মুম্বই থেকে দূরে কল্যাণের সর্বোদয় রেসিডেন্সির ইউনানি ডাক্তার ইজাজ বদরুদ্দিন মাজিদের ঘরে এই তো কিছুদিন আগেও ছিল বেশ খুশি খুশি পরিবেশ। ছেলে আরিব লুর্ডাস হাই স্কুল থেকে ৮৩ পার্সেন্ট নিয়ে পাশ করেছে। মুম্বইয়ের শহরতলি ভাসির ফাদার অ্যাঞ্জেল পলিটেকনিক কলেজে ভর্তি হয়েছিল এই তো সেদিন। দেখতে দেখতে কেমন সময় কেটে যায়। সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংএ ডিপ্লোমা পরীক্ষায় ৭৭ পার্সেন্ট পেল আরিব। যথেষ্ট ভালো। এখন পড়ছে এ ই কালসেকর ডিগ্রি কলেজে। সিভিলেই। ছোট ছেলেটাও ইঞ্জিনিয়ারিং পড়বে। আর দিদি একটি ভালো হাসপাতালের নার্স। পরিবারটির মধ্যে বেশ একটা শিক্ষার চল রয়েছে। তাছাড়া ডক্টর ইজাজ মাজিদের নামডাকও রয়েছে। জনপ্রিয়। এই খুশির হাওয়ার মধ্যেই কখন যেন অন্ধকার ঢুকছিল। কেউ বুঝতে পারেনি। একবার আরিব একটি সংগঠনের হাত ধরে মাথেরান গিয়েছিল। সেখানে তিনদিনের একটা ওয়ার্কশপ। ফিরে আসার পর কেমন একটা গম্ভীর। ওখানে কী নিয়ে আলোচনা হয়েছে? কারও সঙ্গে শেয়ার করে না আরিব। সবথেকে প্রিয় বোনের সঙ্গেও নয়। তবে বিশেষ আশ্চর্যজনক ব্যাপার হল সে অনেক অভ্যাস পালটে ফেলছে। এয়ারকন্ডিশনার ব্যবহার করতে আপত্তি। ওটা নাকি বিলাসিতা। খাটে নয়। মেঝেতে শুতে শুরু করল । এখানেই তো শেষ নয়। একদিন সকালে মায়ের সঙ্গে সাংঘাতিক ঝগড়া। আরিবের মা একটি বিউটি পার্লার চালান। আরিবের জেদ মাকে ওই কাজটি বন্ধ করতে হবে। সৌন্দর্যচর্চা ইসলামের বিরোধী। বাড়িতে সকলে অবাক। এসব কী কথা! তাঁদের পরিবার অত্যন্ত উদার, প্রগতিশীল, শিক্ষিত আর আধুনিক। কী হল আরিবের? কে এসব শেখাচ্ছে? আরিব আজকাল পড়াশোনা কমিয়ে দিয়েছে। সারাক্ষণ মোবাইল। সব মিলিয়ে পরিবারটিতে একটা চাপা উদ্বেগ ছেলেকে নিয়ে। আরিব সবথেকে বেশি সময় কাটায় ফেসবুক আর ট্যুইটারে। একটি অ্যাকাউন্টকে আরিব নিয়ম করে ফলো করে। তার নাম magnetgas। এই ট্যুইটার অ্যাকাউন্টের সবথেকে ইন্টারেস্টিং বিষয় হল খুব আপডেটেড। কোথায় কী লড়াই হচ্ছে, কোথায় কী কী অত্যাচার হচ্ছে তার ভিডিও আর ছবি তৎক্ষণাৎ আপলোড হয়ে যায়। যতই দিন যাচ্ছে এরকম ট্যুইটার অ্যাকাউন্ট আর ফেসবুকে আকৃষ্ট হচ্ছে আরিব। কেন?
তিনজনের সঙ্গে আলাপ হয়েছে আরিবের। ফাহাদ শেখ। ফাদার অ্যাঞ্জেল পলিটেকনিকের মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং এর ছাত্র ফাহাদ শেখ আমন তান্ডেল ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে পড়াশোনা করে শিবাজিরাও এস জোনধালে কলেজে। আর একজনের নাম শাহিম তাঙ্কি। এই চারজনের মধ্যে এত বন্ধুত্ব কেন? কারণ এই কলেজছাত্ররা প্রত্যেকেই যেতে চায় একটি পবিত্র ভূমিতে। জায়গাটার নাম সিরিয়া! প্রত্যেকদিন ক্লাস শেষ হওয়ার পর তারা একটা জায়গায় মিলিত হয়ে পড়াশোনা করতে যেত। এক বন্ধুর বাড়িতে। ফয়েজ খান। মুমব্রায় থাকে। সেখানে কিন্তু পড়াশোনা বেশি হয় না। অনেক বেশি দেখা হয় ইউটিউব। কারণ ২০১৩ সাল নাগাদ খবর আসতে শুরু করেছিল ইরাক আর সিরিয়াতে একটি স্বাধীন ইসলামিক রাষ্ট্র গড়ে তোলার কাজ শুরু হয়েছে। সেটি হবে খলিফার শাসন। অর্থাৎ সরাসরি এক পবিত্র ভূমি হতে চলেছে। পারস্য সাম্রাজ্য বহু দশক ধরে রোমান আগ্রাসনকে প্রতিরোধ করতে সক্ষম হয়েছিল মধ্যযুগে। কিন্তু আধুনিক যুগে মাত্র এক দশকের মধ্যেই রোমানদের থেকেও সম্ভবত বৃহৎ এক শক্তি পারস্যকে গ্রাস করতে শুরু করল। যাকে ঠেকাতে পারল না পারস্য সভ্যতা। তার নাম ইসলামিক স্টেট অফ ইরাক অ্যান্ড সিরিয়া। আইসিস। ২০১৪ সালের মধ্যে আইসিস নিজেদের সাম্রাজ্য ছড়িয়ে দিতে সক্ষম হয়েছিল উত্তরে আলেপ্পো থেকে দক্ষিণে বাগদাদ পর্যন্ত। সিরিয়ার রাক্কা এবং ইরাকের মসুল আসল শক্তিকেন্দ্র হয়ে উঠল। সব মিলিয়ে ৬৫ লক্ষ জনসংখ্যা সরাসরি এই খলিফার শাসনের অধীনে চলে এল। আইসিস সংগঠন কীভাবে গড়ে উঠল? এই গোষ্ঠীতে যোগ দিয়েছিল সুন্নি অধ্যুষিত কিছু আদিবাসী গ্রুপ, সাদ্দাম হুসেনের আরহিস নামক ইনটেলিজেন্স ব্রাঞ্চের প্রাক্তন সদস্যরা এবং শিয়া অধ্যুষিত বিদ্রোহীরা, বাশার আল আসাদের শাসনের বিরুদ্ধে যারা আন্দোলন করছিল।
সুতরাং এরকম একটি সময় যখন আইসিস এগোচ্ছে সবরকম বাধা পেরিয়ে তখনই তাদের দরকার ছিল দেশবিদেশ থেকে যুবক-যুবতীকে টার্গেট করা। আইসিসের সবথেকে বড় শক্তি হল সোস্যাল মিডিয়া। ১০ হাজার যুবক যুবতীর একটি চূড়ান্ত শার্প অনলাইন গ্রুপ আইসিসের সোস্যাল মিডিয়া হ্যান্ডল করে। এদের বলা হয় ওয়েব রিক্রুটার। এবং নেট ক্যাম্পেনার। এটা এক অদ্ভুত প্যারাডক্স। যে আইসিস পশ্চিমি সভ্যতার বিলাসদ্রব্যের বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষণা করেছে তারাই পশ্চিমি সভ্যতার সবথেকে শক্তিশালী আবিষ্কার ইন্টারনেট আর মোবাইলকে নিজেদের সেরা অস্ত্র হিসাবে ব্যবহার করে। কীভাবে যাওয়া সম্ভব সিরিয়া? চার যুবক রাতদিন ইন্টারনেটে পাগলের মতো পরিশ্রম করছে। একদিকে ট্যুইটারে খোঁজ চলছে আর অন্যদিকে ফোন নম্বরও জোগাড় হয়েছে। কয়েকজনের। জানতে চাওয়া হচ্ছে একটাই প্রশ্ন। সিরিয়া যাওয়ার সহজ রুট কোনটা? অধিকাংশই একটা কমন পরামর্শ দিল। সেটা হল আগে তুরস্ক পৌঁছাও। তারপর সেখান থেকে আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করো। আমাদের সঙ্গে মানে কারা? যাদের সঙ্গে প্রায় এক বছর ধরে ট্যুইটার আর ফেসবুকে একটা কন্ট্যাক্ট তৈরি হয়েছে। তাদের মধ্যে কয়েকজন সরাসরি ফাইটার। সবার মধ্যে দুটি নাম বাছাই করা হল। এই দুজনের কথায় বোঝা গেল এরা পারবে প্রকৃত হেল্প করতে। একজন হল ইরাকের আবু রামি। আর অন্যজন তুরস্কের আবু ফালুজা। আরিব মোটামুটি বুঝে গেল তিনটি রুটে যাওয়া সম্ভব তার প্রিয় স্থানে। প্যালেস্টাইন, তুরস্ক আর ইরাক। চারজনের মধ্যে আরিবই দায়িত্ব নিল রুট কনফার্ম করার। মুম্বইয়ের একটি শহরতলি কল্যাণ। চারটি ছাত্র। ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ে। তারা যাবে সিরিয়া। কোথায়? আইসিস অধ্যুষিত রাক্কা কিংবা মসুলে। ভারতের শিক্ষিত উচ্চ মধ্যবিত্ত সুখী পরিবারের চার যুবক থাকতে চায় অনেক দূরে এক পবিত্র ভূমিতে। তারা রেডি যে কোনো কাজে নিজেদের নিয়োজিত করার জন্য। প্রথমেই আরিব গেল টমাস কুক সংস্থায়। এবং জানা গেল সিরিয়ায় যাওয়ার কথা ভাবা যতটা সহজ, যাওয়াটা ততই কঠিন। বিশেষ করে তুরস্কের ভিসা পাওয়া। তুরস্কের ভিসা পেতে দরকার পরিচয়পত্র, বাড়ির ঠিকানা, ইনকাম স্টেটমেন্ট, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ইত্যাদি। আরিব ফিরে এল বাড়িতে। আবার মধ্যরাত পর্যন্ত ডুবে গেল ইন্টারনেটে। সমস্যার কথা বলল তার পরিচিত সেই পরামর্শদাতাদের। যারা আসলে সত্যিই কে কারা তা সঠিকভাবে জানা নেই। কিন্তু একটা বিকল্প জানা যাচ্ছে। তুরস্ক নয়। বরং ইরাক হয়ে যাওয়া একটু সহজ। কীভাবে? তীর্থযাত্রার ভিসায়। যাকে বলা হয় জিয়ারত ভিসা। যে ভিসা পেতে হলে একটা মাত্র পাসপোর্ট আর ছবি চাই। ব্যস! আর কিছু প্রমাণপত্র দরকার হয় না। আলোচনা করে স্থির হল এই প্ল্যানই ফাইনাল। এবার একটা কোনো সংস্থার খোঁজ পেতে হবে যারা এরকম বিদেশের তীর্থ সফর করায় বৈধভাবে আরিব, শাহিম এবং ফারহাদ এবার গেল মুম্বইয়ের রাহত ট্যুর কোম্পানির অফিসে। জানানো হল ইরাকের জিয়ারত ভিসা তারা করে দেবে। তারা ট্যুর প্যাকেজ করায়। চারজনের জন্য লাগবে ২ লক্ষ ৪০ হাজার টাকা। তবে এত টাকা একবারে দেওয়া সম্ভব নয়। ইনস্টলমেন্টে দিতে হবে। তাতে অবশ্য রাজি ওই সংস্থা। তবে এটা জানিয়ে দেওয়া হল যতক্ষণ না ফুল পেমেন্ট হচ্ছে ততক্ষণ টিকিট, ভিসা, প্রোগ্রামের বিস্তারিত কাগজপত্র কিছুই দেওয়া হবে না। কিন্তু এত টাকা আর জিয়ারতের কিছু নিয়মকানুন আছে সেসব পাওয়া যাবে কোথা থেকে? ভারত থেকে চারজন যুবক আসতে চায় তাদের দলে যোগ দিতে। এটা জানতে পেরে ততক্ষণে অ্যাকটিভ হয়ে গিয়েছে আইসিস ওয়েব ফোর্স। তাদের লোকাল স্লিপার সেলের নাম আবু বকর সিদ্দিকি। সে যোগাযোগ করে দিল এমন একজনের সঙ্গে যে গোটা অপারেশনটি মনিটর করবে। তার নাম রহমান দৌলতি। থাকে ইরাক ও সিরিয়ায়। বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানে মাঝেমাঝে আসে রিক্রুটমেন্টের জন্য। সর্বাগ্রে এই রহমান দৌলতি জানিয়ে দিল সে ১ লক্ষ ২৫ হাজার টাকার বন্দোবস্ত করে দিচ্ছে। বাকিটা ওই ছাত্রদের জোগাড় করতে হবে। তাই হল। এতদিন ধরে টাকা জমানো হয়েছে। আর কিছু টাকা এদিক ওদিক থেকে নেওয়া হল ধার হিসাবে। গোটা অভিযানের পিছনে আসল প্ল্যান, মস্তিষ্ক এবং রুট নেটওয়ার্ক কে ছিল? একটা ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের ছাত্রের পক্ষে এতবড় রিস্ক নেওয়ার মতো ব্রেন ছিল নাকি? না ছিল না। আরিব ও তার সঙ্গীরা একদিন ভোরে বাগদাদ এয়ারপোর্টে নামতে পারল যার নিখুঁত প্ল্যানে তার নাম তাহিরা ভাট! আরিবের ইন্টারনেট প্রেমিকা! আইসিসের হানিট্র্যাপ! যা আরিব বুঝতেই পারেনি এক বছর ধরে, প্রেমিকার ছদ্মবেশে তাহিরা ভাট আসলে ছিল এক গোপন রিক্রুটার!
আজকাল শুধুই প্রেম নয়! শুরু হয়েছে ইন্টারনেট ওয়েডিং! অর্থাৎ সোস্যাল মিডিয়াতেই বিবাহ হয়ে যাচ্ছে দুই প্রেমিক প্রেমিকার। কেউ কাউকে ফিজিক্যালি দেখেনি। একবারও সামনে থেকে সাক্ষাৎ হয়নি। কিন্তু কখনও না কখনও সাক্ষাৎ হবে এবং একসাথে ঘর বাঁধা হবে এই কমিটমেন্ট করে হয়ে চলেছে অসংখ্য ইন্টারনেট ওয়েডিং। আইসিসের হানিট্র্যাপ উইংএর মেয়েদের টার্গেট হল সেইসব যুবক, যারা আইসিস সম্পর্কে আগ্রহী। যাদের অ্যাকাউন্ট থেকে হামেশাই বিভিন্ন জেহাদ কিংবা অভিযান অথবা যুদ্ধের সম্পর্কে অনেক বেশি কৌতূহল প্রকাশ করা হচ্ছে দেখা যায়। এদের ফলো করা শুরু হয় প্রথমে। বুঝে নেওয়া হয় কেন এই যুবক এই আগ্রহ দেখাচ্ছে? শুধুই নিজের জ্ঞান বৃদ্ধির কারণে? পেশাগত প্রয়োজনে? সাংবাদিক? সিকিউরিটি এজেন্সি? গোয়েন্দা? গুপ্তচর? নাকি জেহাদি হতে চায় এরকম কেউ? শেষোক্ত পন্থীরাই আসল টার্গেট। তাদের ফেসবুকে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠানো হয়। নিয়মটা হল প্রথমেই নিজেকে বেশি প্রকাশ করতে নেই। তাহলে সন্দেহ হবে। মাসের পর পর মাস শুধু ভালো লাগা তৈরি হোক। রোমান্টিক আলোচনা চলুক। তারপর কমন ইন্টারেস্ট নিয়ে কথা শুরু হবে। এবং সবশেষে যখন জানা হয়ে যাবে যে দুজনের অনেক বিষয়ে মনের মিল, তখন মতাদর্শ আর ধর্মের শুদ্ধতার প্রশ্নে ঢোকা হবে। সেটাই আসল স্টেজ। কারণ তারপর রক্ত গরম করা, ক্ষোভ সৃষ্টি করা এবং দুর্দান্ত এক নতুন জীবনের দিকে অঙ্গুলিহেলনের ভিডিও, ছবি, ইউটিউব শেয়ার করা হবে। কখনও দেখানো হবে অত্যাচার চলছে নিজের সম্প্রদায়ের উপর। এভাবে ব্রেনওয়াশ চলবে। এই ফরমুলায় মুম্বইয়ের কল্যাণ এলাকার কলেজের থার্ড ইয়ারের ছাত্র আরিব মাজিদের বান্ধবীর নাম তাহিরা ভাট। তারা আলোচনা করে কীভাবে আদর্শ মুসলিম জীবন যাপন করা সম্ভব। তাহিরা ভাটের অন্য নামেও একটি ফেসবুক অ্যাকাউন্ট আছে। নাম উম বাকিয়া আল হামসি। একটা সমস্যা। কথা হচ্ছে কথা হচ্ছে…সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হচ্ছে। আচমকা একদিন উধাও তাহিরা। কোথায় গেল সে? আরিব বুঝতেই পারে না। আসল কথা হল তাহিরা ভাটকে ফলো করছে দুনিয়ার একাধিক ইনটেলিজেন্স এজেন্সি। তারা জানে এ আসলে কে। তাই কিছুদিনের মধ্যে তার অ্যাকাউন্ট ব্লক করে দেওয়া হয়। তারপর চুপচাপ। কয়েকদিন পর আবার নতুন নামে, নতুন মেল আইডি, নতুন প্রোফাইল নিয়ে হাজির হয় সে। এবং প্রতিবারই নতুন অ্যাকাউন্ট থেকে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠিয়ে সে ইনবক্সে বলে, আমি তাহিরা! কখনও সেই নতুন প্রোফাইলের নাম হয়েছে ‘ব্লেজ অফ গ্লোরি’ কখনও হয়েছে ‘উম হল হামসি’! সুতরাং একদিন তাহিরাকে আরিব জানাল সে যাবে সিরিয়া। তাদের সেখানেই দেখা হবে। খুব খুশি তাহিরা । সে জানাল তুমি গেলে আমিও যাব। ওখানেই আছে আমাদের জন্নত। বাগদাদে নেমে কার সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে? তাহিরা ভাট সেই নম্বর দিয়ে দিল। নাম আবু ফতিমা।
একদল তীর্থযাত্রী ট্যুরিস্টকে নিয়ে আজমির ট্র্যাভেলস রওনা হবে ইরাকে। ২০১৪ সালের ২২ মে আরিব মাজিদ ও তার সঙ্গীদের কাছে এল বহু প্রতীক্ষিত মুহূর্ত। ইরাক যাওয়ার টিকিট। জিয়ারতে যাচ্ছে মোট ৩০ জন যাত্রী। তাদের মধ্যে চারজন আসলে যাচ্ছে অন্য লক্ষ্যে। সেটা বাকি ২৬ জন যাত্রী কিংবা ওই আজমির ট্র্যাভেলসের কেউ জানেই না। বরং অন্যরা খুশি যে এরকম চারটি অল্পবয়সি যুবক তাদের সঙ্গে যাচ্ছে। বাহ! আজকালকার ছেলেদের এত ধর্মীয় চেতনা খুবই সুসংবাদ! ভাবছে সবাই। ২৪ মে আরিব বাড়ি থেকে বেরল। নর্মাল দিন। কাঁধে কলেজের ব্যাগ। বাড়িতে কেউ সন্দেহ করেনি। করার কথাও নয়। সোজা কলেজ। যে ছেলেটি আজ মাঝরাতে ইরাকে এক অজানার জীবনের দিকে উড়ে যাবে সে অত্যন্ত উদ্বেগহীনভাবে ক্লাস করল। নোট নিল। আসন্ন পরীক্ষা নিয়ে আলোচনা করল। এরপর বিকেলে মুমব্রা মার্কেটে গিয়ে একটা বড় ট্র্যাভেল ব্যাগ কিনে এক বন্ধুর বাড়িতে গেল। সেই ফয়েজ খান। তার বাড়িতে আগেই একটা ব্যাগ রাখা ছিল। জামাকাপড়ের। সেটা নিয়ে বড় নতুন ব্যাগে ভরা হল। রাত আটটায় চারজনের দেখা হল ভিক্টোরিয়া টার্মিনাস স্টেশনের বাইরে। মাঝরাতে ফ্লাইট। আজমির ট্র্যাভেলসের গাইড আসার আগেই চার যুবক হাজির। মধ্যরাত। এতিহাদ এয়ারওয়েজ। ফ্লাইট নম্বর ইটি ২০৫! চারটি ছাত্র উড়ে গেল বাগদাদ। কারও বাড়িতে কেউ জানল না। ২৪ ঘণ্টা পরও কোনো খোঁজখবর না পেয়ে আরিবের মা বাবা থানে পুলিশের শরণাপন্ন হলেন। ফাইল করা হল মিসিং ডায়েরি। আবু ধাবি হয়ে বাগদাদে নামার পর দ্রুত হোটেলে ঢোকা। একটু পর বেরোতে হবে। ৩০ জনের দলটি যাবে শরিফ আবদুল কাদির গিলানির দরগায়। কিন্তু চারটি যুবক যাবে না জানিয়ে দিল। তারা বিরক্ত। কারণ এরকম হোটেলে কষ্ট করে থাকতে পারছে না তারা। তাদের অন্যত্র কোনো হোটেলে রাখা হোক। দরকার হলে আরও টাকা দেবে। আসল কারণ হল এই দলের মধ্যে থেকে নিজেদের আলোচনা করা সম্ভব নয়। তাই তাদের দরকার একটু প্রাইভেসি। সেই অনুযায়ী ট্যুর গাইডকে বলাও হল। এবং এক্সট্রা টাকা দিয়ে পাশের একটি হোটেলেই রাখা হল তাদের। কিন্তু সন্দেহের কারণ কাছে। ২৫ মে, ৩১ মে। একের পর এক দিন যাচ্ছে। অথচ এই চারজন কোনো জিয়ারতে যাচ্ছে না। এতসব দরগা, মসজিদ ধর্মস্থান আছে। সেই মুম্বই থেকে শুধু এই কারণেই তো আসা। তাও এই চার যুবক কোথাও যায় না। ব্যাপার কী? ব্যাপার হল টেনশন বাড়ছে। কারণ সেই আবু ফাতিমার খোঁজ নেই। সে ফোনও তুলছে না। মেসেজও করছে না। অগত্যা আবার সেই রহমান দৌলতিকে ফোন করা হল। বলা হল ভাইজান টাকা ফুরিয়ে আসছে। কী করব? এখানে কিছুই চিনি না। কোথায় যাব? আমাদের ভিসা শেষ হয়ে আসছে। এরপর তো ফিরে যেতে হবে মুম্বই! রহমান আশ্বস্ত করল তাদের। মাত্র এক ঘণ্টা পর একটি মেসেজ এল। হোয়াটস অ্যাপে। আবদুল রহমান আলেজি এক কুয়েতের নাগরিক। জানাল কিছুক্ষণের মধ্যে ১ হাজার ইউএস ডলার ট্রান্সফার করা হচ্ছে আরিবের অ্যাকাউন্টে। ২৯ মে ২০১৪ তারিখে আরিব মাজিদের কাছে ওয়েস্টার্ন ইউনিয়ন মানি ট্রান্সফারের মাধ্যমে টাকা চলে এল।
যে কেউ চাইল, আর ভিসা নিয়ে ইরাক কিংবা সিরিয়া চলে এল। তৎক্ষণাৎ আইসিসে যোগ দিতে পারল? এরকম হয় নাকি? আদৌ হয় না। অতটা সহজ নয় আইসিসে যোগ দেওয়া। আইসিসে যোগ দিতে হলে দরকার রেফারেন্স। এমন কেউ যে বেশ অনেকদিন ধরে আইসিসের অন্দরে আছে। সে যদি আস্থাভাজন হয় তাহলে তার রেফারেন্স যাবে আইসিস কর্তাদের কাছে। ওই প্রক্রিয়ার নাম ‘তাজকিয়া’। তাজকিয়া এসে পৌঁছয়নি। তাই আবু ফাতিমা তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করছেও না। এখন উপায়? আরিব ভাবছে তাহিরা কোথায়? সে কেন কিছু করছে না? তার জন্যই তো সব ছেড়ে আসা! ভারতে ফিরে যাওয়ার দিন এসে গেল। আর থাকা যাবে না। বৈধভাবে। চার যুবক হাতজোড় করে ট্যুর গাইডকে বলল আমাদের ভিসা এক্সটেনশন করে দিতে হবে। টাকা দিচ্ছি। কত দিতে হবে? ৫০০ ডলার। তাই দেওয়া হল। কিন্তু ৩১ মে বিকেলে সেই ট্যুর গাইড জানাল সম্ভব নয়। ভিসা বাড়ানো যাবে না। তোমাদের ফিরতে হবে ইন্ডিয়া। কাল ফ্লাইট ফেরার। তোমরা এলেই বা কেন বুঝলাম না। কোত্থাও তো গেলে না। আশ্চর্য! চারজন শুধু হাসল। তারা জানাল ঠিক আছে আর একবার শরিফের দরগায় নিয়ে চলো আমাদের। আমরা তো আগে দেখিনি। অগত্যা! যাওয়া হল দরগায়।
ট্যুর গাইডকে সম্পূর্ণ ধোঁয়াশায় রেখে চারজন ওই দরগা থেকে আড়ালে বেরিয়ে গেল। সোজা একটি হোটেলের সামনে গেল। তার নাম হোটেল বুর্জ। যেখানে ট্যাক্সি স্ট্যান্ড। একটি ট্যাক্সিকে ভাড়া করা হল। কোথায় যাওয়া হবে? মসুল! আর ঠিক তখনই হোয়াটস অ্যাপে আরিবের প্রেমিকা ভেসে উঠল।
মসুল যাচ্ছ?
তুমি কীভাবে জানলে? এতদিন কোথায় ছিলে? আমি সব খবর রাখি। তোমাদের ফলো করা হচ্ছে।
আরিব চমকে উঠল। মানে? কীভাবে? কোথায়? কারা করছে?
এই ড্রাইভার আমাদের লোক।
সে কী ?
ওকে বলা আছে। তোমাদের তুলবে সাবুঞ্জি মসজিদের পাশের হোটেলে। আর তুমি?
কী আমি?
তোমার সঙ্গে দেখা হবে না?
একটা হাসির এমোজি দিয়ে তাহিরা ভাট লিখল, চলো..বাই..আবার কথা হবে কখনও আরিবের মুখে পড়ল ম্লান এক উদ্বেগের ছাপ! সে কি ভুল করল?
বাগদাদে থাকতেই চারটি সিম কার্ড কেনা হয়েছিল। জেইন কোম্পানির। ৯৬৪৭৮২০২১ এবং ৯৬৪৭৮২০২১। এই ছিল আরিবের নম্বর। মসুলে ঠিক সেই হোটেলে তোলা হল তাদের। কিন্তু এবার প্রচণ্ড রাগ হচ্ছে। তাদের ডেকে আনা হয়েছে। সব হেল্প করা হবে বলা হয়েছে। অথচ আসল জিনিস আসছে না? তাজকিয়া! অবশেষে তাজকিয়া এল। ৭ জুন। কে দিয়েছে রেফারেন্স? স্বয়ং উমর শিসানি। আইসিসের মিলিটারি কমান্ডার। হোটেলের সামনে একটা গাড়ি এসে থামল সেদিন মাঝরাতে। তাদের চারজনকে তোলা হল গাড়িতে। গাড়ি চলেছে। চোখ বাঁধা। কতক্ষণ যাত্রা হল? বোঝার উপায় নেই। ওঠার আগে ঘড়ি ফেলে দিতে হয়েছে। ওটাই নিয়ম। মোবাইল ওই আগন্তুকদের দখলে। চোখ খোলার পর দেখা গেল ভোর হচ্ছে। একটা মরুভূমি। জায়গাটার নাম জাজিরা। এটাই ট্রেনিং ক্যাম্প। চোখের সামনে মুম্বইয়ের চারটি কলেজ ছাত্র এই প্রথম হাতে হাতে এত অত্যাধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র দেখতে পেল। তাদের স্বাগত জানাল একদল জিহাদি। তারা যে সময়টায় জাজিরা ক্যাম্পে এসে যোগ দিল ঠিক তখনই চলছে মসুল দখল করার প্রাণপণ যুদ্ধ। ১২ দিন থাকতে হল জাজিরা ক্যাম্পে। এই চার ইন্ডিয়ান কি পারবে এত চাপ নিতে? সেটা দেখা দরকার। এই ক্যাম্পে সেই পরীক্ষা হচ্ছে। পাশ করল আরিব ও বাকিরা। ঠিক ১৩ দিনের মাথায় তাদের নিয়ে যাওয়া হল একটি ধু ধু প্রান্তরে। জায়গাটার নাম হুদুদ সেন্টার। দায়িত্বে আমির অবু মহম্মন ইরাকি। আমির মানে হল শিবিরের যে প্রধান। সে সবার আগে ফাহাদকে বুকে টেনে নিল। বললেন ম্যাগনেট গ্যাসকে স্বাগত। পাশেই হাসিমুখে দাঁড়ানো আরিব মাজিদ চমকে উঠল । তার মানে? সেই যে আজ থেকে এক দেড় বছর আগে সে যাকে ফলো করছিল, যার ট্যুইটার অ্যাকাউন্টের নাম magnetgas সে আসলে ফাহাদ? এতদিন বলেনি তো? এসব কী হচ্ছে? সবটাই এত গোপনীয় কেন? কে কার সঙ্গে আগে থেকেই পরিচিত? এসব প্রশ্ন এবং এক অজানা আশংকা নিয়েই হুদুদ সেন্টার আরিব মাজিদকে বলল, ওয়েলকাম টু আইসিস। কারণ এখানে হবে নাম রেজিস্ট্রিকরণ। এবং প্রশিক্ষণ।
একদিন রাতে সারাদিনের হাড়ভাঙা প্রশিক্ষণের পর ক্যাম্পে ফিরে এল আরিব। আপাতত তাকে কোনো কাজ দেওয়া হবে না। আরও সময় লাগবে। তবে একটা জিনিস লক্ষ করা যাচ্ছে। এখানে ইন্ডিয়ানদের সম্পর্কে কেমন একটা তাচ্ছিল্যের ভাব। বলা হচ্ছে ইন্ডিয়ানরা নাকি ভালো ফাইটার হয় না। তাহলে? তাদের দিয়ে রাস্তা সারানো হচ্ছে। আর? তারা হচ্ছে সেক্স স্লেভ! ইউরোপীয়ান আর আরব ফাইটাররা প্রথম শ্রেণির নাগরিক। তাহলে কী করবে আরিব? ট্যুইটারে তাহিরা ভাটকে সেকথা বলতেই তাহিরা কেমন যেন ব্যস্ত হয়ে পড়ল। সে বলল, আচ্ছা এসব ভেবো না। আমি কিন্তু আর আলাদা থাকতে পারব না। এবার আমরা মিলিত হব। চলো বিয়ে করি। ইন্টারনেট ম্যারেজ। জনৈক জাঁবাজ উমর নিজেকে তাহিরার ভাই আখ্যা দিয়ে গোটা বিয়ের সাক্ষী ও প্রস্তাবক হিসাবে উপস্থিত হল। এবং একঝাঁক জিহাদির অনলাইন উপস্থিতিতে হল আরিব ও তাহিরার অনলাইন বিয়ে। ঠিক তিনদিন পর তাহিরা ভাট নিজের প্রোফাইল বদলে দিয়ে জানিয়ে দিল ম্যারেড টু আরিব মাজিদ। কেন এখন বিয়ে? কারণ আরিবকে দেওয়া হবে প্রথম কাজের দায়িত্ব। আত্মঘাতী হামলা। তাহিরাকেও একইভাবে অন্যত্র পাঠানো হচ্ছে। তারা দুজনে চায় আত্মঘাতী হামলার পর তারা শহিদ হয়ে জন্নতে দেখা করবে। সেটাই হবে তাদের পবিত্র সংসার। ঈশ্বরের সান্নিধ্যে! প্ল্যান তাহিরার!
মিসাইল, এ কে ফর্টি সেভেন আর লাইট মেশিনগান ট্রেনিং। প্রথম অপারেশনই শিয়া মিলিট্যান্ট ফোর্সকে উড়িয়ে দিতে হবে। ৩ টন বিস্ফোরক ভর্তি একটি গাড়িতে বসানো হল আরিবকে। বলা হল এটা নিয়ে যাও। আরিব হয়ে গেল ফিদাইন। আত্মঘাতী বাহিনী। এবং প্রথম অপারেশনই লোন উলফ! অর্থাৎ একা আক্রমণকারী। এটা শুনে তাহিরা ভাট বলল আমাকেও পাঠানো হচ্ছে প্যালেস্টাইন। হয়তো আমাদের আর দেখা হবে না। বিদায় আরিব। দেখা হবে জন্নতে বিস্ফোরক ভর্তি গাড়ি নিয়ে এগোচ্ছে আরিব। একবার নয়, দুবার নয়, তিনবার সে ব্যর্থ হল। প্রথমে তার গাড়িকে লক্ষ্য করে বিস্ফোরক ছুড়লো কুর্দ বাহিনী। সে কোনো ক্রমে বেঁচে গেল। এরপর আমেরিকান বাহিনী বোমা বর্ষণ করতে শুরু করেছিল আইসিসের বিরুদ্ধে। আর তৃতীয়বার গুলিবিদ্ধ। কিন্তু আইসিসের শত্রুপক্ষকে আরিব কোনো ক্ষতিই করতে পারল না। গুরুতর জখম হয়ে ফিরল ক্যাম্পে। আইসিসি কর্তারা ক্ষুব্ধ। তিনবারই ব্যর্থ! নিজেরই উপর ধিক্কার হচ্ছে আরিবের। কিন্তু সেই রাতেই আমেরিকা আর কুর্দ বাহিনীর প্রবল বিমান হানা শুরু হল। জানা গেল আগস্টের সেই হামলায় আরিব মাজিদের মৃত্যু হয়েছে। গোটা অনলাইন জুড়ে প্রচার করা হল আরিবের শহিদ হওয়ার সংবাদ। আরিবের মৃতদেহ কোথায়? কেউ জানে না।
২ সেপ্টেম্বর! আরিব মাজিদের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে একটি মেসেজ ভেসে উঠল। ‘তুমি কি সবুজ পাখির দেশে চলে গিয়েছ?’…। কেউ উত্তর দিল না। তাহিরা ভাটের ওই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার জন্য তো আরিব মাজিদ আর বেঁচে নেই। সবুজ পাখি মানে বোঝানো হচ্ছে শহিদের স্বর্গ। তাহিরা ভাট নিশ্চিত হল। সে লিখল আমার স্বামীর মৃত্যু হয়েছে। আমি বেঁচে আছি। আরিবের সঙ্গী শাহিম মুম্বইতে ফোন করে আরিব মাজিদের বাবা ইউনানি ডাক্তার বদরুদ্দিন সাহেবকে বলল, আরিব আর নেই! কান্নায় ভেঙে পড়ল গোটা পরিবার।
গোটা ইন্টারনেট দুনিয়ার জেহাদি ওয়েবসাইটগুলিতে যখন আরিব মাজিদকে শহিদের আখ্যা দিয়ে প্রচার চলছে, তখন আরিব ইরাক আর সিরিয়ার সীমান্তে এক হাসপাতালের বেডে শুয়ে আছে। সে মারা যায়নি। সে তখন অচেতন অবস্থায় ভর্তি তেল হাফার হাসপাতালে। আটদিন হয়ে গেল। তার জ্ঞান নেই। কিন্তু বেঁচে আছে। তাই তাকে আর রাখা হবে না হাসপাতালে। কারণ হাসপাতালে জায়গা নেই। অসংখ্য জিহাদি আসছে। অসংখ্য সাধারণ মানুষ আসছে। লাগাতার বোমা ফেলছে আমেরিকার বাহিনী। উপচে পড়ছে হাসপাতাল।
ক্যাম্পে ফিরে এল আরিব এবং মোবাইল হাতে পেয়ে প্রথম দেখল তাহিরার মেসেজ। তবে জবাব দেওয়ার আগে দেখল তাহিরার অ্যাকাউন্ট। না নেই। সেখানে আরিব মাজিদের আর কোনো অস্তিত্ব নেই। বদলে গিয়েছে সব। আবার সে এক অন্য নারী। তাহিরার কোনো ছবি নেই তার কাছে। একটাই ছবি। বোরখা পরা। তাহিরা ভাট নামে আদৌ কি কেউ আছে? আরিব ভাবল তার গোটা মিশন কি ব্যর্থ? কারণ এই জখম অবস্থায় তাকে কেউ সহানুভূতি দেখাচ্ছে না। এমনকী সময়মতো মেডিসিনও পাওয়া যাচ্ছে না। সে এখন অকেজো। তাই তাকে অবহেলা? কোনো কাজ দেওয়া হচ্ছে না। তার কাজ গাড়ি মোছা। রাস্তা সাফাই। ২১ অক্টোবর ক্যাম্প থেকেই বাড়িতে বোনকে স্কাইপেতে ভিডিও কল করল সে। দুজনেই কাঁদছে। বোন বলছে তুমি আমার বিয়েতে এলে না.. ফিরে এসো ভাইজান..। ফিরে এসো। ততদিনে গোটা দেশ জেনে গিয়েছে এই চারজন কোথায় এসেছে। কারণ একমাত্র ফাহাদ বাড়িতে নিজের আলমারিতে চার পাতার একটি চিঠিতে সব জানিয়ে রেখে এসেছিল যে তারা চার বন্ধু চলেছে অন্য এক পবিত্র পথে।
আরিব মাজিদ ইরাক সিরিয়া সীমান্তে গিয়ে আমিরকে বলল আমি ফিরে যেতে চাই। খুব অসুস্থ। আমির ঠান্ডা চোখে বলল, তোমাকে গেলেই কিন্তু গ্রেপ্তার করা হবে। তবু আরিব যেতে চায়। দয়া হল বোধহয় আমিরের। ২৫ নভেম্বর আরিবকে একটা কালো কাচে ঢাকা গাড়িতে তোলা হল। চোখ বাঁধা। তুরস্ক সীমান্তের একটি জনপদ গাজিয়ানতেপ। সেখানে এসে নামানো হল। সীমান্ত পেরিয়ে আরিব সোজা একটা বাসে চেপে বসল। ফিরছে আরিব মাজিদ। ইস্তাম্বুল। এবার আর কোথাও যাওয়া নয়। এবার লক্ষ্য ফেরা। ভারতীয় দূতাবাস। কর্মীরা হতচকিত। ছেলেটি বলছে সে সোজা এসেছে আইসিস ক্যাম্প থেকে! পাসপোর্ট হারিয়ে ফেলেছে। কী করা যায়? একরাত রাখা হল সেখানে। ডুপ্লিকেট পাসপোর্ট দেওয়া হল আরিবকে। সে অসুস্থ। জখম। তাই ইস্যু করা হল ইমার্জেন্সি সার্টিফিকেট। আরিব টার্কিশ এয়ারলাইন্সে ওঠার আগে বাবাকে ফোন করে অশ্রুরুদ্ধ কণ্ঠে বলল, আব্বাজান…..আমি ফিরছি….। ২৮ নভেম্বর আরিব মাজিদ মুম্বই এয়ারপোর্টে ল্যান্ড করল। হাতে মাত্র একটা ব্যাগ। বাইরে বেরোতেই দেখল আব্বা, আম্মা, বোন দাঁড়িয়ে…সবাই কাঁদছে। এগিয়ে যাচ্ছে তাদের দিকে আরিব। জড়িয়ে ধরলেন ছেলেকে বদরুদ্দিন সাহেব। ভারতের প্রথম আইসিস জেহাদি ছিল এই কলেজ ছাত্র! আরিবের কাঁধে টোকা দিল কেউ। কে? আরিব চোখ মুখে পিছনে তাকিয়ে দেখল মুম্বই পুলিশের অ্যান্টি টেররিস্ট স্কোয়াডের চিফ হিমাংশু রায়!
আরিব ইউ আর আন্ডার অ্যারেস্ট!! আরিব হাসল। বলল, চলিয়ে স্যার….।
