ব্ল্যাক করিডর ১.২৭

৬ ফুট ৬ ইঞ্চি। এই যে ধবধবে সাদা ব্র্যাক ব্রাশ ধরনের চুলকে বলা হয় সিলভার লাইনিং হেয়ার। মার্ক শিল্ডস। জামাইকার পুলিশ কনস্ট্যাবুলারির ডেপুটি পুলিশ কমিশনার। কেরিয়ারের বায়োডেটা অবশ্য এটাই একমাত্র নয়। প্রথমে ব্রিটেনের এসেক্স মেট্রোপলিটন পুলিশ এবং তারপর স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের অন্যতম শার্প গোয়েন্দা। ২০০২ সালে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড বনাম সাউদাম্পটনের খেলা দেখছিলেন ভিক্টোরিয়া বেকহ্যাম। স্বামী খেলবেন। ঠিক ম্যাচ শুরুর আগে একটা ফোন এল। ম্যাডাম, দিজ ইজ মার্ক শিল্ডস…স্কটল্যান্ড ইয়ার্ড..। সরি টু ডিসটার্ব ইউ..। এরপর ঠান্ডা মাথায় ভিক্টোরিয়া বেকহ্যাম শুনলেন মার্ক শিল্ডস বলছেন, তাঁকে এবং দুই সন্তান ব্রুকলিন আর রোমিওকে কিডন্যাপের প্ল্যান করা হয়েছে। ৫ মিলিয়ন পাউন্ড চাওয়া হবে বলে ঠিক হয়েছে। পাঁচজন স্কটল্যান্ড ইয়ার্ড ডিটেকটিভ ঠিক তাঁর পাশের বক্সে বসে তাঁর উপর নজরদারি চালাচ্ছেন। সুতরাং কোনো ভয় নেই। শুধু তিনি যেন আচমকা সিট ছেড়ে কোথাও উঠে না যান। যেখানে আছেন ওখানেই থাকুন। বাকিটা আমরা দেখছি। কাউকে কল করবেন না এখন। বি কাম ম্যাম…ডোন্ট ওরি..। একটা ঠান্ডা ঘামের স্রোত ভিক্টোরিয়ার মেরুদণ্ড দিয়ে বয়ে গেলেও তিনি কাউকে বুঝতে দেননি। ডেভিড বেকহ্যাম ততক্ষণে মাঠে নেমে পড়েছেন। বেকহ্যাম দুটি গোল করলেন। খেলা শেষ। এবং সেই রাত থেকেই ব্রিটেনের সব ধনী ও জনপ্রিয় এই সেলেব্রিটি দম্পতির হার্টফোর্ডশায়ারের ম্যানসনে একমাত্র পুলিশ অফিসার, সিকিউরিটি কোম্পানির এজেন্ট আর ডিটেকটিভরা ছাড়া কেউই ঢুকতে পারবে না বলে মার্ক শিল্ডস ফতোয়া দিলেন। আমরা কোথাও বেরোতে পারব না? এটা আবার হয় নাকি? ভিক্টোরিয়া জানতে চাইছিলেন অসহিষ্ণু হয়ে। মার্ক শিল্ডস বলেছিলেন, আমাকে মাত্র দুদিন সময় দিন। তার পরই আপনারা আবার যে কোনো জায়গায় যাবেন! এবং মাত্র ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই ধরা পড়ে গেল ভিক্টোরিয়া বেকহ্যামকে কিডন্যাপ করার প্লট করা ৫ জন সন্দেহভাজন। দুজন আলবেনিয়ার, দুজন রোমানিয়ার এবং একটি ১৮ বছরের আরব তরুণ! জেরা আর তদন্তে জানা গেল একটি বিশেষ সংবাদ সংস্থা এই গোটা প্লটের সঙ্গে যুক্ত। গোটা রহস্য উদঘাটনের কৃতিত্ব কার? স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের হ্যান্ডসাম ডিটেকটিভ মার্কের। জামাইকান কুখ্যাত ড্রাগ, গ্যাং ইয়ার্ডির পিছনে তাড়া করে আন্তর্জাতিক ড্রাগ গ্রুপকে কে ধরে ফেলেছেন? মার্ক শিল্ডস। এহেন মার্ক জামাইকার ডেপুটি পুলিশ কমিশনার পদে যোগ দেওয়ার পর থেকেই স্থানীয় অপরাধীদের মধ্যে ছিল চরম আতঙ্ক। কারণ ক্রমেই জানা হয়ে গেল যে ক্যারিবিয়ান মাফিয়া আর ক্রিমিন্যালদের মধ্যেই ছিল মার্কের নিজস্ব চর। তারাই হয়ে যেত ডাবল এজেন্ট। অতএব মারিজুয়ানা আর ব্রাউন সুগারের ব্যবসা প্রচণ্ড মার খাচ্ছিল। ওয়েস্ট ইন্ডিজ জুড়ে জনমনে পপুলার হয়ে গেলেন মার্ক শিল্ডস। যিনি তার আগেই লন্ডনে এক সুপার কপ হিসাবে বিখ্যাত হয়ে গিয়েছিলেন। যে কোনো আন্তর্জাতিক অপরাধের রহস্যভেদে তাঁর ডাক পড়ত। বলা যেতে পারে স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের আধুনিক নিজস্ব এক জেমস বন্ড।

এহেন মার্ক শিল্ডস ২০০৭ সালের ১৮ মার্চ ডার্ক ব্লু ব্লেজার আর আকাশি টাই পরে জামাইকার পিগাসাস হোটেলের ৩৭৪ নম্বর রুমে ঢুকেই বললেন, ফার্স্ট কে ঢুকেছিল ঘরে? ফাইভ স্টার পিগাসাস হোটেলের ম্যানেজার পাশে দাঁড়িয়ে প্রায় ভয়ে কাঁপছেন। কোনোমতে বললেন, মর্নিং স্টাফ ডিউটি স্যার..কারণ গেস্ট দরজা খুলছিলেন না.. আমরা ডুপ্লিকেট দিয়ে খুলেছি। তারপর কী দেখলেন? ম্যানেজার বললেন, ঘরে কেউই ছিল না। টয়লেটের ডোর সামান্য ভেজানো। আর ভিতরে টাইলসে পড়েছিলেন গেস্ট! সম্পূর্ণ নগ্ন। শাওয়ার খোলা। প্যানেলে জল থইথই। চোখ কুঁচকে গেল মার্ক শিল্ডসের। তাহলে কি স্নান করছিলেন? তার মধ্যেই মৃত্যু? কীভাবে? খুব বেশি সময় নিয়ে ভেতরে তদন্ত করা যাবে না। কারণ ততক্ষণে গোটা জামাইকাই নয়, বস্তুত পৃথিবীর ক্রিকেট দুনিয়ায় তোলপাড় শুরু হয়েছে। হোটেলের লবিতে মিডিয়া আছড়ে পড়েছে। কারণ যাঁর মৃতদেহ একটু আগে জামাইকার হোটেল পিগাসাসের টুয়েলথ ফ্লোরের ৩৭৪ নম্বর রুমে পাওয়া গিয়েছে তিনি যে সে কেউ নয়? তাঁর নাম বব উলমার! আধুনিক ক্রিকেট কোচিংয়ের একচ্ছত্র দ্রোণাচার্য! দক্ষিণ আফ্রিকার উত্থানের একমাত্র কারিগর। আর এই রহস্যময় মৃত্যুর সময় তিনি ছিলেন পাকিস্তান ক্রিকেট টিমের কোচ। ঠিক আগের দিন অর্থাৎ ১৭ মার্চ যে পাকিস্তান আয়ার্ল্যান্ডের কাছে বিস্ময়করভাবে হেরে গিয়ে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিচ্ছে। গতকাল রাত থেকেই প্রশ্ন উঠেছে আয়ার্ল্যান্ডের কাছে এভাবে পাকিস্তান কীভাবে হেরে গেল? সোজা পথে হার? নাকি….? মার্ক শিল্ডস কাউকেই জানাননি যে গতকাল রাতেই ইন্টারপোলের এক গোপন বৈঠকে স্থির হয়েছে এই ম্যাচের গতিপ্রকৃতি নিয়ে নিঃশব্দে তদন্ত হবে। সন্দেহের লক্ষ্য দুটি শব্দ। ম্যাচ ফিক্সিং! কেউই জানে না যে এই সন্দেহ নিয়ে ইন্টারপোল আসরে নামছে। আর তার আগেই মাত্র ১২ ঘণ্টার মধ্যেই পাকিস্তানের কোচের রহস্যময় মৃত্যু? কীভাবে?

জামাইকার কিংস্টনের সাবাইনা পার্ক স্টেডিয়াম, ১৭ মার্চ ২০০৭। আইসিসি বিশ্বকাপ ম্যাচ। পাকিস্তান বনাম আয়ার্ল্যান্ড। প্রথম ওভারেই মহম্মদ হাফিজ আউট। এবং তারপর ইউনুস খান। পাকিস্তান ১৫ রান দুই উইকেট। এবং বোঝা গেল আজ কেউ ম্যাচ বাঁচানোর লোক নেই। কারণ ১৩২ রানে পাকিস্তান ইনিংস শেষ। কীভাবে সম্ভবত আয়াৰ্ল্যান্ড সাইড এত ভালো বোলিং এ? আগে তো বোঝা যায়নি! বৃষ্টি এসে গেল আচমকা। এবং আয়ার্ল্যান্ডের টার্গেট আরও কমে গেল। ১২৮। জিতে গেল বিশ্বক্রিকেটের শিশু একটি টিম। মাঠেই শুরু হয়েছিল বিক্ষোভ। ড্রেসিং রুম ঘিরে পাকিস্তান সমর্থকদের গালিগালাজ। ডাকা হয়েছিল জামাইকার রায়ট পুলিশ। কারণ একের পর এক গাড়িতেও ভাঙচুর শুরু হয়েছিল। আর অন্যদিকে স্বাভাবিকভাবেই রাওয়ালপিন্ডি, করাচি, লাহোরের পরিস্থিতি আরও জটিল। তুমুল বিক্ষোভ, গাড়িতে আগুন, ক্রিকেটারদের বাড়িতে আক্রমণ। কারণ একটাই। বিশ্বকাপ থেকে পাকিস্তান ছিটকেই যাচ্ছে এই একটি ম্যাচে যাওয়ার জন্য। অথচ তুমুলভাবে টিকে যাওয়ার সম্ভাবনা ছিল। আগের ম্যাচেই ওয়েস্ট ইন্ডিজের কাছে পরাজয়। পরের ম্যাচ জিম্বাবোয়ে। সুতরাং এই আয়ার্ল্যান্ড ম্যাচটি জিতে গেলেই বিশ্বকাপে পরের রাউন্ডে যাওয়া ছিল নিশ্চিত। কিন্তু বিস্ময়করভাবে হেরে গেল ইনজামাম উল হকের টিম। প্রেস কনফারেন্সের প্রত্যাশিত প্রশ্ন ছিল এটা কেন হল? কোচ বব উলমারকে বিধ্বস্ত দেখাচ্ছিল। ইনজামাম উল হক মাথা নীচু করে বসে। তাঁর বৈশিষ্ট্য হল সর্বদাই এক নির্লিপ্ত উদাসীন আচরণ। কোনো সমস্যাই যেন তাঁকে স্পর্শ করে না। এমনিতেই কোচের সঙ্গে তাঁর দূরত্ব আছে। বাদানুবাদ হয়েছে একাধিকবার। কারণ অতিরিক্ত ধর্মপ্রাণ ইনজামাম উল হক প্র্যাকটিসের থেকে বেশি প্রার্থনা করেন, নমাজ পরেন এবং সময়মতো নেটে আসেন না। উলমারের ক্ষোভ ছিল। তাঁর বক্তব্য ছিল ধর্মপালন করলে আপত্তির কিছুই নেই। কিন্তু পারফরম্যান্স আর প্র্যাকটিস মার খেলে সেটা তো প্রফেশনালিজম নয়। উলমার সাংবাদিক সম্মেলনে বললেন, আমার আজ দিন ছিল না। ওয়ার্ল্ড কাপ ইজ ওভার ফর আস। এবং তারপরই একটি তীক্ষ্ণ বাক্য ব্যবহার করলেন। আমি বুঝতেই পারছি না আমরা এত কম রান কেন করলাম? কীভাবে করলাম? বলে উঠে গেলেন।

স্টেডিয়াম থেকে টিমবাসে চেপে ফিরে হোটেল রুমে ঢুকলেন সকলেই। এবং কিছুক্ষণের মধ্যেই সম্পূর্ণ ভেঙে পড়া গোটা টিমের কিছু খেলোয়াড় চলে এলেন কোচের রুমে। উলমার তাঁদের দেখে বসতে বলেছিলেন, তবে এটা ওটা কথার পর বললেন, আমার আজ কথা বলতে ভালো লাগছে না। আমরা কাল ম্যাচ নিয়ে আলোচনা করব। প্রত্যেকে নিজেদের রিপোর্ট তৈরি কর। সকলের মতামতই জানতে চাই। যদিও ততক্ষণে পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডের উপর প্রবল চাপ আসতে শুরু করেছে উলমারকে সরিয়ে দিতে হবে। যত নষ্টের গোড়া। অতিরিক্ত সিস্টেমের জন্য প্লেয়ারদের স্বাভাবিক ছন্দ নষ্ট করেছেন তিনি। অতএব উলমার হঠাও। যে কোনো ম্যাচে দলের খারাপ ফল হলে এই প্রচার ও দাবি প্রধানত পাওয়ার সেন্টারের কাছে কারা তোলে? শুধুই ক্রিকেট ফ্যান নয়। কিছু রহস্যময় চরিত্র যাঁরা প্লেয়ারদের যে কোনো মূল্যে বাঁচাতে চায়। খারাপ পারফরম্যান্সের জন্য কোচের চাকরি যাক। কিন্তু কোনো প্লেয়ার যেন টিম থেকে বাদ না পড়ে। আর একটি মহল চায় অবশ্যই কয়েকজন প্লেয়ারকে টার্গেট করে বাদ দেওয়া হোক। কারণ এদের লক্ষ্য নতুন এক দুজন প্লেয়ার ঢুকুক। কারা এঁরা। এঁদের কী স্বার্থ? অপেক্ষা করুন। একটু পরই জানব সেই জটিল অঙ্কটির কথা। সেদিন ছিল শনিবার। পরদিন রবিবার কিংস্টনের আকাশ ছিল ঝকঝকে। হোটেল পিগাসাসের ৩৭৪ নম্বর রুমের গেস্ট সাধারণত খুব সকালেই উঠে হোটেলের জিমে চলে আসেন। আর তার আগে নিয়ম হল একটা গ্রিন টি উইথ টোস্ট। পাকিস্তানের ক্রিকেট কোচ বব উলমার। তাঁর সুগার আছে। হয়তো প্রেশারও। কারণ কথার মাঝেই হাঁফিয়ে ওঠেন এবং অসম্ভব ঘাম হয় তাঁর। রুম সার্ভিস এসে কোনো সাড়া পাচ্ছিল না। এরকম হয় না। প্রতিদিন সকালে প্রথমে উলমার সুইমিংয়ে যান। সেদিন যাননি। এবং দরজা বন্ধ। সকাল ১০ টা বেজে গেছে। ম্যানেজারকে ডাকা হল। ডুপ্লিকেট চাবি দিয়ে দরজা খুলে গেল ওয়াশ রুমের সাদা টাইলস রক্তে ভাসছে। দেওয়ালে ছড়ানো রক্ত আর বমির দাগ। উপুড় হয়ে শুয়ে নগ্ন উলমার। তার আগে কী করছিলেন তিনি? আয়ার্ল্যান্ড ম্যাচে পরাজয়ের পর যখন ধীর পদক্ষেপে নিজের ঘরের দিকে আসছেন তখন লিফটে তাঁর সঙ্গে ছিলেন শোয়েব মালিক। তিনতলায় লিফট থামল। দুজনেই চুপ। বব তাঁর টিমের সঙ্গে ইয়ার্কি করতেন খুব। সেরকমই লিফট থামলে শুধু দরজা থেকে সরে গিয়ে শোয়েবকে জায়গা করে দিয়ে বললেন, লেডিজ ফার্স্ট। ম্লান হাসি হেসে মালিক নিজের রুমে চলে যান। ঠিক সাড়ে সাতটায় উলমার নিজের ঘরে ঢুকলেন এবং স্নান সেরে আটটায় ডিনার অর্ডার করেন। এবং শুয়ে পড়েন। একটু আগেই প্রেস কনফারেন্সের পর তিনি বলেছিলেন, আজ রাতে ঘুম হবে না…। তাই হয়েছিল। রাত তিনটে বারো মিনিটে উঠে পড়লেন উলমার। নিজের ল্যাপটপ খুলে ইমেলে লিখতে শুরু করলেন কিছু বার্তা। কাকে পাঠালেন সেই মেইল? স্ত্রী গিল উলমারকে। এবং চরম রহস্যময় সেই ইমেল। সেখানে বলা হয়েছিল ‘হাই ডার্লিং…ফিলিং আ লিটল ডিপ্রেসড। কেন তা তো তুমি বুঝতেই পারছ। আমি ঠিক জানি না যে সেমিফাইনাল পর্যন্ত গিয়ে তারপর হেরে যাওয়া বেশি দুঃখের হত, নাকি এভাবে প্রথম রাউন্ডে বিদায় বেশি খারাপ..। আজ আমাদের ব্যাটিং বিপর্যস্ত ছিল..আমি ঠিক বুঝতে পারিনি যে এভাবে আমার সবথেকে বড় আশঙ্কাটা এত তাড়াতাড়ি সত্যি হয়ে যাবে…। বব উলমার ঠিক কী বলতে চেয়েছিলেন? কী ছিল তাঁর সবথেকে বড় আশঙ্কা? এরকম খারাপ পারফরম্যান্স হতে পারে এটা তিনি আন্দাজ করছিলেন? কেন? রাত তিনটের সময় এটা লিখতে হল কেন?

এটা একটা মার্ডার! ঠিক দুদিন তদন্তের পর ঘোষণা করলেন মার্ক শিল্ডস! আর লোকাল কেউ এই খুনটা করেনি। বাইরের ক্রিমিনাল। কেন? মার্ক শিল্ডসের থিওরি হল তিনি জানেন জামাইকার হাঞ্চম্যানরা (এদের বলা হয় ইয়ার্ডি) হয় ছুরি, রিভলবার অথবা ভোঁতা অস্ত্র নিয়েই ঢোকে খুন করতে। কিন্তু এটা শ্বাসরুদ্ধ করে খুন । যা ইন্ডিয়ান সাবকন্টিনেন্টে সবথেকে বেশি। অর্থাৎ ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশে। নাকে আর ঘাড়ে কিছু আঘাতের চিহ্ন। অর্থাৎ ধস্তাধস্তি হয়েছিল আততায়ীর সঙ্গে। আর কিংস্টনের প্যাথলজিস্টের সেশাইয়া জানালেন, অ্যাসিফিক্সিয়া। ঘাড়ের হাড় ভেঙে গিয়েছে। শ্বাসরুদ্ধ করার সময় এরকম হয়ে থাকে। বমি হল কেন তাহলে? সেটা কখন? একটি থিওরি প্রচার করা হল শ্বাসরোধ করার আগে বিষপ্রয়োগ হয়েছিল। সেটা কীভাবে সম্ভব? কখন বমি করেছেন উলমার? মৃত্যুর অনেক আগেই? আরও কয়েকদিন কেটে গেল। আচমকা মার্ক শিল্ডস কয়েকদিনের জন্য উধাও ছিলেন। ২৪ মার্চ তিনি তড়িঘড়ি প্রেস কনফারেন্স ডাকলেন।

প্রশ্ন : উলমারকে কি বিষ দেওয়া হয়েছিল?

শিল্ডস : হতেও পারে

প্রশ্ন : হিটম্যানের কাজ?

শিল্ডস : সেটাও সম্ভব

প্রশ্ন : ম্যাচ ফিক্সিং সিন্ডিকেট জড়িত?

শিল্ডস : স্রেফ কাঁধ নাচিয়ে শ্রাগ করলেন আর হালকা করে হাসলেন। জানালেন ক্রিকেটের অ্যান্টি করাপশন ব্যুরো আর স্কটল্যান্ড ইয়ার্ড জামাইকায় এসে গিয়েছে।

এসবের থেকে ঠিক ৩০ মাইল দূরে। মন্টেগো বে এয়ারপোর্ট। একটি বিমান দাঁড়িয়ে। পাকিস্তান ক্রিকেট টিম যাবে হোটেল থেকে বেরোচ্ছে। তাড়াতাড়ি পা চালানো হচ্ছে। আচমকা জামাইকান পুলিশের একটি টিম দৌড়ে এল। ক্যাপ্টেন ইনজামাম উল হক, অ্যাসিস্ট্যান্ট কোচ মুস্তাক আলি আর টিম ম্যানেজার তালাত আলিকে আলাদা করে অপেক্ষা করতে বলা হল। পৃথক একটি রুমে গিয়ে তাঁদের জিজ্ঞাসাবাদ শুরু। কারণ কী? তদন্ত চলাকালীন তাঁরা পরস্পর বিরোধী কিছু মন্তব্য করেছেন। সেগুলি মেলানো যাচ্ছে না। প্রায় এক ঘণ্টা পর তাঁদের যেতে দেওয়া হল। ততক্ষণে খবর এসেছে বাইরে। মিডিয়া ঢুকে পড়েছে। এবং জেরার পর বেরনোর সময় ইনজামামকে সামনে পেয়ে এক সাংবাদিক প্রশ্ন করলেন, ইঞ্জি…তুমি কি ববকে খুন করেছ?..। ইনজামাম শূন্য চোখে তাকালেন। এবং কোনো কথা না বলে এগোলেন গ্রে হাউন্ড বাসের দিকে। এয়ারপোর্ট।

কিন্তু মাত্র কয়েকদিনের মধ্যেই গোটা পরিস্থিতি বদলে গেল। জামাইকার ডিটেকটিভ দপ্তরের বয়ানের সঙ্গে মার্ক শিল্ডসের বক্তব্যের চরম অসঙ্গতি। জামাইকান গোয়েন্দাদের সন্দেহ খুনের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। সিসিটিভিতে ৩৭৪ নম্বর রুমের বাইরের করিডরে কাউকে কেন দেখা গেল না? তাহলে আততায়ী কোথা থেকে ঢুকেছে? সুতরাং তাঁরা চাপ দিল আবার নতুন করে অটোপসি রিপোর্ট পরীক্ষা করা হোক। মার্ক শিল্ডস শুধু তাঁদের একবার জিজ্ঞাসা করেছিলেন, ১৮ মার্চ সকালে বডি পাওয়ার পর পাকিস্তানের ৬ জন প্লেয়ার ওই ৩৭৪ নম্বর রুমে ঢুকেছিলেন কীভাবে? বড়ি থাকলে সেটা তো সঙ্গে সঙ্গে কর্ডন করে দেওয়ার কথা! হয়নি কেন? জামাইকান গোয়েন্দারা জবাব দেননি ঠিক যেমন জবাব পাওয়া যাচ্ছে না ১৭ মার্চ রাতে বব উলমার ঠিক কী খেয়েছিলেন? কে অর্ডার নিয়েছিল? খোঁজ পাওয়া যায়নি। জামাইকান গোয়েন্দাদের ওই থিওরি কিন্তু দ্রুত প্রতিষ্ঠার দিকে এগোতে শুরু করে দিল। মাত্র ৪৫ দিনের মধ্যে কানাডা থেকে একটি রিপোর্ট এল। বলা হল কোনো ঘাড়ের হাড় ভাঙা নয়। এবং জুন মাসের ১২ তারিখ জামাইকা পুলিশ ঘোষণা করে বব উলমারের স্বাভাবিক মৃত্যু! তাহলে ওই রক্ত? ওই বমি? ওই শরীরে আঘাত? মার্ক শিল্ডস শুধু বলেছিলেন, মার্ডার মিস্ট্রি কোনো টিভি সিরিয়াল নয় যে ৪৫ মিনিটের মধ্যে ক্লোজ হয়ে যাবে। যাক গে…এটা জামাইকা পুলিশের অভ্যন্তরীণ ব্যাপার। আমার কিছু বলা উচিত নয়। বাট আমি সার্টেন যে সেটি মার্ডার! এসবকে ছাপিয়ে গেল একটি মারাত্মক তথ্য। জামাইকার নাইট ক্লাবের এক ডিস্ক জকি (ডিজে) পুলিশকে বলেছিল তাঁর কাছে উলমার নিয়ে কিছু বিস্ফোরক খবর আছে। কিন্তু তাঁকে যখন ডাকা হল জেরা ও সাক্ষ্যের জন্য, দেখা গেল সে উধাও!

ততক্ষণে নিঃশব্দে তদন্ত শুরু করেছে আইসিসি ক্রিকেটের অ্যান্টি করাপশন ইউনিট। এবং সবার আগে ইন্ডিয়ান অ্যাঙ্গেল দেখতে হবে। ইন্ডিয়ান অ্যাঙ্গেল? এখানে আবার ভারত আসছে কোথা থেকে? পাকিস্তান আর আয়ার্ল্যান্ডের ম্যাচ ফিক্সিং হয়েছিল কিনা এবং সেই সম্পর্কে গোপন কোনো বিস্ফোরক তথ্য উলমার জেনে গিয়েছিলেন কিনা সেই তদন্তই তো প্রধান বিষয়! এখানে ইন্ডিয়া কেন? একেবারেই নয়। ক্রিকেটের বেটিং আর ফিক্সিং সিন্ডিকেট চক্রকে পাকড়াও করতে হলে ভারতকে টাচ করতেই হবে। তাই ময়দানে নেমেছে। গোপনে। কারণ ২০০৭ সালের সাবাইনা পার্কে পাকিস্তান ও আয়ার্লান্ডের ম্যাচ ঘিরে তাবত সন্দেহ এবং পাকিস্তান কোচের রহস্যময় মৃত্যু নিয়ে দুনিয়া তোলপাড় হলেও আড়ালে ইন্টারপোল অনেক বেশি অ্যালার্ট দিয়েছে দিল্লিকে। কারণ ঠিক সেদিনই ওয়েস্ট ইন্ডিজেরই পোর্ট অফ ছিল আর একটি ম্যাচ। ভারত বনাম বাংলাদেশ। এবং ভারতও অবিশ্বাস্যভাবে হেরে গিয়েছিল সেই ম্যাচ। মাত্র ১৯১ রানে অলআউট। ইন্টারপোেল ভারতের শাখাকে (সিবিআই) অ্যালার্ট করে দিল। ততক্ষণে সিবিআই আগে থেকেই সক্রিয় হয়েছে।

কারণ আচমকা সন্ধ্যার পর দেশের বিভিন্ন সিটিতে প্রচুর ক্যাশের আনাগোনা আর হাওলা সিন্ডিকেটকে সক্রিয় হওয়ার খোঁজ পেয়েছিল ইনটেলিজেন্স ব্রাঞ্চ। হঠাৎ করে আবার তাহলে আন্তর্জাতিক বেটিং আর ম্যাচ ফিক্সিং সিন্ডিকেট অ্যাকটিভ? এবার কার হাত ধরে? দিল্লি পুলিশ ভাবল এম কে গুপ্তা কি আবার শহরে হাজির হয়েছে ৭ বছর পর? নাহলে এত বড় র‍্যাকেট আর কার থাকতে পারে? যাঁর ডায়েরি আর মোবাইলে বিশ্বের সব দেশের ক্রিকেট প্লেয়ারদের মোবাইল নম্বর থাকে কোড নেম দিয়ে? যাঁর একটা ফোনে তাবত লোভী ক্রিকেটাররা বহু ম্যাচ ডুবিয়েছে! সবথেকে বড় কথা যাঁর সঙ্গে দিল্লির পাওয়ার করিডরের যোগাযোগ অবিশ্বাস্য। তাহলে কি বিটিং সিন্ডিকেটে রাজনীতির রাঘব বোয়ালরাও আছে? কে এই এম কে গুপ্তা?

দুটি নম্বর থেকে ফোন আসছে। দিল্লির এক ধনী ব্যবসায়ীর কাছে। ৯৭১-৫০-৬৭99*** এবং ৯৭১-৫০-৬৭৯৬***। তাঁর প্রধান ব্যবসা হল হস্তশিল্পের রপ্তানি। দিল্লি পুলিশের ক্রাইম ব্রাঞ্চ দেখেই বুঝে গেল দুবাইয়ের নম্বর। এবার স্বাভাবিক নিয়ম হল ফোন ট্যাপ করা। কেসটি হ্যান্ডল করতে বলা হল ইনস্পেক্টর ঈশ্বর সিংকে। প্রথমেই দেখতে হবে দিল্লির কেউ এই নম্বরগুলিতে কল করছে কিনা। কারণ সাধারণত যে শহরে টার্গেট ধরা হয় সেখানে অবশ্যই এক বা একাধিক স্লিপার সেল থাকে। ফোন দুবাই থেকে এলেও সেই শহরের কেউ না কেউ ওই টার্গেটের মুভমেন্ট ফলো করে এবং রিপোর্ট করে। ঠিক যেভাবে বহু বছর আগে কলকাতায় খাদিম সংস্থার কর্তা পার্থ রায়বর্মণের অপহরণের ক্ষেত্রেও হয়েছিল। মুক্তিপণ চেয়ে ফোন এসেছিল দুবাই থেকে। কিন্তু আসল কাজটি করেছিল লোকাল অপারেটিভ। আমরা এই সিরিজের আগামী কোনো এক সংখ্যায় সেই গল্পটি নিশ্চয়ই শুনব। শুনতেই হবে। কারণ সেই গল্পের সবথেকে মারাত্মক আন্তর্জাতিক লিংক হল কলকাতার এক ব্যবসায়ীকে অপহরণ করে পাওয়া মুক্তিপণের টাকা গিয়েছিল আমেরিকার টুইন টাওয়ার ধ্বংসের প্রোজেক্টে। অর্থাৎ ওসামা বিন লাদেনের ফান্ডে। ভায়া মহম্মদ আট্টা! কে কে ছিল সেই লিংকে? ওই যে বললাম, এখন নয়, পরে জানব। আপাতত দেখা যাক ১৯৯৯ সালের নভেম্বর মাসে দিল্লির ক্রাইম ব্রাঞ্চ অফিসার ঈশ্বর সিং সেই নম্বরগুলিতে আড়ি পেতে কী কী পেলেন! একটি নম্বরের সঙ্গে প্রায় রোজ যোগাযোগ। দিল্লির নম্বর। ৯৮১১০**৪১১। কার নম্বর? নাম পাওয়া গেল কৃষাণ কুমার। কে এই কৃষাণ কুমার? ঈশ্বর সিং মোবাইল সার্ভিস প্রোভাইডারের কাছে জানতে চাইলেন। এবং দুদিনের মধ্যে জানা গেল কৃষাণ কুমার আসলে গুলশান কুমারের ভাই। যে গুলশান কুমারকে মুম্বইয়ের রাস্তায় মাফিয়া গ্যাংস্টাররা প্রকাশ্যে গুলি করে খুন করেছিল। আর যে মামলায় অভিযুক্ত গুলশান কুমারের সবথেকে প্রিয় সংগীত পরিচালক নাদিম শ্রাবনের নাদিম। যাঁকে তিনিই প্রতিষ্ঠা দিয়েছিলেন। ঘটনার পর থেকে যে লন্ডনে পলাতক। কৃষাণ কুমার কি তাহলে দুবাইয়ের মাফিয়াগোষ্ঠীর স্লিপার সেল? ইন্টারেস্টিং ব্যাপার তো!! এভাবেই পাওয়া গেল আরও কিছু নম্বর। সেরকমই একটি নম্বরে দুপুর আড়াইটের সময় আড়ি পেতে আচমকা শোনা গেল একটা আপাত নিরীহ বাক্যালাপ। কে এক সঞ্জীব চাওলার সঙ্গে একটি পাঁচতারা হোটেলে দেখা হবে এক বিদেশির। বিদেশির নাম হ্যান্সি ক্রোনিয়ে! কিন্তু এই নামটা যেন চেনা চেনা। এবং সেদিন থেকে দিল্লি পুলিশের তদন্তের গতিপথ ঘুরে গেল। ঝড় উঠল বিশ্বজুড়ে। দিল্লি পুলিশ গ্রেপ্তার করল কৃষাণ কুমার, সুনীল দারা এবং রাজেশ কালরাকে। সঞ্জীব চাওলার শাগরেদ। মূল চক্রী সঞ্জীব লন্ডনে পালিয়েছে। তিনজনই ক্রিকেট বুকি। দিল্লি পুলিশ জানিয়ে দিল ভারত সফরে আসা দক্ষিণ আফ্রিকা ক্যাপ্টেন ক্রোনিয়ে একাধিক ম্যাচ ছেড়ে দিয়েছেন বুকিদের থেকে টাকা নিয়ে। কিন্তু হ্যান্সি ক্রোনিয়ে এরকম কাজ করতে পারে? কেউ বিশ্বাস করবে না। করেওনি। বিশেষ করে দক্ষিণ আফ্রিকার ক্রিকেট বোর্ড ডিরেক্টর ডক্টর আলি বাখার। ৭ এপ্রিল ২০০০। ইউনাইটেড ক্রিকেট বোর্ডের কমিউনিকেশন ম্যানেজার ব্রনউইন উইলকিনসনকে ইংল্যান্ড থেকে ফোন করে এক সাংবাদিক জানালেন, শুনেছেন তো? ক্রোনিয়ে হ্যাজ বিন চার্জড! দিল্লি পুলিশের জয়েন্ট কমিশনার কে কে পল একটু আগে প্রেস কনফারেন্স করেছেন। উইলকিনসন আকাশ থেকে পড়লেন! তৎক্ষণাৎ আলি বাখারকে ফোন করে জানালেন। বাখার প্রচণ্ড বিরক্ত। সঙ্গে সঙ্গে বললেন, অ্যাবসলিউট রাবিশ! এখনই কে কে পলকে ফোন করে আপনি বলুন, আপনারা আগে দক্ষিণ আফ্রিকা ক্রিকেট কন্ট্রোল বোর্ডকে না জানিয়ে মিডিয়াকে কেন জানালেন? আগে তো আমাদের জানাতে হবে এত বড় এক অভিযোগ! মিসেস উইলকিনসন ঠিক তাই করলেন। এবং দিল্লির আইটিও ক্রসিং এর পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সে বসে জয়েন্ট কমিশনার কে কে পল কেটে কেটে ঠান্ডা গলায় বললেন, ম্যাডাম, আপনাদের কে বলেছে যে আমরা কী তদন্ত করছি আর সেই তদন্ত থেকে কী পাওয়া গেল সেসব আপনাদের জানাতে আমরা বাধ্য? বরং আপনারা তৈরি থাকুন..এবার আপনাদের বোর্ড আর ক্রিকেটারদের একে একে ডাকা হবে। ডোন্ট বি ওভার স্মার্ট!! এই শীতল হুমকি শুনে স্বাভাবিকভাবে আলি বাখারও আশঙ্কা করলেন এভাবে যখন দিল্লি পুলিশ কথা বলছে, তাহলে কি সত্যিই কিছু হয়েছে? কিন্তু তাই বলে ক্রোনিয়ে? অসম্ভব! তিনি ক্রোনিয়েকে বললেন, হ্যান্সি আমি তোমার পাশে আছি। হ্যান্সি কাঁধ ঝাঁকিয়ে বললেন, থ্যাংকস ডক! সেটি ছিল একটি বারবিকিউ ডিনার পার্টি। ঠিক দুদিন পর দক্ষিণ আফ্রিকার টিম ডারবানে একজোট হল। তিনটি একদিনের ম্যাচের সিরিজ।. অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে। হ্যালি ক্রোনিয়ে প্রেস কনফারেন্সে জানাচ্ছেন, আমি ১০০ শতাংশ সৎ আমি এক পয়সাও নিইনি কোনো ম্যাচ ফিক্সিংয়ে। দুনিয়ার যে কোনো পুলিশ, যে কোনো আদালত তদন্ত করুক। আমি নিজেকে সৎ প্রমাণ করব। এবং তারও দুদিনের পর ১১ এপ্রিল ২০০০। দক্ষিণ আফ্রিকার কোচ আলি বাখারের ক্যাম্প বাংলোয় ভোর তিনটের সময় একটি ফোনের রিং হচ্ছে। বিরক্ত বাখার। এই মাঝরাতে কে ফোন করছে? আশ্চর্য! কাণ্ডজ্ঞান নেই! ফোন কানে নিয়ে বাখার শুনলেন, চেনা কণ্ঠ। গুলাম রাজা। দক্ষিণ আফ্রিকার টিম ম্যানেজার। বাখারকে টিমমেটরা সকলেই সম্বোধন করেন ডক! তিনি ডাক্তার। তাই ডক। রাজা বললেন, ডক! ইয়ে…তোমার সঙ্গে ক্যাপ্টেন কথা বলতে চায়। এখন? হ্যান্সি? বাখার টেনশনে উঠে বসলেন! ক্রোনিয়ে অন্য প্রান্তে! হ্যালো..ডক! আমি তোমার সঙ্গে মিথ্যাচার করেছি। আমি দেশকে ঠকিয়েছি! বাখার বললেন, হ্যান্সি? তার মানে তুমি টাকা নিয়েছ? কত? হ্যান্সি জানালেন, প্রথমে ১০ হাজার ডলার, তারপর ১৫ হাজার ডলার। অর্থাৎ লক্ষ লক্ষ টাকা। কবে থেকে? ১৯৯৬ সাল থেকে চলছে। অবিশ্বাস্য কথা বলছে হ্যান্সি! কীভাবে এত টাকার লেনদেন হতে পারে? হতে পারে ডক! তুমি তো জানো আমি পিচ স্পেশালিস্ট। একটা ইন্ডিয়ান সিন্ডিকেট আমাকে শুধু পিচ রিপোর্টের জন্যই ৫ কোটি টাকার অফার দিয়েছিল…। ৫ কোটি টাকা!! শুধু পিচ কেমন সেটা জানার জন্য? মাথা ঘুরতে লাগল আলি বাখারের। ইটস অল ওভার হ্যান্সি!

ইয়েস ডক! ইটস ওভার। নাও আই উইল স্লিপ..।

জুন মাস! ক্রিকেট ফিক্সিং নিয়ে একদিকে যেমন পুলিশি তদন্ত চলছে, তেমনই তৈরি হয়েছে তদন্ত কমিশন। কিং কমিশন। প্রথম বোমা ফাটালেন হার্সল গিবস। কিং কমিশনে জানালেন, ক্যাপ্টেন আমাকে ১৫ হাজার ডলার দিয়েছিলেন ইন্ডিয়া ট্যুরে। একটা ম্যাচে ২০ রানের মধ্যে আউট হয়ে যেতে হবে। আমি তাই করেছিলাম। এরপর একে একে জ্যাক কালিস, মার্ক বাউচার, ল্যান্স ক্রুজনার জানালেন, ব্যাঙ্গালোর ম্যাচে তাদের টাকার অফার দেওয়া হয়। এবং অবশেষে স্বয়ং হ্যান্সি ক্রোনিয়ে। সব স্বীকার করলেন। এবং একটি বিস্ফোরণ ঘটালেন। জানালেন, ১৯৯৬ সালে তাঁকে প্রথম বেটিং সিন্ডিকেটের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন এক ভারতীয় প্লেয়ার। তখন তিনি ক্যাপ্টেন ছিলেন। কে? মহম্মদ আজহারউদ্দিন!!

সিবিআই এর জয়েন্ট ডিরেক্টর (ইকনমিক অফেন্স) নীরজকুমারের কাছে একটি ফোন এল। অপরাধ জগতের সঙ্গে যোগ থাকা তাঁরই এক ইনফর্মার। অর্থাৎ সোর্স। সে বলল, স্যার, আপনার সঙ্গে এম কে কথা বলতে চায়। নীরজকুমার জানতে চাইলেন এম কে মানে কি? সে আবার কে? ফোনের অন্য প্রান্তে থাকা লোকটি বিস্মিত। বলল, আপনার ডেস্কে বেটিংয়ের কেস এসেছে। আর আপনি এম কে গুপ্তার নাম শোনেননি? সেই তো ভারতের ক্রিকেট বেটিংয়ের গডফাদার? নীরজ কুমার রাজি হয়ে গেলেন। দিল্লির হোটেল ওবেরয়। রুম নম্বর ৬৫০। এম কে গুপ্তাকে দেখে কেউ বলবেই না এহেন একজন সাধারণ দেখতে আন ইমপ্রেসিভ মানুষ দেশের সবথেকে প্রভাবশালী বেটিং সিন্ডিকেট চালায়। স্যার..চা খাবেন? নীরজকুমার বললেন, কাম টু দ্য পয়েন্ট! আমার সঙ্গে কী কাজ? স্যার..আমি সারেন্ডার করতে চাই! আমার প্রাণের পিছনে অনেকে আছে। যে কোনো সময় মার্ডার হয়ে যাব!

জানা গেল ইতিহাস। এক সাধারণ ব্যাংক কর্মী ছিল এই এম কে গুপ্তা। একটু এক্সট্রা পয়সার লোভ কার না থাকে। তাই প্রথমে সাট্টা এবং রাজ্য লটারিতে টাকা ইনভেস্ট করত সে। আর তারপর একদিন এক বন্ধুই নিয়ে গেল চাঁদনি চক। গলির গলি তস্য গলি। একটি মাত্র ছোট ঘর। সেখানে হচ্ছে বেটিং। আশির দশক। তার মানে তখন থেকেই ঢুকে পড়েছে বেটিং! একের পর এক বাজি ধরে এম কে গুপ্তা এতই মুনাফা করতে লাগল যে একসময় সে ব্যাংকের নিরাপদ চাকরি পর্যন্ত ছেড়ে দিল স্রেফ ফুল টাইম বুকি হয়ে যাওয়ার জন্য। ১৯৮৮ সালে এম কে গুপ্তা দিল্লির মাঠে একটি ক্লাব স্তরের ম্যাচ দেখার সময় লক্ষ করে এক তরুণ ক্রিকেটার দারুণ খেলছে। সেঞ্চুরি করল খুব অল্প সময়ে। এম কে বুঝে গেল সে তার প্রথম ঘোড়া পেয়ে গিয়েছে। ভালো খেলে ফেরার পর ক্লাব কর্তারা কিংবা সমর্থকদের কেউ অথবা ক্রিকেট ফ্যানরা তরুণ প্লেয়ারদের হাতে, হাজার টাকা ঢুকিয়ে দিলেন ওই প্লেয়ারের পকেটে। প্লেয়ারটি বিস্মিত। এত টাকা! কে ইনি? সঙ্গে সঙ্গে এক সতীর্থ এসে সেই প্লেয়ারকে বলে দিল চিনে রাখো ইনি এম কে গুপ্তা। তোমার নতুন বন্ধু। প্লেয়ারের নাম অজয় শর্মা। এম কে কিন্তু ট্যালেন্ট চিনতে ভুল করেনি। দু বছরের মধ্যে অজয় শর্মা ইন্ডিয়া টিমে চান্স পেল, নিউজিল্যান্ড সফরে। ১৯৯০। তার সঙ্গেই আর এক নতুন প্লেয়ার। দিল্লি থেকে নির্বাচিত। আপাতত ইন্ডিয়া টিমে এম কের দুই এজেন্ট ঢুকে গেল। সেই শুরু। বেশ লাভ হল। কারণ অনেক ইনপুট পেয়ে সেই ট্যুর থেকে যথেষ্ট মুনাফা হল। ইন্ডিয়া টেস্ট সিরিজ পরাজিত হয়ে ফিরে এল। এরপর ইংল্যান্ড। কিন্তু আচমকা এম কের নিজের দুই প্লেয়ারই টিম থেকে বাদ। এবার উপায়? তাঁরা বলেছিল কোনো চিন্তা নেই। যারা যাচ্ছে তাঁদের মধ্যে দুজনের সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিচ্ছি। এই নতুন রিক্রুটদের এম কে জানিয়ে দিল ইংল্যান্ড থেকে সফল হয়ে ফিরলেই মারুতি জিপসি দেওয়া হবে একটা করে। আর অ্যাডভান্স ৪০ হাজার টাকা। এই নতুন অলরাউন্ডার অপ্রত্যাশিত ভালো পারফরম করেছিল। কারণ সে যে নিছক আবহাওয়া, পিচ কন্ডিশন, কোন ম্যাচে ব্যাটিং অর্ডারের রদবদল হচ্ছে এসব খবরই দিয়েছিল তাই নয়, সঙ্গে সঙ্গে নিয়ে এসেছিল একঝাঁক আন্তর্জাতিক প্লেয়ারের ফোন নম্বর। এম কে আর পিছনে ফিরে তাকায়নি। সে হয়ে উঠেছিল ভারতীয় ক্রিকেট সিন্ডিকেটের বেতাজ বাদশা। আর নব্বই দশকের মাঝামাঝি তাঁর সবথেকে পুরোনো সেই কাছের প্লেয়ার আলাপ করিয়ে দিল এমন একজনের সঙ্গে যে আলাপ পরিচয় ভারতের ক্রিকেট কেলেঙ্কারিকে নিয়ে গেল এক অন্য স্তরে। সেই নতুন আলাপ হওয়া মানুষের নাম মহম্মদ আজহার উদ্দিন। আর এরপর কী হল সেটা তো বহু চর্চিত এক ইতিহাস। এরপর আর নীরজকুমারের সন্দেহ রইল না কীভাবে এগিয়েছে বেটিং সিন্ডিকেট। গোটা তদন্ত এরপর শুধু গোটানোর পালা। হ্যানসি ক্রোনিয়েকে আজীবনের মতো ব্যান করা হল ক্রিকেট জীবন থেকে। কিন্তু এম কে জানিয়ে দিলেন এক অজানা জগতের কথা। জানা গেল নিছক প্লেয়ার নয়। ফিক্সিং আর বেটিং সিন্ডিকেটের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত সবাই। সবাই মানে কারা? সবাই মানে আম্পায়ার, গ্রাউন্ডসম্যান, টিমের ফিজিও এবং হ্যাঁ মিডিয়ার একাংশ। দেশবিদেশের বিভিন্ন ম্যাচ কভার করতে যাওয়া সাংবাদিকদের জন্য মিডিয়া রুম দেওয়া হয়। সংবাদ পাঠানোর জন্য। মেল অথবা ফ্যাক্স করার ব্যবস্থা। প্রতিটি ক্ষেত্রেই ফ্যাক্সে ম্যাচ শুরুর পর থেকেই কিছু বিশেষ নম্বরে রিপোর্ট পাঠানো শুরু হয় দুবাই আর জেড্ডার ফ্যাক্স নম্বরে। সাদা এ ফোর সাইজের পেপারে পাঠানো হয়। কোনো নাম লেখা হয় না। থাকে শুধুই কিছু পরিসংখ্যান। কারা পাঠায়? কার কাছে?

যাই হোক সেই আজীবনের ব্যান হওয়ার পর হঠাৎ উধাও ক্রোনিয়ে। কোথাও তার সন্ধান পাওয়া যায় না। শুধু জানা গেল ক্রোনিয়ে নিজের মতো করে একটি ব্যাবসায়িক ফার্মের সঙ্গে যুক্ত হয়ে দিন কাটাচ্ছেন আড়ালে। ২০০২ সালে যখন আবার হঠাৎ করে ম্যাচ ফিক্সিং নিয়ে ক্রোনিয়েকে নিয়ে আলোচনা শুরু হল এবং তাঁকে সামগ্রিকভাবেই ভিলেন তকমা দেওয়া হল, তখনই ক্রোনিয়ে আচমকা জানালেন, আমার অনেক কিছু বলার আছে। আমি একা কেন এভাবে ভিলেন হয়ে যাব? যাঁরা যুক্ত বলে আমি জানি, আমার কাছে প্রমাণ আছে এরকম নাম এবার বলব। সেই তালিকায় নাকি রাজনীতিক থেকে সেলেব্রিটি সকলের নাম আছে। হ্যাঁ, ভারত, ইংল্যান্ড, পাকিস্তান, অস্ট্রেলিয়া সকলে…। কিং কমিশনের সাক্ষ্যে ঠিক এরকমই আভাস দিয়েছিলেন তিনি।

৩১ মে ২০০২। প্রচণ্ড গুমোট জোহানেসবার্গে। শুক্রবারের ট্রাফিক মারাত্মক জ্যাম। সকলেই উইক এন্ডে বাড়ি ফিরবে তাড়াতাড়ি। বিজনেস মিটিং সেরে ফিরছেন হ্যান্সি ক্রোনিয়ে। তাঁর নিজের বাড়ি ওয়েস্টার্ন কেপ প্রদেশের জর্জ নামক শহরে। বাড়ি নয়। একটি গলফ রিসর্ট। বিএমডবু ড্রাইভারকে তাড়াতাড়ি অন্য কোনো রুটে যেতে বলছেন ক্রোনিয়ে। কারণ এয়ারপোর্টে যাওয়ার আগে তাঁকে একবার বেল ইকুইপমেন্ট কোম্পানিতে একটা ছোট মিটিং সারতে হবে। এদিকে জ্যামে রাস্তা প্রায় স্তব্ধ। ইচ্ছা করলেই মিটিং ক্যান্সেল করা যায়। কিন্তু সেটা সম্ভব নয় একটাই কারণে। যখন তাঁকে ক্রিকেট দুনিয়া থেকে ব্যান করা হয় তখন এই সংস্থা তাঁকে একটা অ্যাকাউন্ট ম্যানেজারের চাকরি দিয়েছিল। তাই এদের না বলা উচিত নয়। হ্যান্সি ক্রোনিয়ে ছিলেন শেষ দিন পর্যন্ত নীতিতে অটল। অথচ কেন তিনি নীতিহীন হয়েছিলেন? এই প্রশ্ন আজও তাড়িয়ে বেড়ায় গোটা ক্রিকেট সমাজে।

হ্যান্সি ক্রোনিয়ে সেদিনের ফ্লাইট মিস করলেন শেষ পর্যন্ত। সন্ধ্যা নামার পর আচমকা ঠান্ডা বেড়ে গেল। তীব্র বাতাসও দিচ্ছে। যখন মিটিং শেষ হল ততক্ষণে বেল ইকুইপমেন্টের প্রায় সব কর্মীই চলে গিয়েছেন। অল্প কয়েকজন শুধু অফিসে। ক্রোনিয়ে নিজের প্রাক্তন সহকর্মীদের দিকে তাকিয়ে বলছিলেন, কেউ কফি খাবে? কিন্তু এবার কী? ক্রোনিয়ে ফিরবেন আজই? নাকি থেকে গিয়ে আগামীকালের ফ্লাইট নেবেন? এখন আর ফ্লাইটের টিকিট পাওয়াও যাবে বলে মনে হয় না। উইকএন্ড রাশ। তাহলে? ক্রোনিয়ে বললেন আজই ফিরব। একটাই উপায় আছে। এয়ার কোরিয়াস। বেসরকারি এক চার্টার্ড এয়ারলাইনস কোম্পানির মালিকের সঙ্গে ক্রোনিয়ের বন্ধুত্ব। খুব বেশি সমস্যায় পড়লে মাঝে মধ্যে ক্রোনিয়ে এদের কার্গো ফ্লাইটে ককপিটে বসেই চলে যান। এদিনও সেরকম বন্দোবস্ত হল। ঠিক হল ক্রোনিয়ে ককপিটের জাম্প সিটে বসবেন। পাইলটের ঠিক পাশেই। পাইলট চেনা। তবে ঠিক সময়মতো টেক অফ হল না। একটু ডিলেড। সে তো হতেই পারে। হকার সিডলে এইচ এস সেভেন ফোর এইট কার্গো এয়ারক্র্যাফট জো বার্গ থেকে টেক অফ করল। কেপ টাউন থেকে মাত্র ৪৩০ কিলোমিটার পূর্বের শহর জর্জে যেতে বেশি দেরি হবে না। এবার ল্যান্ডিং। একটু তন্দ্রা এসেছিল হ্যান্সির। তবে ঝাঁকুনিতে চোখ খুলে গেল। একটু কি বেশি দুলছে প্লেনটা? ভাবতে ভাবতেই আচমকা একটা পাহাড়ের দিকে বোঁ বোঁ করে নামতে শুরু করল এয়ারক্র্যাফট। এটা হল ক্র্যাডক পিক। আউটেনকিয়া পর্বতশ্রেণি। পাইলটের দিকে আতঙ্কের সঙ্গে তাকিয়েছিলেন সম্ভবত হ্যালি। সোজা পাহাড়ের গায়ে আছড়ে পড়ল সেই প্লেন। হ্যান্সি ক্রোনিয়ে মারা গেলেন। সঙ্গে দুই পাইলট। কী হয়েছিল? গ্যাভিন ব্র্যানসন এয়ার কোয়ারিসের মালিক। পরে বলেছিলেন, ওই রুটে এই কার্গো ফ্লাইট অবিরত ফ্লাই করে। এটা কীভাবে ক্র্যাশ করল আমরা আজও জানি না। কোনো খারাপ ওয়েদারও ছিল না। সবথেকে বড় যে প্রশ্নের উত্তর পাওয়া গেল না সেটি হল এয়ারক্র্যাফটে বোর্ডিংয়ের পর হ্যান্সি কেন একবারও স্ত্রী বার্থাকে ফোন করে বললেন না যে আমি আসছি? তিনি ফ্লাইট মিস করেছেন এটা বার্থা জানতেন। কিন্তু আবার আসছেন এটা জানতেন না। একটা ছোট কার্গো এয়ারলাইনসের এয়ারক্র্যাফটে কেন যান্ত্রিক গোলযোগ হল? কেন সামান্য ডিলেড ছিল? এসব প্রশ্নের থেকেও যে আরও বড় প্রশ্নগুলি হ্যান্সি ক্রোনিয়ের সঙ্গেই হারিয়ে গেল তা হল কাদের নাম তিনি জানতেন যারা জড়িয়ে বেটিং সিন্ডিকেটে? বিশেষ করে ভারতের রাঘববোয়ালরা আছে বলে তিনি বলেছিলেন! কারা তারা? যাতে ফাঁস না হয় সেই কারণেই মরতে হল না তো হ্যান্সিকে? ২০০০ সালে তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায়, কিং কমিশনের রিপোর্ট পাওয়ার পর আজীবনের মতো তাঁকে ব্যান করা হয়েছিল। অথচ চরম বিস্ময়কর হল ২০১৩ সাল পর্যন্তও হ্যান্সি ক্রোনিয়ের বিরুদ্ধে বা ওই ক্রিকেট বেটিং কেসের কোনো চার্জশিট দেওয়া হয়নি আদালতে। চার্জশিট দেওয়া হল ২০১৩ সালে। কেন? কারণ ছিল প্রবল উপরমহলের চাপ। রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের বাধা। এই মামলায় চার্জশিট হলে শুনানি শুরু হলে প্রচুর প্রভাবশালী রাজনীতিকদের নামও ফাঁস হয়ে যাবে। তাই চুপচাপ ১৩ বছর ধরে চার্জশিট না দিয়ে বসে থাকা হয়েছে। এসবের পরই ইন্টারপোল থেকে বলা হয়েছিল ক্রিকেটের থেকে কালো টাকা সরাতে একটি বিশেষ উইং স্থাপন করা হবে। স্কটল্যান্ড ইয়ার্ড আর ইন্টারপোল থাকবে সেই উইংয়ে। কিন্তু রাজি হয়নি ক্রিকেট কর্তারা। কারা তাঁরা? প্রায় সকলেই রাজনীতির বিখ্যাত মুখ! কে ছিলেন সেই প্রস্তাব পেয়ে প্রত্যাখ্যানের সময় বি.সিআইআইয়ের সর্বোচ্চ পদে? শরদ পাওয়ার!

এবং ২০১৩ সালের ৫ মে। সেই ঈশ্বর সিংয়ের মতোই এবার আবার দিল্লি পুলিশের স্পেশাল সেলের এক ইনস্পেক্টর বদ্রিশ দত্ত আন্ডারওয়ার্ল্ড মাফিয়াদের সঙ্গে সন্ত্রাসবাদীদের কতটা যোগাযোগ আছে তা জানার জন্য মোবাইল ফোন সার্ভেল্যান্সের মাধ্যমে নেটওয়ার্ক তৈরি করছেন। বিকেলে ৫ টা ৫৪ মিনিট। রাজস্থান রয়্যাল টিমের এক সদস্যের কাছে ফোন এল। তাঁর ফোন ততক্ষণে দিল্লি পুলিশ ট্যাপ করে রেখেছে। সুতরাং সে সন্দেহের আওতায়। কিন্তু উলটোদিকে যে ফোন করছে তার পরিচয় জেনে দিল্লি পুলিশ স্তব্ধ। কারণ তিনি হলেন এক প্রাক্তন ক্রিকেটার। যাঁর জনপ্রিয়তা প্রশ্নাতীত। রাজস্থান রয়্যালসের প্লেয়ারকে ফোনে বলা হচ্ছে, আজকের ম্যাচে সেকেন্ড ওভারে ১৪ রানের বেশি দিতে হবে। এমনভাবে বল করবে! ঠিক আড়াই ঘণ্টা পর খেলা শুরু। জয়পুর সওয়াই মানসিং স্টেডিয়ামে। রাজস্থান রয়্যালস বনাম পুণে ওয়ারিয়ার্স। ঠিক কখন সেই ওভারটি শুরু হবে? ওই প্লেয়ারটি জানিয়ে দিলেন আমি ট্রাউজার থেকে ইন করা জার্সি বের করে আবার ইন করে নেব। ওটাই হবে সিগন্যাল। খুব ভালো। এই কথোপকথন শুনে দিল্লি পুলিশ গোটা ম্যাচ বল বাই বল দেখা শুরু করল। এবং সেই বোলার নিজের সেকেন্ড ওভারে সত্যিই ১৪ রানের বেশি দিয়ে দিল লুজ আর ওয়াইড বল করে। কিন্তু বিরাট ভুল করল। কারণ সম্ভবত টেনশন আর উত্তেজনায় সে ওই নির্দিষ্ট সিগন্যালটি দিতে ভুলে গিয়েছে। সেই জার্সি ট্রাউজার থেকে বের করা। চন্দ্রেশ প্যাটেল ওরফে জুপিটার রাগে আতঙ্কে কাঁপছিল। এই ম্যাচের একটি বিশেষ সিন্ডিকেটের হয়ে প্রধান পাণ্ডা চন্দ্রেশ। তার রাগে মাথার চুল ছিঁড়তে ইচ্ছে করছে! কারণ এই বিরাট ভুলের জন্য কোটি কোটি টাকার লোকসান হল। আর আতঙ্ক, কারণ এই ভুলের মাশুল তাকে দিতে হবে। আজ রাতেই ফোন আসবে পাকিস্তান থেকে। সত্যিই এসেছিল। ফোনের অপর প্রান্ত থেকে রাত আড়াইটেয় বলা হয়েছিল জুপিটারকে, এরকম কেন হল? এই লস কিন্তু আমাদের পূরণ করতেই হবে। যদি না পারে এসব ফালতু ছোকরাকে কাজে লাগিও না। আর এই ছেলেটা ডাবল ক্রস করছে না তো আমাদের? (ডাবল ক্রসের অর্থ অন্য কোনো সিন্ডিকেটের হয়েও কাজ করছে)। যদি সেরকম করে তাহলে কিন্তু….। ঠান্ডা গলায় বলেছিল ওপারের কণ্ঠটি। ভয়ে কাঠ হয়ে শুনছিল জুপিটার। কারণ ওপারের লোকটির নাম শাকিল বাবুমিয়াঁ শেখ। অর্থাৎ ছোটা শাকিল…দাউদের ডান হাত। দিল্লি পুলিশ বুঝে গেল আইপিএলে হচ্ছে স্পট ফিক্সিং। আর সিন্ডিকেটের দখলের হাতবদল হয়েছে। এখন আইপিএল নামের নতুন ক্রিকেটের বেটিং সিন্ডিকেটের গডফাদার হয়েছে তিনটি শিবির। কর্পোরেট, রাজনীতি এবং ডি কোম্পানি! অর্থাৎ দাউদ ইব্রাহিম! আর আমরা?

চিয়ারলিডার!

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *