ব্ল্যাক করিডর ১.৫

ইজরায়েলের তেল আভিভ সিটির বাইরে বেন গুরিয়ন ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টে ল্যান্ড করল এয়ার ইন্ডিয়ার বিমান। এসেছে ইন্ডিয়ান ডিফেন্স ডেলিগেশন। ভারতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রীর পর সবথেকে যে ব্যক্তি শক্তিশালী সেই প্রতিরক্ষা সচিব বিজয় সিং-এর নেতৃত্বে। ২০০৮ সালের নভেম্বর। প্রতিনিধি দলে আছেন ভবিষ্যতে এয়ারফোর্স এয়ার মার্শাল এন এ কে ব্রাউনি। কেন আসা হয়েছে ইজরায়েলে? মিডিয়াম রেঞ্জ সারফেস টু এয়ার মিসাইল নিয়ে কথা বলতে। যা ইতিমধ্যেই অর্ডার দেওয়া হয়েছে ভারতীয় এয়ার ফোর্সের জন্য। গোটা টিমকে এয়ারপোর্টে স্বাগত জানানো হল। আর তারপর প্রত্যেকের জন্য পৃথক একটি করে অডি এস ইউ ভি। নিয়ে যাওয়া হল সেভেন স্টার হোটেলে। যে কোনো সরকারি প্রতিনিধি দলের প্রথম কাজ হল সকাল থেকে রাত পর্যন্ত সারাদিন কী কী মিটিং আর অ্যাসাইনমেন্টস আছে সেটা ডায়েরিতে লিখে রাখা। তার জন্য আগে থেকেই ইন্ডিয়ান হাইকমিশন থেকে একটি ব্রিফিং ফোল্ডার দেওয়া হয়। অফিসাররা হোটেলে রুমে পৌঁৗঁছনোর পরই ফ্রেশ হয়ে এক কাপ কফি খাওয়ার পর তেল আভিভের সিটি সেন্টারের দিকে তাকিয়ে ডেস্কে রাখা ফোল্ডার টেনে নিলেন। এবং ফোল্ডার খুলতেই দেখা গেল একটি বড় এনভেলপের মধ্যে ১০০ ডলার করে একঝাঁক বিল। যার মূল্য কয়েক হাজার ডলার। যাঁরা পরিচিত এই ব্যবস্থায়, তাঁরা বিস্মিত হননি। কিন্তু যাঁরা প্রথমবার গিয়েছেন, তাঁদের একজন লিয়াঁজো অফিসারকে ডেকে জানতে চাইলেন এসব কী? লিয়াঁজো অফিসার বললেন, স্যার, এটা আপনার লোকাল এক্সপেন্স। যদি ব্যবহার না করেন আমাদের হেল্প ডেস্ক ডলারে কনভার্ট করে দেবে। ইওর চয়েস স্যার! বোঝা গেল এই প্রতিনিধি দলকে খুশি রাখার এটা একটা সামান্য প্রাথমিক পদক্ষেপ। যদি ডিল অনুমোদিত হয়ে যায় এবং পজিটিভ রিপোর্ট দেওয়া হয় তাহলে আরও বড় উপহার অবশ্যই অপেক্ষা করবে।

এই ছোট্ট গল্পটি দিয়ে এই পরিচ্ছদটি শুরু করার কারণ একটা আন্দাজ প্রদান করা যে ভারতের ডিফেন্স ডিলের পরতে পরতে কতটা দুর্নীতি, লবি আর কমিশন জড়িয়ে আছে। যে কাহিনির সূত্রপাত সেই ১৯৪৮ সালে। এবার শোনা যাক দুটি শিহরন জাগানো প্রতিরক্ষা দুর্নীতি।

তহেলকার দুই সাংবাদিক স্থির করলেন এলটিটিইর সঙ্গে ভারতের আর্মস ডিলারদের কী সম্পর্ক তা জানতে একটি তদন্তমূলক স্টোরি করা হবে। আর সেই সূত্রেই তাঁরা দিল্লির সাউথ ব্লকে প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের ওয়েটিং রুমে দেখা পেয়ে গেলেন এক মিডলম্যানের। সুশীল। সামান্য কথোপকথনের পরই সুশীল জানিয়ে দিল যদি সত্যিই কোনো সামরিক অস্ত্র নির্মাণ সংস্থার হয়ে তাঁরা কাজ করতে চান, তাহলে একদিন অ্যাপয়েন্টমেন্ট করা যাবে প্রতিরক্ষামন্ত্রকের অ্যাডিশনাল ডিরেক্টর জেনারেল (প্রোকিওরমেন্ট) অমিত সিংলার সঙ্গে। তাঁর কাছে যে তথ্য পাওয়া যাবে সেটি ডিফেন্স ডিলের সবথেকে দামি। অর্থাৎ ভারতীয় সামরিক বাহিনী এই মুহূর্তে ঠিক কী ক্রয় করতে চাইছে, কোনটা দরকার, এটা জানলেই অর্ধেক কাজ হাসিল।. সুশীল এই কাজটি কি বিনামূল্যে করবে? অবশ্যই নয়। তাই তাঁকে ওই দুই সাংবাদিক প্রাথমিকভাবে মাত্র ২ হাজার টাকা দিয়েছিল। বাকি পেমেন্ট অ্যাপয়েন্টমেন্টের পর। ঠিক চারদিন পর অ্যাপয়েন্টমেন্ট। আর তার আগে সুশীলকে দিতে হয়েছিল ৫ হাজার টাকা। এরকম ক্লায়েন্ট পেয়ে সুশীল খুব খুশি। অ্যাডিশনাল ডিরেক্টর জেনারেলের সঙ্গে আলোচনায় স্থির হয়েছিল তাঁকে প্রথমে দিতে হবে ২ লক্ষ টাকা। পরিবর্তে কিছু ডকুমেন্ট। বাকিটা পরে। তবে অর্ডার দেওয়ার ক্ষমতা তাঁর নেই। সেটি সামরিক বিভাগের একেবারে উপরমহলে। সবথেকে ভালো হয় যদি সরাসরি রাজনৈতিক মহলের শীর্ষ নেতৃত্বকে ধরা হয়। তাহলে আর চারদিকে টাকা ছড়ানোর দরকারই নেই। এক দু’জায়গায় দিলেই কাজ হয়ে যাবে। তবে সবার আগে দরকার একটি সংস্থা গঠন করার। তহলকার যে দুই সাংবাদিক তদন্ত করছেন তাঁদের মধ্যে একজন থাকেন দিল্লির জনকপুরী। একদিন একটি রাস্তা ক্রস করার সময় তিনি দেখলেন রাও তুলা রাও মার্গ নামের রাস্তাটির পাশে গলিটার নাম ‘ওয়েস্ট এন্ড’। সেদিনই স্থির করা হল অস্ত্র বিক্রির জাল সংস্থার নাম হবে মেসার্স ওয়েস্ট এন্ড ইন্টারন্যাশনাল। ইন্টারনেটে হঠাৎ দেখা গেল হ্যান্ডহেল্ড কুকার নামের কোনো প্রোডাক্ট। ওই হ্যান্ডহেল্ড নামটি নিয়ে একটি অত্যাধুনিক সামরিক উপকরণের নাম দেওয়া হল ‘হ্যান্ডহেল্ড থার্মাল ইমেজার’। পাহাড়ি এলাকায় কাজে লাগবে সেনাবাহিনীর। সবেমাত্র কারগিল যুদ্ধ সমাপ্ত হয়েছে। সুতরাং হিমালয় রেঞ্জে কাজে আসবে এটা। বেশ উৎকৃষ্ট টোপ। আসলে ওরকম নামের কোনো সামরিক উপকরণই হয় না। সব প্ল্যান যখন নিখুঁতভাবে করা হয়ে গেল তখন প্রথম কাজ হল ওই হ্যান্ডহেল্ড থার্মাল ইমেজারির একটি কাল্পনিক ছবি দিয়ে ব্রোশিওর তৈরি। কারণ যাঁদের কাছে ওই কাল্পনিক উপকরণ বিক্রির প্রস্তাব দিয়ে কমিশন দেওয়া হবে তাঁদের বিশ্বাস করানো দরকার তো! চেনাশোনা এক আইআইটি দিল্লির ছাত্রকে পাকড়াও করে বলা হল এই নামের একটি মডেল ইমেজ বানাতে হবে। এরকম নামের উপকরণ হলে তাকে কেমন দেখতে হওয়া উচিত? আইআইটির সেই ছাত্রটি অতি উৎসাহে কার্যকারণ না জেনেই সুন্দর মডেল বানিয়ে দিয়েছিলেন। আর সেইভাবে তৈরি হল ব্রোশিওর। ২০০১ সালের এনডিএ সরকার। অটলবিহারী বাজপেয়ী প্রধানমন্ত্রী। প্রতিরক্ষামন্ত্রী জর্জ ফার্নান্ডেজ। বিজেপি ওই প্রথমবার ভারতবর্ষের সরকারে ক্ষমতায় আসীন। প্রথম দেখা করা হল পি শশীর সঙ্গে। প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের সিনিয়র সেকশন অফিসার। তিনি টাকার বিনিময়ে রাজি হলেন ব্রিগেডিয়ার অমিত শেহগলের সঙ্গে দেখা করিয়ে দিতে। তাঁদের সামনেই ফোন করলেন, স্যার, ওয়েস্ট এন্ড ইন্টারন্যাশনাল থেকে লিয়াঁজো অফিসার একটু বসতে চান। ইয়েস স্যার। রিগার্ডিং হাই অলটিচিউড ইকুইপমেন্টস স্যার। শশী ফোন রেখে হাসছেন। স্যার রাজি। অতএব দুজন সম্পূর্ণ মিথ্যা পরিচয়ের সাধারণ সাংবাদিক অনায়াসে পৌঁছে গেলেন ডিরেক্টর জেনারেল অপারেশন সাপ্লায়ার্সের বাড়িতে। ডিল তো হয়ে যাবে। কিন্তু ক্যাবিনেট কমিটি অফ সিকিউরিটি চূড়ান্ত অনুমোদন দেয়। সেখানে সমস্ত প্রথম সারির মন্ত্রী ও সামরিক অফিসার। কীভাবে রাজি করানো সম্ভব? ঠিক এখান থেকে ভারতীয় জনতা পার্টির সততার ইতিহাসের সবথেকে বড় কালো দাগটির সূত্রপাত। কারণ আর কাউকে নয়। দুজনকে টার্গেট করা হয়েছিল ঘুষ দেওয়ার জন্য। জর্জ ফার্নান্ডেজের দলের দ্বিতীয় শক্তিশালী ব্যক্তি, জয়া জেটলি। সমতা পার্টির সাধারণ সম্পাদক। আর বঙ্গারু লক্ষ্মণ। বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতি। গোটা অপারেশনটি তোলা হয় গোপন ক্যামেরায়। নাম দেওয়া হয় অপারেশন ওয়েস্ট এন্ড। দেখা গেল অশোক রোডে বিজেপির সদর দপ্তরে নিজের চেম্বারে বসে বিজেপি সভাপতি বঙ্গারু লক্ষ্মণ ১ লক্ষ টাকা নিচ্ছেন। নিয়ে ড্রয়ারে ঢোকালেন এবং কথোপকথনে জানা গেল বাকি অংশ ডলারে দেওয়া হবে। পরিবর্তে তিনি ওই সংস্থাকে পাইয়ে দিতে সাহায্য করবেন হ্যান্ডহেল্ড থার্মাল ইমেজারি অর্ডার। একইভাবে টাকা দেওয়া হল জয়া জেটলিকেও। কারণ প্রতিরক্ষা মন্ত্রী জর্জ ফার্নান্ডেজ। যাঁকে জয়া সম্বোধন করেন সাহেব বলে। গোটা দেশে তুমুল হইচই হয়েছে। কারণ তার ঠিক আগেই কারগিলে শহিদ হওয়া সেনাদের কফিন কেনাতেও বিপুল দুর্নীতির অভিযোগে উত্তাল ছিল রাজনীতি। এই দুই ঝড়ের মধ্যে সরকারও টলোমলো। বঙ্গারু লক্ষ্মণ ইস্তফা দিলেন। আর তৎকালীন রেলমন্ত্রী সর্বাগ্রে দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদে সরকার থেকে বেরিয়ে গেলেন। সমর্থন প্রত্যাহার করলেন। প্রধানমন্ত্রী বাজপেয়ী বহু চেষ্টা করলেন সেই রেলমন্ত্রীকে শান্ত করার। তিনি কিন্তু কোনো কথাই শোনেননি। রেলমন্ত্রীর নাম মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। পদত্যাগ করতে হয় জর্জ ফার্নান্ডেজকেও। ১০ বছরের বেশি সময় ধরে তদন্ত চলার পর বিজেপি সভাপতি বঙ্গারু লক্ষ্মণকে আদালত দোষী সাব্যস্ত করে। আর তাঁর চার বছর সাজা হয়। ২০১২ সালের এপ্রিল মাসে চার বছর সাজা ঘোষণার পর অক্টোবরে বঙ্গারু লক্ষ্মণ জামিনে মুক্ত হন। কিন্তু ২০১৪ সালে আচমকা হায়দরাবাদে বঙ্গারু লক্ষ্মণের মৃত্যু হয়। এনডিএ সরকারের আমলে হওয়া এই স্টিং অপারেশন একেবারে খোলাখুলি দেখিয়ে দিয়েছিল রাজনীতিবিদ থেকে সরকারি অফিসার সকলেই কমিশন আর কাটমানির পূজারি।

বঙ্গারু লক্ষ্মণ কিংবা প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের অফিসারদের এভাবে একটি জাল সংস্থার জাল উপকরণ বিক্রির জন্য কমিশন নেওয়ার রীতিটি ভারতীয় রাজনীতির সঙ্গে দুর্নীতির অন্তহীন সংযোগের একটি প্রবহমান উদাহরণ। সবথেকে বিস্ময়কর হল প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে অস্ত্র কেনাবেচার জন্য মিডলম্যান থাকা এবং দেশে বিদেশে লবি করা একটি অফিসিয়াল ব্যবস্থার মধ্যেই ঢুকে পড়েছে। এটাই সবথেকে হোয়াইট কলার দুর্নীতি ভারতীয় তথা বিশ্ব রাজনীতিতে। আন্তর্জাতিক কমিশন সিন্ডিকেট ভারতের সেনাবাহিনীর ডিলে কীভাবে ঢুকে পড়েছে তা প্রকটভাবে প্রকাশ হয়ে পড়েছিল স্বাধীন ভারতের প্রথম আর একটি মেগা রাজনৈতিক স্ক্যামের মধ্যে দিয়ে। এক ও অকৃত্রিম বোফর্স কেলেঙ্কারি!

বোফর্স কোম্পানি যে কমিশন দিয়েছিল তা নিয়ে সংশয় নেই। প্রশ্ন তো একটাই ঘুরপাক খাচ্ছে এই ৩০ বছর ধরে। সত্যিই কমিশনের সুবিধা কারা পেয়েছে? কোনো সরাসরি প্রমাণ আজও পাওয়া যায়নি। সবটাই কার্যকারণ আর অভিযোগের স্তরে রয়ে গিয়েছে। সত্তরের দশকে অত্তাভিও কাত্রোচ্চি নামের এক সুদর্শন যুবক ভারতে আসেন ইতালি থেকে। যে সংস্থায় তিনি কাজ করতেন তার নাম স্যানপ্রোগেত্তি। তখন দিল্লিতে হাইকমিশন ছাড়া আর কটাই বা ইতালীয় পরিবার কর্মসূত্রে বাস করতো? হয়তো হাতে গোনা। অতএব গান্ধী পরিবারের বড় বধূটির সূত্রে কাত্রোচ্চির পরিবারের সঙ্গে গান্ধীদের সম্পর্ক দ্রুত ঘনিষ্ঠ হয়েছিল। আর এটা নিয়েও কোনো সন্দেহ নেই কাত্রোচ্চি যতদিন এদেশে ছিলেন ততদিন তাঁর সংস্থা স্যানগ্রোপোত্তি ভারতে কমপক্ষে তিনশোর বেশি প্রকল্পের অর্ডার পেয়েছিল। গ্যাস পাইপলাইন থেকে সার উৎপাদক সংস্থাদের হয়ে কারখানা গড়ে দেওয়া পর্যন্ত অসংখ্য। আর যেহেতু এভাবে কাত্রোচ্চির সংস্থা একের পর এক সরকারি অর্ডার পেয়ে এসেছে, তাই স্বাভাবিকভাবেই বিশ্বজুড়ে ডিলার আর মিডলম্যানরা ধরে নিয়েছে নিশ্চিত ভারতের ফার্স্ট ফ্যামিলির সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা রয়েছে বলেই এই লোকটিই চাবিকাঠি কাজ হাসিলের।

১৯৮০ সালে ভারত সরকারের প্রতিরক্ষা মন্ত্রক লিখিতভাবে জানাল, ১৫৫ এমএম হাউৎজার সিস্টেম দরকার সামরিক বাহিনীকে উন্নত করার জন্য। আর্জেন্ট! ১৯৮২ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে জমা পড়া আবেদনের মধ্যে শর্টলিস্ট করা হল কিছু সংস্থাকে। ফ্রান্সের সফমা, সুইডেনের এ বি বোফর্স, ব্রিটেনের ইন্টারন্যাশনাল মিলিটারি সার্ভিস, অস্ট্রিয়ার ভোয়েস্ট অ্যালপাইন। প্রতিযোগিতা হবে এই চার সংস্থার মধ্যে। অর্ডার পাওয়ার জন্য লড়াই। ১৯৮৫ সালে আরও যাচাই পর্ব সম্পন্ন হওয়ার পর তালিকায় এসে দাঁড়াল দুটি কোম্পানি। ফ্রান্সের সফমা এবং সুইডেনের বোফর্স। ঠিক এমন সময় যখন সেনাপ্রধান এ এস বৈদ্য অবসরের দোরগোড়ায়। আর দায়িত্ব নেবেন জেনারেল সুন্দরজি। আবার নতুন সেনাপ্রধান দায়িত্ব নিলে নতুন করে প্রক্রিয়া, পরীক্ষা নিরীক্ষা করতে অনেক দেরি হতে পারে। তাই তড়িঘড়ি ১২ মার্চ ১৯৮৬ লেটার অফ ইনটেন্ট দিয়ে দেওয়া হল বোফর্সকে। ১৪৩৭ কোটি টাকা দিয়ে ৪১০টি ১৫৫ এমএম ফিল্ড হাউৎজার কামান কেনা হবে। যদিও তখনও পর্যন্ত জানা যাচ্ছিল ফ্রান্সের সংস্থার হাউৎজার কামান সবদিক থেকে বেশি উন্নত ছিল। তা সত্ত্বেও কেন বোফর্স? কারণ জানা যায়নি। ১৯৮৭ সালের এপ্রিল মাসে সুইডিশ রেডিও প্রথম ঘোষণা করে বোফর্স কামানের কেনাবেচায় ঘুষ দেওয়া হয়েছে। এবং ভারতের প্রভাবশালী রাজনীতিকরা কমিশন দিয়েছেন। সেটি ঘোষণা করা মাত্র স্টকহোমে থাকা ভারতের হাইকমিশনার আগুপিছু চিন্তা না করেই সুইডিশ সরকারকে জানিয়ে দেন, ভারত চায় বিষয়টির পূর্ণাঙ্গ তদন্ত হোক। তারপরই আমরা ডিলে সবুজ সংকেত দেব। কিন্তু কয়েকদিনের মধ্যেই বোফর্স ঘোষণা করে যে, কোনো কমিশন এই ডিলে কাউকে দেওয়া হয়নি। আর সেই কারণেই ভারত সরকারকে ৫০ মিলিয়ন ডলারের একটি পে অফ দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে, অর্থাৎ যেহেতু কোনো কমিশন চার্জ নেই। কিন্তু বোফর্সের চিফ এক্সিকিউটিভ অফিসারের ব্যক্তিগত ডায়েরিতে লেখা হয়েছিল কাকে কাকে কমিশন দেওয়া হয়েছে।

১) R

২) P

3)?

৪) NERO

৫) হ্যানসন

৬) Q.

কারা এরা? এখান থেকে তদন্ত শুরু। আর ওই R মানে রাজীব এবং Q মানে কাত্রোচ্চি। এটাই ধরে নিয়ে এগোনো হয়। যদিও এই দুর্নীতি নিয়ে চরম শোরগোল শুরু হতেই ১৯৮৭ সালের জুন মাসে রাজীব গান্ধী প্রতিরক্ষামন্ত্রককে নির্দেশ দেন আমরা যদি এই চুক্তি বাতিল করি তাহলে কী কী লোকসান হতে পারে তা খতিয়ে দেখা হোক। ১৩ জুন ১৯৮২ সালে জেনারেল সুন্দরজি (তৎকালীন সেনাপ্রধান) একটি গোপন নোটে জানালেন, আমাদের জানতেই হবে কারা কমিশন নিয়েছে। বোফর্স আমাদের যদি তথ্যটি না জানায় বা জানাতে অস্বীকার করে, তাহলে আমাদের উচিত হবে বোফর্স কেনা বাতিল করা। প্রতিরক্ষামন্ত্রকের রাষ্ট্রমন্ত্রী অরুণ সিং তাঁর নোটে লিখলেন অবশ্যই এই চুক্তি বাতিল করা হলে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। লোকসান হবে। এমনকী গোটা ক্রয় প্রক্রিয়া আরও পিছিয়ে যাবে। যা জাতীয় সুরক্ষার ক্ষেত্রে বড় ঝুঁকি। কিন্তু তবু আমাদের উচিত বোফর্সকে বলা যে কমিশনের বিষয়টি প্রকাশ করতেই হবে। এই টানাপোড়েনে বোফর্স কামান ক্রয় কিন্তু আটকে থাকেনি। শেষ পর্যন্ত কেনা হয়েছিল। সিবিআই তদন্ত সেই থেকে চলছে বটে। সিবিআই চার্জশিটে জানাচ্ছে, কাত্রোচ্চি সাড়ে ৮ কোটি টাকা কমিশন নিয়েছিলেন প্রথমেই। কিন্তু বাকি কোড ল্যাংগুয়েজের মানুষরা? তাদের মধ্যে হিন্দুজা ব্রাদার্স আর উইন চাড্ডা যে সত্যিই এজেন্ট ছিলেন এ ই বোফর্সের সেটা সিবিআই দাবি করেছে। এবং তাদের সুইস ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকেও নথি পাওয়া গিয়েছে। রাজীব গান্ধীর সঙ্গে আর কার নাম জড়িয়ে যায়? তাঁর পারিবারিক তথা সেই ছেলেবেলার বন্ধু। অমিতাভ বচ্চন। যদিও ২০১২ সালে অমিতাভ বচ্চনকে ক্লিনচিট দেওয়া হয়। এবং অমিতাভ একটাই কথা বলেছিলেন। বদনামের সেই যন্ত্রণাময় ২৫ বছর কেউ ফিরিয়ে দিতে পারবে? আজ নির্দোষ বললে কী হবে? এই একটি দুর্নীতি বচ্চন আর গান্ধী পরিবারের মধ্যে দেওয়াল তুলতে শুরু করে। ১৯৯১ সালে রাজীবের মৃত্যুর পর আমেরিকা থেকে ফেরা রাহুলকে লন্ডন থেকে সঙ্গে নিয়ে ফিরেছিলেন তাঁর অমিত আংকল। পাশে দাঁড়িয়ে বন্ধুর শেষকৃত্যের সব কাজ সামলেছিলেন। কিন্তু সেই শেষ। তারপরই বচ্চন ও গান্ধীদের মধ্যে চিরবিচ্ছেদ। অমিতাভের অভিযোগ, দুঃসময়ে পাশে দাঁড়ায়নি গান্ধীরা। বোফর্সের আসল অভিযুক্ত কাত্রোচ্চিকে বহুবার হাতে পেয়েও সিবিআই গ্রেপ্তার করতে পারেনি কেন? সেই রহস্য আজও রয়ে গিয়েছে। কখনও মালয়েশিয়া, কখনও আর্জেন্টিনায় কাত্রোচ্চি ধরা পড়েছেন ইন্টারপোল নোটিশের জন্য। অথচ প্রতিবার সিবিআই দুর্বল নথিপত্র আর প্রত্যর্পণের আবেদন করায় প্রতিবার তিনি হাসতে হাসতে ছাড়া পেয়েছেন। ২০১৩ সালের ১৩ জুলাই ইতালির মিলানে হার্ট অ্যাটাকে মারা যান কাত্রোচ্চি। এবং সেদিনই কার্যত তাঁর সঙ্গেই কবরে গিয়েছিল বোফর্স রহস্য।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *