ব্ল্যাক করিডর ১.১৩

ফরওয়ার্ড সেকশন টুয়েন্টি থ্রি!

পাক অধিকৃত কাশ্মীরের সবথেকে স্ট্র্যাটেজিক টাউন। স্ট্র্যাটেজিক, কারণ ভারতের হাতে থাকা কাশ্মীরের প্রবেশপথ শর্ট রুটে খুব কাছে। কিন্তু বর্ডার থেকে এই জনপদে সোজা পথে আসতে হলে বহু পাহাড়ি এলাকা আর জঙ্গল পেরোতে হবে। ফরওয়ার্ড সেকশন টুয়েন্টি থ্রি হল পাকিস্তানের গুপ্তচর সংস্থা ইন্টার সার্ভিসেস এজেন্সির ব্যক্তিগত টাউনশিপ। সারি দেওয়া একতলা বাড়ি ক্যাম্প। চারটি প্রাসাদোপম বাংলো। ওই একতলা বাড়ি আর ক্যাম্পগুলি জঙ্গি উৎপাদন কেন্দ্র। ভারত, পাকিস্তান আর বাংলাদেশ থেকে জঙ্গি হতে উৎসুক যুবক আর তরুণের দল প্রথমে লাহোর অথবা করাচি আসবে। তারপর তাদের নিয়ে আসা হয় এই টাউনশিপে। এটাই নিয়ম। ওই একতলা বাড়ি আর ক্যাম্পে তারা থাকে। ট্রেনিংয়ের জন্য। যখন ট্রেনিং শেষে বেরোয় তখন কেউ হয়ে ওঠে আজমল কাসব, আবার কোনো ক্লাস টেনের ছাত্র হয়ে ওঠে ভয়ংকর ফিদাইন। আর ওই বাংলোগুলি যাদের জন্য, তাদের একজনকে মাঝেমধ্যেই করাচির ক্লিফটন এলাকা থেকে সরিয়ে আনতে হয় আত্মগোপনের জন্য। তার নাম দাউদ ইব্রাহিম কাসকর। দ্বিতীয় বাংলোটি হাফিজ সঈদের জন্য বরাদ্দ। তৃতীয় বাংলোয় থাকে আইএসআই চিফ। আর কখনও সখনও পাকিস্তান আর্মির বড় অফিসার এলে ওই চতুর্থ বাংলো। বেশিদিন অবশ্য গোপন থাকেনি। আমেরিকা জেনেই গেল এই গোপন টাউনশিপের কথা। ২০০১ সালের ৯ সেপ্টেম্বরের টুইন টাওয়ার ধ্বংসের পর আমেরিকা কড়া কণ্ঠে পাকিস্তানকে জানিয়ে দিল ফরওয়ার্ড সেকশন টুয়েন্টি থ্রি বন্ধ করে দিতে হবে। সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে লড়াই এর জন্য হাজার হাজার কোটি ডলার দেয় আমেরিকা। পাকিস্তান তাই আমেরিকার কথা অমান্য করতে পারে না। সুতরাং আপাতভাবে বন্ধ করে দেওয়া হল সেই ট্রেনিং ক্যাম্প। যদিও পরে আবার খোলা হবে। তাহলে কোথায় হবে ভারতবিরোধী প্ল্যান প্রয়োগের কর্মশালা? গোটা নেটওয়ার্ক শিফট করে দেওয়া হল করাচিতে। ২০০২ সালে পাকিস্তান আর্মির সিক্সথ বালুচ ব্যাটেলিয়নের এক দুর্ধর্ষ সেনা অফিসার মেজর আবদুর রহমান হাসিম সেনাবাহিনী থেকে ইস্তফা দিল। কারণ কয়েকমাস আগে তাকে পাঠানো হয়েছিল তোরা বোরা মাউন্টেন উপত্যকায়। আল কায়েদার বিরুদ্ধে পাকিস্তান আর্মির অপারেশন হবে। সেখানে তাকে যেতে হবে। বেঁকে বসল মেজর আবদুর রহমান হাসিম। আল কায়েদার বিরুদ্ধে সে লড়াই করবে না। সেনাবাহিনীতে বিদ্রোহ? নির্দেশের অমান্য? সহ্য করা হবে কেন? তাই মেজর আবদুর রহমানের মেজর পদে কেড়ে নেওয়া হল। তাকে নামিয়ে আনা হল ক্যাপ্টেন পদে। ঠিক তিনমাস পর সে সেনাবাহিনী থেকে পদত্যাগ করেছিল। এই তিনমাসে কী করেছে? তার সঙ্গে যোগাযোগ তৈরি হয়েছিল এক দীর্ঘদেহী, রোগাটে গড়নের ব্যক্তির। আস্তে আস্তে কথা বলে সে লোক। কিন্তু চোখদুটি স্থির সর্বদাই। মুখে মৃদু হাসি। আল কায়েদার বিরুদ্ধে লড়াই করতে আবদুর রহমান চায়নি বলে ভূয়সী প্রশংসা করে সেই লোকটিই রহমানকে ডেকে পাঠায় নিজের আস্তানায়। গোপন। এবং তারপর রহমানকে দিল নতুন এক কাজের অফার। যা রহমানের পছন্দ হয়েছে। সেনাবাহিনীর কাজে মজা পাওয়া যাচ্ছে না। এটা দারুণ দায়িত্ব। কী সেই নতুন অফার? ওই রোগা লম্বা লোকটি একটি বিশেষ ইউনিটের জন্মদাতা। ভয়ংকর যোদ্ধা ইউনিট। সবটাই প্রযুক্তিনির্ভর। ইউনিটের নাম জুন্দ আল ফিদা! এই জুন্দ আল ফিদার শাখা হিসাবে নতুন একটি প্রকল্প হাতে নিয়ে রহমানকে পাঠানো হবে আইএসআই এর কাছে। সেই লোকটিই সব ব্যবস্থা করে দিল। লোকটির নাম ওসামা বিন লাদেন। আর আইএসআইএর কাছে গিয়ে রহমান যোগ দেওয়ার পর, দু মাসের মধ্যে যে নতুন ইউনিট ও মিশন স্থাপন করা হল, তার নাম করাচি প্রজেক্ট! লক্ষ্য ইন্ডিয়া! রহমান মাস্টারমাইন্ড। তার ডাক নাম পাশা। তাই আইএসআই আদর করে সেই প্রজেক্টকে সম্বোধন করে ‘পাশা প্রজেক্ট’।

সবার আগে দরকার রিক্রুটমেন্ট সেল। এবং সেটা হওয়া দরকার ভারতে। সহ্যাদ্রি পবর্তমালার তিনদিকে ঢেউ খেলানো পর্বতশ্রেণি। পশ্চিমঘাট। আর একদিকে সমুদ্র। আরবসাগর। উত্তর কর্ণাটকের উপকূলবর্তী কোস্টাল টাউনের নাম ভাটকল। অসামান্য সুন্দর দেখতে এক জনপদ। ঘন সবুজ বনভূমি। দিগন্তে পর্বতশ্রেণি। আর শহরের উপকণ্ঠে সমুদ্র। একদিকে ম্যাঙ্গালোর। অন্যদিকে কারওয়ার। এই দুই শহরের মাঝখানে এই ভাটকল। ফাঁকা ফাঁকা। প্রতিটি বাড়িতে রয়েছে বাগান, লন। ছোট্ট দোতলা, একতলা বাড়ি। একঝাঁক অট্টালিকাসম প্রাসাদোপম বাড়ি ঘোষণা করছে শহরটির সমৃদ্ধি। ৬০ হাজার মানুষের বাস মাত্র। এখান থেকে সামান্য দূরের কারওয়ার শহরটিও দারুণ সুন্দর। পাহাড় আর সমুদ্র পাশাপাশি। সেখানে মার্কেট কমপ্লেক্সও বেশি। তাই ভাটকলের মানুষ কেনাকাটা করতে ম্যাঙ্গালোর অথবা কারওয়ার যাতায়াত করেন। কারওয়ার আর একটি কারণে বিখ্যাত। আজ থেকে অনেক অনেক বছর আগে এখানে এক আইসিএস অফিসার এসে থাকতেন। বিরাট সুন্দর বাংলো। তিনি ছিলেন বাঙালি জেলা জজ। ব্রিটিশ ভারতে একজন জেলা জজের বিপুল পদমর্যাদা আর মাহাত্ম্য। সাংঘাতিক সম্মান। যদিও তিনি অফিসের কাজে ব্যস্ত থাকলেও তাঁর বিশাল বাংলোটিতে বসে প্রকৃতি উপভোগ করার জন্য তাঁর ছোটভাই মাঝেমধ্যেই এসে থাকতেন এই কারওয়ারে। ছোটভাইয়ের লেখালেখির শখ। তাই এই নির্জন শহরে, আইসিএস দাদার বাংলোয় তিনি খুঁজে নিতেন নিজের সাহিত্যচর্চার অবকাশ। সেই আইসিএস অফিসারের নাম ছিল সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর। আর ভাইয়ের নাম রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।

এই কারওয়ার থেকেই একটি পরিবার ষাটের দশকে শিফট হয়ে চলে এসেছিল নিকটবর্তী জনপদ ভাটকলে। প্রথমে ছিল রাবার প্ল্যান্টের ব্যবসা। তারপর অর্ডার সাপ্লাই। জায়গাটির নাম অনুযায়ী এই পরিবারের পরবর্তী প্রজন্মের সদস্যদের মধ্যে নামের পাশে অন্তর্ভুক্ত করা হতে থাকে স্থানের নাম। ভাটকল। আরবসাগরের তীরে ২০০২ সালের মে মাসে চারজন যুবক একজোট হয়ে একটি মিটিংয়ে মিলিত হল। ২ ঘণ্টা প্রচুর আলাপ আলোচনার পর তাদের বৈঠক সমাপ্ত হয়। এবং ঠিক হয়েছিল তাদের প্রধান লক্ষ্য হবে জিহাদ। তার জন্য দরকার এমন কিছু করা যাতে গোটা দেশ কেঁপে যায়। আগে একটা গ্রুপ তৈরি করা যাক।

সেদিন ওই চারজনের দলই ঠিক করল নতুন গ্রুপের নাম কী হবে। যার নেতা হবে দুই ভাই। ইয়াসিন ভাটকল, রিয়াজ ভাটকল। সেই কারওয়ার থেকে ভাটকল শহরে চলে আসা পরিবারটির দুই ছেলে। আর গ্রুপের নাম? ইন্ডিয়ান মুজাহিদিন! যারা এরপরের বছরগুলিতে গোটা দেশে একের পর এক বিস্ফোরণ ঘটিয়ে সব মিলিয়ে ৫৩৪ জনের মৃত্যুর কারণ হবে। আমেদাবাদ থেকে বোধগয়া। দিল্লি থেকে বেঙ্গালুরু। হায়দরাবাদ থেকে জয়পুর। তাদের ফ্রেন্ড, ফিলজফার এবং গাইড কে ছিল? করাচি প্রজেক্ট! কীভাবে সম্পন্ন হল এই নিপুণ বিপজ্জনক ষড়যন্ত্রটি?

প্রথমে ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল। ক্লাস টেনের বোর্ড পরীক্ষায় ৯৩ শতাংশ পেয়েছে মনসুর পীরভয়। এরপর ক্লাস টুয়েলভথের বোর্ড পরীক্ষায় আরও ভালো। ৯৮ শতাংশ নম্বর। সুতরাং। অল ইন্ডিয়া জয়েন্ট এন্ট্রান্সে চান্স পাওয়া মোটেই শক্ত হয়নি। সহজেই তাই বিশ্বকর্মা ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজি থেকে ইঞ্জিনিয়ারিং। পুণের পশ এলাকায় বাড়ি। উজ্জ্বল, খুব নম্র স্বরে কথা বলা। যাকে বলা হয় সফট স্পোকেন। বড় দাদার নাম শাহিদ। লন্ডনের ডাক্তার। আর এক দাদার নাম আদিল। তিনি আবার আর্কিটেক্ট। বেলজিয়াম থেকে ডাক এসেছে। আর কয়েকমাসের মধ্যেই বেলজিয়াম চলে যাবেন। একদম ছোট ভাই আলিম এখনও পড়ছে। মনসুর সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিং-এ কলেজের মধ্যে টপ করেছে। তাই ক্যাম্পাস ইন্টারভিউতে ভালো একটি চাকরি পেয়ে গেল। এবং কয়েক বছরের মধ্যেই তার বেতন হয়ে গেল বার্ষিক ১৯ লক্ষ টাকা। কোম্পানির নাম জিহ্বা টেকনোলজিস। ঠিক ৮ মাস। সংস্থাটি কিনে নিয়েছে বহুজাতিক সংস্থা ইয়াহু। ডিলের মূল্য ৩০০ মিলিয়ন ডলার। সুতরাং মনসুর এবার থেকে পৃথিবীখ্যাত ইয়াহুর কর্মী। এবার বিয়ে করার সময় এসেছে। মহারাষ্ট্রেরই আকোলার বাসিন্দা এক রাজ্য সরকারি কর্মীর কন্যার সঙ্গে বিয়ে হল মনসুরের। মেয়েটি হোমিওপ্যাথি ডাক্তার। সুখী দম্পতি। আধুনিক প্রজন্মের পারফেক্ট রোলমডেল।

ঠিক এরকমই কাউকে দরকার ইন্ডিয়ান মুজাহিদিনের। যাকে দেখে মোটেই বোঝা যাবে না তার ভিতরটা কেমন। ইয়াসিন ভাটকল আর রিয়াজ ভাটকল তাদের পুণে ইউনিটে যুবক রিক্রুটমেন্টের জন্য দায়িত্ব দিয়েছে দুজনকে। আসিফ বশিরুদ্দিন শেখ আর আনিক শফিক সঈদ। পুণের আজম ক্যাম্পাসের কোরান ফাউন্ডেশনে আরবি ক্লাসে ভর্তি হয়েছিল মনসুর। কেন? কারণ তার প্রিয় শখ হল ভাষাশিক্ষা। এর আগে সে স্প্যানিশ শিখেছে। ফ্রেঞ্চ শেখার ইচ্ছা আছে। কিন্তু তার আগে বরং আরবি ভাষা শিখে নেওয়া যাক। প্রকৃত ভাষায় লিটারেচার পড়ার অনেক মূল্য। সেই লক্ষ্যেই এই আরবি ক্লাসে ভর্তি হওয়া। প্রত্যেকটি ক্লাসের পর দুটি লোক এসে উপযাচক হয়ে কথা বলে। তাদের লক্ষ্যটা অবশ্য বেশ ভালো। ক্লাসের পর আমরা নিজেদের মধ্যে আরবি ভাষা চর্চা করব। কিছুক্ষণ। যাতে এই ক্লাসের পর চর্চাটা রয়ে যায়। আর একসঙ্গে যদি অনুশীলন করা যায় তাহলে আনন্দও হয়। বোরিং লাগে না। ঠিক একমাস পর ওই দুটি লোক সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিল কয়েকটি ফোটোগ্রাফ। অত্যাচার করা হচ্ছে মুসলিমদের উপর। গুজরাতে, অসমে, উত্তরপ্রদেশে। এমনকী বেঙ্গালুরুতেও। আমরা এত পড়াশোনা শিখে কি চুপ করে বসে থাকব? বাড়ি ফিরে গম্ভীর মনসুর। এরকম সচরাচর সে থাকে না। কী হল? স্ত্রী জানতে চায়। মনসুরের ভিতরে ততক্ষণে বীজ রোপিত হচ্ছে। কিছু করার। দুদিন পর শনিবারের ক্লাসে যখন যে পৌঁছল তখন ওই দুটি লোক আসিফ আর আনিক মনে মনে উল্লসিত হয়ে উঠল। কারণ টোপ গিলেছে এই ছেলেটি। সে রাজি জিহাদে। মাত্র তিনদিনের মধ্যে পুণে হাজির হয়েছে রিয়াজ ভাটকল। আসিফের বাড়িতে। নতুন মেম্বারকে স্বাগত জানাতে। জড়িয়ে ধরে বলল তুমি শুধু এই গ্রুপের নয়। গোটা কমিউনিটির কাছে একজন রোলমডেল। কারণ এরকম টেকনিক্যাল জ্ঞান আর কজনের আছে? তুমি হবে আমাদের নতুন টেকনোলজি গুরু। তোমার দেখানো পথেই চলবে নতুন শিক্ষিত আধুনিক এক গ্রুপ। শুরু করো। ঠিক এভাবে ইন্ডিয়ান মুজাহিদিন চালু করল তাদের প্রথম মিডিয়া সেল৷ দুদিন ক্লাস। পুণেতে। নতুন রিক্রুট জঙ্গিরা আসছে। টিচারের নাম মনসুর। প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে যে বিষয়গুলিতে তা হল ১) ডিলিটেড ডেটা রিকভারি ২) সিকিওরিং এনক্রিপটিং কমিউনিকেশন। ভারতের বিভিন্ন সরকারি সংস্থা, এমনকী কোস্ট গার্ড অথবা তদন্তকারী সংস্থাগুলি বাইরে থেকে অনেক সময়ই হায়ার করে সফটওয়্যার বিশেষজ্ঞ। কত বেশি ডিলিটেড ডেটা রিকভারি করা সম্ভব সেটা জানার জন্য একটি বিশেষ ট্রেনিং হল। তবে সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ ট্রেনিং, কীভাবে অনলাইন যোগাযোগ ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ গোপন রাখা সম্ভব প্রক্সি সার্ভারের মাধ্যমে। কারণ যে কোনো কমিউনিকেশনের ডেটা রিকভারির মাধ্যমেই তদন্তকারী সংস্থাগুলির পক্ষে কোনো একটি ঘটনার প্রাথমিক সূত্র বা লিড পাওয়া সম্ভব। সেটা আটকাতে পারলেই হল। শুধু এটুকু জ্ঞানে কি এত বড় এক কর্মযজ্ঞে নামা সম্ভব? একেবারেই নয়। দরকার আরও বিশেষ কোনো টেকনিক্যাল জ্ঞান।

২০০৭ সালের মে মাসে হায়দরাবাদের ‘ই টু’ ল্যাব নামক একটি সাইবার ল্যাবরেটরিতে শুরু হয়েছিল একটি বিশেষ কোর্স। তার নাম ‘এক্সপার্ট হ্যাকিং কোর্স।’ কর্পোরেট প্রফেশনালসদের জন্য। ওই কোর্স করার ফি কত লাগবে? ১ লক্ষ টাকা। এত বেশি কেন? কারণ ‘ই টু’ ল্যাব চাইছিল কোনো ছাত্র কিংবা চাকরিপ্রার্থী যুবক যেন অ্যাপ্লাই না করে। এই কোর্স শুধুমাত্র প্রফেশনালদের জন্য। যাদের কোম্পানি পে করবে। আর সর্বোপরি কোর্সের ট্রেনিং হাবিজাবি লোক তো দেবে না। দিতে আসছে বিশ্বখ্যাত সব সংস্থার প্রধান সফটঅয়্যার ইঞ্জিনিয়ার। আসছেন আয়াল দোতান। বিখ্যাত অ্যান্টি ভাইরাস বিশেষজ্ঞ সংস্থা ট্রাস্টঅয়্যারের সহ প্রতিষ্ঠাতা দোতান। যিনি সর্বপ্রথম সেইসব মারাত্মক ভাইরাসকে প্রতিরোধ ব্যবস্থায় পথিকৃৎ ভূমিকা পালন করেছেন, যেগুলির নাম, আই লাভ ইউ, মেলিসা, ক্লেজ, ব্লাস্টার, সাসার ওয়ার্ম। শুধু কর্পোরেট নয়। এই কোর্সে আসতে আহ্বান করা হচ্ছে মিলিটারি ডিপার্টমেন্টকেও। ই টু ল্যাব নিজেদের নাম দিয়েছে এশিয়ার প্রথম অ্যান্টি হ্যাকিং অ্যাকাডেমি। ১৪ মে থেকে ১৯ মে ২০০৭। কোর্স। শেখানো হবে অ্যান্টি হ্যাকিং, ওয়েব অ্যাপ্লিকেশন সিকিউরিটি এবং অ্যান্টি অয়্যারলেস হ্যাকিং। মনসুর ভাবল এই কোর্সটা করতেই হবে। কিন্তু কোম্পানি তাকে সেই সুযোগ দেবে না। নিজের পকেটের টাকা খরচ করতে হবে। কিন্তু মাত্র পাঁচদিনের জন্য ১ লক্ষ টাকা! অবশ্যই অনেক বেশি। তাই মনসুর ই টু ল্যাবের সঙ্গে অনলাইনে দরদাম শুরু করল। নিজের পরিচয় আর জব স্ট্যাটাস জানিয়ে এটাও টোপ দিল সে মাঝেমধ্যেই আমেরিকা যায়। ফলে ই টু ল্যাবের সফটঅয়্যার টেকনোলজি প্রোগ্রামিং-এ সে সহায়তা করবে। মনসুরের এই কথায় রাজি হয়ে গেল ই টু ল্যাব। ডিসকাউন্ট হল ৩৫ হাজার টাকা। মনসুরকে দিতে হবে বাকিটা। কিন্তু চারদিনের ছুটি নিতে হবে তো? অফিসে কী বলা হবে? বাড়িতে কী বলা হবে? অফিসে মনসুর জানাল কিছু পার্সোনাল কাজ আছে। একটু সময় লাগবে মেটাতে। মনসুর কখনও ছুটি নেয় না। সুতরাং তার সেই ছুটির আবেদন সহজেই মঞ্জুর হল। আর স্ত্রীকে বলল ঠিক উলটোটা। অফিসের কাজেই তাকে যেতে হচ্ছে হায়দরাবাদ। ট্রেনের টিকিট এখন আর পাওয়া যাবে না। ওয়েটিং লিস্ট। তাই মনসুর বাসে যাওয়া স্থির করেছে। পুণে বাসস্ট্যান্ড থেকে হায়দরাবাদ। বাসে পাশের ছেলেটি একটু বেশি গায়ে পড়া। কোথায় যাচ্ছেন ভাই?

মনসুর সংক্ষেপে বলল হায়দরাবাদ।

আমিও তো হায়দরাবাদ। আপনি কি চেনেন ওখানে কোনো হোটেল টোটেল?

মনসুর ঘাড় নাড়ল। বোঝানোর চেষ্টা, সে পছন্দ করছে না এত বাক্যালাপ। ছেলেটি অবশ্য নাছোড় আসলে কি জানেন দাদা, আমি ওখানে একটা কোর্স করতে যাচ্ছি। চার পাঁচদিনের ব্যাপার। তবু সস্তার হোটেল হলে একটু ভালো হয়। কোর্স ফি এখনও পুরো জোগাড় হয়নি জানেন?

মনসুর এবার একটু নড়েচড়ে বসল। কোর্স? কীসের কোর্স?

ছেলেটি বলল একটা অ্যান্টি হ্যাকিং কোর্স! ‘ই টু’ ল্যাব!

মনসুর স্তম্ভিত! এটা কেমন হল? সেও যাচ্ছে ওই কোর্সে। আর এই ছেলেটিও যাচ্ছে। তাও আবার ঠিক পাশের সিট! এটা কীভাবে সম্ভব? ছেলেটির নাম মুবিন কাদের শেখ। কিছু ঘণ্টার মধ্যেই মনসুর বুঝে নিল ছেলেটি সরল টাইপ। চাকরিবাকরির খোঁজে আছে। তাই এই কোর্সে যাচ্ছে। ভালোই হল। একসঙ্গে বরং থাকলে সস্তায় হয়ে যাবে। সেইমতো বেগমপেট রেলস্টেশনের লাগোয়া একটি হোটেল নেওয়া হল। একসঙ্গে থাকছে দুজন। প্রথম দুদিনেরই কোর্স ট্রেনাররা বুঝে গেল এই গ্রুপে এমন একটি ছেলে এসেছে যার মাথা চূড়ান্ত শার্প। যে কোনো হ্যাকিং প্রসিডিওর আর সফটঅয়্যার হ্যান্ডলিং এই ছেলেটি নিমেষে বুঝে যায়। মনসুর তার নাম। এদিকে মুবিন খুব মনমরা। কারণ সে শেষ পর্যন্ত টাকাটা জোগাড় করতে পারল না। কোর্সটা করা হল না তার। সারাদিন কোথায় কোথায় ঘুরে বেড়ায়। তবে মনসুরের সঙ্গে ল্যাবে যায়। সেখান থেকে বেড়াতে বেরিয়ে পড়ে। প্রত্যেকদিন ট্রেনিং শেষ হওয়ার পর বাইরে এসেই মনসুর দেখে মুবিন কিন্তু ঠিক দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছে। খুব ভালো ছেলে।

আর মাত্র একদিন বাকি কোর্স শেষ হতে। সেদিন ১৮ মে। শুক্রবার। ই টু ল্যাব থেকে বেরিয়ে মনসুর মক্কা মসজিদের দিকে যাবে নমাজ পড়তে। চারমিনারে। রিকশায় যাওয়ার পথে আচমকা একটা বিকট শব্দ। প্রবল হট্টগোল। মানুষ দিগ্‌বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে ছুটছে। মক্কা মসজিদে ব্লাস্ট হয়েছে! ব্লাস্টে ৯ জনের মৃত্যু। এভাবে ঠিক বেছে বেছে কারা মক্কা মসজিদে শুক্রবারই ব্লাস্ট করাল? তারা কি মুসলিম টেররিস্ট হতে পারে? অঙ্ক মিলছে না। তাহলে? ভাবতে ভাবতে হাসপাতালে গিয়ে মনসুর দেখতে পেল চরম এক নারকীয় দৃশ্য। শয়ে শয়ে মানুষ কাতরাচ্ছে। রক্তাপ্লুত। এ নিশ্চয়ই অন্য কোনো বড় চক্রান্ত! মনসুর রাত সাড়ে ১০ টায় হায়দরাবাদ মিউনিসিপ্যাল হাসপাতালে দাঁড়িয়ে শুনতে পেল তার কানে বাজছে রিয়াজ ভাটকলের একটাই কথা, যা এখানে আসার আ রিয়াজ বহুবার বলেছে—জিহাদই একমাত্র উত্তর মনসুর ভাই…। পাশে দাঁড়ানো মুবিন জানতে চাইছে, কী ভাবছেন দাদা? মনসুর হোটেলের ঘরে ফিরে বলল, আমাদের উপরই এত অত্যাচার কেন হচ্ছে? এর কোনো বদলা হবে না? মুবিন পাশে বসে বলল, ঠিক বলছেন দাদা। আমিও তাই ভাবি..। মনসুর খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ছে। মুবিনের সিগারেট ফুরিয়ে গিয়েছে। সে যাবে স্টেশনের পাশের দোকানে। সিগারেট আনতে। গিয়ে টেলিফোন বুথে ঢুকে মুবিন অন্য প্রান্তে থাকা কাউকে বলল, রিয়াজ ভাই…লেড়কা সহি হ্যায়…ইসকে অন্দর ঘুস গয়ি জিহাদ…কাম হাসিল হো যায়েগা..আপ বেফিকর রহো…।

মুবিন আসলে ইন্ডিয়ান মুজাহিদিনের স্পাই। মনসুরের উপর গোপন নজরদারির জন্য তাকে পাঠানো হয়েছে।

হায়দরাবাদ থেকে ফিরেই আচমকা এক কাণ্ড। ইয়াহু কোম্পানি থেকে মনসুরকে পাঠানোর সিদ্ধান্ত হল আমেরিকায়। একটা প্রজেক্টে। কিছুদিনের জন্য। এই খবরটি ছড়িয়ে যেতেই খুশির হাওয়া ইন্ডিয়ান মুজাহিদিনের গ্রুপে। ইয়াসিন ভাটকল বলল সেলিব্রেশন হবে। আমরা আসছি। সকলে আবার মিলিত হল পুণের আসিফের ফ্ল্যাটে। কিন্তু আমেরিকায় কিছুদিনের জন্য যাওয়া। তার আবার সেলিব্রেশন কী? কেন? মনসুর অবাক। আসল কারণটা জানা গেল সন্ধ্যায় আসরে। ইয়াসিন বলছে, শোনো মনসুর, তিনটে জিনিস আনতে হবে আমেরিকা থেকে। একটা স্পাই ক্যামেরা ডিটেক্টর, ভয়েস চেঞ্জার সফটঅয়্যার আর রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি ডিটেক্টর। কী কাজে লাগবে? শেষেরটি কাজে লাগে গোপন বাগ ভয়েস রেকর্ডার আর লুকানো মাইক্রোফোনের সন্ধান পেতে। ঠিক চারমাস পর মনসুর এই সবকটি যন্ত্র নিয়ে ফিরে এল ভারতে। শুরু হল নতুন এক জঙ্গি বাহিনীর পথ চলা। মনসুরকে প্রথম যে কাজটি দেওয়া হল তা খুবই সিম্পল। মুম্বইয়ে আনসিকিওরড ওয়াই ফাই কানেকশন খোঁজ করতে হবে। কোথায় কোথায় পাওয়া যাবে। এ তো সোজা কাজ! মনসুর কয়েকদিন ঘোরাফেরা করল মুম্বই শহরে। তার সঙ্গে ইকবাল। রিয়াজ ভাটকল ফোন করে জানতে চাইছে, কী খবর মনসুর?

রিয়াজ ভাই সব ঠিকঠাক। যা বলেছিলেন তা করেছি। নো প্রবলেম।

রিয়াজের প্রশ্ন, নো প্রবেলম মানে কী? কটা পেয়েছ?

অন্তত ১০ টা তো পেয়েছি।

কানেক্ট করেছ?

হ্যাঁ ভাইয়া। কানেক্ট করে দেখে নিয়েছি। টেস্ট মেল করেছি। সব ও কে। কানেক্ট করলে কীভাবে?

কেন? ইকবালের ল্যাপটপে। আমার ল্যাপটপে তো অফিসের পাসওয়ার্ড। ওপেন হয় না সব কানেকশনে।

তুম বিলকুল গাধা হো মনসুর.. মুঝে নেহি পাতা থা তুম ইতনি লাপরওয়া হো সকতে হো।

মনসুর ভ্যাবাচাকা খেয়ে গেল। মানে? হঠাৎ করে এত খেপে যাওয়ার কারণ কী? রিয়াজ বলল, মনসুর আমরা কি কোনো ভিডিও গেম ডাউনলোড করার খেলা খেলছি? আমরা কি কলেজ স্টুডেন্ট? যারা ফ্রি ওয়াই ফাই খুঁজে বেড়ায়? তুমহে সমঝনা হোগা হামারা কাম..রাগে গরগর করছে রিয়াজ।

মনসুর ভাবছে কিছু. একটা ভুল হচ্ছে। সে কোনোমতে বলল, হুয়া কেয়া হ্যায়?

রিয়াজ বলল, একদম নতুন ল্যাপটপ ইউজ করো। যেখানে কোনো আরো ডেটা নেই। এভাবে তো আমরা ধরা পড়ে যাব।

মনসুর পরদিনই মুম্বইয়ের ল্যামিংটন রোডে ২০ হাজার টাকা দিয়ে একটি একরের ল্যাপটপ কিনে নিয়ে এসে আবার সেই এলাকাগুলিতে ঘুরে কানেক্ট করে দেখে নিতে শুরু করল। কোথায় কোথায় পাওয়া গেল আনসিকিওরিড ওয়াই ফাই? কোলাবা, সিএসটি এলাকা, মাতুঙ্গা, খালসা কলেজ, চেম্বুর, আর নভি মুম্বইয়ের সানপাদা।

২০০৮ সালের ২১ লাই। ইকবালের ফ্ল্যাট অশোকা মিউজে একজোট হয়েছে চারজন ইকবাল, মনসুর, আসিফ এবং কী আশ্চর্য সেই বাসে থাকা ছেলেটা। নাম মুবিন। মনসুরের মুখ থেকে কথা বেরোচ্ছে না। কী ব্যাপার? তুমি এখানে? মুবিনও সম্পূর্ণ নিখুঁত অভিনয় করতে পারছে। সে চোখ কপালে তুলে বলল আরে মনসুর ভাইয়া! তুমি? মনসুরকে বলা হল এই মুবিন নামের ছেলেটি মাত্র কয়েকমাস হয়েছে গ্রুপে যোগ দিয়েছে। পুণেতে বাড়ি। মনসুরের সামান্য সন্দেহ হয়নি। সে বলল আরে আমাদের আগেরই পরিচয় আছে। হায়দরাবাদে তো…। একে অন্যকে তারা জড়িয়ে ধরল। এবার কাজ। খোলা হল নতুন ল্যাপটপ। লিখতে শুরু করল আসিফ। ড্রাফট মেইল। এক লাইন দু লাইন তিন লাইন চার লাইন করে করে প্রায় ১০ লাইন। এত বড় একটা মেল পাঠানোর দরকার আছে? আরও ছোট করা যায় না? আলোচনা করে ঠিক হল আর একটু ছোট করাই ভালো। তবে আসিফের বানানে প্রচুর ভুল । গ্রামারে ভুল। সেগুলো ঠিক করার দায়িত্ব মনসুরের। তার ইংলিশ সবথেকে তুখড়। সে ধরে ধরে বানান ও গ্রামারের ভুল সংশোধন করে ফাইনাল করল। তবে এটা ফাইনাল নয়। ফাইনাল করবে রিয়াজ। কাল ভোরে সে আসছে। শুধু এই মেল পড়তে। ফোনে শোনালেই তো হয়। মাথা খারাপ নাকি? ফোন ইন্টারসেপ্ট হয়ে গেলে? এখনই যে হচ্ছে না কে বলতে পারে? কিন্তু কেন এই মেল লেখা হচ্ছে? মনসুর তখনও জানে না। তবে মেলের যা ভাষা তা দেখে সে প্রবল উত্তেজিত। এই কাজ যদি হয় তাহলে এতদিনে একটা জবরদস্ত ব্যাপার হতে চলেছে। আর সে যুক্ত থাকছে পরোক্ষভাবে এই অপারেশনে। সাংঘাতিক ভালো লাগছে। পরদিন রিয়াজ ভাটকল এসে জানিয়ে দিয়ে গেল মেল ঠিক আছে। পিডিএফ ফরম্যাট করে সেভ করা হোক। ঠিক যখন সে গ্রিন সিগন্যাল দেবে তখনই যেন এই ই মেল বাছাই করা কিছু ঠিকানায় পাঠানো হয়। অতএব আপাতত অপেক্ষা। কবে আসবে সেই গ্রিন সিগন্যাল? অপারেশনটাই বা কী?

২৬ জুলাই মুম্বই চলে যাও। মেসেজ এল মনসুরের মোবাইলে। ভোরে যেতে হবে। তিনজন পুণে বাসস্ট্যান্ডে মিট করল। সেখানে একটি মারুতি এস্টিমে আগে থেকে ওই যে বসে আছে মুবিন। কিন্তু চালকের সঙ্গে মনসুরের পরিচয় নেই। কে? লোকটার নাম মহসিন চৌধুরি। তিনজন সেই মারুতি এস্টিমে চেপে পুণে থেকে রওনা হয়ে মুম্বই গেল। যেতে বলা হয়েছে নভি মুম্বই। সেদিন যে ই.মেল লেখা হয়েছে আজ সেটি সন্ধ্যা ৬টা ৪০ মিনিটে সেন্ট করতে হবে তিন চারটি ঠিকানায়। সেরকমই প্ল্যান। নভি মুম্বই পৌঁছে আগে দেখে নেওয়া হল সেই ওয়াই ফাই কানেকশন ঠিক আছে তো! হ্যাঁ…ঠিক আছে। নিশ্চিন্ত হওয়া গেল। এবার শুধু অপেক্ষা। আর একবার ই মেল খুলে দেখে নেওয়া হচ্ছে ঠিকঠাক আছে কিনা। কী লেখা আছে সেই ইমেলে?

“so wait ..await now.wait only for five minutes from now…wait for mujahidin and fidayeen and stop them if you can who will make you feel the terror of jihad….await for 5 minutes to feel the fear of death…” (অপেক্ষা করো..আর একটু অপেক্ষা…পাঁচ মিনিটের জন্য অপেক্ষা.. মুজাহিদিন আর ফিদাইনদের জন্য অপেক্ষা করতে থাকো সামান্য। আর পারলে তাদের ঠেকাও! যারা জিহাদের সন্ত্রাস কাকে বলে বুঝিয়ে দেবে..আর পাঁচ মিনিট অপেক্ষা করো মৃত্যুভয়ের অনুভূতির জন্য…)

আর একটি ইমেলে লেখা হয়েছে,

yes! we the terrorists of india THE INDIAN MUJAHIDIN..the militia whose each and every mujahid belongs to this very soil of india..have returned…”

মারুতি এস্টিম পার্ক করা হল গিনি টাওয়ারের কাছে। সন্ধ্যা ৬টা ৪০। এখনই পাঠাতে হবে। পাঠানো হল। ঠিক পাঁচ মিনিট। ৬টা ৪৫-এ আমেদাবাদের মণিনগরে মার্কেটের মধ্যে ধুম…ধুম…ধুম…তিনবার প্রবল শব্দের বিস্ফোরণ। তিন মিনিট পর আমেদাবাদের সারকেজ এলাকায় স্টেট ট্র্যান্সপোর্ট কর্পোরেশনের বাসে পরপর আবার দুটি বিস্ফোরণ। তৃতীয়বার বিস্ফোরণ ঘটল ১০ মিনিটের মধ্যে সঙ্গম থিয়েটারে। মণিনগর, ইশানপুর, নরোল সার্কল, বাপুনগর, হাটকেশ্বর, সারংপুর ব্রিজ, সারকেজ এবং ওদাও। ৭০ মিনিটের মধ্যে ২১টি বিস্ফোরণ। গোটা আমেদাবাদ জুড়ে ৫৬ জনের মৃত্যু। ২১০ জন আহত। কতটা নিখুঁত প্ল্যান ছিল? কতটা ভয়ংকর? একটি উদাহরণ দিলে বোঝা যাবে। প্রথম বিস্ফোরণগুলিতে আহতদের যখন হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে এবং ভর্তি প্রক্রিয়া চলছে, তখন দুটি বিস্ফোরণ ঘটেছিল সেই হাসপাতালের মধ্যেই। ভাবা যায়! আবার ইমেল পাঠানো হল খালসা কলেজের ওয়াই ফাই চুরি করে। বলা হল, দেখলে তো! পারলে আটকাতে! এরকম আরও হবে!

কয়েকটি সংবাদপত্র আর পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সের একটি মেলে পাঠানো হয়েছিল সেই দুটি মেল। আইপি অ্যাড্রেস খোঁজা শুরু। কোথা থেকে পাঠানো হয়েছে? নভি মুম্বইয়ের এক ওয়াই ফাই থেকে। কার নামে? কেন হেউড। এক আমেরিকান বৃদ্ধ। একাই থাকেন। গিনি টাওয়ারে থাকছিলেন। তার ডেটা কার্ডের ওয়াই ফাই। গ্রেপ্তার করা হল তাঁকে। তিনি হতভম্ব। কিছুই জানেন না। কীভাবে তাঁর ওয়াই ফাই অন্য কেউ কানেক্ট করেছে তাও জানেন না। আর এরকম ভয়াবহ এক সন্ত্রাসের চক্রে তিনি জড়িয়ে গেলেন এটাও এক চরম ধাক্কা ভারতে এসে। কিন্তু পুলিশ মানবে কেন? কেন হেউড কি সত্যি বলছেন? তাঁকে বসানো হল নারকো অ্যানালিসিন আর পলিগ্রাফ টেস্টের সামনে। সোজা কথা লাই ডিটেক্টর। দেখা গেল তাঁর আচরণ মোটেই অপরাধীদের মতো নয়। তাহলে কে পাঠাল?

যারা পাঠাল তারা ততক্ষণে আবার পুণে ফিরে গিয়েছে। মনসুর যথারীতি অফিসে। অন্যরাও। এখনও বলা হয়নি বাকিদের পূর্ণ পরিচয়। আসিফ বশিরুদ্দিন শেখ। কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার। মুবিন কাদের শেখ কম্পিউটার সায়েন্স গ্রাজুয়েট এবং সফটঅয়্যার ডেভলপার। সকলেই পুণের সফটঅয়্যার জগতের পরিচিত ব্রাইট কেরিয়ারের যুবক। এরা যে করতে পারে ভাবাই যায় না। সুতরাং কোনো চিন্তা নেই। কিন্তু গুজরাত পুলিশ তুখড় পালটা চাল দিল। যাকে বলা যায় মাস্টারস্ট্রোক। বিস্ফোরণের দু সপ্তাহ পর গ্রেপ্তার করা হল এক ব্যক্তিকে। নাম আবু বাশার। তাকে জেরা করে আরও এক যুবককে। এবং প্রকাশ্যে গুজরাত পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হল আমেদাবাদ ব্লাস্টের প্রাথমিক তদন্তেই সাফল্য এসেছে। আবু বাশার ঘটিয়েছে এই ভয়াবহ বিস্ফোরণ। এতদিনের নিখুঁত প্ল্যান, রীতিমতো আগেভাগে ঘোষণা করে ঘটনা ঘটানোর পরও এভাবে অন্য কেউ কৃতিত্ব নিয়ে যাবে? কে এই বাশার? এটা মেনে নেওয়া অসম্ভব। ছটফট করছে ইন্ডিয়ান মুজাহিদিনের গোটা টিম। অবশেষে প্ল্যান হল আবার দাবি করা হবে। অতএব ২৩ আগস্ট মনসুরের নিজের গাড়িতে চেপে ফের যাওয়া হল মুম্বই। মনসুরের ইমেল অ্যাকাউন্ট হল alarbi.alhindigmail.com। সেই মেল থেকে আবার পাঠানো হল সংশোধনী। আবু বাশার নামে কেউ আমেদাবাদের বিস্ফোরণ ঘটায়নি। ওই বিস্ফোরণের কৃতিত্ব একমাত্র ইন্ডিয়ান মুজাহিদিনের। এবার ব্যবহার করা হচ্ছে খালসা কলেজের ওয়াই ফাই কানেকশন। সন্ধ্যায়। এবং ততক্ষণে মুম্বই পুলিশের সাইবার সেল আগেভাগেই ফাঁদ পেতে রেখেছে। বিশেষ সাইবার ডিটেকশন ব্যবস্থা। এবং দেখা গেল লোকেশনও। চারদিনের মধ্যে ইকবাল ধরা পড়ে গেল। আর মাত্র চার ঘণ্টার জেরায় সে সব কবুল করে দিল সঙ্গে কে কে আছে। ধরা পড়ল মনসুর। ভারতীয় সন্ত্রাসের মানচিত্রে সফটঅয়্যার স্পেশালিস্ট জঙ্গি যুবক। যার কেরিয়ার হওয়া উচিত ছিল অনেক উজ্জ্বল। অথচ পথ বেঁকে গেল অন্যদিকে। তার গ্রেপ্তার হওয়া ইন্ডিয়ান মুজাহিদিনের কাছে বিরাট এক লোকসান। এরকম তুখড় সাইবার অ্যানালিস্ট আর কোথায় পাওয়া যাবে? এই শূন্যতা কি পূর্ণ হবে?

এই ভাবনার আড়ালে কিন্তু বেড়ে উঠছিল আর একটি রহস্যময় চরিত্র। কয়েক বছরের মধ্যে সন্ত্রাস সাম্রাজ্যে আচমকা এক প্রযুক্তি স্পেশালিষ্ট অন্ধকার ধ্রুবতারা ফুটে উঠল। সিরিয়া, লিবিয়া, ব্রিটেন, বেলজিয়াম, লেবানন, ইরাক, তুরস্ক, ভারত, বাংলাদেশ, পাকিস্তান, আফগানিস্তান…একের পর এক দেশের অসংখ্য হাজার হাজার জঙ্গি মনোভাবাপন্ন যুবক যাকে পথপ্রদর্শক হিসাবে মান্য করেছে। যার টুইটার অ্যাকাউন্টকে ফলো করে চলেছে অসংখ্য জঙ্গি হতে জিহাদে যোগ দিতে চাওয়া যুবক যুবতীর দল। কে এই লোকটি? ব্রিটেনের জিহাদি মনোভাবাপন্ন যুবকরা ইন্টারনেটে বসে ভাবতো এই লোকটি লিবিয়ার বাসিন্দা। লিবিয়ার জঙ্গিরা জেনেছিল তাদের এই গাইড আসলে ইয়েমেনের মানুষ। লেবাননের যুবকরা এই লোকটিকে ফলো করতে করতে ধরে নিয়েছিল ইরাকে থাকে এই বিশেষ টেকনোলজি এক্সপার্ট…। কিন্তু আসলে ছিল সে কোথাকার মানুষ? কারও কল্পনাতেও যা ছিল না। সে ছিল কলকাতার…। কে সে? এবার শুনব!

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *