নাসিক জেলে ক্রিকেট ম্যাচ হচ্ছে। দুই দল ক্রিমিন্যালের মধ্যে। এখন আপাতত দুটি আলাদা টিম খেলছে বটে। কিন্তু আদতে এই সব প্লেয়ারই বাইরে থাকাকালীন একই আন্ডারওয়ার্ল্ড টিমের সদস্য। টিমের মাথা ছোটা রাজন। সুতরাং এই গোটা ম্যাচের সব কুশীলবই আসলে টিম রাজন। অর্থাৎ এটা নিছকই একটি প্রীতিম্যাচ। কারণ কয়েকজন ওয়ার্ডেন, সিকিউরিটি গার্ড আর কারারক্ষীও আছে ম্যাচে। ম্যাচের ১০ মিনিটের মধ্যে দেখা গেল ক্যাচ ধরা নিয়ে গোলমাল। ও পি সিং ক্যাচ ধরেছে। কিন্তু ডি কে রাও আর তার দলবল বলছে ক্যাচ মাটিতে পড়ে গিয়েছে। চিটিং করছে ও পি সিং। ও পি সিং সেটা মানতে নারাজ। প্রথমে ঝগড়া। তারপর হাতাহাতি। এবং ও পি সিং যখন পিছন ফিরে এক নামজাদা আন্ডারওয়ার্ল্ডের শার্প শুটার সরফিরা নেপালিকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিয়েছে, ঠিক তখন ডি কে রাও ব্যাট দিয়ে ও পি সিং এর মাথার পিছনের অংশে মারলো। ছিটকে পড়ে গেল ও পি সিং। তখনও ফাটেনি মাথা। তার দরকার নেই। এবার অন্য ব্যবস্থা। উইকেটের পিছনে রাখা ছিল আগে থেকেই প্লাস্টিকের দড়ি। সেটি নিয়ে এসে হাতে দেওয়া হল রাওয়ের। পিছন থেকে গলায় পেঁচিয়ে ধরা হল। হাত দিয়ে দড়ির ফাঁস ছাড়ানোর নির্জীব চেষ্টা করছে ও পি সিং। দুর্বল সেই প্রয়াস। কারণ মাথায় ওরকম ভারী ব্যাটের আঘাতে এমনিতেই তার আর ওঠার শক্তি ছিল না। তবু গলায় ফাঁস বসছে। ডি কে রাও ছাড়ছে না। কারণ তার একটা নাম আছে অপরাধী ও পুলিশ মহলে। নামটি হল ব্ল্যাক মাম্বা। ব্ল্যাক মাম্বার সিস্টেম হল একবার যখন শিকারকে ধরে, তখন যতক্ষণ না শিকার সম্পূর্ণ নড়াচড়া বন্ধ করে দেয় এবং প্রতিটি পেশি শিথিল হয়ে পড়ে, ততক্ষণ সে ছাড়বে না। সমস্ত বিষ ঢেলে শিকারকে নির্জীব নিথর করেই সে নিশ্চিত হতে চায়। ছোটা রাজনের ভয়ংকর শার্প শুটার ডি কে রাও এরকমই। অতএব ও পি সিং এর পক্ষে আর মাথা তোলার প্রশ্নই নেই। নাসিক জেলেই তার মৃত্যু হল। নিজের গ্যাংয়ের সবথেকে দামি এক সদস্য এভাবে দলের অন্যদের হাতে খুন হয়ে গেল দেখে রাজনের তো ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠার কথা। কই! তা তো হল না! বরং সেই সময় ব্যাংককে থাকা রাজন খবরটা এক পুলিশ অফিসারের মাধ্যমে পেয়ে অট্টহাসি হেসেছিল। কারণ গোটাটাই তার প্ল্যান। কাঁটা দিয়ে কাঁটা তোলা। আর এমনভাবে যাতে কারও সন্দেহই না হয়। কী সেই প্ল্যান?
একই টিমের হওয়া সত্ত্বেও ও পি সিং বাকিদের খুব পাত্তা দিত না। কারণ সে এইসব পেটি ক্রিমিনালদের মতো নয়। মুম্বই ইউনিভার্সিটি থেকে কেমিস্ট্রির পোস্ট গ্রাজুয়েট। মাজেগাঁও ডকের কোয়ালিটি কন্ট্রোল অফিসার ছিল ও পি সিং। দাদার নাম অরুণ সিং। ঝুনঝুনওয়ালা কলেজের প্রফেসর। দাদাকে প্রাণের থেকেও বেশি ভালোবেসেছে ও পি সিং। দাদাই ছিল তার কাছে ফ্রেন্ড ফিলজফার গাইড। দাদা একটি কলেজের অধ্যাপক। ভাই সরকারি ডকইয়ার্ডের উচ্চপদস্থ অফিসার। সুখী সংসার। এহেন এক পরিবারের গোটা যাত্রাপথ ঘুরে গেল। কারণ দাদা অরুণ সিংকে একদিন মুম্বইয়ের সবথেকে ভয়ংকর গ্যাংস্টার অশ্বিনী নায়েক এবং অমর নায়েকের হিটম্যানরা গুলি করে খুন করে ফেলল। সম্পূর্ণ বাহ্যজ্ঞানরহিত হয়ে গেল ও পি সিং। বদলা নিতে হবে। দাদা নেই? আন্ধেরির একটা বারে মাঝেমধ্যেই যেত ও পি সিং। সেখানে তিনটি ছেলের সঙ্গে আলাপ। তাদের সঙ্গে চার পেগ খাওয়ার পর ও পি সিং ঝাঁপি খুলেছিল। কীভাবে দাদাকে খুন করেছে অশ্বিনী নায়েক আর মর নায়েক সেকথা বলেছিল তাদের। আর সে ছিল সেই খুনের মামলারও অন্যতম সাক্ষী। আর এফ আই আরে অমর অশ্বিনীদের নাম বলেছিল সে। ১৯৯৫ সালে তাই তাকেও টার্গেট করা হয়। দুবার গুলি থেকে বেঁচে গেল ও পি সিং। এবং সেই তিনটি ছেলে জানাল এই বদলা নিতে পারবে একজনই। ছোটা রাজন। এই তিন যুবক রাজনেরই লোক। তারা ও পি সিংকে বলেছিল, চলে এসো আমাদের গ্রুপে। সব পাবে। বদলা, পাওয়ার আর টাকা। আসলে মুম্বই আন্ডারওয়ার্ল্ড মাফিয়া গ্যাংয়ে এরকম একজন করে শিক্ষিত ঠান্ডা মাথার স্ট্র্যাটেজিস্ট খোঁজে সর্বদাই সব মাফিয়া ডন। কারণ শুধু গরম মাথার স্বল্পশিক্ষিত অথবা অশিক্ষিত হিটম্যান, গ্যাংস্টার দিয়ে দল চালানো যায় না। প্ল্যানার চাই। রাজনের দলে এরকম কেউ নেই। তাই ও পি সিংকে দেখেই ওই তিনজন সোজা ব্যাংককে ফোন করেছিল। রাজন তাদের বলেছিল ছেলেটিকে দলে নিতে। ও পি সিং এর নতুন কেরিয়ার শুরু হয়েছিল ডাকাতি দিয়ে। গোরেগাঁও এলাকায়। কিন্তু তার সবথেকে যে কৌশলটি রাজনকে খুশি করেছে, সেটি হল রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে সম্পর্ক রচনার মুনশিয়ানা। কংগ্রেস, বিজেপি, শিবসেনা সকলের সঙ্গে ও পি সিং এর প্যারালাল একটি সম্পর্ক গড়ে উঠলো। ক্রিমিন্যাল আর রাজনীতিবিদদের মধ্যে সংযোগ না থাকলে আন্ডারওয়ার্ল্ডের বিপুল অর্থনীতির সাম্রাজ্যটি চলবে কীভাবে? অতএব ১৯৯৭ সালে সে হয়ে উঠল রাজনের সঙ্গে পলিটিশিয়ানদের একমাত্র যোগসূত্র। কিছুদিন পরই প্রমোশন হল। তাকে ডেকে নেওয়া হল কুয়ালালামপুরে। কারণ ততদিনে মালয়েশিয়ায় একটি ব্যবসা খুলেছে রাজন। ড্রাগস তৈরির ব্যবসা। ম্যানড্রাক্স। যা ভারত, বাংলাদেশ, পাকিস্তান, শ্রীলংকা, নেপাল, মায়ানমারে সাংঘাতিক জনপ্রিয়। অনেক আগেই দুবাই থেকে পালিয়ে এসেছে রাজন। উপায় নেই। দাউদের ডান হাত ছোটা শাকিল উন্মত্তের মতো তাকে খুঁজছে। হত্যার জন্য। তাই পালিয়ে বেড়ায় রাজন। কখনও ব্যাংকক। কখনও মালয়েশিয়া। কখনও ম্যানিলা। মালয়েশিয়ায় এসেই ও পি সিং ধরে ফেলল রাজনের ব্যবসার হাল। ক্রমেই সে হয়ে গেল দু নম্বর। কারণ রাজন বেশিটাই থাকে ব্যাংকক। তাই কুয়ালালামপুর বাণিজ্য সিংয়ের হাতে।
ঠিক পাঁচ বছর পর গোটা সাম্রাজ্যের প্রায় প্রধান ম্যানেজার হয়ে গেল সে। যার প্রধান কারণ হল ব্যাংককে দাউদের হিটম্যানদের আক্রমণ থেকে রক্ষা পাওয়া রাজন স্মিতভেজ হাসপাতাল থেকে পালাতে পেরেছিল এই ও পি সিংয়ের রিমোট কন্ট্রোলের কারণেই। কারণ থাইল্যান্ডের মিডিয়ার মাধ্যমে ইতিমধ্যেই টাকা লেনদেনের স্থায়ী ব্যবস্থা করে ফেলেছিল সিং। আর তাদের সাহায্যে থাইল্যান্ডের সামরিক বিভাগের মধ্যে সোর্স ছিল রাজন বাহিনীর। রাজন হাসপাতাল থেকে যখন পালিয়েছিল এবং গোপনে কম্বোডিয়া চলে যায়, সেই সময় তাকে এসকর্ট করে খোদ থাই মিলিটারি সিকিউরিটি। সুতরাং ও পি সিং রাজনের কাছে দেবদূত। সবই ঠিক চলছে। কিন্তু ঠিক কয়েকবছর পর ও পি সিংয়ের আচরণে বদল এল। লক্ষ করল রাজন। তখন সে কখনও পর্তুগাল, কখনও অস্ট্রেলিয়া। এদিকে মালয়েশিয়া থেকে দিল্লি চলে আসতে চায় ও পি সিং। কেন যেন আজকাল ড্রাগ বিজনেসের মুনাফা কমছে। কী হল হঠাৎ? বোঝা যাচ্ছে না। তবে ও পি সিং এতই বিশ্বস্ত যে রাজনের কোনো ক্ষতি হতে সে দেবে না। নিশ্চয়ই কোনো কারণ আছে। হয়তো একান্ত ব্যক্তিগত। তবু সেটা জানতে পারলে সুবিধা হয়। রাজনের পক্ষে জানা সম্ভব নয়। কারণ সে থাকে অনেক দূরে। অস্ট্রেলিয়া। ও পি সিং কখনওই মালয়েশিয়া, ব্যাংকক আর ভারত ছাড়া অন্যত্র কোথাও যায় না। তবে একটা ব্যাপারে খটকা। আজকাল বারংবার ড্রাগ সাপ্লাই ধরা পড়ে যাচ্ছে। একের পর এক কনসাইনমেন্ট আগে থেকে কীভাবে যেন খবর ফাঁস হচ্ছে আজকাল। আগে এরকম ছিল না। তাই ও পি সিংকে রাজন বলেছে সাবধানে এবার থেকে অর্ডার পাঠাতে। আর গ্রুপে কোনো গদ্দার আছে কিনা তাও না কে জানে! ছোটা রাজনের দুঃস্বপ্নেও নেই এসবের পিছনে কে। আসল ঘরশত্রু বিভীষণ ও পি সিং। কারণ সে ইতিমধ্যেই হয়ে গিয়েছে ডাবল এজেন্ট। মুম্বই পুলিশের ক্রাইম ব্রাঞ্চের এনকাউন্টার ইনস্পেক্টর প্রদীপ শর্মার গোপন চরের নাম ও পি সিং! যাকে ছোটা রাজন সবথেকে বিশ্বস্ত সঙ্গী ভেবে এসেছে। একটি অচেনা ফোন রাজনকে গোপনে একদিন জানিয়ে দিল এই চরম সত্যটা! কারণ তার ঠিক দু সপ্তাহ আগে পরপর তিনটি ড্রাগ সাপ্লাই ধরা পড়েছে। ও পি সিং ডাবল এজেন্ট? রাজনের মাথায় আগুন জ্বলে উঠলো। শিক্ষা দিতে হবে। কীভাবে?
ও পি সিং দল ছাড়তে চায়। মুম্বই থেকে ফোনে জানাচ্ছে বালু ডিকরে। রাজনের এক বিশ্বস্ত হিটম্যান। কেন? বালু জানাচ্ছে তার কোনো ক্লিয়ার আইডিয়া নেই। তবে হয়তো নতুন করে নিজের কোনো গ্যাং বানাবে সিং। অথবা অন্য কোনো ধান্দা আছে। তার মানে এত বছর ধরে সিং আসলে রাজনের নেটওয়ার্ক নিজের কন্ট্রোলে নিয়ে আসার কাজটাই করছিল। এবার আর সহ্য করা নয়। সরাতে হবে সিংকে। মুম্বই পুলিশ এবং দিল্লি পুলিশের মধ্যে একটা ফারাক আছে। যেহেতু ১৯৯৩ সালের মুম্বই বিস্ফোরণের পিছনে দাউদ রয়েছে এবং ছোটা রাজনকে ওই অপারেশনে একেবারেই সরিয়ে রাখা হয়েছিল, আর রাজন ওই ঘটনার পরই দাউদের গ্যাং ছেড়ে দেয়, তাই দিল্লি পুলিশ, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক কিংবা দিল্লির পাওয়ার করিডরে রাজন সম্পর্কে একটি নরমপন্থা কাজ করে এসেছে। রাজন নিজেকে দেশপ্রেমী দেশপ্রেমী একটা মোড়ক দেওয়ার চেষ্টা করেছে ওই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে। তার বার্তা হল আমি যাই করি না কেন, পাকিস্তানের সঙ্গে হাত মিলিয়ে নিজের দেশের মানুষের তো আর গণহত্যা করি না। অতএব আমি দেশভক্ত। এর পাশাপাশি সে যেহেতু এত বছর ধরে দাউদের সঙ্গে ঘর করেছে, তাই স্বাভাবিকভাবেই দাউদের যাবতীয় নেটওয়ার্ক, বাণিজ্য সংক্রান্ত ঠিকুজি কোষ্ঠী, তাবত কন্টাক্ট এবং দাউদের দলের সদস্যদের সম্পর্কেও সম্যক জ্ঞান আছে। সেই তথ্য দিয়ে সে মাঝেমধ্যেই সাহায্য করে দিল্লির আইবি এবং RAW কে। কিন্তু এসব কথায় মুম্বই পুলিশের কাছে চিঁড়ে ভেজানো যাবে না। তারা মনে করে রাজন একজন মাফিয়া লিডার। মুম্বইয়ে তার রমরমা দাদাগিরি আর খুনের ব্যবসা। সুতরাং কোনোভাবেই তাকে রেয়াৎ করা হবে না। দাউদ যেমন দোষী, সেও তেমন। তাই রাজনের গ্রুপে চর ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছিল। প্ল্যান কষতে লাগল রাজন। কীভাবে পথের কাঁটা ও পি সিংকে সরানো হবে। এটা একটা শিক্ষাও হবে অন্যদের কাছে। সামান্য বেচাল দেখলেই হত্যা। এই ফিয়ার সাইকোসিস না থাকলে গ্যাং চালানো যায় না। অতএব প্ল্যান করে রাজন ও পি সিংকে বলল তুমি যখন আর মালয়েশিয়ায় থাকতে চাইছ না তাহলে ফিরে যাও ভারত। আর কাউকে মালয়েশিয়ার ব্যবসা বুঝিয়ে তুমি তাহলে ইন্ডিয়া নেটওয়ার্ক সামলাও। তোমাকে ছাড়া আমার তো চলবে না জানোই। ও পি সিং রাজি। সে তৎক্ষণ রাজনের গ্রুপে যে কয়েকজন তার অনুগামী তাদের কয়েকজনের মধ্যে দুজনকে বাছাই করল মালয়েশিয়ার ব্যবসা দেখভালের জন্য। এতে ডাবল সুবিধা। রাজন ভাববে ও পি সিংয়ের দায়িত্ব আছে। ভালো দুজনকে দিয়েছে কাজ সামলাতে। আবার নিজের লোক থাকায় রাজনের প্রতিটি মুভমেন্ট সে জানতে পারবে। ও পি সিং ভারতে ফিরে এসে মুম্বই নয়, থাকতে শুরু করল দিল্লি। কারণ আগেই বলা হয়েছিল যে দিল্লির রাজনৈতিক ক্ষমতার অলিন্দে অবাধে সে ঘোরাফেরা করে। তাই সেই কাজটি করার জন্য দিল্লিই বেস্ট জায়গা। ঠিক এই অপেক্ষাতেই ছিল রাজন। তার চেনা আর বিশ্বস্ত পুলিশ অফিসার আছে দিল্লিতে। তাঁদের মাধ্যমে বার্তা দিয়ে রাজন দিল্লি পুলিশের স্পেশাল সেলের দুই দুর্ধর্ষ অফিসার এ সি পি রাজবীর সিং এবং ইনস্পেক্টর মোহনচাঁদ শর্মাকে ফোন করল। তাদের জানিয়ে দিল আপনাদের জন্য একটি দারুণ খবর আছে। একটা মাফিয়া লিডার লুকিয়ে আছে দিল্লির গ্রেটার কৈলাশ টু এলাকার গেস্ট হাউসে। তাকে ধরতে পারলে দুবাই আর করাচি নেটওয়ার্কের অনেক গোপন তথ্য জানা যাবে। এই হল ঠিকানা…। দিল্লি পুলিশ কুইক কাজ করতে ভালোবাসে। তৎক্ষণাৎ হানা এবং সেদিন রাতেই গ্রেপ্তার। কিন্তু দিল্লি পুলিশের কাছে কোনো কেস নেই ও পি সিং-এর নামে। তাকে পাঠানো হবে মুম্বই। দুদিনের জেরার পর। তার বিরুদ্ধে যত কেস সবই মুম্বইতে। সবই প্ল্যানমাফিক এগোল। ও পি সিংকে গ্রেপ্তার করে মুম্বই পাঠানো হল। এবং জানা কথা তাকে নাসিক জেলেই রাখা হবে। সেইমতো আগে থেকেই ছোটা রাজনের টিমমেম্বাররা তৈরি। যেই ও পি সিং নাসিক জেলে এল প্রত্যেকেই তাকে স্বাগত জানাল। সিং আশ্বস্ত। কারণ এটা বেশ ভালো হয়েছে। নিজেদের সঙ্গে থাকা। এভাবে কয়েকমাস। তারপরই ক্রিকেট ম্যাচ। ও পি সিং এর শেষ ক্রিকেট ম্যাচ। ম্যাচের মধ্যেই ও পি সিং মার্ডার হয়ে গেল। সে তো আগেই বললাম। রাজনের প্ল্যান সাকসেসেফুল। নিশ্চিন্ত সে।
ততদিনে ছোটা রাজনের জানা হয়ে গিয়েছে ও পি সিং এর সঙ্গে কার যোগাযোগ। কোন সোর্সে ও পি সিং সমস্ত তথ্য পাচার করেছে মুম্বই পুলিশের কাছে। লোকটির নাম আমজাদ খান। আমজাদ খান অবিকল আর এক আমজাদ খানের মতোই কথা বলে। যাকে লোকে চেনে গব্বর সিং নামে। মধ্য মুম্বইয়ের এই আমজাদ খান আগাপাশতলা নকল করে ওই আমজাদ খানকে। সে এক সাংঘাতিক ফ্যান। নব্বইয়ের দশকে মুম্বইয়ের সবথেকে নটোরিয়াস ড্রাগ মাফিয়া ছিল ইকবাল মিরচি। আমজাদ খান সেই গ্রুপে কাজ করত সাধারণ পেডলার হিসাবে। একদিন আমজাদ খান ধরা পড়ে গেল ভাহিন্দারের কাছে সমুদ্রের খাঁড়ি থেকে। সঙ্গে হেরোইন। নারকোটিক্স কন্ট্রোল ব্যুরোর অফিসাররা একটা ভালো বিকল্প দিয়েছিলেন আমজাদকে। হয় বছরের পর বছর জেলে থাকো অথবা বাইরে বেরিয়ে আমাদের ইনফরমার হয়ে যাও। তাহলে আর ভয় নেই। আমজাদ দ্বিতীয় পথ বেছে নিয়েছিল। সে ড্রাগের সামান্য পেডলার ছিল এমন নয়। সে ছিল মারাত্মক এক রিসার্চার। কোন ড্রাগ কোন দেশ থেকে আসে। কোন ড্রাগ আজকালকার ছেলেমেয়েদের কাছে বেশি প্রিয় এসব নিয়েই তার বলা যেতে পারে নিজস্ব গবেষণা। কারণ সে এইসব ছেলেমেয়েদের সঙ্গে ড্রাগ পার্টিতে যেত। আর জেনে নিত এদের মনস্তত্ত্ব। সুতরাং এরকম এক ইনফরমার নারকোটিক্স কন্ট্রোল ব্যুরোর কাছে প্রাইজ ক্যাচ। আমজাদ খান ময়দানে নামার পর আচমকা দেখা গেল ড্রাগ ব্যবসায়ীদের মধ্যে ত্রাহি ত্রাহি রব। একের পর এক কনসাইনমেন্ট ধরা পড়ছে। একের পর এক সাপ্লাই চেইন বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। আমজাদ খানের প্রতিটি ইনপুট ছিল মোক্ষম। মুম্বই পুলিশের নারকোটিক্স কন্ট্রোল টিম তখন হিরো। রোজ শহরের যেখানে হানা দিচ্ছে সেখানেই সাফল্য। তাই সমস্ত ড্রাগ মাফিয়ারা একদিন বিকেলে কল্যাণ এলাকার একটি গেস্ট হাউসে একজোট হয়ে মিটিংয়ে বসল। সেই মিটিং-এ ফোন গেল আসল পাণ্ডা মিরচির কাছে। ইকবাল মিরচি। আফগানিস্তানে তখন সাংঘাতিক ড্রাগের সাপ্লাই বাড়ছে। আসছে পাকিস্তান থেকেও। এমনকী কানাডা আর মেক্সিকোর অর্ডারও আসছে। সুতরাং এরকম সময়ে সামান্য লোকসান কিংবা একের পর এক কনসাইনমেন্ট ধরা পড়লে বিরাট ক্ষতি। অতএব একটাই পথ। আমজাদকে খুন। ও একাই শেষ করে দিচ্ছে বিজনেস। কিন্তু কে করবে? মাত্র ৫ হাজার টাকায় মুম্বইয়ে পাওয়া যায় শার্প শুটার। মাত্র পাঁচ হাজার টাকা পেয়েই যাকে তাকে খুন করবে বহু পেটি ক্রিমিনাল। কিন্তু তাও কাউকে পাওয়া যাচ্ছে না। কেন? কারণ একটাই। আমজাদ খানের পিছনে কার বরাভয় আছে সেটা সকলেই জানে। এনকাউন্টার স্পেশালিস্ট মুম্বই পুলিশের অফিসার প্রদীপ শর্মা। প্রদীপ শর্মার মেইন সোর্স আমজাদ। কোন অপরাধী চাইবে প্রদীপ শর্মার লোককে খুন করতে? কেউ না। শর্মা ধরে না, মারে। যে কোনো ক্রিমিন্যালকে পাকড়াও করে আর শহর থেকে দূরের নিরালায় নিয়ে গিয়ে এনকাউন্টার করতে সিদ্ধহস্ত প্রদীপ শৰ্মা। তাই তাকে যমের মতো ভয় করে সাধারণ ক্রিমিন্যালরা। অতএব কেউ রাজি নয়। ৫ লক্ষ টাকা থেকে শুরু হয়েছিল সুপারি দেওয়া। সেটি বাড়তে বাড়তে যখন ৫ কোটিতে পৌঁছল, তখনই কাজটা করতে রাজি হল একজন। তার নাম ছোটা রাজন।
২০০৬ সালের ১৬ অক্টোবর। প্রায় ৬ বছরের পুরোনো একটি ড্রাগ কেসের মামলায় শুনানিতে যাচ্ছিল আমজাদ খান আর দুই সঙ্গী। মুম্বই শহর। ঠিক সেশন কোর্টের উলটোদিকে আর পুলিশ সদর দপ্তর থেকে ঢিল ছোড়া দূরত্বে আমজাদ খান আর তার সঙ্গী দুজনকেই গুলিতে ঝাঁঝরা করে দিয়ে পালাল দুই মোটরসাইকেল আরোহী। প্রকাশ্য দিনের বেলায়। যা গোটা মুম্বই পুলিশের কাছে চরম লজ্জা আর বেইজ্জতি। নিজেদের ইনফরমারকে যারা রক্ষা করতে পারে না তাদের হয়ে আগামীদিনে কেউ সোর্স হবে কেন? এই বার্তা পেল অপরাধী সমাজ। সবথেকে ক্রুদ্ধ হলেন একজন। প্রদীপ শর্মা। প্রথমে ও পি সিং এবং তারপর আবার এই আমজাদ খান। পরপর তাঁর সোর্সকে রাজন খুন করছে এভাবে! এর অর্থ হল রাজন তাঁকে চ্যালেঞ্জ করছে। এত সাহস! প্রদীপ শর্মা ময়দানে নামলেন। ২০০৬ সালের ডিসেম্বর থেকে শুরু হল মুম্বইয়ে ক্রিমিন্যালদের এক অন্ধকার সময়। প্রদীপ শর্মার নেতৃত্বে অন্তহীন এনকাউন্টার। রোজ…সকালে…বিকেলে…রাতে…। একটা সময় এল যখন দলে দলে ক্রিমিন্যালরা মুম্বই শহর থেকে পালাতে শুরু করল। কিন্তু বাঁচবে কীভাবে? ঠিক খবর পেয়ে যায় প্রদীপ শর্মার দুরন্ত সোর্স। আর ফলো করে তাদেরও কখনও ধানখেতে, কখনও সরকারি ডকের নির্জনে, কখনও সমুদ্রের খাঁড়িতে এনকাউন্টার। ত্রাহি ত্রাহি রবের মধ্যে সবথেকে ক্ষতি হল ছোটা রাজনের। তার গোটা মুম্বই নেটওয়ার্ক তছনছ করে দিলেন একা প্রদীপ শর্মা আর মুম্বই পুলিশের এনকাউন্টার স্পেশালিস্ট স্পেশাল টিম।
এই গোটা ঘটনাপরম্পরা অত্যন্ত তীক্ষ্ণভাবে লক্ষ করছিলেন একজন ক্রাইম রিপোর্টার। আমজাদ খানের হত্যার পর থেকেই তিনি ছিলেন বীতশ্রদ্ধ ছোটা রাজনের প্রতি। কারণ আমজাদ খান পুলিশ আর ক্রাইম রিপোর্টারদের কাছে ছিল অত্যন্ত মূল্যবান সোর্স। সে মহারাষ্ট্রকে ড্রাগ মুক্ত করার ক্ষেত্রে অনেক সাহায্য করছিল। তাকে যখন রাজন সরিয়ে দিল পাঁচ কোটির বিনিময়ে তখন বোঝাই গেল রাজন আজও মনেপ্রাণে বাইকুল্লার এক সাধারণ পাতি ক্রিমিন্যাল হয়ে রয়েছে। রাজনের গায়ে যে দেশপ্রেমের মেকি পোশাকটা পরা আছে এবার সময় এসেছে সেটিকে একটানে খুলে ফেলার। ঠিক সেই কাজটি করার দিকেই এগোলেন সেই ক্রাইম রিপোর্টার। মুম্বইয়ের সংবাদমাধ্যমে যে মানুষটিকে সকলে সমীহ আর শ্রদ্ধা করে। তার অসাধারণ ক্রাইম স্টোরি আর নেটওয়ার্কের জন্য। লোকটির নাম জ্যোতির্ময় দে। মিড ডে পত্রিকার ক্রাইম ব্যুরোর চিফ। তিনি বই লিখবেন একটি। তার নাম ‘চিন্ডিস-র্যাগস টু রিচেস’। সেই বই লেখার ভাবনাই তাঁর জীবনের শেষ অধ্যায়ের জন্য দায়ী হয়ে রইল। কী ছিল সেই বইতে? যে কারণে খুন হতে হল দুর্ধর্ষ সাংবাদিক জ্যোতির্ময় দে-কে?
মুম্বইয়ের পুলিশ, সাংবাদমাধ্যম আর অপরাধজগতের কোডনেমে চিন্ডি কথাটা বলা হয় সেই সব অপরাধীদের, যাদের সেরকম ব্যক্তিত্বের ওজন নেই। পেটি ক্রাইম করে যারা উপরে উঠেছে। হয়তো মাফিয়া ডন হয়েছে। কিন্তু তাদের দৃষ্টিভঙ্গি, আচরণ, ক্রিমিন্যাল হিসাবে জীবনযাপন আর অ্যাটিটিউড সবই রয়ে গিয়েছে সেই সাধারণ ছোট ক্রিমিন্যালদের মতোই। যাদের কোনো প্রফেশনাল এথিক্সও নেই। এদের মধ্যে থেকে ২০ জন ক্রিমিন্যালকে বাছাই করে তাদের নিয়ে বই লিখছেন জ্যোতির্ময় দে। এদের মুখোশ খুলে দিতে চান তিনি। এই বইয়ের ক্রিমিন্যাল তালিকায় স্থান পেয়েছে ছোটা রাজন। অর্থাৎ এর থেকেই প্রমাণিত জে দে (এটাই তাঁর পরিচিত নাম ছিল) ছোটা রাজনকেও চিন্ডি মনে করেন। দাউদের থেকে অনেক অনেক নিম্নমানের মাফিয়া। এই বইয়ের পাশাপাশি আর একটি বইয়ের ভাবনা আছে। সেটির প্ল্যানও চলছে। সেই বইয়ের উপজীব্য হল আদি অকৃত্রিম একটি চরিত্র। দাউদ ইব্রাহিম। আর সেখানে দেখানো হবে কীভাবে একজন ছোটখাটো স্মাগলার থেকে দেশের তথা বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম ডনে পরিণত হয়েছে দাউদ। সবটাই সে প্ল্যান করেছে। এক্সিকিউট করেছে অন্যকে দিয়ে। নিজে অপারেশন করেছে হাতে গোনা। ভারতে থাকাকালীন। দাদার হত্যার বদলা নিতে। কিন্তু ভাবনা, প্ল্যান, প্রয়োগ আর কোম্পানিকে ছড়িয়ে দিতে দাউদের মাথার ধারেকাছে ছোটা রাজন আসে না। জে দে এর আগে দুটি বই লিখেছেন। ‘খাল্লাস’ আর ‘ডায়াল ১০০’। তিনি ঠিক করেছিলেন চাকরি ছেড়ে দেবেন। তার আগে এই ক্রাইম সিরিজের শেষ বই দুটো সমাপ্ত করা দরকার। রাজনের সঙ্গে বহুদিনের আলাপ। তাই রাজনের সঙ্গে কথা বলবেন জে দে। সেইমতো ফোনে কথাও হল। প্রথমে ম্যানিলা এবং তারপর লন্ডন। দুবার রাজনের সঙ্গে দেখা করতে গেলেন জে দে। ইন্টারভিউ। সেই আলোচনার মধ্যেই রাজন বুঝতে পারল তাকে আর পাঁচটা সাধারণ ক্রিমিন্যালের মতোই ভাবছে জে দে। কিন্তু এভাবে তা আন্দাজের উপর নির্ভর করে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া যায় না। সেই সংশয় দূর হল যখন দেখা গেল জে দে তাঁর পত্রিকায় মাঝেমধ্যেই ছোটা রাজনের সম্পর্কে লিখছেন, রাজনের কেরিয়ার শেষ। রাজনের গ্রুপও ভেঙে গিয়েছে। এবং তার শারীরিক অবস্থা এমন, যে নতুন করে আর ভারতের আন্ডারওয়ার্ল্ড কন্ট্রোল করার মতো ক্ষমতাই নেই। অর্থাৎ ছোটা রাজনের জমানা শেষ। এটাই রাজনের মাথা খারাপ করে দিল। কারণ সে জানে জে দে যেটা লিখছেন সেটা ১০০ শতাংশ সত্যি। সত্যিই রাজনের টিম ভেঙে যাচ্ছে। তার টিমের বহু মেম্বার এখন ধরা পড়েছে। মারা গিয়েছে এনকাউন্টারে। পাশাপাশি দাউদ এবং ছোটা শাকিলের থেকে বাঁচার জন্য রাজন রীতিমতো চোরপুলিশের মতো লুকোচুরি খেলতে খেলতে ক্লান্ত।। দাউদের যেমন বাইপাস সার্জারি হয়েছে, দুবার হার্ট অ্যাটাক হয়েছে, ঠিক তেমনই রাজনের চূড়ান্ত ডায়াবেটিস। শুধুমাত্র ডায়াবেটিসের জন্যই তাকে দুবার হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছে। একদা মিঠুন চক্রবর্তীর ভক্ত ঝাঁকড়া চুলের রাজনের এখন চুল পাতলা। মুখের চামড়া শ্লথ। একটি হেরে যাওয়া সিংহ। রাজন এই সত্যটা মেনে নিতে পারছে না। তার উপর সেটাই আরও বেশি করে গায়ে লাগছে যখন প্রতিটি সত্য কথা জ্যোতির্ময় দে লিখছেন। জে দে বইয়ের জন্য আর কাদের সঙ্গে কথা বলছেন? অবশেষে চেম্বুরের এক প্রপার্টি ডিলার রাজনকে জানিয়ে দিল জে দে একটি বই লিখছেন। যার মধ্যে রাজনও আছে। কিন্তু সেই তালিকায় সবই মুম্বইয়ের চিন্ডিরা আছে। বড় কেউ নেই। কীভাবে জানতে পারল সেই প্রপার্টি ডিলার? জে দের নিজস্ব ক্যাবিনেটের চাবি খোওয়া গিয়েছিল। চুরি গিয়েছে তার কয়েকটি ডায়েরি আর নোট। সেটি কে করল? রাজন আর ঝুঁকি লেবে না। একবার ওই বই বেরোলে তার প্রেস্টিজ সম্পূর্ণ ধ্বংস হবে। আর তখন থেকে সে যে টার্গেট নিয়েছে সেটি পূরণ হবে না। কী সেই টার্গেট? সেটি হল ভারত সরকারকে রাজি করানো আত্মসমর্পণের শর্তাবলি রাজন আর পালিয়ে বেড়াতে পারছে না। সে আত্মসমর্পণ করতে চায়। কিন্তু একটা মিনিমাম শর্ত আছে। তাকে ফাঁসিতে ঝোলানো চলবে না। আর মুম্বইয়ের কোনো জেলে রাখা যাবে না। পাশাপাশি বেশ কিছু অপারেশন আছে যেগুলি থেকে তাকে মুক্তি দিতে হবে। এসব শর্তের বিনিময়ে সে দাউদ আর লস্কর নেটওয়ার্কের গোপন তথ্য দেবে ভারত সরকারকে। এই ডিলের খুব কাছে রাজন। এরকম সময়ে জে দের ওই বই প্রকাশিত হলে রাজনের গুরুত্ব কমে যাবে। অতএব শেষবারের মতো রাজন চেষ্টা করল। জে দে-কে ফোন।
রাজন : দে! তুমি বেইমানি করছ।
জে দে : বেইমানি কীসের?
রাজন : তুমি এই বইটা লিখো না
জে দে : মানে ? কেন?
রাজন : আমি জানি ওখানে কী থাকবে। আমি চাই না।
জে দে : তুমি কীভাবে জানলে? আর আমি তো তোমার সঙ্গে কথা বলেছি। তুমি যা যা বলেছ সবই আমি রাখছি বইতে।
রাজন : তাহলে তুমি শুনবে না?
জে দে : প্রশ্নই নেই! আমার বই লেখা নিয়ে তুমি হুমকি দিচ্ছ কেন? কে তুমি বাধা দেওয়ার?
রাজন : তুম বেইমান হো…
ফোন কেটে গেল।
২৩ মে রাজন ফোন করল রোহিত যোসেফকে। যার ডাক নাম সতীশ কালিয়া।
রাজন : একজনকে সরাতে হবে কালিয়া!
কালিয়া : কাকে ভাই?
রাজন : আছে একজন। ছবি পাঠাচ্ছি। মোটরবাইক নম্বর পাঠাবো। ঠিক দেড়টায় রোজ একটা জায়গায় ওই বাইক পার্ক করে ঢোকে।
কালিয়া : ভাই লোকটা কে?
রাজন : আরে সেরকম কেউ না। প্রাইভেট কোম্পানিতে জব করে।
কালিয়া : বড় ঝঞ্ঝাট হবে না তো!
রাজন : কোনো চিন্তা নেই। কেউ চেনে না ওকে। কাজটা করে দাও। টাকা নিতে নৈনিতাল চলে যাও।
কালিয়া : নৈনিতাল? কেন? এখানেই একটা ডিল করে দাও ভাই।
রাজন : না তা হবে না। প্রথমে চেম্বুর যাও। বলে, দিচ্ছি কোথায়! তারপর নৈনিতাল। মালও ওখান থেকে নিতে হবে।
কালিয়া : ও কে ভাই।
সতীশ কালিয়া চেম্বুর থেকে ২ লক্ষ টাকা প্রথমে পেল। এরপর নৈনিতাল। কাঠগোদাম স্টেশন। একটি গাড়ি আগে থেকে রাখা ছিল। লাল মারুতি ভ্যান। নৈনিতাল লেকের পাশে জু রোডে একটি হোটেলের লবিতে দেখা। ব্লু শার্ট পরা এক যুবক। হাতে ছোট ব্যাগ। আরও ২ লক্ষ টাকা। আর পয়েন্ট থার্টি টু বোরের রিভলভার এবং ২৫টি চেকোস্লোভাকিয়ান বুলেট। মুম্বই ফিরে এল সতীশ কালিয়া। এসেই ফোন করল বন্ধু অনিলকে। অনিল ওয়াগমোড়ে। অনেকদিনের পুরোনো সাথী। একসঙ্গে এর আগে তারা অপারেশন করেছে একাধিক অনিলের কাজ হল টিম মেম্বার বাছাই করা। কাদের নেওয়া হল এই অপারেশনে? ৩৪ বছরের নীলেশ সেংজে ওরফে বাবলু। মঙ্গেশ আগভানে। এরপর দলে এল অরুণ ডাকে, অভিজিৎ শিন্ডে। এখনও সবথেকে ভালো শার্প শুটারকে পাওয়া যায়নি। সবশেষে সে যোগ দিল টিমে। তার নাম শচীন গাওকোয়া।
৬ জুন। প্ল্যান রেডি। ঠিক দুপুর একটায় ফোন এল ছোটা রাজনের। ফাইনাল কল। এবার দেওয়া হল মোটরবাইক নম্বর। বলে দেওয়া হল দুটি জায়গায় পাওয়া যাবে টার্গেটকে। হয় মিড ডে অফিস প্যারেলের পেনিনসুলা সেন্টারে। অথবা জে দের বাড়ি পওয়াইয়ে হীরানন্দানি এস্টেট। অনিলকে সতীশ কালিয়া বলে দিল পরদিন একটা রেকি করতে। অর্থাৎ অপারেশনের আগে জায়গাটা ঘুরে টার্গেটকে দেখে ফাইনাল প্ল্যান করে নিতে। সেইমতো অনিল পরদিন ৭ জুন দুপুরে চলে গেল পেনিনসুলা সেন্টারের সামনে। অপেক্ষা করছে সে। হাতে ছবি। আর মোটরবাইকের ডিটেলস তথা রেজিস্ট্রেশন নম্বর। ঠিক দুটোর সময় সত্যিই জে দে বাইক পার্ক করছিলেন অফিসের সামনে। একদিনে তো হবে না। আবার আসতে হবে। পরপর দুদিন। তাই ৮ জুন আবার। একইভাবে দুটো নাগাদ এলেন জে দে। এবার কনফার্মড হল। তাহলে এই সময়ই আসে লোকটা। কোথায় যায়? সেটা রাজন বলেনি।
কিন্তু সতীশ কালিয়া আশপাশে দেখে নিয়ে বুঝল মুম্বইয়ের কেন্দ্রস্থল এরকম একটি লোকেশনে ব্রড ডে লাইটে কাউকে মারা সম্ভব নয়। তার থেকে পওয়াইতে টার্গেটের বাড়ির কাছে ট্রাই করা ভালো। ওই জায়গাটা একটু কম ভিড়। আর পালানো সহজ। কিন্তু সমস্যা হল পওয়াইতে নিজের বাড়ি আসার আর যাওয়ার কোনো টাইমই নেই জে দের। পরপর দুদিন হীরানন্দানি এস্টেটের সামনে থেকে ঘুরে এসেও সতীশ আর অনিল জে দে-কে দেখতে পেল না। তাহলে? ঠিক সেরকম সময় একটি ফোন এল। রাজনের। বলা হল ১১ জুন টার্গেট ঘাটকোপার থেকে ফিরবে।
১১ জুন। পরদিন। ঘাটকোপারে মা বীণা দে-র সঙ্গে দেখা করে ফিরছেন জ্যোতির্ময় দে। আরসিটি মলের পাশে দেড়টা নাগাদ দেখা গেল মোটরবাইকে চলেছেন তিনি। এটাই সুযোগ। তাঁকে ফলো করা শুরু হল। অন্য দুটো বাইকে। পিছনে। জে দে প্রথমে হীরানন্দানি হাসপাতালের কাছে একটি বেসমেন্টে গেলেন। একটি ফোটোকপি সেন্টারে। হাতে থাকা কিছু কাগজ। ফোটোকপি করলেন। বেরোচ্ছেন। মোটরবাইকে হেলমেট ঝোলানো। কিন্তু সামনে অসংখ্য মানুষ। সকলেই বাইক পার্ক করছে। ঘুরছে। বেরোচ্ছে। সতীশ কালিয়া ঠিক করল এখানে নয়। দাঁতে দাঁত চেপে তারা আবার ফলো করতে শুরু করল। আবার থামলেন তিনি। এবার পওয়াইয়ের ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজি। একটি ক্যুরিয়ার কোম্পানি। এবারই? আর তো সুযোগ নাও মিলতে পারে! অনিল রিভলভার বের করতে গেল। কিন্তু সেই সময়ই একটি পুলিশ ভ্যান। আর পেট্রলিং কার এসে দাঁড়াল। দ্রুত মুখ আড়াল করে সরে এল হত্যাকারীদের বাইক। প্রায় ১৫ মিনিট। তারপর বেরোলেন জ্যোতির্ময়। বাইক স্টার্ট করেই তিনি একটু এগিয়ে আচমকা বাঁদিকে টার্ন করলেন। সেই রাস্তা ফাঁকা। জায়গাটা ক্রিসিল হাউসের পাশে। হীরানন্দানির স্পেকট্রা বিল্ডিং এর সামনে। আর দেরি হলে জে দে হারিয়ে যাবেন। সতীশ কালিয়া অনিলকে বলল, স্পিড!! স্পিড বাড়িয়ে দিল অনিল! একদম জে দের পিছনে চলে এল। সামনে পিছনে দুটি বাইক। একবার মুখ ঘোরালেন জ্যোতির্ময় দে। এত কাছে পিছনে কেন বাইকটা এসেছে? তিনি সাইড দিতে চাইলেন। কিন্তু পিছন থেকে সতীশ কালিয়ার হাতে ততক্ষণে উঠে এসেছে রিভলভার। পাঁচটা বুলেট বিদ্ধ হল জে দের শরীরে। চতুর্থ বুলেট সোজা হার্ট ফুটো করে দিল। বাইক স্কিড করে আকাশের দিকে হাতটা বাড়িয়ে পড়ে গেলেন জে দে। চতুর্দিকে চলা গাড়ি থেমে গেল। ছুটে এলেন পথচারীরা। সেই ভিড়কে নস্যাৎ করে আরও স্পিড তুলে পালাল হত্যাকারীরা। আর জে দেকে দেখেই হীরানন্দানি হাসপাতালের ডাক্তার বললেন, হি ইজ ডেড!!
অনিল আর সতীশ বাইক নিয়ে সোজা ততক্ষণে যোগীশ্বরীতে মঙ্গেশের বাড়িতে। মঙ্গেশরা পিছনেই ছিল। ব্যাকআপ হিসাবে। সতীশ ঘরে ঢুকেই বলল টিভি চালা! নিউজ চ্যানেল। এবং কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই সতীশ অনিল মঙ্গেশরা স্তব্ধ। তাদের মুখে নেমে এল চরম আতঙ্ক। কারণ কাকে খুন করেছে তারা? এই কারণেই রাজন ভাই কিছুতেই টার্গেটের নাম বলেনি? এ তো পত্রকার! মিডিয়ার লোক! যাদের থেকে দূরে থাকতে হয়। তাও আবার মিড ডে পত্রিকার গতিময় দে। যে নাকি বিরাট ফেমাস! কালিয়া তৎক্ষণাৎ ফোন করল রাজনকে। বলল ভাই এটা কী হল! তুমি আমাদের ফাঁসিয়ে দিলে! রাজন বলল, কেন? কালিয়া উত্তরে বলল আমাকে একবারও বললে না লোকটা কে? রাজন আরও ঠান্ডা মাথায়
বলল, বলে দিলে কাজটা করতিস না তুই। চিন্তা নেই। আরও বেশি পেমেন্ট দেব। তোরা মুম্বই ছেড়ে দে। অন্য জায়গায় চলে যা। কোথায়?
পাওয়াগ, শিরডি, আকালকোট, ইয়াদগিরি….পালাচ্ছে সতীশ কালিয়ারা। শোলাপুরে বাবলু রয়ে গেল। আর বাকিরা পালাতে পালাতে গিয়ে হাজির হল রামেশ্বরমে। কিন্তু ততদিনে গোটা ইন্ডিয়া তোলপাড়। মুম্বই পুলিশের উপর প্রবল চাপ। যেভাবেই হোক ধরতেই হবে। গোটা মিডিয়া, পলিটিশিয়ান, মহারাষ্ট্র সরকার, নেতা, মন্ত্রী সকলেই চাপ দিচ্ছে। কারণ এত বড় ঘটনা ঘটেনি আজ পর্যন্ত মুম্বইতে। পুলিশ কমিশনার অরূপ বললেন, আমাদের এক মাস সময় দিন। কেস ক্র্যাক করা হবেই। প্রাথমিক লিড এসে গিয়েছে।
ঠিক ১৬ দিনের মাথায় রামেশ্বরমে হানা দিয়ে তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হল। সোর্স মারফত খবর পেয়ে গিয়েছিল মুম্বই পুলিশ। জেরা শুরু হল। ধীরে ধীরে জেরায় একের পর এক তথ্য সামনে এল। বিশেষ করে ছোটা রাজনের ভূমিকা। কিন্তু সবথেকে বড় বিস্ফোরণ হল কিছুদিন পর। যখন জানা গেল, ছোটা রাজনকে কে দিয়েছিল জ্যোতির্ময় দের মোটরবাইকের রেজিস্ট্রেশন নম্বর আর আরও বেশ কিছু তথ্য। বিশেষ করে বলা হয়েছিল কীভাবে রাজনের ভাবমূর্তি নষ্ট করার জন্য জে দে সাহায্য নিয়েছিল রাজনের চিরশত্রু ছোটা শাকিলের। সেসব বলে বলেজে দে সম্পর্কে রাজনের মন বিষিয়ে দিয়েছিল একজন। কে সে? ওই রোমহর্ষক হত্যা মামলায় একাদশতম অভিযুক্ত হিসাবে যাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ তিনিই ছিলেন এই হত্যাকাণ্ডে অন্যতম প্ররোচকের ভূমিকায়। তাঁর নাম জিগনা ভোরা! এশিয়ান এজ সংবাদপত্রের ক্রাইম রিপোর্টার! সিঙ্গল পেরেন্ট ৩৭ বছরের এক মহিলা সাংবাদিক।
সত্যিই কি তাই? জিগনা ভোরার সঙ্গে প্রফেশনালি শত্রুতা ছিল জ্যোতির্ময় দের? নাকি অন্য কোনো গোপন প্রতিযোগিতা? আসল কারণ কী? কিন্তু মামলার রায় বেরনোর পর দেখা গেল প্রমাণ নেই কোনো। জিগনা ভোরা যে এই হত্যাকাণ্ডে যুক্ত তা পুলিশ প্রমাণ করতে পারেনি নথিপত্র তথ্য দিয়ে। তাই জিগনা ভোরা বেকসুর খালাস হয়ে গিয়েছেন। প্রধান অভিযুক্ত ছোটা রাজন এবং তার সুপারি পাওয়া সাতজনকে সাজা ঘোষণা করা হয়েছে। রাজন আগে থেকেই তিহার জেলে বন্দি। সেখান থেকেই ভিডিও কনফারেন্সে তাকে হাজির করানো হয়েছিল আদালতে। কেন? কারণ দাউদের গ্যাং তাকে এখনও যে কোনো সময় পেলেই হত্যা করবে! তাই তাকে বাইরে আনা যাবে না। কিন্তু জ্যোতির্ময় দেকে হত্যা করার পিছনে আর কে কে আছে? জানা যাবে কি কখনও?
