ফোন বাজছে চিফ ক্যাশিয়ারের টেবিলে। ৪৫ মিনিট আগে ব্যাংক খুলেছে। স্টেট ব্যাংক অফ ইন্ডিয়া। পার্লামেন্ট স্ট্রিট ব্রাঞ্চ। বেজেই চলেছে। কেউ ধরার নেই। কারণ চিফ ক্যাশিয়ার বেদপ্রকাশ মালহোত্রা গিয়েছেন দু নম্বর পেমেন্ট কাউন্টারে। একটি রিসিট নিয়ে নির্দেশ দিচ্ছেন। তাই ফোন ধরতে পারছেন না। ফোন থামছে না। বাজছে। পিওন হরিরাম এদিক ওদিক তাকিয়ে ফোনটা ধরলেন। কিছু শোনার আগে বলে উঠলেন, হ্যালো, স্যার তো রুম কে বাহার হ্যায়… আভি আ যায়েঙ্গে…। অপর প্রান্ত থেকে গম্ভীর গলাটি বলল, তুরন্ত বুলাও সাবকো। একটু ভয় পেয়ে ছুটলেন হরিরাম স্যারকে বলতে। বেদপ্রকাশ মালহোত্রা চিন্তিত মুখে ফিরে আগে বসলেন চেয়ারে। তারপর ফোন কানে দিয়ে দু সেকেন্ডের মধ্যে অন্য প্রান্তের কথা শুনে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। প্রায় অ্যাটেনশনের ভঙ্গিতে! ফোনে তাঁকে গম্ভীরভাবে কেউ বললেন, পি এন হাসার বলছি! প্রিন্সিপ্যাল সেক্রেটারি টু প্রাইম মিনিস্টার। ধরুন, ম্যাডাম কথা বলবেন। ম্যাডাম? ফোনে? তাঁর সঙ্গে? স্টেট ব্যাংকের চিফ ক্যাশিয়ারের পা ঠকঠক করে কাঁপতে শুরু করেছে। সামান্য বিরতি। ওপারে মহিলা কণ্ঠ। ম্যাডামের গলা টেলিফোনে কেমন হয় তা জানা নেই। কণ্ঠটি শীতলভাবে শুধু বললেন, মন দিয়ে শুনুন। এক ভদ্রলোক একটু পরই ব্যাংকের বাইরে আসবে। আপনার কোড ওয়ার্ড হবে “বাংলাদেশ কা বাবু”। মনে রাখবেন.. আই রিপিট ‘বাংলাদেশ কা বাবু’। আর আপনাকে তার উত্তরে সেই লোকটি বলবে, ‘বার অ্যাট ল’! সমঝ গয়ে না? ‘বার অ্যাট ল’। যদি সে এই কোড দেয় তাহলেই তারপর তাঁর হাতে জলদি ৬০ লক্ষ টাকা ক্যাশ দিয়ে দেবেন। ছোট ক্যাশ ভ্যান নিয়ে গেটের বাইরে যান। ঠিক আছে? বেদপ্রকাশ মালহোত্রা কোনোমতে বলতে পারলেন একটাই বাক্য ‘জি মাতা জি।’ ইন্দিরা গান্ধীকে সরকারি অফিসারদের একটি বড় অংশ মাতাজি বলেই ডাকতেন। ‘গুড’ বলে মাতাজি ফোন রেখে দিলেন।
দিল্লির কেন্দ্রস্থল পার্লামেন্ট স্ট্রিটের স্টেট ব্যাংক অফ ইন্ডিয়া শাখায় যুদ্ধকালীন তৎপরতা শুরু হল। ১৯৭১ সালের ২৪ মে। প্রাইম মিনিস্টার স্বয়ং ফোন করে নির্দেশ দিয়েছেন ৬০ লক্ষ টাকা পেমেন্টের। কেন কী বৃত্তান্ত কিছুই জানাননি। এরকম কোনোদিন হয়নি। ভারতের প্রধানমন্ত্রী ফোন করে একটি ব্যাংকের সামান্য চিফ ক্যাশিয়ারকে অর্ডার দিচ্ছেন অজানা অচেনা ব্যক্তিকে ৬০ লক্ষ টাকা দিয়ে দিতে? এত কার্যকারণ বিশ্লেষণের সময় নেই। আর সাহসও নেই। অতএব দ্রুত বলা হল ডেপুটি চিফ ক্যাশিয়ার রামপ্রকাশ বাটরাকে ৬০ লক্ষ টাকা প্যাক করতে। অ্যাকাউন্টসের এইচ আর খান্নার কাছে নির্দেশ গেল ক্যাশ থেকে টাকা ডেসপ্যাচের ফরমালিটি তাড়াতাড়ি করে ফেলুন। বাটরার কাছে টাকার পরিমাণ আর কারণ শুনে চোখ কুঁচকে গেল ক্যাশিয়ার রাওয়াল সিং-এর। তখন চা দিতে এসেছে ক্যান্টিনের ছেলেটি। তার সামনেই রাওয়াল সিং জানতে চাইলেন ব্যাপার কী? এরকম তো শুনিনি? রেজিস্টারে পেমেন্ট ভাউচারে কে সই করবে? বাটরা চায়ের কাপ নিতে নিতে বললেন, মালহোত্রা করবে সিগনেচার! এরপর আর কথা চলে না। দুজন স্টাফ একটি ট্রাংকে টাকা তুলে দিলেন ছোট কালো ক্যাশ ভ্যানে। ড্রাইভার আর স্বয়ং ব্যাংকের চিফ ক্যাশিয়ার। গেটের বাইরে এসে বাঁদিকে বেঁকে একটু এগোতেই একটি লম্বা মানুষ হাত দেখাচ্ছেন । তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে গেল ভ্যান। নামলেন না মালহোত্রা। জানালা দিয়ে জিজ্ঞাসুদৃষ্টিতে শুধু তাকালেন। লোকটি সামনে এসে এদিক ওদিক তাকিয়ে মালহোত্রার কানের কাছে মুখ নিয়ে বললেন, আমিই সে। মালহোত্রা সন্দিগ্ধ কণ্ঠে বললেন, “বাংলাদেশ কা বাবু?” লোকটি এবার হাসল। ঘাড় নেড়ে বলল, ‘বার অ্যাট ল’। হাসি ফুটল মালহোত্রার মুখে। তৎক্ষণাৎ গাড়ি থেকে নেমে ক্যাশ ভ্যানের ডিকি খোলা হল। আর ট্রাংক বের করে নামানো হল মাটিতে। লোকটি বলল এবার আমাদের একসঙ্গে যেতে হবে। আপনার ড্রাইভারকে চলে যেতে বলুন ভ্যান নিয়ে। এবার বোঝা গেল ঠিক সামনেই একটি ট্যাক্সি আগে থেকে দাঁড় করানো আছে। সেখানে ট্রাংক তুলে দুজনে বসলেন পিছনে। আর সামান্য একটুক্ষণ পরই এসে গেল সর্দার প্যাটেল রোড আর পঞ্চশীল মার্গের ক্রসিং। ব্যস! এখানে দাঁড়াও। ট্যাক্সিচালক ব্রেক মারল। ৬ ফুটের বেশি লম্বা লোকটি মালহোত্রাকে বললেন, এখানে নেমে আপনি সোজা প্রাইম . মিনিস্টারের বাড়ি থেকে ভাউচার সাইন করিয়ে নিয়ে ব্যাংকে চলে যান। মালহোত্রাকে মাঝপথে নামিয়ে ট্যাক্সি চলে গেল। মালহোত্রা এগোলেন প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের দিকে। এবং প্রাইম মিনিস্টারের বাড়ির রিসেপশনে পরিচয় দিয়ে শোনা গেল প্রধানমন্ত্রী তখন বাড়িতে নেই। পার্লামেন্টে।
পার্লামেন্টে তখন এত কড়াকড়ি ছিল না। তার উপর পরিচয় যেখানে স্টেট ব্যাংকের চিফ ক্যাশিয়ার। বিশেষ করে মালহোত্রা নিজে ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিল কমিটির সদস্য। তাই রিসেপশনে যখন প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে যোগাযোগ করতে চাইলেন তাঁকে ফোনে কথা বলিয়ে দেওয়া হল সেখানে। এবং মালহোত্রা পি এন হাকসারকে চাইলেন। প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত সচিব। ঠিক এক মিনিট পর মালহোত্রার চোখের সামনের দুনিয়া কেঁপে উঠল। তাঁর মাথা ঘুরতে লাগল। এতক্ষণ দাঁড়িয়ে ফোনে কথা বলছিলেন। এবার বসে পড়লেন। তাঁর চোখমুখ দেখে পার্লামেন্টের সিকিউরিটি বিভাগের দুজন অফিসার ছুটে এসে তাঁকে ধরে না ফেললে তিনি পড়ে যেতেন মাটিতে। কারণ পি এন হাকসার ফোন তুলে মালহোত্রার কথা শুনে বলেছেন, এরকম কোনো অর্ডার প্রাইম মিনিস্টার অফিস থেকে যায়নি। আর তিনি নিজে আজ অনেক সকালে পার্লামেন্টে। কারণ লোকসভায় স্পেশাল মেনশন আছে প্রাইম মিনিস্টারের। তাই ব্যস্ত। সুতরাং তিনি ফোন করে ম্যাডামকে ধরিয়ে দিয়েছেন এরকম প্রশ্নই ওঠে না। কিছু একটা ভুল হচ্ছে। আপনি ভিতরে আসুন। সিকিউরিটির অফিসাররা ধরে ধরে মালহোত্রাকে সংসদ ভবনের ভিতরে নিয়ে গেল প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের নির্দেশ পেয়ে। সেখানে গোটা ঘটনা-পুরম্পরা শুনে পি এন হাকসার চিন্তিতমুখে বললেন, ইমিডিয়েট পুলিশে কমপ্লেন করুন। ওয়েল প্ল্যানড ব্যাংক রবারি। সুচারুভাবে আপনাদের ধোঁকা দিয়ে ব্যাংক ডাকাতি হয়েছে। আপনারা কি পাগল? নাকি বোকা? এরকমভাবে কোনো প্রধানমন্ত্রী ব্যাংকের ক্যাশিয়ারকে ফোন করে বলবেন যে কাউকে ৬০ লক্ষ টাকা দিয়ে দিন! আর সেই টাকা দেওয়ার আগে আপনি একবার ফোন করবেন না প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে? কিংবা নিজের সুপিরিয়রকে? উলটে হাকসার অগ্নিমূর্তি। পি এম এটা জানতে পারলে আপনাদের সকলের চাকরি যাবে। মালহোত্রা আর কিছু ভাবতে পারছেন না। এত বড় একটা গেমপ্ল্যান? মালহোত্রা কিন্তু পুলিশে যাননি। তিনি ফিরে এলেন ব্যাংকে। এবং কোনো কথা না বলে চুপচাপ নিজের চেয়ারে। একটু পরই আচমকা এল পুলিশ। কী ব্যাপার? জানা গেল মালহোত্রার দেরি হচ্ছে দেখে টেনশন রাখতে পারেননি জুনিয়র ক্যাশ কফিসার রাওয়াল সিং। তিনিই সোজা পার্লামেন্ট স্ট্রিট থানায় গিয়ে এফ আই আর করে ফেলেছেন। মালহোত্রা বিস্মিত হয়ে কোনো কথাই বলতে পারলেন না। শুধু বললেন, আপনাকে কে বলেছিল এফ আই আর করতে? আমার জন্য ওয়েট করলেন না কেন? রাওয়াল সিং বুঝলেন স্যার প্রচণ্ড রেগে গিয়েছেন। কিন্তু কেন?
অ্যাসিস্ট্যান্ট সুপারিনটেন্ডেন্ট অফ পুলিশ ডি কে কাশ্যপ, ইনস্পেক্টর হরি দেব, ইনস্পেক্টর এ কে ঘোষকে (বাঙালি অফিসার দিল্লি পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চের) দেওয়া হল তদন্তের দায়িত্ব। এই তিন অফিসারই ক্রাইম ডিটেকশনে তুখড়। কারণ প্রধানমন্ত্রীর নাম জড়িয়ে গিয়েছে। ততক্ষণে সংবাদমাধ্যম জেনে গিয়েছে। তদন্তের নাম দেওয়া হল ‘অপারেশন তুফান।’ প্রথমেই দু ঘণ্টার মধ্যে খুঁজে পাওয়া গেল ট্যাক্সিচালককে। সে জানিয়ে দিল ওই প্যাসেঞ্জার নেমেছিল ডিফেন্স কলোনিতে। তবে তার আগে ট্যাক্সি নিয়ে গিয়েছিল রাজিন্দার নগরে। সেখানে একটি বাড়ির সামনে ট্যাক্সিকে দাঁড়াতে বলে ভিতরে ঢুকে যায় ওই প্যাসেঞ্জার। আর ফিরে আসে একটি সুটকেস নিয়ে। সেখান থেকে পুরোনো দিল্লি। জায়গার নাম নিকলসন রোড। আগে থেকে একটি কালো পাঞ্জাবি পরা মানুষ দাঁড়িয়ে ছিল। আর তাকে সুটকেস দিয়েই বলা হয়েছিল, জোরে চালাও গাড়ি, এক্সট্রা টাকা দেব। ঝড়ের গতিতে ট্যাক্সি এসেছিল ডিফেন্স কলোনিতে। ওই রহস্যময় প্যাসেঞ্জার ট্যাক্সি ড্রাইভারকে বলেছিল, ভাই ট্রাংকটা একটু ভিতরে নিয়ে এসো। তাই করেছিল সে। আর পরিবর্তে? ৫০০ টাকা ভাড়া। যা ১৯৭১ সালে একটি ট্যাক্সিচালকের কাছে স্বপ্ন। শুধু শর্ত ছিল একদম মুখ খুলবি না। তোর উপর কিন্তু নজর রাখা হচ্ছে। সাবধান।
সেই ডিফেন্স কলোনির বাড়িতে ছুটল পুলিশের জিপ। সঙ্গে ড্রাইভার। কিন্তু লাভ হল না। ড্রাইভার শুধুমাত্র সিঁড়ির কাছেই এসেছিল। তারপরই তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়। একতলা, দোতলা, তিনতলা সব ফ্যামিলি থাকে। কেউ এরকম কোনো ব্যক্তিকে চেনেই না। তাহলে? এবার কী? তাহলে কি ধরা পড়বে না সেই ব্যক্তি? ছবি আঁকানোর ব্যবস্থা হচ্ছে। পোস্টার দেওয়া হবে। পরদিন বিকেল সাড়ে পাঁচটার সময় একটি ফোন এসেছিল দিল্লি পুলিশের হেড কোয়ার্টারে। একটি মিহি গলার পুরুষ। বলা হল ইনভেস্টিগেটিভ অফিসারকে দিন। কন্ট্রোল রুমে ইনভেস্টিগেটিভ অফিসার আবার কোথায়? গলাটি বলল, ব্যাংক ডাকাতির কেসে ইনফরমেশন আছে। কাকে বলব? তৎক্ষণাৎ ডিসি ক্রাইম ব্রাঞ্চকে লাইন ট্র্যান্সফার করা হলে রহস্যময় কণ্ঠটি জানিয়ে দিল ওই ডাকাতের নাম নাগরওয়ালা। যে নিজেই এক প্রাক্তন এম আই অফিসার। এম আই মানে? মিলিটারি ইনটেলিজেন্স! আপনি এসব কীভাবে জানলেন? হু আর ইউ? আপনি ঠিক বলছেন তার প্রমাণ কী? পরপর প্রশ্ন করলেন ডিসি ক্রাইম ব্রাঞ্চ। ফোনের অন্য প্রান্ত থেকে উত্তর এল, বিশ্বাস করার দরকার নেই। আই ওয়াজ ট্রাইং টু হেল্প ইউ! বাট আপনারা চান না। ফোন ছেড়ে দিচ্ছি! এবার সতর্ক ডিসি। তিনি বললেন, আচ্ছা আচ্ছা! ঠিক আছে বলুন। একটা হাসির আওয়াজে খসখসে মিহি গলাটি বলল, পুরোনো দিল্লির পার্সি ধর্মশালায় চলে যান আজ রাতে। পেয়ে যাবেন। সেই রাতেই পার্সি ধর্মশালা থেকে গ্রেপ্তার হয়ে গেল নাগরওয়ালা। ২৮ বছরের যুবক আইপিএস অ্যাসিস্ট্যান্ট সুপারিনটেন্ডেন্ট ডি কে কাশ্যপ সারারাত ধরে জেরা করলেন। পরদিন সকালেই নাগরওয়ালাকে সঙ্গে নিয়ে এক বিরাট ফোর্স গেল টাকা উদ্ধারে। এবং সত্যিই পুরো টাকা উদ্ধার হল সেই সুটকেস-সহ। পুরোনো দিল্লির এক কবরখানা থেকে। এই রহস্যময় কেসের কোনো মাথামুন্ডু বুঝতে পারছেন না ডি কে কাশ্যপ। কে রিক্রুট করল নাগরওয়ালাকে? আর ব্যাংকের চিফ ক্যাশিয়ার কেন পুলিশে কমপ্লেন করতে চায়নি? তাঁরও গাফিলতির সাজা হয়েছে ঠিকই। কিন্তু কেনই বা সেই নাগরওয়ালা সেদিন দিল্লিতেই রয়ে গেল? পালিয়ে গেল না কেন? কেনই বা ৬০ লক্ষ টাকা কবরখানায় খোলা আকাশের নীচে একটি গর্তে রেখে দেওয়া হয়েছিল ৪৮ ঘণ্টা ধরে? কোনো উত্তর নেই। কিন্তু এসব ছিল নিছক প্রথম এপিসোড। আসল চমক শুরু হল এরপর।
নাগরওয়ালা মাত্র ১০ মিনিটের মধ্যেই আদালতে স্বীকার করল সে এই প্ল্যান করেছে। এবং দ্রুত তার ৪ বছরের জেল হয়ে গেল। কিন্তু জেলে যাওয়ার ঠিক তিন মাস পর আচমকা নাগরওয়ালা ফের আদালতে আপিল করে জানাল সে নির্দোষ। তাকে ফাঁসানো হয়েছে। সেশন কোর্ট আবার শুনানির নির্দেশ দিল বটে। কিন্তু সেই শুনানি শুরু হওয়ার কয়েকদিনের মধ্যেই ১৯৭১ সালের ২৮ অক্টোবর নাগরওয়ালার পুনরায় বিচারের আবেদন খারিজ হয়ে গেল। তবে এই পুনরায় আবেদনের প্রেক্ষিতে সেই আই পি এস যুবক ডি কে কাশ্যপ দেখা করলেন নাগরওয়ালার সঙ্গে। জানতে চাইলেন আসল ঘটনাটি কী? আমার মনে হয় এর পিছনে কোনো গভীর চক্রান্ত আছে। নাগরওয়ালা বলেছিল, আপনাকে বলব। তার আগে আপনি এমন কোনো ব্যবস্থা করুন যাতে আমার কেসটা রিওপেন হয়। আর কেস সেই কোর্টে যেন ফেলা না হয়, যে ম্যাজিস্ট্রেট আমাকে সাজা দিয়েছেন। গভীর চক্রান্ত আছে। কাশ্যপ বললেন, আমি ট্রাই করছি। আপনি আপিল করুন আবার। ১৬ নভেম্বর নাগরওয়ালা আপিল করল আদালতে। অন্যদিকে কাশ্যপ কিছু তদন্তের সূত্র খুঁজতে শুরু করল। কিছুদিন আগেই বিয়ে হয়েছে তাঁর। কোথাও বেড়াতে যাওয়া হয়নি। স্ত্রী অনুযোগ করছেন। কাশ্যপ বলেছিল একটা কেসে ইন্টারেস্টিং ডেভেলপমেন্ট হচ্ছে। দাঁড়াও অনেক কিছু হাতে আসবে। এটা ক্র্যাক করতেই হবে। তারপর বেড়াতে যাব। কিন্তু স্ত্রী নাছোড়। অতএব ২০ নভেম্বর স্ত্রীকে নিয়ে হানিমুনে যাচ্ছেন কাশ্যপ। দুজনেই দারুণ খুশি। পাহাড়ে। ফাঁকা রাস্তা। গাড়িতে। চণ্ডীগড়ে ঢোকার আগেই আচমকা দুদিক থেকে দুটি ট্রাক সামনে এসে ধাক্কা মারল। গাড়িতে। ড্রাইভার জাম্প করে বাইরে যেতে পারল। পারলেন না ডি কে কাশ্যপ। রহস্যময় দুর্ঘটনায় ২৮ বছরের আইপিএস যুবকের মৃত্যু হল। স্ত্রী বেঁচে গেলেন। কেন দুর্ঘটনা? দুর্ঘটনা নাকি হত্যা? আজও জানা যায়নি। তারপর কী হল? ‘কারেন্ট’ নামের একটি ইংরাজি পত্রিকা ছিল। পত্রিকার সম্পাদককে নাগরওয়ালা জেল থেকে চিঠিতে জানাল আমি একটা ইন্টারভিউ দিতে চাই। ইন্টারভিউ দেওয়ার কথা ফেব্রুয়ারিতে। ১৯৭২ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি জানা গেল নাগরওয়ালা হঠাৎ অসুস্থ হয়ে তিহার জেল হাসপাতালে ভর্তি। ব্যথা কমানো যাচ্ছে না। বমিও হচ্ছে। দ্রুত পাঠানো হল জি বি পন্থ হাসপাতালে। সাতদিন পর জানা গেল, লাঞ্চের পর লাগাতার কালো রঙের বমি হচ্ছে। এবং সেদিন দুপুর আড়াইটের সময় ১৫ দিন আগেও সম্পূর্ণ সুস্থ নাগরওয়ালার মৃত্যু হল! তারপরই জাতীয় রাজনীতিতে তীব্র আলোড়ন শুরু হল। বিরোধীরা চাইলেন বিচারবিভাগীয় তদন্ত। দিনের পর দিন সংসদ হয়েছিল উত্তাল। সরকারকে জবাবদিহি করতে হবে। কারণ সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর তো বটেই, খোদ প্রধানমন্ত্রীর কণ্ঠস্বরের নাম জড়িয়েছে। কেন এই একের পর এক রহস্যময় মৃত্যু? কিন্তু তখন সবেমাত্র বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার যুদ্ধ লড়ছে। ভারত প্ল্যান শুরু করেছে পাকিস্তান থেকে পূর্ব পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করার লড়াইয়ে যথাসাধ্য সাহায্য করা হবে। দলে দলে উদ্বাস্তু আসছে সীমান্ত পেরিয়ে। ইন্দিরা গান্ধীর ভাবমূর্তি আকাশছোঁয়া। আর জাতীয় রাজনীতিতে তখন আছড়ে পড়ছে একের পর এক অ্যাজেন্ডা। অতএব সময়ের সঙ্গে একসময় মুছে গেল এই রহস্যময় এপিসোড।
