আমরা এভাবে আর কতদিন থাকব?
মানে?
মানে তুমি বুঝতে পারছ না? কাশ্মীরের ওইদিকের সঙ্গে এই কাশ্মীরের কোনোরকম মিল আছে?
না নেই! অনেক অমিল। কিন্তু তুমি কী বলতে চাইছ?
আমি বলতে চাইছি এতদিনেও কি তুমি বুঝতে পারছ না যে আমাদের জীবন, আমাদের কেরিয়ার নিয়ে স্রেফ আইএসআই ছিনিমিনি খেলছে। আমাদের ফিউচার কী? শামিমা, তুমি কি জেহাদের সাপোর্টার নয়? আজাদি চাও না?
না। এখন আর নই। এখন আর চাই না। আমি বুঝে গিয়েছি আমরা নিছক পুতুল। আমাদের দিয়ে এই পাকিস্তান নিজেদের স্বার্থ সিদ্ধি করছে। আমাদের আজ পর্যন্ত কী লাভ হয়েছে? কারা মরছে? কাদের ফ্যামিলি ধ্বংস হচ্ছে? ভালো করে ভেবে দেখ, আম কাশ্মীরিদের। তোমার মতো ব্রাইট ইয়ং ছেলেদের শুধু অবাস্তব গল্প বলে টেনে আনা হচ্ছে ঘর থেকে। আর তারপর? নিজের ঘরবাড়ি, পরিবার, সমাজ সব ছেড়ে শুধু পালিয়ে বেড়াও। একদিন এভাবেই বুড়ো হয়ে যাওয়া। আর একবার অকাজের লোক হয়ে গেলে এরাও তাড়িয়ে দেবে। আর নয়তো ইন্ডিয়ার সিকিউরিটির হাতে গুলি খাওয়া। এই জন্য আমরা পড়াশোনা করলাম? এই দুয়ের মধ্যে পড়ে আমাদের লাইফ তো সম্পূর্ণ চলে যাচ্ছে। আবদুল একবার ভেবে দেখ। আমাকে তুমি বিশ্বাস করো তো?
এটা কী বলছ? আমি এ দুনিয়ায় একমাত্র তোমাকেই বিশ্বাস করি। সেটা নিজের মুখে বলতে হবে? ঠিক আছে তুমি বল, কী করা উচিত।
এখান থেকে পালাও। চলো ওদিকে ফিরে যাই। আমাদের কাশ্মীরে। এখানে আমার মন টিঁকছে না। এটা এক অচেনা দেশ। কারও সঙ্গে কথা বলতে পারি না। কারও সঙ্গে সামান্য মনের মিল হয় না। শুধু কাজ কাজ কাজ আর কাজ! এভাবে কি জীবন কাটানো যায়? আর তোমার কাজ? যে কাজের কোনো শেষ নেই। একটা অপারেশনের পর আর একটা অপারেশন। একটা মিশনের পর আর একটা মিশন। এন্ডলেস। আর বদলে? শুধু পিঠ চাপড়ানো।
তুমি কী বলতে চাও এরা চায় না কাশ্মীরের ভালো হোক? এরা চায় না আমরা আজাদ হই? এরা আমাদের তাহলে হেল্প করছে কেন? আমরা যা চাইছি তাই দিচ্ছে। এত টাকা খরচ করছে।
আবদুল তোমাকে আমি ভালোবেসেছিলাম কেন জানো? তুমি একজন ইনটেলিজেন্ট লোক বলে। তোমার শার্প মাইন্ড আর কাশ্মীরের জন্য এই ভালোবাসা দেখেই আমার মনে হল এরকম মানুষই পারে কাশ্মীরের দুঃখ কষ্ট সত্যিকারের বুঝতে। শুধু ইমোশন নয়। কাশ্মীরকে যদি জাস্টিস দিতেই হয় তাহলে বাস্তবটা বুঝে নিয়ে সেইমতোই ভাবনাচিন্তা করা দরকার। শুধুই ইন্ডিয়া আর ইন্ডিয়ান ফোর্সকে অন্ধের মতো ভিলেন বানিয়ে আর পাকিস্তানকে গডফাদার করে কিন্তু আমরা ভুল করছি। তাই সঠিক পথ দেখানোর জন্য দরকার তোমার মতো মাইন্ডসেট। যারা অ্যানালাইজ করতে পারবে আসলে কাদের লাভ হচ্ছে। তুমি এখনও ভাবো পাকিস্তান আমাদের ভালো চাইছে?
চায় না? তুমি কী মনে করো?
নেভার আবদুল নেভার। পাকিস্তান আমাদের ইউজ করছে। ডোন্ট ইউ আন্ডারস্ট্যান্ড! ওরা একমাত্র চায় কাশ্মীরে সারাক্ষণ শুধু বারুদের গন্ধ ভাসুক। কাশ্মীর যেন প্রতিদিন খবরের কাগজের পাতায় খবর হয়। কাশ্মীরের অশান্তি ইন্টারন্যাশনাল লেভেলে নিয়ম করে যেন আলোচনা হতেই থাকে। এটাই টার্গেট পাকিস্তানের।
আসল টার্গেট কিন্তু ইন্ডিয়ার খপ্পর থেকে বের করে আনা। কারণ পাকিস্তানকে সবথেকে বড় ধাক্কা দিয়েছে ইন্ডিয়া ইস্ট পাকিস্তানকে আলাদা করে দিয়ে। বাংলাদেশ নামের একটা নতুন দেশ পাকিস্তানের শরীর কেটে তৈরি হল। এটা মেনে নিতে পারবে না কোনোদিন পাকিস্তান। তাই কাশ্মীর চাই ওদের।
তুমি আবার ভুল করছ আবদুল। ইস্ট পাকিস্তানের মানুষগুলি নিজেরাই তো বেরিয়ে যেতে চেয়েছে। প্রায় সবাই। কিছু রাজাকার বাদ দিয়ে। কিন্তু আমাদের কাশ্মীরে মিক্সড রেসপন্স। নর্থ, সাউথ গোটা কাশ্মীর, জম্মু সর্বত্র তো সবাই চায় না যে ইন্ডিয়া থেকে আমরা আজাদি পাই। অনেকে ভারতেই থাকতে চায়। তা না হলে এখনও যখনই নির্বিঘ্নে ইকেলশন হচ্ছে তখন সকলেই কেন ফারুখ সাব, মুফতি সাবদের ভোট দিচ্ছে? কেন ওরাই জিতছে লাগাতার? তার মানে একটা অংশের পাবলিক শান্তি চায়। আর অবশ্যই চায় অন্য পাঁচটা রাজ্যের মতোই কাশ্মীরও যেন স্বাভাবিক স্টেট হয়। আবার তোমাদের মতো মানুষও হাজার হাজার আছে। যাদের একমাত্র স্বপ্ন আজাদি। আমারও তাই। কিন্তু আমি বুঝতে পারছি এভাবে হবে না। আমরা আসলে পাকিস্তানের হাতে পরিচালিত হচ্ছি। তাই অন্যভাবে ভাবতে হবে। অন্যভাবে কাশ্মীরিয়তকে আমাদের এস্ট্যাবলিশ করতে হবে। আমি আমাদের কাশ্মীরে ফিরতে চাই আবদুল। আমি আর তুমি। একটু ভাবো। নয়তো দেরি হয়ে যাবে।
আবদুল মজিদ দার থমকে গেল। শামিমা কি ঠিক বলছে? হতেও পারে। অন্তত শুনে তো মনে হচ্ছে। এই পাক অধিকৃত কাশ্মীরের মুজফফরাবাদের সঙ্গে সত্যিই সেই ফেলে আসা কাশ্মীরের কোনো মিল নেই। সেই একই পাহাড়, একই ভ্যালি, একই নদী। কিন্তু একবার ওই পারে গেলেই মনে হয় একটা অন্যরকম উন্নত কান্ট্রিতে এলাম। আর এই পাক অধিকৃত কাশ্মীর কেমন যেন ধূসর প্রাচীন আর ঘিঞ্জি একটা গরিব এলাকার মতো। পাকিস্তান নিজেরা বলে ভারতের সিকিউরিটি ফোর্স গোটা কাশ্মীরকে দখল করে রেখেছে। কাশ্মীর একটা পুলিশ স্টেটে পরিণত হয়েছে। মানুষের হাঁটাচলার পথে সাধারণ বাসিন্দার থেকে উর্দিধারী স্টেনগানধারী পুলিশ বেশি। কিন্তু এখানেও তো তাই। এই পাক অধিকৃত কাশ্মীরেও একই দৃশ্য৷ গোটা ভ্যালিই তো পাকিস্তান আর্মি দখল করে রেখেছে। কিন্তু তাই বলে পাকিস্তান কাশ্মীরকে ভালোবাসে না, কাশ্মীরের আজাদির জন্য জানপ্রাণ দিয়ে হেল্প করছে তা নয়, এটা কি ঠিক? শামিমা এসব কী বলছে? কিন্তু আবদুল মজিদ দারের মনোজগতে আমূল পরিবর্তন হচ্ছে। সে এক নিমেষে গত ১০ বছরের ঘটনাপঞ্জি, নানারকম ইনসিডেন্ট মনে করতে শুরু করল। সত্যিই তাই। ১০ বছর আগে কাশ্মীর যতটা শান্ত ছিল, যত দিন এগিয়েছে ততই অশান্তি বেড়েছে। আবদুল মজিদ দারকে তার স্ত্রী শামিমা একটা মারাত্মক সত্যি কথা বলল। বলল, আবদুল কাশ্মীরের এই আজাদির লড়াইতে কী হচ্ছে জানো তো? মজিদ জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। শামিমা বলল, কাশ্মীরিদের হাতে কাশ্মীরিদের মৃত্যু হচ্ছে। যে কোনো ব্লাস্ট, যে কোনো গানব্যাটল, যে কোনো আক্রমণে হয় সাধারণ মানুষ মারা যায় আর নয়তো কাশ্মীর পুলিশ ফোর্সের কেউ। আর্মি কিংবা সেন্ট্রাল ফোর্সের বাইরে কাশ্মীর পুলিশে তো সবাই আমাদের কাশ্মীরেরই লোক। পাকিস্তান কী করছে? এই কাশ্মীর থেকে অর্থাৎ পাক অকুপাইড কাশ্মীর থেকে ইন্ডিয়া অকুপাইড কাশ্মীরে টেররিস্ট পাঠাচ্ছে। যদি ওখানে সফলভাবে আক্রমণ করা হয় তাহলে ওই পারের কাশ্মীরবাসীর মৃত্যু হচ্ছে। আর যদি ওখানে সিকিউরিটি এজেন্সি অপারেশন চালায় তাহলে সেই অপারেশনে এই পাক অকুপাইড কাশ্মীরের ছেলেরা মারা যাচ্ছে। তার মানে? দুদিক থেকেই কাশ্মীরের মানুষ মরছে। পাকিস্তানের কী হচ্ছে? কিছুই না। মজিদ দার এসব শুনে সম্পূর্ণ মানসিক ভাবে বিধ্বস্ত। এভাবে সে ভাবেইনি কখনও।
শামিমা আজ চোখ খুলে দিল। না। আর নয়। এবার একটা এসপার ওসপার। সবার আগে এই মুজফফরাবাদ ছাড়তে হবে। কীভাবে? তাকে তো এরা যেতে দেবে না! হঠাৎ করে সে কেন চলে যেতে চাইছে? আর গেলেই যে ওই পারে তার জন্য ফুল নিয়ে কেউ ওয়েট করছে তা তো নয়। বরং তাকে পাগলের মতো খুঁজছে ইন্ডিয়ান ফোর্স। একবার টের পেলেই সারাজীবনের জন্য জেলে। তাহলে? তাও কি যাব? এসব ভাবছে দার। শামিমা আসলে ইন্ডিয়ায় ফিরে যেতে মরিয়া। এখানে তার আর ভালো লাগে না। কোথায় শ্রীনগর, সোপর, পহেলগাঁও, ফুলওয়ামা, আর কোথায় এই মুজফফরাবাদ! কোনো তুলনাই হয় না। কিন্তু ফেরার রাস্তা তো বের করতে হবে! কে এই আবদুল মজিদ দার? এতক্ষণে তো বোঝাই যাচ্ছে সে এক জঙ্গি। কিন্তু স্ত্রীর কথায় সে নিশ্চিন্ত পাকিস্তান অধিকৃত কাশ্মীর ছেড়ে অনিশ্চিত জীবন নিয়ে ভারতের কাশ্মীরে আসতে চাইছে কেন?
মহম্মদ ইউসুফ শাহ জামাত ই ইসলামির এক বক্তা। কাশ্মীরে তার বক্তৃতা এতই জনপ্রিয় হয় যে ১৯৮৭ সালের বিধানসভা ভোটে ইউসুফ শাহ ঠিক করে ইলেকশনে লড়াই করবে। একটি ছোট দলের হয়ে সে আমিরাকাদাল বিধানসভা কেন্দ্র থেকে ভোটে প্রার্থী হল। এবং হেরে গেল। ইউসুফ শাহ অভিযোগ আনল সম্পূর্ণ রিগিং হয়েছে নির্বাচনে। সে রাজ্য সরকারের বিরুদ্ধেও জেহাদে নামল। ফলে স্বাভাবিক পরিণাম জেল। জেলেই তার আলাপ হল এক ব্যক্তির সঙ্গে। সেই লোকটি বলল তোমার জেহাদকে সঠিক লক্ষ্যে পৌঁছে দিতে পারবে একটাই লোক। এহসান দার। জেল থেকে ছাড়া পেয়ে তার সঙ্গে দেখা করো। তুমি যে কাশ্মীরকে দেখতে চাইছ, সেই লোকটি তাই চায়। জেল থেকে বেরিয়ে এহসান দারের সঙ্গে যতদিনে দেখা হল ততদিনে কাশ্মীরে আগুন জ্বলতে শুরু করেছে। আচমকা বেড়ে গেল অবিরত বিস্ফোরণ, গুলির লড়াই। এহসান দার একটি সংগঠনের প্রধান ছিল। সেই সংগঠনের নাম হিজবুল মুজাহিদিন। ১৯৯১ সালের নভেম্বর মাসে সেই সংগঠনের প্রধান কমান্ডার হিসাবে নিয়োগ করা হল ইউসুফ শাহকে। মহম্মদ ইউসুফ শাহের নতুন নামকরণ হল। সালাউদ্দিন!! পরবর্তী দশকগুলিতে যে নামটি কাশ্মীরের সন্ত্রাসের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে মিশে যাবে। হিজবুলের প্রধান কাজ হল কাশ্মীরের ছড়িয়ে থাকা জঙ্গি গোষ্ঠীগুলিকে নিজেদের ছাতার তলায় নিয়ে আসা। এরকমই একটি গ্রুপ উত্তর কাশ্মীরে দাপিয়ে বেড়ায়। সোপোর থেকে কুপওয়ারা। সেই গ্রুপের পিছনে আছে একটি ব্যক্তি। লন্ড্রি চালায়। আবদুল মজিদ দার। কিন্তু লন্ড্রি চালানোর মধ্যে সে নিজেকে মোটেই সীমাবদ্ধ রাখতে চায় না। তার আসল লক্ষ্য আজাদ কাশ্মীর। তাকে একঝলক দেখেই পিপলস লিগ নামের এক বৃহৎ সংগঠন তাকে দলে টেনে নিল। কিন্তু নিজের একক সংগঠন চায় সে। কারও অঙ্গুলিহেলনে চলার পাত্র নয়। কারণ সে দেখতে পাচ্ছে এসব আধা পলিটিক্যাল গ্রুপগুলো আসলে সুবিধাবাদী। এরা জেহাদের নাম করে ইয়ং ছেলেদের বাইরে বের করে আনছে। আর অন্যদিকে গোপনে ইন্ডিয়ান মেইনস্ট্রিম পার্টি আর গভর্নমেন্টের সঙ্গেও গোপন কন্ট্যাক্ট রাখে। ফলে এদের কোনো ক্ষতি হয় না। এরা সবদিক থেকেই নিজেদের স্বার্থ গুছিয়ে নিচ্ছে। কাশ্মীর যে অন্ধকারে সেখানেই পড়ে আছে। এরকমই ভাবে আবদুল মজিদ দার। তার এক স্বাভাবিক নেতৃত্বক্ষমতা আছে। সুতরাং অনুগামী পেতে অসুবিধাই হল না। সমর্থকও। অতএব নিজের সংগঠন হল। নাম তেহরিক ই জিহাদ ই ইসলামি। আর চরম সক্রিয়তায় ঝাঁপিয়ে পড়ল। প্রত্যাশিতভাবেই দ্রুত খ্যাতি আর কুখ্যাতি ছড়িয়ে পড়ল। আর সবার আগে আগ্রহী হল দুটি সংগঠন। একটি হল ভারতের ইনটেলিজেন্স ব্রাঞ্চ। আর অন্যটি পাকিস্তানের আইএসআই। ইনটেলিজেন্স ব্রাঞ্চ নতুন ফাইল খুলল আবদুল মজিদ দারের নামে। আর আইএসআই ফাইল খুলল এই লোকটিকে এবার রিক্রুট করতে হবে এই লক্ষ্যে। আইএসআই সফল। হিজবুল মুজাহিদিনের প্রধান সেই এহসান দারকে আইএসআই জানিয়ে দিল এই লোকটিকে আমাদের চাই। তোমার দলে নাও। যা টাকা লাগে দেব। ঠিক দেড় মাসের মধ্যে হিজবুল মুজাহিদিনের ডেপুটি চিফ কমান্ডার হল একটি নতুন লোক। আবদুল মজিদ দার। পরবর্তী সময়ে কাশ্মীর জুড়ে সন্ত্রাস তাণ্ডবের জেরে একের পর এক ইনটেলিজেন্স ইনপুটে জানা যাচ্ছে সব অ্যাটাক প্ল্যানের পিছনে একটিই মাথা। আবদুল মজিদ দার। হিজবুলই পারবে কাশ্মীর আজাদি আনতে। অতএব ১৯৯১ সালের ডিসেম্বরে সোপরের নিজের ঘরবাড়ি, সমাজ, পরিবার ছেড়ে আবদুল মজিদ দার চলে গেল পাকিস্তানে। গোপনে। খুব অল্পবয়সে তার বিয়ে হয়েছিল। ভালো করে প্রেম ভালোবাসা বোঝার আগেই। কিন্তু আসল প্রেম যেন অপেক্ষা করে ছিল। সোপোরের মেয়ে শামিমা বদরুকে একদিন দেখেছিল আবদুল। একটি ক্লিনিকে। শামিমা ডাক্তার। এবং বিবাহিতা। ছোটখাটো শহরের ক্লিনিকে সন্ত্রাসবাদী দলে নাম লেখানো লোকদের বিনামূল্যে চিকিৎসা করে দিতেই হয়। এটাই নিয়ম। সেই চিকিৎসা সূত্রেই দেখা। আবদুল তাকিয়েছিল। এবং শামিমাও। সেই দেখাই চিরস্থায়ী হয়ে গেল যেন। নিয়ম করে দেখা হল। প্রতিদিন কথা হতে পারত না। কারণ আজকাল আবদুল সময় পায় না। কোথায় যেন চলে যেত দিনের পর দিন। আর তারই মধ্যে একদিন শোনা গেল সে পাকিস্তান চলে যাচ্ছে। অবিশ্বাস্য! তাকে এভাবে কাশ্মীরে ফেলে রেখে আবদুল চলে যাবে। কেন? আবদুল ঠান্ডা কণ্ঠে বলল, আমার কাছে আজাদি আগে। জান থাকলে, ভাগ্য থাকলে আবার দেখা হবে।
এদিকে আবদুলের প্রথম স্ত্রী? তার সঙ্গে ততদিনে দূরত্ব অনেক। সে নিজের বাপের বাড়িতেই থাকে। কিন্তু সন্তান? হ্যাঁ। এই ছেলেকে প্রাণের চেয়েও বেশি ভালোবাসে আবদুল। কিন্তু তার কাছে ততদিনে কাশ্মীরকে স্বাধীন করার লক্ষ্য প্রোথিত হয়েছে মনের অন্দরে। তাই তাদেরও পিছনে ফেলে রেখেই আবদুল চলে গেল পাকিস্তান। কোথায়? আপাতত লাহোর। তারপর মুজফফরাবাদ। মুজফফরাবাদে হিজবুল মুজাহিদিনের হেড কোয়ার্টার। আবার আইএসআই-এর ইউনিট। এটাই হল মিশন টেররিজমের এবং বলা যায় হেট ইন্ডিয়া প্রোজেক্টের ভরকেন্দ্র। তাই যত হামলার ট্রেনিং সব হয় এই মুজফফরাবাদে। পাকিস্তান নিজেদের মূল এলাকায় অর্থাৎ এই পাকিস্তান অধিকৃত কাশ্মীরের বাইরে নিজেদের ভূখণ্ডে কোনো আঁচ আসতে দিতে চায় না। দুই কাশ্মীরবাসীই অশান্তি ভোগ করুক। এখানেই দিন কাটছে আবদুল মজিদের। মাঝেমধ্যেই মনে পড়ে শামিমাকে। ছেলেকেও। নিয়ম করা আছে সপ্তাহে একদিন করে ফোন করবে তারা। একটি হাসপাতালের নম্বর দেওয়া। সেখানেই। কিন্তু আর কি কখনও দেখা হবে?
একজন মহিলা আপনার সঙ্গে দেখা করতে এসেছে।
মহিলা? কে?
তা তো জানি না।
এই মুজফফরাবাদে আবার মহিলা কে? আবদুল মজিদ দার অবাক। এবং বাইরে এসেই স্তব্ধ। সামনে দাঁড়িয়ে শামিমা। হাসছে।
একী? তুমি? কীভাবে?
শামিমা বলল, চলে এলাম।
মানে?
মানে এখানে পোস্ট গ্রাজুয়েশন করব। ভিসা নিয়ে এসেছি। স্টুডেন্ট ভিসা। মজিদ বিস্মিত। তোমাকে ভিসা দিল? ইন্ডিয়া ছেড়ে কেউ পোস্ট গ্রাজুয়েট করতে পাকিস্তানে আসছে এটা কেউ বিশ্বাস করবে?
শামিমা বলল সেই কারণেই তো আরও বেশি করে দিল। কারণ এটা তো ইন্ডিয়ার কাছেই একটা মেসেজ পাকিস্তানের যে, কাশ্মীরের ছেলেমেয়েরা পোস্ট গ্রাজুয়েট করতে ইন্ডিয়ায় যায় না। পাকিস্তানে যায়। এসব যে আসলে অজুহাত তা তো দুজনেই জানে। অতএব দুজনেই যেন পরস্পরকে পেয়ে শ্বাস ফেলল। এতদিন পর তাহলে দেখা হল। কিন্তু শামিমার স্বামী রাজি? তার সঙ্গে কোনোদিনই মনের মিল হয়নি। সেও শামিমাকে মন থেকে চায়নি। তাহলে? তাহলে একটাই রাস্তা। কিছুদিন পরই শামিমা ডিভোর্স করবে স্বামীকে। এবং মুজফফরাবাদ ক্যান্টনমেন্ট হাসপাতালে সে চাকরিও পেয়ে যাবে পোস্ট গ্রাজুয়েশনের সঙ্গে সঙ্গে। কারণ ভারতের কাশ্মীর থেকে আসা কাশ্মীরিদের পাকিস্তানের দখলে থাকা কাশ্মীরে চাকরিবাকরি ব্যবসার সুযোগ সুবিধা দেওয়া হয় বেশি করে। কারণ ওখানে তো ভারতের কাশ্মীরকে ভারতের বলে মনে করা হয় না। অতএব হিজবুল মুজাহিদিনের কমান্ডার আবদুল মজিদ দার এবং মুজফফরাবাদ ক্যান্টনমেন্ট হাসপাতালের ডাক্তার শামিমা বদরুর হয়ে গেল বিবাহ। দুজনেরই দ্বিতীয়বারের বিয়ে।
ঠিক চার বছর কাটল। ‘এবং হিজবুল মুজাহিদিন কাশ্মীরের শেষ কথা । কিন্তু একটু যেন হাওয়া বদলাচ্ছে! আইএসআই দপ্তরে কিছু নতুন লোকের আমদানি বাড়ছে। এরা কারা? একটি সাদা কুর্তা পরা দাড়িওয়ালা আর মোটা ফ্রেমের চশমা পরা লোককে বেশি আনাগোনা করতে দেখা যাছে। সবথেকে বড় কথা হল আইএসআই ইউনিটে যেসব কাজের জন্য আজকাল আবদুল মজিদ কিংবা সালাউদ্দিনকে ডাকা হচ্ছে তা খুবই জোলো, সাধারণ। সেসব করে কাশ্মীরের আজাদি পাওয়া যাবে না। ইন্ডিয়ান সিকিউরিটি লক্ষ্য করে ইটপাটকেল ছোড়া, কিছু বোমা মারা, বনধের সময় ভাঙচুর। এসব রুটিন কাজে কোনো সাড়া ফেলা যায় না। শুধু রিক্রুটমেন্ট ছাড়া আর কোনো কাজই নেই বলা যায়। কিন্তু তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে আবদুল মজিদ দার বুঝতে পারছে আইএসআইয়ের কাছে নতুন কিছু গোষ্ঠীর আনাগোনা বেড়েছে। এমনকী এটাও জানা গিয়েছে কয়েকটি ট্রেনিং ক্যাম্পও চলছে। যা মুজাহিদিনকে জানানো হয়নি। এটা কেন করছে আই এসআই? আবদুল চিন্তিত এবং ক্ষুব্ধ। কিছু একটা লুকানো হচ্ছে তাদের কাছে। ব্যাপারটা কী?
ঠিক একমাস পর মুজাহিদিনের রিক্রুট করা ৬ জন যুবকের একটি টিমকে আইএসআই ইউনিটে পৌঁছে দিতে বলা হল। বলা হল ওদের আপাতত কিছুদিন প্রশিক্ষণ দিতে হবে। একটা প্ল্যান আছে। কিন্তু যে কোনো ট্রেনিং এ মজিদ দার কিংবা সালাউদ্দিন থাকবে তো! এবার বলা হচ্ছে কেউ থাকবে না। কেন? ১৫ দিনের ট্রেনিং শেষ। ওই ৬ যুবক ফিরে যাবে ইন্ডিয়ায়। কাশ্মীরে। কী প্ল্যা হল? যে যুবকদের মজিদ নিজের নেটওয়ার্কে এই ১৫ দিন আগেই নিয়ে এসেছে কাশ্মীর থেকে তাদের চোখমুখ বদলে গিয়েছে। ঠান্ডা কণ্ঠে তাদের একজন বলল, সেটা তো বলা বারণ! বারণ? আমাকেও বলা বারণ? আশ্চর্য হয়ে যাচ্ছে মজিদ। কারা ট্রেনিং দিল? এবার ছেলেগুলো উচ্ছ্বসিত। বলল, উফফ, মারাত্মক ভালো ট্রেনার। যা কথা বলেন। রক্ত গরম হয়ে যাবে। মজিদ আরও অবাক। ভালো কথা বলে? এরকম আবার কে এসেছে? ছেলেগুলি পালটা বিস্মিত। সেকী মজিদভাই! আপনি জানেন না। আর আমাদের এখন থেকে ওঁকেই রিপোর্ট করতে হবে। আমাদের প্ল্যানের পর ওদের হেডকোয়ার্টারে নিয়ে যাবে বলেছে। কোথায়? লাহোর। ওই গ্রুপের হেডকোয়ার্টার? মজিদ কিছুই জানে না। তার লজ্জা করছে। এরা তারই রিক্রুট। এরা কাশ্মীরে গিয়ে এরপর বলবে মজিদভাই আসলে অনেক কিছু জানে না। আইএসআই এরকম করছে কেন? কে লোকটা? যে এখন আইএসআইয়ের কাছে এত আপন হয়ে উঠছে? লোকটির নাম হাফিজ সঈদ! নতুন সংগঠনের নাম লস্কর ই তৈবা!
অর্থাৎ পাকিস্তান ফোকাস চেঞ্জ করেছে। তারা আর কাশ্মীর থেকে উঠে আসা কাশ্মীরিদের সংগঠন হিজবুল মুজাহিদিনকে পুরোদমে বিশ্বাস করছে না। এখন নতুন স্ট্র্যাটেজি হল পাকিস্তানের মধ্যেই জন্ম হওয়া, পাকিস্তানের লিডার দিয়েই পরিচালিত এবং আলকায়েদার মতো ইন্টারন্যাশনাল গ্রুপের সঙ্গে সমন্বয় তৈরি করা নতুন গ্রুপকে দিয়ে ইন্ডিয়াকে অ্যাটাক করা। অর্থাৎ তাহলে কি আবদুল মজিদ দারের গুরুত্ব কমছে? আর এর দেড় বছরের মধ্যেই আবদুলকে শামিমা এক রাতে ডিনারের পর বলল, আমরা এভাবে আর কতদিন থাকব এখানে? ১০ দিন পর। হিজবুল মুজাহিদিনের দুটি যুবক ভারতের কাশ্মীরে ঢুকতে গিয়ে ধরা পড়ে গেল। তাদের নিয়ে যাওয়া হল সোজা ইনটেলিজেন্স ব্রাঞ্চের কাছে। আই বি অফিসারের সঙ্গে রয়েছেন বিএসএফ কমান্ডারও। সেই কমান্ডার বললেন এক আশ্চর্য কথা। বললেন, ধুলত সাব এই ছেলেদুটোর সাথে একটু কথা বলুন তো? ইন্টারেস্টিং কথা বলছে। সত্যি মিথ্যা জানি না। আইবি অফিসার ধুলত চোখে প্রশ্ন নিয়ে তাকালেন। একটি ছেলে কোনো ভণিতা করল না। সোজা চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, স্যার মজিদ দারকে চেনেন? আইবি অফিসার ধূলত চমকে উঠলেন। চেনেন মানে? হিজবুল মুজাহিদিনের অপারেশন কমান্ডার যতই সালাউদ্দিন হোক, আসল ব্রেন হল এই মজিদ দার। গোটা ইন্টেলিজেন্স সেটা জানে। তিনি বললেন, হ্যাঁ। চিনি। কেন কী হয়েছে? এবার যেন ঘরে বাজ পড়ল। সকলেই স্তব্ধ। কারণ ছেলেটি বলছে, আবদুল মজিদ দার ইন্ডিয়ায় ফিরতে চাইছে স্যার। আপনারা কি হেল্প করবেন? একটা প্ল্যান আছে! প্ল্যান? কী প্ল্যান। দার ইন্ডিয়ায় নিজে থেকেই ফিরতে চায়? এটা তো খুব অদ্ভুত কথা। আইবি অফিসার শুনলেন গোটা প্ল্যান। তিনি বিস্ফারিত চোখে তাকিয়ে রইলেন প্রথমে ২৩ বছরের ওই বাচ্চা ছেলেটির দিকে। ছেলেটির চোখে ভয় আর শঙ্কা। কারণ প্ল্যান শুনে এই অফিসার কী সিদ্ধান্ত নেবেন তার উপর অনেক কিছু ডিপেন্ড করছে। ধুলত চোখ কুঁচকে ভাবছেন। এবং তারপর বললেন, ডান! ইটস আ ডিল! বোঝা গেল এই ছেলেদুটি ইচ্ছা করেই ধরা দিয়েছে। এই প্ল্যান জানানোর জন্য। সেদিন রাতেই রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালিসিস চিফ ফোন করলেন ভারতের হোম মিনিস্টারকে। বললেন প্ল্যানের কথা। সেই হোম মিনিস্টার বললেন, গো অ্যাহেড! বাট ডোন্ট ফরগেট টু কিপ ওয়াচ অন হিম! হোম মিনিস্টারের নাম লালকৃষ্ণ আদবানি!
স্যার আমি ইন্ডিয়া ফিরতে চাই। পাকিস্তানের দখলে থাকা কাশ্মীরের মুজফফরবাদের এক দোতলা বিল্ডিং। সেখানে যে ঘরে বসে কথা বলছে আবদুল মজিদ দার, সেটা এক বিরাট হলঘর। দুদিকে সার দেওয়া চেয়ার। পাকিস্তানের ফ্ল্যাগ লাগানো ক্যাবিনেট টেবল। কায়েদ এ আজমের পোর্ট্রেট দেওয়ালে একটু বেঁকে গিয়েছে। সেদিকে তাকিয়ে আছে দার। কথাটা বলে সে অপেক্ষা করছে প্রতিক্রিয়ার। সামনে যিনি বসে আছেন তার নাম ব্রিগেডিয়ার রিয়াজ! পাকিস্তানের গুপ্তচর সংস্থা আইএসআই এর হ্যান্ডলার। তিনি বললেন, ইন্ডিয়া ফিরে যাবে? কেন? আবদুল বলল, স্যার আমার একটা প্ল্যান আছে। কী প্ল্যান? রিয়াজ জানতে আগ্রহী। এতটা রিস্ক নিয়ে লোকটা ফিরতে চায় কেন? মজিদ বলল, আমি আমার নেটওয়ার্ক দিয়ে প্রো ডায়লগ গ্রুপে ঢুকে যাব। ইন্ডিয়াকে আলোচনার টেবিলে আনার জন্য রাজি করাব। আলোচনা শুরু হবে। কিন্তু আমরা আড়ালে আমাদের কাজ চালিয়ে যাব। মানে? রিয়াজ একটু সামনে ঝুঁকে এলেন উত্তেজনায়৷ তিনি জানতে চান প্ল্যানটা। আবদুল বলছে, একদিকে আমরা আলোচনায় রাজি পাকিস্তান—এরকম মেসেজ দেব। আবার সেই আলোচনার টেবিলে ইন্ডিয়াকে টেনে এনে কাশ্মীর আর কাশ্মীরের বাইরেও হামলা চালাব। তাহলে ইন্ডিয়া আরও দিশাহারা হয়ে যাবে। রিয়াজ চমৎকৃত। এটা দারুণ প্ল্যান। তবে তিনি বেশি উচ্ছ্বাস দেখালেন না। বললেন, আচ্ছা আমি একটু ওপর তলায় কথা বলি। তোমায় কাল জানাব। কাল আবার এসো। রিয়াজ এই সময়টা চেয়ে নিলেন আসলে আড়ালে সালাউদ্দিনের মতামত নেওয়ার জন্য। কারণ সালাউদ্দিনের সঙ্গে আদতে মজিদের সম্পর্ক খুব ভালো নয়। সালাউদ্দিন এক নম্বর হলেও, মজিদকেই এই গ্রুপের সবাই মান্য করে বেশি। আর আইএসআই জানে মজিদের বুদ্ধি, প্ল্যানিং, রিক্রুটমেন্ট ক্ষমতা অনেক শার্প। সুতরাং তা নিয়ে চাপা ঈর্ষা আছে সালাউদ্দিনের। তাই মজিদ দারের কোনো অন্য মতলব আছে কিনা তা জেনে নেওয়া দরকার।
কারণ সালাউদ্দিন আইএসআইয়ের ঘরের ছেলে। তার ক্ষমতাই নেই নিজের মতো করে ভাবার। মজিদের আছে। যারা নিজের মতো করে ভাবতে পারে, তারা যেমন কার্যকর হয়, তেমন আবার বিপজ্জনকও। ব্রিগেডিয়ার রিয়াজ সালাউদ্দিনকে প্ল্যানের কথা জানানোয় সালাউদ্দিন জানাল তাকে আগেই বলেছে মজিদ। সে নিজের গ্রুপেও গোপনে কথা বলেছে। কোনো আশঙ্কা নেই। এই প্ল্যান ভালোই হবে। সুতরাং রাজি ব্রিগেডিয়ার। কারণ আবদুল মজিদ দার ভারতে ফিরছে কাশ্মীর সমস্যা নিয়ে আলোচনার অ্যাজেন্ডায় ভারতকে রাজি করাতে। কাশ্মীরে দুটি অংশ আছে। একটি অংশ চায় কোনো মধ্যপন্থা নয়। সোজাসুজি জিহাদ। ভারত থেকে বেরিয়ে যেতে হবে। আর একটি অংশ চায় ভারত পাকিস্তানকে আলোচনার টেবিলে বসাতে। আবার একটি অংশ চায় ভারতে থেকেই কাশ্মীরের নিজস্ব আরও অধিকার প্রাপ্তি। সুতরাং ওই আলোচনায় যে গোষ্ঠীগুলো রাজি তাদের মধ্যে ঢুকবে আবদুল মজিদ দার। সে পরিচিত নাম। যে সে নয়। হিজবুল মুজাহিদিনের ডেপুটি কমান্ডার। সুতরাং সে যদি অস্ত্র ছেড়ে আলোচনায় বসতে চায় তাহলে ইন্ডিয়া অবশ্যই রাজি হবে। কিন্তু আসলে সে হয়ে থাকবে পাকিস্তানের চর। আইএসআই এজেন্ট। যে সমস্ত আলোচনার প্রাক-প্রস্তুতি আর ইন্ডিয়ার প্ল্যান গোপনে পাকিস্তানকে জানাতে থাকবে। একইসঙ্গে চলবে জঙ্গি হামলা।
২৪ জুলাই ২০০০। মজিদ দার শ্রীনগরে প্রবেশ করল। এবং তার আগেই সে ঘোষণা করেছে একতরফা সিজফায়ার। অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি। ভারত সরকার তৎক্ষণাৎ স্বাগত জানাল। স্থির হল ভারত সরকারের সঙ্গে প্রথম বৈঠক হবে এই সন্ত্রাস ছেড়ে আসা গোষ্ঠীদের সঙ্গে। তারা কী চায়? জানতে চাওয়া হবে। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রসচিব কমল পাণ্ডে একঝাঁক অফিসারকে সঙ্গে নিয়ে ৩ আগস্ট শ্রীনগর এলেন। নেহরু গেস্ট হাউসে প্রথম মিটিং। সঙ্গে হামিদ তান্ত্রে আর ফারুখ মির্জা। সন্ত্রাস ছেড়ে আসা মজিদ দারের হয়ে মধ্যস্থতাকারী হলেন ফজল হক কুরেশি। আলোচনা শুরু হল। পরের মিটিং ৮ আগস্ট। কী কী কথা হচ্ছে? জানতে চায় পাকিস্তান। আইএসআই মেসেজ পাঠাচ্ছে নানাভাবে আবদুলের কাছে। আবদুল জানাচ্ছে, আর একটু কথা এগোক। জানাচ্ছি। এরপর সেপ্টেম্বর। আইএসআইকে এবার নিজেই জানাল মজিদ দার। আলোচনার গতিপথ কোনদিকে এগোচ্ছে। এরপর আশা করা যায় একটা সম্মেলন ডাকা হবে। কারা থাকবে সেখানে? তাও জানাল মজিদ। হয়তো সেই সম্মেলনে আফগানিস্তান অংশ নেবে। আজ মার্কিন বিদেশসচিব আসতে পারেন। আইএসআইয়ের কাছে জানতে চাইলো এবার মজিদ। আমাদের নেক্সট মিশন কী? আইএসআই বলল, আমরা কুপওয়ারা আর অনন্তনাগে একসঙ্গে একটা অ্যাটাক করব। টিম পাঠাচ্ছি। ওদের কোথায় রাখা যায়? তুমি একটু দেখে নিও। ঠিক পাঁচদিন পর সেই টিম ধরা পড়ে গেল। মধ্যরাতের এক অপারেশন ভারতের সেনাবাহিনীর একটি কাউন্টার ইনটেলিজেন্স টিম হানা দিয়ে সকলকে ধরে ফেলল। তারা জানাল আইএসআই পাঠিয়েছে তাদের। সালাউদ্দিনের টিম। কীভাবে লিক হয়ে গেল খবর? আইএসআই হেডকোয়ার্টারে রাগের আগুন ছড়িয়ে পড়ছে। একটি নয়, পরপর তিন বার তিনটি মিশন ফেল করল। অথচ আলোচনার টেবিলে সন্ত্রাসবাদীদের নিয়ে এসে ইন্ডিয়া দেখাতে সক্ষম হচ্ছে তারা জঙ্গিদের আলোচনায় নিয়ে এসে কাশ্মীরে শান্তি ফেরাতে সফল। কেউ একজন বেইমানি করছে? কে? আইএসআইয়ের জানতে জানতে প্রায় পাঁচ মাস কেটে গেল যে আদতে এই গোটা খেলায় একজন ডাবল এজেন্ট রয়েছে।
তার নাম আবদুল মজিদ দার। তার গ্রুপের ছেলেরা যখন ভারতের আইবি অফিসারকে বলেছিল মজিদ দার ফিরবে বলছে। আপনারা হেল্প করুন। আইবি এবং রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালিসিস (RAW) গুপ্তচররা স্পষ্ট বলেছিলেন, একটাই পথ খোলা। আমরা সবরকমভাবে ওকে হেল্প করব। আলোচনার টেবিলে আনব। শুধু আমাদের হয়ে ওকে কাজ করতে হবে। আইএসআইয়ের প্ল্যান আমাদের জানাতে হবে। তুমি পাকিস্তানের এজেন্ট হয়ে থাকো। কিন্তু আসলে তুমি ইন্ডিয়ার স্পাই এজেন্ট। আমাদের মিটিংয়ের খবর ওদের দেবে। তার পর ওরা কী প্ল্যান করছে তা আমাদের জানিয়ে দেবে। রাজি? আবদুল রাজি! আর এই গোটা প্ল্যানের কারিগর কে? ডক্টর শামিমা বদরু! সবটা সে একা ছক কষেছে। ভারতের গুপ্তচরবাহিনীর হয়ে কাজ করতে করতেই আবদুল মজিদ দার কাশ্মীর সমস্যা নিয়ে আলোচনার রাস্তা খুলে দেওয়ার অন্যতম ভূমিকা নিলে তার মূলস্রোতে ঢুকে যাওয়া সহজ হবে। গ্রেপ্তার হতে হবে না। আবার আইএসআইয়ের কাছে যদি সম্পূর্ণ গুরুত্বহীন কিছু মিটিংয়ের খবর পৌঁছে দিয়ে তাদের গুডবুকে থাকা যায় তাহলে তাদের আস্থাভাজনও থাকা সম্ভব হবে। এই ছিল প্ল্যান। যা সম্পূর্ণ সফল! কিন্তু খবর পেতে দেরি হয়নি আইএসআইয়ের। তারা জেনে গেল ডাবল এজেন্ট কে? তারপর?
ডক্টর শামিমা বদরু রোগী দেখছিলেন। আজ খুব লম্বা লাইন। ২৩ মার্চ। ২০০৩। আবদুল আজ মা আর বোনকে দেখতে গিয়েছে। সোপরে। নিজেদের বাড়ি ফিরতে দেরি হবে। তাই তাড়া নেই। একটা পেশেন্টের অবস্থা ভালো নয়। হাসপাতালে পাঠানোর ব্যবস্থা করছে শামিমা। সন্ধ্যা হয়েছে। মনোরম হাওয়া। ঠিক তখন অনেক দূরের সোপর শহরেও সন্ধ্যা নেমেছে। আবদুল মজিদ মায়ের সঙ্গে দেখা করে খেয়েও নিল। রাত হবে ফিরতে। মা আর বোন বেরিয়ে এসেছে। মাকে তাহলে আগামী রবিবার নিয়ে আসিস। একবার চেকআপ করাতে হবে। এখানে ওসব হবে না। বোনকে বলল, মজিদ দার। ঠিক তখনই সামনে এসে দাঁড়াচ্ছে একটা মোটরবাইক। দুটি যুবক। দাঁড়িয়েছে। তবে স্টার্ট বন্ধ হচ্ছে না। ছেলেদুটি নামছেও না। সালাম আলাইকুম মজিদ ভাই…চিৎকার করে উঠল তারা। মজিদকে সবাই চেনে। সে অবশ্য সবাইকে চেনে না। তাই হেসে হাতটা তুলে বলল আলাইকুম আসসলাম। কে? আবার শব্দ শোনা গেল, আমরা ভাই… আমরা কারা? মজিদ এগিয়ে যাচ্ছে। দু’কদম এগোতেই উপর্যুপরি গুলি। থামছে না। মজিদ দার মাটিতে পড়ে গিয়েছে। বাইকে বসে গুলি চালাচ্ছে ছেলেদুটি। তারপর স্পিড তুলল। চলে গেল। আবদুলের মা মাটিতে পড়ে। বোন বসে পড়েছে। সকলের পেটে বুকে, মুখে গুলি লেগেছে। আবদুল মজিদ দারকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার সময় পাওয়া যায়নি। মারা গিয়েছে সে। ওখানেই।
২০০৬ সালের নভেম্বর। ডক্টর শামিমা বদরু অত্যন্ত ক্লান্ত। আজ সারাদিন তাঁর কেটেছে তিনটে স্কুলে। মৃত স্বামীর নামে তাঁর একটি এনজিও আছে। গরিব বাচ্চাদের বইখাতা দেওয়া, পড়ানোর খরচ, জামাকাপড় ইত্যাদি বিতরণ করে ওই এনজিও। তারই কাজ ছিল। বেশি লোকজন তো নেই। একাই প্রায় সব কাজ করতে হয়। বয়সও তো হচ্ছে। আর স্বামী চলে যাওয়ার পর কেমন যেন একটা নির্লিপ্তি এসেছে তাঁর। কারও সঙ্গেই বিশেষ কথা হয় না। শামিমা বদরু আজ কিছু খাবেন না। ভালোই লাগছে না। রাত পৌনে আটটা। ডোরবেল বাজছে। এখন আবার কে? কাজের একটি মেয়ে আছে সর্বক্ষণের। তাকে বললেন, দরজাটা খুলে দ্যাখ তো কে ? দুমিনিট পর একটা আর্ত চিৎকার পাওয়া গেল। কী হল! ডক্টর শামিমা বেরিয়ে এসে দেখলেন বাচ্চা মেয়েটি মেঝের এক প্রান্তে বসে আছে। মুখে হাত দিয়ে। চারজন ছেলে দাঁড়িয়ে। তারা কোনো কথা বলল না অবশ্য। শুধু গুলি চালাল। ডক্টর শামিমা বদরু একা একা শ্রীনগরের চানপোরায় লালনগরের বাগ এ ইসলাম অঞ্চলে নিজের বাড়িতে রক্তাপ্লুত হয়ে ধীরে ধীরে গেলেন মৃত্যুর দিকে।
সেখান থেকে অনেক অনেক দূরে কাশ্মীরের নিয়ন্ত্রণরেখা পেরিয়ে মুজফফরাবাদের এক দোতলা বিল্ডিংয়ে সেই বিরাট বড় হলঘরে ক্যাবিনেট টেবলে বসে থাকা ব্রিগেডিয়ার রিয়াজের ফোন বাজল। ফোন কানে নিয়ে তিনি শুনলেন হ্যাঁ, শামিমা খতম। তিন বছর আগে খতম হয়েছিল আবদুল মজিদ দার। হাসলেন ব্রিগেডিয়ার রিয়াজ। কুটিল হাসি। ভাবলেন ইন্ডিয়ান কাশ্মীরি মিলিট্যান্টদের শিক্ষা হওয়া দরকার। বুঝুক বেইমানি করলে কী সাজা হয়। এটাই হল আইএসআইয়ের বদলা! আজও কাশ্মীরে যারা পাকিস্তানের হাতে পুতুল হয়ে সন্ত্রাসে নাম লেখাচ্ছে তাদের কি এই শিক্ষাটির কথা মনে আছে? সামান্য বেচাল দেখলেই তাদেরও যে হাল এরকম হতে পারে সেটা তারা জানে তো?
