনা না জানলেও এটুকু পড়তে পারল কী লেখা আছে। সেটায় লেখা-দউরা ই সুফা! তাদের বলা হল এই চিরকুট নিয়ে যেতে হবে লাহোর শহরের কাছেই একটা জায়গায়। মুরিদকে।
ঠিক ২৪ ঘণ্টা পর আজমল কাসব আর মুজফফর এসে নামল লাহোর থেকে ৩০ মিনিট বাসদূরত্বের জায়গা মুরিদকে স্টপেজে। বাসস্টপে নেমে যেতে হবে বিশেষ একটি এলাকায়। যার নাম মারকাজ ই তৈবা। এটা কী? আসলে একটা প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি। গেট থেকে ভিতরে ঢুকলেই চোখ ধাঁধিয়ে যাচ্ছে। বড় বড় রাস্তা। সেই রাস্তার দুদিকে ফুল আর সবুজ উদ্ভিদে ঢাকা পাথওয়ে। অন্তত চারটে খেলার মাঠ। কিছুক্ষণ পর পর একটি করে গার্ডেন। ব্যাক গেটের সামনে বিরাট এক সুইমিং পুল। চারদিকে বড় বড় বিল্ডিং। সবথেকে বৃহৎ ভবনটির নাম আবু হারেরা মসজিদ। সেই বিল্ডিংয়ে একসঙ্গে ৫ হাজার মানুষ বসতে পারে। অফিসে বসিয়ে রাখা হল অনেকক্ষণ। প্রায় ৪০ মিনিট পর একটি লম্বা মানুষ ঢুকল। অফিসে উপস্থিত সকলেই সসম্ভ্রমে উঠে দাঁড়াল। এই হল চাচা জাকি! লস্কর ই তৈবার নম্বর টু কমান্ডার! আর লাহোর থেকে ৩০ মিনিট দূরত্বের এই প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি হল লস্কর ই তৈবার জঙ্গি তৈরির কলেজ। আজমল কাসব আর তার বন্ধুকে বলা হল তোমাদের আপাতত পাঁচদিনের একটা কোর্স করানো হবে। পাঁচদিন পর বলবে তোমরা এখানে থাকবে কিনা! ঠিক পাঁচদিন ধরে ভোর চারটেয় ঘুম থেকে উঠে নমাজের পর সারাদিন ধরে বক্তৃতা শোনা। আর সবথেকে মজার টাইম বিকেলে। ক্রিকেট খেলা। সেই খেলার নিয়ম হল সবথেকে খারাপ প্লেয়ারদের নিয়ে যে টিম তৈরি হবে তার নাম দেওয়া হয় ইন্ডিয়া। আর ভালো পোক্ত খেলোয়াড়দের নিয়ে তৈরি টিমের নাম পাকিস্তান। তাই মুরিদকে প্লে গ্রাউন্ডে দিনের পর দিন প্রতিদিন প্রতি ম্যাচেই একটি টিম জিতে যায়। পাকিস্তান। পাঁচদিন পর সকালের নমাজের পর সকলকে ডাকা হল অডিটোরিয়ামে। একটি বিশেষ মানুষ আসবে আজ। ৪০ জন যুবকের দল বসে আছে। অপেক্ষায়। মুখে দাড়ি, রোগাটে চেহারা। একটা কালো চশমা পরা। সানগ্লাস কিনা বোঝা যায় না। মঞ্চের সামনে রাখা পোডিয়ামের সামনে এসে দাঁড়াল। লোকটির নাম আল কামা! লস্করের অপারেশন কমান্ডার কাশ্মীর সেক্টর। সে বলল, ইন্ডিয়ার বড় বড় সিটিতে অ্যাটাক করা হবে। আমরা এবার ইন্ডিয়ার মধ্যে ঢুকে সেখান থেকেই যুদ্ধ শুরু করব। আর এই যুদ্ধে ইন্ডিয়া হারবেই। ১৫ জনের টিম তৈরি হবে। তোমাদের থেকেই। কে কে রাজি আছো? মনে রেখো এটা হবে ফিঁদায়ে ফোর্স। আত্মঘাতী বাহিনী। পারবে? মনের জোর আছে? যদি বেঁচে ফিরতে পারো তোমরাই হবে পাকিস্তানের নতুন হিরো! চাঁদের মতো উজ্জ্বল হবে তোমাদের মুখ! সোজা জন্নতে যাবে। তোমাদের শরীর এসে নিয়ে যাবে স্বয়ং ফেরেস্তা। আর সেই শরীর থেকে বেরোবে অপূর্ব এক গোলাপের খুশবু! এবার বলো? সবার আগে একটি শর্ট হাইটের ছেলে উঠে দাঁড়িয়ে বলল, জনাব, আমি যাব! ছেলেটির নাম আজমল কাসব!
রাহুল তুমি এত হ্যান্ডসাম! ফিল্মে নামছ না কেন? প্রশ্ন করল ডেভিড কোলম্যান হেডলি।
রাহুলের সবথেকে গোপন স্পর্শকাতর জায়গা। তাঁর বাবার নাম মহেশ ভাট। বোনের নাম পূজা ভাট। কাকার নাম বিক্রম ভাট। অথচ তাঁকেই কেউ সেভাবে চান্স করে দিচ্ছে না। আর অল্প কয়েকদিনের মধ্যেই ডেভিড এই দুর্বলতার সন্ধান পেয়েছে। ২০০৭ সালের নভেম্বরে রাহুলের বাড়ির ব্যালকনিতে বসে ডেভিড জানতে চাইলেন, ওই কথাটা, রাহুল তুমি ফিল্মে নামছ না কেন? রাহুল চুপ।
ডেভিড জানতে চাইছে, একটা ফিল্ম তৈরি করতে কত টাকা দরকার হয়? একটা ছোট বাজেটের সিনেমা করতে প্রায় ৫ থেকে ৬ কোটি টাকা তো লাগবেই। ইউ মিন টু মিলিয়ন?
ইয়েস, অ্যাক্সিমেটলি।
ওকে! ইটস ভেরি ইজি! আই উইল ট্রাই ফর ইউ বয়! চিয়ার আপ!
রাহুল নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছে না। ডেভিড তাঁকে লঞ্চ করাবে? তাঁর কতদিনের স্বপ্ন এই ফিল্ম জগতে ঢোকা।
বাট রাহুল তোমাকে একটা কাজ করে দিতে হবে। একটা ছোট্ট হেল্প। বিলাস তোমার খুব বন্ধু। ও শিবসেনার ক্যাডার। ওকে বলে আমার সঙ্গে একবার শিবসেনা সুপ্রিমোর রাতে হবে। আই ওয়ান্ট টু মিট হিম! মিস্টার বাল ঠাকরে! আলা
পাঁচদিনের মাথায় বিলাস একটা অ্যাপয়েন্টমেন্ট ফিক্সড করে ফেলল। তারা তিনজন গেল মাতশ্রী। বান্দ্রা ইস্ট। বাল ঠাকরের বাড়ি। ট্যাক্সিতে যেতে যেতে ডেভিড বলল, তোমরা জানো মুম্বইয়ে শিবসেনার কটা শাখা আছে? রাহুল আর বিলাস কেউই জানে না। ডেভিড হেসে বলল, ২৪১ টি। আশ্চর্য! এই দুজন সারাজীবন মুম্বই থেকেও এত কিছু জানে না। আর এই আমেরিকান লোকটি এত কথা জানছে কীভাবে? কিন্তু সেদিন বাল ঠাকরের সঙ্গে দেখা হল না। কারণ তিনি ব্যস্ত। আর এভাবে যাঁর তাঁর সঙ্গে তিনি দেখাও করেন এমন নয়। বিলাস অ্যাপয়েন্টমেন্ট করলেও এতটা খুঁটিনাটি জানেই না। তাই আপাতত আর হচ্ছে না। কারণ ডেভিড চলে যাবে আবার। কয়েকমাস থেকেই ডেভিড চলে যায় আমেরিকা। এটাই নিয়ম। কেন যায়? কোথায় যায়? এখানে ওর নিজের অফিস আছে। লম্বা একটা ভিসা নিচ্ছে না কেন? রাহুল ভাট কিছুই আঁচ করতে পারছে না সে কার সঙ্গে বন্ধুত্ব পাতিয়েছে। ততদিনে ডেভিড টার্গেট ঠিক করে ফেলেছে। লিস্ট হয়ে গিয়েছে। সিএসটি স্টেশন, তাজ হোটেল, লিওপোল্ড কাফে, ট্রাইডেন্ট হোটেল। এছাড়া একটা হাসপাতালকে বাছাই করতে হবে। কিন্তু আসল কাজ বাকি। এগুলোর ভিডিওগ্রাফি করা। মেজর ইকবাল লাস্ট ভিজিটে একটা ভিডিও ক্যামেরা দিয়েছে। একজন বিদেশি লোক স্টিল আর ভিডিও ক্যামেরায় ছবি তুলছে এটা মোটেই কোনো আশ্চর্য কিংবা সন্দেহজনক দৃশ্যই নয়। হামেশাই দেখা যায় দেশের সমস্ত শহরের দর্শনীয় স্থানে। আর সন্দেহ করলেও চিন্তা নেই। ডেভিড বলতেই পারে সে একটা মুম্বইয়ে ট্র্যাভেল প্লাস ইমিগ্রেশন কোম্পানি চালায়। তাই ক্লায়েন্ট আর ট্যুরিস্টদের দেখাতেই হয় বিখ্যাত জায়গাগুলির ভিডিও সিডি। শুধু কেউ নজর করল না যে এই লোকটি সাধারণ পর্যটকদের মতো বাইরে থেকে ছবি বা ভিডিও করে চলে যাচ্ছে না। ডেভিড কোলম্যান হেডলি বিনা বাধায় ভিডিও করে যাচ্ছে ওই টার্গেটগুলোর এন্ট্রি পয়েন্ট, এক্সিট পয়েন্ট, ফায়ার সার্ভিস, কতজন সিকিউরিটি, সিকিউরিটি ডিউটি চেঞ্জ হয় কখন….। সব। ঠিক এভাবেই কোলাবা থেকে হাঁটতে হাঁটতে আচমকা একটা আবিষ্কার করা গেল নতুন টার্গেট। একটা পাঁচতলা বিল্ডিং। নাম নরিম্যান হাউস। কী আছে ভিতরে? এবং জেনে চমৎকৃত। হেডলি ইহুদিদের কেন্দ্র। চাবাড সেন্টার। ইজরায়েলের পর্যটক আর স্থানীয় ইহুদিদের থাকার জায়গা। প্রার্থনাস্থলও। সেদিনই রাতে ইমেলে মেজর ইকবালকে হেডলি জানাল নতুন টার্গেটের কথা। ইকবাল উত্তেজিত। সে বলল, এটা দারুণ কাজ করেছ। আমেরিকান, ইজরায়েল, আর ইন্ডিয়া। সবাইকে একসঙ্গে শিক্ষা দেওয়া যাবে। ওয়েল ডান দাউদ! কিন্তু খুব সাবধান। ওই চাবাড হাউসে স্থানীয় ইহুদিরাও থাকে আর ইজরায়েলি ট্যুরিস্টদের যাতায়াত। তার মানেই ওটা মোসাদের ঘাঁটি। ইজরায়েলের দুর্ধর্ষ স্পাই এজেন্সি! ওদের চোখ মারাত্মক! তাই সতর্ক হয়ে কাজ করবে।
২০ সেপ্টেম্বর ২০০৮। মুম্বইয়ের বিখ্যাত রেস্তোরাঁ হানিবাল রাইসিংয়ের দিকে যাচ্ছে একটা মারুতি এস এক্স ফোর। রাহুল, বিলাস আর ডেভিড হেডলি। জ্যাম আছে। গাড়ি এগোচ্ছে না। কেম্পস কর্নার ক্রসিংয়ে। কার রেডিও ঘোরাচ্ছে রাহুল। ভালো একটা গান শুনতে হবে। আচমকা নিউজ হেডলাইনস চলে আসায় ডেভিড বলল, হোল্ড, এক সেকেন্ড! চলন্ত গাড়িতে নিউজে বলছে কিছুক্ষণ আগেই পাকিস্তানের ইসলামাবাদে ম্যারিয়ট হোটেলের বাইরে বোমা বিস্ফোরণ হয়েছে। এখনও পর্যন্ত ৫৪ জনের মৃত্যু। ২৫০ জন আহত। ডেভিড স্তব্ধ। সে ভাবল এটা নিশ্চয়ই ইন্ডিয়ান এজেন্সির করা। দাঁতে দাঁত চেপে রইল। খবরটা শুনে প্রাথমিক অভিঘাতে রাহুল আর বিলাসও চুপ। তারপর আচমকা ডেভিড বলল, এরকম অ্যাটাক মুম্বইতেও হতে পারে শীঘ্রই। তোমরা দুজনে কিন্তু সাবধানে থেকো! রাহুল আর বিলাস চমকে উঠল! মানে কী? এসব কী বলছে ডেভিড?
ডেভিডের কাজ শেষ। একটাই ডিউটি বাকি। সেটাই সবথেকে ভাইটাল। একটা সেফ ল্যান্ডিংয়ের সন্ধান করতে হবে। সাজিদ মীর তাকে ইমেলে ইনস্ট্রাকশন দিয়েছে এমন কয়েকটা কোস্ট এলাকা আইডেন্টিফাই করো যেগুলি কোনোভাবেই কোস্টাল পুলিশের পেট্রলিংয়ের নজরদারির মধ্যে নেই। পরদিন হেডলি তাজ হোটেলের সামনে থেকে আরবসাগরে একটি ট্যুরিস্ট বোটে চেপে বসল। প্রথমে এলিফ্যান্টা কেভ। পকেট থেকে বের করল একটা গোপন মূল্যবান জিপিএস রিডিং গ্যাজেটস। আর সকলের অলক্ষ্যে সেই জিপিএস অন করে করে ফোটোগ্রাফি আর ভিডিও করতে লাগল গোটা যাত্রাপথ। বিশেষ করে ফেরা। একদিনে তো হবে না। কারণ সেদিন রাতে তাকে ইমেলে বলা হল দিনের বেলা নয়। তুমি রাতের জিপিএস আর ক্রাউড পাঠাও। এই ধরো সাড়ে ৮ টা থেকে ৯ টা! কেন? আইএসআই এর অফিসার হাসলেন। এখনও আসল অপারেশনের টাইমটা কাউকে বলা হয়নি। তিনজন জানে। হাফিজ সঈদ, সাজিদ মীর, মেজর ইকবাল। তিনজনের মিটিংয়ে ঠিক হয়েছে রাত সাড়ে ৮টাই প্রশস্ত সময়। হেডলি পরদিন সন্ধ্যার পর মেরিন ড্রাইভ থেকে প্রথমে গেল কাফে প্যারেড। একটা ট্যাক্সি নেওয়া হল। সমুদ্রতীর ধরে হেডলি সোজা যাচ্ছে। যতক্ষণ না বাধওয়ার পার্ক এল। এটা সবথেকে আদর্শ ল্যান্ডিং হতে পারে। ভাবছিল হেডলি। একটিমাত্র বোট নিয়ে এক মাঝি বসে আছে। তাকে হেডলি বলল, আজ রাত তিনটের সময় আমি সাগরে যাব। নিয়ে যাবে? এই নাও অ্যাডভান্স! ৫০০ টাকা! ওই মাঝি একটি ট্রিপে এত টাকা পায়নি কোনোদিন। এই প্রথম। তাই সানন্দে রাজি। সেদিন নিশুতি রাতে বোটে চেপে সেই নির্জন সমুদ্রতীর থেকে বোট নিয়ে প্রায় ৪ কিলোমিটার সাগরের ভিতরে চলে গেল হেডলি। আর তারপর ফেরার সময় জিপিএস অন করে দিল। সঙ্গে ভিডিও। গোটা রুট। এটাই ফাইনাল। মাঝির হাতে আরও ৫০০ টাকা দিয়ে হেডলি বলল, তোমার নাম কী? কয়েকজন কলেজ স্টুডেন্ট আসছে শীঘ্রই। তোমার বোটে চাপবে। মনে থাকবে তো! মাঝি ঘাড় নাড়ল। আটদিন পর ডেভিড কোলম্যান হেডলি পাকিস্তানের রাওয়ালপিন্ডি মিলিটারি ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় একটি বিল্ডিংয়ে ঢুকল। তার ব্যাগে জিপিএস রিডিংস আর যাবতীয় ভিডিও। আজ এগুলো দেখানো হবে। সাজিদ মীরের থাকার কথা। কই তাকে তো দেখা যাচ্ছে না! কোথায় গেল? এখনও আসেনি? ডেভিডকে দেখে একটি লোক এগিয়ে এল। গোটা মুখ ক্লিন শেভড! হাঁটার ধরনটা চেনা। মুখের আদলটাও? কিন্তু পুরোপুরি চেনা যাচ্ছে না। লোকটি কাছে টেনে নিল ডেভিডকে। বলল, সালাম আলাইকুম দাউদ! সব খ্যায়রিয়াৎ? ‘আপনি?’ বিস্মিত চোখে তাকিয়ে রইল ডেভিড। লোকটি বলল, আমি মীর! চমকে গেল ডেভিড! মীর? সাজিদ মীর? এরকম দেখতে হয়ে গেল কীভাবে? মুম্বই অ্যাটাক এগিয়ে আসছে। তাই সাজিদ মীর প্লাস্টিক সার্জারি করিয়ে নিয়েছে নিজের মুখ! ইন্ডিয়া যদি আগামীদিনে তাকে চক্রান্তকারী হিসাবে ছবিও দেয়, পাকিস্তান সরকার বলতেই পারবে এরকম দেখতে কোনো টেররিস্ট পাকিস্তানে নেই! আগাম প্ল্যান রেডি! মীর বলল, দাউদ তোমার কাজ শেষ। বহোৎ শুক্রিয়া। এবার আসল কাজ করবে অন্য টিম! স্ত্রী সাজিয়া আর চার ছেলেমেয়েকে পাকিস্তান থেকে আমেরিকায় পাঠিয়ে দিল ডেভিড কোলম্যান হেডলি। তার বড় ছেলে বিশেষ প্রিয় হেডলির। তাকে বলল, ড্যাডি তোমার সঙ্গে ওয়ান উইক পর মিট করবে। এখন যাও তোমরা। প্রিয় পুত্রের নাম কী রেখেছিল ডেভিড কোলম্যান হেডলি? ওসামা!!
২৪ জনের গ্রুপ। মুরিদকের ট্রেনিং শেষ। এবার যেতে হবে অন্য কোথাও। আরও কঠোর প্রশিক্ষণ। আট ঘণ্টার জার্নি। নর্থ ওয়েস্ট ফ্রন্টিয়ার প্রভিন্সের জায়গাটার নাম মানশেরা! দক্ষিণদিকে কী আছে? একটা ছোট জনপদ। সেই সিটির নাম অ্যাবটাবাদ। ওসামা বিন লাদেন থাকে সেখানে তখন। ২১ দিনের ট্রেনিং হল এখানে। যার পোশাকি নাম দওরা ই আমা। ঝিলমের একটা সামান্য ছোট সংস্থা ওয়েলকাম টেন্ট সার্ভিসে কাজ করা আজমল কাসব রাওয়ালপিন্ডি গিয়েছিল একটামাত্র যে কোনো আর্মস কিনতে। কান্ট্রিমেড। কারণ ওটা দিয়ে সে আর তার বন্ধু মুজফফ্ফর ভেবেছিল ছিনতাই শুরু করবে। তার হাতে এই প্রথম দেওয়া হল সম্পূর্ণ স্বপ্নের মতো একটি আর্মস। একে ফর্টিসেভেন। এই ক্যাম্পে প্রত্যেককে উপহার দেওয়া হল একটি করে এই কালাশনিকভ। দেড় মাস কঠোর পরিশ্রমের পর তাদের বলা হল এবার রেস্ট। ছুটি। যে কেউ ইচ্ছে করলে বাড়ি যেতে পারে। তবে ১৫ দিনের জন্য। আবার যোগ দিতে হবে ক্যাম্পে। সবথেকে বিস্ময়কর হল এত কঠোর প্রশিক্ষণ হয়ে যাচ্ছে। অথচ কেউই জানে না কেন এই ট্রেনিং! কোথায় অ্যাটাক করা হবে? সকলে ধরেই নিয়েছে কাশ্মীরে যেতে হবে। মুজফফরকে বাড়ি থেকে দাদা নিতে এসেছিল। সেই দাদার হাতে টাকা তুলে দিল লস্কর। বলা হল তোমার ভাই আমাদের নয়, তোমাদেরও পরিবারের গর্ব। যাও। আবার ফের দিয়ে যেও। আজমলকে কেউ নিতে আসেনি। সে বাড়িতে দুবার ফোন করল মোবাইলে মাকে। লাইন ঢুকছে না। আর কথাই হল না। ক্যাম্পেই থেকে যেতে বাধ্য হল সে। ট্রেনিং সমাপ্ত। কাদের বাছাই করা হল?
হাফিজ আরশাদ। ৬ ফুট লম্বা। বাড়ি মুলতানে। তার ৬ ভাই আখের খেতে কাজ করে। আর আরশাদ রেলের লেবার ছিল। সেখানেই রেলকলোনির মাঠে হাফিজ সঈদের সভা দেখল একদিন বিকালে। সেখানেই তাকে হাফিজের জ্বালাময়ী অ্যান্টি ইন্ডিয়া ভাষণ শুনে হাততালি দিতে দেখে দুজন লস্কর রিক্রুটার বলেছিল তাদের হয়ে কাজ করলে মাসে ১২০০ টাকা করে দেওয়া হবে। সে রাজি। আর সেই নতুন কাজের রুট তাকে আজ এই ক্যাম্পে এনেছে।
শোয়েব। সবথেকে কম বয়সি। ১৮ বছর। শিয়ালকোট জেলার বড়াপিন্ড গ্রামের কোরান শিক্ষকের ছেলে। মুরিদকায় তাকে ভর্তি করা হয়েছিল ধর্মীয় টিচার হওয়ার জন্য। তার বাবা জানতেন না ওই কেন্দ্রটি আসলে জঙ্গি গড়ার কারিগর।
নাসির আহমেদ। ফয়জালাবাদের একটি রোগা যুবক। নাসির দীর্ঘদিন ধরে গরিব গ্রামের ছেলেদের লস্কর ক্যাম্পে পাঠানোর কাজ করে। মাসে বেতন ১৩০০ টাকা। আবদুল রহমান ছোটা। ইটভাটায় কাজ করেছে। পাঞ্জাবের বেহরা জেলার এমন এক প্রত্যন্ত গ্রামে তার বাড়ি যে সেই গ্রামের সরকারি কোনো নামই নেই। শুধু কাগজে কলমে যার নাম ৫১১। গ্রামের নাম।
ফাহাদুল্লা। আজমল কাসবের নিজের এলাকার ছেলে। ২৪ বছর বয়স। বাঁ হাতের দুটো আঙুল নেই। কীভাবে হল? জিজ্ঞাসা করা হলে সে শুধু রহস্যময় হাসে। উত্তর দেয় না।
জাভেদ। ওকারার উত্তরদিকে গুগেরা গ্রামের ছেলেটি ১৬ বছর বয়সেই বাবা মাকে বলেছিল সে লস্করে যোগ দিতে চায়। গ্রামের চাষি তার বাবা শুনেই এতটা ক্ষিপ্ত আর ভীত হয়ে যান যে, তিনি পাশের বাড়ির ১৪ বছরের এক কিশোরীর সঙ্গে ১৬ বছরের ছেলের বিয়ে দিয়ে দেন। যাতে ছেলের মাথা থেকে লস্করের ভূত চলে যায়। তা হয়নি। সে কয়েকমাস পরই বাড়ি থেকে পালায়। আর আশ্রয় নেয় ওকারায় লস্কর হেডকোয়ার্টারে।
ইসমাইল খান। নর্থ ওয়েস্ট ফ্রন্টিয়ার প্রভিন্সের একমাত্র অপাঞ্জাবি সদস্য। আর এদের সঙ্গে করাচিতে গিয়ে দেখা হবে আরও দুই সদস্যের। উমের আর অক্ষ। যদিও আর কয়েকদিনের মধ্যেই ফাইনাল অপারেশনের আগে সব নাম চেঞ্জ করে দেওয়া হবে। প্রত্যেককে নতুন নামে দেওয়া হবে আই কার্ড। কপালে থাকে গেরুয়া তিলক। মুম্বইয়ের সিদ্ধি বিনায়ক মন্দির থেকে ওই গেরুয়া তিলকের কৌটো কিনে এনেছে ডেভিড।
ডেভিড কোলম্যান হেডলি আরও কিছু শপিং করে এনেছে আগেই। ১০টা চাইনিজ ব্যাকপ্যাক। প্রত্যেকটির উপরে একটি লোগো। যাতে লেখা আছে ‘দ্য টাইড। ‘পাঁচটা নোকিয়া ১২০০ হ্যান্ডসেট। দুজন করে টিম হবে। প্রত্যেক টিমের কাছে একটি ফোন। ভোদাফোনের সিম কার্ড। অমৃতসরের কাছে একটা সীমান্তবর্তী গ্রামে গিয়ে ডেভিড চেক করে এসেছে সেই সিম কাজ করে কিনা পাকিস্তান বর্ডারে।
৪ সেপ্টেম্বর ২০০৮। আজমল কাসব আর বাকি ৯ জন ট্রেনে করে করাচি এসেছে। একটি নির্জন লোকালিটি। নাম আজিজাবাদ। আসলে এরকম নামের কোনো জায়গাই নেই ওখানে। সবটাই কোডনেম। সেখানেই উঠেছে এই গোটা টিম। এখানে ব্যাগ গোছানো হবে। ব্যাগে থাকছে জিংক চেস্ট, পিংক ফোম। তুলো দিয়ে ঢাকা ডিটোনেটর। টিনের বাক্সে আরডিএক্স। চারটে পৃথক ব্যাগে গ্রেনেড আর কার্তুজ। পরে এগুলো ভাগ বাটোয়ারা করা হবে। ১ লক্ষ ৮০ হাজার টাকা দিয়ে কেনা হল ১৬টা লাইফ জ্যাকেট। একটা ডিঙি। আর একটি ইম্প্রোভাইজড বোট কেনা হয়েছে। যার নাম আল হুসেনি। বেআইনি নয়। পাকিস্তান কাস্টমসের অনুমাদিত পোর্ট ক্লিয়ারেন্স সার্টিফিকেট আছে। যার নম্বর বিএফডি ৫৮৪৬। একটা বোট যদি ইঞ্জিন ফেল করে? তাই ব্যাক আপ রাখা হবে। আরও দুটো। আল আট্টা। আর আল ফাউজ! এই বোট চালাবে কে? কারাই বা হবে নেভিগেটর? তাই ১৬ জন মাঝিকে রিক্রুট করা হল। একজনকে কন্ট্রাক্ট দিয়ে। যার কোডনেম হাকিম সাব।
তোমরা সবাই রেডি? এখনও তোমাদের বলা হয়নি কোথায় আমরা অ্যাটাক করব। তোমরা জেনে খুশি হবে। জায়গাটার নাম মুম্বই। ইন্ডিয়ার সবথেকে বড়লোক সিটি। বলল আমির সাব। সে এসেছে আজই সকালে। ১৩ সেপ্টেম্বর। ২০০৮। আজিজাবাদের মধ্যেই একটা ছোট কনফারেন্স রুম। চাচা জাকি, আবু হামজা, মেজর ইকবাল হাজির।
সাজিদ মীরের কাজ শেষ। সে ব্যাকঅফিসের লোক। অপারেশনের জন্য এবার অন্য কমান্ডারের দায়িত্ব। চাচা জাকি ১০ জনের ফিঁদায়ে টিমকে বলল আমাকে ফলো করে এসো। সকলেই ওই অডিটোরিয়াম ছেড়ে একটা প্রাঙ্গণ পেরোল। বিল্ডিংয়ের একেবারে পিছনদিকে একটা সম্পূর্ণ আলাদা ঘর। এটা হল লস্কর ই তৈবার ডেটা সেন্টার। এই সেন্টারের ইনচার্জ আবু জারার শাহ। গত কয়েকমাস ধরে সে পোর্টেবল কমিউনিকেশন নেটওয়ার্ক তৈরি করছে। আর এই গোটা নেটওয়ার্ক গড়ার জন্য নিয়োগ করা হয়েছে একটি ইনফরফেশন টেকনোলজি টিম। যে টিমের কোডনেম ‘আউলস’। তাদের রিক্রুট করা হয়েছে দুবাই, করাচি, জেড্ডা থেকে। এই ১০ জন জঙ্গি যখন মুম্বই ল্যান্ড করবে তখন তাদের সঙ্গে যোগাযোগ সারাক্ষণ যাতে থেকে যায় এবং এই করাচি কিংবা লাহোরে বসেই যাতে মিনিট বাই মিনিট নির্দেশ দেওয়া যায় অথবা আপডেট পাওয়া যায়, তা নিশ্চিত করতে প্রথমেই নেওয়া হয়েছে ইন্টারনেট ফোন লাইন ভাড়া। যাকে বলা হয় ইন্টারনেট টেলিফোনি। কোথা থেকে নম্বর এবং নেটওয়ার্ক ভাড়া করা হয়েছে? আমেরিকার নিউ জার্সির কোম্পানি কলফোনেক্স । এই সংস্থার নেটওয়ার্ক ইউজ করে জঙ্গিবাহিনী মুম্বই থেকে ইন্ডিয়ান সিমকার্ড থেকে যে ইন্টারন্যাশনাল কল করবে, সেটি প্রথমে যাবে অস্ট্রিয়ায়। সেখান থেকে কল ডাইভার্ট করা হবে পাকিস্তান ভায়া কলফোনেক্স! ভারতীয় গোয়েন্দাদের পক্ষে যা ট্র্যাক করা অসম্ভব!
ফাইনাল প্ল্যান। ১৪ সেপ্টেম্বর। সেদিনই প্রথম আজমল আর তার টিম জানতে পারল তাদের কোথায় অ্যাটাক করতে হবে। ছত্রপতি শিবাজি টার্মিনাসে যাবে আজমল আর ইসমাইল। শোয়েব আর উমের যাবে লিওপোল্ড কাফে। আবদুল রহমান আর জাভেদ ঢুকবে তাজ হোটেলে। উমের আর অক্ষ টার্গেট করবে চাবাড় হাউসে। ডেভিড হেডলির তোলা ভিডিও আর জিপিএস রিডিংস টানা ৭ দিন ধরে দেখানো হল। আর যারা তাজে ঢুকবে তাদের বোঝার সুবিধার জন্য থ্রি ডি অ্যানিমেশন প্রদর্শিত হল বড় স্ক্রিনে। ১০ দিন পর তোমাদের দেওয়া হবে একটি করে আই কার্ড। তোমরা স্টুডেন্ট। হিন্দু। হায়দরাবাদের অরুণোদয় ডিগ্রি কলেজের। মনে রাখবে সবাই। কন্ট্রোল রুম খোলা হবে করাচির মালির টাউনে। মিলিটারি ক্যান্টনমেন্ট এলাকা। সবথেকে পশ এলাকা। ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টের কাছে। এখান থেকে চারদিকে পাকিস্তানি সেনার সিকিউরিটি বলয়ের মধ্যে থেকে কন্ট্রোল করা হবে ভয়াবহ একটি অপারেশন!
২৭ সেপ্টেম্বর। ২০০৮। প্রত্যেকটি ব্যাকপ্যাকে একটি করে কালাশনিকভ, ২৪০ রাউন্ড গুলি, ৮টা হ্যান্ডগ্রেনেড, একটা বেয়নেট, একটি করে পিস্তল যার তিনটি ম্যাগাজিন। এক কেজি করে কাঠবাদাম, কিশমিশ। হেডফোন। ব্যাটারি চার্জার। ৮ কেজি আরডিএক্স। সাপ্লাই বস্তার মধ্যে চাল ডাল তেল, জল, টিস্যু পেপার, মাউন্টেন ডিউ, রেজার, টুথপেস্ট, ব্রাশ টাওয়েল, মিল্ক পাউডার। সন্ধ্যা ৬ টা। দুটি ডিঙিতে ১০ জন। আবু হামজা, হাফিজ সঈদ, চাচা জাকি সকলকে জড়িয়ে ধরে বলল, জিতকে আনা! ঠিক সাড়ে ৭ টায় অ্যাটাক করবে। নতুন ঘড়ির কাঁটা আধঘণ্টা এগিয়ে রাখো। ইন্ডিয়া আমাদের থেকে টাইমে এগিয়ে। সঙ্গে দুজন করে মাঝি। অনেক দূরে সাগরে দাঁড়িয়ে আছে আল হুসেনি।। কিন্তু শুরুতেই বিপত্তি। সামান্য ১৯ মিনিটের মধ্যেই আরব সাগর এত উত্তাল হয়ে উঠল যে সকলেই ভয় পেয়ে গেল। অনেকক্ষণ চেষ্টা করেও ডিঙি সামলানো যাচ্ছে না। ফিরে এল ১০ জন।
পাঁচদিন পর। আবার রওনা হওয়া। এবার কোনো সমস্যা হল না। অনায়াসে সমুদ্রের অভ্যন্তরে দাঁড়ানো আল হুসেনি বোটে ওঠা গেল। সকলেই উত্তেজিত। এগোনো হচ্ছে দ্রুত। কেউ কথা বলছে না। অজানা সফর। অজানা টার্গেট। অজানা দেশ। কী হবে? আচমকা শান্ত আকাশ আবার অশান্ত। প্রবল ঝড় উঠল। টলমল করছে বোট। কিন্তু হাকিমসাব স্টিয়ারিংয়ে। কোনো চিন্তা নেই। ইন্ডিয়া বর্ডারের কাছেই? নাকি ক্রস করা হয়েছে? হঠাৎ ওই ঝড়ের শব্দ ভেদ করে একটা বিদ্যুচ্চমক।
গুলি চালাচ্ছে কেউ? চিৎকার করে উঠল হাকিমসাব। কে এই মাঝসমুদ্রে গুলি করছে? সকলেই বাইরে আসতে ভয় পাচ্ছে। পাঁচ মিনিটের মধ্যেই উপর্যুপরি গুলি আসছে অন্ধকার থেকে। হাকিম সাহেবের হাত কেঁপে গেল বোঝা গিয়েছে। সামনেই কোনো ইন্ডিয়ান ট্রলার। সেখানে যারা আছে তারা ভেবেছে এটা জলদস্যুদের বোট। তাই আগুপিছু না ভেবেই গুলি চালাচ্ছে ইন্ডিয়ান ট্রলার। উপায় নেই? এদের সঙ্গে লড়াই করে গুলি নষ্ট করা কিংবা ধরা পড়লে সব প্ল্যান নষ্ট! তাই আবার ব্যর্থ হল মিশন। ফিরে গেল আল হুসেনি। করাচিতে। কয়েকশ গ্যালন ডিজেল নষ্ট হল। কাজ হল না। মিশন কি ব্যর্থ হবে? ঠিক দু সপ্তাহ পর। রাত সাড়ে তিনটের ইয়ে ফোন এল রাহুল ভাটের কাছে। এত রাতে কে? অনেক বড় নম্বর। ডেভিড।
হাই রাহুল।
হ্যালো ডেভিড, কী খবর!
একটা কথা বলার ছিল।
কী?
আগামী একমাস সাউথ মুম্বইয়ে যেও না তুমি আর বিলাস!
মানে? কেন?
আমি বলছি যেও না।
স্যাটেলাইট ফোন কেটে গেল!
২২ নভেম্বর। রাত ৯টা। ফের দুটি নতুন ডিঙি কেনা হয়েছে। কারণ আগেরগুলো অপয়া। সেই পুরোনো টিম। ডিঙিতে চেপে যাচ্ছে আরব সাগরে। করাচির এক নির্জন উপকূল ছেড়ে। ওই যে দূরে দেখা যাচ্ছে আল হুসেনি। অপেক্ষা করছে হাকিম সাব। ১০ টিম মেম্বার আর সাতজন বোটকর্মী নিয়ে আল হুসেনি নিজেকে ভাসিয়ে নিল মুম্বইয়ের দিকে। সমুদ্রে রাত কাটানো এই প্রথম। পরদিন সকাল। ২৩ নভেম্বর। খুব ভোরেই ক্রস করা হয়ে গিয়েছে ইন্ডিয়ান বর্ডার। সমুদ্র শান্ত। এই টিমের লিডার করা হয়েছে ইসমাইলকে। সে মাঝেমধ্যেই গান গাইছে। আসলে টেনশন কাটাতে। কারণ ইচ্ছা করলেই আর পিছু হটা যাবে না। ইন্ডিয়ান নেভির হাতে ধরা পড়লে সারাজীবন জেল। আর এতসব অস্ত্র নিয়ে ধরা পড়া মানে সাংঘাতিক শাস্তি। ১০ জনের কানে একটা কথাই বাজছে। আসার আগে তাদের হ্যান্ডলাররা বলে দিয়েছে যত বেশি সংখ্যক লোক মারতে হবে। গোটা দুনিয়া যেন ভয় পেয়ে যায়। ১০ জন যুবক সেটাই করতে চলেছে। ঠিক দুপুরে দূরে একটা বিন্দু। হাকিম সাব ডেকে পাঠাল বাকিদের। ডেক থেকে দূরবিনে চোখ। দেখা যাচ্ছে একটা ট্রলার। আবার ইন্ডিয়ান ট্রলার? হ্যাঁ। এই কালো, সাদা হলুদ রঙের ট্রলারটির নাম এম ভি কুবের! দ্রুত এগিয়ে আসছে আল হুসেনির দিকে। একটু কাছে আসতেই উমের হাতে একটা ভাঙা ফ্যানের বেল্ট তুলে নাড়াতে লাগল। যাতে মনে হয় তারা বিপদে পড়েছে। সেই ভারতীয় ট্রলার নিয়ম অনুযায়ী কাছে এল। সমুদ্রে বিপদে পড়লে সকলেই পরস্পরকে সহায়তা করে। এটাই নিয়ম, অঘোষিত। দুটি বোট পাশাপাশি। আচমকা আড়াল থেকে চারজ ছিটকে বেরিয়ে এসে জাম্প করে এমভি কুবেরের ডেকে উঠে গেল। ভারতের নিরীহ লোকগুলো ভ্যাবাচাকা খেয়ে গেল। আর উঠেই গুলি চালাল দুজন। ছিটকে পড়ল ভারতীয় ট্রলারের দুজন সওয়ারি। এরা জেলে। মাছ ধরতে এসেছে। মোট চারজন। নাবিক বাদে বাকিদের ধরে জোর করে আল হুসেনিতে তুলে দেওয়া হল। আর আরও ৬ জন লস্কর জঙ্গি উঠে এল এম ভি কুবেরে। এবার এই ভারতীয় ট্রলার এই ১০ লস্কর জঙ্গিদের দখলে। একমাত্র এই ট্রলারের ভারতীয় যে সে চালক। অমরচাঁদ সোলাঙ্কি। তার হাত পা বেঁধে ফেলা হল। আর অন্যদিকে যে তিনজন জেলেকে পাকিস্তানের হাকিমসাবের বোটে তোলা হয়েছে, তাদের বাঁচিয়ে রাখার প্রশ্নই নেই। পরপর গলার নলি কেটে ফেলা হয়েছে। গোটা শরীর ছটফট করতে করতে শান্ত হওয়ার আগেই সব কটা বডি সমুদ্রে ছুঁড়ে ফেলা হল। এবার বিদায়ের পালা। হাকিমসাব এই টিমকে শুভেচ্ছা জানিয়ে তার বোট ঘুরিয়ে নিল। সে ফিরে যাবে করাচি। চিৎকার করে বলল, চুন চুন কে মার না ভাইলোগ! আজমলরা হেসে হাত নাড়াল।
ভারতীয় ট্রলারে উঠে কিছুক্ষণ ধাতস্থ হতে সময় লাগল এই ১০ জনের। টেনশনও আছে। বোটের ডেকে এসে কাঁপা কাঁপা গলায় ইসমাইল মোবাইল ফোনে নম্বর ঘুরিয়ে বলল, সালাম আলাইকুম! কোনো শব্দ নেই ওপ্রান্তে। কয়েক সেকেন্ড চলে গেল। কী ব্যাপার? কানেকশন হচ্ছে না? ঠিক ১৫ সেকেন্ড পর ওপ্রান্ত থেকে ভেসে এল ভাঙা কণ্ঠ। আলাইকুম আসসালাম! আবু হামজা। করাচির কন্ট্রোল রুম থেকে। একটা উল্লাস ছড়িয়ে পড়ল। মাঝসমুদ্রে আর কন্ট্রোলরুমে সর্বত্র আনন্দ। বিকেল চারটের পর দূর থেকে একটা দিগন্তরেখায় দেখা যাচ্ছে বড় বড় বিল্ডিংয়ের ছায়া। চিৎকার করে উঠল আবদুল রহমান ছোটা। সবাই চলে এসো! ওই দ্যাখো মুম্বই! জিপিএস অন আছে। দেখা যাচ্ছে হ্যাঁ। ওটাই মুম্বই কোস্টলাইন! ভারতীয়দের কাছে স্বপ্ননগরী। ইসমাইল আজমলকে জিজ্ঞাসা করল এই লোকটাকে নিয়ে করব? আজমল বলল মেরে ফেলব! আবার কী? তবু ইতস্তত করছে ইসমাইল। কন্ট্রোল রুমে ফোন। এবার আবু হামজা লাইনে। হ্যাঁ বল! এই ট্রলারের ইন্ডিয়ানকে নিয়ে কী করা হবে? আবু বলল, তোমাদের যা ইচ্ছে! ওকে দিয়েই শুরু করো তোমরা! বলে হেসে উঠল। হাসল আজমলও। অমরচাঁদ সোলাঙ্কিকে নির্মমভাবে হত্যা করা হল।
সন্ধ্যা ৬টা। জিপিএস দেখাচ্ছে ওই যে বাধওয়ার পার্কের মাছিয়ারা কলোনি। ওটাই ল্যান্ডিং লোকেশন। আজমল কাসব আর ৯ জন লস্কর ফোর্স মুম্বই নামল। ২৬ নভেম্বর ২০০৮। সন্ধ্যা সাড়ে সাতটা। ঠিক এক ঘণ্টা পর শুরু হবে এক কালান্তক পর্ব! টুয়েন্টি সিক্স ইলেভেন! মুম্বই অ্যাটাক! ১৬৪ জনের মৃত্যু। ৩১০ জন আহত। কয়েকশো পরিবারের জীবনযাত্রা সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যায়। মুম্বই পুলিশ, ন্যাশনাল সিকিউরিটি গার্ডের কমান্ডোদের অসীম বীরত্বের কৃতিত্ব ভোলার নয়। প্রাণ দিয়েছেন একঝাঁক পুলিশ অফিসার আর সিকিউরিটি অফিসার। আক্রমণকারীদের ভারতীয় সুরক্ষাবাহিনী অসীম সাহসী লড়াইয়ে হত্যা করেছে। ধরা পড়েছে আজমল কাসব।
পাঁচদিন পর মুম্বই পুলিশের অ্যান্টি টেররিজিম স্কোয়াডের দুই অফিসারকে ধরা পড়া আজমল কাসব জানতে চাইল আমার সঙ্গীরা কোথায়? অফিসার বললেন, তারা অন্য কোথাও আছে। দেখা করবে? আজমল ব্যগ্র হয়ে বলল, দেখা করা যাবে? অফিসার বললেন হ্যাঁ, চলো। আজমলকে নিয়ে আসা হল বাইকুল্লায় জে জে হাসপাতালে। একটি ঘরে ঢোকানো হয়েছে তাকে। পরপর স্ট্রেচার। চাদর দিয়ে ঢাকা। কোথায় ওরা? আজমল জানতে চায়। স্থির চোখে জয়েন্ট কমিশনার অফ পুলিশ রাকেশ মারিয়া সামনে আঙুল দিয়ে বললেন, ওই তো! সার দিয়ে ৯ জনের ডেডবডি। পাকিস্তানের পাঠানো ফোর্স খতম। আজমল হাউ হাউ করে কেঁদে উঠল। চার বছর পর তার ফাঁসি হয়।
কীভাবে হয়েছিল সেদিনের সেই যুদ্ধটা? চারদিন ধরে ভারতীয় সিকিউরিটি বাহিনীর ওই অভিযানের নাম ছিল “অপারেশন টর্নেডো”। এক সাধারণ কনস্টেবল থেকে ব্ল্যাক ক্যাট কমান্ডো, প্রত্যেকের ছিল একটি করে ব্যক্তিগত জীবন বাজি রাখা অসমসাহসী লড়াইয়ের কাহিনি। সে কাহিনির প্রতিটি মুহূর্তের হাড় হিম করা রোমহর্ষক বিবরণ। সে এক সত্যি থ্রিলার। আবার পরে হয়তো কোনো এক সময় শুনব আমরা!
আপাতত করিডর ক্লোজড!
.
প্রথম খণ্ড সমাপ্ত
.
তথ্য ঋণ :
এই সত্যি কাহিনিগুলো লেখার জন্য সবথেকে কঠিন ছিল সোর্স রেফারেন্স সংগ্রহ করা। কারণ প্রতিটি ঘটনার মিনিট বাই মিনিট বিবরণে কোনো কল্পনার জায়গা থাকতে পারে না। প্রায় কমবেশি সকলেরই এসব কাহিনি চেনা, জানা এবং পরিচিত। সুতরাং তথ্যবিকৃতি সবথেকে বড় অপরাধ হিসাবেই গণ্য হবে। তাই যেসব বই, ফাইল, তদন্তকারী সংস্থার চার্জশিট, মামলার রায়ের কপি এবং সংবাদপত্রের পৃষ্ঠার বিবরণের কাছে অকুণ্ঠ ঋণী সেগুলি হল নিম্নরূপ :
NEWS REPORT AND INVESTIGATIVE FEATURES FROM VARIOUS MEDIA:
- THE GUARDIAN
- THE TRIBUNE
- INDIAN EXPRESS
- REDIFF
- HINDUSTAN TIMES
- DAWN
REPORTS:
- “CENTRE FOR LAND WARFARE STUDIES” UNDERSTANDING THE INDIAN MUJAHIDIN-MANEKSHIT SINGH
- INSTITUTE FOR DEFENCE STUDIES AND ANALYSES
GOVERNMENT DOCUMENTS AND REPORT:
- NATIONAL INVESTIGATION AGENCY CASE STUDY REPORT AND PRESS RELEASE
- CBI REPORT AND PRESS RELEASE
- ANNUAL REPORT: MINISTRY OF HOME AFFAIRS
- MUMBAI ATS CRIMINAL BAIL APPLICATION AND CHARGESHEET TO HIGH COURT
- SPECIAL CELL DELHI POLICE PRESS RELEASE
- HIGH COURT AND SUPREME COURT FINAL JUDGEMENT
BOOKS:
- MISSION RAW – RK YADAV
- FEAST OF VULTURES – JOSY JOSEPH
- KASHMIR-THE VAJPAYEE YEARS-A S DULAT
- SIX MINUTES OF TERROR-NAZIA SYED AND SHARMIN HAKIM
- DIAL D FOR DON – NEERAJ KUMAR
- DANGEROUS MINDS-BRIJESH SINGH ANS S HUSSAIN ZAIDI
- FOUND DEAD-SHANTANU GUHA RAY
- FIXED-SHANTANU GUHA RAY
- DONGRI To DUBAI – S HUSSAIN ZAIDI – A S DULAT
- SPY CRONICLES
