ব্ল্যাক করিডর ১.২৪

ভাগ লতিফ ভাগ…

চিৎকার করছে জামিরা বেগম…ভাগ লতিফ ভাগ…। চিৎকার করছে লুৎফর.. ভাগ লতিফ ভাগ… চিৎকার করছে সুলেমানের আব্বা, ভাগ লতিফ ভাগ..

ওই যে ছুটছে আবদুল লতিফ! মরিয়া সেই দৌড়। আমেদাবাদের বাসস্ট্যান্ডের পিছনে পোপাতিয়াবাদের গলির মধ্যে থাকা কার্পেন্টার রশিদ, সেলুনের কর্মচারী আকবর, মদের ঠেকের রুস্তমভাই, মসজিদের বাইরে ফুল বিক্রি করা সাবির সকলের সামনে থেকে যখনই লতিফ প্রাণপণে ছুটে পেরোচ্ছে, তখন তারাও সব ফেলে দৌড়, শুরু করেছে তার পিছনে। আর পিছন থেকে বলছে ভাগ লতিফ ভাগ…। ছুটছে রশিদ, ছুটছে আকবর, ছুটছে রুস্তম, ছুটছে সাবির। আর সকলের পিছনে হাতে খোলা রিভলভার নিয়ে ছুটে আসছেন সাব ইনস্পেক্টর যোশী। অনেকটা পিছনে জিপ। সেখানে পাবলিক অ্যাড্রেস সিস্টেমে গুজরাতি ভাষায় ঘোষণা করা হচ্ছে মাঝেমধ্যে, আবদুল লতিফ সারেন্ডার করো..। সারেন্ডার করা ধাতে নেই আবদুল লতিফের। সে সব বাধা বিঘ্ন পেরিয়ে শুধু সামনের দিকে ছুটতে ভালোবাসে। তার প্রিয় গেম হল দৌড়। সেই ছেলেবেলা থেকে সে দৌড়ে চলেছে। কালুপুরের স্কুল শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পেটে প্রচণ্ড খিদে থাকলেও আগে ছুটতে হত বাবার বিড়ির দোকানে। সেখান থেকে বিড়ির বান্ডিল নিয়ে ছুটতে হয়েছে মহল্লায় মহল্লায় পানের দোকানগুলিতে। রাত ৯ টা পর্যন্ত। একদিনে যতগুলো দোকান কভার করা যাবে ততই টাকা পাওয়া যাবে। দু টাকা রোজগার করতে তাই লতিফ ছুটেছে দিনের পর দিন। মাসের পর মাস। আজ সেই লতিফ কালুপুর আর পোপাতিয়াবাদের নতুন মসিহা। সকলেই তাকে ভালোবাসে। সকলের বিপদে লতিফের ছেলেরা আছে সবাই জানে। তাই আজ তার দৌড় আরও বেড়ে গিয়েছে। মনজুরের বিজনেসের থেকেও বড় বিজনেস করতে হবে। তাই ছুটেছে লতিফ। আজ আর ভয় কীসের। যাঁদের মুখে হাসি ফোটাতে সে চেয়েছিল প্রচুর টাকার মালিক হতে সেই পরিবারের কর্তা বাবা আবদুল ওয়াহাব পাপের টাকা ছুঁতে ঘেন্না পান। তিনি বলে দিয়েছেন তোমার রোজগারের টাকা আমাদের দেবে না। আমাদের চাই না। পাপের টাকা কেন? কারণ চোরাই মদ বিক্রির টাকা। লতিফ যতই নিজের পরিবার থেকে দূরে সরে যেতে শুরু করল, ততই কাছে এল হানিফ দুধওয়ালা, সঈদ বাপু, পিলু মারওয়াদি, আব্বাস অন্ধা। সকলেই মদের ব্যবসার বাদশা, শাহেনশাহ, সুলতান। এসব তো অনেক পরের কথা। তারও আগে কালুপুরের মনজুর আলির কাছে এই পথে হাতেখড়ি হয়েছিল লতিফের। বিড়ি সাপ্লাই করে করে তার আর ভালো লাগেনি। তাই একটা কিছু করতে হবে এই জেদ ছিল। আর আটজনের সংসার বাবার ওই বিড়ির দোকান টানবে কীভাবে? তাই আবদুল লতিফ ঠিক করেছিল তাকে রোজগার করতে হবে। অনেক টাকা। নতুন রাজ্য হিসাবে জন্মের পর গুজরাত শুরু থেকেই ড্রাই স্টেট। অর্থাৎ মদ বন্ধ। তাই এখানে ক্রিমিনালদের প্রশিক্ষণ শুরু হয় একটিই পেশার মাধ্যমে। চোরাই মদের সাপ্লাই। অতএব প্রথম অপরাধ ব্যাগে কান্ট্রি লিকার ঢুকিয়ে সাপ্লাই করা দোকানে দোকানে। বাচ্চাদের পুলিশ বেশি সন্দেহ করে না। স্কুলের ব্যাগ নিয়ে একদিন দৌলত গলির দোকানে বিড়ির বান্ডিল পৌঁছে দেওয়ার সময় দেখা হয়েছিল দুই সাহেবের সঙ্গে। তারা পানের অর্ডার দিয়ে নিজেদের মধ্যে কিছু একটা ভাবে আলোচনা করছে। কানে এল লতিফের। সবরমতীর ওপারে নাকাবন্দি চলছে। বেজায়। চেনা মুখ দেখলেই পাকড়াও করছে পুলিশ। এখন উপায়? কাল সকালের মধ্যে সাপ্লাই করতে হবে। আর তার জন্য দরকার আনকোরা নতুন কোনো মুখ। যাকে কেউ চেনে না। কিন্তু এখন এত তাড়াতাড়ি কীভাবে সম্ভব পাওয়া? পানের দোকানের আসিফ চাচাও তাহলে সব শুনছিল? নাহলে তিনি কেন বলে উঠবেন মনজুর মিঞা রাতে কাউকে পাঠাব ঠেকায়? ‘ঠেকা’ হল মনজুরের জুয়া আর মদের দোকান। কয়েকটি রাস্তা পেরিয়ে যেতে হবে। মনজুর বিস্মিত। কাকে পাঠাবে? হাসিমুখে আসিফ বলল, সে আছে। তোমার কাজ হওয়া নিয়ে কথা। মনজুর রাজি। আগে তো পাঠাও! দেখি আবার কেমন হয়!

চলে গেল তারা। আর আসিফ এতক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকা লতিফকে বলে উঠল কীরে, টাকা চাই! অনেক টাকা! কোনো খাটনি নেই! শুধুই একটা মাল সাপ্লাই করতে বে। লতিফ আগুপিছু কিছুই চিন্তা না করে ঘাড় হেলিয়ে বলল রাজি। কী মাল জানিস? লতিফের উত্তর ছিল, উসসে কেয়া ফর্ক পরতা চাচা! কাম তো কাম হোতা হ্যায়..বাস পয়সা চাহিয়ে। চমকে উঠল আসিফ! এরকম কথা এই বাচ্চা ছেলের মুখে শোনার প্রত্যাশা ছিল না। আসিফ জানত আবদুল ওয়াহাবের পরিবারের অবস্থা ভালো নয়। এই ছেলেটা রোজ এসে ব্যাগের মধ্যে থেকে বিড়ির বান্ডিল বিক্রি করে দেয়। তারপর দৌড়ায়। আবার অন্য কোনো দোকানে। তাই একটা মায়া পড়ে গিয়েছে। আসিফ আর আসিফের মতো এই মহল্লার অন্যান্য দোকানি জানে এখানে মুশকিল আসান একজনই। মনজুর ভাই। লোকাল এলাকায় মদের ঠেক চালায়৷ আর অন্যান্য কিছু পাচারের কারবারও আছে। কিন্তু নিজের মহল্লার পাবলিকের কাছে সে লিডার গোছের। কাজে অকাজে টাকার দরকার পড়লে হেল্প করবে। ছেলে ছোকরাদের কোনো একটা কাজ জুটিয়ে দেয়। সে কাজ অবশ্য আলো অন্ধকার মেশানো। তাতে কী! খালি পেটে থাকার থেকে তো ভালো! তাই আসিফ মিঞার কাছে আর কোনো নাম মনে আসেনি। লতিফকে পাঠানো হল মনজুর আলির কাছে। সেই শুরু। পরদিন স্কুল ব্যাগের মধ্যে চারটে বোতল প্রথমে দিয়ে পাঠানো হয়েছিল বাসস্ট্যান্ডে। টেস্ট কেস। সে আদৌ অভিনয় করে রাস্তা পেরিয়ে যথাস্থানে মাল পৌঁছাতে পারবে কিনা তা জানা দরকার। চোখেমুখে ভয় থাকলে হাবিলদারগুলো সন্দেহ করতেই পারে। লতিফ একচান্সে সেদিন পাশ করেছে। সে বিন্দুমাত্র ভুল না করে বাসস্ট্যান্ড পেরিয়ে লস্যির দোকানে দাঁড়ানো নীল জামার লোককে দেখে জিজ্ঞাসা করেছে ভাইয়া টিকিট কাউন্টার কোথায়? সে লোকটা হেসে বলেছে মাল কোথায়? লতিফ নির্বিকার কণ্ঠে বলেছিল, আগে টাকা চাই। হুবহু এসব শিখিয়ে দিয়েছিল আলি। নিখুঁতভাবে সেসব মনে রেখেছে লতিফ। অতএব লোকটিও নতুন এক ছেলেকে দেখে মনে মনে ভাবছিল মনজুর ভাই কোথা থেকে এসব গোল্ডেন রিক্রুটমেন্ট করে কে জানে! এই ছেলে বড় হলে কোথায় পৌঁছবে? টাকা দিয়ে মৃদু হেসে লোকটি চলে যায়। আর সেদিন থেকেই মাসিক ৩০ টাকা বেতনে মনজুর আলির কাছে বহাল হল আবদুল লতিফ। তারপর? তারপর আর পিছনে ফিরে তাকায়নি লতিফ। ঠিক তিন বছর ধরে এই কাজটি করার পর একদিন লতিফ বুঝল নেহাৎ আমেদাবাদের মধ্যে কান্ট্রি লিকার বিক্রি করে লাভ কী? সে মনজুর আলিকে বলেছিল আমি দায়িত্ব নিচ্ছি। গোটা গুজরাত আমাদের টার্গেট হোক। মনজুর চমকে উঠেছিল। এতবড় কথা কেউ ভাবেনি। এমনকী এই লাইনের সবথেকে ডেঞ্জারাস লোক হংসরাজও নয়। এই ছেলেটা কি একটু নিজেকে ওজন দিয়ে ফেলছে? ও জানে এই লাইন কীভাবে চলে। শুধু গোপনে কিছু দেশি মদের কারখানা তৈরি করে আর সোমনাথ মন্দিরের রুটে দিউ থেকে মাল নিয়ে এসেই কি এত বড় সম্রাজ্য গড়ার স্বপ্ন দেখা যায় নাকি? লতিফকে ডেকে সেকথা বলল মনজুর। লতিফ বলেছিল আপনাকে কে বলেছে এসব থাকলেই শাহেনশাহ হওয়া যায়! আমিও জানি হওয়া যায় না। যা করলে হওয়া যায় আমি সেটাই করতে চাই। তবে একটাই কন্ডিশন। প্রত্যেক সাপ্লাইয়ে ফিফটি ফিফটি কমিশন থাকবে। মনজুর ঠাণ্ডা চোখে তাকাল। ছেলেটা বলে কী? এত সাহস পায় কীভাবে? এই সেদিন হাতে ধরে নিয়ে এলাম। শেখালাম সব নেটওয়ার্ক। আর আজ আমার পার্টনার হওয়ার শখ! ফুৎকারে ওসব প্রস্তাব উড়িয়ে দিয়ে বলল মনজুর, এসব হবে না লতিফ। যেভাবে কাজ চলছে সেভাবেই চলবে। আমি এই গ্রুপের বস। আমিই ঠিক করব। লতিফ বলল, কাল থেকে আপনি ভাবতে শুরু করুন কী ভুল করেছেন আজ! কাল থেকে বিজনেস নয় আলি চাচা, আপনার মাথায় শুধু ঘুরবে কীভাবে একদিন আবদুল হওয়া যায়। এই মহল্লার সবাই চাইবে আবদুল হতে। আমি দেখিয়ে দেব মটকা থেকে জুয়া, ঠেকা থেকে সোনা, গুজরাতের বাদশা হবে একজনই। আবদুল লতিফ। মনজুর চিৎকার করে ডাকল তার দক্ষিণ হস্ত জহাঙ্গিরকে। জহাঙ্গির..ইসে বহার কা রাস্তা দিখা দো..। জহাঙ্গির…। কোথায় জহাঙ্গির? সে তো সর্বদাই খিদমত খাটার জন্য আলিভাইয়ের জন্য জান কবুল। রুবেল! রুবেল! জহাঙ্গিরকে না পেয়ে এবার রুবেলকে ডাকল আলি। রুবেল আর এক অনুগত। দুর্দান্ত ছুরি চালাতে পারে। বিরোধী পক্ষের কাউকে ডেকে এনে গলায় মসৃণভাবে ছুরি চালাতে জুড়ি নেই রুবেলের। একটুও নড়ছে না লতিফ। সোজা তাকিয়ে রয়েছে সামনে। মনজুর আলির দিকে। মনজুরের চোখে বিস্ময় জমছে। কী ব্যাপার? রুবেল নেই! জহাঙ্গির নেই! কোথায় গেল? ওরা তো এক মিনিটও মনজুরকে ছেড়ে যায় না। মিনিট খানেক কেটেছে। লতিফ এগিয়ে আসছে। কাছে এসে কাঁধে হাত রেখে বলল, আলিচাচা, তুমহে আভি থোড়া রেস্ট লেনা চাহিয়ে! তুমি পুরানা খিলাড়ি হয়ে গেছ। আলি বিস্ফারিত নেত্রে দেখল রুবেল আর জহাঙ্গির কখন যেন নিঃশব্দে এসে দাঁড়িয়েছে লতিফের পিছনে। লতিফ শুধু বলল, ওরা আমার সঙ্গে যাচ্ছে চাচা! নঈ দুনিয়ায়! আলির কাঁধ ছেড়ে দিয়ে লতিফ শুধু বলল, আসব মাঝে মাঝে…তোমার এলাইচি খেতে। দারুণ টেস্ট!

ঠিক পরদিন দুপুরে সাব ইনস্পেক্টর যোশী তার ফুল ফোর্স নিয়ে জিপে করে ঢুকলেন কালুপুরে গলিতে। আবদুল লতিফকে চাই। কেন? লোকাল থানায় খবর গিয়েছে পোপাতিয়াবাদের আঞ্জুম মহল্লার পিছনে মদ ডাম্প করা আছে। আর ওই গুদাম লতিফের। সত্যিই লতিফের। কিন্তু ওটা তো কাপড় জামার গোডাউন। ভর্তি কাটপিস। সেগুলো এসেছে কটন মিল থেকে। এলাকার মেয়েরা জামা বানাবে সারামাস ধরে। তারপর সাপ্লাই হবে ছোট মার্কেটগুলোয়। এটাও ঠিক। কিন্তু প্রতিটি কাপড়ের কার্টুনের মধ্যে রয়েছে প্রচুর মদের বোতল। সেগুলো সাপ্লাই যাবে পোরবন্দর। ঠিক সেই সময় ঝড়ের গতিতে জিপ নিয়ে ঢুকলেন সাব ইনস্পেক্টর যোশী। গোডাউন কোনদিকে? লোকজন একে অন্যের মুখে চাওয়া চাওয়ি করছে। মুখে বলছে না। সামনে ছিল একটি যুবক। তাকে জিজ্ঞাসা করা হল কোথায় লতিফ? সে বলল জানি না। একটা সজোরে থাপ্পড়! ছিটকে পড়ল ছেলেটি। উত্তাপ ছড়াচ্ছে কালুপুরে। যোশী ভ্রূক্ষেপ করছেন না। এসব মহল্লায় তার ইনফর্মার আছে। তারা বলেছে এখন লতিফ ওই গোডাউনে। কিন্তু আসল সোর্স অন্য কেউ। তার নাম মনজুর আলি। কাল রাতেই সে যোশীকে জানিয়ে দিয়েছে লতিফ আর তার সঙ্গে নেই। গ্রুপ ছেড়ে দিয়েছে। লতিফের গোডাউনে প্রচুর মাল। একবার লকআপে গেলে অন্তত ৬ মাস এক বছরের জন্য জেল। ততদিনে বিষদাঁত ভেঙে যাবে। ওকে ধরতেই হবে। যোশী তাই আগে খোঁজ নিয়েছে কখন কোথায় থাকবে লতিফ। গোডাউনের দরজা বন্ধ ভেতর থেকে। যোশী চিৎকার করে বললেন, আবদুল….ফোর্স ঘিরে রেখেছে। পালাতে পারবে না। দরজা খোলো। নয়তো গুলি করে দরজা খুলব। কেউ উত্তর দিচ্ছে না ভিতর থেকে। যোশী বললেন, এক…দো….তিন..। গুলি চলল না অবশ্য! দরজা ভাঙা হল। এবং ভেতরে কেউ নেই। জানালার শিক খোলা। সেখান থেকে মুখ বাড়িয়ে দেখা গেল ওই যে দৌড়চ্ছে লতিফ। যোশী এক লাফে বাইরে। শুরু হল তাড়া করা। ছুটছে লতিফ। এই মহল্লার দরিদ্র খেটে খাওয়া মানুষ লতিফের থেকে উপকার পায়। প্রতি পদে ভিড় টপকে যেতে হচ্ছে যোশীকে। আর সঙ্গে চলছে সমস্বরে চিৎকার ভাগ লতিফ ভাগ! ঠিক তখন আচমকা একটা দরজা খুলে গেল। কাঠের। দৌড়ের সামনে মুখের উপর দরজা এসে পড়ায় প্রায় পড়ে যাচ্ছিল লতিফ। কিন্তু একটা হাত তাকে টেনে নিয়ে এল ঘরের দিকে। বাধা দিতে পারেনি সে। সঙ্গে সঙ্গে দরজা বন্ধ। ঘর অন্ধকার। পিছনে শুধু চিৎকার শোনা যাচ্ছে ভাগ লতিফ ভাগ। লতিফ কিছু বলতে যেতেই কেউ মুখে হাত চাপা দিল। চাঁপা ফুলের গন্ধ মাখা হাত। লতিফ নিমেষে বুঝে গেল বিলকিস। সেদিন বেঁচে গেল লতিফ। বিলকিসের জন্য। সাব ইনস্পেক্টর যোশী গোটা মহল্লা তোলপাড় করেও আর খুঁজে পেলেন না। সব শান্ত হয়ে গেলে চুপিসারে পিছনের একটা দরজা দিয়ে লতিফ বেরিয়ে যাওয়ার আগে বিলকিসের হাত ধরে শুধু বলল, আজ তুই না থাকলে…বিলকিস কোনো কথা বলেনি। নিঃশব্দে চোখের জল গোপন করল। সে তো প্রাণ দিতে পারে লতিফের জন্য। কিন্তু লতিফের মন টেনেছে ততদিনে অন্য কেউ। আকিলা বানু! লতিফ ওই যে চলে যাচ্ছে আবার। বিলকিস একটি শ্বাস ফেলল। তার আর লতিফকে পাওয়া হল না।

হংসরাজ মানবে না আবদুল ভাই! কী করা যায়? বলল রুবেল। যেখানে বসে আছে লতিফ সেই জায়গাটার নাম দেওয়া হয়েছে ক্লাব। সকাল থেকে বাইরে লাইন পড়ে। রিটেল মদের সাপ্লায়াররা এসেছে। ঘরে ঢুকেই একটা বড় হল। সেখানে সার দিয়ে রাখা টেবিল। আর টেবিলে নম্বর দিয়ে সাজানো দেশি মদের বোতল। অন্য ঘরে বিদেশি মদের সারি। প্রত্যেকে আগে থেকেই দিয়ে গিয়েছিল কার কটা লাগবে আর সেইমতো কুপন বিলি করা হয়। এবার সকাল থেকে সেই কুপন মিলিয়ে টাকা নিয়ে নম্বর দেখে দেখে বোতল বণ্টন। সকালটা এখানেই কাটায় আবদুল লতিফ। কারণ একদিকে যেমন সে এই বেআইনি মদের ব্যবসার আপাতত শীর্ষে, তেমনই আবার এলাকার সরকার। সকাল থেকে বাইরে দুটি লাইন পড়ে। একটি ওই মদের সাপ্লায়াররা। আর দ্বিতীয় লাইনে আসে গরিব রিকশচালক, দিনমজুর, দোকানের কর্মচারীর মা, কটন মিলের শ্রমিকের বউ, ছাত্র। নিজেদের সমস্যা নিয়ে। এদের কাছে লতিফই আদালত। সে ঠিক করে দেবে কোন সমস্যার কী সমাধান। সেই বিচারের রায় সকলকে মানতে হবে। নয়তো লতিফের ছেলেরা অমান্যকারীকে উচিত শিক্ষা দেবে। হাতেনাতে বিচার হয় লতিফ কোর্টে। কোনো শুনানি নেই, কোনো তারিখ নেই, কোনো জেল জরিমানা জামিন নেই। এলাকায় এই ররিনহুড ইমেজ তৈরি করা অপরাধীদের বরাবরের স্টাইল দক্ষিণ মুম্বইয়ের ডোংরির কাছে পাকমোড়িয়া স্ট্রিটে একবার যাবেন সময় পেলে। ঢুকে দেখবেন একটা বিল্ডিং এর নাম গর্ডন হাউস। সেখানে থাকত হাসিনা পার্কার। গোটা রাস্তায় যত দোকান, হোটেল, রেস্তোরাঁ আছে সকলেই অচেনা আগন্তুককে কাছে এবং দূর থেকে জরিপ করে। এবং ঠিক কয়েক মিনিট পর একটা ফোন যায় করাচিতে। জানিয়ে দেওয়া হয় এরকম দেখতে একটি লোক ঘুরছে। এটাই নেটওয়ার্ক দাউদ ইব্রাহিমের। কারণ দাউদ দক্ষিণ মুম্বইয়ের কয়েকটি এলাকায় আজও রবিনহুড। এই স্টাইল নিলে সাধারণ মানুষের সমর্থন পাওয়া যায়। তাই হাজি মস্তান থেকে করিম লালা। দাউদ থেকে আবদুল লতিফের ফরমুলা এটাই। যাতে পুলিশ প্রশাসন সরকার কিছু কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার আগে দুবার ভাবে। অর্থাৎ ডনরা জানে আসল শক্তি নিজের গ্যাং নয়। আসল শক্তি পাবলিক সিমপ্যাথি। অগ্নিপথের বিজয় দীননাথ চৌহানকে তাই নামজাদা এলিট রেস্তোরাঁয় অসম্মান করা হয়, ইনস্পেক্টর গায়কোন্ডের ছেলে তাকে দেখে বলে গুন্ডা..কিন্তু পরের দৃশ্যেই দেখা যায় ৬ ফিট ৪ ইঞ্চির বিজয় দীননাথ চৌহান মুম্বইয়ের বস্তি এলাকায় ঢুকতেই হাজার হাজার লোক তার পায়ে পড়ছে, তার সামনে হাতজোড় করে দাঁড়াচ্ছে, আর মুখে জয়ধ্বনি দিচ্ছে ভাই..ভাই…। এসব সিনেমার চিত্রনাট্য অবিকল তৈরি হয় আসল ডনদের আদলে। সত্যিমিথ্যে মিথ মিশিয়ে। তাদের হিরো বানানো হয়। আমেদাবাদের আবদুল লতিফও ছিল এরকমই জনপ্রিয় গরিবের কাছে। কিন্তু ততটাই ভয়ংকর অপরাধী হিসাবে চিহ্নিত পুলিশ ফাইলে। কারণ লতিফের অপরাধের কোনো মাত্রাজ্ঞান নেই। হংসরাজ ত্রিবেদী এই চোরাই মদের লাইনে সবথেকে বড় প্রতিপক্ষ লতিফের। বরোদা, গোধরা, সুরাতের নেটওয়ার্কে সে বারংবার লতিফের ট্রাক আটকে দেয়। পুলিশকে গোপন খবর দিয়ে দেয়। ফলে লক্ষ লক্ষ টাকা লোকসান হচ্ছে। এলাকা ভাগাভাগি করার প্রস্তাব দিয়ে অথবা একসঙ্গেই কাজ করার ডিল হোক এই আশায় নিজের বিশ্বস্ত ডানহাত রুবেলকে পাঠাল লতিফ হংসরাজের কাছে। হংসরাজ প্রস্তাবটা শুনল। আর গোটা গ্রুপ চরম অপমান করল তাকে। বলা হল কী রে লতিফের এত জোেশ সব কোথায় গেল? আজ আমার সঙ্গে ডিল করতে হচ্ছে? লতিফ নিজেকে শাহেনশাহ ভাবে তো! আজ চুহা হয়ে গেছে! শুধু মুখেই এসব কথা নয়। রুবেলকে চড়থাপ্পড়ও মারা হল। কারণ একটাই, হংসরাজের পিছনে আছে রাজনৈতিক শক্তি। প্রতিটি মদের সাপ্লাইয়ের কমিশন যায় রাজনৈতিক দলগুলির নীচের তলার নেতা ও পদাধিকারীর কাছে। একদিকে যদি বিজেপির মদত থাকে, অন্যদিকে তাহলে কংগ্রেসের মদত। হংসরাজ বনাম লতিফের এই লড়াইয়ের পিছনে তাই রয়েছে আসলে পরোক্ষ যুব বিজেপি মোর্চা বনাম গুজরাত কংগ্রেসের দুই নেতার দাবাখেলাও। রুবেল ফুঁসতে ফুঁসতে ফিরে এসে বলল, হংসরাজ মানবে না। বরং আমাদের মাল আজও আটকে দিয়েছে সে। লতিফের মুখ শক্ত হয়ে গেল সে ফোর স্কোয়ার ব্র্যান্ডের সিগারেট খায়। টেনশন আর রেগে গেলে সেই সিগারেটের ফিল্টারের অংশ দাঁত দিয়ে চিবানো স্বভাব! ওটাই লক্ষণ লতিফ এবার অ্যাকশনের কথা ভাবছে। ঠিক তাই। বলা হল খতম কর দো! কাকে? হংসরাজকে। চমকে উঠল দলের লোকজন। হংসরাজকে খতম! এটা মুখের কথা নাকি। বহু খুন করিয়েছে লতিফ। সেসব চুনোপুঁটি। তাই বলে হংসরাজ! সম্ভব নাকি?

১৯৯২ সালের ৩ আগস্ট সন্ধ্যা সাতটা পঁয়তাল্লিশে আবদুল চারজন বাছাই করা হিটম্যানকে পাঠাল হংসরাজের অফিসে। প্রথমে দুজন ঢুকল। মদের সাপ্লাই চাই বলে তারা জানতে চায় কোথায় ত্রিবেদী ভাই। কিন্তু হংসরাজ অফিসে নেই। কোথায়? সেটা বলার নিয়ম নেই। অতএব প্ল্যান সাকসেসফুল হচ্ছে না। ফিরে এল তারা। ঠিক সাড়ে ৮টার সময় আবদুল লতিফ খবর পেল হংসরাজ আছে রাধিকা জিমখানা ক্লাবে। আবার গেল সেই চারজন। জিমখানা ক্লাবে ঢুকে দেখা গেল একটা করে টেবিল সাজানো চারদিকে। সেখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বেশ অনেকেই বসে আছে। বেশিরভাগ খেলছে তাস। কিন্তু এর মধ্যে কে হংসরাজ? আসল লোকটাকেই তো চেনে না এই নতুন বাইরে থেকে আসা হিটম্যানরা। এরা এসেছে মুম্বই থেকে। তাহলে? আবার কি প্ল্যান ফেল করবে? তারা দ্রুত বেরিয়ে এল। একটা দোকানের বাইরে ঝুলছে টেলিফোন বুথ। সেখানে কয়েন ফেলে কথা বলতে হয়। এক টাকার কয়েন ফেলে ফোন করা হল ক্লাবে। সেই লতিফের ক্লাব। আগে থেকেই লতিফ বসে আছে। সে খবর চায়। ফাইনাল খবর। কিন্তু কোথায় খবর? তার পাঠানো গ্যাংস্টাররা এবার জিজ্ঞাসা করা হচ্ছে ওখানে ১০ জন মতো বসে আছে। ছড়িয়ে ছিটিয়ে। বুঝব কীভাবে কে হংসরাজ? লতিফ তিন সেকেন্ড ভাবল সম্ভবত। এবং ঠাণ্ডা গলায় অর্ডার দিল সবকো উড়া দো! ওপ্রান্তে থাকা লোকটি এটা আশা করেনি। কেয়া ভাই? এবার ধমকে উঠল লতিফ! শুনতে পাচ্ছ না? সব কটাকে খতম করো! এক টাকার কয়েনের সময়সীমা শেষ। ফোন কেটে গেল। ঠিক ১২ মিনিট পর জিমখানা ক্লাবে ঢুকে চারজন হিটম্যান চেয়ারে বসে তাস খেলা সবাইকে লক্ষ্য করে নির্বিচারে গুলি চালানো শুরু করল। আটজনই খতম। হংসরাজ ত্রিবেদীর গোটা গ্যাংয়ের প্রধান শাগরেদরা কেউ নেই। হংসরাজ নিজেও নিহত। এটাই হল ভারতীয় অপরাধ ইতিহাসে কুখ্যাত রাধিকা জিমখানা কিলিং। কেন কুখ্যাত আর গুরুত্বপূর্ণ এই গ্যাং ওয়ার? কারণ সেই প্রথম ১৯৯২ সালের আগস্ট মাসে ভারতের কোনো অপরাধী গ্যাং হত্যকাণ্ডে ইউজ করল এ কে ফর্টি সেভেন! হ্যাঁ আবদুল লতিফের হাত ধরে অপরাধ দুনিয়ায় ঢুকল এ কে ফর্টি সেভেন! আর এই রাধিকা জিমখানা মামলার প্রধান অভিযুক্ত হিসাবে আর রেয়াত করা হবে না । গোটা রাজ্যে সমালোচনার ঝড়। এমনিতেই কংগ্রেসের মুখ্যমন্ত্রী চিমনভাই প্যাটেলের বিরুদ্ধে বিরোধীরা অভিযোগ তোলে তাঁর সঙ্গে নাকি ক্রিমিন্যালদের যোগসূত্র। আর এইসব ক্রিমিন্যালদের সাহায্যে তিনি ভোটেও জেতান কংগ্রেসকে। সুতরাং রাধিকা জিমখানা মামলা হাইপ্রোফাইল অপরাধ হিসাবে গণ্য হল। অচিরেই লতিফ বুঝতে পারল বড়সড় হিসাবে গোলমাল করেছে সে। একসঙ্গে আটজনকে খুন করার মধ্যে যে হিরোইজম দেখাতে গিয়েছে সে তা আসলে ব্যাকফায়ার করেছে। একের পর এক গ্রুপ মেম্বারকে অ্যারেস্ট করছে আমেদাবাদ পুলিশ। সব মিলিয়ে ১১টি গোডাউনে তল্লাশি চালিয়ে হাজার হাজার লিটার বেআইনি মদ আটক। আবার পালাচ্ছে লতিফ। পিছনে পুলিশ। পোরবন্দর, রাজকোট, জুনাগড়, সোমনাথ…লতিফ ছুটছে। যেখানেই যাচ্ছে সেখানেই পুলিশ আসছে রেইডে। একমাত্র বাঁচাতে পারে একজনই। হাসান লালা। ছোটবেলার বন্ধু। কিন্তু এখন সে গুজরাত যুব কংগ্রেসের সভাপতি। আর উপায় নেই। তাঁকেই ফোন করল লতিফ। কিন্তু হাসান লালা এখন আর কোনো হেল্প করতে পারবে না জানিয়ে দিলেন। তিনি বললেন, এবার তুমি যা করেছ এরপর সবটাই হাতের বাইরে চলে গিয়েছে। আর উপায় নেই আবদুল। সারেন্ডার করো।

সারেন্ডার?

আজ পর্যন্ত সারেন্ডার করেছে লতিফ? হাসান লালা তাকে বলল তোমাকে যেভাবে হোক ধরার জন্য সবথেকে বেশি চাপ দিচ্ছে একজন। কে? রউফ ওয়ালিউল্লাহ। রাজ্যসভার প্রাক্তন এমপি। তিনি গুজরাতের আইনশৃঙ্খলা নিয়ে রাস্তায় নেমে আন্দোলনের ডাক দিয়েছেন। কারণ একটাই। এটা এখন পলিটিক্যাল ইস্যু। তাহলে একমাত্র বাধা ওই রউফ? হ্যাঁ। বললেন, হাসান। লতিফ ঠিক দুদিন পর চলে গেল দুবাই। আর দুবাই থেকে সে রসুল পাত্তিকে বলল, একজনকে খতম করতে হবে। কে সে? ওয়ালিউল্লাহ! রসুল পাত্তি লতিফের অনেক পুরোনো লেফটেন্যান্ট। সে পারে না হেন কাজ নেই। এরকম গুলির নিশানা আর কারও কি আছে? সেই রসুলও কেঁপে উঠল। ওয়ালিউল্লাহ সাবকে টার্গেট করার অর্থ আত্মহত্যা করা। কিন্তু লতিফ তার জন্য যে রেট ফিক্সড করল রসুলের পক্ষে উপেক্ষা করা সম্ভব হল না। ৫০ লক্ষ!! ১৯৯২ সালে ৫০ লক্ষ!! ৯ অক্টোবর ১৯৯২। আমেদাবাদ রেলওয়ে আন্ডার ব্রিজের কাছে টাউন হলের পাশে একটা ফোটোকপির দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে ওয়ালিউল্লাহের গাড়ি। দুটি যুবক কাছে এল। ভরদুপুর। যুবকদুটির নাম সাজ্জাদ ওরফে ড্যানি। আর মহম্মদ ওরফে ফাইটার। রসুল পাত্তির সবথেকে সেরা দুই হিটম্যান। শার্প শ্যুটার। গাড়ির কাছে এল ফাইটার। সালাম আলাইকুম, আর গুলি চালাল। তখনও আলাইকুম আসসালাম বলে হাত নামাননি রউফসাহেব। গাড়িতেই ঢলে পড়লেন মৃত্যুর কোলে। মোটরবাইক চালাল ড্যানি। নিমেষে উধাও!

আবদুল লতিফ বদলা না নিয়ে থাকতে পারে না। তার পথের কাঁটা সবাইকে সে সরিয়ে দেবে নির্মমভাবে। কিন্তু আসল কথাটাই তো বলা হল না। এখানে এই দুবাইতে ১৯৯২ সালে সে এল কীভাবে? গত ৮ বছর ধরে যার সঙ্গে তার প্রতিনিয়ত বিবাদ চলছে, গ্যাং ওয়ার হচ্ছে সেই দাউদ ইব্রাহিমের গুহা দুবাইতে ঢুকে গেল সে? এ তো সুইসাইড করতে আসা। একেবারেই নয়। দাউদ ইব্রাহিম লোকটা বৃহত্তর স্বার্থে ক্ষুদ্র স্বার্থকে সর্বদাই অগ্রাহ্য করে। গুজরাত উপকূল তার কাজে লাগবে। অস্ত্র পাচার, ড্রাগ পাচার আর স্মাগলিংয়ে। আর গুজরাতে আবদুল লতিফের থেকে বড় নেটওয়ার্ক কারও নেই। অতএব যতই এই লতিফ একদিন দাউদকে খতম করার জন্য মরিয়া হয়ে যাক, তাকেই কাছে ডাকতে কোনো দ্বিধা নেই দাউদের। অতএব এর আগেই ১৯৯০ সালের নভেম্বরে একদিন আবদুল লতিফ একটা মেসেজ পেয়েছিল। সেখানে বলা হয়েছে দাউদ ভাই আপনার সঙ্গে কথা বলতে চায়। সেই কথা হয়। ফোন করিয়ে দিয়েছিল আনিস ইব্রাহিম। দাউদ স্পষ্ট কথায় বিশ্বাসী। বলেছিল গুজরাত তোমার থাকবে। আমি শুধু এন্ট্রি চাই গুজরাত কোস্টে। কমিশন পাবে। লতিফ প্রথমে ভাবল এটা কোনো কৌশল কিনা। কিন্তু তারপর দেখল মুম্বইয়ে আলমজেব আর আমিরজাদা কেউ আর নেই। দাউদের সঙ্গে অযথা এখন দুশমনি জিইয়ে রেখে লাভ কী? সুতরাং দাউদের দলে নাম লেখাল গুজরাতের ডন! নতুন যুগলবন্দির জন্ম হল। আর রাধিকা জিমখানার মামলার পর সেই দাউদের হেল্পেই দুবাই পালিয়ে এসেছিল লতিফ। রউফকে খুন করার প্ল্যান দুবাইতে বসে।

৩১ ডিসেম্বর দুবাইয়ে দাউদের বাড়িতে একটি বৈঠক হচ্ছে। আয়োজক আইএসআই। দাউদের কাছে আইএসআই একটি প্ল্যান দিল। সেই প্ল্যানের জন্য দরকার এমন একটি নেটওয়ার্ক যার সবথেকে ভালো হাত রয়েছে একমাত্র সমুদ্র উপকূলে। কে আছে এমন? দাউদের প্রথম যার নাম মনে পড়ল সে হল আবদুল লতিফ। লতিফ ছাড়া আর কেউ পারবে না আরব সাগরকে হ্যান্ডল করতে। ১৯৯৩ সালের ৯ জানুয়ারি গুজরাতের ডিগি পোর্টে একঝাঁক বাক্স এসে পৌঁছল জলপথে। আরবসাগর দিয়ে। সেই বাক্সগুলিতে ছিল কয়েক কেজি আরডিএক্স, ২৯টি রাইফেল। গোটা সাপ্লাইয়ের দায়িত্বে ছিল আর কেউ নয়। আবদুল লতিফ। কী হবে এই এত আরডিএক্স দিয়ে? আবদুল লতিফ সোনা স্মাগলিং করেছে। বেআইনি মদের সাপ্লাই নিয়েছে সে। কিন্তু এত আর্মস আর আরডিএক্স সে এই প্রথম নিখুঁতভাবে নিয়ে আসতে সফল হল। কী হবে এত আরডিএক্স দিয়ে? একটা অপারেশন আছে। অপারেশনের নাম দেওয়া হয়েছে তেহরিক ই ইন্তকাম! সিক্রেট মিশন! কী সেটা?

লঞ্চের নাম মুস্তাফা মজনু আল-সাদা বাহার। দুবাই থেকে আসছে। জানুয়ারি ১৯৯৩। আরব সাগর। আপাতত শান্ত। প্রথম স্টপেজ পাকিস্তানের করাচির কাছে একটি ছোট বন্দর। ডাক নাম পাকিস্তান কা খাড়া! অফিসিয়াল পোর্ট নয়। সারেংদের ওপর নির্দেশ আছে কারা লঞ্চে উঠছে আর সঙ্গে কী কী ব্যাগ তুলছে সেসব নিয়ে যেন তারা মাথা না ঘামায়। তাদের তো টাকা পাওয়া নিয়ে কথা। আর কোনো শব্দ যেন মুখে উচ্চারিত না হয়। প্রায় ২ ঘণ্টা দাঁড়াতে হল। কিছু ব্যাগ উঠছে। তারপর সবুজ সংকেত। ছাড়ল লঞ্চ। ওদ্দার উপকূল ধরে যেতে হবে। সেভাবেই গুজরাতের পোরবন্দরে এসে পৌঁছল পরদিন সকালে। ঘোসাবারা উপকূল। সচরাচর এদিকটায় কেউ আসে না। শুধু মাঝেমাঝে এরকম লঞ্চ আসে নিয়ম করে। পুলিশ জানে। কাস্টমস অফিসারও জানে। তবে সব লঞ্চে তো আর কোনো বেআইনি কারবার হয় না। বলা যায় মিলিয়ে মিশিয়ে ৷ কিছু বেআইনি মাল থাকে। কিছু নর্মাল। তাই সন্দেহজনক কারবার থাকলেও সেসব ব্যবস্থা করাই থাকে। তাছাড়া সন্দেহজনক লঞ্চের মধ্যে থাকা কিছু বস্তায় ম্যাক্সিমাম থাকে রুপোর বার। আর সোনার বিস্কুট। এছাড়া কখনও সখনও সাদা আর কালো পাউডার। তার নাম ড্রাগস। সেটা অবশ্য গোয়া, মেঘালয়, মণিপুর আর পাঞ্জাবে যাবে। প্রতিটি বস্তার জন্য পৃথক রেট আছে কাস্টমসের। ঘোসাবারা উপকূলের সমুদ্রতীরে আগে থেকেই দাঁড়িয়ে আছে কয়েকজন পোর্টার। তারা মাল ওঠানো নামানোর কাজ করে থাকে সারা বছর। চুনিলাল কারভা ওই পোর্টারের নাম।

এক ব্যক্তি চিৎকার করে বলে উঠল, কারভা তোর লোকদের বল আস্তে আস্তে মালগুলো নামাতে। চুনিলাল কারভার সঙ্গে আছে আরও তিনজন। তারাও পোর্টার। সকলে লঞ্চে উঠল। লঞ্চে আগে থেকেই দুজন এসে বসে আছে। তারা মালগুলো নামানোয় হেল্প করবে। কোথা থেকে যেন এসেছে লঞ্চ নিয়ে। ইকবাল হুসেন সৈয়দ আর ইউসুফ কুচ্চি। এক মিনিট পরপর বুখারি চিৎকার করছে, আস্তে..আস্তে। কী ব্যাপার? এতবার আস্তে আস্তে বলার মানে কী? আমরা কি নতুন কাজ করছি নাকি? ভাবছে চুনিলাল। বিরক্তও হচ্ছে। কয়েকটা বস্তা থেকে সাদা পাউডারের মতো কিছু বেরোচ্ছে মনে হল। চুনিলাল দেখছে। কিছুক্ষণ পর আর একটা বস্তা পিঠে নিতে গিয়ে খোঁচা খেল। কিছু একটা লোহার রডজাতীয়। প্রায় ২৮টি বস্তা নামানোর পর চুনিলাল ঘাম মুছছে। জানুয়ারি মাস হলেও গুজরাতের পোরবন্দরে সেরকম কোনো শীতের অনুভব নেই। বরং ভরদুপুরে বেশ গরম লাগছে। সামুদ্রিক হাওয়ায় গরম ভাব। মাঝেমধ্যে সিগাল ওড়ে এই খাঁড়ির মতো জায়গাটায়। ঘাম মোছার ফাঁকেই চুনিলাল ক্যাজুয়াল ভঙ্গিতেয় জানতে চাইল, মামুমিয়াঁ! এসব বস্তায় কী আছে বলো তো? কেমন যেন রডের মতো। পিঠে তোলার সময় খুব ব্যথা লাগল। চুনিলাল বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেল পরের মুহূর্তে। বুখারিকে সকলে ওই নামেই ডাকে। মামুমিঁয়া। পোরবন্দরের সে হল খ্যাতনামা স্মাগলার। সেই বুখারির মুখ রাগে লাল হয়ে গেছে। চিৎকার করে বলে উঠল, তোর কী দরকার? বস্তায় কী আছে সেটা তোর জানার কথা? নিজের কাজ মন দিয়ে করে যা। আর পেমেন্ট অ্যাডভান্স দিয়ে দিয়েছি মনে রাখিস। আর কী চাই! চুনিলাল বুঝতে পারছে না এতে এত রাগের কী আছে! এসব লাইনে মাল ওঠানামা তো সে আজ থেকে দেখছে না। সোনা রুপো থাকেই। জানে ড্রাগও থাকে। এতে আবার গোপন কিছু আছে নাকি? পুলিশই জানে সবকিছু। তাই এই সামান্য নিরীহ প্রশ্নের সামনে এতটা রাগারাগির ব্যাপারটা বোঝা যাচ্ছে না। কিন্তু মুখে আর কিছু বলল না সে। সত্যিই তো! তার কী যায় আসে। টাকা পাবে, কাজ করবে। তার মতো ছোটা আদমির এর বেশি জানতে চাওয়াই উচিত হয়নি বলে ভাবছিল চুনিলাল। এবার মালগুলো লোড করতে হবে। বাইরে টেম্পো রাখা আছে। তিনটে। সেখানে মাল নিয়ে যেতে হবে। সব কাজ হয়ে গেলে চুনিলালকে আরও এক্সট্রা কিছু টাকা হাতে দিয়ে বুখারি বলল, আবার মাল আসতে পারে। তৈয়ার রহেনা! চুনিলাল হেসে চলে গেল। সেটা ছিল প্রথম কনসাইনমেন্ট। ৪৫টি বস্তায় ওই যে লোহার রডের মতো জিনিস। সেগুলির নাম একে ফর্টি সেভেন। ২২৫ টা বড় বড় রুপোর বার। ৩০টি বাক্সে রয়েছে পাউডার। সেই পাউডারের নাম আরডিএক্স! টেম্পো প্রথমে যাবে ভালসাদে। সেখানে একজনের কাছে মাল ডেলিভারি করতে হবে। এসব মাল তার নামেই এসেছে। তিনদিন পর আরও দুটি লঞ্চ এল। ঠিক একইভাবে। সেই এক রুটে। তবে এবার আর পোরবন্দর লক্ষ্য নয়। এবার নেমেছিল ভালসাদ। পোরবন্দরের ঘোসাবারা থেকে সেই তিনটি টেম্পো প্রথমে থামল ধোরাজি। টেম্পো তিনটি জোগাড় করা আর ওই মাল তুলে যথাস্থানে পৌঁছে দেওয়ার জন্য কন্ট্রাক্ট দেওয়া হয়েছিল ইজু শেখকে। ইজুর এটাই কাজ। সুতরাং গোটা নেটওয়ার্কে সকলে সকলকে চেনে। ভালসাদে এসে অপেক্ষা করছিল টেম্পো তিনটি। কারণ অন্য মাল এখনও এসে পৌঁছয়নি। ঠিক তিনদিন পর এসে গেল। তবে যেটি এসে পৌঁছেছিল সেটা কোনো টেম্পো বা ম্যাটাডর ছিল না। ছিল সরকারি অ্যাম্বুলেন্স হুটার বাজিয়ে এবং বেকন লাইট জ্বালিয়ে গোটা পথ চলেছে যে সরকারি অ্যাম্বুলেন্স, সেটার মধ্যে ছিল ১০৫টি একে৪৭, ১৯০ কেজি আরডিএক্স আর ৩৯০ হ্যান্ড গ্রেনেড!

চারটে গাড়ি আমেদাবাদে যখন পৌঁছেছে তখন ভোর। শহরের ঘুম ভাঙেনি। সবরমতী আশ্রমের নিয়ম হল সকলেই ভোর চারটের মধ্যেই উঠে যান। সেটাই নিয়ম ছিল মহাত্মা গান্ধীর। উঠে প্রথমেই প্রার্থনা। আর কিছু বাজার খুলতে শুরু করেছে শহরে। ঠিক ওরকম এক টিপিক্যাল আমেদাবাদের দিন শুরুর মধ্যেই একটি অ্যাম্বুলেন্স আর তিনটি টেম্পো কালুপুরের একটি গোডাউনে দাঁড়াল এসে। টোকা মারতেই যে দরজা খুললো তাকে চেনে ইজু শেখ। কিন্তু চমকে উঠলো। কারণ লোকটি ছিল আবদুল লতিফ। যে আছে দুবাইতে। এরকম সকলে জানে। লতিফ ভাই কবে ফিরল? মামুমিয়াঁ জানে? সেসব প্রশ্ন মনে এসেছিল ইজু শেখের। কিন্তু লতিফ ভাইয়ের সামনে কে মুখ খুলবে? ভয়ে হাত পা সেঁধিয়ে যায় কথা বললেই। লতিফ সম্পূর্ণ গোপনে ফিরে এসেছে গুজরাত। তাকে পাগলের মতো খুঁজছে পুলিশ। সে জানে। তা সত্ত্বেও সে ফিরে এল কেন? কারণ দাউদ ভাই একটা কাজ দিয়েছে। সেটা তাকে সম্পন্ন করতে হবে। আর সেই কাজ সে ছাড়া এই গোটা গুজরাতে কেউ পারবে না। কারণ গুজরাতের তীর ঘেঁষে বয়ে যাওয়া আরব সাগর তার সাম্রাজ্য। তার মতো আরব সাগরকে কেউ চেনে না। আর তার থেকেও বড় একটা কারণ আছে। যত ছোট ডনই হোক। সে গুজরাতের সম্রাট। দুবাইতে তাকে থাকতে হয়েছিল সম্পূর্ণ দাউদের আর এক নিছকই গ্যাং মেম্বার হয়ে। সেখানে আনিস ভাই থেকে সেলিম সকলেই চোখ রাঙায়। আবদুল লতিফকে এসব ভাইয়ের অনুগ্রহে পালিত দু কড়ির মস্তানদের চোখ রাঙানি সহ্য করতে হবে? আরে আমি তো নিজের সাম্রাজ্য নিজে তৈরি করে দেখিয়েছি। আর এরা তো সবাই দাউদ ভাইয়ের আলোয় আলোকিত। নিজেরা কী করেছে? এরকমই ভেবে একদিন দাউদকে বলেছিল আমাদের ফের পাঠানোর ব্যবস্থা করুন। আমি আপনার সব সাপ্লাই দেখব এবার থেকে। দাউদ এর থেকে বড় নিশ্চিন্ত আর কীসেই বা হবে। কারণ বম্বে তার হাতে। এবার যদি গুজরাত কোস্ট সবটাই নিজের লোকের হাতে থাকে তাহলে আর মাল পাচার নিয়ে কোনো চিন্তাই নেই। দুবাইয়ে কলকাঠি নেড়ে জাল পাসপোর্ট বানিয়ে লতিফকে তাই আবার গোপনে ভারতে পাঠিয়ে দিয়েছে সে। তাই আইএসআই যখন দাউদকে বলেছিল ভারতে অ্যাটাক করতে হবে, তখন গোটা প্ল্যান শুনে প্রথমেই দাউদের মনে পড়েছিল একজনেরই কথা। কারণ একমাত্র সেই পারবে আর্মস সাপ্লাই রিসিভ করতে। আসলে রিসিভ তো সকলেই করতে পারে। কিন্তু সমুদ্রপথে কোনো বেআইনি পণ্য আসা এবং সেই পণ্য সঠিক জায়গায় পৌঁছে যাওয়ার জন্য যে পুলিশ আর কাস্টমস নেটওয়ার্ককে হাত করা দরকার সেটা কজনের কাছে থাকে? ওই ব্যাপারে তো সিদ্ধহস্ত একজনই। আবদুল লতিফ।

তাই দুবাই থেকে এসেই পোরবন্দরের ঘোসাবারা উপকূল মারফত সে নিয়ে এসেছে বিপুল অস্ত্রের এক সাপ্লাই। কাজে লাগবে। ওই অস্ত্র পাঠাতে হবে বম্বে। কোন রুটে এসেছে এই সাপ্লাই? ওই যে আগেই বললাম, আরবসাগরে ওদ্দারা কোস্ট রুটে! করাচি থেকে। একবার তো বলা হয়েছে। আবার একই কথার পুনরাবৃত্তি করা হচ্ছে কেন? হচ্ছে, কারণ এই বিশেষ রুটটি মনে রাখা দরকার। ১৯৯৩ সালের সেই জানুয়ারির ১৫ বছর পর ঠিক এই রুটেই করাচি থেকে আর একটি বোট আসবে। ২০০৮ সালে। তার নাম হবে কুবের। সেই বোটেও থাকবে অসংখ্য অস্ত্র। আর থাকবে ১০ জন যুবক। যাদের একজনের নাম আজমল কাসব। সেই বোটের যাত্রী ও অস্ত্রশস্ত্রের গন্তব্যও হবে সেই একই টার্গেট। বম্বে!

কীভাবে একজন নেহাত বেআইনি মদের কারবারি থেকে আর্মস সাপ্লাইয়ের মাস্টারমাইন্ড হয়ে উঠল লতিফ? পোরবন্দরে ছোটখাটো অপরাধ আর পাচার হওয়া মাল সাপ্লাইকারী মামুমিয়াঁর দাদা একদিন খুন হয়ে গেল। সেই ছিল পাঁচজনের পরিবারের একমাত্র রোজগেরে লোক। সুতরাং তার খুন হয়ে যাওয়ার পর গোটা বুখারি পরিবার সম্পূর্ণ জলে পড়ে গেল। মেজ ছেলে ওসমান বুখারি তখনও ক্লাস ইলেভেনে। কিন্তু আর পড়াশোনা করে কী হবে? অতএব সে একদিন স্কুলে না গিয়ে আস্তে আস্তে গিয়ে পৌঁছল খারওয়া নারান সুধার জুয়ার আড্ডায়। নারান সুধার আড্ডার বৈশিষ্ট্য হল এখানে জুয়া খেলতে আসে পুলিশ কনস্টেবলও। অবশ্যই লুকিয়ে। তার সুবিধাটা হল কখনও এখানে রেইড হওয়ার প্ল্যান হলে আগেভাগে নারান সুধা খবর পেয়ে যেত। কারণ তার তো কাস্টমার স্বয়ং পুলিশ। সুতরাং এহেন এক আড্ডার রমরমা বাড়বেই। বাড়ছিলও। জুয়ার সঙ্গে মদের সম্পর্ক কে না জানে অঙ্গাঙ্গী। অতএব বেআইনি মদের দরকার হয়ে পড়ল অনেক। মামুমিয়াঁকে কাজ দেওয়া হল ক্যারিয়ারের। সেই শুরু তার নিজের কেরিয়ার। মাল বেশিরভাগ আসত সাগরপথে। সুতরাং কোস্টাল রুটের মাস্টার হয়ে উঠল মামুমিয়াঁ। কয়েক বছরের মধ্যেই তার ডাক পড়ল সোনা আর রূপোর বাট আনা নেওয়ার ক্যারিয়ার হিসাবে। সেই থেকে আর অন্য কোনো বিজনেসে যায়নি সে। কিন্তু বড় মাল নেওয়ার মতো লোক কোথায়? সব তো ছোটখাটো বিজনেস করে। সেই কলজের জোরই নেই কারও। অথচ সাপ্লাইয়ের লোক বসে আছে দুবাইয়ে। অবশ্য একটা লোক আছে। আমেদাবাদে। সেই পারে বড় অর্ডার দিতে। ১৯৯০। সেই লোকটির কাছে একদিন মামুমিয়াঁ যেতে চায়। কেন?

লতিফ ভাই আপনি যদি সোনা চান আমি দিতে পারি।

কীভাবে? তুমি কে?

আমি ভাই, পোরবন্দরে ঘোসাবারায় কাজ করি। ছোটখাটো সাপ্লাই করে দিন গুজরান হয়।

ছোটখাটো সাপ্লায়ার আমাকে ফোন করছে কেন? ধান্দা কী?

ভাই সোনার সাপ্লাই আমি জানি। নেওয়ার লোক গুজরাতে কেউ নেই। আপনি ছাড়া। ওপারে ফোনে একটু নিস্তব্ধতা। ৩০ সেকেন্ড পর বলল পরশু তুমি আমার কাছে এসো।

পরশু কেন? আমি কালই যেতে পারি

ঠান্ডা গলায় লতিফ বলল, দরকার নেই। পরশু মানে পরশু!

আচ্ছা ভাই! ফোন রেখে দিল মামুমিয়াঁ!

পরশু নয়, কারণ পরবর্তী ২৪ ঘণ্টায় লতিফ নিজের পুলিশের সোর্সকে দিয়ে জেনে নিল মামুমিয়াঁ আদতে কী কাজ করে। আজ কাদের সঙ্গে তার কন্ট্যাক্ট। কারণ রাইভ্যাল গ্যাংয়ের লোকজন এভাবে ট্র্যাপও পাততে পারে। যে কোনো সময়। সোজা গাড়ি নিয়ে আমেদাবাদ গেল মামুমিয়াঁ। ততক্ষণে খবর পেয়েছে লতিফ যে মামু জেনুইন লোক। সোনা রুপোর সাপ্লাই করে। প্রথম অর্ডারেই লতিফ মামুমিয়াঁকে দিল ২৫ লক্ষ টাকা! বাক্যস্ফূর্তি হচ্ছে না মামুমিয়াঁর। কারণ এই লেভেলের অর্ডার সে কল্পনাই করেনি। কে পাঠাবে সোনা? তার নাম হাজি কাসেম। থাকে দুবাইতে। প্রকাশ্যে একটা টেলারিং কোম্পানির দরজি। কিন্তু সন্ধ্যার পর সে করে সোনার স্মাগলিং। তার সঙ্গেই যোগাযোগ মামুমিয়াঁর। ২৫ লক্ষ টাকার অর্ডার ১৫ দিনের মধ্যেই এসে হাজির। চারটে জ্যাকেট এল। ১০০টা গোল্ড বিস্কুট। সেই শুরু! মামমিয়ার সঙ্গে লতিফের সোনা রুপোর স্মাগলিং ব্যবসা তুঙ্গে উঠল। তখনই এল একটা বিশেষ দিন। নিজেই চলে এল লতিফ একদিন সোজা পোরবন্দর। কেন? মামুমিয়াঁকে ডেকে পাঠালেই তো হত। তা হল না। সে নিজেই এসে পোরবন্দরে সুদামা চকের পাশের গলিতে ঢুকে একটা হোটেলের রুমে দরজা বন্ধ করে বলল পঞ্জু, আর্মস পাওয়া যাবে? মামুমিয়াঁ অবাক। আর্মস? আবদুল লতিফ মামুমিয়াঁকে সম্বোধন করে পঞ্জু নামে। ওটা তার পারিবারিক ডাক নাম। কেন? আপনার আবার আর্মসের অভাব? ওসব দিয়ে হবে না। আমার চাই স্পেশাল কিছু। কী সেই স্পেশাল আর্মস? লতিফ বলল, একে ফর্টি সেভেন। বিস্ফারিত নেত্রে তাকিয়ে রইল মামুমিয়াঁ। কোথায় পাবে সে? চোখেই দেখেনি! তাহলে উপায়? মামুমিয়াঁর কাছে কেন হেল্প চাইছে লতিফ? কারণ তার দুবাইতে কানেকশন আছে। আর দুবাইয়ের এক মাফিয়া তৌফিক জারিওয়ালার নেটওয়ার্ক করাচির সঙ্গে। করাচি হল আর্মস সাপ্লাইয়ের ডেন। সুতরাং মামুমিয়াঁর পক্ষে সেটা সম্ভব হবে। মাত্র দুটো একে ফর্টি সেভেন! জারিওয়ালাকে খবর পাঠানোর পর সে জানাল এটা কোনো ব্যাপার নয়। পাঠিয়ে দিচ্ছি। এসেও গেল। কী করা হয়েছিল ওই দুটি একে ফর্টি সেভেন দিয়ে? আমেদাবাদের সেই গণহত্যায় কাজে লাগাল লতিফ। যার বিবরণ আগের পর্বে দেওয়া হয়েছে। রাধিকা জিমখানা কিলিং! সেখানে যে আটজনকে হত্যা করা হয়, সেই নৃশংস হত্যাকাণ্ড ব্যবহার করা হয় এই দুটি একে ফর্টি সেভেন। সেই প্রথম ভারতে কোনো মাফিয়া নেতা গ্যাং ওয়ারের বদলা হিসাবে ব্যবহার করেছিল একে ফর্টি সেভেন! অতএব আর্মস সাপ্লাইয়ের সঙ্গে আবদুল লতিফের সম্পর্ক নতুন নয়। তবে দুটি একে ফর্টি সেভেন আনা আর এভাবে বস্তা বস্তা আর্মস নিয়ে আসার মধ্যে বিরাট ফারাক। নিখুঁত ট্র্যান্সপোর্ট ব্যবস্থায় সেই বিপুল অস্ত্র ঠিক সময়মতো পৌঁছে গেল মুম্বই থেকে দূরে রায়গড়ে।

অপারেশনের নাম তেহরিক ই ইন্তেকাম। আইএসআই এই অপারেশন এমন এক বৃহৎ মাত্রায় করতে চেয়েছিল যে ভারতের মাফিয়া গ্যাং, দাউদ ইব্রাহিম, সৌদি আরবের দুটি সংগঠনকে কাজে লাগিয়েই নিশ্চিন্ত হচ্ছিল না। এমনকী প্যালেস্টাইন লিবারেশন অর্গানাইজেশন এবং আফগান মুজাহিদিনের মতো আন্তর্জাতিক সংগঠনকেও বলেছিল সহায়তা করতে। যত টাকা লাগে নিতে রাজি ছিল পাকিস্তান। মিটিং হচ্ছিল দুবাইতে। মিটিং হয়েছে আবু ধাবিতে। মিটিং হয়েছে লন্ডনে। করাচিতে। কাবুলে। আইএসআই দাউদকে দায়িত্ব নিতে বলেছিল। তাহলে দাউদ যেচে কেন টাইগার মেমনকে গোটা অপারেশনের দায়িত্ব দিয়েছিল? দাউদ আইএসআইকে বলেছিল যে এই কাজটি সবথেকে ভালো পারবে মেমন! ওর নেটওয়ার্ক দুর্দান্ত! আর আবদুল লতিফের মাধ্যমে যাবে আর্মস। টাইগার মেমন আর মহম্মদ দোসা গোটা অপারেশন করবে। এরকমই হল। ৩০ জন যুবককে মুম্বই, মহারাষ্ট্র, মধ্যপ্রদেশ থেকে সংগ্রহ করে পাঠানো হল দুবাই। সেখান থেকে করাচি। তারপর পাক অধিকৃত কাশ্মীরে ট্রেনিং। ১২ মার্চ ১৯৯৩ সালে মুম্বইয়ে কী হয়েছিল সেই আর্মস আর আরডিএক্স দিয়ে সেকথা এখন সবাই জানে। বম্বের সেই ঘটনা বস্তুত ভারতকে বলেছিল ওয়েলকাম টেররিজিম! গোটা ভারত কেঁপে উঠেছিল ওই একটি বিস্ফোরণে। আর তারপর থেকেই দাউদ ইব্রাহিম নামটির সঙ্গে মিশে গেল প্রবল ঘৃণা। এতদিন সে ছিল নেহাৎ এক মাফিয়া ডন। শিবসেনা প্রধান সর্বপ্রথম দিলেন নতুন নাম। দেশদ্রোহী! দাউদের নিজের অনুগামীরা পর্যন্ত বম্বেতে বসে বিশ্বাস করেনি সে এরকম একটি কাজ করতে পারে নিজের শহরে।

একটি বাক্স এসেছিল দাউদের ঠিকানায়। সেটি খুলে দেখা গেল একঝাঁক কাচের চুড়ি। একটা চিরকুটে লেখা, ‘এক ভাইকে লিয়ে, যো আপনে বহেনকা হিফাজৎ না কর সকে! ইয়ে চুড়িয়া প্যাহেন লে’..।

টাইগার মেমন সেই সময় হয়ে উঠছিল বম্বের এক শক্তিশালী ডন। স্মাগলিং আর তোলাবাজিতে সে ক্রমেই সবাইকে ছাপিয়ে যায়। ঠিক মোক্ষম সেই সময়টায় টাইগার মেমনকে বম্বে ব্লাস্টের দায়িত্ব দিয়ে বম্বে থেকে তাকে পালাতে বাধ্য করেছিল দাউদ। আর অস্ত্রপাচারের সঙ্গে যুক্ত করেছিল আবু সালেম আর আবদুল লতিফকে। তার মানে কী? মানে হল নিখুঁত কৌশলে গোটা প্ল্যানের মাস্টারমাইন্ড নিজে হলেও কোনো প্ল্যান প্রয়োগেই নিজের প্রত্যক্ষ সংযোগ রাখেনি দাউদ। এটাই ছিল তার মাস্টারস্ট্রোক। মেমনরা পুরো পরিবার চক্রান্তের প্রধান কারিগর হিসাবে দোষী। আর ফলে বম্বের ফাঁকা মাঠ আবার দাউদেরই লতিফের কী হল? লতিফ উধাও! কেউ তার খোঁজ পাচ্ছে না।

হয়ে গেল! আর আবদুল ১৯৯৫ সালের ২২ সেপ্টেম্বর গুজরাত পুলিশের ডিআইজি কেএন শর্মা দিল্লির অ্যান্টি টেররিস্ট স্কোয়াডের কুলদীপ শর্মাকে ফোন করে বললেন, আবদুল লতিফ আমেদাবাদের দুটি নম্বরে ফোন করে ৫০ লক্ষ টাকা চাইছে। সেই টাকা ওই ব্যবসায়ী দিতে পারবেন না। তাই তিনি যোগাযোগ করেছেন গুজরাত পুলিশের সঙ্গে। এরপরই আমেদাবাদ পুলিশ সেই ব্যবসায়ীর ফোন ট্যাপ করে। আর জানা যায় ফোন আসছে ডি ট্যাক্স ব্যবস্থার মাধ্যমে। যাকে পরিভাষায় বলা হয় ডিজিট্যাল টেলিফোন অটোমেটিক এক্সচেঞ্জ। সেটির লোকেশন দেখাচ্ছে দিল্লির জনপথে খুরশিদ লাল ভবনে। তাই গুজরাত পুলিশ সাহায্য চায় দিল্লির। ডিআইজি কুলদীপ শৰ্মা তৎক্ষণাৎ সিবিআইকেও যোগাযোগ করলেন। ঠিক হল সত্যিই যদি এটা আবদুল লতিফ হয় তাহলে সিবিআই, দিল্লি পুলিশ আর আমেদাবাদ পুলিশ একজোট হয়ে অপারেশন চালাবে। এটাই হবে আবদুল লতিফের প্রকৃত লোকেশন জানার সবথেকে সহজ উপায়। সবার আগে যেতে হবে টেলিকম দপ্তরে। আজকের এই মোবাইলের যুগে কল্পনাই করা যাবে না ১৯৯৫ সালে একটি টেলিফোন কলকে মনিটর করা এবং সেই নম্বর থেকে কোন নম্বরে কল করা হচ্ছে তা নিখুঁতভাবে জানা রীতিমতো দুঃসাধ্য ছিল। দিল্লি পুলিশকে মহানগর টেলিফোন নিগম লিমিটেডের ডিজিএম সুনীল সাকসেনা বললেন, মনিটর করা সম্ভব! তবে একটা শর্ত আছে। ওই ফোন কল অন্ততপক্ষে ১০ থেকে ১২ মিনিট চালু থাকতে হবে। তাহলেই জানা সম্ভব কোথা থেকে কল আসছে, কোথায় করা হচ্ছে। আর প্রকৃত লোকেশন। ঠিক যখন আমেদাবাদে ফোন আসবে ঠিক তখনই লোকাল এক্সচেঞ্জে সবার আগে জানাতে হবে। সেই এক্সচেঞ্জ এরপর আমেদাবাদের ডি ট্যাক্সকে সতর্ক করবে। সঙ্গে সঙ্গে। আমেদাবাদ ডি ট্যাক্স মনিটর করতে পারবে দিল্লির কোন ডি ট্যাক্স রাউটার ব্যবহার করে কলটি আসছে। ডি ট্যাক্স ওয়ান? নাকি ডি ট্যাক্স টু? সেখনেই শেষ নয় কিন্তু। এরপর দিল্লির ওই ডি ট্যাক্স মনিটর করবে দিল্লির বিভিন্ন এক্সচেঞ্জ। সব মিলিয়ে যে শহরে আছে ৩১টি এক্সচেঞ্জ। আর আপনাদের এই গোটা মনিটর প্রসেসে আমাদের সঙ্গে থাকতে হবে। পারবেন? দিল্লি পুলিশ বলেছিল থাকতেই হবে। যাকে ধরার জন্য এই প্ল্যান সে ধরা পড়লে বিরাট সাকসেস!

সাধারণত আবদুল লতিফের ফোনকল আসছিল সন্ধ্যা সাতটা থেকে রাত ১০ টার মধ্যে। সুতরাং ব্যাপারটা দাঁড়াচ্ছে ওই তিন ঘণ্টায় আমেদাবাদ, দিল্লি টেলিকমকে একজোট হয়ে প্রতিটি মোমেন্ট অ্যালার্ট থাকতে হবে। পরদিন কিন্তু ফোন এল যথাসময়ে। তার পরদিনও তাই। তার পরদিনও এল ফোন। কিন্তু কোথা থেকে কল আসছে তা জানা সম্ভব হচ্ছে না। কারণ একটাই। আবদুল লতিফ ফোন করছে মাত্র কয়েক মিনিটের জন্য। তিন মিনিটের আগেই সে ফোন কেটে দিচ্ছে। অথচ কল চালু থাকতে হবে অন্তত ১২ মিনিট। ওই ব্যবসায়ীকে বলা হল এরপর তিনি যেন অনেক বেশি সময় নেন। আর বিভিন্ন কথার জালে লতিফকে ব্যস্ত করে ফেলেন। যাতে টেলিফোন কল অনেকটা সময় ধরে করা সম্ভব হয়। ৭ সেপ্টেম্বর। ফোন কল এল। এবং এই প্রথম কিছুটা সাফল্যের আলো দেখা যাচ্ছে। কারণ প্রায় ১৩ মিনিট ধরে কথা হয়েছে। দিল্লি আর গুজরাতের এটিএস বাহিনী এবং অধীর হয়ে জানতে চাইছে কোথা থেকে এল কল? এবং জেনে চমকে উঠল সবাই। যে ফোন থেকে এসেছে সেটির নম্বর হল ৩২৮১। দরিয়াগঞ্জ এক্সচেঞ্জ। দুবাই টুবাই কিছুই নয়। দিল্লির দরিয়াগঞ্জ। আর ওই নম্বরটি কার? একটি পাবলিক বুথের। জামা মসজিদের পাশেই। অর্থাৎ এতদিন ধরে আবদুল লতিফ দিল্লিতে লুকিয়ে? আর সে জামা মসজিদের পাশের থেকে রোজ কল করছে? যে জামা মসজিদের অদূরে আইটিও ক্রসিংয়ে খোদ দিল্লি পুলিশের হেডকোয়ার্টার্স!! আশ্চর্য! দিল্লি পুলিশ জানেই না!

কিন্তু আগের কলগুলোও এই একই নম্বর থেকেই করা হয়েছিল কিনা তা জানার জন্য আবার অন্য ব্যবস্থা। সেটি হল ডিজিট্যাল ডেটা টেপ রিড করতে হবে। দরিয়াগঞ্জ এক্সচেঞ্জের। সেটা কীভাবে সম্ভব? টেলিকম দপ্তরের জেনারেল ম্যানেজার (কম্পিউটার) পারবেন বিশেষ অর্ডার বের করে। দিল্লি পুলিশ তাঁর কাছে গেল। ঠান্ডা মাথায় সবটা শুনলেন। এবং আড়মোড়া ভেঙে হাই তুলে বললেন, আচ্ছা ঠিক আছে। একটা রিকোয়েস্ট লেটার দিয়ে যান। ১৫ দিন পর খোঁজ করবেন। দেখি কী করা যায়। স্যার এত দেরি করে চলবে না আমাদের! আমাদের একটা জরুরি কেস! বললেন, এইচ সি সিং । সিবিআইয়ের এক ডিএসপি। কিন্তু সেই জেনারেল ম্যানেজার কোনোরকম হেলদোলই দেখালেন না। এর থেকে আগে করা যাবে না। সবকিছুর একটা নিয়ম আছে। ফোন করে সব বলা হল অরুণ ভগতকে । সিবিআই এর স্পেশাল ডিরেক্টর। অরুণ ভগত বললেন, ঠিক আছে। আমি ভাটকে পাঠাচ্ছি। আর এস ডিএসপি। এম কে ভাট। তিনি বেশি কথা বলার লোক নয়।

ঠিক দু ঘণ্টা পর গেলেন সেই জেনারেল ম্যানেজারের কাছে।

এবং বললেন, আপনার গত এক মাসের পার্সোনাল কল রেকর্ড দেখান। জেনারেল ম্যানেজার বললেন, কেন?

আমরা একটা কেসে আপনার নাম পাচ্ছি। সেটা ভেরিফাই করতে হবে। ২৪ ঘণ্টা টাইম দিলাম।

প্রিন্ট আউট রেডি রাখবেন। দুবাই কানেকশনের কেস। খুব জটিল মামলা। আর শুনুন, আপাতত দিল্লি ছেড়ে কোথাও যাবেন না। আচ্ছা! চলি! নমস্কার!

জেনারেল ম্যানেজারের মুখমণ্ডল রক্তশূন্য হতে শুরু করেছে। ভাট বেরিয়ে আসার আগে হাসলেন। যে রোগের যে ওষুধ! ওষুধ ধরেছে।

ঠিক ২৪ ঘণ্টা পর দরিয়াগঞ্জ এক্সচেঞ্জের সম্পূর্ণ ডিজিট্যাল টেপ দক্ষিণ দিল্লির সিবিআই সদর দপ্তরে এসে পৌঁছল। দিয়ে গেল স্বয়ং সেই এক টেলিকম জেনারেল ম্যানেজার। অরুণ ভগতকে ধন্যবাদ জানালেন দিল্লি পুলিশের এটিএস বাহিনীর ডিআইজি। হাসলেন ভগত তিনি জানেন ঘি ওঠাতে গেলে কখন আঙুল বাঁকা করতে হয়। এবং আর কোনো সন্দেহ রইল না। জানা গেল সমস্ত ফোনই এসেছে ওই একই নম্বর থেকে। অর্থাৎ জামা মসজিদের পাশের পাবলিক বুথ। এবার ফাইনাল প্ল্যান! কী প্ল্যান? দরিয়াগঞ্জ এক্সচেঞ্জের কর্মীরা ওই বিশেষ টেলিফোন বুথের সমস্ত কল মনিটর করবেন সাড়ে ৬ টা থেকে সাড়ে ১০ টার মধ্যে। প্রতিদিন সন্ধ্যায়। মোটোরোলা আলট্রা হাই ফ্রিকোয়েন্সি ওয়্যারলেস সেট নিয়ে দুটো পুলিশের টিম ওই পাবলিক বুথের ধারেকাছে গোপনে সাদা পোশাকে থাকবে। সেই টিমে থাকবে দিল্লি আর গুজরাত দুই রাজ্যের পুলিশই। এমনভাবে যাতে কোনো সন্দেহ না হয়। গুজরাত পুলিশ যদি সংকেত দেয় যে হ্যাঁ এই লোকটিই আবদুল লতিফ, তাহলেই সঙ্গে সঙ্গে দরিয়াগঞ্জ এক্সচেঞ্জ থেকে ওই পাবলিক বুথের আশেপাশে থাকা পুলিশ টিমকে অ্যালার্ট করে দেবে। অয়্যারলেসের মাধ্যমে। তারা তখন ন্যাব করবে লতিফকে। দুদিক থেকে! থার্ড টিম থাকবে একটু দূরে। কারণ লতিফের নিজের টিমও তো থাকতে পারে ব্যাকআপ কভারের জন্য! তাদের মোকাবিলা করবে ওই তিন নম্বর টিম।

দিল্লি পুলিশের টিম তো কখনও আবদুল লতিফকে দেখেইনি। তাহলে তাকে চিনবে কীভাবে জোগাড় করা হল একটি ভিডিও। কোনো একটি বিবাহের। যে বিবাহ অনুষ্ঠানে হাজির ছিল আবদুল লতিফ। সেই ভিডিওতে দেখা গেল অন্যদেরও। লতিফের সঙ্গীদের। রউফ, শরিফ খান, রসুল পাত্তি, সাত্তার ব্যাটারি। গুজরাত পুলিশের পাঠানো একঝাঁক ছবিও বারংবার করে স্ক্রিনে দেখানো হল। আইডিয়াটি ছিল লতিফকে কেমন দেখতে সেটা তো বটেই, পাশাপাশি তার ম্যানারিজম, আচরণ, কথা বলার ধরন সবই যেন দেখে দেখে মনে রাখে পুলিশ টিম। কারণ এমন হতেই পারে লতিফ নিজের এই পুরোনো চেহারা বদলে ফেলেছে। গোটা টেলিফোন কথোপকথন মনিটর করার জন্য ডাকা হল দিল্লির ডিসিপি (সেন্ট্রাল) অফিসের এক আইটি ইঞ্জিনিয়ারকে। রাজু সিনহা। তুখড় অফিসার। ৯ অক্টোবর থেকে শুরু হল। প্রথম দিন ফোন কলই এল না। ১০ অক্টোবর। একইভাবে দরিয়াগঞ্জ এক্সচেঞ্জে দিল্লি পুলিশ, সিবিআই, গুজরাত পুলিশের অফিসাররা বসলেন। ওদিকে দুটি টিম জামা মসজিদে। সাড়ে ৮টা। ওই পাবলিক বুথ থেকে একটা কল হচ্ছে। কিন্তু পাত্তা দেওয়ার মতো নয়। কারণ সেটা যাচ্ছে রাজস্থানের উদয়পুরে। আমেদাবাদে নয়। লতিফ তো নিশ্চয়ই আমেদাবাদে করবে! কিন্তু এক মিনিট পরই আচমকা কোনো একটা কারণে ডিআইজি কুলদীপ শর্মার সন্দেহ হল। চেনা লাগছে না কণ্ঠ? এতবার করে শোনা হয়েছে লতিফের স্বর। তাই চেনা হয়ে গেছে। তবু তিনি নিশ্চিত হওয়ার জন্য হেডফোন দিলেন ডিআইজি সিবিআই নীরজকুমারের দিকে। এরপর রাজু সিনহা। এবং কিছুক্ষণের মধ্যেই বোঝা গেল সেই একই কণ্ঠ! অর্থাৎ লতিফ আছে লাইনে! তৎক্ষণাৎ দরিয়াগঞ্জ এক্সচেঞ্জের কর্মীদের ইশারায় বলা হল টিমকে মেসেজ পাঠাতে। অয়্যারলেসে মেসেজ গেল জামা মসজিদের বাইরে পাবলিক বুথের কাছেই থাকা দুটি টিমের কাছেই।

প্রথমে এগোলেন ইনস্পেক্টর রাজ। তিনি গুজরাত পুলিশের। সন্তর্পণে এগোচ্ছেন। পিছন ঘুরে একটা হাত বুথের কাচঘেরা দেওয়ালে রেখে কথা বলছে আবদুল লতিফ। কিন্তু তারও কিছু একটা সন্দেহ হল। এক নিমেষে ঘুরে দাঁড়াল। কথা বলতে বলতে। বাইরে চোখ গেল। আর তাকিয়েই দেখতে পেল ইনস্পেক্টরকে। তাকে কোনো সুযোগ না দিয়ে ইনস্পেক্টর রাজ দরজার সামনে ঝাঁপিয়ে এলেন। তাকে ধাক্কায় শুইয়ে দিল লতিফ। পালাচ্ছে। কয়েক পা এগোতেই দেখল পালানোর উপায় নেই। তিনদিক থেকেই সাদা পোশাকে সাত আটজন লোক আসছে। আর এতদিনের অভিজ্ঞতায় সে জানে এই লোকগুলো কারা। চোখ দেখলে বোঝা যায় ৷ শ্বাপদের মতো পা ফেলা দেখলে বোঝা যায়। কিন্তু আত্মসমর্পণের সুযোগ দেওয়া হল না। তাকে আগেই একজন পুলিশ অফিসার অ্যাথলেটের ধাঁচে ঝাঁপালেন লতিফকে লক্ষ্য করে। এবং জাপটে ধরলেন মোক্ষম প্যাচে। লোকটির নাম এইচ পি এস চিমা। দরিয়াগঞ্জের স্টেশন হাউস অফিসার! সিবিআইয়ের স্পেশাল ডিরেক্টর অরুণ ভগত নিজের কানকে বিশ্বাস করছিলেন না। তিনি তাঁর টিমের ফোন পেয়ে বলেছিলেন, ডোন্ট টেল দ্যাট! আবদুল লতিফ আবদুল ওয়াহাব শেখ তোমাদের জিম্মায়! এ তো সাংঘাতিক! কনগ্র্যাটস বয়েজ!!

আবদুল লতিফের ইতিহাস তাহলে ওই গ্রেপ্তারের পর সমাপ্ত হল? হল না। লতিফ কাহানির তখনও শেষ দৃশ্য বাকি! ১৯৯৭ সালের এক শনিবার। ২৯ নভেম্বর। লতিফকে কোর্টে পেশ করার জন্য নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। আমেদাবাদ থেকে। পরদিন গোটা গুজরাত জানতে পারল লতিফ কোর্ট থেকে ফেরার সময় পুলিশ ভ্যান থেকে নেমেছিল প্রস্রাব করবে বলে। কারণ সেটা ছিল একটা লেভেল ক্রসিং। নারোদা লেভেল ক্রসিং। তাই পুলিশ ভ্যান দাঁড়িয়েছিল। ট্রেন আসছে দূরে। লতিফ পাশের মাঠে নেমেছে। আচমকা দুটি পুলিশ গার্ডকে ধাক্কা দিয়ে সে পালানোর চেষ্টা করে! এমনকী গুলিও ছুড়েছে গোপনে রাখা পিস্তল দিয়ে। এক দৌড়ে রেললাইন ক্রস করার মরিয়া প্রয়াস। ছুটছে লতিফ! তার কানে আসছে একটা চেনা বাক্য, ভাগ লতিফ ভাগ! সারা জীবন লতিফ ছুটেছে। লতিফ আবার ভাগছে! হঠাৎ একটি গরম সিসা আচমকা লতিফের পিঠে এসে স্পর্শ করল। পালাচ্ছে লতিফ! কিন্তু পারল না। আর একটি গুলি এসে লাগল! তখনও কেউ যেন বলছে, ভাগ লতিফ ভাগ…! ওই যে পড়ে যাচ্ছে লতিফ। অবশেষে। শেষবারের মতো। আবদুল লতিফের জীবনের চিত্রনাট্যের ক্লাইম্যাক্সের নাম ছিল এনকাউন্টার!!

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *