ওরলির কার্নিভাল। আন্ধেরির দীপা। গ্র্যান্ট রোডের টোপাজ। এই তিনটি ডান্স বারের ভিড়। কখনও কমেনি। নিয়ম হল একটি থাকবে কমন ডান্স ফ্লোর। সাধারণ কাস্টমারের জন্য। একটি ডান্স এনক্লোজার থাকবে ফ্লোরের সামনেই। পার্টিরা প্রচুর অর্থ খরচ করবে একটি করে গান আর একটি নাচের ঠিক পরই। আর এসবের আড়ালে রয়েছে একটি প্রাইভেট চেম্বার। ডান্স বারের পিছনের দিকে। সেখানে যাওয়ার ক্ষমতা সকলের নেই। কারণ অফুরন্ত অর্থ আর প্রবল প্রভাব না থাকলে দক্ষিণ মুম্বইয়ের ডান্সবার গুলোর এই গোপন এলাকাটিতে প্রবেশ নিষিদ্ধ। আপাতত দীপা ডান্স বারের একটি প্রান্তের টেবিলে বসে আছেন এক ব্যক্তি। মুম্বই ক্রাইম ব্রাঞ্চের ডেপুটি কমিশনার প্রদীপ সাওয়ান্তকে দেখে একঝলক মনে হবে মারাঠি সিনেমার হিরো। গ্রে রঙের সাফারি। আর এই আলো আঁধারি ডান্স ফ্লোরের আবহে চোখে একটা সানগ্লাস। ৩১ ডিসেম্বর ২০০১। দুজন নর্তকী ডান্স ফ্লোরে। তাঁদের নাম কাজল আর রানি। আসল নাম নয়। অবিকল কাজল আর রানি মুখার্জির মতো দেখতে। তাই এই নাম। প্রদীপ সাওয়ান্ত ছাড়া আর মাত্র একজন ব্যক্তি বসে আছেন সেই প্রাইভেট এনক্লোজারে। যে গানের সঙ্গে ডান্স চলছিল সেটি হল কোই মিল গয়া…। ঠিক মাঝপথে আচমকা দরজা ঠেলে ঢুকলেন, সাদা শার্ট আর ক্রিম রঙের ট্রাউজার্স পরা সাধারণ চেহারার সামান্য বেঁটে একজন লোক। পাশে আর একজন। যার হাতে দুটি ভারী ব্যাগ। এমন ব্যাগ, যেটায় বাজারও করা যায় বাড়ি ফেরার পথে। লোকটির মুখে বোকা বোকা হাসি। একটু যেন টেনশনে। এরকম প্রাইভেট চেম্বারে সচরাচর বিগ পার্টি আসে। এর চেহারা, আচরণ আর ভাবভঙ্গি কেমন যেন নার্ভাস। অথচ তাঁর আশেপাশে হাত কচলাচ্ছে ডান্স বারের ম্যানেজার। দুপাশে দুই বাউন্সার রীতিমতো গার্ড করছে। আর তাঁর টেবল ধার্য হল একেবারে ফ্লোরের সামনে। মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই কাজল আর রানি মুখার্জির সঙ্গে যোগ দিলেন মনীষা আর ঐশ্বর্য। অর্থাৎ মনীষা আর ঐশ্বর্যের মতো দেখতে আরও দুজন ডান্সগার্ল। এবার চারজন। ওই লোকটির শাগরেদ সঙ্গে আনা ব্যাগের চেন খুলে পাশে ধরে দাঁড়িয়ে রইল। তারপর যেটা ঘটল সেটি প্রদীপ সাওয়ান্তের মতো তুখড় পুলিশ অফিসারকে স্তব্ধ করে দিয়েছিল। কেন? কী হল?
জানার আগে একটু জেনে নিতে হবে কে এই প্রদীপ সাওয়ান্ত। প্রদীপ সাওয়ান্তের বাবা মূলচন্দ্র সাওয়ান্ত কাজ করতেন মুম্বই ক্রাইম ব্রাঞ্চে। কলেজ থেকে মাঝেমধ্যেই প্রদীপ বাবার অফিসে চলে আসতেন একসময়। বাবার সঙ্গে দেখা করা অজুহাত। আসলে দেখতে আসতেন ফতে সিং গায়কোয়াড়কে। মুম্বই পুলিশের এক হিরো পুলিশ অফিসার। ফতে সিং-এর গোঁফ ছিল পুরুষালি। আর চেহারাও তেমন। সেটা দেখে আর তাঁর সঙ্গে কথা বলে প্রদীপ জীবনের লক্ষ্য স্থির করেছিলেন পুলিশ অফিসার হতে হবে। এই ফতে সিং-এর মতো। মুম্বইয়ের মাতুঙ্গার রুইয়া কলেজ থেকে পাশ করার পর প্রদীপ সম্পূর্ণ নিজেকে সঁপে দিয়েছিলেন এমপিএসসি পরীক্ষার জন্য। মহারাষ্ট্র পুলিশ সার্ভিস কমিশন। এবং ১৯৮৬ সালের ব্যাচে প্রদীপ ছিলেন টপার। লম্বা। ফর্সা। হ্যান্ডসাম। বহুদিন মহারাষ্ট্রের বিভিন্ন শহরে ডিউটি করার পর ১৯৯৭ সালে প্রদীপ সাওয়ান্তের পোস্টিং হয়েছিল মুম্বই শহরের বাইকুল্লা ডিভিশনে। অ্যাসিস্ট্যান্ট কমিশনার অফ পুলিশ। বাইকুল্লা ডিভিশনে তখন সবথেকে বেশি যে ক্রাইম হচ্ছে সেটি হল জুয়েলারির দোকানে ডাকাতি। একের পর এক। দ্বিতীয় অশান্তি অরুণ গাওলি বনাম অশ্বিন নায়েক গ্যাং ওয়ার। ঠিক মাঝখানে এসে পড়েছেন প্রদীপ। এবং সাওয়ান্ত দুটি অসাধ্য করলেন। দুটি গ্রেপ্তার। অশ্বিন নায়েকের শার্প শুটার সন্দীপ ডিচোলকর আর ছোটা রাজনের গ্যাংস্টার বেঙ্কটেশ বাগ্গা। যে বেঙ্কটেশ ক্রাইমের পরে কালীপুজো করে নিজের রক্ত খায়। এই দুজনকে গ্রেপ্তার করে রীতিমতো ত্রাহি ত্রাহি রব তুলে দিলেন প্রদীপ সাওয়ান্ত। গোটা মুম্বই পুলিশ তাঁকে সমীহের চোখে দেখা শুরু করল। দ্রুত পদোন্নতি হল সাওয়ান্তের। এবার এসিপি ক্রাইম ব্রাঞ্চ। সাওয়ান্ত হয়ে উঠলেন অপ্রতিরোধ্য। কারণ তাঁর অস্ত্রাগারে রয়েছে তিনটি সাংঘাতিক মারণাস্ত্র। অপরাধী মোকাবিলায়। প্রদীপ শৰ্মা, প্রফুল্ল ভোঁসলে আর বিজয় সালাসকার। মুম্বইয়ের সর্বকালের সেরা তিন এনকাউন্টার স্পেশালিস্ট। দাউদ ইব্রাহিম, ছোটা রাজন, অরুণ গাউলি, অশ্বিন নায়েক—যে কোনো মাফিয়া ডনের শার্প শুটার আর সুপারি কিলারদের মধ্যে অনেককে এই তিনজন ফিনিশ করেছেন। সাওয়ান্ত টিম এতটাই জনপ্রিয় ছিল যে আমির খান নাসিরউদ্দিন খানের ‘সরফরোশ’ সিনেমায় আমির খানের চরিত্রের আদলটি ছিল প্রদীপ সাওয়ান্তের ধাঁচে। এবং তাঁর কোড নেম এরপর থেকে হয়ে যায় ‘রাঠোর’! মহারাষ্ট্র পুলিশের মধ্যে যখন কোনো গোপন ফোনবার্তা অথবা ইনফরমার মারফত বার্তা বিনিময়ের সময় তাঁর নাম রেফারেন্স হিসাবে ব্যবহার করা হবে, তখন সরাসরি নাম নয়, বলতে হবে ‘রাঠোর স্যার’। অর্থাৎ ‘সরফরোশে’ সেই আমির খানের চরিত্রের নামটি। প্রদীপ সাওয়ান্ত ততদিনে মেগা সাফল্য পেয়েছেন বলিউড আর আন্ডারওয়ার্ল্ডের এক অপ্রত্যাশিত চমকপ্রদ কানেকশন ধরে ফেলে। করাচির ছোটা শাকিলের সঙ্গে সংযোগ ছিল ভরত শাহের। কে ভরত শাহ? বম্বে ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির অন্যতম সেরা প্রযোজক। যশ চোপড়ার ‘ডর’ শুরু করে সঞ্জয় লীলা বনসালির ‘দেবদাসে’র প্রযোজক। আর ঠিক এই ঘটনাপরম্পরার মধ্যেই একটি ছোট ঘটনা ঘটল পুণের কাছে। যা পরে গোটা ভারতকে কাঁপিয়ে দিয়েছিল বিস্ময়ে। ৭ জুন ২০০২। সকাল থেকে প্রবল জ্যাম। মারাত্মক গরম পড়েছে। সেই প্রবল ষানজটের মধ্যেই আচমকা পুণের বান্দ গার্ডেন পুলিশ স্টেশনের টহলদারি অফিসার আর কনস্টেবলরা একটি ইন্ডিকা আটকালেন পুণে রেলওয়ে স্টেশন সংলগ্ন বাসস্ট্যান্ডে। চালক ছাড়া ইন্ডিকায় রয়েছে তিনজন যাত্রী। তিনজনই বেরিয়ে এলেন। ইন্ডিকার মধ্যে বড়বড় ব্যাগ। লেদারের।
কী আছে?
চালক বললেন, স্ট্যাম্প পেপার স্যার!
প্রশ্ন : কোথায় যাচ্ছে?
উত্তর : ব্যাঙ্গালোর
প্রশ্ন : পেপার দেখি?
না পেপার দেখে সন্দেহ মিটছে না। কত টাকা মূল্যের স্ট্যাম্প পেপার ধরা পড়ল? বেশি না। ২ লক্ষ ৯৮ হাজার ৬৯৪ টাকার। কিন্তু এই তিন যাত্রীকে জেরা করে এরপর মাত্র সাত থেকে ১০ দিনের মধ্যে পুণে, ভিওয়ান্ডি, মুম্বই আর বাঙ্গালোরে বাছাই করা কিছু বাড়িতে আর স্টোরে অভিযান চালিয়ে আটক করা হল এরকম অসংখ্য বান্ডিল করা স্ট্যাম্প পেপার। কত টাকা মূল্যের? মাথা ঘুরে যাবে শুনলে। ২১০০ কোটি টাকার! এবং সব স্ট্যাম্প পেপার জাল! ভারতবর্ষের অন্যতম বড় দুর্নীতি ফাঁসের প্রথম ধাপটি এভাবে শুরু হয়ে গেল পুণের রেলস্টেশন লাগোয়া বাস স্ট্যান্ডে একটি ইন্ডিকা গাড়িকে আটকের মাধ্যমে। তদন্তে যুক্ত হয়ে গেল মুম্বই ক্রাইম ব্রাঞ্চ। আর সেই তদন্তের সূত্রেই ডিটেকশন বিভাগের জয়েন্ট কমিশনার অফ পুলিশ প্রদীপ সাওয়ান্ত একটি বিশেষ সোর্সে খবর পেয়ে সেদিন একটি লোককে দেখতে এসেছিলেন। যে কবে কোথায় থাকবে কেউ জানে না। কিন্তু নিউ ইয়ার্স ইভে নিজের প্রিয় ৬ জন ডান্স গার্লের নাচ দেখে তাঁদের সঙ্গে সময় কাটিয়ে অন্তত যাবেই সেই লোক। এমনকী দিল্লিতে থাকলেও শুধু এই ডান্স দেখতে লোকটি দুপুরের ফ্লাইটে এসে আবার রাতে ফিরে গিয়েছে এমনও হয়েছে। এই তাহলে সেই লোক? এরকম একেবারে সাদামাটা দেখতে? রানি, কাজল, মনীষা, ঐশ্বর্যর একটি করে নাচ শেষ হচ্ছে, আর পাশে দাঁড়ানো শাগরেদের হাতেধরা ব্যাগে না দেখেই হাত ঢোকাচ্ছে লোকটি। হাতের মুঠোয় যা উঠে আসছে সেটাই উড়িয়ে দিচ্ছে ডান্স ফ্লোরে। এসব সময় সাধারণত মুখের ভাষা অশালীন হয়ে যায় অনেক ক্লায়েন্টের। লোকটি সেরকম নয়। মাঝে মধ্যে শুধু বলছে, আজ বহোত চমক রেহি হো …আজ কেয়া বিজলি গিরা রহি হো…মাশাল্লা ইতনা ভি নয়নো কে তিরসে কতল মাত করো রানি…। ব্যস! গোটা ডান্স ফ্লোরে আর যে দু-এক জন ক্লায়েন্ট এসেছিল, তারা আস্তে আস্তে বিরক্ত হয়ে ঘর ছেড়ে চলে গেল। কারণ কোনো ডান্সার তাদের দিকে কেয়ারই করছে না। অথচ তাদের কাছেও টাকা আছে। তারাও নিয়ম করে আসে। কিন্তু এই আনইমপ্রেসিভ লোকটাই যেন সম্রাট। প্রদীপ সাওয়ান্ত সেদিন একটু পরই সকলের অলক্ষে ফ্লোর ছেড়ে চলে যান। এবং ঠিক পরদিন দীপা বারে এসে পরিচয় দিয়ে সেই রানিকে জেরা করে জানতে পারেন, সেদিন তারা চারজনে মিলে ৩৫ লক্ষ টাকা পেয়েছিলেন ওই লোকটির থেকে। কিন্তু তারা জানে যে তারা ওই মানুষটির প্রকৃত দিলদার নয়। আসল ভালোবাসার নর্তকী থাকেন টোপাজ বারে। সেদিন সেই রাতে ওই লোকটি তাদের সঙ্গে সময় কাটিয়ে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ৩৫ লক্ষ টাকা বাতাসে উড়িয়ে দিয়ে টোপাজ বারেই চলে যায়। এককভাবে একজনের নাচ দেখতে। সেই বিশেষ নতর্কীর নাম মাধুরী। কেন এই নাম এতক্ষণে তো বোঝাই যাচ্ছে। ওই টোপাজের বারডান্সার মাধুরী দীক্ষিতের মতো দেখতে। প্রদীপ সাওয়ান্ত সেই মাধুরীর কাছে গিয়ে তাঁর জন্য পাগল হওয়া মানুষটির সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে জানতে চাইলেন সেদিন কত টাকা বখশিস দিয়েছিলেন তোমার সেই প্রিয় লোকটি? মাধুরী লজ্জিত কণ্ঠে বলেছিল, স্যার পুরোটা গোনা হয়নি। তবে ৯৩-৯৪ লক্ষ টাকা হবে বোধহয়। এক কোটি হয়নি এটা জানি! প্রদীপ সাওয়ান্তের সঙ্গে আসা মুম্বই পুলিশের ক্রাইম ব্রাঞ্চের অন্য অফিসাররা রীতিমতো বিস্ময়ে অবিশ্বাস্য চোখে মাধুরীর দিকে কিছুক্ষণ চেয়ে ছিলেন। কী নাম সেই লোকটির? সেই লোকটি হল আবদুল করিম লাডসাব তেলগি। যার হাত ধরে ভারত বিখ্যাত হয়েছিল তেলগি স্ট্যাম্প পেপার স্ক্যাম। সব দুর্নীতিকে ছাপিয়ে যাওয়া এই অপরাধ। কারণ এই একটি মাত্র মানুষ একা দেখিয়ে দিয়েছিল রাজনীতিবিদ থেকে পুলিশ কর্তা, একসঙ্গে চারটি রাজ্যের সরকারকে স্রেফ টাকা দিয়ে প্রায় কিনে নেওয়া যায়। এবং এই একটি মাত্র লোকের জন্য একটি রাজ্যের একাধিক মন্ত্রীকে পদত্যাগ করতে হয়েছে। খোদ মুম্বইয়ের পুলিশ কমিশনারকে পর্যন্ত গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। একঝাঁক পুলিশ কর্তা আর পুলিশ কর্মী, প্রশাসনিক অফিসার গ্রেপ্তার হয়ে যায়। তেলগির চক্রের একজন করে অপারেটর হিসাবে। কত টাকার জাল স্ট্যাম্প পেপার চক্রের সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছিল এই আবদুল করিম তেলগি? ২০ হাজার কোটি টাকা!!
রেলের চতুর্থ শ্রেণির কর্মী লাডসাব তেলগি কর্ণাটকের বেলগাঁও-এর খানপুর রেলস্টেশনে কাজ করতেন। সামান্য বেতন। কিন্তু পরিবারটির অবস্থা এক ধাক্কায় প্রায় রাস্তায় এসে দাঁড়ানোর মতো হল, যখন ১৯৬১ সালে আবদুল করিম তেলগির জন্মের কিছুদিনের মধ্যে বাবা লাডসাবের মৃত্যু হল। কারণ ডায়াবেটিস। তিন সন্তান নিয়ে শরিফা বিবি বিপদে পড়লেও হাল ছাড়লেন না। খানপুরের কাছেই একটি জঙ্গল ছিল। সেই জঙ্গলের মধ্যে প্রচুর ফলের গাছ। গরিব মানুষগুলো সেই অরণ্যে গিয়ে নিজেদের জন্য এবং বিক্রি করার জন্য নানাবিধ ফলমূল নিয়ে কোনোমতে সংসার চালাত। শরিফা বিবি তিন সন্তানকে নিয়ে রোজ ভোরে সেই জঙ্গলে অন্যরা আসার আগেই ঢুকে যেতেন। আর সবেদা, আতা, পেয়ারা জোগাড় করে চলে আসতেন স্টেশনে। সর্বসাকুল্যে খানপুরে ১২টি ট্রেন যাতায়াত করত তখন। সেই ট্রেনের যাত্রীদের কাছে এই ফল বিক্রি করে কখনও একবেলা, কখনও দুবেলার খাবার জোগাড় করতেন শরিফা বিবি। তাই বলে ছেলেদের পড়াশোনা বন্ধ করে নয়। আবদুল করিম, আবদুল রহিম আর আবদুল আজিম সর্বোদয় বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিল। এভাবেই তো কেটে যাওয়ার কথা একটি প্রত্যন্ত মফস্সল এলাকার দরিদ্র পরিবারের। কিন্তু তা হল না। গোগেট কলেজ থেকে কমার্স গ্র্যাজুয়েট হয়ে প্রথমেই সবাইকে চমকে দিয়েছিল আবদুল করিম। আর তারপরই সে জোগাড় করে ফেলল একটি চাকরি। সেলস এক্সিকিউটিভ। কোম্পানির নাম ফিলিক্স ইন্ডিয়া। কিন্তু এসব ছোটখাটো কাজ তার জন্য নয়। ধাক্কা খেতে খেতে কল্যাণ বা ভীরার থেকে রোজ ট্রেনে এসে শহরে সারাদিন ঘুরে সামান্য দেড়শো টাকা কমিশন আর আড়াই হাজার টাকার বেতন দিয়ে চলে নাকি? আবদুল করিম নিজের মহল্লায় দেখতে পাচ্ছিল সৌদি আরবে যাওয়ার যেন ঢল নেমেছে। সবাই সৌদি আরবে লেবার পাঠায়। আর প্রচুর লাভ করে। করিম মুম্বইয়ের চার্চ গেট স্টেশনের বাইরে নিউ মেরিন লাইনস এলাকায় একটি ছোট্ট দোকান ভাড়া করে ট্রাভেল এজেন্সির ব্যবসা শুরু করল। অ্যারাবিয়ান মেট্রো ট্র্যাভেলস। এই ব্যবসা দুভাবে করা যায়। সততার সঙ্গে সবরকম কাগজপত্র ঠিক রেখে। তাতে মুনাফা কম। আর একটি পন্থা হল ইমিগ্রেশন কাগজপত্র জাল করে অনেক বেশি করে অবৈধভাবে লেবার সাপ্লাই করে বিপুল লাভ করা। প্রত্যাশিতভাবেই আবদুল করিম এই দ্বিতীয় পন্থাই বেছে নেবে। কারণ সিঁড়ি নয়, উপরে ওঠার জন্য তার পছন্দ লিফট। দ্রুত আকাশ স্পর্শ করার স্বপ্ন। আর তাই যা হওয়ার তাই হল। একদিন এমআরএ পুলিশ স্টেশনের পুলিশ এসে তাকে দোকান থেকে তুলে নিয়ে গেল। কারণ তার বিরুদ্ধে ইমিগ্রেশন জালের অভিযোগে এফআইআর হয়েছে থানায়। তিন মাসের জেল। এবং আসলে জেল নয়। সেটাই হল আবদুল করিমের সেরা উপহার। আলিবাবার গুহার দরজা খুলে গেল তার জেলের সহবন্দির মাধ্যমে। সেই লোকটির নাম রতন সোনি। তাকে আবদুল করিম জানতে চেয়েছিল, কীসের জন্য জেল হয়েছে তোমার? রতন সোনি হেসে উত্তর দিয়েছিল, টাকা ছাপার অপরাধে। চমকে উঠল আবদুল। টাকা ছাপা যায়? কোথায় পাওয়া যায় এই মেশিন? রতন বলেছিল, আরে ইয়ার, আভি তো বাস শুরু কিয়ে হো তুম। ইতনি জলদি কেয়া হ্যায়। একটা কথা শোন, যদি ক্রাইম করতেই হয়, খুচরো পয়সার জন্য করবি না, কোটি টাকার জন্য করবি।
রতন সোনি ভালো করে শান্তভাবে জেনে নিয়েছিল আবদুল করিমের অপরাধের কাহিনি। জানা গেল আবদুলের বিরুদ্ধে একটি অপরাধ ছিল ৩১২টি লেবারকে সে আরবে পাঠিয়েছিল জাল স্ট্যাম্প পেপার দিয়ে। কোথা থেকে পেলি?
করিম বলেছিল, আছে একজন, আমাদের ট্রাভেল এজেন্সিগুলোতে এসে এসে দিয়ে যায়। সোনি অট্টহাসি হেসে বলেছিল, আর তুই বোকার মতো এটা দেখলি না যে কোথা থেকে স্ট্যাম্প পেপার আসছে? শোন আমাদের দেশের যে কোনো রাজ্যের সরকারে দেখবি সবথেকে নেগলেকটেড, সবার আড়ালে থাকা একেবারে ভাঙাচোরা অফিসের মধ্যে থাকে স্ট্যাম্প পেপার ডিপার্টমেন্ট। কেউ খেয়ালই করে না। বাড়ির দলিল থেকে যে কোনো রেজিস্ট্রি বা ডকুমেন্ট অথবা বিজনেস ডিল। স্ট্যাম্প পেপার লাগবেই। আমরা যদি জাল স্ট্যাম্প পেপার ছাপানো শুরু করি তাহলে আর পিছনে তাকাতে হবে না। কিন্তু কীভাবে? জেল থেকে দুজনে ছাড়া পাওয়ার পর স্বাধীন ভারতের অপরাধ ইতিহাসে এক বিস্ময়কর চক্রান্ত শুরু হল। রতন সোনি আর আবদুল করিম সমাজবাদী জনতা পার্টি বিধায়ক অনিল গোতের সঙ্গে দেখা করে তাঁকে ম্যানেজ করে শুধু একটা অ্যাপয়েন্টমেন্ট চাইল এক মন্ত্রীর সঙ্গে। যেভাবেই হোক সেই মন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করতেই হবে। মহারাষ্ট্র সরকারের রাজস্ব মন্ত্রী। ব্যবস্থা হয়েও গেল। সেই মন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে আবদুল করিম চায় স্ট্যাম্প পেপার ছাপানোর সরকারি ভেন্ডিং মেশিনের লাইসেন্স পাওয়ার অনুমতি। যেটা কোনো অপরাধ নয়। যে কেউ আবেদন করতেই পারে। ঠিক দু’মাস পর অমূল্য রতন হাতে এসে গেল। লাইসেন্স নম্বর ১২৫০০। ১৯৯৪ সালের মার্চ মাস। লাইসেন্স পেয়ে গেল আবদুল করিম। কে লেন সেই মন্ত্রী? তাঁর নাম ছিল বিলাস রাও দেশমুখ। মহারাষ্ট্রের প্রাক্তন প্রয়াত মুখ্যমন্ত্রী।
তেলগি স্ট্যাম্প পেপার ছাপা শুরু করল নিজের লাইসেন্সে। এবং রতন সোনি শুরু করে দিল জাল স্ট্যাম্প পেপার ছাপানো। আবদুল করিমের লাইসেন্স অনুযায়ী ছাপা হতে শুরু হল আসল সরকারি স্ট্যাম্প পেপার। আর দক্ষিণ মুম্বইয়ের কয়েকটি বিল্ডিং২-এর বেসমেন্টে রতন সোনি ছাপাচ্ছিল তখন জাল স্ট্যাম্প পেপার। এরপর জাল আর আসল স্ট্যাম্প পেপার মেশানো শুরু হয়ে গেল। পরবর্তীকালে সিবিআই তদন্তে নেমে দেখেছিল প্রথম বছরেই আবদুল করিম তেলগি সরকারিভাবে আড়াই কোটি টাকার স্ট্যাম্প পেপার কিনেছিল। আর তার সঙ্গে জাল স্ট্যাম্প পেপার মেশানোর পর সেই পরিমাণটি বিক্রি হয়েছিল ১০ কোটি টাকায়। এটা একটি ছোট্ট নমুনা। নেহাত মুম্বইতে আবদ্ধ রইল না ওই ব্যবসা। এবং গোপনও রইল না। কারণ স্ট্যাম্প পেপার ডিপার্টমেন্ট থেকে তেলগিকে টার্গেট করল পুলিশ। যে কোনো দিন গ্রেপ্তার হবে অনুমান করে আবদুল করিম আদালতে আগাম জামিনের একটি আবেদন করেই আচমকা উধাও। আসলে উধাও হল না। মুম্বই পুলিশ যখন কাগজে কলমে তাকে পলাতক হিসাবে ঘোষণা করে ফাইল বন্ধ করে দেওয়ার চেষ্টা করেছে, তখন বহাল তবিয়তে মুম্বইতে বসেই আবদুল করিম তেলগি সম্পূর্ণ নতুন এক অভিনব উদ্যোগ নিয়েছিল জাল স্ট্যাম্প পেপার ব্যবসায়। নতুন কোম্পানির নাম মাধব এমডি। মহারাষ্ট্র, কর্ণাটক, অন্ধ্রপ্রদেশ, দিল্লি। চার রাজ্যে আচমকা মাল্টিলেভেল মার্কেটিং বেড়ে গেল স্ট্যাম্প পেপারের। অসংখ্য অল্পবয়সি ছেলেমেয়ে চাকরি পেতে শুরু করল একটি হঠাৎ গজিয়ে ওঠা সংস্থায়। তার নাম মাধব এমডি। এই সংস্থার সেলসম্যানরা চার রাজ্যের তাবত অফিস, কলেজ, সংগঠন, ক্লাব, সম্পত্তির ডিলে স্ট্যাম্প পেপার বিক্রির দারুণ অফার দিতে শুরু করেছিল। অনেক কম দামে এভাবে স্ট্যাম্প পেপার পেয়ে সকলেই খুশি। ব্যবসা এমন পর্যায়ে গিয়েছিল যে তেলগি দুটি প্রিন্টিং প্রেস কিনে স্ট্যাম্প পেপার ছাপানো শুরু করে দেয়। এবার লাইসেন্স পাওয়া গেল ডেসপ্যাচ অর্ডার ২১ সেপ্টেম্বর ২০০০ তারিখের বিজ্ঞপ্তিতে। সেই আবেদনের ফর্মে লেখা ছিল ‘প্লিজ কনসিডার’। স্বাক্ষর ছিল অশোক চ্যবনের। মহারাষ্ট্রের তৎকালীন রাজস্ব মন্ত্রী। (সিবিআই এই মর্মেই রিপোর্ট আদালতে পেশ করেছিল)। ততদিনে কয়েক হাজার কোটি টাকার সরকারি লোকসান হয়ে গিয়েছে একের পর এক রাজ্যে। জমি বিক্রি হয়েছে জাল স্ট্যাম্প পেপারে। চাকরির নিয়োগ হয়েছে জাল স্ট্যাম্প পেপারে। সরকারি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে জাল স্ট্যাম্প পেপারে। বিদেশি লগ্নি হয়েছে জাল স্ট্যাম্প পেপারে। বিবাহ হয়েছে জাল স্ট্যাম্প পেপারে। ডিভোর্স হয়েছে জাল স্ট্যাম্প পেপারে। মুম্বইতে এরকম জামাই আদর পেয়ে বারংবার হাত পিছলে বেরিয়ে গেলেও কর্ণাটকে আচমকা একদিন এমজি রোডে শপিং করার সময় গ্রেপ্তার হয়ে গেল আবদুল করিম তেলগি। এবং জানতে পেরেই মহারাষ্ট্র পুলিশ নিজেদের হেফাজতে চাইতে শুরু করল। কর্ণাটক পুলিশ তেলগিকে পাঠিয়ে দিয়েছিল মুম্বই। মুম্বই পুলিশের ক্রাইম ব্রাঞ্চের ইউনিট নম্বর ফাইভের কাছে বন্দি তেলগি। তাকে জেরা করা হচ্ছে। তাকে নিয়ে যখন তখন গোয়া কিংবা পুণে গিয়ে তদন্ত করছে ক্রাইম ব্রাঞ্চ। মুম্বই পুলিশের ক্রাইম ব্রাঞ্চের জঘন্য এক ছোট্ট লকআপে তেলগির স্থান হয়েছে।
আসলে সব মিথ্যা। কোনো লক আপে নেই তেলগি! ৯ জানুয়ারি ২০০৩ মহারাষ্ট্র স্পেশাল ইনভেস্টিগেশন টিমের চিফ সুবোধ জয়সওয়াল আর কর্ণাটকের তদন্ত সেলের প্রধান আর শ্রীকুমার আচমকা হাজির ক্রাইম ব্রাঞ্চে। জানতে চাইছেন কোথায় তেলগি? গোটা ক্রাইম ব্রাঞ্চ নীরব। কারও মুখে কথা নেই। জয়সওয়াল তৎক্ষণাৎ হোম মিনিস্টারকে ফোন করার ভয় দেখালেন। সঙ্গে সঙ্গে ভেঙে পড়লেন কয়েকজন অফিসার। তেলগি লক আপে নেই। নেই মানে? যার বিরুদ্ধে চারটি রাজ্যের পুলিশের মামলা ঝুলছে, যাকে জেরা করে দেখা যাচ্ছে একের পর এক বড় বড় নাম জড়িয়ে যাচ্ছে সে কোথায়? খবরটি পেয়েই ওই দুই অফিসার ছুটলেন কাফ প্যারেড এলাকায়। মুম্বইয়ের সবথেকে অভিজাত অঞ্চল। তিনতলার একটি ফ্ল্যাট। ডোরবেল বাজানো হল। দরজা খুলে গেল। কর্ণাটক আর মহারাষ্ট্রের দুই পুলিশ কর্তা ঘরে ঢুকে দেখলেন সামনে টিভি চলছে। একটি ফোন কানে নিয়ে কারও সঙ্গে হেসে হেসে কথা বলছে তেলগি। সামনে দুজন পুলিশ কনস্টেবল ট্রে হাতে। একটি ট্রেতে চিকেন পকৌড়া, আর একটিতে কফি আর ফ্রেঞ্চ ফ্রাই। তারা অ্যাটেনশনের ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে। অপেক্ষা করছেন কখন তেলগির কথা শেষ হবে। এটা হল তেলগির নিজের ফ্ল্যাট।
অর্থাৎ গোটা পুলিশ বাহিনী এবং চার রাজ্যের প্রশাসন যখন জানে যে তেলগি মুম্বই ক্রাইম ব্রাঞ্চের লক আপে আছে, তখন আসলে সে নিজের ফ্ল্যাটে বহাল তবিয়তে। আর তাকে দেখভাল সেবা করার জন্য চাকরের মতো ডিউটি করছে চারজন কনস্টেবল। জানা গেল ২০ হাজার কোটি টাকার দুর্নীতির অপরাধী আবদুল করিম তেলগি প্রথম থেকে কোনোদিন লকআপে ছিল না। তাকে রাখা হয়েছিল হোটেল ‘আশ্রয়’ কিংবা তার নিজের গেস্ট হাউস ‘অলঙ্কার লজে’। আর মাঝেমধ্যেই সে নিজের কাফ প্যারেডের ফ্ল্যাটে চলে আসত। তদন্তের স্বার্থে মাঝেমাঝেই তেলগিকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল গোয়ায়। আদতে গোয়ায় সে আর তার পরিবার ‘হোটেল সিলভানিয়া রিসর্ট’ কিংবা ‘লীলা প্যালেসে’ উঠত। স্রেফ ক্যাসিনো খেলা কিংবা ছুটি কাটানোর জন্য। অর্থাৎ যার থাকার কথা লক আপে সে আদতে একদম নর্মাল জীবন কাটাচ্ছে। কারণ সে পুলিশ থেকে রাজনীতিবিদ সকলকে বিপুল টাকা দিয়ে মুখ বন্ধ করে দিয়েছিল। ওই কাফ প্যারেডে অভিযানের ঠিক তিনদিন পর ভিওয়ান্ডিতে হানা দিয়ে যে জাল স্ট্যাম্প পেপার উদ্ধার হয়েছিল তার মূল্য ছিল ৯০০ কোটি টাকা। অন্ধ্রপ্রদেশের অনন্তপুর থেকে বাজেয়াপ্ত হয়েছিল ৮৫০ কোটি টাকার স্ট্যাম্প পেপার। দিল্লির মেহরৌলি থেকে ১১২০ কোটি টাকার স্ট্যাম্প পেপার।
আবদুল করিম তেলগি একটি নজিরবিহীন দুর্নীতি করেছিল সেটা তেমন বড় কথা নয়। আসল কথা হল আবদুল করিম তেলগি প্রমাণ করে দিয়ে গিয়েছে যে, ভারতের মতো রাষ্ট্রে টাকা ছড়ালে সবাইকে কেনা যায়। শুধু দামটা জানতে হবে। কেন এরকম কথা বলা হচ্ছে? কারণ আবদুল করিম তেলগির ঘুষের জালে জড়িয়ে পড়া এবং তার জেরে গ্রেপ্তার হওয়াদের তালিকায় অসংখ্য নাম ছিল। মন্ত্রী থেকে সাধারণ নেতা। ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট থেকে সরকারি দপ্তরের সেকশন ইনচার্জ। একে একে সবাই গ্রেপ্তার হয়েছে। কিন্তু ৫৯তম গ্রেপ্তার মুম্বই পুলিশের ক্রাইম ব্রাঞ্চের জয়েন্ট সিপি প্রদীপ সাওয়ান্ত। এবং ৬০তম গ্রেপ্তার রঞ্জিত কুমার শর্মা। তিনিও নাকি তেলগির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। কে তিনি? মুম্বইয়ের পুলিশ কমিশনার!! হ্যাঁ! খোদ পুলিশ কমিশনার!
জানা গেল গোবিন্দা আর সোনালি বেন্দ্রের ‘জিস দেশ মে গঙ্গা রহতি হ্যায়’ এবং গোবিন্দার ‘আখিয়োঁ সে গোলি মারে’ সিনেমা দুটির ডিস্ট্রিবিউশন রাইট নিয়েছিল যে সানা ফিল্মস, সেটি আসলে ছিল তেলগির সংস্থা। ছোট মেয়ে সানার নামে। কিন্তু দুটিতেই লোকসান হয়েছিল। তাই আর ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির ধারেকাছে ঘেঁষেনি সে। তাই আবদুল করিম তেলগি আসলের থেকে নকলকে বেশি ভালোবেসেছে। কারণ তাকে কখনও ঠকতে হয়নি নকলের কাছে। নকল স্ট্যাম্প পেপার এবং টোপাজ বারের নকল মাধুরী দীক্ষিত! দুজনের কেউই তাকে ছেড়ে যায়নি কখনও!
