মেইয়াপ্পন : কারেন্ট রেট কী চলছে?
বিন্দু দারা সিং : রাজস্থান রয়্যাল ৭৯ পয়সা। চেন্নাই ৮১ পয়সা। চেন্নাই আজ ফেভারিট না। কিন্তু ওরাই জিতবে।
মেইয়াপ্পন : রাজস্থান রয়্যালের হয়ে আমার বিশ লাখ লাগাও। আমি বলছি ওরাই জিতবে। ফোন কেটে গেল..।
কিছুক্ষণ পর..
মেইয়াপ্পন : শোনো, সিএসকে (চেন্নাই সুপার কিংস) ১৩০ থেকে ১৪০ রান করবে আজ।
দারা সিং : তা হোক। আমাকে বিশ্বাস করতে পারো। আমি বলছি আজ সিএসকে জিতবে। আরআর (রাজস্থান রয়্যালস) হারছেই।
মেইয়াপ্পান : তাহলে বলো কী করব? বেরিয়ে যাব?
দারা সিং : সিএসকেতে লাগাও।
মেইয়াপ্পন : আর ইউ সিওর!
দারা সিং : ইয়েস..হান্ড্রেড পার্সেন্ট
মেইয়াপ্পন : দেন টেল মি, হোয়াটস দ্য রেট?
দারা সিং : আরআর ৮৩ পয়সা।
মেইয়াপ্পন : ওকে! তাহলে সিএসকেতে ৩০ লাখ লাগাও আমার।
দারা সিং : ওকে বস!
ফোন কেটে গেল। ঠিক ১০ মিনিট পর। বিন্দু দারা সিং পবন জয়পুরকে ফোন করলেন। পবন জয়পুর হল নামকরা বুকি। ভিআইপি বেটিং সে হ্যান্ডেল করে।
দারা সিং : কেয়া রেট হ্যায়।
পবন জয়পুর : ৮০-৮৩
দারা সিং : ঠিক হ্যায়! তিস পেটি উসকে লিয়ে লাগাও।
পবন জয়পুর : (কোড ল্যাংগুয়েজে) ম্যায়নে আসসিপে তিস খা লিয়া।
দারা সিং : ওকে ডান।
১০ মিনিট পর। আবার ফোন।
মেইয়াপ্পন : কী চলছে?
দারা সিং : তুমি এখন ৬৪ লাখ হারছ।
মেইয়াপ্পন : কটু থমকে গিয়ে, চিন্তিত কণ্ঠে) কত যাচ্ছে রেট?
দারা সিং : আরআর ৪৩ পয়সা।
মেইয়াপ্পন : ঠিক আছে তাহলে আরআরে আরও ৩০ লাখ।
ফোন কেটে দারা সিং পবনকে ফোন করলেন।
দারা সিং : ইয়ে আজ মরেগা।
পবন জয়পুর : কেন কী হয়েছে?
দারা সিং : আগেই এত লস। তার উপর বলছে আরও ৩০ লাখ। ৪৪ এর উপর। পবন জয়পুর হাসল শুধু। এবং বেট লাগাল।
খেলা শেষ হওয়ার সামান্য আগে। ফোন বাজছে। মেইয়াপ্পন : কী ব্যাপার?
দারা সিং : খুব খারাপ। আমার তো কাঁপুনি আসছে। জেতা ফেতা ভুলে যাও। আপাতত ব্যালান্স করো যেভাবে হোক। নয়তো ডুববে।
মেইয়াপ্পন : আরে টোটাল কী যাচ্ছে আমাদের? তাই বলো।
দারা সিং : সিএস-কের উপর ১ কোটি ২৪ লক্ষ আর রাজস্থান রয়্যালস ৫৫ লাখ। ২০১৩ সালের আইপিএলের সেই ম্যাচে শেষ পর্যন্ত রাজস্থান রয়্যাল জিতে গেল। মেইয়াপ্পন সব মিলিয়ে ৬৮ লক্ষ টাকা লোকসান করল। কিন্তু তার মুনাফার ব্যালান্স অন্য ভাবে হয়ে গিয়েছে। কারণ কী? কারণ হল অন্য বুকিকে তিনি ততক্ষণে পিচ রিপোর্ট, চেন্নাইয়ের রান আগাম বলে দিয়ে অনেক টাকা কামিয়ে নিয়েছেন। মনে করে দেখুন দারা সিং কে মেইয়াপ্পন কিন্তু আগেই বলেছিলেন চেন্নাই সুপার কিং সেদিন ১৩০ থেকে ১৪০ রান করবে। চেন্নাই সেদিন করেছিল ১৪১ রান। প্রায় হুবহু মিলে গিয়েছে। কে এই গুরুনাথ মেইয়াপ্পন? চেন্নাই সুপার কিংসের অন্যতম কর্তা ছিলেন। তবে তার থেকেও বড় পরিচয় স্বয়ং বোর্ড অব কন্ট্রোল ফর ক্রিকেট ইন ইন্ডিয়ার তৎকালীন চেয়ারম্যান এন শ্রীনিবাসনের জামাই। এই শ্রীনিবাসন? ইন্ডিয়া সিমেন্টের মালিক। ইন্ডিয়া সিমেন্ট কোম্পানির বৈশিষ্ট্য কী? চেন্নাই সুপার কিংস এর অন্যতম স্পনসর। চেন্নাই সুপার কিংসের অফিসিয়াল কে ছিলেন? মেইয়াপ্পন। শ্রীনিবাসনের জামাই। বিন্দু দারা সিং কে? বিখ্যাত সিনেমা স্টার প্রয়াত দারা সিং এর পুত্র। তাঁর আর একটি পরিচয় কী? তিনি মেইয়াপ্পনের বন্ধু। তাঁর পেশা কী ছিল? ক্রিকেট বেটিং। আয় হত কীভাবে? প্রতিটি বেটে এক পয়সা করে কমিশন। কীভাবে? পার্টি যখন বেট লাগাত তখন সে আসল রেটের থেকে এক পয়সা কমিয়ে অথবা বাড়িয়ে বলত। যখন আসল রেট চলছে কোনো একটি টিমের হয়ে ৮০ পয়সা, তখন তিনি হয়তো ৮১ কিংবা ৭৯ বলতেন। ওই মাঝখানের এক পয়সা তাঁর পকেটে। আইপিএল সিক্সের মাধ্যমেই আসলে জানাজানি হয়ে গেল গোটা ক্রিকেট সমাজ কীভাবে জড়িয়ে রয়েছে ম্যাচ ফিক্সিং, স্পট ফিক্সিং আর বেটিং-এ। মুম্বই এবং দিল্লি পুলিশের চার্জশিটে দেখানো হয়েছে কীভাবে একের পর এক ম্যাচে আদতে কী ফলাফল হতে চলেছে তা আগাম বলে দেওয়া হয়েছিল বুকিদের। মেইয়াপ্পন একা চারটি ম্যাচে বেটিং-এ যুক্ত ছিলেন। ১২ মে থেকে ১৫ মে তাঁর ফোনকল ইন্টারসেপশন থেকে জানা গেল সেই যেদিন রাজস্থান রয়্যালস বনাম চেন্নাই সুপার কিংসের ম্যাচে তাঁর লোকসান হল ৬৮ লক্ষ টাকা, সেদিনই তিনি বেঙ্গালুরু রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স বনাম কলকাতা নাইট রাইডার্সের ম্যাচের পিচ রিপোর্ট শেয়ার করে লক্ষ লক্ষ টাকা আয় করে নেন। তিনি বুকিকে জানিয়ে দিয়েছিলেন রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স ওই ম্যাচ হারছে। তাই হয়েছিল। ঠিক পরদিন মেইয়াপ্পন বুকি সিন্ডিকেটকে আগাম জানিয়ে রেখেছিলেন সানরাইজ হায়দরাবাদ বনাম মুম্বই ইন্ডিয়ানসের ম্যাচে হায়দরাবাদ জিতবে। সেইমতো নিজেই টাকা লাগান দারা সিং এর মাধ্যমে। আর ১৪ মে এম এ চিদম্বরম স্টেডিয়ামে আয়োজিত দিল্লি ডেয়ারডেভিল বনাম চেন্নাই সুপার কিংসের ম্যাচ নিয়ে তাঁর গোপন বার্তা ছিল, চেন্নাইয়ের অথরিটির কাছে স্টেবিলিটি সার্টিফিকেট আসেনি। তাই ওই ম্যাচ হচ্ছেই না। এই রিপোর্টও বেটিং সিন্ডিকেট কাজে লাগিয়ে প্রভূত লাভ করে।
কিন্তু পিচের কাছে না গিয়ে, উইকেট না দেখে, কতটা ময়েশ্চার আছে মাঠে তার কোনো প্রত্যক্ষ পর্যবেক্ষণ না করে কীভাবে সম্ভব সেইসব বিষয়ে পূর্বাভাস দেওয়া? তার জন্য দরকার এমন কারও সহায়তা যে প্রথম থেকে একেবারে মাঠের মধ্যেই উপস্থিত। সেক্ষেত্রে তো তার মানে প্লেয়ার? হ্যাঁ। প্লেয়ার তো থাকেই। শ্রীশান্ত থেকে অজিত চান্ডেলার কাণ্ড তো আমরা জানি। কিন্তু তারা কাজটা করবে খেলতে নেমে। অর্থাৎ বুকি ও সিন্ডিকেটের নির্দেশ মেনে পারফরম্যান্স দিয়ে খেলাটাকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করবে। হয় ভালো খেলবে। অথবা খারাপ। হয় রান করবে। অথবা ইচ্ছে করে আউট হবে। কিন্তু আগাম পিচ রিপোর্ট আর ওয়েদার কন্ডিশনের জন্য কী কী হতে পারে তা জানার জন্য অন্য কোনো সোর্স চাই। তাহলেই বেটিং ও ম্যাচ ফিক্সিং সিন্ডিকেটের কাজটা নিখুঁত হবে। সেই লোকটিকেও পাওয়া গিয়েছিল। ফলে ম্যাচ ফিক্সিং আর বেটিং-এর ষোলোকলা পূর্ণ।
লোকটির নাম আশাদ রউফ। আইপিএল ম্যাচগুলির অন্যতম এক আম্পায়ার! পাকিস্তানের এই আম্পায়ার যাবতীয় পিচ রিপোর্ট দিতেন। আর ম্যাচের আগে পরের হাল হকিকত। প্লটটা ভাবুন। একাধিক প্লেয়ার আছে। একাধিক অফিসিয়াল আছে। একটি টিমের মালিকের ঘনিষ্ঠ স্বজন আছে। আম্পায়ার আছে। দেশজোড়া বেটিং সিন্ডিকেট আর বুকিদের কাছে আর কী চাই একের পর এক ম্যাচে স্পট ফিক্সিং এর জন্য? মোবাইল ফোন ইন্টারসেপশন থেকে জানা গেল ২০১৩ সালের ১৫ মে মুম্বই ইন্ডিয়ান বনাম রাজস্থান রয়্যালসের ম্যাচের আগে বিন্দু দারা সিংকে ফোনে উৎফুল্ল আম্পায়ার আশাদ রউফ বলেছিলেন, আজ জিন্দেগি কী হার জিত কর লেনা। রউফ নিজেই ছিলেন আম্পায়ার ওই ম্যাচের। বিন্দু দারা সিং অত্যন্ত আনন্দিত। তিনি অন্যদেরও জানিয়ে দিলেন আজ ছপ্পড় ফুঁড়ে টাকা আসবে। কারণ নানাভাবে আর বেট করা হচ্ছে।
সেই প্রথম নয়। ১২ মে আশাদ রউফ জয়পুরের পিচ সম্পর্কে আগাম খবর দিলেন। একটি রহস্যময় ফোন আসে মাঝে মাঝে পবন জয়পুরের কাছে। সেই ফোন এল। তাকে বলা হল শাম কো ওহি চিজ করনা হ্যায়, যো রউফ বাতায়া..ঠিক হ্যায়? এই নম্বর থেকে ফোন এলে শুধু হাঁ অথবা না বলা নিয়ম। নম্বরটি হল ৯২৩৩৩২064। সেটি শুনে বিন্দু দারা সিংকে ফোন করে জানিয়ে দিল পবন। বিন্দু আনন্দে বলে উঠেছিলেন, রউফকে যা যা গিফট দেওয়া হয়েছে তার সব আজ উসুল হয়ে যাবে একটা ম্যাচে। কিন্তু সকলের অলক্ষে সেই ফোনের বার্তালাপ ততক্ষণে মুম্বই পুলিশ কন্ট্রোল রুমে বসে শুনেছে। কারণ বিশেষ কিছু বুকি লাগাতার লক্ষ করেছে যে এই বিশেষ সিন্ডিকেটটি সবরকম খবর আগে পাচ্ছে।
আর এরাই কোটি কোটি কামাই করছে। সুতরাং এদের খবর পুলিশকে দিয়ে রাখা হয়েছিল। তাই মুম্বই পুলিশ জাল পেতে প্রত্যেক ফোন ট্যাপিংয়ের ব্যবস্থা করে। এবং পরদিন সাত সকালে খবরটা আবার পেয়ে গেল সেই পবন জয়পুর। অর্থাৎ পুলিশ যে পিছনে লেগেছে তা জানা হয়ে গেল। পবন জয়পুর পাগলের মতো ফোন করছে বিন্দুকে। ১৫ মে। কিন্তু বিন্দু দেরি করে ঘুমান রাতে। আর সকালে ঘুম থেকে ওঠেনও দেরিতে। কে না জানে তাঁর কাজ শুরু হয় দুপুরের পর। কারণ আইপিএল তো বিকেলের আগে শুরুই হয় না। অবশেষে পাঁচ বারের পর কোনোমতে ঘুম জড়ানো কণ্ঠে বিন্দু দারা সিং ফোন তুললেন, পবন জয়পুর উত্তেজিত…গলায় আতঙ্ক।
পবন : লাফড়া হো গয়া হ্যায় বিন্দু ভাই… যো সিম রউফকো দিয়া থা উও অভি কে অভি ডেসট্রয় করনে কে লিয়ে বোল দো ইয়ার।
বিন্দু : কেন কী হল?
পবন : আরে পুলিশ ওই নম্বর ট্যাপ করছে।
বিন্দু : সেকি? তাহলে তো আমাদেরও….
পবন : হ্যাঁ, তাই তো বলছি। কাল তো অনেকবার কথা হয়েছে।
বিন্দু : আরে আমার তো প্রায় ৮০ বার কল হয়েছে রউফের সঙ্গে। এখন কী করব? পবন : উসে ভাগনে কো বোলো..
বিন্দু লাফ দিয়ে বিছানা থেকে উঠে ফোন করলেন আশাদ রউফকে। জানিয়ে দিলেন, মুম্বই পুলিশ আপনার পিছনে। আশাদ রউফ আর কোনো দ্বিতীয়বার চিন্তা করলেন না কিছু। পালালেন ভারত ছেড়ে।
কোটি কোটি জনতা যখন কাজকর্ম ফেলে, ক্রিকেট ও নিজেদের পছন্দের টিমকে সমর্থন করতে পাগলের মতো টিভির সামনে হাজির হয়ে চলেছে তখন আদতে ওইসব ম্যাচেরই ভিভিআইপি কর্পোরেট বক্সের সোফায় বসে একঝাঁক উপরতলার মানুষ সেইসব ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ করে চলেন। কিন্তু আদতে কি তারাই এসব ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ করেন? তারা তো পুতুল। আসল প্ল্যান আর স্ট্র্যাটেজি হচ্ছে অন্যত্র। সেখান থেকে নির্দেশ আসে দিল্লিতে। দিল্লির বেটিং কিংপিনের মাধ্যমে গোটা প্ল্যান কার্যকর করা হয়। সেই কিংপিনের নাম কেউ জানে না। শুধু পরিচয় জানে। ডক্টর সাব! কে এই ডক্টর সাব! ।
এত টাকা কোথা থেকে আসছে? ২০১০ সালে আইপিএলের শুরুর দিনগুলিতেই সবথেকে বড় প্রশ্ন হয়ে দেখা দিচ্ছিল। কেন্দ্রীয় সরকারের আইটি দপ্তর তীক্ষ্ণ নজর রাখতে শুরু করল। ২০১০ সালের ১৯ এপ্রিল সেই সময়ের ভারত সরকারের অর্থমন্ত্রী খুব সকালে অফিসে এসেই প্রথম যে কাজটি করলেন সেটি হল ইকনমিক অফেন্ডারস উইং আর ইনকাম ট্যাক্স ডিপার্টমেন্টের অফিসারদের ডেকে পাঠালেন। নর্থ ব্লকে অফিস অর্থমন্ত্রকের। তিনি ওই অফিসারদের সঙ্গে দীর্ঘ বৈঠক করলেন এবং কড়াভাবে বুঝিয়ে দিলেন আইপিএল নিয়ে প্রচুর অভিযোগ আসছে। সরকার চুপ করে থাকতে পারে না। অর্থমন্ত্রী জানতে চান ম্যাচ ফিক্সিং, বিডিং প্রক্রিয়ার সময় অনিয়ম, বেটিং, টাকা বিদেশে পাচার সমস্ত কিছু নিয়েই তদন্ত করতে হবে। তিনি একটা কথা উচ্চারণ করলেন, নো ওয়ান শুড বি স্পেয়ারড! ঠিক পরের বছর ২০১১ সালে ভারতে আয়োজিত হবে ওয়ান ডে বিশ্বকাপ।
সুতরাং তার আগে ক্রিকেট নিয়ে ঘনিয়ে ওঠা অত্যন্ত ঘোরালো ধোঁয়াশা যেন পরিষ্কার হয়ে যায়। অর্থমন্ত্রীর টেবিলে একঝাঁক ফাইল। তিনি এমন এক রাজনীতিবিদ যিনি ফাইল তৈরি, ফাইল পড়া আর অনুপুঙ্খ নোট দেওয়া, খসড়া রিপোর্ট গঠন ইত্যাদি কাজে কিংবদন্তির পর্যায়ে গিয়েছেন। সে রাজনৈতিক দলের সঙ্গে তিনি যুক্ত তাদের যে কোনো নির্বাচনী ইস্তাহার বরাবর তিনি তৈরি করতেন অথবা তাঁর সীলমোহর ছাড়া সেগুলি প্রকাশিত হয় না। আজ পর্যন্ত কোনো ফাইল তাঁর হাত থেকে বেরোয়নি যাতে সামান্য খুঁত বা অনিয়ম অথবা ভুল আছে। এত সময় পান কীভাবে? কারণ ভদ্রলোক রাত দেড়টা পর্যন্ত নিজের বাসভবনে কাজ করেন। এবং রাত দেড়টার পরও তাঁর কাছে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা দর্শনপ্রার্থীদের অ্যাপয়েন্টমেন্ট দেন। দেখাও করেন। তাঁর সরকারি বাংলোর ভিজিটর্স রুমের শেষতম আগত মানুষটির সঙ্গেও দেখা না করে তিনি চেয়ার ছেড়ে উঠবেন না। অন্যদিকে আবার ঠিক ভোরেই ঘুম থেকে উঠে পড়েন। কারণ স্নান করে তাঁর এক ঘণ্টা চণ্ডীপাঠ করা অভ্যাস। এবং তারপর তাবত ইংরাজি সংবাদপত্র একপ্রকার মুখস্থই করেন। তারপর অফিসে এসে আবার ফাইলে ডুবে যান। তার মধ্যে নিয়ম করে বই পড়া। এরকম এক অবিশ্বাস্য রুটিন বছরের পর বছর ধরে চালিয়ে যাওয়া মানুষকে স্বাভাবিকভাবে কোনো সরকারি দপ্তরের অফিসার ফাঁকি দিতে পারেন না। সাহসও পান না। সেই অর্থমন্ত্রীর নাম ছিল প্রণব মুখোপাধ্যায়।
তিনি একটি ফাইল তুলে নিয়ে বিশেষ জোর দিয়েছিলেন আইপিএলের চেয়ারম্যান সহ তাবত পরিচালক গোষ্ঠীর আর্থিক লেনদেন যেন খুঁটিয়ে তদন্ত করা হয়। অর্থমন্ত্রকের আয়কর বিভাগের এক অফিসার বলেছিলেন, স্যার একটা কথা ছিল। তিনজন বিগ শটকে বাদ দিয়ে তদন্ত শুরু করা যাবে না। অর্থমন্ত্রী জানতে চাইলেন কারা তাঁরা? অফিসার বললেন, রাজস্থান রয়্যালসের চেয়ারম্যান মনোজ বাদালে, ভেনু নায়ার, ওয়ার্ল্ড স্পোর্টস গ্রুপের সি ই ও এবং আইপিএলের চিফ অপারেটিং অফিসার সুন্দর রামন। এঁদের প্রশ্ন করা উচিত। তাহলে হয়তো অনেক কিছু জানা যাবে। অর্থমন্ত্রী তৎক্ষণাৎ আশ্বস্ত করলেন তদন্ত হবে নিরপেক্ষ। কাউকে ছাড়া হবে না। তবে তিনি তার আগে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পি চিদম্বরম এবং কৃষি মন্ত্রী (যিনি কৃষির থেকেও ক্রিকেট প্রশাসনকে অনেক অনেক বেশি বোঝেন) শরদ পাওয়ারের সঙ্গে বৈঠক করলেন। সিদ্ধান্ত হল তদন্ত হবে পক্ষপাতহীন ও সার্বিক
আইপিএল কমিশনারের নাম ললিত মোদি। তিনি তখন লন্ডনে। তাই তাঁকে জেরা করার উপায় কী? টেলি কনফারেন্স। তাঁকে প্রাথমিক জেরার পর বলা হল আপনি ফিরে আসুন তাড়াতাড়ি। সরকার থেকে চাপ দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু ললিত মোদি বলে দিলেন ক্রিকেট মাফিয়ারা আমাকে পেলে খুন করবে। আমি আপাতত যাচ্ছি না। রাজস্থান রয়্যালসের চেয়ারম্যান মনোজ বাদালেকে জেরা করা হল। তাঁর কাছে যেটা জানতে চাওয়া হচ্ছে সেটি হল সত্যিই রাজস্থান রয়্যালসের গোপন শেয়ারের মালিক স্বয়ং ললিত মোদি কিনা। আর ওয়ার্ল্ড স্পোর্টস গ্রুপের চিফ এক্সিকিউটিভ অফিসার ভেনু নায়ার সন্দেহের তালিকায়। কারণ আইপিএল নিয়ে একটি ধোঁয়াশাপূর্ণ গোপন ডিলের সন্ধান পাওয়া যাচ্ছিল। সেই ডিলে সিঙ্গাপুরে থাকা এক মিডলম্যান কমিশন হিসাবে ৪০০ কোটি টাকা মুনাফা করেছে। কীভাবে করা হয়েছিল সেই ডিল? জানা দরকার। তাই ভেনু নায়ারকে জেরা।
ইতিমধ্যে বিসিসিআই এর শৃঙ্খলারক্ষা কমিটি পৃথক তদন্ত করছে। এবং সেই কমিটি এক বিস্ফোরক রিপোর্ট জমা দিল। তদন্তের শীর্ষে ছিলেন বিসিসিআই ভাইস প্রেসিডেন্ট। তাঁর নাম অরুণ জেটলি। সদস্য হিসাবে ছিলেন আর এক পরিচিত নাম। জ্যোতিরাদিত্য সিন্ধিয়া। এই কমিটির রিপোর্টে জানা গেল আইপিএল টিম তৈরির টেন্ডার প্রক্রিয়ায়। অনিয়ম ঘটানো হয়েছে বিশেষ কিছু টিমকে সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার জন্য। ললিত মোদি বিশেষ সুবিধা পাইয়ে দিতে চেয়েছেন দুই কর্পোরেট গ্রুপকে। আবার তাদের পালটা আরও দুটি গ্রুপও টিম চাইছিল। ভারতের বিখ্যাত দুই কর্পোরেট। তাদের মধ্যে একটির উত্থান বিস্ময়কর। তাদের সাহায্য করার জন্যই ললিত মোদি আইপিএল গভর্নিং কাউন্সিলকে কিছু না জানিয়ে এমনকী কোনো পারমিশন ছাড়াই দুটি বিশেষ শর্ত টেন্ডার প্রসেসের আবেদনপত্রে ঢুকিয়ে দেন। সেটা জানাজানি হলে সর্বাগ্রে আপত্তি জানায় বাকিরা। তদন্ত করার পর ললিত মোদির অতি সক্রিয়তার কারণে অনিয়ম খুঁজে পাওয়া গেল। আর তাই বিসিসিআই গোটা টেন্ডার প্রক্রিয়া বাতিল করে দেয়। ফলে আদানির আর টিম ফ্র্যাঞ্চাইজি পাওয়া হল না। ললিত মোদি সেই সময় যখন দেখছেন তাঁকে ঘিরে আইনের ফাঁস ক্রমেই শক্ত হচ্ছে এবং ক্রিকেট প্রশাসন, হাত থেকে চলে যেতে বসেছে, পালটা একটি বিস্ফোরণ ঘটালেন একটি ট্যুইট করে। ট্যুইটের বিষয়বস্তু ছিল—সুনন্দা পুষ্কর রঁদেভু স্পোর্টস ওয়ার্ল্ডের ৪.৯ শতাংশ সোয়েট ইক্যুইটি কিনেছেন। রঁদেভু স্পোর্টস ওয়ার্ল্ড কারা? কোচি আইপিএল টিমের মালিক। কোচি টিমের মেন্টর কে? শশী থারুর। তিনি তখন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী। সুতরাং সুনন্দা পুষ্কর কেউ না। আসল টার্গেট তাঁর প্রিয় মানুষটি। শশী থারুর। বিরোধী দল স্বাভাবিকভাবেই ঝড় তুলল। তিনি সরকারি ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন এই অভিযোগে ইস্তফার দাবি তোলা হল। তিনি ইস্তফা দিতে বাধ্যও হলেন। যদিও সুনন্দা পুষ্কর সেই শেয়ার কিনেছিলেন মাত্র ১৮ হাজার টাকা দিয়ে। আর সেই ৪.৯ শতাংশ শেয়ারের মধ্যে তাঁর নিজের ছিল মাত্র ০.৫ শতাংশ শেয়ার। বাকিটা? দুই নামজাদা ক্রিকেটারের নামে। এরকমই তিনি বলেছিলেন। যদিও মৃত্যুর আগে পর্যন্ত তিনি কখনও ফাঁস করেননি কারা সেই দুই ক্রিকেটার। কিন্তু সুনন্দা পুষ্কর আইপিএল দুর্নীতি সম্পর্কে অনেক কিছু জানতেন। তাঁর যোগাযোগের নেটওয়ার্ক এতটাই স্ট্রং ছিল যে কোনো মহলের গোপন ডিল কানে আসা অসম্ভব নয়। অন্যদিকে কোচি টিমের মেন্টর হিসাবে শশী থারুরও যে কোনো গোপন বা ঘুরপথে ডিল করেছেন এমনও প্রমাণ পাওয়া যায়নি। অন্তত আইপিএল বিডিং প্রক্রিয়ার তদন্তে সেরকম কোনো নথিপত্রই উদ্ঘাটিত হয়নি। বস্তুত তাঁর বিরুদ্ধে ললিত মোদির প্রধান রাগ একটাই। কোচি টিমের বিডিং প্রসেস মোদির অনেক গোপন অ্যাজেন্ডাকে আটকে দিয়েছিল। তিনি কয়েকটি গ্রুপকে কথা দিয়েছিলেন তাদের ফ্র্যাঞ্চাইজি পাইয়ে দেবেন। সেটি হল না। ঠিক চার বছর পর ২০১৪ সালের ১৭ জানুয়ারি দিল্লির চাণক্যপুরী এলাকার একটি সাততারা হোটেলের একটি বিলাসবহুল স্যুইটে একজন গেস্টের মৃতদেহ পাওয়া গেল। প্রাথমিক তদন্তে মনে হল মৃত্যুর কারণ ড্রাগ ওভারডোজ! অর্থাৎ কোনো একটি ওষুধ বেশিমাত্রায় খেয়ে ফেলেছিলেন। সেটা আত্মহত্যার লক্ষ্যে? নাকি ভুল করে? কেন আত্মহত্যা করবেন তিনি? সেসব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায়নি। কীভাবে ঘটল ব্যাপারটা? শেষ যে গ্লাসে জল খেয়েছিলেন তিনি সেখানে কোনো ড্রাগের রং বা গন্ধ ছিল না।
ওই হাই প্রোফাইল গেস্টের নাম সুনন্দা পুষ্কর! কীভাবে হল তাঁর মৃত্যু? আমরা বরং পরে একসময় সেই বিবরণটি শুনব!
ডক্টরসাব আয়ুর্বেদের চিকিৎসক। যখনই তিনি কারও সঙ্গে কথা বলেন অথবা নতুন আলাপ হয়, তখনই তিনি তাঁদের ঘুরিয়ে ফিরিয়ে আয়ুর্বেদের উপকারিতা সম্পর্কে বলেন। শান্ত সৌম্য ডক্টর সাব সকলের প্রিয়। দিল্লিতে থাকেন। লোকটা আসলে কে? জাভেদ চুটানি। দাউদ ইব্রাহিমের অন্যতম কাছের লোক। দাউদের কাছের লোক, কথাটা শুনতে খুব সাধারণ। কিন্তু অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ আন্ডারওয়ার্ল্ড জগতে। কারণ দাউদের সবথেকে বড় বৈশিষ্ট্য হল তার সঙ্গে ডাইরেক্ট কথা বলতে পারে অথবা পেরেছে এরকম লোকের সংখ্যা কম। দাউদ নিজের বৃত্তে খুব কম লোককে এন্ট্রি দেয়। এমনকী বহু বছর ধরে তার হয়ে কাজ করছে এরকম সদস্যও সরাসরি দাউদকে ফোন করতে পারে না। ছোটা শাকিল, আনিস ইব্রাহিমদের সঙ্গে কথা বলতে হয়। জাভেদ চুটানি সেরকমই মুষ্টিমেয় এক ব্যক্তি যার সঙ্গে সরাসরি দাউদ কথা বলে। এই জাভেদই হল আইপিএলের অন্যতম প্রধান বুকি এবং ম্যাচ ফিক্সার। দাউদ, ছোটা শাকিল, আনিস ইব্রাহিম সকলকে চেনা যায়। তাদের ছবি আছে। কিন্তু ওই টিমের একমাত্র মেম্বার জাভেদ চুটানির কোনো ছবিই নেই ভারতীয় গোয়েন্দাদের কাছে। দিল্লি বা মুম্বই পুলিশ বহু চেষ্টা করেও তার ছবি জোগাড় করতে পারেনি। একবার ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থার এক স্পাই দুবাইতে দাউদের অনুগামী ফারুখ টাকলার গ্রুপে মিশে গিয়ে জাভেদ চাটুনির ছবি তুলতে গিয়েছিল মোবাইলে। তাকে চারতলার ছাদ থেকে ফেলে দেওয়া হয়। অবশ্য প্রাণে বেঁচে যান তিনি। জাভেদের আজ চুল লাল। পরের সপ্তাহে হাইলাইট করা। আবার কিছুদিন পর সম্পূর্ণ ন্যাড়া। কখনও গালভর্তি দাড়ি। আবার কখনও ক্লিন শেভড। জাভেদ চুটানি গোটা আইপিএল ম্যাচ ফিক্সিংয়ের সবথেকে বড় হোতা। অথচ সে নিজে কখনও কোনো মাঠে যায় না। আর একবার দুবার যদিও যায়ও তাকে দেখা গিয়েছে সবথেকে কম দামি আসনে। কলেজ স্টুডেন্টরা যেখানে বসে সেরকম কোনো সস্তার স্ট্যান্ডে। প্রবল ভিড়ে তাকে খুঁজে বের করা অথবা আলাদাভাবে আইডেন্টিফাই করা অসম্ভব। চুটানি কী করে? যে কোনো ম্যাচ অথবা স্পট ফিক্সিংয়ের শুরুর রেট সে ঠিক করে। যাকে বলা হয় ওপেনিং বিড। এই প্রাথমিক রেটিং যায় চারটি দেশে। ভারত, সিঙ্গাপুর, পাকিস্তান আর মালয়েশিয়া। কারণ এ পর্যন্ত যখন। বেটিং আর ফিক্সিং হয়েছে আইপিএল নিয়ে তার সবই এই চারটি দেশের কয়েকটি শহর থেকেই। চুটানি সিন্ডিকেটে সবথেকে বেশি টাকা লগ্নি করা হয়েছে। কারণ কী? আরও তো অনেক বেটিং সিন্ডিকেট আছে! কারণ হল একমাত্র জাভেদের সিন্ডিকেটের পূর্বাভাস হুবহু মিলে যাওয়ার চান্স। কোনো ম্যাচের ভবিষ্যৎ কী তা সবথেকে বেশি নিখুঁত ভবিষ্যৎবাণী করার কৃতিত্ব এই সিন্ডিকেটের। তবে এটাই স্বাভাবিক। কারণ এই সিন্ডিকেটের পিছনে যে লোকটা আছে, সে কোনো হাফ হার্টেড কাজ করে না। সবই নিখুঁত প্রফেশনালিজমে। তার নাম ডি কোম্পানি। জাভেদ চুটানির পাশাপাশি আর যে নামটি সবথেকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ এই গোটা প্রক্রিয়ায় সেটি হল টিটু নাগপুরী। নাগপুরে এমন কোনো বড় ব্যবসা নেই যার সঙ্গে তার সংযোগ নেই। নাগপুরের এমন কোনো রাজনীতিবিদ নেই যার সঙ্গে তার ওঠাবসা নেই। এবং সবথেকে বড় কানেকশন হল বিসিসিআই। এই মহাশক্তিমান আর বিশ্বের ধনীতম ক্রিকেট বোর্ডের প্রথম সারির তাবত কর্তাদের সঙ্গে তার পরিচিতি ছিল। এই পাহাড়প্রমাণ চাপ নিয়ে মুদগল কমিটি তদন্ত করেছিল। এবং বিস্তারিত তদন্তের পর ১৩টি নাম সম্বলিত একটি রিপোর্ট জমা দেয়। সেখানেই শেষ নয়। পাশাপাশি জাস্টিস লোধা কমিটি তদন্ত করে। এবং সবথেকে বড় যে ধাক্কাটি দেওয়া হল সেটি হল ইন্ডিয়া সিমেন্ট এবং জয়পুর আইপিএলকে সাসপেন্ড করে দেওয়া হয় ২ বছরের জন্য। গুরুনাথ মেইয়াপ্পন আর রাজস্থান রয়্যালসের মালিক রাজ কুন্দ্রাকে যে কোনো রকম ক্রিকেটের সঙ্গে যুক্ত হওয়া থেকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়।
টিম মালিক এবং টিমের অফিসিয়ালদের ম্যাচ ফিক্সিংয়ের সঙ্গে যুক্ত থাকা সবথেকে সুবিধা। আর ঠিক সেই কারণেই এঁদের যেভাবে হোক সিন্ডিকেটে টানার প্রবল চেষ্টা করা হয়। কেন? কারণ টিম অফিসিয়ালস সরাসরি টিমের প্র্যাকটিস সেশনে উপস্থিত থাকে। কারা খেলতে পারে কারা খেলবে না সেই শেষ মুহূর্তের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয় প্রায় তাঁদের চোখের সামনে। আইপিএল মালিকদের নিয়ে যে ওয়ার্কশপ হয় সেখানে মালিকদের পক্ষে প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ পায় অফিসিয়ালরা। সুতরাং আগামীদিনের যে কোনো পরিবর্তন, পরিমার্জন এবং নতুন রীতিনীতি কী আসছে তাও সবার আগে তাঁরা জানতে পারে। এরকম সোনার হাঁস যদি সিন্ডিকেটে থাকে তাহলে কোনো বেটিং লোকসানের মুখ দেখবে না। এখানেই কি শেষ? তা তো হতে পারে না? তদন্ত আরও এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত হল। বিশেষ করে দিল্লি ও মুম্বই পুলিশ পৃথকভাবে যে ক্রিমিন্যাল ইনভেস্টিগেশন চালাচ্ছে সেখানে বিস্ফোরক তথ্য আসছে।
১১ মে ২০১৩। দিল্লি পুলিশের স্পেশাল সেল যাবে মুম্বই। একঝাঁক নতুন তথ্য এসেছে হাতে। মুম্বই পুলিশের সঙ্গে কোঅর্ডিনেট করা দরকার। কারণ রেইড করতে হবে। কয়েকটা অ্যারেস্টও হয়ে যেতে পারে। এবং রাঘববোয়াল। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পি চিদম্বরম গো অ্যাহেড দিয়েছেন। চিন্তা নেই। স্পেশাল সেল দুপুরেই বেরিয়ে যাবে। ফ্লাইটের টিকিট কাটা। চারজন যাওয়ার কথা। কিন্তু ইনস্পেক্টর দত্ত কোথায়? বারংবার ফোন করা হচ্ছে। ফোন তুলছেন না বদ্রীশ দত্ত। দিল্লি পুলিশের স্পেশাল সেলের তুখড়। এক ইনস্পেক্টর। গোয়েন্দাগিরিতে মোটামুটি সেরাই বলা যায়। ২০০৩ এবং ২০০৬ দুই বছরেই তিনি রাষ্ট্রপতির থেকে সাহসিকতার পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। অন্তত ২০ জন সন্ত্রাসবাদীকে একা পাকড়াও কিংবা এনকাউন্টার করেন। একের পর এক কেস ক্র্যাক করেছেন। এহেন এক অফিসার বদ্রীশ কোথায়? কোথায় বদ্রী? জানতে চাইছেন খোদ পুলিশ কমিশনার নীরজ কুমার ফোন তুলছে না কেন? তাঁর সহকর্মীরা অধৈর্য হয়ে যাচ্ছেন। কারণ এরকম কখনও বদ্রী করে না। বাড়িতে ফোন করা হল। বদ্রী দত্তের স্ত্রী বললেন, উনি তো নেই। অন্য ফ্ল্যাটে একটা কাজে গিয়েছিলেন। গতকাল রাতে। ফেরেননি। আর অপেক্ষা করা যায় না। তাই বদ্রী দত্তের এক সহকর্মী সোজা জিপ নিয়ে গুড়গাঁও। সেখানেই ফ্ল্যাটে গিয়েছিলেন বদ্রীশ। তাঁর নিজের অন্য ফ্ল্যাট ফরিদাবাদ। সেক্টর ফিফটি টুতে সেকেন্ড ফ্লোর ফ্ল্যাট। ভেতর থেকে বন্ধ। ডোরবেল বাজানো হল। সাড়া নেই। অবশেষে দরজা ভাঙা হল। ভিতরে অদ্ভুত দৃশ্য। বদ্রীশ দত্ত এবং আর এক মহিলা মেঝেতে পড়ে আছেন। দুজনেই গুলিবিদ্ধ। এবং মৃত। বদ্রীশের পেটে ও বুকে গুলি। মহিলার মাথায়। মহিলার নাম গীতা শর্মা। বদ্রীশ দত্তের পরিচিতা। শোনা যাচ্ছিল গার্ল ফ্রেন্ড। গীতা শর্মার পরিচয় কী? তিনি একজন প্রাইভেট ডিটেকটিভ। প্রাথমিক তদন্তে ধরে নেওয়া হল দুজনের মধ্যে কোনো কারণে ঝগড়া হয়েছিল। রাগের বশে প্রথমে বদ্রীশকে গুলি করে হত্যা করে গীতা শর্মা আত্মহত্যা করেছেন। কিন্তু আলমারি ভাঙা কেন? বদ্রীশ দত্ত দিল্লি পুলিশের স্পেশাল সেলে সেই সময় ঠিক কী নিয়ে তদন্ত করছিলেন? আইপিএল!
ম্যাচ ফিক্সিংয়ের প্রধান ইনভেস্টিগেশন অফিসার ছিলেন বদ্রীশ। আর এ ব্যাপারে নিজের সোর্সকে কাজে লাগিয়েছিলেন। সাফল্যও পেয়েছেন। অন্যতম সোর্স সম্ভবত এই গীতা শর্মা। প্রাইভেট ইনভেস্টিগেটর। সেদিনই দুপুরে বদ্রীশ দত্তের নেতৃত্বে মুম্বই যাওয়ার কথা দিল্লি পুলিশের। ছিল একটি গোপন অভিযান। তার আগেই কেন খুন হতে হল বদ্রীশ দত্তকে? আজও ওই হত্যাকাণ্ডের সঠিক কারণ জানা গেল না। তাহলে কি আইপিএল ফিক্সিংয়ের বিস্ফোরক কিছু জেনে ফেলেছিলেন? তাই সরে যেতে হল? বদ্রীশ দত্ত আজ নেই। আইপিএল অবশ্য আজও আছে। আমরাও আছি। মাঠে ভিড় জমাতে।
