রাত আড়াইটের সময় একের পর এক দরজায় ধাক্কা। অবিরাম। ‘জেন্টলম্যান প্লিজ ওপেন দ্য ডোর..জেন্টলম্যান ইটস আর্জেন্ট…জেন্টলম্যান ইওর প্রাইম মিনিস্টার ইজ ডাইং…!’ যাঁদের ঘরের দরজায় ধাক্কা দেওয়া হচ্ছে তাঁরা কেউ ভারতীয় বিদেশমন্ত্রকের সচিব, কেউ প্রধানমন্ত্রীর অ্যাডভাইসর, কেউ ইনটেলিজেন্স ব্রাঞ্চের অফিসার অথবা দূতাবাসের অ্যাটাশে। ১০ জানুয়ারি ১৯৬৬ মধ্যরাত। অসহ্য ঠান্ডা। রাতে ঘুমাতেও দেরি হয়েছে সকলের। কারণ গতকাল এই তাসখন্দে এক ঐতিহাসিক যুদ্ধবিরতি চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী লালবাহাদুর শাস্ত্রী এবং পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আয়ুব খানের মধ্যে। ১৯৬৫ সালের সেই যুদ্ধে পাকিস্তান যথেষ্ট ল্যাজেগোবরে হয়েছে। তারা ভেবেছিল ভারত এখনও ১৯৬২ সালের সেই চীন যুদ্ধের ধাক্কা সামলাতে পারেনি আর সেরকমই যুদ্ধে অপ্রস্তুত অবস্থায় রয়ে গিয়েছে। কিন্তু আদতে তা হয়নি। জম্মু-কাশ্মীর তো বটেই, ভারতীয় সেনারা প্রায় লাহোরের দিকে যাত্রা শুরু করে দিয়েছিল পালটা পাঞ্জাব বর্ডার ক্রস করে আক্রমণ করে। রাষ্ট্রসংঘের হস্তক্ষেপে মান বেঁচেছে পাকিস্তানের। কিন্তু তার ৬ মাস পর সোভিয়েত ইউনিয়নের উদ্যোগে এই তাসখন্দ সম্মেলন পাকিস্তানকে আরও ব্যাকফুটে ফেলেছে। যাই হোক, পরদিনই ফেরা দিল্লি। দূতাবাসে রাশিয়ার অফিসারদের নিয়েই ছোটখাটো পার্টি হয়েছে। তাই প্রত্যেকের দেরি হয়েছে ঘুমাতে। প্রধানমন্ত্রী লালবাহাদুর শাস্ত্রীর জন্য সোভিয়েত প্রশাসন যে বাসস্থানের ব্যবস্থা করেছে, তার থেকে কিছুটা দূরে আর একটি বাংলোয় ভারতীয় অফিসারদের আস্তানা। সেখানেই এই মধ্যরাতের দরজায় করাঘাত। প্রবল বেগে। এবং আতঙ্ক জড়ানো কণ্ঠ এক মহিলার। তড়িঘড়ি করে সকলেই লাফ দিয়ে উঠলেন একটিমাত্র বাক্য শুনে..ঘুমের মধ্যে সঠিক শুনেছেন তো সবাই বাক্যটি? নাকি ভুল শোনা হয়েছে? বাক্যটি হল, ইয়োর প্রাইম মিনিস্টার ইজ ডাইং…! প্রধানমন্ত্রী মারা যাচ্ছেন? মানে কী? কীভাবে? এটা সম্ভব নাকি? নাইট গাউন ছাড়াই অনেকে দরজা খুলে বেরিয়ে এসে দেখলেন রাশিয়া প্রশাসনের তথ্য দপ্তরের এক মহিলা অফিসার প্রায় কাঁপছেন। বললেন, আপনারা আসুন… আপনারা চলুন… হি ইজ সাফারিং আ ম্যাসিভ হার্ট অ্যাটাক..। কোনোমতে গরম জামাকাপড়। গায়ে দিয়ে একটা গাড়িতেই সকলে বসে ছুটলেন শাস্ত্রীর বাংলোর দিকে। কাছে গিয়ে দেখা গেল বারান্দায় একটা ছোট্ট ভিড়। আর অস্বাভাবিক নীরবতা। দূর থেকে যাঁকে চেনা গেল তিনি হলেন আলেক্সি কোসিগিন। সোভিয়েত প্রিমিয়ার। ভারতীয় অফিসার, কূটনীতিক আর সাংবাদিকদের দেখেই তিনি একধাপ নেমে এলেন সিঁড়িতে। সেই দলে ছিলেন প্রখ্যাত সাংবাদিক কুলদীপ নায়ার যিনি সেই সময় অন্যতম অ্যাডভাইসর প্রধানমন্ত্রীর। তার আগের দিনই প্রিমিয়ার কোসিগিনের একটি সাক্ষাৎকার নিয়েছেন তিনি। তাঁকে দেখেই কোসিগিন মাথা নাড়লেন, আর হাতটা নাড়িয়ে বোঝালেন ইটস ওভার..। তার মানে? নেই? শাস্ত্রীজি নেই? সম্পূর্ণ সুস্থ, চূড়ান্ত সাধারণ জীবনযাপন করা একজন মানুষ ৬২ বছর বয়সে আচমকা চলে যেতে পারেন নাকি? সকলেই হতচকিত। দৌড়ে ভিতরে গিয়ে কী দেখা গেল? প্রয়োজনের থেকে বিপুল বড়। একটা ঘর। একজন মানুষের পক্ষে শয়নের তুলনায় বিরাটকায় এক বেড। ঝকঝকে সাদা বেডশিট। সাদা পিলোকভার। সাদা পর্দা। কিন্তু বাবুজি (লালবাহাদুর শাস্ত্রীকে ওই নামেও সম্বোধন করা হত) যে বালিশে মাথা রেখে ঠিক যেন ঘুমিয়ে আছেন, তার পিছনে লাল দাগ কেন? রক্ত নাকি? আচমকা বাইরে প্রবল একঝাঁক গাড়ির শব্দ। জিপ। সেখান থেকে কঠোর মুখের সুট পরা চারজন রাশিয়ান ভদ্রলোক তড়িৎ বেগে নামলেন। মুখে কোনো এক্সপ্রেশন নেই। শরীর অত্যন্ত বলবান। তাঁরা জিপ থেকে নেমেই সোজা জানতে চাইলেন বাটলার হাউস কোথায়? অর্থাৎ যাঁরা ভিভিআইপির রান্নাবান্না করে সেই কুক, বাটলাররা কোথায় থাকে? ঠিক উলটোদিকের বিল্ডিংটি দেখানো হল তাঁদের। দৌড়ে গিয়ে ঢুকলেন তাঁরা সেই ভবনে। আর আতঙ্কে কম্পমান চার রাশিয়ান বাটলারকে বাইরে বের করে জিপে বসিয়ে এক নিমেষে উধাও হয়ে গেলেন। কারা এঁরা? জানা গেল এঁরা দুর্ধর্ষ রাশিয়ান স্পাই এজেন্সি কেজিবির চার এজেন্ট। বাটলারদের নিয়ে যাওয়া হল কেন? তাহলে কি শাস্ত্রীর স্বাভাবিক মৃত্যু হয়নি? কেজিবি এখানে কেন? তাঁরা ওই চারজনকে নিয়ে গেলই বা কোথায়? মধ্যরাতে, তাসখন্দে যে এরকম একটি চরম সাসপেন্স ভরা নাটকীয়তাপূর্ণ পরিস্থিতিতে ভারতবর্ষের প্রধানমন্ত্রীর মৃত্যু হচ্ছে, এটা দুনিয়ার কেউ জানতে পারছে না তখন। হাতেগোনা ভারতের কিছু সরকারি অফিসার। রাশিয়ান প্রশাসনিক কর্তারা। আর একটু পরই জেনে যাবে পাকিস্তানের তাবত নেগোশিয়েটর এবং প্রেসিডেন্ট জেনারেল আয়ুব খান।
তারপর কী হল? ধীরে ধীরে জানা গেল একঝাঁক অসঙ্গতি। অনেক না মেলা প্রশ্ন নিয়ে শাস্ত্রীর নিথর দেহ ফিরল দিল্লিতে। আর সেই মৃতদেহ দেখে সর্বপ্রথম শাস্ত্রীর মা চিৎকার করে বলে উঠলেন, হায় হায়..মেরে বিটওয়া কো জহর (বিষ) সে মার দিয়া…। তারপর? জানব একটু পরে। তার আগে জেনে নেওয়া যাক কী সেই ঘটনাপরম্পরা যা লালবাহাদুর শাস্ত্রীর নিয়তি তাঁকে নিয়ে এসেছিল ১৯৬৬ সালের জানুয়ারিতে এই সোভিয়েত ইউনিয়ন শাসিত এক প্রদেশের রাজধানী তাসখন্দে (যা আজকের উজবেকিস্তান)? যেখানে পাকিস্তানের সঙ্গে একটি চুক্তিপত্রে স্বাক্ষর এবং তাখসন্দ ঘোষণাপত্রের মাত্র ১২ ঘণ্টার মধ্যে তাঁর মৃত্যু হল বিদেশের মাটিতে! কী হয়েছিল?
কাশ্মীরের নেতা শেখ আবদুল্লা মক্কা গেলেন। ১৯৬৫। মার্চ। দু মাস আগে নিজের দল ন্যাশনাল কনফারেন্সকে ভারতের জাতীয় কংগ্রেসের সঙ্গে যুক্ত করেছেন। গোটা কৌশলটিই অবশ্য স্ট্র্যাটেজিক। শেখ আবদুল্লা কাশ্মীর যাওয়ার আগে প্রধানমন্ত্রী লালবাহাদুর শাস্ত্রী তাঁকে একটি পরোক্ষ বার্তা দিলেন। নিজে কিছু বলেননি। রাজ্যসভার এমপি সুধীর ঘোষকে দিয়ে দিলেন বার্তাটি। সেটি হল শেখ আবদুল্লা কাশ্মীর নিয়ে খুব বেশি হলে যে দাবিটি আদায় করতে পারেন, সেটি হল ভারতের অন্তর্গত জম্মুকাশ্মীরের স্বশাসনের অধিকার। যেরকম অনেক পার্বত্য এলাকাকে দেওয়া হয়েছে। তার বেশি কিছু নয়। ভারত থেকে মক্কা যাওয়ার অদ্ভুত রুট নিলেন শেখ আবদুল্লা। ভায়া লন্ডন। তাঁর এক প্রিয়পুত্র সেখানেই থাকে। ফারুখ আবদুল্লা। দিল্লি এবং বিশেষ করে কংগ্রেস তথা ভারত সরকার অত্যন্ত শঙ্কিত হয়ে অপেক্ষা করছে যে, লন্ডনে সাংবাদিকদের সামনে শেখ আবদুল্লা বেফাঁস কিছু মন্তব্য করে বসেন কিনা। একটু লাগামছাড়া বক্তব্যই পাকিস্তানের হাতে অস্ত্র তুলে দেবে কাশ্মীর নিয়ে। এবং লন্ডনে দাঁড়িয়ে কিছু বলা মানে আন্তর্জাতিক স্তরের ইস্যু হয়ে যাবে। যদিও সেরকম কিছু ঘটল না। শেখসাহেব অত্যন্ত ম্যাচিওরড আচরণ করলেন। কোনো বিতর্কিত কথা, কাশ্মীর ইস্যুতে ত্রিপাক্ষিক কোনো হস্তক্ষেপ এসব কিছুই বললেন না। হাঁফ ছাড়ল ভারতীয় প্রশাসন। কিন্তু কতক্ষণের জন্য? বেশিক্ষণের জন্য নয়। কারণ মক্কাযাত্রার পর ফেরার পথে আবার এক অদ্ভুত রুট নিয়েছিলেন শেখ আবদুল্লা। আচমকা তিনি গেলেন আলজিরিয়া। সেখানে একটি বৈঠক করলেন এমন একজনের সঙ্গে যে, এরকম যে কোনো পরিণতমনস্ক রাজনীতিক করতে পারেন, তা কল্পনাতেও ছিল না কারও। যাঁর সঙ্গে শেখ আবদুল্লা বৈঠক করলেন তাঁর নাম চৌ এন লাই। চীনের প্রধানমন্ত্রী। ভারতের সঙ্গে চীনের তখন চরম ঠান্ডা সম্পর্ক। ১৯৬২ সালের যুদ্ধের পর চীনের সঙ্গে সম্পর্ক তলানিতে। এহেন চীনের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে শেখ আবদুল্লা বৈঠকে কাশ্মীর নিয়ে নিশ্চয়ই কোনো গোপন ফরমুলার আলোচনা করেছেন! এ নিয়ে কারও মনে কোনো সন্দেহ রইল না। সকলেই নিশ্চিত আদতে কাশ্মীরের পূর্ণ স্বাধীনতার লক্ষ্যেই শেখ কোনো নিশ্চয়তা চেয়েছেন চীনের কাছে। আর চীন তো এক পায়ে রাজি হবেই। ভারতে ফেরার পর প্লেন থেকে দিল্লির পালাম এয়ারপোর্টে নামার সঙ্গে সঙ্গেই শেখ আবদুল্লাকে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে গ্রেপ্তার হল। নিয়ে যাওয়া হল রাজধানী দিল্লির এক সরকারি বাংলোয়। গৃহবন্দি। কিন্তু সেখানেও বেশিদিন নয়। দ্রুত তাঁকে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হল দক্ষিণ ভারতে। কোদাইকানালের এক মনোরম পরিবেশে একটি সুদৃশ্য আধুনিক কটেজে স্থান হল। কাশ্মীরের একটি বড় অংশের মানুষ ক্ষুব্ধ হলেন। এভাবে কেন শেখ সাহেবকে গ্রেপ্তার করেছে ভারত সরকার? অপরাধটা কী? একজন আন্তর্জাতিক মানের নেতা আর একজন আন্তর্জাতিক নেতার সঙ্গে দেখা করেছেন, বৈঠক করেছেন, কথা বলেছেন। এর মধ্যে অন্যায় কী? এসব নিয়ে তুমুল সরগরম কাশ্মীরও। ঠিক সেই সময়ই গুজরাতের কচ্ছের রানে আচমকা ভারত ও পাকিস্তানের সেনাদের মধ্যে গুলিবিনিময় শুরু হল। আর ঠিক এই সময় জেনারেল আয়ুব খানের মনে হল একদিকে শেখ আবদুল্লাকে গ্রেপ্তার করায় কাশ্মীরের মানুষ ক্রুদ্ধ, আবার কচ্ছের রানে সেনাবাহিনীকে ব্যস্ত রেখে দেওয়া হয়েছে, এটাই আদর্শ সময় ভারতকে উচিত শিক্ষা দেওয়ার। কাশ্মীর দখলের। আয়ুব খান ধরেই নিলেন কাশ্মীরের মানুষ এবার সর্বান্তঃকরণে পাকিস্তানকে স্বাগত জানিয়ে জয়ের পথ সুগম করে দিতে সাহায্য করবে। সুতরাং জেনারেল আয়ুব খান শুরু করলেন তাঁর বিশেষ প্ল্যান। অপারেশন জিব্রাল্টর। লালবাহাদুর শাস্ত্রীর সঙ্গে জেনারেল আয়ুব খানের এর আগে মাত্র একবারই দেখা হয়েছিল। ১৯৬৪ সালের অক্টোবরে। মিশরের কায়রো থেকে দিল্লি ফেরার পথে শাস্ত্রী স্থির করেছিলেন করাচিতে নামবেন। সেইমতো জেনারেল আয়ুব খানের সঙ্গে তাঁর দেখা ও বৈঠকও হল। আয়ুব খানের পরনে ছিল সুট। আর লালবাহাদুর শাস্ত্রীর ছোটখাটো শরীরে সেই চিরাচরিত ধুতি আর পাঞ্জাবি। শাস্ত্রী চলে যাওয়ার পর আয়ুব খান নিজের মন্ত্রীদের কয়েকজনকে বেশ তাচ্ছিল্যের ভঙ্গিতে বলেছিলেন, নেহরুর স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন এই লোকটা! আয়ুব খান লালবাহাদুর শাস্ত্রীকে জাজ করতে ভুল করেছিলেন। এমনিতে শাস্ত্রী অত্যন্ত সাদামাঠা মনের মানুষ হলেও তাঁর ভিতরে কোনো দ্বিধা ছিল না যে তাঁর পছন্দ এবং অপছন্দ কোনটা। এলাহাবাদ থেকে রাজনীতি করা ভদ্রলোক আজীবন দেশ ও রাজনীতির কথাই ভেবেছেন। অন্য কোনোদিকে মন দেননি। জওহরলাল নেহরুর মতো শাস্ত্রীর স্টেটসম্যান কিংবা আন্তর্জাতিক নেতা হওয়ারও কোনো বাসনা ছিল না। তিনি ভারতের প্রধানমন্ত্রী এবং ভারতের ভূমিখণ্ড রক্ষা করার দায়িত্ব তাঁর, এই মনোভাবেই স্থির ছিলেন। কচ্ছের রানে যখন প্রবল গুলিবর্ষণ এবং প্রায় যুদ্ধ পরিস্থিতি চলছে, তখনও শাস্ত্রী চাইছিলেন একটা কোনো শান্তিপূর্ণ মীমাংসা। তিনি চাননি কোনো যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে। কিন্তু সেটি তাঁর দুর্বলতা নয়। তাঁর আদর্শ ও নীতি। এবং যেই পাকিস্তান অপারেশন জিব্রাল্টর শুরু করে দিল কাশ্মীরে, তখন শাস্ত্রী সামান্য দ্বিধা না করেই তাঁর কমান্ডারদের বললেন, আপনারা যা ভালো বুঝবেন সেটাই করবেন। সরকার কোনো বাধা হয়ে দাঁড়াবে না। ১৯৬৫ সালের ৫ আগস্ট পাকিস্তান থেকে একঝাঁক অনুপ্রবেশকারী কাশ্মীরে ঢুকে পড়ে। ঢুকেই একের পর এক সেতু উড়িয়ে দিল। সরকারি ভবনগুলি বোমা মেরে বিস্ফোরণে চুরমার করে দিতে শুরু করল তারা। কোনো বাধা না পেয়ে পাকিস্তান উল্লসিত। রেডিও পাকিস্তান ঘোষণা করে দিল “ভারত অধিকৃত কাশ্মীরে” বিদ্রোহ শুরু হয়েছে ভারত সরকারের বিরুদ্ধে। কাশ্মীরের মানুষ আজাদির লড়াই শুরু করেছে। পাকিস্তানবাসী উল্লাসে বাজি ফাটাতে শুরু করেছিল। কিন্তু আসল ঘটনা অন্য। ভারতীয় সেনা সম্পূর্ণ অন্যরকম প্ল্যান নিয়ে যে এলাকা থেকে পাকিস্তানের অনুপ্রবেশকারীরা প্রবেশ করেছিল, সেই পাকিস্তানের দখলে থাকা হাজি পীর পাস দখল করে নিল। ২৭ আগস্ট। অনুপ্রবেশকারীরা ততক্ষণে কাশ্মীরের ভিতরে ঢুকে আছে। সামনে থেকে ভারতীয় সেনারা আক্রমণ করছে। আবার পিছনে হাজি পির পাস ভারতীয় সেনার দখলে। মাঝখানে আটকে গেল তারা। সোজা কথায় আয়ুব খানের অপারেশন জিব্রাল্টর বিপর্যয়ের মুখে। সবথেকে হতাশার ব্যাপার হল, আয়ুব খান ভেবেছিলেন এবং নিজের দেশে রেডিও মারফত প্রচার করছিলেন, কাশ্মীরবাসীরা বিদ্রোহ করছে, তা সম্পূর্ণ বিপরীত হল। বরং উলটে কাশ্মীরবাসীরা সুযোগ পেলেই পাকিস্তানীদের ধরে ফেলে ভারতীয় সেনার হাতে তুলে দিয়েছে। যা অপ্রত্যাশিত পাকিস্তানের কাছে। এবার কী করা হবে? কিন্তু কাশ্মীর দখলে মরিয়া জেনারেল আয়ুব খানের কাছে যে ‘প্ল্যান বি’ আছে তা জানা গেল কয়েকদিনের মধ্যেই। এবারের নাম অপারেশন গ্র্যান্ডস্লাম। এই অপারেশনের লক্ষ্য আখনুর ব্রিজ দখল করা। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে পাকিস্তানের ইনফ্র্যান্ট্রি ডিভিশন এবং সদ্য আমেরিকার থেকে উপহার পাওয়া প্যাটন ট্যাংকের মাধ্যমে ৩০ বর্গমাইল ভারতীয় এলাকা দখল করে নিল পাকিস্তান। আখনুর ব্রিজ দখল করে নেওয়ার লক্ষ্য স্থাপনের কারণ পাঞ্জাবের সঙ্গে জম্মু-কাশ্মীরের যোগসূত্র ছিন্ন হয়ে যাবে। সোজা কথায় ভারতের মূলস্রোতের সঙ্গেই কাশ্মীর ছিন্ন হয়ে যাবে। ভারত তৎক্ষণাৎ এয়ারফোর্সকে অপারেশন শুরু করতে নির্দেশ দিল। মুহূর্তের মধ্যে ৩০টি ভারতীয় বায়ুসেনার ভ্যাম্পায়ার যুদ্ধবিমান অবিশ্রান্ত বোমাবর্ষণ শুরু করল শত্রুবাহিনীর উপর। জবাব দিতে এগিয়ে এল পাকিস্তান এয়ারফোর্সের সাবার জেট। ক্রমেই যখন পাকিস্তান আখনুর দখলের দিকে এগোচ্ছে এবং জয়ের গন্ধ পেয়ে আয়ুব খান রীতিমতো উল্লসিত, ঠিক তখনই লালবাহাদুর শাস্ত্রী দিয়েছিলেন মাস্টারস্ট্রোক। তিন সেনাবাহিনী প্রধানের সঙ্গে বৈঠক করে স্থির হল কাশ্মীরে সর্বশক্তি নিয়োগ করে পাকিস্তানকে হতচকিত করে দিতে হবে অন্য নতুন ফ্রন্ট খুলে। তাই হল। ৬ সেপ্টেম্বর সকালে একঝাঁক ভারতীয় সেনার ইনফ্র্যান্টি ডিভিশন আর ট্যাংক রেজিমেন্ট সোজা অমৃতসর সীমান্ত ক্রস করে লাহোরের দিকে এগোতে শুরু করল। পাকিস্তানের মাথায় হাত। এরকম কোনো সম্ভাবনার কথা মাথায় রাখেনি তারা। সমস্যাটা হল জেনারেল আয়ুব খানের পরামর্শদাতা এবং আর্মি অফিসাররা সকলেই ছিলেন ইয়েস ম্যান। পাকিস্তান প্রশাসনের প্রথম থেকেই যেটি সবথেকে বড় দুর্বলতা। নিয়ম হল, যে কোনো দেশের যুদ্ধকৌশল নির্ধারণের ক্ষেত্রে থাকতেই হবে একটি কাউন্টার সিন্ডিকেট। সেই কাউন্টার সিন্ডিকেটের কাজ হল প্রশাসক, আর্মি, পরামর্শদাতাদের সিংহভাগ যে সিদ্ধান্তটি গ্রহণ করতে চলেছে, আগেভাগেই সেই সিদ্ধান্তটি ফ্লপ করলে বা ব্যর্থ হলে কী করতে হবে, তার রূপরেখা ঠিক রাখা। অথবা বিকল্প ব্যবস্থা তৈরি রাখা। কিন্তু একনায়কতন্ত্রে সেটি চলে না। জেনারেল আয়ুব খান যা স্থির করছেন তার বিরোধিতা করা মানেই জেনারেলের রোষে পড়া সুতরাং আর্মির মধ্যেও কোনো বিপরীত অভিমত কেউ প্রদান করেনি। আয়ুব খান ভেবেছিলেন ১৯৬২ সালের ভারত আর ১৯৬৫ সালের ভারত একই জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে। চীনের কাছে নাস্তানাবুদ হওয়া ভারত আর ১৯৬৫ সালের ভারত যে এক নয়, সেটি তাঁর বুঝতে দেরি হয়েছিল। কারণ তাঁকে পাকিস্তানের ইনটেলিজেন্স সঠিক খবর দেয়নি যে, ভারতের বর্তমান প্রতিরক্ষামন্ত্রী ওয়াই বি চ্যবন কয়েকবছর ধরে লাগাতার ইওরোপ আর রাশিয়া সফর করে অসংখ্য আধুনিক ট্যাংক, আগ্নেয়াস্ত্র, সাবমেরিন, ফাইটার জেট কিনে ফেলেছেন। সোভিয়েত ব্লক সম্পূর্ণভাবে ভারতের পাশে দাঁড়িয়ে বিপুল অস্ত্রসম্ভার দিয়েছে ভারতকে। সুতরাং সেটি ছিল অন্য ভারত। এবং সেই ভারতের দেশভক্তি কিংবা মনের জোরও ছিল মারাত্মক। পাকিস্তান লড়াই করছিল সাম্প্রদায়িক লাইনে। “হিন্দু ভারত কাশ্মীরের মুসলমান ভাইদের অত্যাচার চালাচ্ছে।” এই ছিল প্রাকপ্রচার। কিন্তু ভারতের রাজস্থানের এক সেনা ট্যাংক যুদ্ধে একাই পাকিস্তানের একের পর এক ট্যাংক ধ্বংস করেছিলেন। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী জেনারেল আয়ুব খান পরে জানতে পেরে স্তম্ভিত হয়ে যান যে, ভারতের ওই সেনাটির নাম ছিল আয়ুব খান। ওই যুদ্ধের পর কেরলের এক মুসলিম সেনা সর্বোচ্চ সম্মান পেয়েছিলেন পরমবীর চক্র। আর একটি কাহিনি আরও প্রেরণাদায়ক। সেনাপ্রধান জেনারেল কে এম কারিয়াপ্পার পুত্র ছিলেন এই যুদ্ধে এয়ারফোর্সের এক ফাইটার পাইলট। তাঁর যুদ্ধবিমানকে গুলি করে নামিয়ে এনেছিল পাকিস্তানীরা। জেনারেল আয়ুব খান জেনারেল কারিয়াপ্পাকে একটি ব্যক্তিগত বার্তা দিয়ে বলেছিলেন, আপনার পুত্রের কোনো ক্ষতি হবে না। আমরা তাঁকে মুক্তি দেব। শোনা যায়, তার জবাবী বার্তায় জেনারেল কারিয়াপ্পা বলেছিলেন, এই যুদ্ধে আমার হাজার হাজার পুত্র লড়াই করছে। প্রত্যেকটি ভারতীয় যুদ্ধবন্দি আমার পুত্র। আমার নিজের পুত্র বলে কারও প্রতি কোনো বিশেষ ব্যবহার করার কোনো দরকার নেই।
এদিকে পাকিস্তানে কিন্তু পাকিস্তান সরকার ও প্রচার মাধ্যম তখনও প্রচার চালিয়ে যাচ্ছে যে আর মাত্র কয়েক.দিন। তারপরই কাশ্মীর দখল হয়ে যাবেই। এমনকী পাঞ্জাবের অনেকটা জমি দখল করে নিতে পারছে পাকিস্তানী সেনা। পাকিস্তান জুড়ে গান চলছিল মাইকে, “হাসকে লিয়া হ্যায় পাকিস্তান, লড়কে লেঙ্গে হিন্দুস্তান”..। অন্যদিকে দিল্লিতে তখন যুদ্ধজয় নিয়ে এতটাই তুঙ্গে উত্তেজনা যে, সকলেই উদগ্রীব কখন খবর আসবে লাহোর দখল হয়ে গিয়েছে। কিন্তু সেই সময় চলছিল চরম ট্যাংক যুদ্ধ। গোটা যুদ্ধে পাকিস্তানের ক্ষতি হয়েছে ২৫০টি ট্যাংক, ৫০টি এয়ারক্র্যাফট। প্রায় ৫ হাজার সৈন্য হতাহত হয়েছে। আবার ভারতেরও ক্ষতি হয়েছে প্রায় ৩০০ ট্যাংক, ৫০টি এয়ারক্র্যাফট এবং হতাহতের সংখ্যা প্রায় ৬ হাজার। পাকিস্তানের থেকে বহুগুণ বেশি জনসংখ্যা, সেনাবাহিনী, এয়ারফোর্সের আয়তনের তুলনায় ভারতের ক্ষয়ক্ষতি আনুপাতিকভাবে অনেকটা কম। এবং সবথেকে বড় কথা হল পাকিস্তানের চরম বেইজ্জতি। কাশ্মীরের মানুষ পাকিস্তানকে চরম হতাশ করেছে। আবার ততদিনে ভারত প্রায় ৭০০ বর্গমাইল পাকিস্তানী জমি দখল করে ফেলেছে। আর ভারতীয় জমি পাকিস্তানের হস্তগত হয়েছে ৪০০ বর্গমাইল। ঠিক এরকম একটি মুহূর্তে রাষ্ট্রসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের সেক্রেটারি জেনারেল ইউ থন্ট দিল্লি ও করাচিতে এসে দু’পক্ষকেই বললেন, আর নয়! এবার যুদ্ধ বন্ধ করুন। অনেক টালবাহানার পর ২২ সেপ্টেম্বর যুদ্ধ আনুষ্ঠানিকভাবে সমাপ্ত হল। যুদ্ধসমাপ্তির আগেও পাকিস্তান জ্বালা ভুলতে না পেরে সাম্প্রদায়িক লাইনেই প্রচার চালিয়ে যায়। বলা হয় লালবাহাদুর শাস্ত্রী একজন হিন্দু নেতা। তাই তিনি পাকিস্তানকে দখল করতে চান। ঠিক যুদ্ধসমাপ্তির পর দিল্লির রামলীলা ময়দানে এক সমাবেশ ডাকা হয় যুদ্ধজয়ের আনন্দে। সেই মিটিংএ শাস্ত্রী বলেন, আজকের এই জনসভার সভাপতি কে? ওই যে বসে আছেন মীর মুস্তাক সাহেব। তিনি একজন মুসলিম। আজকের জনসভার প্রথম উদ্বোধনী বক্তা কে? ওই যে মিস্টার ফ্র্যাঙ্ক অ্যান্টনি। একজন খ্রিস্টান। মঞ্চে পার্সি, শিখ সকলেই বসে আছে। পাকিস্তানের কাছে এসব হল স্বপ্ন। তাদের রাষ্ট্রনেতাদের একটাই কাজ। ধর্মীয় জিগিরে দেশপ্রেম জাগিয়ে তোলা। তা না হলে তারা ক্ষমতায় থাকতেই পারবে না। ভারতের সঙ্গে পাকিস্তানের তুলনাই চলে না। যুদ্ধসমাপ্তির পর সোভিয়েত ইউনিয়ন প্রস্তাব দিল, তারা ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে এই যুদ্ধ সমাপ্তির একটি চুক্তি সম্পাদন ও আনুষ্ঠানিক ঘোষণাপত্র প্রকাশের ক্ষেত্র ও মধ্যস্থতাকারী হতে প্রস্তুত। সেইমতো ১৯৬৫ সালের ২২ সেপ্টেম্বর যুদ্ধ শেষ হলেও ১৯৬৬ সালের জানুয়ারিতে তাসখন্দে সেই চুক্তি সম্পাদন ও দর কষাকষির ক্ষেত্র প্রস্তুত হয়েছিল। সেখানেই গিয়েছিলেন লালবাহাদুর শাস্ত্রী। প্রায় সপ্তাহখানেক ধরে দড়ি টানাটানি। কারণ কে কতটা অধিকৃত ভূমি ছাড়বে, যুদ্ধবন্দিদের সংখ্যা কত, ক্ষতিপূরণ কীভাবে হবে এসব ছিল প্রধান ইস্যু। অবশেষে স্থির হল ১৯৬৫ সালের ৫ আগস্ট যাঁদের দখলে যে ভূমি ছিল, সেটি এবং যেখানে যাঁদের সেনাবাহিনী অবস্থান করছিল সেই পুরোনো অবস্থানে ফিরে যেতে হবে। সুতরাং ভারতের লোকসান হল হাজি পীর পাস ফেরত দিয়ে দিতে হয়েছিল। যা পাকিস্তানের কাছে সর্বোত্তম উপহার ছিল। কিন্তু পাকিস্তানের মানুষ এসবে সন্তুষ্ট নয়। তারা তুমুল ক্ষিপ্ত আয়ুব খানের উপর। কারণ সবটাই ধোঁকা ছিল। কাশ্মীরবাসী সঙ্গে নেই। চীন অনেক লম্বাচওড়া লেকচার দিয়েছে, দিল্লির নিন্দা করেছে, কিন্তু সরাসরি সাহায্য করেনি। আর এই যুদ্ধে পাকিস্তানের কোনো লাভই হয়নি। অর্থনীতি ধসে গিয়েছিল। সুতরাং আয়ুব খান ছিলেন হতাশ ও নিরাশ।
চুক্তি সম্পাদনের আলোচনা শুরু হওয়ার আগে জেনারেল আয়ুব খান বুঝে গিয়েছিলেন শাস্ত্রী লোকটি মোটেই সহজ নয়। নরম নয়। দেখতে ওরকম। তিনি শুরুতেই বলেছিলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীজি কাশ্মীর কে মামলে মে কুছ অ্যায়সা কর দিজিয়ে কী ম্যায়ভি আপনে মুলক মে মুহ দিখানে কাবিল রহু..’। মুচকি হেসে লালবাহাদুর শাস্ত্রী সুন্দর উর্দুতে উত্তরে বলেছিলেন, ‘সাহাব, ম্যায় বহোত মুয়াফি চাহতা হুঁ কী ইস মামলে মে ম্যায় কোই খিদমত নেহি কর সাকতা..। ঠিক কতটা তিক্ত ছিল ভারত ও পাকিস্তানের সম্পর্ক? পাকিস্তানে নিযুক্ত ভারতের রাষ্ট্রদূত কেবল সিং পাকিস্তানের অর্থমন্ত্রীর মেয়ের বিবাহে একটি বেনারসি শাড়ি উপহার দিয়েছিলেন। সেই শাড়ি সেই অর্থমন্ত্রী নিলামে চড়িয়েছিলেন এবং সংগৃহীত অর্থ পাকিস্তান ডিফেন্স ফান্ডে দিয়েছিলেন।
১৯৬৬ সালের ১০ জানুয়ারি বিকেলে সেই ঐতিহাসিক তাসখন্দ চুক্তি সম্পন্ন হওয়ার পর সাড়ে ৯ টা নাগাদ নিজের ঘরে ফিরে এলেন লালবাহাদুর শাস্ত্রী। ব্যক্তিগত পরিচারক রামনাথ এসে বললেন, বাবুজি খাবার রেডি করি? এখানে যে কদিন শাস্ত্রী আছেন তাঁর খাবার আসছে তাসখন্দের ভারতীয় দূতাবাসের দূত টি এন কলের বাসভবন থেকে। তাঁর নিজস্ব বাবুর্চি জান মহম্মদ সেই খাবার তৈরি করে। তাসখন্দে আসার আগেই শাস্ত্রী খাবার নিয়ে চিন্তিত ছিলেন। তিনি বিদেশে গেলে এটাই ছিল প্রধান সমস্যা। একেবারে সাধারণ রুটি, ডাল, সবজি ছাড়া বিশেষ কিছুই খেতেন না। রাতে দুধ। টি এন কল আশ্বস্ত করেছিলেন যে চিন্তা নেই। আমার বাড়ি থেকে খাবার যাবে আপনার কাছে। যাক নিশ্চিন্ত! শাস্ত্রীজি রাত পৌনে ১০টা নাগাদ রামনাথকে বললেন, খাবার এসেছে?
হ্যাঁ বাবুজি কিছুক্ষণ আগেই জান মহম্মদ দিয়ে গিয়েছেন। স্পিনাক, একটু আলু ভাজা আর সবজির ঝোল। ব্যস! খাবার পর একটু হাঁটা অভ্যাস শাস্ত্রীর। তাই করলেন। তবে কেন যেন বেশিক্ষণ না। বললেন, আমি ঘুমাব এবার। রামনাথ শুনেই কিচেন থেকে এক গ্লাস দুধ নিয়ে এলেন। রাত ১১ টা ১৫ নাগাদ দুধ খেলেন লালবাহাদুর শাস্ত্রী। পরদিন কাবুল যাওয়া। খুব সকালে। তাই শাস্ত্রী রামনাথকে বললেন, যাও, শুতে চলে যাও। কাল কিন্তু ভোরে ওঠা। যাওয়ার আগে আবার রামনাথকে ডাকলেন। ভ্রু কুঁচকে যাচ্ছে রামনাথের। এরকম অস্বস্তি তো কখনও দেখা যায়নি। কী ব্যাপার! শাস্ত্রী বললেন, একটু জল দাও তো! রামনাথ সঙ্গে সঙ্গে ড্রেসিং টেবিলে কাকা থার্মো ফ্লাস্ক থেকে ঈষদুষ্ণ জল ঢেলে দিলেন। পুরো গ্লাস খেলেন না শাস্ত্রী। বললেন, আচ্ছা। এবার যাও। চলে গেলেন রামনাথ ঘুমাতে। বললেন, বাবুজি আজ আমি মেঝেতে আপনার কাছেই শুয়ে পড়ি? এইটুকু তো রাত। কেটে যাবে! শাস্ত্রী মাথা নাড়লেন। বললেন, না না, তুমি দোতলায় যাও। আজ ভালো ঘুমানোর দরকার। কাবুলের কোনো সময়ের ঠিক নেই মিটিং এর। যাও…। যাওয়ার
রহস্য
রাত দেড়টা। ঠিক পাশের ঘরে শাস্ত্রীর ব্যক্তিগত সচিব জগন সহায় আর দুজন স্টেনোগ্রাফার রয়েছেন। মাঝখানের দরজায় নক করছে কেউ। এই ঘরে অবশ্য কেউ ঘুমোয়নি। কারণ প্যাকিং চলছে। কাল ভোরে বেরনো। তাই এখনই প্যাক না করা হলে এয়ার ইন্ডিয়ার ফ্লাইটে আগেভাগে লাগেজ দেওয়া যাবে না। সিকিউরিটির লোকজন অনেক আগে এসে প্রাইম মিনিস্টারের সফরসঙ্গীদের লাগেজ নিয়ে যায়। বোঝা গেল আর কেউ নয়, স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী দরজায় নক করছেন। ধড়ফড় করে উঠলেন সহায়। দরজা খুলেই দেখলেন শাস্ত্রী প্রায় কথা বলতে পারছেন না। কোনোমতে বলছেন জল..। জল? জল তো বাবুজির ঘরেই টেবিলে থাকে? আজ কি রামনাথ রাখেনি? জগন দ্রুত ঘরে এসে দেখলেন থার্মোফ্লাস্ক আছে। তার মানে বাবুজি বুঝতে পারেননি। জল খেয়ে শাস্ত্রী বললেন, ডক্টরসাব কোথায়? জগন সহায় শাস্ত্রীকে জল দিয়ে বললেন, বাবুজি এবার আপনি একদম ঠিক হয়ে যাবেন। ততক্ষণে শাস্ত্রী খুব কাশছেন। অবিরত। এবার জগন সহায় বুঝলেন অবস্থা একটু সিরিয়াস। তিনি ধরে ধরে শাস্ত্রীকে শুইয়ে দিয়ে বললেন, আমি এখনই ডেকে আনছি ডাক্তারসাবকে। শাস্ত্রীর ব্যক্তিগত চিকিৎসক ডাঃ আর এন চুঘ। ঠিক পাশের বিল্ডিং-এ আছেন। দৌড়ে গেলেন সহায়। ডাঃ চুঘ এসে দেখলেন প্রধানমন্ত্রী বুকে হাত চেপে ধরেছেন। কাশছেন। এবং মুখ বিকৃত হয়ে যাচ্ছে। হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণ। এবং তখন সত্যিই অনেক দেরি হয়েছে। অ্যাম্বুলেন্স রেডি হচ্ছে। শাস্ত্রীর বুকে পাম্প করতে করতে ডাঃ চুঘ কাঁদতে শুরু করলেন। মুখে বললেন, বাবুজি আমাকে একটুও সময় দিলেন না..বাবুজি আমাকে একটু সময় দিলেন না…। জয় শ্রীরাম…জয় সীতামাইয়া…শেষ উচ্চারণ…। লালবাহাদুর শাস্ত্রী মারা গেলেন।
খবর ছড়িয়ে পড়ল। সেই যে শুরুতে বলেছিলাম একটি জিপ ঝড়ের গতিতে এসে দাঁড়াল, সেটি ছিল রাশিয়ান স্পাই এজেন্সি কেজিবির নাইনথ ডিরেক্টরেটের অফিসারদের বাহিনী। তাঁরা যাঁদের প্রথমেই জিপে তুলে নিয়ে গেল তাঁরা ছিলেন প্রধানমন্ত্রী শাস্ত্রী ও সফরসঙ্গীদের জন্য রান্না করার দায়িত্বে। সেই বাবুর্চিদের নেতার নাম আমেদ স্যাটারোভ। সঙ্গে জুনিয়র আরও তিন বাটলারকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল ৩০ কিলোমিটার দূরের এক নির্জন বাড়িতে। সেটি ছিল কেজিবির ইন্টারোগেশন সেন্টার। কেন এই জিজ্ঞাসাবাদ? কারণ কেজিবি শুরুতেই সন্দেহ করে লালবাহাদুর শাস্ত্রীর মৃত্যু বিষক্রিয়ায় হয়েছে। কে বিষ দেবে তাঁকে? সর্বাগ্রে সন্দেহ হয় এসব ক্ষেত্রে অবশ্যই খাবার তৈরি আর সার্ভ করার দায়িত্বে থাকা বাবুর্চিদের। কিন্তু ওই রাশিয়ান বাবুর্চিরা জানায়, একমাত্র দুধ ছাড়া আর কোনো খাবার লালবাহাদুর শাস্ত্রীর জন্য কিচেন থেকে যায়নি। খাবার এসেছে টি এন কলের ব্যক্তিগত কিচেন থেকে। কে রান্না করেছে? জান মহম্মদ। তৎক্ষণাৎ সেকেন্ড অফিসার উস্তিনভ জিপ নিয়ে গেলেন আবার সেই ঘটনাস্থলে। জান মহম্মদকে হ্যান্ডকাফ পরানো হল। তাঁকে নিয়ে আসা হল ঝড়ের গতিতে সেই ইন্টারোগেশন সেন্টারে। এবং তারপর নিরন্তর এক জেরা। আর ঠিক অন্যদিকে শাস্ত্রীর ঘরে গিয়ে ভারতীয় অফিসাররা গিয়ে কী দেখেছিলেন? দেখা গেল শাস্ত্রীর চপ্পল যথারীতি সাজানো রয়েছে খাটের সামনে। এবং এরপরই একঝাঁক পরস্পরবিরোধী তথ্য। চারজন প্রত্যক্ষদর্শীর মধ্যে কেউ বলেছেন, পেটের নীচে কাটা দাগ দেখা গিয়েছে। এবং ধবধবে সাদা বালিশে চাপ চাপ রক্তের ছোপ। কাটা দাগ ঘাড়ের কাছেও। যাঁর হার্ট অ্যাটাক হয়েছে বলে বলা হচ্ছে তাঁর ঘাড়ে কাটা দাগ কেন? কেনই বা সেই কাটা দাগের ঠিক নীচেই চাপ চাপ রক্ত? যা নিয়ে সবথেকে বড় প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে তা হল শাস্ত্রীর গোটা শরীর নীল হয়ে গিয়েছিল। এরকম কি স্বাভাবিক? ব্যক্তিগত চিকিৎসক ডাঃ আর এন চুঘকে হঠাৎ করে কোথায় যেন সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। তাঁকে দেখা যাচ্ছে না। তিনি প্রচণ্ড আপসেট। ভোর সাড়ে ৪ টের সময় এলেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী জেনারেল আয়ুব খান। আয়ুব খানকে সত্যিই মনে হল যথেষ্ট দুঃখিত। তিনি শুধু বললেন, এই যে লোকটি এখানে শুয়ে আছেন তিনি কিন্তু ভারত আর পাকিস্তানের সমস্যা মেটানোর সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ এক চরিত্র হতে পারতেন। আমার বিশ্বাস শাস্ত্রীজি বেঁচে থাকলে আমরা দুই দেশ সব সমস্যার সমাধানের রাস্তা ঠিক বের করে নিতাম। শাস্ত্রীর দেহ নিয়ে আসা হল দিল্লি। এবং শাস্ত্রীর পত্নী ললিতা শাস্ত্রীর প্রথম থেকে সন্দেহ তাঁর স্বামীকে বিষ দিয়ে হত্যা করা হয়েছে। শাস্ত্রীর পরিবার তদন্ত চাইলেন। সরকার থেকে সবরকম আশ্বাস দেওয়াও হল যে তদন্ত হবে। হলও। কিন্তু যে প্রশ্নের উত্তর পাওয়া গেল না, সেটি হল পোস্ট মর্টেম হয়নি কেন? তাসখন্দে রাশিয়া প্রশাসনের কাছে বারংবার চিঠি লিখলেন শাস্ত্রীর পরিবার। কোনো জবাব নেই। ১৯৭০ সালে সরকারের পক্ষ থেকে মোরারজি দেশাই জানালেন সবরকম রিপোর্ট পাওয়ার পর তাঁরা নিশ্চিত যে, কোনোরকম সন্দেহের অবকাশ নেই। শাস্ত্রীজির মৃত্যু হয়েছে হার্ট অ্যাটাকে। সেই বাবুর্চি জান মহম্মদকে ততদিনে পাঠানো হয়েছে রাষ্ট্রপতি ভবনে। গোটা ঘটনার সাক্ষী ছিলেন একমাত্র লালবাহাদুর শাস্ত্রীর ব্যক্তিগত চিকিৎসক ডাঃ আর এন চুঘ।
১৯৭৭ সাল জরুরি অবস্থার অবসান ঘটিয়ে ইন্দিরা গান্ধী অবশেষে নির্বাচনের ডাক দিলেন। এবং গোটা ভারত অত্যাশ্চর্য হয়ে রায় দিল তাঁর বিরুদ্ধে। স্বাধীনতার পর এই প্রথম কংগেস হেরে গেল লোকসভা ভোটে। কেন্দ্রে এই প্রথম অকংগ্রেসী সরকার। সেই নতুন সরকারের প্রথম ঘোষণা ছিল, “ইন্দিরা গান্ধীর রাজত্বে যতরকম অন্যায়, যত অনাচার, অনিয়ম হয়েছে এবার ধীরে ধীরে হবে সব বিচার।” খোদ তাঁরই বিচার করবে জনতা সরকার। ততদিনে লালবাহাদুর শাস্ত্রীর পত্নী ললিতা শাস্ত্রীর মৃত্যু হয়েছে। তিনি জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত বিশ্বাস করতেন স্বামীর মৃত্যু হয়েছে বিষক্রিয়ায়। জনতা সরকার ক্ষমতায় আসায় শাস্ত্রীর পরিবার আবার আশান্বিত। এবার অন্তত মোরারজি দেশাইকে কোনো চাপের মুখে দ্বিধা করতে হবে না। এবার সত্য উদ্ঘাটন হবে। আবার তদন্তের দাবি করা হল। জনতা সরকার রাজি। সাক্ষী চাই। একে একে সকলের সঙ্গে যোগাযোগ করা হল। সবথেকে জোরালো প্রত্যক্ষদর্শী এবং প্রয়োজনীয় মানুষটি শাস্ত্রীর ব্যক্তিগত চিকিৎসক ডাঃ আর এন চুঘ। তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছে। বয়স হয়েছে। তবু তিনি অত্যন্ত স্বাস্থ্যবান। অবশ্যই সেদিন যা যা দেখেছেন এবং বুঝেছেন তা বলবেন। বাবুজি তাঁর খুব প্রিয় ছিলেন। সত্য উদঘাটনের দিন খুব কাছে আসছে। ঠিক তখনই একটি ট্রাক দুর্ঘটনার খবর এল। ডাঃ আর এন চুঘ, তাঁর স্ত্রী, দুই পুত্রকে পিষে দিয়ে একটি রহস্যময় ট্রাক তাঁদের গাড়িকে দুমড়ে দিয়ে চলে গিয়েছে। একমাত্র কন্যা বেঁচে গেলেন। কিন্তু পঙ্গু। কীভাবে হল সেই দুর্ঘটনা? ট্রাক কেন রাস্তার একেবারে পাশ থেকে যাওয়া ঢিমে গতির একটি ফ্যামিলি কারকে ধাক্কা মারল? লালবাহাদুর শাস্ত্রীর মৃত্যুকে সবথেকে কাছের থেকে দেখা ডাক্তার চুঘের থেকে জানা হল না ঠিক কী ঘটেছিল ১৯৬৬ সালের ১০ জানুয়ারির মধ্যরাতে। তিনি একজন চিকিৎসক হিসাবে কী দেখেছিলেন? কী বুঝেছিলেন? লালবাহাদুর শাস্ত্রীর শরীরে সত্যিই কি কাটা দাগ ছিল? কেন? আজও সঠিক উত্তর পাওয়া গেল না!
