ক্যান আই স্পিক টু মিস্টার কুমার প্লিজ!
স্পিকিং! বাট আই অ্যাম ইন আ মিটিং রাইট নাউ! উইল ইট বি পসিবল ফর ইউ টু কল মি লেটার?
মিস্টার কুমার দিস ইজ মেজর ?
মেজর? ও কে টেল মি! কলিং ফ্লম?
ইয়েস, ফ্রম দুবাই!
মেজর…দুবাই…দিল্লি পুলিশের স্পেশাল সেলের জয়েন্ট কমিশনার কুমার ভাবছেন কে এই মেজর? এবং কয়েক সেকেন্ড লাগল চিনতে। উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বলে উঠলেন, মেজর, হাউ আর ইউ স্যার..হোয়াট আ প্লেজান্ট সারপ্রাইজ! এনি অর্ডার ফর মি? হাসতে হাসতে বলছেন নীরজকুমার।
ফোনের ও প্রান্তে মেজরের কণ্ঠ কিন্তু সিরিয়াস। তিনি বলছেন, কুমার সাব একটা প্রবলেম নিয়ে ফোন করছি আপনাকে। কুমার বললেন, হ্যাঁ হ্যাঁ বলুন না! আমার পক্ষে কিছু হেল্প করা সম্ভব হলে অলওয়েজ অ্যাট ইওর সার্ভিস মেজর! মেজর এরপর যা জানালেন তা চমকে দেওয়ার মতো। দিল্লি পুলিশের স্পেশাল সেলের জয়েন্ট কমিশনার ভাবলেন এটা তো খড়ের গাদায় সুঁচ খোঁজার মতো এক অসাধ্য সাধন! এই কাজটি আদৌ করা সম্ভব? ২ এপ্রিল ২০০২। দুবাই পুলিশের ডিপার্টমেন্ট অফ ক্রিমিন্যাল ইনভেস্টিগেশনের পক্ষ থেকে তদন্তকারী শাখার প্রধান ওই মেজর দিল্লি পুলিশকে জানালেন, একটি ভারতীয় মেয়ে দুবাইতে এসে এক শেখকে বিবাহ করেছিল। প্রায় ৭ বছর আগে। সেই আরব শেখের নাম হামিদ কাবানজি। তাঁদের একটি সন্তানও হয়েছে। মেয়ে। নাম হিন্দ কাবানজি। এখন বয়স ৫ বছর। তবে কাবানজি শেখের এটা ছিল দ্বিতীয় বিবাহ। প্রথম স্ত্রীর সঙ্গে বিচ্ছেদ হয়ে যায় বছর দশেক আগেই। সেই প্রথম স্ত্রীর সন্তানের নাম মুনা আহমেদ। সেই থাকে কাবানজির সঙ্গেই। যখন কাবানজির সঙ্গে ওই বম্বে থেকে আসা ভারতীয় মেয়েটির বিবাহ হয়েছে তখন মুনা আহমেদের বয়স ১৩। অর্থাৎ সৎ মেয়ে আর নিজের মেয়ে আর স্বামীকে নিয়ে বসবাস ভারতীয় নারী রোশন আনসারির! যার নিজের বাড়ি মুম্বই। শেখ সাহেব নিজের অফিসে গিয়েছিলেন সেদিন। ফিরে এসে দেখেন স্ত্রী নেই। নেই তো নেই! ছোট বাচ্চাটাও নেই। কোথায় গেল? রাত হয়ে যাচ্ছে। কেউ ফিরছে না। পরদিন সকাল । কেউ ফেরেনি। কাবানজি সোজা দুবাই পুলিশকে জানালেন। তদন্তে এসে পুলিশ খুঁজে পেয়েছিল একটি ক্রু। চারটি কাগজের টুকরো। স্টোররুমের কাছে পড়ে আছে। কাবানজি স্টোররুমে যাননি। সারারাত স্ত্রী আর দুই মেয়ের জন্য অপেক্ষা করেছেন। ঘর থেকে বাইরে গিয়েছেন। আবার ঘরে এসেছেন। কিন্তু স্টোরের দিকে যাননি। পুলিশ এসে সেই কাগজপত্রের মধ্যেই পেল কয়েকটি কনট্যাক্ট নম্বর। সেই নম্বর ধরে এগোতেই একে একে তিনজনের সন্ধান পাওয়া গেল। তাদের মধ্যে একজন বাংলাদেশি। বাকি দুজন ইন্ডিয়ান। তিনজনকেই জেরা শুরু। আলাদা আলাদা।
এবং একসঙ্গে। দেখা গেল অসংখ্য অসঙ্গতি। ঘটনার দিন তারা কেন ওই শেখের বাড়িতে গিয়েছিল? কীভাবে ওই কাগজের টুকরো তাদের কারও একজনের মানিব্যাগ থেকে মাটিতে পড়ে গেল? এসব নিয়ে তিনজনের বয়ান পরস্পরের সঙ্গে মিলছে না। সন্দেহ বেড়ে গেল। ক্রমেই নিশ্চিত সন্দেহ হচ্ছে এরা কোনো গ্যাংয়ের হয়ে কাজ করে। আর শেখসাহেবের স্ত্রী রোশন আনসারি এবং দুই কন্যা হিন্দ ও মুনাকে নির্ঘাৎ কিডন্যাপ করা হয়েছে। কারা সেই কিডন্যাপার? কাদের অর্ডারে এই কাজ করা হয়েছে? দুবাই পুলিশের ইন্টারোগেশন সেলের কাজ করার ধরনটি আলাদা। হু হু সমুদ্রের বাতাস আসা সাদা রঙের অ্যাপার্টমেন্ট। চারতলা। তারই বেসমেন্ট হল সন্দেহভাজনদের রাখার সেল। তখনও কিন্তু অফিসিয়ালি অ্যারেস্ট দেখানো হয়নি। কারণ মুখ খোলেনি কেউ। বারংবার বলছে, ওই শেখের বাড়ি থেকে তাদের ফোন করা হয়েছিল। তারা কাজ করে যে ট্র্যান্সপোর্ট সংস্থায় সেখানে ফোন এসেছে। কিছু একটা বড় বাস নাকি লাগবে। সে বিষয়ে কথা বলার জন্য। বাস লাগবে? শেখ কাবানজি বুঝতে পারছেন না। কীসের জন্য বাস লাগবে? আর রোশন কেনই বা বাস চাইবে? তাঁদের তো তিনটে গাড়ি। একটা ক্যারাভান! তিনি তো কিছু জানেন না! সুতরাং দুবাই পুলিশ তখনও অন্ধকারে যে কীভাবে এদের থেকে জানা সম্ভব আদৌ সত্যি বলছে কিনা। সমস্যা হল ওরা যে ট্রান্সপোর্ট সংস্থার কথা বলছে সেখানে কিন্তু খোঁজ নিয়ে দেখা হয়েছে সত্যিই ফোন করা হয়েছিল। কিন্তু একসঙ্গে তিনজনকে পাঠানো হয়নি। পাঠানো হয়েছে দুজনকে। এই বাংলাদেশি কেন সেখানে গিয়েছে তারা ওই সংস্থা জানে না। চেনেও না। অর্থাৎ গোটা ব্যাপারটা ক্রমেই জটিল হচ্ছে। বাংলাদেশি নাগরিককে উপরে নিয়ে আসা হল। জায়গাটা একটা টেরেস। সামনেই সমুদ্র। খাঁড়ির মতো। তবে বড় বড় পাথর দেওয়া। একজন আরবকে কিছু একটা জিজ্ঞাসা করা হচ্ছে। দুই পুলিশ। আরবের ভাষাটা এখনও জানে না বাংলাদেশি লোকটি। তাই বুঝতে পারছে না কী কথাবার্তা হচ্ছে! আর তাকে এখানে কেন নিয়ে আসা হয়েছে? হঠাৎ আরব লোকটির দুটি কাঁধ ধরে কিছু একটা প্রশ্ন করা হল। সেই লোকটি মাথা নেড়ে যাচ্ছে অবিরত। এবং নিমেষের মধ্যে ঘটনাটা ঘটে গেল। লোকটিকে একটা জাস্ট ধাক্কা। সঙ্গে সঙ্গে লোকটা পিছনে পা ফসকে পড়ে গেল। নীচে। 1 মানে? সেই সমুদ্র খাঁড়িতে যে অসংখ্য পাথর রাখা আছে সেইসব পাথরের উপর পড়ছে লোকটি? তাহলে তো সাক্ষাৎ মৃত্যু! হ্যাঁ। তাই। লোকটি পড়ে গেল নীচে। অর্থাৎ মারাই গেল। চারতলার উপর থেকে। একটা আর্তচিৎকার! তারপর সব শেষ। বাংলাদেশি লোকটি আতঙ্কে বসে পড়ল মাটিতে। তাকে বলা হল ওই লোকটি চুরি করেছে একটা শপিং মল থেকে। সিসিটিভিতে দেখা যাচ্ছে। কিন্তু স্বীকার করছে না। অনেকবার বোঝানো হয়েছে। তা সত্ত্বেও। অনড়। তাই এছাড়া উপায় নেই। এটাই আমাদের নিয়ম। বিস্ফারিত নেত্রে বাংলাদেশি লোকটি তাকিয়ে। তার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে দুবাই পুলিশের তদন্তকারী অফিসার। তুমি কী করবে? বাংলাদেশি মাথা নাড়ল! অর্থাৎ সব বলবে। এবং নীচে তখনও বেসমেন্টে থাকা লোকদুটি জানতেই পারল না তাদের সঙ্গী সব কথা বলে দিচ্ছে। কী সেই কথা? যা শুনে দুবাই পুলিশের মতো ঠান্ডা মাথার শার্প অফিসাররা পর্যন্ত চমকে গেলেন? ওই বাংলাদেশির বয়ানে জানা যাচ্ছে, রোশন আনসারি অথবা তাঁর মেয়েদের কেউ কিডন্যাপ করেনি। সে নিজেই নিজের সৎ কন্যা ২০ বছরের মুনা আহমেদকে হত্যা করেছে। অদূরের এক ফ্ল্যাটে। সেখানেই মুনা আহমেদ থাকত। একা। হত্যা করে স্টোররুমের মেঝেতে পুঁতেও দিয়েছে। ওই পুঁতে ফেলার কাজটির জন্য সে ডেকে এনেছে নিজের এই পুরোনো চেনা সঙ্গীদের। যাদের দিয়েছে কয়েক লক্ষ ইন্ডিয়ান টাকা। স্টোররুমের একটা ডিভান রাখা ছিল পরিত্যক্ত। সেখানে। ডিভানের নীচের ভাগে পুঁতে ফেলার কাজটি করা হয়েছে। বাইরে থেকে বোঝা যাবে না। নিখুঁতভাবে সিমেন্ট দিয়ে প্লাস্টার। আর তার উপর দামি কার্পেট। যেটা আগে থেকেই ছিল। তারপর? রোশন আনসারি কোথায়?
রোশন আনসারি ভারতে পালিয়েছে গতকাল রাতেই। ছোট মেয়েকে নিয়ে। এয়ার ইন্ডিয়া ফ্লাইট নম্বর AI ৭০০। সব কথা শোনার পর দুবাই পুলিশ তিনজনকেই সেই বাড়ির বাইরে বের করে আনল। এবার পাঠানো হবে কোর্টে। গাড়িতে তোলা হল। গেট দিয়ে বেরনোর সময় বাংলাদেশি লোকটি নিজের চোখকেও বিশ্বাস করতে পারল না। কারণ গেটের অদূরে দাঁড়িয়ে আছে সেই আরব লোকটি। যাকে একটু আগেই চারতলা থেকে ঠেলে ফেলে দেওয়া হয়েছিল। সে বহাল তবিয়তে এই পুলিশদের সঙ্গেই গল্প করছে! কী ব্যাপার? ব্যাপার আর কিছুই নয়। ওই আরব লোকটিও আসলে তদন্তকারী টিমের সদস্য। বাংলাদেশি লোকটির মুখ খোলার জন্যই তাকে অপরাধী সাজিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের নাটক করা হয়েছিল। আর টেরেস থেকে ঠেলে ফেলে দেওয়া হলেও আদতে নীচে ছিল নেট। সেখানেই সে পড়েছে। সোজা কথায় বাংলাদেশিকে ভয় পাওয়ানোই ছিল লক্ষ্য। সেই লক্ষ্য পূরণ হয়েছে। প্ল্যানের কথাটা শোনার সঙ্গে সঙ্গে দুবাই পুলিশ ওই তিন হত্যার সহকারীকে নিয়ে দৌড়ল সেই অ্যাপার্টমেন্টে। এবং সত্যিই তাই! স্টোররুমের ডিভান সরিয়ে দেখা গেল সবেমাত্র করা সিমেন্টিং এখনও কাঁচাই। একটু খোঁচাতেই তীব্র গন্ধ। নাকে রুমাল চাপা দিল কেউ। কেউ বাইরে বেরিয়ে এসে বেসিনে বমি করে দিল। কারণ ক্ষতবিক্ষত মৃতদেহ ২০ বছরের মুনা আহমেদের। পচন ধরেছে। গলিত শব থেকে আসছে তীব্র গন্ধ। গলায় ছুরি দিয়ে নির্বিচারে মারা হয়েছে। হতভম্ব হয়ে গেলেন শেখ কাবানজি। রোশনের মতো শান্ত মেয়ে হয় না। ভারতীয় মেয়েটিকে তিনি বিবাহ করেছিলেন ওই নিপাট শান্ত স্বভাবের জন্যই। এবং সে গোটা সংসারের কাজ করে এসেছে। একাই সামলেছে সবকিছু। অবশ্যই একটা প্রধান সমস্যা ছিল। সেটা হল মুনা আহমেদ শুরু থেকেই এই নতুন সৎ মাকে মেনে নিতে পারেনি। সে বাবাকে বলেই দিয়েছিল এই মহিলার সঙ্গে থাকা সম্ভব নয়। তার মায়ের জায়গা আর কেউ নিক সে তা চায় না। আর ঠিক ওই কারণেই পাশের অ্যাপার্টমেন্টেই সে থাকতে শুরু করে আলাদা। কিন্তু তা সত্ত্বেও সৎ মা আর সৎ মেয়ের মধ্যে ঝগড়া তুমুল হয়েছে একাধিকবার। তাই বলে সেই ঝগড়ার এই পরিণতি! একটা ২০ বছরের মেয়েকে নির্মমভাবে হত্যা করে পালিয়ে গেল রোশন? এর বদলা চান শেখ! কিছুতেই যেন ওই মহিলাকে ছাড়া না হয়। তিনি প্রবল প্রতাপান্বিত এক বিজনেসম্যান। তাঁর কথা দুবাই প্রশাসনের কাছেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অতএব সব চাপ এসে পড়ল দুবাই পুলিশের উপর। বলা হল, যেভাবেই হোক ভারত থেকে ওই মহিলাকে ধরে আনতেই হবে। অ্যাট এনি কস্ট!
অতএব দুবাই পুলিশ দিল্লি স্পেশাল সেলে ফোন করে সাহায্য চায়। যেভাবেই হোক রোশন আনসারিকে খুঁজে দুবাইয়ে পাঠাতে হবে। কারণ হামিদ কাবানজি অনেক পাওয়ারফুল। সে যখন জেনেছে তাঁর ভারতীয় স্ত্রী এভাবে বড় মেয়েকে হত্যা করে পালিয়েছে সে সোজা সরকারের উচ্চস্তরে চাপ দিয়েছে। যেভাবেই হোক তিনি বিচার চান। আর সরকার থেকে তাই দুবাই পুলিশকে প্রচণ্ড প্রেশার দেওয়া হচ্ছে। এখন ভারতের উপরই ভরসা। দেখা যাক ভারত প্রতিদান দিতে পারে কিনা! প্রতিদান আবার কীসের? প্রতিদান হল ওই বছরের এই ঘটনার মাত্র দুমাস আগেই দুবাই পুলিশ মাত্র কয়েকদিনের মধ্যেই ভারতের এক দুর্ধর্ষ অপরাধীকে গ্রেপ্তার করে ভারতের হাতে তুলে দিয়েছিল। দিল্লি পুলিশ আর সিবিআই এর টিম এসে সেই লোকটিকে দুবাই থেকে ভারতে বিশেষ চার্টার্ড ফ্লাইটে ফিরিয়ে নিয়ে গিয়েছে। সেই দুই পুলিশ অফিসার দুবাই পুলিশকে বলে গিয়েছিলেন তাঁরা এই সাহায্যের কথা কখনও ভুলবেন না। যে কোনো মূল্যে যে কোনো সময় দুবাই পুলিশ সহায়তা চাইলে ভারতকে পাশে পাবে। কে ছিল সেই অপরাধী? যাকে হন্যে হয়ে ভারতের অন্তত চারটি শহরের পুলিশ দিনের পর দিন মাসের পর মাস খুঁজেছে? তাকেই দুবাই পুলিশ গ্রেপ্তার করে ভারতের হাতে তুলে দিয়েছে মাত্র দু মাস আগে। লোকটির নাম আফতাব আনসারি! কলকাতার আমেরিকান সেন্টারে হামলা থেকে খাদিম কর্তা অপহরণ। সবকিছুর সঙ্গে যুক্ত। আফতাব আনসারিকে ভারতে ফিরিয়ে দিয়েছে দুবাই। এবার সামান্য একজন আনপ্রফেশনাল নারী হত্যাকারীকে খুঁজে বের করতে পারবে না ভারত? সত্যিই ভারত পড়ে গেল প্রবল চাপে। কারণ এই কাজটি করে দিতে না পারলে দুবাইয়ের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক খারাপ হয়ে যাবে। ভবিষ্যতে কোনো সাহায্য পাওয়াও যাবে না। অতএব যেভাবেই হোক খুঁজে বের করতে হবে রোশন আনসারিকে! কোথায় সে? দুবাই পুলিশ ঠিকানা জানাল। ভারতে রোশন আনসারির বাড়ির ঠিকানা হল মারু মিয়া চাল, পাংখে শাহ বাবা দরগার কাছে, লালবাহাদুর শাস্ত্রী মার্গ, ঘাটকোপার (ওয়েস্ট), মুম্বই।
ফোন নম্বর আছে একটা। ৫০০২। রোশনের বাবা মা দাদা থাকেন। গোটা অপারেশনের দায়িত্বে কে থাকবে? সিবিআই এর মুম্বই ইকনমিক অফেন্স উইং এর ডিআইজি বীরেন্দ্র সিংকে বলা হল। বীরেন্দ্র তৎক্ষণাৎ নিজের একটা টিম তৈরি করে ফেললেন। টিম ইনচার্জ ডিএসপি ডি এস শুক্লা। প্রথমেই যেতে হবে রোশনের বাড়ি। অর্থাৎ যেখানে এখন তার পিতামাতা দাদারা থাকে। কিন্তু সিবিআই অফিসার হিসেবে গেলে তো লাভ নেই। গোপনে যেতে হবে। কারণ প্রাথমিকভাবে মনে হয় রোশন ওখানে থাকবে না। তার এটুকু বুদ্ধি আছে যে পুলিশ হানা দিলে সর্বাগ্রে বাপের বাড়িতেই টার্গেট করবে। তবু অপরাধের তদন্তের নিয়ম হল কোনো চান্সকেই অগ্রাহ্য করতে নেই। তাই ডিএসপি শুক্লা ভাবছেন কীভাবে ওই ঠিকানার বাড়িটার অন্দরে যাওয়া যায়। যদি এখানে নাও থাকে, নিশ্চয়ই ফোন করবে রোশন। আচমকা দুবাই থেকে পালিয়ে এসে কতদিন সে পালিয়ে পালিয়ে ঘুরবে? নিজের আত্মীয় পরিজনদের সঙ্গে কন্ট্যাক্ট তো রাখতেই হবে। এই চিন্তা মাথায় আসতে তৎক্ষণাৎ পাওয়া গেল সমাধান। টেলিফোন। লোকাল টেলিফোন এক্সচেঞ্জের এই এলাকার লাইনম্যানকে ধরা হল। সিবিআই? সে চমকে গেল। এসব ঝামেলায় সে পড়তে চায় না। কিন্তু একটু কড়কানিতেই লাভ হল। শুক্লাকে সঙ্গে নিতে রাজি সে। লোকটির সঙ্গে টেলিফোন এক্সচেঞ্জের লাইনম্যান সেজে শুক্লা ঢুকলেন সেই বাড়িতে। বলা হল টেলিফোন লাইন সারাতে আসা হয়েছে। রোশনের আম্মি বললেন, সারাতে কেন? আমাদের ফোন তো ঠিকই আছে। ওই লাইনম্যান বললেন, রিসিভারের স্পিকার চেঞ্জ করতে হবে। নতুন অর্ডার। পুরোনো সমস্ত স্পিকার রিপ্লেস করতে হবে। হতেই পারে। তাই কেউ সন্দেহ করছে না। অত্যন্ত সন্তর্পণে ল্যান্ডলাইনের ফোনের রিসিভার খুলে একটা গোপন যন্ত্র লাগিয়ে দেওয়া হল। যেটি আসলে মনিটরিং ডিভাইস। এক্সচেঞ্জে বসে জানা যাবে এখান থেকে কোথায় ফোন করা হচ্ছে। আর বাইরে থেকে কারা ফান করছে এই নম্বরে। সুতরাং প্রাথমিক কাজ সফল। এবার অপেক্ষা করা কখন ফোন করে রোশন।
একদিন..দুদিন….তিনদিন…রোশন ফোন করেনি। এমনকী অন্য কোনো ফোন নম্বরেও কথা বলার সময় রোশন সম্পর্কে কোনো শব্দই উচ্চারিত হচ্ছে না। অপেক্ষা করছেন সিবিআই অফিসাররা। কোনো একটি ব্রেক থ্রুর আশায় বসে আছেন। এদিকে দুবাইতে ততক্ষণে আরও উত্তাপ ছড়াচ্ছে। কারণ আগেই বলা হয়েছে শেখ কাবানজি প্রচণ্ড প্রভাবশালী এক ব্যবসায়ী। তিনি প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্তাদের দিয়ে দুবাই পুলিশকে চাপ দিচ্ছেন । এখনও কেন তাঁর মেয়ের হত্যাকারী ধরা পড়ল না। তাঁকে বলা হল ভারতীয় পুলিশ প্রাণপণে চেষ্টা চালাচ্ছে। এখনও রোশনের সন্ধান পাওয়া যায়নি। সে কোথায় গিয়েছে বা যেতে পারে তার হদিশ মিলছে না। আপনি অপেক্ষা করুন। ইন্ডিয়ান পুলিশ পারবেই খুঁজে বের করতে। শেখ কাবানজি ফিরে এলেন নিজের বাড়ি। এবং এসেই তাঁর মনে হল একবার রোশনের নিজের আলমারিতে তল্লাশি চালিয়ে দেখা যাক কোনো ক্রু মেলে কিনা। কোনো চিঠি, কোনো লিংক। সত্যিই পাওয়া গেল। একটি ডায়েরি। সেখানে পাঁচটি হাতে লেখা ঠিকানা। মুম্বই, দিল্লি, আজমের। আর দুটি ঠিকানা ব্যাঙ্গালোর। আর একঝাঁক ফোন নম্বর। যার মধ্যে বড় অংশই দুবাই, শারজার। তৎক্ষণাৎ আবার দুবাই পুলিশের ক্রিমিন্যাল ইনভেস্টিগেশন হেডকোয়ার্টার্সে ছুটলেন শেখ। সেই ডায়েরি পেয়ে তার স্ক্যান কপি পাঠানো হল মুম্বইয়ে সিবিআই দপ্তরে। আর ইতিমধ্যেই দুবাই পুলিশ দুবাইতে রোশনের যেসব বন্ধু ছিল সেইসব পরিচিতদের ফোন ট্যাপ করতে শুরু করে দিয়েছে। মুম্বই সিবিআই ব্যাঙ্গালোরে ফোন করছে। ওখানে সিবিআই শাখার সুপারিনটেন্ডেন্ট অফ পুলিশ হলেন প্রতাপ রেড্ডি।
রেড্ডি, একটা ঠিকানা লেখো, বললেন ডিআইজি বীরেন্দ্র।
ইয়েস স্যার।
ইজ দ্যাট ওকে?
ইয়েস স্যার।
ওখানে এই দুটো ঠিকানাকে অ্যাপ্রিহেন্ড করতে হবে রেড্ডি।
রেড্ডি চুপ।
কী হল? এনি প্রবলেম?
ইয়েস স্যার।
কী প্রবলেম? বিস্মিত ডিআইজি বীরেন্দ্র।
স্যার ওই জায়গা সাংঘাতিক সেনসিটিভ। ওখানে রেইড করতে গিয়ে বহুবার পুলিশের গাড়ি পুড়েছে। ক্রিমিন্যাল ডেন। লোকাল পুলিশকে ইনভলভ করতে হবে।
বীরেন্দ্র ভাবছেন। লোকাল পুলিশকে সর্বদা যে কোনো অভিযানে ইনভলভ করতে রাজি হয় না সিবিআই। কারণ অনেক। প্রথমত লোকাল পুলিশ মনেপ্রাণে পছন্দ করে না যে তার এলাকা থেকে অপরাধীকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যাচ্ছে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা। আর তারা কিছুই জানতে পারেনি এই অপরাধীর লুকিয়ে থাকা, এটা ব্যর্থতা। তাই তারা সর্বদাই নানারকম প্রটোকলের ঝামেলা উত্থাপন করে। শেষে এসব করতে গিয়ে অভিযানটাই ব্যর্থ হয়।
বীরেন্দ্র বললেন, ওকে। রেড্ডি একটা কাজ করো। শুধু ঠিকানাটা কনফার্ম করো। বলেন। এবারও তাই বললেন, ইয়েস স্যার।
রেড্ডি কম কথা বলেন, এবারও তাই বললেন ইয়েস স্যার।
দুবাই পুলিশ সক্রিয়। তারা যে ফোন ট্যাপিং করে রেখেছে ওই দেশে থাকা রোশনের বন্ধু বান্ধবীদের, তারই একটি নম্বর থেকে ব্যাঙ্গালোরে ফোন এসেছে। শোনা গেল এক মহিলা আর এক মহিলার সঙ্গে কথা বলছে। দুবাই থেকে ব্যাঙ্গালোর। ব্যাঙ্গালোরের মহিলার নাম সায়রা। রেকর্ড করার পর সেই কণ্ঠস্বর শোনানো হয়েছে শেখ কাবানজিকে। তিনি বললেন, সায়রা নয়, এটাই রোশনের ভয়েস! অর্থাৎ রোশন আনসারি ব্যাঙ্গালোরেই রয়েছে? দুবাই পুলিশ জানিয়ে দিল ইন্ডিয়াকে। আর বলল, এরপরও তোমরা ধরতে পারবে না? এটা শ্লেষ ছিল। দিল্লি পুলিশ চুপ করে রয়েছে। এবার জাল গোটানোর পালা। তবে সাবধান থাকতে হবে। কিন্তু ফাইনাল অপারেশনের আগে অনেক কিছু ভাবনাচিন্তার আছে। তাই চিন্তিত বীরেন্দ্র। লোকাল পুলিশকে বলতেই হবে। কিন্তু তার আগে আর একটা কাজ করা দরকার। সেটা হল যদি রোশন আনসারি নামক মহিলাকে সত্যিই ধরা যায় তাকে দুবাইতে ফেরত পাঠানো হবে কীভাবে? এজন্য দরকার ডিপোরশন অর্ডার। অর্থাৎ প্রত্যর্পণ নির্দেশ সংবলিত একটি সরকারি অর্ডার। যে কোনো ভারতীয় নাগরিককে গ্রেপ্তার করে অন্য দেশে পাঠানো যায় না। একটা নিয়ম আছে। আর সেই অর্ডার আজকালের মধ্যেই করতে হবে। কারণ ততক্ষণে নিশ্চিত যে ব্যাঙ্গালোরে আছে রোশন। ২০ দিন কেটে গেল। এখনও সন্ধান নেই। দুবাই পুলিশ, দুবাই সরকার চাপ বাড়াচ্ছে। সবথেকে লজ্জার কথা হল দুবাই পুলিশের ডিরেক্টর ক্রিমিন্যাল ইনভেস্টিগেশন এটাও মনে করিয়ে দিলেন আমরা কিন্তু মাত্র দুদিনের মধ্যে আফতাব আনসারিকে গ্রেপ্তার করে আপনাদের হাতে তুলে দিয়েছিলাম। সে ছিল মারাত্মক আন্তর্জাতিক মাফিয়া। আর আপনারা একটা সাধারণ হাউসওয়াইফকে ধরতে পারছেন না? দিল্লি পুলিশ, সিবিআই সকলেই এই বার্তা পেয়ে চুপ করে রয়েছে। কারণ কথাটা সত্যি।
সব আয়োজন সম্পূর্ণ। ঠিকানা জানা আছে। লোকাল পুলিশকে সঙ্গে নেওয়া হল। কারণ জায়গাটা গলির গলি তস্য গলি। দিল্লি পুলিশের সঙ্গে সিবিআই। একইসঙ্গে রয়েছে ব্যাঙ্গালোর পুলিশ। একটি ৩৫ বছরের মহিলাকে যার সঙ্গে আবার পাঁচ বছরের বাচ্চাও রয়েছে, পাকড়াও করার জন্য নাজেহাল এই বিরাট বাহিনী। বাড়িটা দোতলা। একতলায় থাকে সায়রা। আসলে সায়রাই রোশন। ডোরবেল বাজানো হল। বাইরে পজিশন নিয়ে আছে ব্যাঙ্গালোর পুলিশ। ভিতরে সাদা পোশাকে সিবিআই আর দিল্লি পুলিশ। একটু সময় লাগছে দরজা খুলতে। কিন্তু খুলল। মহিলাটি দাঁড়িয়ে। না রোশন নয়। অন্য কেউ। রোশন কোথায়? মহিলাটি বললেন, রোশন? সে কে? ডিএসপি শুক্লা আই কার্ড বের করলেন।
বললেন, কোনো এক্সট্রা চালাকি করবেন না। রোশনকে ডেকে দিন।
সায়রা এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল, ঘরে আর কেউ নেই। আপনারা ঢুকে চেক করে আসুন।
পুলিশ বাহিনী থমকে গেল। ভাবল, হতে পারে রোশন বাইরে কোথাও গেছে। তাই বলা হল, আমরা কিন্তু অপেক্ষা করব। আপনার নাম কী? মহিলার উত্তর, আমি সায়রা! আপনি সায়রা? আপনিই ফোন করেছিলেন দুবাই? হ্যাঁ। কেন? কে থাকে? আমার স্বামীই তো থাকে ওখানে। ফোন করা অন্যায় নাকি?
ডিএসপি শুক্লা এবার ভাবতে শুরু করেছেন সম্ভবত অপারেশন ফেইল করছে। কারণ বোঝাই যাচ্ছে পাখি এখানে নেই। তা না হলে এই মহিলা এতটা স্মার্টলি আর কনফিডেন্স নিয়ে কথা বলতে পারতেন না।
তবু সাবধানের মার নেই। সেদিন সারারাত দুজন পুলিশকে মোতায়েন করা হল। কিন্তু কোনো লাভই হল না। কারণ সায়রা একাই থাকে এই বাড়িতে। রোশন নেই। হতাশ গোটা বাহিনী ফিরে এল। একটা সামান্য গৃহবধূ এতটা জেরবার করে দিচ্ছে এত বড় একটা ভারতীয় নিরাপত্তা এজেন্সিকে? আশ্চর্য! ডি আই জি বীরেন্দ্রর কাছে ক্রমেই প্রেস্টিজ ফাইট হয়ে দাঁড়াচ্ছে। পুলিশ যখন হাতড়ে বেড়াচ্ছে ব্লু, ঠিক তখন একটি ফোন এসেছে ঘাটকোপারে রোশনের বাবার কাছে। একটি মহিলা কণ্ঠ। আগে থেকেই সেই ফোনটি ট্যাপ করা। তাই কন্ট্রোলরুমে বসে শোনা গেল, মামুজান, সায়রা বলছি। রোশন আপাকে খুঁজতে পুলিশ এসেছিল। আল্লা কা শুকর হ্যায় কী রোশন আপা পহেলেই ইহাসে যা চুকি। আপকো অগর ফোন করে তো বাতা দে না ব্যাঙ্গালোর না আয়ে!
কন্ট্রোল রুমে বসে সবই শুনল মুম্বই পুলিশ। এবং জানা গেল ব্যাঙ্গালোরে হানা দিতে দেরি হয়েছে। এবার কী উপায়! যে নম্বর থেকে সায়রা কল করেছে সেটা কিন্তু নিজের বাড়ি নয়। ব্যাঙ্গালোর বি এস এন এল জানাল ওই নম্বর তাজউদ্দিন মেহমুদের। যে আসলে রোশনের মামা। কীভাবে জানা গেল? কারণ ওই নম্বরটি মনিটর করা শুরু হল। এবং দুদিনের মধ্যে একটি মোবাইল থেকে ফোন। এবার স্বয়ং রোশন। কোনো সন্দেহ নেই। কারণ ফোন কানে নিয়েই মামা বললেন তুই কোথায়? রোশন বলল, আমি গোয়ায়। চিন্তা নেই। মামা আরও বেশি চিন্তিত। বললেন, শোন। বম্বে আর দিল্লির পুলিশ সব জেনে গিয়েছে। তোর পিছনে ছুটছে। কী করবি? রোশন কিছুক্ষণ চুপ। তারপর বলল, দেখছি কী করা যায়। ব্যস! পুলিশ শুনল। তার মানে গোয়া? সিবিআইকে খবর দেওয়া হল। আর দেরি করা যাবে না। তৎক্ষণাৎ গোয়া পুলিশকে বলা হল ওই সিমকার্ডের লোকেশন ট্র্যাক করতে। সেই ২০০২ সালে এত আধুনিক প্রযুক্তি ছিলও না। তাই সার্ভিস প্রোভাইডারকে বলা হলেও কাজটা করতে অনেকটা সময় লাগত। আজকাল তো নিমেষে মোবাইল ট্র্যাক করা যায়। তখন তা ছিল না। রাতারাতি মুম্বই থেকে সিবিআই টিম এল। গোয়া কোলাবা পুলিশ স্টেশনের গায়েই কন্ট্রোল রুম। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে জানা হয়ে গেল জায়গাটা কোথায়। সাউথ গোয়ায়। আমরা যাচ্ছি। ফোনে গোয়া পুলিশের ডিআইজি সুরেশ সাওয়ান্তকে বললেন বীরেন্দ্র। কিন্তু আপনারা তার আগে বেরিয়ে যান। আমি ফ্যাক্স করছি অ্যারেস্ট ওয়ারেন্ট। সাওয়ান্ত পরের মুহূর্তেই পেয়ে গেলেন ফ্যাক্স। আর টিমকে বললেন, প্রসিড বয়েজ! তিনটি গাড়ি ছুটে চলল। কিন্তু এবারও হতাশ হতে হয়েছে। সাউথ গোয়ার যে হোটেলে রোশন ছিল সেখান থেকে রোশন সেদিন ভোরেই বেরিয়ে গিয়েছে। রোশন ফোন করছে মুম্বই। রোশন ফোন করছে দুবাই। রোশন ফোন করছে দিল্লি। যখনই ফোন করছে তার সিম কার্ড ট্র্যাক করে দেখা যাচ্ছে সেটা অন্য এক নম্বর। অন্য এক সিম কার্ড। আর অন্য কোনো শহর। আজ গোয়া। কাল হায়দরাবাদ। পরশু আমেদাবাদ। তারপর নাসিক। একটি মহিলা গোটা সিবিআই থেকে দিল্লি পুলিশকে ঘোল খাইয়ে দিচ্ছে। কারণ সে যে কোনো শহরে নেমেই প্রথমে একটা নতুন সিম কার্ড নিচ্ছে। তারপর হোটেলে ঢুকছে। দুদিনের বেশি থাকছে না। আর সিবিআইয়ের পক্ষে ওই সিম কার্ড লোকেট করে সঠিক লোকেশন জানার জন্য অন্তত ৪৮ ঘন্টাই লাগছে। যেই স্থানীয় পুলিশকে ওই লোকেশনে যেতে বলা হচ্ছে প্রতিবার দেখা যাচ্ছে পুলিশ পৌঁছনোর আগেই রোশন উধাও। এবং একই কাহিনি হোটেলের রিসেপশনিস্ট বলছে একটা বাচ্চা কোলে মহিলা। সারাদিনে বেশি বাইরে বেরোয় না। দুবার বেরোয়। কোথায় জানি না। এই তো আপনারা আসার আগে আজ ভোরে কিংবা গতকাল রাতে চলে গেল চেক আউট করে। এ যেন সত্যিকারের চোরপুলিশ খেলা চলছে।
এবং অবশেষে সুযোগ এসেছে। সেই মামার কাছে ফোন এল। কল করছে রোশন। তার টাকা ফুরিয়ে আসছে। আর সে পালাতে পারছে না। আর কত পালানো সম্ভব? কতদিন ধরে পালানো সম্ভব? হাউ হাউ করে কেঁদে ফেলেছে রোশন আনসারি। তার মামা কোনো সান্ত্বনা দিতে পারলেন না। শুধু বললেন, ফিরে আয়। আর কতদিন পালাবি? পরদিন সকালেই মামার কাছে আবার ফোন। রোশন জানাল সে মুম্বই এসেছে। মামা বললেন, একটা কাজ কর। ভাসি ব্রিজের কাছে আয়। বাড়িতে গেলেই পুলিশ ধরবে। আশেপাশেই ওত পেতে আছে পুলিশ। সাবধান। রোশন আর তার মামা জানতেই পারছে না গোটা কথোপকথন সিবিআই আর মুম্বই পুলিশ শুনছে। সবটা শুনেছে পুলিশ। ডিএসপি শুক্লা নিজেকেই যেন বললেন, এতদিন পর বেটি বাইরে থেকে আসছে। তাই আর কেউ দেখা করুক না করুক। রোশনের মা অবশ্যই দেখা করতে যাবে একবার অন্তত মেয়ের কাছে। তাহলেই জানা যাবে ভাসি এলাকার কোথায় আছে রোশন এখন। অভিজ্ঞ শুক্লার কথায় সামান্য ভুল হয়নি। সিবিআইয়ের একটি টিম ঘাটকোপারে রোশনের বাড়ির সামনে দুদিন ধরে নজরদারি চালাচ্ছিল। দ্বিতীয় দিনে তারা দেখতে পেল বোরখায় ঢাকা রোশনের মা বেরিয়েছে বাড়ি থেকে। যাচ্ছে স্টেশনের দিকে। পিছু নিল তারা। এবার নিশ্চয়ই ট্রেনে উঠবে। হ্যাঁ। তাই হল। বোরখা পরা মহিলা রোশনের মা ট্রেনে উঠলেন লেডিজ কম্পার্টমেন্টে। পুলিশ টিম সোজা পাশের কামরায়। দরজায় দাঁড়িয়ে। কিন্তু একী !! মহিলা পরের স্টেশনেই যে নেমে যাচ্ছে? এখানে কোথায় যাবে? তৎক্ষণাৎ পুলিশ টিমও নেমে গেল। ফলো করা হচ্ছে মহিলাকে। স্টেশন থেকে বেরিয়ে একটা শপিং মার্কেটে। সেখানে ঢুকলেন তিনি। এবং জামাকাপড় দেখা শুরু। অর্থাৎ মেয়ের সঙ্গে দেখা করার আগে কিছু কেনাকাটা করবেন। প্রায় এক ঘন্টা কাটল। সামান্য কিছু কেনাকাটা করলেন মহিলা। লস্যি খেলেন। এবং এবার ফিরছেন। ততক্ষণে দু ঘণ্টা। এবার নিশ্চয়ই আবার ভাসির ট্রেন। সেইমতো আগেভাগেই স্টেশনে পৌঁছে গেলেন পুলিশ কর্মীরা। কিন্তু একী ! মহিলা তো আবার ডাউন ট্রেন ধরতে যাচ্ছেন! এটা কী হল? তার মানে মেয়ের সঙ্গে দেখা করবে না? আর ঘাটকোপারের বাসিন্দা এতদূর এসে সামান্য জামাকাপড় কিনবে কেন? ব্যাপারটা অদ্ভুত। আসলে কিছুই অদ্ভুত না। পুলিশ জানতেই পারল না এই মহিলা মোটেই রোশনের মা নয়। এটা হল সেই ব্যাঙ্গালোরের সায়রা। যে আসলে রোশনের এক বোন। সে গোপনে মুম্বই চলে এসেছে। এবং প্রথম থেকেই তারা জানে পুলিশ বাড়িতে নজরদারি করছে। রোশনের মা বাড়ি থেকে বেরোলে যে পুলিশ পিছু নেবে তাও জানা কথা। তাই সায়রা ইচ্ছা করে বেরিয়ে এসেছিল। পুলিশকে বাড়ির সামনে থেকে সরিয়ে আনতে। পুলিশকর্মীরা তাকে ফলো করার জন্য বাড়ির সামনে থেকে সরে এসেছে। এবং ২ ঘন্টার বেশি ঘোরাঘুরি করাও সমাপ্ত। এতক্ষণে গোপনে ঘাটকোপারে এসে নিজের বাড়িতেই বাবা মায়ের সঙ্গে দেখা করে গিয়েছে রোশন! গোটাটাই রোশনের প্ল্যান! পুলিশ জানতেই পারল না। তারা অযথা বাড়ির সামনে থেকে চলে এসে সায়রার পিছনে ফলো করে গেল। এতটা ধোঁকা খেতে হবে পুলিশ কর্মীরা ভাবেননি। তাঁরা যখন হাঁফাতে হাঁফাতে আবার ঘাটকোপারে রোশনের বাড়ির সামনে এসে হাজির হলেন ততক্ষণে রোশন বাবা মায়ের সঙ্গে দেখা করে আবার উধাও!
২ মে। ২০০২। রোশন নিজের ১৫ বছর বয়সি ভাইকে ফোন করেছে। ভাইয়ের মোবাইল ফোন। কিন্তু রোশন ফোন করছে একটি ল্যান্ডলাইন থেকে। নম্বর ট্র্যাক করে দেখা গেল সেটা আসলে একটা পাবলিক বুথ। কোথায়? মুন্ত্রা। জায়গাটা ঘিঞ্জি। লাইন দিয়ে কলোনি। আবার একইসঙ্গে রয়েছে পয়সাওগালা লোকের অট্টালিকাও। পাবলিক বুথটা কোথায়? তার জন্য যেতে হবে টেলিকম অফিসে। কোন এলাকা? মুন্ত্রা? ওখানে লাইনম্যান তো হরি সিং। ডিভিশনাল ম্যানেজার ফাইল চেয়ে পাঠালেন। দেখা গেল আইসক্রিম কারখানার পাশের ক্রসিংয়ে পাবলিক বুথ। চারের বি লাজপত কলোনি। সোজা যাওয়া হল সেখানে। আশ্চর্য! ফাইলে লেখা আছে লাজপত কলোনির এই ঠিকানায় পাবলিক বুথ আছে। আর গিয়ে দেখা যাচ্ছে কোথায় বুথ? কোনো পাবলিক বুথই নেই! এটা কীভাবে হয়? পাশেই পান সিগারেটের দোকান। জানতে চাওয়া হল। তারা বলল এখানে কোনো বুথ নেই। তোমরা কোথায় যাও? আমরা তো ফোন করতে রেললাইনের ওপারে যাই। আবার ফিরে এলেন এ আর রাউত। অ্যাসিস্ট্যান্ট সাব ইনস্পেক্টর সিবিআই। মুম্বইয়ের গলিঘুঁজি নখদর্পণে। তাই তাঁকেই পাঠানো হয় এসব কেসে। ব্যাপার কী? তিনি ফিরে এলেন। এবার ডিভিশনাল ম্যানেজার অবাক! ওখানে ফোনবুথ নেই? তা কীভাবে হয়? ডেকে পাঠানো হল হরি সিংকে। লাইনম্যান। তাঁকে দুচারটে কথা জিজ্ঞাসা করার সঙ্গে সঙ্গে কেঁদে ফেলল। পা জড়িয়ে ধরেছে টেলিকম অফিসারের। পা ছাড়ছে না। কান্নাও থামছে না। আশ্চর্য! কী ব্যাপার! অনেক পর জানা গেল হরি সিং ওস্তাদ টাইপের লোক! এই টেলিফোন বুথ বসানোর অর্ডার নিয়েও সে টাকা কামানোর ধান্দা আবিষ্কার করে ফেলেছে। ওই ২০০২ সালে মোবাইলের এত রমরমা ছিল না। তখনও পাবলিক বুথই সম্বল পথচলতি ফোনের জন্য। তাই প্রতিটি মহল্লায় পাবলিক বুথের খুব চাহিদা। কোনো একটি লোকালিটিতে পাবলিক বুথ বসানোর অর্ডার হয়তো বেরিয়েছে। হরি সিংকে টাকা দিয়ে অন্য এলাকার কিছু ব্যবসায়ী বা পাড়ার লোকজন নিজেদের পাড়ায় বসিয়ে দিতে বলত। টাকা পেয়ে হরি সিং তাইই করত। ওইসব ছোটখাটো কোনো ব্যাপার পরিদর্শন করতেও অফিসার লেভেলের কেউ আসত না। অতএব এভাবেই হরি সিং দিনের পর দিন লাজপত কলোনির নামে বরাদ্দ হওয়া ফোনবুথ বসিয়ে দিয়ে গিয়েছে হয়তো তিলক মার্গে। শিবাজি মহল্লার নামে ইস্যু হওয়া টেলিফোন বুথ মীরাবাঈ চবুতরায় লাগানো হয়েছে। সেরকমই ওই মুম্ভ্রার ঠিকানায় বরাদ্দ হলেও হরি সিং ওই নম্বরের বুথটি বসিয়েছে আসলে অন্যত্র। এই যে জানাজানি হয়ে গেল এবার তো সাসপেন্ড হতেই হবে। তাই কাঁদছে সে। বোঝা গেল ভারতের দুর্নীতিটা কত রঙবেরঙ পথে হাঁটে। স্রেফ ফোনের ঠিকানা বদলে টাকা কামাচ্ছে এরকম কতশত হরি সিং।
কিন্তু এবার আসল বুথের জায়গাটা দেখিয়ে দিল হরি সিং। এ আর রাউত দেখে নিল জায়গাটা। আর সেদিন থেকে বুথের কাছেই তাঁর স্থায়ী ডিউটি হয়ে গেল। রোশনের ছবি তাঁকে দেখানো হয়েছে। একদিন…দুদিন….তিনদিন…। সারাদিন দাঁড়িয়ে রাউত। রাত সাড়ে ১০টা পর্যন্ত তিনি ঠায় দাঁড়িয়ে, ঘুরে বসে চা খেয়ে অপেক্ষা করছেন। কখন রোশন আসবে অসংখ্য লোক মহিলা ফোন করতে আসছে। ফোন করছে। চলে যাচ্ছে। কিন্তু তীক্ষ্ণ চোখে নজর করেও রাউত বুঝতে পারছে রোশন নয়। তাহলে? অবশেষে। ৬ মে। বোরখা পরা একটা মহিলা এগিয়ে আসছে। হাইট দেখে মনে হল রোশন হতেও পারে। সন্ধ্যা হচ্ছে। অন্ধকার আসছে। আলো আঁধারি। যেই মহিলা এস্ত পায়ে এগিয়ে আসছে এ আর রাউত এগিয়ে গেলেন। হ্যাঁ। মহিলা পাবলিক বুথের সামনে যাচ্ছে। ইতিমধ্যেই কিছু লাইন পড়েছে বুথের সামনে। যারা ফোন করবে। পয়সা ফেলে ফোন করতে হয়। দ্রুত সরে এলেন এএসআই রাউত। যাতে মেয়েটির ঠিক পিছনে দাঁড়াতে পারেন। মেয়েটি লাইনে। পিছনেই রাউত। অন্যমনস্কভাবে। কিন্তু এখনও মেয়েটির বোরখা পরা। তাই এখনও সংশয়। এবার মেয়েটির পালা এল। বুথের সামনে গিয়ে আশেপাশে একবার তাকিয়ে বোরখাটা তুলে ফেলে ডায়াল শুরু করল মেয়েটি। ওই আলো আঁধারিতেই চকিতে দেখে রাউত বুঝে গেল অবশেষে!! এটাই রোশন! কিন্তু রাউত কোনো শব্দই করলেন না। কোনো উত্তেজনা নয়। মেয়েটি ফোন করে চলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এবার পিছু নিলেন। উত্তেজনায় হাত পা কাঁপছে। কারণ অনেকদিন ধরে রোশন গোটা নিরাপত্তা বাহিনীকে বোকা বানিয়ে পালাচ্ছে। আরও একবার ভুল হলেই সে আবার পালাবে। তাই এবার চরম সতর্কতা নিতে হবে। রোশন একটি গলির মধ্যে ঢুকল। দ্বিতীয় বাড়ি। নোট করে নিলেন রাউত। এবং তৎক্ষণাৎ ফোন করলেন মোবাইল বের করে। ডিএসপি শুক্লাকে। স্যার…মিল গয়া চিড়িয়া!
সিবিআই এর ডিআইজি বীরেন্দ্র তখন পরিবারকে নিয়ে দক্ষিণ মুম্বইয়ের একটা বিখ্যাত রেস্তোরাঁয় ডিনার খাচ্ছেন। সবেমাত্র সার্ভ করেছে স্টার্টার। মেন কোর্স আসছে এরপর। ইটিং জয়েন্টের নাম খাইবার! দক্ষিণ মুম্বইয়ের কালা ঘোড়া এলাকা। ঠিক তখন মোবাইল ফোন বাজল। ডিএসপি শুক্লা। স্যার রোশনকে পাওয়া গিয়েছে।
বীরেন্দ্র বিষম খেলেন। পাওয়া গিয়েছে? অবশেষে? কিন্তু আগেও অনেকবার পাওয়া গিয়েছে। তাই এত আনন্দিত হওয়ার কিছু নেই। বীরেন্দ্র বললেন আমি আসছি। পরিবারকে হতবুদ্ধি করে বীরেন্দ্র বললেন, তোমরা খাও! আমায় যেতে হবে। এক দৌড়ে বেরোলেন। ড্রাইভারকে বললেন, দের বাড়ি পৌঁছে দিও। তিনি একটা চলন্ত ট্যাক্সিকে হাত দেখিয়ে প্রায় জাম্প করে উঠে পড়লেন দরজা খুলে। শুক্লাকে বললেন, ওখানেই থাক। আসছি। লোকাল পুলিশকে খবর দাও।
বাইরেটা অন্ধকার আজ। আলো জ্বলছে না কেন? ভাবছে রোশন। নিশ্চয়ই আবার কেউ ঢিল মেরে বাল্ব ভেঙেছে। সাবধানে থাকতে হবে। নিশ্চয়ই চোর আসবে আজ মহল্লায়। রাত ১১ টা ৪০। একটা কালো ছায়া জানালায় পড়ল না? মেয়ে ঘুমিয়েছে। রোশন শ্বাস বন্ধ করে আছে। কে বাইরে? চকিতে একটা বুটের শব্দ। আচমকা দরজায় করাঘাত। দরওয়াজা খোলো রোশন আনসারি! তুম ভাগ নহি সাকতে! রোশন স্তব্ধ! পুলিশ! এই এত কষ্ট করেও পালানো গেল না? ধরা পড়ে যাবে? এক ..দুই ..তিন…পুলিশ দরজা ভাঙার চেষ্টা করছে। রোশন এক নিমেষে উঠে এল। আর দরজা খুলে দিল। একসাথে চারজন ঢুকল। তবে লেডি অফিসারও আছে। তিনিই হাত বাড়ালেন। রোশন হাঁটু ভেঙে পড়ে গেলেন কাঁদতে কাঁদতে।
শুধু বলল, সাব ওহ লেড়কি আমার বেটিকে খুন করার চেষ্টা করছিল! আমি তাই….।
পরদিন ভোর সাড়ে ৫ টার প্রথম ফ্লাইট। এমিরেটস। রোশনকে নিয়ে সোজা এয়ারপোর্টে সিবিআই। কিন্তু তার পাসপোর্ট? রোশন মুখ নীচু করে আছে। তারপর নিজেই বলে দিল কাকার বাড়িতে ঘাটকোপারে বাক্সে লুকানো আছে। তৎক্ষণাৎ একজন পুলিশকর্মী ছুটলেন। কিন্তু রোশনকে নিয়ে দুবাই যাবে কে? লেডি অফিসার জ্যোৎস্না রসম রাজি। কিন্তু তাঁর পাসপোর্টও তো বাড়িতে আনতে যেতে হবে। বাড়ি আন্ধেরি। তিনি ছুটলেন। আর এদিকে সিবিআই অফিসাররা এমিরেটসের ফ্লাইট আটকে রেখেছেন। সিবিআইয়ের গাড়ি ছুটছে জ্যোৎস্নাকে নিয়ে। আন্ধেরি। আধঘণ্টা লাগল। সময় হয়ে গিয়েছে। এখনও প্লেন টেক অফ করছে না কেন? যাত্রীরা উত্তপ্ত। পাইলট আর এয়ার পোর্ট অথরিটি সিবিআইকে আক্রমণ করছে। এসব কী হচ্ছে? একটা আন্তর্জাতিক ফ্লাইট এভাবে আটকে রাখা যায় নাকি? একজন প্যাসেঞ্জারের জন্য? সিবিআই ডিআইজি বীরেন্দ্র ঠান্ডা গলায় বললেন, একদম চুপ!! বেশি কথা বললে, ফ্লাইট অপারেশন বন্ধ হয়ে যাবে এই প্যাসেঞ্জারকে না নিয়ে গেলে! ইউ আন্ডারস্ট্যান্ড? ওই কঠোর চোখ দেখে আর কেউ কথা বলার সাহস পেল না। ঠিক সাড়ে সাতটার সময় দুবাই এয়ারপোর্টে নামানো হল রোশন আনসারিকে। কোলে পাঁচ বছরের বাচ্চা। এয়ারপোর্টে দাঁড়িয়ে খালিফান আবদুল্লা। দুবাই পুলিশের ক্রিমিন্যাল ইনভেস্টিগেশন ডিপার্টমেন্টের ডিরেক্টর জেনারেল। রোশন তাঁর দিকে তাকালেন। এবং তাঁর বিশাল শরীরের আড়াল থেকে বেরিয়ে এলেন শেখ কাবানজি। রোশনের স্বামী। দুজনে দুজনের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে। কাবানজি এগিয়ে এসে শুধু রোশনের কোলের থেকে পাঁচ বছরের মেয়েটিকে নিয়ে নিলেন। রোশনকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে দুবাই পুলিশের প্রিজনার ভ্যানের দিকে! ওঠার আগে শেষবারের মতো রোশন তাকাচ্ছে পিছনে। মেয়েকে দেখছে।
দুবাই পুলিশ হেডকোয়ার্টারের কন্ট্রোল রুম তখন ফোনে ইন্ডিয়ার সিবিআই হেডকোয়ার্টারকে জানাচ্ছে থ্যাংক ইউ!!
