দিল্লির আবহাওয়া বেশ মনোরম। আবুধাবি থেকে দিল্লি এয়ারপোর্টে নামার আগে তেক্কাত সিদ্দিকির ধারণা হয়েছিল বাইরেটা নিশ্চয়ই খুব গরম। এতক্ষণে কেরলে তো প্রচণ্ড তাপ। দিল্লিতেও হয়তো তাই হবে। যদিও তেক্কাত সিদ্দিকি বহু বছর হয়ে গেল আবুধাবিতেই সেটলড। বছরে একবার কেরল অবশ্য যান নিজের বাড়িতে। সুতরাং তাঁর আবার গরমের ভয় কী! আসলে ভয় নয়। বিস্ময়! এরকম মার্চ মাসে দিল্লিতে বেশ মৃদুমন্দ বাতাস। বরং হালকা শীতের কামড়ও যেন পাওয়া যাচ্ছে। অদ্ভুত তো! এর আগে দিল্লিতে আসা হলেও এয়ারপোর্ট থেকে আবার কোচির ফ্লাইট ধরতে হয়েছে। অর্থাৎ ওই শুধু ট্রান্সফারের সময়টুকু ছাড়া সেভাবে বেরনো হয়নি। এবার অনেকদিন পর তাই দিল্লি আসা। একটা জরুরি কাজে। বিজনেস ট্রিপ। এবারের ডিলটা হয়ে গেলে নতুন ভেঞ্চার করা যাবে। কালিকট থেকে প্রায় ২২ বছর আগে আবুধাবি চলে গিয়েছেন সিদ্দিকি। বিভিন্ন ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানির সঙ্গে অর্ডার সাপ্লাই আর কনস্ট্রাকশনের কাজ করে ২২ বছরে তিনি এক পরিচিত বিজনেসম্যান। ভারত সরকারের সঙ্গেও তাঁর কিছু কাজ আছে। সরকারের কয়েকজন মন্ত্রী, রাজনৈতিক নেতার সঙ্গে আলাপ আছে। সুতরাং সোজা কথায় তেক্কাত সিদ্দিকি একজন রেপুটেড এবং ধনী ব্যবসায়ী। ২০০১ সালের ১১ মার্চ। আজ তিনি ভেতরে ভেতরে একটু উত্তেজিত। বিজয় রাঠোরের সঙ্গে একবার আলাপ হয়েছিল দুবাইতে। তখনই কন্ট্যাক্ট আদানপ্রদান। সেই বিজয় রাঠোর গত কয়েকমাস ধরে ফোন করেছিলেন। দিল্লির কোনো একটা সেরামিক ফার্ম ওয়েস্ট এশিয়ায় এক্সপোর্ট করতে চায়। সেই কন্ট্রাক্ট পাওয়া নিয়ে আলোচনা শুরু। প্রাইমারি কন্ট্রাক্ট তাঁকে দিতে চায় বিজয় রাঠোর। রাঠোর নিজে মিডলম্যান। সেই মতো একবার তেক্কাতকে দিল্লিতে আসতে বলেছে রাঠোর। একটা মিটিং হবে। সময় পাওয়া যাচ্ছিল না। আপাতত দুয়েকদিন আবুধাবির অফিসে ভাইকে বসিয়ে রেখে তাই সিদ্দিকি এসেছেন দিল্লি। আশা করা হচ্ছে একেবারে ফাইনাল এগ্রিমেন্ট সেটলড করেই ফিরতে পারবেন। অ্যারাইভাল লাউঞ্জে পৌঁছে সিদ্দিকির মনে পড়ল এবার একটা ফোন করতে হবে। অমর নামে কাউকে। ফোনে কথা হল। অমর এয়ারপোর্টের অ্যারাইভাল লাউঞ্জের বাইরে অপেক্ষা করছে। ফোনেই অমর জানাল রাঠোর সাব আসেনি। তবে চিন্তা নেই। তিনি নিজের অফিসেই আছেন। সেখানেই তেহাত সিদ্দিকি সাহেবকে নিয়ে যাওয়ার কথা। অমর বলল আমি গাড়ি আনছি। আপনি দাঁড়ান। সিলভার হুন্ডাই অ্যাসেন্ট। দিল্লির কিছু সেভাবে চেনেন না সিদ্দিকি। আধঘণ্টা পর গাড়ি ঢুকল একটি দক্ষিণ দিল্লির কলোনির মধ্যে। রাস্তা ছেড়ে একটা বাইলেন। বাংলো টাইপের বড় বাড়ির গেট খুলে গেল। এবং গাড়িটি ঢুকতেই গেট বন্ধ। গাড়ি থেকে অমর তাঁকে নামতে বলে এক দৌড়ে ভিতরে চলে গেল। অবাক সিদ্দিকি। ব্যাপার কী? তবে এখন নিশ্চয়ই বিজয় রাঠোরের সঙ্গে দেখা হবে! এটা বাংলো নাকি অফিস? কিছুই বোঝা যাচ্ছে না। সামনেই দরজা। সেখানে আগে থেকে কিছু লোক দাঁড়িয়ে। কিন্তু মুখচোখ কেমন যেন রাফ। এরা কি অফিস স্টাফ? কিছুই বোঝা যাচ্ছে না। তাদের একজন এগিয়ে এসে বলল আইয়ে। বলে ভিতরে নিয়ে গেল। ড্রইংরুমের মধ্যে কিছু সোফা। কিছু চেয়ার। তেক্কাত ঢুকতেই ড্রইংরুমের দরজাও বন্ধ করে দেওয়া হল। ঠিক তখনই তেক্কাতের মাথায় ভয় প্রবেশ করল। কী হচ্ছে এসব? তাঁর কি আর একটু খোঁজখবর নিয়ে প্লেনে চাপা উচিত ছিল? ঠিক সেই সময় পিঠে একটা ধাক্কা। বৈঠ যাইয়ে…ইস চেয়ারপে বৈঠিয়ে..। এরকম একটা অদ্ভুত রুড ওয়েলকাম পেয়ে সিদ্দিকি যতটা বিস্মিত ততটাই ভীত হয়ে পড়ল। এক লহমায় মনে এল ভুল করেছি। কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গিয়েছে। তাঁর কাঁধ ধরে জোর করে চেয়ারে বসানো হল। আর বলা হল, তুমি কিডন্যাপড। মানে? কিডন্যাপড! আবুধাবির বিখ্যাত হাই প্রোফাইল বিজনেসম্যান তেক্কাত সিদ্দিকি কিডন্যাপড! তাও আবার দিল্লিতে। ব্রড ডে লাইটে? এরকম হয়? সিদ্দিকি ভাবতেই ভাবতে তাঁকে বলা হল ১২ কোটি! এখান থেকে ছাড়া পেতে হলে, বাঁচতে হলে ১২ কোটি টাকা দিতে হবে। তেক্কাত স্তব্ধ। তাঁর ফোন কেড়ে নেওয়া হল। বলা হল বাড়িতে বউকে ফোন করো। তেক্কাত নম্বর বলল। ফোন বাজছে। তেক্কাতের স্ত্রী স্বামীর ব্যাগে একঝাঁক লিস্ট লিখে দিয়েছিলেন। সেখানে বলা আছে দিল্লির বিজনেস ডিল সেরে কী কী আনতে হবে তাঁকে। অন্তত তিনটে লখনউ চিকনের শাড়ি চাই বলেছেন। একটু আগেই তাই এয়ারপোর্ট থেকে আসার পথে তেক্কাত গাড়ি থেকে মুখ বাড়িয়ে বাইরে দেখছিলেন বড় কোনো মার্কেট বা দোকান আছে কিনা। সেই স্ত্রীকে ফোন করে তিনি এখন বলছেন, আমাকে কিডন্যাপ করা হয়েছে…বলছে বাঁচতে হলে ১২ কোটি দিতে হবে…অন্য প্রান্তে থাকা স্ত্রী ডুকরে কেঁদে উঠলেন। এটুকু শুনতে শুনতে কিছু একটা বলতে যাবেন সিদ্দিকি। সেই সুযোগ দেওয়া হল না। ফোন কেড়ে নিল একটি যুবক। সিদ্দিকি কাঁপা গলায় কোনো মতে ভাঙা হিন্দিতে বললেন, আপনাদের ভুল হচ্ছে। আমি এত বড় বিজনেস চালাই না যে ১২ কোটি টাকা থাকবে। অফিস, অ্যাসেট বিক্রি করলেও হয়তো ১২ কোটি হবে না। প্লিজ…। এটা আমাদের পক্ষে সম্ভবই নয়। যুবকরা হাসল। তারা জানে একটা বৃহৎ অ্যামাউন্ট দিয়েই শুরু করতে হয়। তারপর তো নেগোসিয়েশন আছেই। আসল কথাটা হল ভিকটিম কতটা ভয় পেয়েছে। যত বেশি ভয় পাবে আর যত তাঁর পরিবার বা আত্মীয়রা মানসিকভাবে দুর্বল হবে ততই দরকষাকষির প্রবণতা কমবে। কারণ বেশিরভাগ বিজনেসম্যানের ফ্যামিলি চায় আগে লোকটা ভালোয় ভালোয় বেঁচে ফিরুক। টাকা যায় যাক! এই ভয়ই হল পুঁজি কিডন্যাপারদের। মৃত্যুকে কে না ভয় পায়? তাই একটা সজোরে চড় মারা হল সিদ্দিকিকে।
পরদিন। ১২ মার্চ। প্রায় কাঁদতে কাঁদতে তেক্কাত সিদ্দিকির স্ত্রী ও দাদা আবুধাবিতে ভারতীয় দূতাবাসে গেলেন। দেখা করলেন রাষ্ট্রদূত কে সি সিং এর সঙ্গে। গিয়ে তাঁরা প্রায় ভেঙেই পড়লেন। কে সি সিং ধৈর্য ধরে পুরোটা শুনলেন। এবং তৎক্ষণাৎ দিল্লিতে একটি নম্বরে ফোন নম্বরটি সোজা গেল আর কে রাঘবনের কাছে। সিবিআইয়ের ডিরেক্টর। সিবিআই? কেন? সাধারণত সিবিআই ঘটে যাওয়া কোনো দুর্নীতি, আর্থিক ক্রাইম এবং কখনও সখনও মার্ডার বা গণহত্যা মামলার তদন্ত করে। সোজা কথায় যে অপরাধটি ঘটে গিয়েছে সেটির পিছনের কারণ কী, কারা জড়িত, ষড়যন্ত্রটির মূল চক্রী কে ইত্যাদি নিয়েই তদন্ত করে সিবিআই। কিন্তু একটি অপরাধ ঘটছে। লাইভ অ্যাকশন তখনও চলছে অর্থাৎ কিডন্যাপিং কেস ফলো করা, এটা সিবিআই কখনও করেনি। তাহলে কী করা উচিত? ডিরেক্টর আর কে রাঘবন ডেকে পাঠালেন নীরজকুমার নামের অফিসারকে। তাঁকে তিনি বিশ্বাস করেন। বললেন, তুমি হ্যান্ডল করবে? নীরজকুমার জানতে চাইলেন, এটা তো দিল্লি পুলিশের স্পেশাল সেলের কাজ। আমাদের এর মধ্যে ঢোকা কি উচিত? রাঘবন বললেন, এটা সরকারের প্রেস্টিজের ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। ডেপুটি পি এমের কানে গিয়েছে। তিনি বললেন, এটা আমাদের দেখতে হবে। আর অ্যাজ আর্লি অ্যাজ পসিবল! ডেপুটি পি এম মানে উপ প্রধানমন্ত্রী। তিনি সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও। নাম লালকৃষ্ণ আদবানি। সবেমাত্র এক বছর আগেই এক ভয়াবহ ধাক্কা খেয়েছে সরকার একটি হাইজ্যাকিং কেসে। নেপাল থেকে আসা ইন্ডিয়ান এয়ারলাইন্স ফ্লাইট কাঠমান্ডু থেকে টেক অফের পরই হাইজ্যাকারদের হাতে চলে যায়। আর তারপর এক লজ্জার ও বেদনার কাহিনি ঘটে গিয়েছে। একজন যাত্রী রুপেন কাটিয়ালকে হাইজ্যাকাররা মেরে ফেলেছে। আর বহু কষ্টে গ্রেপ্তার হওয়া সন্ত্রাসবাদী মাসুদ আজহার সহ তিনজনকে ছেড়ে দিতে হয়েছিল কান্দাহারে গিয়ে। সেই ধাক্কা এখনও দগদগে। তাই আর কোনো রিস্ক নিতে চাইছে না সরকার। একজন এনআরআই ব্যবসায়ী দিল্লিতে ব্যবসার কাজে এসে কিডন্যাপ হয়ে গেলেন এটার কোনো ফ্যাটাল পরিণতি হলে সরকারের মুখ দেখানোর আর উপায় থাকবে না। তাই আদবানি নিজেই রাঘবনকে বলেছেন টিম তৈরি করো বেস্ট অফিসারদের। তেক্কাতকে জীবন্ত উদ্ধার করতেই হবে। গোপন টেনশন বয়ে যাচ্ছে সরকারের অন্দরে। যদিও খুব সামান্য কয়েকজন ছাড়া কেউ জানে না।
আন্না এরা আর আমাকে টাইম দেবে না।
তুমি ভেবো না সব ঠিক হয়ে যাবে আমরা ব্যবস্থা করছি
না না আমার খুব ভয় করছে (আমি সেকেন্ড ফ্লোরে আছি)…এরা যা চাইছে ঠিক সেই মতোই টাকাটা জোগাড় করো …(একটা দোকান দেখা যাচ্ছে যার সাইনবোর্ডে নম্বর লেখা 6683899)
তেক্কাত তুমি এমনিতে ঠিক আছো তো?
হ্যাঁ আমার কিছু হয়নি..খাওয়া দাওয়া দিচ্ছে (এটা এয়ারপোর্টের কাছে মনে হয়…মাথার উপরে খুব কাছে প্লেনের শব্দ…
ঠিক আছে আর একটু ধৈর্য ধরো..আমরা টাকার ব্যবস্থা করছি।
আচ্ছা আন্না…তাড়াতাড়ি করো (একটা টেলিফোন বুথও আছে দেখতে পাচ্ছি..)
তেক্কাত সিদ্দিকির বড় ভাই আহমেদ কোয়া দিল্লির লোদি রোডে সিজিও কমপ্লেক্সে ফোন করে সিবিআই অফিসারকে ফোন করে জানালেন তাঁর ভাই সকালে ফোন করেছিল। ওই কিডন্যাপাররা তাঁকে দিয়ে ফোন করিয়েছে। সিদ্দিকিরই ফোন। কিডন্যাপাররা নিশ্চয়ই সামনে দাঁড়িয়ে ছিল। সেই ফোনই হল উপরের কথোপকথন। তেক্কাত সিদ্দিকি জানিয়েছে, তাঁর উপর চাপ দেওয়া হচ্ছে। যতটা সম্ভব দ্রুত টাকাটা জোগাড় করতে হবে। তবে আসল তথ্য হল এই কথোপকথনের ভাষা হিন্দির মধ্যেই তেক্কাত সিদ্দিকি কৌশলে কয়েকটি মালয়ালি ভাষায় বাক্য বলে ইঙ্গিত দিতে চেয়েছে যে সে কোথায় আছে। উপরে ওই যে ব্র্যাকেটে লেখা বাক্যগুলি, ওগুলিই ছিল মালয়ালি ভাষায় তেক্কাতের কয়েকটি বাক্য। মালয়ালি ভাষাটা কিডন্যাপারদের জানা নেই। তবে প্রচণ্ড রিস্ক নিয়েছে বটে তেক্কাত। যে কোনো মুহূর্তে ধরা পড়তে পারত। কিন্তু অবশ্যই দুর্দান্ত বুদ্ধিমানের কাজও করেছে। তদন্তটা সিবিআই করার দ্বায়িত্ব নিয়েছে বটে, কিন্তু দিল্লি পুলিশের স্পেশাল সেলকেও একেবারে বাদ দেওয়া হয়নি। সেটার কারণ কয়েকজন দুর্ধর্ষ অফিসার। সরকারের পক্ষ থেকে প্রবল চাপের জেরে এমন এক টিম তৈরি হল যা দিল্লি পুলিশ ও সিবিআইয়ের সেরা এবং নিখুঁত এক গোয়েন্দা দল। সিবিআইয়ের নীরজকুমার, দিল্লি পুলিশের অ্যাসিস্ট্যান্ট কমিশনার রাজবীর সিং, ইনস্পেক্টর মোহনচাঁদ শৰ্মা, ইনস্পেক্টর রাজেন্দ্র বক্সি, সাব ইনস্পেক্টর মেহতাব সিং। এই পাঁচজনের টিম। সঙ্গে সহায়তার ব্যাক আপ। তেক্কাত সিদ্দিকি ফোন করে তাঁর দাদাকে আভাসে ইঙ্গিতে মালয়ালি ভাষায় মিনিমাম যেটুকু ইনফরমেশন দিতে পেরেছিলেন, সেটা পেয়েই অ্যাকশন শুরু। প্রথমেই ফোন করা হল ওয়ান নাইন সেভেনে। এনকোয়ারি। সেই যে তেক্কাত একটি দোকানের সাইনবোর্ডে লেখা ফোন নম্বরের কথা বলেছিল সেটির সোর্স কী? ৬৬৮৩৮৯৯। ওয়ান নাইন সেভেন থেকে জানানো হল নম্বরটি দিল্লির মালবিয়া নগরের। ঠিকানা এফ ৭৩ বেগমপুর, মালবিয়া নগর। এই ইনপুট থেকে তদন্ত শুরু।
রাত দেড়টা। নীরজকুমার ঘুমোচ্ছেন। হঠাৎ ফোন বাজছে। এত রাতে? কে? কী হল? ফোন তুলে শোনা গেল রাজবীর সিংয়ের কণ্ঠ। স্যার!..ইয়েস রাজবীর…স্যার, লোকেশন লোকেট করা গিয়েছে। যে দোকানের কথা তেক্কাত বলেছে সেটা আছে। আর পাশেই একটা বাড়ি। তাহলে? স্যার টাইম ওয়েস্ট করা যাবে না। লেটস মুভ নাউ..
নীরজকুমার লাফ দিয়ে নামলেন বিছানা ছেড়ে। দ্রুত ওয়াশ রুম সেরে এসে পোশাক পরে নিলেন। অবশ্যই সিভিল ড্রেস। পয়েন্ট টু টু ওয়াল্টার পিপিকে পিস্তলটা আলমারি থেকে বের করছেন নীরজকুমার। সাবধানে। কিন্তু ওটুকু শব্দেই স্ত্রীর ঘুম ভেঙে গেল। একী ! এই মাঝরাতে কোথায়? পিস্তল কেন? নীরজকুমার বললেন, একটা ছোট কাজ আছে। স্ত্রী উৎকণ্ঠিত হলেও বিস্মিত নয়। কারণ এটা অনেক সময়ই হয়েছে আগে। শুধু বললেন, বি কেয়ারফুল। নীরজকুমার হাসলেন। তাঁর মাথায় চিন্তা কাজটা কি হবে আজ? অফিসিয়াল গাড়ি ডাকার সময় নেই। তাই নিজের গাড়ি বের করলেন তিনি। নিজেই ড্রাইভ করে যাচ্ছেন। রাজবীরের ফোন আবার। স্যার…প্ল্যান কী? নীরজকুমার বললেন, এসেক্স ফার্ম। আইআইটির কাছে। কাম শাৰ্প! তাই হল এবার সিবিআইয়ের আরও দুই অফিসারকে খবর দেওয়া হল। কারণ নিয়ম অনুযায়ী তাঁদের একজন এই অপহরণ কেসের ইনভেস্টিগেশন অফিসার। তাঁর নাম রামনীশ এবং হিতেশ অবস্থি। বেগমপুর জায়গাটা কেমন? দক্ষিণ দিল্লির মধ্যে। একদিকে সবোদয় এনক্লেভ। অন্যদিকে সর্বপ্রিয়া বিহার। মাত্র এক কিলোমিটারের মধ্যে বিএমডব্লু আর মার্সিডিস দাঁড়িয়ে থাকে পার্কিংয়ে। আর এখানে গোরু, মহিষ ঘুরছে। সরু লেন। এরকম এলাকায় একজন করে লোক থাকে যাকে স্থানীয় মানুষ সম্বোধন করেন ‘প্রধান’। যেমন ধরা যাক আমাদের পরিচিত পঞ্চায়েত প্রধান। ইনস্পেক্টর রাজেন্দ্র বক্সিকে এই টিমে নেওয়ার কারণ কী? কারণ তিনি এই বেগমপুরেই বড় হয়েছেন এবং এখানেই তাঁর আসল বাড়ি। বক্সি চেনেন প্রধানকেও। তাই সেই ভোররাতেই প্রধানকে তোলা হল বাড়ি থেকে। অপারেশন একটু পরই শুরু হবে। দুটি গাড়িতে ওঠা হল। কিন্তু পুলিশের গাড়ি নয়। কোথাও লেখা নেই যে পুলিশের গাড়ি। প্রধানকে প্রথমেই জিজ্ঞাসা করা হল ওই বাড়িটায় কারা থাকে? প্রধান দেখা গেল কিছু কিছু জানে। বললেন, বাড়িটায় কিছু সন্দেহজনক লোকজন যাতায়াত করে এটা ঠিক। জামাকাপড় আর হ্যান্ডিক্র্যাফটের এক্সপোর্টার ওটার মালিক। ওই এক্সপোর্টার নিয়ম করে শুনেছি দুবাই আর গালফ কান্ট্রিজে যায়। বাড়িটার পিছনে গিয়ে নিঃশব্দে গাড়ি দাঁড়াল। জায়গাটা বিরাট বড় একটা লনের মতো। তেক্কাত মালায়ালি ভাষায় ফোনে বলেছিল, সেকেন্ড ফ্লোরে। কিন্তু সেকেন্ড ফ্লোরে উঠতে গেলে মই চাই। সেটা সম্ভব নয়। অতএব ফ্রন্ট গেট। তাছাড়া উপায় নেই। প্রধানকে বলা হল আপনি ডোরবেল বাজান। তাই হল। ডোরবেল শুনেই মিনিটখানেকের মধ্যে ল্যান্ডিংয়ে একটা লাইট জ্বলল। আগাপাশতলা চাদরে মোড়া একটি ছেলে নেমে এল সিঁড়ি দিয়ে। প্রধান গেটে দাঁড়ানো। কিন্তু পুলিশের টিম আড়ালে। লুকিয়ে। তাঁদের দেখা যাচ্ছে না। ছেলেটি জানতে চাইল কী ব্যাপার? প্রধান বললেন, দরজা খোলো! কিন্তু নিমেষের মধ্যে ছেলেটা ঘুরে দাঁড়িয়ে ধুপধাপ করে সিঁড়ি ধরে উপরে গিয়ে লাইট নিভিয়ে দিল। গোটা বাড়ি অন্ধকার। প্রধান এবার চিৎকার করছেন, দরওয়াজা খোল দো! দরওয়াজা খোল দো..। কোনো সাড়াই নেই। আর অপেক্ষা করা যায় না। যদি কোনো ক্ষতি হয়ে যায়! অতএব আড়াল থেকে রাজবীর সিং নীরজকুমার মোহনচাঁদ শর্মারা বেরিয়ে এলেন। উপর্যুপরি ধাক্কা আর একটা ছুরি লকের মধ্যে ঢুকিয়ে চাপ দিতেই গেট খুলে গেল। দুটি দলে ভাগ হয়ে গোটা টিম প্রথমে ফার্স্ট ফ্লোর আর দ্বিতীয় দলটি গেল সেকেন্ড ফ্লোরে। হাতে প্রত্যেকের অটোমেটিক রিভলভার। ব্যাকআপে দুজন। অন্ধকার নিকষ। প্রথম দরজাটায় ধাক্কা দেওয়ার আগেই অকস্মাৎ খুলে গেল। এরপর পাশেরটা। পরপর তিনটি রুম। আশ্চর্য ঘটনা। সব রুমে একঝাঁক নেপালি যুবক। ভয়ে জড়সড়। চাদরে ঢাকা। আর কে আছে? বাড়ির মালিক কোথায়? চিৎকার করে উঠলেন রাজবীর। ভয়ে আতংকে নেপালি দুটি ছেলে বলল তারা জানে না। তারা এখানে কাজ করে জামাকাপড় তৈরির। তাহলে দরজা না খুলে পালিয়ে এলে কেন? তারা জানাল যতজন এই বাড়িতে থাকার কথা কেয়ারটেকার তার থেকে আরও বেশি বাইরের কয়েকজনকে থাকতে দিয়েছে। তাই তার ভয় যদি মালিক জানতে পেরে যায় তাহলে চাকরি যাবে। এইসব ছেলেদেরও কাজ চলে যাবে। তাই কেয়ারটেকার ভয় পেয়ে ওরকম করেছে। কিছুটা হতচকিত হয়ে গেল পুলিশ টিম। কারণ এরা ছাড়া সত্যিই গোটা বাড়িতে কিছু নেই। অথচ বিবরণ সব মিলে যাচ্ছে। এমনকী আকাশে খুব কাছের থেকে প্লেন উড়ছে। তাহলে? এখন উপায় কী? আর কোনো পথ নেই। এখন আর রাখঢাক নয়। তল্লাশি করতে হবে গোটা মহল্লায়। যাকে বলা হয় কম্বিং অপারেশন। সমস্যা হল এই জাতীয় মহল্লায় প্রায় সব বাড়ি একইরকম দেখতে। একই ছাঁচের। রং নেই। ইট বের করা। টানা উঠে গিয়েছে। প্লাস্টারহীন দাঁত বের করা দোতলা তিনতলা, চারতলা। ঘরে ঘরে হানা দেওয়া শুরু হল। রীতিমতো আতঙ্ক ছড়াল। যদিও এই প্রক্রিয়া অত্যন্ত ঝুঁকিবহুল। এবং সম্পূর্ণ আনপ্রফেশনাল। কারণ কিডন্যাপাররা প্রথমেই অপহৃতকে খুন করে দেবে। তারপর চলবে হয়তো এনকাউন্টার। কিন্তু এই কেসের ক্ষেত্রে স্পষ্ট নির্দেশ আছে যেভাবেই হোক আবুধাবির ব্যবসায়ীকে অক্ষত ধরতেই হবে। একটুও আঁচ যেন না লাগে। বেশিরভাগ বাড়িই দেখা গেল আসলে মেস। একটি ঘরে দুটি তিনটি করে ছেলে। তারা আইআইটি এন্ট্রান্স পরীক্ষায় চান্স পেতে চায়। এখানে থাকে আর দিল্লির কোনো না কোনো ইনস্টিটিউটে কোর্স করে। তাঁরা সকলেই ভারতের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা। ভয়ে কম্পমান সকলেই। কোনো লাভই হল না। অপারেশন সম্পূর্ণ ব্যর্থ। এটা সেই জায়গাই না। কিন্তু সবই মিলে গেল যে? গোটা টিম ফিরে এল। সকলেই হতোদ্যম।
এরপর কী?
অন্যদিকে সেদিনই দুপুর আড়াইটের সময় আবার আহমেদ কোয়ার ফোন এল। ভাই তেক্কাত সিদ্দিকি।
ভাইয়া..আমাকে প্রচণ্ড ভয় দেখানো হচ্ছে। মারধরও করা হচ্ছে। তুমি কিছু ভেবো না। আমি টাকা প্রায় জোগাড় করেই ফেলেছি।
এত দেরি হচ্ছে কেন ভাইয়া? (উলটোদিকের ছাদে সবুজ একটা নেট। কার্নিশে প্লাস্টিকের টব।) কান্না..
কেঁদো না ভাই…কেঁদো না
আমাকে এরা মেরে ফেলবে আমাকে বাঁচাও (রাস্তায় জামাকাপড় শুকাচ্ছে..অনেক তারে জামাকাপড় মেলা)
আহমেদ কোয়া এসবই বললেন গোয়েন্দাদের। কারণ তাঁকে আবার মালয়ালি ভাষায় ওই কথাগুলোর মাঝখানেই ভাই এসব ইঙ্গিতগুলো দিয়ে দিয়েছে। সেটাই তিনি জানালেন ফোনে। অর্থাৎ বোঝা যাচ্ছে, তেক্কাতকে যে ঘরে আটকে রাখা হয়েছে সেখান থেকে দেখা যাচ্ছে উলটোদিকের বাড়ির ছাদে একটা সবুজ নেট লাগানো। কার্নিশে সার দিয়ে প্লাস্টিকের টব। টবগুলিতে ফুলের গাছ। আর একবার মাত্র বাইরে উঁকি মেরে দেখতে পেয়েছে রাস্তায় জামাকাপড় শুকাতে দেওয়া হয়েছে। বিরাট লম্বা তার গাছের সঙ্গে লাগানো। সেখানে ঝুলছে জামকাপড় আহমেদ কোয়ার থেকে এই ইনফরমেশন পেয়ে আরও সুবিধা হল। কিন্তু হলে হবে কি? মেন্টাল প্রেশারও তো বাড়ছে। কারণ স্বয়ং অপহৃত নিজেই নিজের জীবনকে বিপন্ন করে ফোনে কিডন্যাপারদের সামনেই দাদাকে কাঁদতে কাঁদতে হলেও মালয়ালি ভাষায় গোপন কৌশলে অনেক ইনফরমেশন দিচ্ছে, আর তা সত্ত্বেও যদি ইন্ডিয়ান পুলিশ বা ডিটেকটিভ এজেন্সি অপরাধীদের ধরতে না পারে তাহলে সেটা হবে এক চরম লজ্জার। আবু ধাবির স্থায়ী বাসিন্দা তেক্কাত সিদ্দিকি। সেই দেশের সরকার থেকে ঘনঘন ফোন করা হচ্ছে ভারত সরকারের কাছে। কালিকটে রীতিমতো বিক্ষোভের পরিস্থিতি। সিদ্দিকির দেশের বাড়ি সেখানে। সব মিলিয়ে প্রবল মানসিক চাপ বাড়ছে। তদন্তকারী গোয়েন্দারা এবার তেক্কাতের ইন্টারন্যাশনাল মোবাইল নম্বরটির কল ডিটেলস চেক করতে নামলেন। দেখা গেল একটা ফোন নম্বর থেকে বারংবার কল করা হয়েছে এই নম্বরে। সেটা স্যাটেলাইট ফোন। নম্বর ০০৮737627। আর তেক্কাতের কাছে লেখা এই নম্বরটির নাম হল বিজয় রাঠোর! কে এই বিজয় রাঠোর? আহমেদ কোয়া জানালেন এই সেই বিজনেসম্যান যার সঙ্গে ভাই সেরামিকস এক্সপোর্ট নিয়ে ডিল করতে গিয়েছে দিল্লি। এবার দেখা যাক দিল্লিতে নেমে আবু ধাবির নম্বর থেকে তেক্কাত কোথায় ফোন করেছিল। সেটা দিল্লির নম্বর। দেখা যাচ্ছে আবু ধাবি থেকে দিল্লিতে ল্যান্ড করেই তেক্কাত যে নম্বরে ফোন করেছিলেন সেটি হল ৯৮১০১। এবং কল রেকর্ড চেক করে দেখা যাচ্ছে সেই নম্বরের লোকটি একটি মেয়ের সঙ্গে অ্যাপয়েন্টমেন্ট করছে। আগামীকাল বিকেলে। বসন্ত কুঞ্জ এলাকায়। একটি সিনেমা হলের সামনে।
বিজয় রাঠোর…..বিজয় রাঠোর….বিজয় রাঠোর….। নামটা চেনা চেনা লাগছে। একইরকম যেন কিডন্যাপ..একইরকম ফোনকল। একইরকম মুক্তিপণ। নামটা কার যেন? দিল্লি পুলিশের স্পেশাল সেলের অফিসার মোহনচাঁদ শর্মা আর রাজবীর সিং পরস্পরের দিকে তাকিয়ে আছেন। দুজনের ভুরু কুঁচকে। একই কথা ভাবছেন? এবং শর্মার মুখে হাসি ফুটে উঠল। ইয়েস…গট ইট! ২০০০ সালে দিল্লির দেশবন্ধু গুপ্তা রোড থেকে অপহরণ করা হয়েছিল এক ব্যবসায়ী এম সি মহাজনকে। সেই কেস ক্র্যাক করেছিলেন তাঁরা। সেখানেও যে ফোন থেকে কল করা হয়েছিল মুক্তিপণের জন্য, সেটির IMEI নম্বর ছিল ৪৪৯১২৩৮৭১৫২ আর এই এখন যে ফোনের সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে সেটিরও IMEI নম্বর এই একই। অর্থাৎ একই ফোন? আগের কিডন্যাপিং কেসের আটজন ধরা পড়েছিল। কিন্তু আসল লোকটা পালিয়ে যায়। তার নাম বীরেন্দর পন্থ। ওরফে ছোটু। আর তার সবথেকে কাছের শাগরেদ চাঙ্কি। এই দুজনের কম্বিনেশন মারাত্মক। উত্তরপ্রদেশের নামজাদা মাফিয়া ডন বাবলু শ্রীবাস্তবের গ্যাং মেম্বার। বীরেন্দর পন্থ হিমাচল প্রদেশের এক হাই প্রোফাইল ধনী পরিবারের সন্তান। হরিয়ানার রাই ইউনিভার্সিটি থেকে পাশ করেছে। হ্যান্ডসাম, স্মার্ট এবং তুখোড় ইংরাজি বলতে পারে। বীরেন্দর আর চাঙ্কি গোটা দেশের অপরাধজগতে কিডন্যাপিং স্পেশালিস্ট। সুতরাং বিজয় রাঠোর আর কেউ নয়। ওই বীরেন্দর পন্থই। তার মানে বিরাট প্ল্যান! আবু ধাবিতে গিয়ে এই তেক্কাত সিদ্দিকির সঙ্গে আলাপ জমিয়েছে বীরেন্দর। নিজেকে দিল্লির বিজনেসম্যান পরিচয় দিয়ে বিশ্বাসও অর্জন করেছে। তারপর ফাঁদ পেতেছে সেরামিকসের এক্সপোর্টের। আর সেই ফাঁদে পা দিয়েই তেক্কাত সিদ্দিকি আবু ধাবি থেকে চলে এসেছে দিল্লি। আর সেই সিদ্দিকি তাহলে আজ বীরেন্দরের কবজায়! আবু সালেম থেকে বাবলু শ্রীবাস্তব। ফজলুর রহমান থেকে কলকাতায় অ্যাটাক করা আফতাব আনসারির সর্বাগ্রে বীরেন্দর আর চাঙ্কি, এই দুজনের টিমকে বুক করে যে কোনো কিডন্যাপিংয়ে। এদের আন্ডারে ১২ জনের একটি নিখুঁত দল আছে। বাছাই করা ক্রিমিন্যাল। ১৭ মার্চ সিবিআই হেডকোয়ার্টারে ফোন করে তেকাত সিদ্দিকির দাদা আহমেদ কোয়া জানালেন, আর সময় দেওয়া সম্ভব নয়। তাঁর ভাইকে বলা হয়েছে এবার মরার জন্য রেডি হতে। সিদ্দিকির পরিবার ৪ কোটি টাকা পর্যন্ত দরকষাকষিতে রাজি হয়েছে। সেই টাকা তারা এবার পেমেন্ট করে ভাইকে বাঁচাবে। আর পুলিশের সাহায্য করার দরকার নেই। জানিয়ে দিলেন কোয়া। নীরজকুমার রাজবীর সিং স্তব্ধ! কারণ তাঁরা বাধা দিতে পারবেন না। সত্যিই তো! এত ব্লু পেয়েও এখনও বিশেষ কোনো ডেভেলপমেন্ট নেই। কোয়া অনেক হেল্প করেছে। যে লোকটা কিডন্যাপড হয়ে আছে সে অনেক হেল্প করেছে। এরপরও কী চায় দিল্লি পুলিশ আর সিবিআই? নীরজকুমার একবার শুধু জিজ্ঞাসা করলেন, আপনার সঙ্গে আপনার ভাইয়ের আজ কথা হয়েছে? কোয়া বললেন হ্যাঁ। কী বললেন তিনি? কোয়া নিস্পৃহ গলায় বললেন, কী বলার কথা? জানেন না! ভয়ে প্রায় হাফডেড। মারধর চলছে। নীরজকুমার বুঝলেন, কোয়া রেগে আছেন। স্বাভাবিক। তবু বললেন, আর কিছু? এবার কোয়া বললেন, হ্যাঁ আজও গোপনে আমাদের ল্যাংগুয়েজে বলল, কাছেই একটা কোনো বিয়ের অনুষ্ঠান চলছে। কারণ প্রচণ্ড জোরে গান বাজছে। ব্যস!
এক নিমেষের মধ্যে রাজবীর সিংকে ফোন করলেন নীরজকুমার। তাঁকে বললেন এই ডিটেইলস। এবং ১০ মিনিটের মধ্যে রাজবীর রিং ব্যাক করলেন। জানালেন, স্যার, পাশের পাড়া সর্বপ্রিয়া বিহারে একটা বিয়ের অনুষ্ঠান চলছে। আর দেরি নয়। সেদিনই বিকেলে আহমেদ কোয়া দিল্লি আসছে টাকা নিয়ে। তাঁকে বলা হল আপনি টাকা দেওয়ার আগে একবার দিল্লি নেমে অন্তত আমাদের জানাবেন। আমরা ডিসটার্ব করব না। আমরা টাইমিং টা বলে দেব। সেই সময়ই টাকাটা দেবেন। কোয়া নিমরাজি হয়েও বললেন, আচ্ছা!
গোটা টিম আধঘণ্টার মধ্যে হাজির হয়ে গেলেন হাউজ খাস এলাকায়। মাথার চুল ছিঁড়তে ইচ্ছা করছে। কারণ যে সাইনবোর্ডে ফোন নম্বর দেখে তারা এই লোকালিটিকে আইডেন্টিফাই করেছেন সেই একই এক্সচেঞ্জ শুধু বেগমপুর নয়, সর্বপ্রিয়া বিহারেও হতে পারে এটা মাথায় আসেনি। যেহেতু ওটা পশ লোকালিটি। সর্বপ্রিয়া বিহার তো বোঝা গেল! কিন্তু ঠিক কোন বাড়িটা? পরপর গলি। সকলে একসঙ্গে যাওয়া হবে না। ঠিক হল একটি গলির এক প্রান্ত থেকে একজন প্রবেশ করবে, অন্য প্রান্ত থেকে আর একজন। আর যে কোনো সন্দেহ হলেই রাজবীরকে ফোন করা হবে। এই অপারেশনে লোক লাগবে। তাই দিল্লি পুলিশ আর সিবিআই মিলে ২১ জনের টিম করা হল। রবিবার। হঠাৎ এলাকায় কিছু অচেনা মুখ সন্দেহজনকভাবে ঘুরছে কেন? প্রায় প্রতিটি গলিতেই মুখে সন্দেহ নিয়ে জরিপ করছে আগন্তুকদের। কারা এরা। নিমেষে একটা ফিসফাস শুরু হল যে কিছু অচেনা মানুষ এলাকায় ঢুকে পড়েছে। বোঝা যাচ্ছে না তারা কারা! মোহনচাঁদ শর্মা আর বক্সিকে ফলো করা হচ্ছে। তাঁরা দ্রুত পায়ে লেন চেঞ্জ করছেন। কিন্তু পিছনে তিনজনে প্রায় তাড়া করছে ক্রূর চোখে। মেহতাব সিংকে ততক্ষণে আটকে দিয়েছে একদল লোক অন্য গলিতে। সমস্যা হল পুলিশের আইডেন্টিটি কখন ডিসক্লোজ করা হবে সেটা প্ল্যানে বলা নেই। তাই কেউই পাবলিকের সন্দেহ ভাঙাতে বলতে পারছেন না তাঁরা যে ডিটেকটিভ এজেন্সির। মেহতাবকে ধাক্কা দেওয়া হচ্ছে। আচমকা সামনে উদয় হলেন রাজবীর সিং। তিনি এসেই মেহতাবকে হাত ধরে টেনে বললেন রান মেহতাব রান…। স্পট মিল গ্যায়া..। মেহতাব দৌড়। শুরু করলেন। নীরজুমার ততক্ষণে একটা গলির সামনে পজিশন নিয়ে দাঁড়িয়ে। তিনিই ফোন করেছেন রাজবীরকে। ফোন করা হয়েছে মোহনচাঁদ শর্মা ও বক্সিকে। ছুটছেন মেহতাব আর রাজবীর। পিছনে একদল জনতা। এবার রাজবীরের হাতে উঠে এল একটা পিস্তল! ঘুরে দাঁড়িয়ে মুখে হাত দিয়ে বললেন, বিলকুল সাইলেন্ট! কোই পিছে নেহি আওগে..পুলিশ..এখানে একটা অপারেশন হবে। চুপ করে ঘরে ঢুকে যাও। ওয়েল বিল্ট, হ্যান্ডসাম, শীতল চোখের রাজবীরের হিসহিসানি থ্রেট শুনে জনতা স্তব্ধ হয়ে গেল। এবং শান্ত হয়ে পিছু হটতে শুরু করল। নীরজকুমার একা দাঁড়িয়ে। তিনি এগোচ্ছেন সামনে। সেখানে একটা ধোপা জামাকাপড়। ইস্ত্রি করছে। এটাই সেই এলাকা যেখানে রাস্তায় জামাকাপড় সার দিয়ে শুকানো হচ্ছে। ধোপাকে জিজ্ঞাসা করা হল এখানে একটা ক্রিমিন্যাল গ্রুপ লুকিয়ে আছে। ধোপাটি কোনো প্রশ্ন করলেন না। কোনো ভয় পেলেন না। শুধু হাত বাড়িয়ে বললেন, তিনটি বাড়ি পরে। ওই যে…। অবাক নীরজকুমার৷ এবং এগিয়ে দেখলেন সত্যিই একটা বাড়ির ছাদে সবুজ নেট। আর তার সামনেই একঝাঁক টব রাখা। লাল রঙের গোলাপ ফুটে আছে। ততক্ষণে উলটোদিক থেকে ঢুকেছেন রাজবীর। তিনি এসেই নীরজকুমারের দিকে তাকিয়ে বুঝে গেলেন কী করতে হবে। চারজনের টিম ভিতরে ঢুকে গেলেন। এবং কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে শোনা যাচ্ছে ভয়ংকর গুলির যুদ্ধের শব্দ। প্রবল আর্তচিৎকার। অবিরল গুলির শব্দে গোটা লেনের দুপাশে জড়ো হচ্ছে সাধারণ বাসিন্দারা। ব্যালকনি টেরেসে ভিড় জমছে। ঠিক তখন যে বাড়ির তিনতলায় চলছে যুদ্ধ সেখানে দোতলার বারান্দায় একটি মেয়ে কোলে বাচ্চা নিয়ে বেরিয়ে এলেন। কাঁদছেন…কাঁপছেন.….….মুঝে বাঁচাও….মেরে বাচ্চেকো বাঁচাও কোই…। নীচে থাকা মেহতাব সিং এক লহমায় গ্রিল ধরে ঝুলতে ঝুলতে একতলার কার্নিশে। একটা দড়ি ঝুলছে। টবে আটকানো। সেটি ধরে তিনি উপরে উঠতে গেলেন। কিন্তু পলকা দড়ি। ছিঁড়ে যেতে পারে। ছিঁড়েও গেল কিন্তু একটা শূন্যে ডিগবাজি খেয়ে দোতলার রেলিং এক হাতে ধরে ফেললেন। অন্য হাতে বাচ্চাটাকে দিতে বললেন। কাঁপতে কাঁপতে মেয়েটি বাচ্চাকে দিল। ততক্ষণে আরও দুজন পুলিশ নীচে দাঁড়িয়েছেন। বাচ্চাকে ফেলে দিলেন মেহতাব। নিখুঁত ক্যাচ নিলেন সেই দুজন। এবার মেয়েটিকে বলা হল নেমে আসতে। মেয়েটি মেহতাবের কাঁধে পা রেখে একইভাবে কোলে। আর নিরাপদে নেমে এলেন।
তিনতলায় গুলি থামছে না। গোটা এলাকা ব্যাক আপে রাখা হয়েছে । আর একটি টিম যাবে উপরে। সেইমতো সিঁড়ির দিকে এগনো হচ্ছে। আচমকা স্তব্ধ সবদিক। গুলি নেই। এক মিনিট…দুই মিনিট…। তিনতলার ব্যালকনির দরজা খুলে গেল। মোহনচাঁদ শর্মার মুখে হাসি, কাঁধে রক্ত, বুকে রক্ত…। ডান হাতে ধরা তেহাত সিদ্দিকির হাত। চিৎকার করে বললেন, স্যার..সাকসেস..। গোটা টিম এবার উপরে উঠে এলেন। দেখা গেল মেঝেতে ব্যালকনিতে সিঁড়িতে রক্তাপ্লুত হয়ে তিনটি দেহ। তারা কারা? স্বয়ং বীরেন্দর পন্থ, চাঙ্কি আর সুনীল নাথানি। এই অপারেশন সম্পূর্ণ সফল হল। অসামান্য সাহসিকতা দেখালেন গোটা টিম। এদিকে ততক্ষণে আর একটি টিম বসন্তকুঞ্জে গিয়ে একটি সিনেমা হলের সামনে থেকে গ্রেপ্তার করেছে অমরকে। সে প্রেমিকার সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিল।
ভারত সরকার হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। নীরজকুমার রাজবীর সিংয়ের প্ল্যানমাফিক তিনতলায় উঠে কিন্তু একাই অপারেশনের নেতৃত্ব দিলেন ইনস্পেক্টর মোহনচাঁদ শর্মা। কারণ তিনি দুর্দান্ত শার্প শুটার। গুলির লড়াইতে তাঁর কখনও লক্ষ্যভ্রষ্ট হয় না। কিন্তু ঠিক ৭ বছর পর ২০০৮ সালে দক্ষিণ দিল্লিরই আর একটি ঘিঞ্জি লোকালিটিতে এরকমই এক শ্বাসরুদ্ধকর অপারেশনে তিনজন সন্ত্রাসবাদীকে ধরতে গিয়েছিল দিল্লি পুলিশের স্পেশাল সেল। নেতৃত্বে ছিলেন মোহনচাঁদ শৰ্মা। সকাল থেকে প্রবল গুলি বিনিময়। রহস্যময়ভাবে একজন সেই এনকাউন্টারে মারা গিয়েছিলেন। সবথেকে আশ্চর্য ব্যাপার, তিনি বুলেটপ্রুফ ভেস্ট পরেননি সেদিন। বাকিরা সকলে কিন্তু পরেছিলেন। কেন? সামনে থেকে নয়। পিছন থেকে গুলিবিদ্ধ হয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন তিনি। কেন? কে সেই পুলিশ অফিসার? মোহনচাদ শৰ্মা! সে তো অন্য গল্প!
