গোলাম আব্বাস লেন ধরে ছুটছে আহমেদ। ছুটছে নবাব শেখ। উদভ্রান্ত হয়ে ছুটছে জব্বার। পিছনে তাকানোর সময় নেই। পুলিশের দলটি একটু আগেই শ্যামলাল লেন ক্রস করেছে বলে খবর দিল আবদুল। এখনই আসবে এই গলিতে। যেভাবেই হোক বিচালি ঘাট পৌঁছতে হবে পুলিশের আগেই। গোটা চোরাই মাল বিচালি ঘাটের সংলগ্ন বাঁশ আড়তে রাখা আছে। কথা ছিল আজ সকালেই কার্তিকের নৌকা করে ওপারে পাঠিয়ে দেওয়া হবে। একবার হাওড়ায় পৌঁছে দিলে আর চিন্তা নেই। মাল যাবে জামালপুর। সেখানেই থাকে কুদ্দুসভাই। সব প্ল্যান আগে থেকেই হয়ে আছে। কিন্তু তার মধ্যে পুলিশের রেইড। আশ্চর্য! পুলিশ কীভাবে খবর পেল? এলাকায় কী খোঁচড় ঢুকেছে? নাকি ডাবল এজেন্ট? আমাদের খবর পুলিশকে দিচ্ছে? আবার আমাদের সঙ্গেও রয়েছে! ছুটতে ছুটতে এসব ভাবছে জব্বার। এই টিমের লিডার। প্রায় পৌঁছে গিয়েছে বিচালি ঘাট। এমন সময় আচমকা সামনে এসে উপস্থিত লতিফের ছেলে নুর। হাঁফাচ্ছে। জব্বার চাচা….. পুলিশ! থমকে গেল জব্বাররা। কোথায় পুলিশ? পিছনেই তো ছিল। সামনেও নাকি? এইমাত্র লেডিস পাড়ায় জিপ এসেছে। বিচালি ঘাটের দিকেও নাকি একটা দল গেল। কতজন আছে? আছে প্রায় ১০ জন। ১০ জন? জব্বার এক মুহূর্তে ভেবে নিল। কি করা উচিত? এই পুলিশবাহিনী কি লোকাল থানার? নাকি লালবাজারের ইডি সেকশন? লোকাল থানার হলে তো আগে জানা উচিত ছিল। ঠিক চলে আসে এসব রেইডের অ্যাডভান্স খবর। তাই আগেভাগেই মাল সরিয়ে ফেলা নিয়ম। কিন্তু কিছুদিন হল ওয়াটগঞ্জ, খিদিরপুর আর গার্ডেনরিচের পুলিশের হাবভাব ভালো ঠেকছে না। কাঠ কাঠ কথাবার্তা বলে কয়েকজন অফিসার। আগে যাঁরা যথেষ্ট হেসে কথা বলতেন। আর সবথেকে বড় কথা হল নাসো ভাইয়াকে ডেকে নাকি বেশ গরম গরম ধমকও দিয়ে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে, যা এতদিন চলে এসেছে, সেইসব কারবার গোটাতে হবে। এসব ভাবতে ভাবতে জব্বার ঠিক করল বাতিখাে দিকে চলে যাওয়াই বেস্ট। ওই দিকটার গলি বেশি সরু। জিপ তো ঢুকবেই না। রুট চেঞ্জ করল জব্বার, নবাব, আহমেদ। কোনোমতে বেরিয়ে সুহানের গ্যারাজে গিয়ে সামনে রাখা মোটরবাইকে বসে স্টার্ট। সুহান জিজ্ঞাসুদৃষ্টিতে কিছু জানতে চাইছিল। হাত নাড়িয়ে জব্বার বলল, ফোর্স এসেছে। হাওয়া গরম আছে। রাতে আসছি। ম্যানেজ করিস।
ঠিক তখন পুলিশবাহিনীটি পৌঁছে গিয়েছে কারবালা লেনে। মুন্না আর শরাফত মসজিদের পিছনের গলিতে আছে, খবর আছে। ওদের ধরতে হবে। এস আই আর দুজন কনস্টেবল জিপ ছেড়ে রাস্তায়। দৌড়চ্ছেন তাঁরাও। শুধু রেইড করে লাভ নেই। মাল ধরা না পড়লে জবাবদিহি করতে হবে বড়সাহেবকে। অবশেষে বিচালিঘাট। খবর ঠিক ছিল। বাঁশের স্তূপ ডাঁই করে রাখা। তার আড়ালেই কাঠের বাক্স। একটি বাক্সের ডালা খুলতেই বেরিয়ে গেল রুপোর বাট। সারি সারি। উপরে রুপোর বাট। প্রত্যেক বাক্সের নীচে কী এগুলো? সাদা সাদা প্যাকেট। একটা প্যাকেট সামনে নিয়েই সাব ইনস্পেক্টর ভদ্রলোক চমকে গেলেন। গাঁজা! ধরতে এসেছিলেন স্মাগলিং-এর রুপো। কিন্তু এ তো দেখা যাচ্ছে নতুন বিজনেস। । গাঁজার সাপ্লাই শুরু হয়েছে? কতদিন ধরে? ভ্রু কুঁচকে গেল। নারকোটিক সেল তার মানে ইনভলভড হয়ে গেল? অন্যমনস্ক হয়ে সাব ইনস্পেক্টর বললেন, জিপ আনাও! সিজার লিস্ট বড় হবে। একটু দূরে বসে সস্তায় রুমাল বিক্রি করতে বসা ৫ বছরের ইকবাল গোটা ঘটনাটি দেখে পুলিশের দলটি চলে যাওয়ার পরক্ষণেই ছুটল হানিফ চাচাকে বলতে… পুলিশ এসেছিল। মাল হাপিশ! কথাটি শুনেই হানিফের মুখ শক্ত হয়ে গেল। দাঁতে দাঁত চেপে শুধু বলল, ইয়ে ওহি নয়ি ডিসি কা কাম হ্যায়। নাক মে দম কর রকখা হ্যায়..অব তো কুছ করনা পড়েগা..সাহাব কুছ করতে কিঁউ নেহি? কে এই সাহাব?
আমার এলাকায় আমি কোনো গ্যাং ওয়ার সহ্য করব না। প্রথম মিটিং-এই বলছিলেন বিনোদ মেহতা। কোনো এলাকা দখল ফখল চলবে না। নতুন দায়িত্বে আসা কলকাতা পুলিশের পোর্ট ডিভিশনের এই ডেপুটি কমিশনার ৩৫ বছরের ঝকঝকে যুবক। বন্দরে আসার পর থেকে তাঁর একটাই মিশন দেখা যাচ্ছে। অপারেশন, রেইড, সার্চ আর শুট। নাম বিনোদ মেহতা। পঞ্জাব ক্যাডারের আইপিএস। প্রবল সাহসী। ১৯৮৪ সাল। কলকাতা পোর্টের ডকইয়ার্ডের অপরাধ চিত্রটি পৃথিবীর সব বন্দর এলাকার মতোই। যেসব কন্টেনার আসে, সেগুলি রাতের অন্ধকারে ভাঙা হয়। কন্টেনারের আসা যাওয়ার মধ্যেই করাচি আর কাবুল থেকে আসে রুপো, গাঁজা, এলএসডি। আর বাইরে স্মাগলিং করা হয় সোনা, বেআইনি ডলার। আর মেটিয়াব্রুজ, গার্ডেনরিচের গরিব মহল্লাগুলির ভাগাভাগি করে নেওয়া হয়েছে কেরোসিনের ব্ল্যাকের জন্য। রেশনে নয়, এসব জায়গায় কার্ডে কেরোসিন পাওয়ার থেকে ব্ল্যাকেই কিনতে হয়। একইভাবে রেশনের চাল, ডাল চলে যাচ্ছে দোকানগুলিতে। প্রতিবাদ করে লাভ নেই। আশরাফের কথা মনে আছে সকলের। আশরাফ আর গুড্ডু শান্তিবাহিনী গড়ে তুলেছিল এলাকায়। ঠিক আড়াই মাসের মাথায় গুড্ডু লাইটহাউসে সিনেমা দেখতে গিয়েছিল। এবং সেখান থেকে ভ্যানিশ! ভ্যানিশ তো ভ্যানিশই। আর পাওয়াই গেল না। এবং আশরাফকে তারপর থেকে আর কেউ এলাকার কোনো ব্যাপারে মাথা ঘামাতে দেখেনি কেউ। সঠিক বার্তা ছিল। আমাদের বিরুদ্ধে মাথা তুললেই ভ্যানিশ! পোর্টের অপরাধ জগতে ক্ষমা নেই। ঠিক এরকমই চলছিল। ধরেই নেওয়া হল আর কোনো পরিবর্তন আসবে না বোধহয়। এই অপরাধ সাম্রাজ্য নিয়তি। আচমকা বন্দর এলাকার অপরাধ জগতে বিনা মেঘে বজ্রপাত। ডিসি বিনোদ মেহতা। এই যুবক আইপিএস অফিসার আসার পর বিজনেস মার খেতে লাগল প্রবলভাবে। কারণ একদিকে যেমন যখন তখন রেইড। মাল ধরা পড়ছে ওয়াটগঞ্জে। ডক ইয়ার্ডে মাঝরাতে হানা। ফ্যান্সি মার্কেটের রিসিভারকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। ফাঁস হয়েছে পকেটমার আর ছিনতাইয়ের র্যাকেট। চুরি, পকেটমার আর ছিনতাই করে অপরাধীরা নিজেদের কাছে সেগুলি রাখে না। ক্যাশ ছাড়া অন্য মূল্যবান সামগ্রী বিক্রির ব্যবস্থা করাই রিসিভারের কাজ। একের পর এক রিসিভার অ্যারেস্ট হয়ে যাচ্ছে। স্মাগলিং প্রায় বন্ধ হওয়ার মুখে। মেটিয়াব্রুজের নিয়ম হল সারাদিন দলের পর দল যুবক, তরুণের দল রাস্তায় আড্ডা মারছে। ক্যারম খেলছে। অপরাধের সঙ্গে যুক্ত হয়ে টাকা কামাচ্ছে। আর অন্যদিকে বাড়ির মেয়ে ও স্ত্রীরা সকাল থেকে রাত প্রচণ্ড পরিশ্রম করে চলেছে সেলাই এর কারখানায়। কারখানা মানে কী? একটি ঘরে আট থেকে ১০ জন বসে দিনভর সেলাই করা, জামাকাপড় তৈরি করা। ঘুড়ি নির্মাণের কারখানাগুলিও এরকমই। মহিলা আর বাচ্চা বাচ্চা ছেলেমেয়েরাই এই দুই ক্ষুদ্র কিন্তু বিস্তীর্ণ ইন্ডাস্ট্রির মূল কারিগর। অথচ সেলাইপিছু টাকা পাওয়া যায় নামমাত্র। যেসব বড় টেলার বা কাপড়ের ব্যবসায়ী অর্ডার দিয়ে যায় তারা ঘরে তোলে মুনাফা। আর এই কারিগরদের দারিদ্র্য আর কখনওই মেটে না। অপরাধ, সেলাইমেশিন, পাঁচ ওয়ক্ত নমাজ আর আজানের শব্দ এবং অন্তহীন বেঁচে থাকার সংগ্রামের ঠিক এরকম একটি সময়ে বন্দর এলাকার রোজনামচায় নতুন একটি চরিত্রের আবির্ভাব হল। ডি সি বিনোদ মেহতা!
এলাকার বম্ব সাপ্লায়ার কার্তিক। জব্বার একদিন এসে কার্তিককে বলল, কোনো খবর পাচ্ছ? কার্তিক বিস্মিত। কী খবর? এলাকা নাকি গরম হচ্ছে? কার্তিক এরকম কোনো খবর পায়নি। তবে আচমকা তার থেকে বোমা সাপ্লাই বেড়ে গিয়েছে। তাহলে কি কোনো আগাম প্ল্যান চলছে? জানা যাচ্ছে না। তবে আচমকা একটা বড় ঘটনা ঘটল। প্রবল ঝামেলা শুরু হয়ে গেল দুই অপরাধ জগতের মধ্যে। ডিসি বিনোদ মেহতার স্ট্যান্ডার্ড নির্দেশ আছে। পাবলিককে বিপদে ফেলা যে কোনো গোলমাল ঠেকাতে প্রথমে নরমে বোঝাতে হবে। তারপর টিয়ার গ্যাস। কিন্তু এসব কিছুতেই সামলানো না গেলে কোনো দ্বিধা না করে গুলি চালাবে। ক্রিমিনালদের প্রতি বিনোদ মেহতার কোনো দয়া মায়া নেই। তাঁর ফিলোসফি হল যেভাবেই হোক সাধারণ খেটে খাওয়া শান্তিপ্রিয় মানুষ যেন কোনোভাবেই নিজেদের বিপন্ন বোধ না করে। আর এটা যেন কেউ না ভাবে যে গার্ডেনরিচ মেটিয়াব্রুজে আইনের শাসন নেই। দাদা মস্তান মাফিয়ারাই এলাকায় প্যারালাল সরকার চালাবে এসব বরদাস্ত করা হবে না। সোজা কথা। একজন ডিসি লেভেলের অফিসারকে কেউ কোনোদিন ওয়াটগঞ্জ, মেটিয়াব্রুজ, খিদিরপুর, গার্ডেনরিচে নিত্যদিন এত বেশি টহল দিতে দেখেনি। তাই সেদিন গুলি চলল। আর দুই যুবকের মৃত্যু হল। ব্যস! জ্বলে উঠল ভিতরে ভিতরে গার্ডেনরিচ। আর এই সুযোগটি নিতে স্রেফ সময়ের অপেক্ষায় রইল লোকাল মাফিয়া গোষ্ঠী। পুলিশের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের ক্ষোভকে সঙ্গে পেলে আর কী চাই। আর ওই ঘটনার পরই খুনি পুলিশের শাস্তির দাবিতে ওয়াটগঞ্জ থেকে গার্ডেনরিচ বিস্তীর্ণ এলাকার গলি মহল্লার দেওয়ালে দেওয়ালে পোস্টার পড়ে গেল। কিন্তু এসবের আড়ালে আসলে কারা আছে? শুধুই কি মাফিয়া জগৎ না। বিনোদ মেহতা নিজের নেটওয়ার্কে ক্রমেই জানতে পেরেছে বন্দর এলাকার অপরাধ সাম্রাজ্য আর কালো অর্থনীতির করিডরটি চলে রাজনৈতিক অঙ্গুলিহেলনে। প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত এই কালো জগৎ। রাজনৈতিক সেই নেতাদের তাঁদের পার্টি রাশ টানে না। কারণ তাঁরা পার্টির ফান্ডে বিপুল যে টাকা জমা দেয় তার একটি বড় অংশই আসছে এই বন্দর থেকে। তাহলে আর পার্টি রাশ টানবে কেন? অতএব ওই নেতা বা তাঁদের টিম উত্তরোত্তর হয়ে উঠেছে অঘোষিত সম্রাট। নবাব ওয়াজিদ আলি শাহের একদা ফেলে যাওয়া সাম্রাজ্যের অধুনা অধীশ্বর। সুতরাং বিনোদ মেহতার লড়াইটা হয়ে গেল ত্রিমুখী। লোকাল পুলিশের একাংশ, রাজনীতিক এবং মাফিয়া গ্যাং। এই তিন প্রতিপক্ষ একদিকে। আর অন্যদিকে তিনি একা।
ঠিক ১০ টায় ফোন বাজছে বিনোদ মেহতার ঘরের ফোনে। ১৮ মার্চ। হোলির দিন। গতকাল ছিল দোলযাত্রা। শহরে ছুটির আমেজ। কোনো গোলমালের খবর তেমন নেই। আর হোলির দিন একটু হালকা প্রিকশান নিলেই হবে। প্রধানত অবাঙালি শ্রেণির মধ্যেই প্রচলিত আজকের উৎসব। ফোন বাজছে। বিনোদ মেহতাকে রাইটার্স বিল্ডিং-এর এক প্রশাসনিক কর্তা বললেন, ওয়াটগঞ্জ পিএস (পুলিশ স্টেশন) ঠিক আছে? মেহতা বললেন, স্যার শুনেছি কিছু ঝামেলা হয়েছে। লোকাল পিএস গেছে স্যার! ওপার থেকে কর্তাটি বললেন, বাট সিএম পার্টি সোর্সে খবর পাচ্ছেন ঝঞ্ঝাটটা নাকি বাড়ছে। একটু মনিটর করে আমায় রিপোর্ট দিন তো! মেহতা বললেন, স্যার আমি স্পটে যাচ্ছি। গুড! বলে ফোন রাখলেন সেই কর্তা। বিনোদ মেহতা বেরিয়ে এলেন। সঙ্গে একমাত্র বডিগার্ড মোক্তার আলি। ডিসি আসছেন। এই খবর দেওয়া হল থানায়। কিন্তু ঘটনাচক্রে আগেই স্পটে পৌঁছেছেন বিনোদ। ঠিক আধঘণ্টা পর স্থানীয় থানার পুলিশ ফোর্স আরও কয়েকজন অফিসারদের সঙ্গে নিয়ে হাজির। এবং তাঁরা আসার সঙ্গে সঙ্গে শুরু হল ইটবৃষ্টি। এবং সঙ্গে বোমাবাজি। পুলিশকে লক্ষ্য করে প্রবল বোমা পড়ছে গার্ডেনরিচ রোডে। দুটি ভাগে ভাগ হয়ে গেল বাহিনী। একটি রইল ব্যাকআপ হিসাবে। বাকি টিম রাস্তা পেরিয়ে আক্রমণকারীদের পালটা জবাব দিতে এগোল। আচমকা একটা ইট সোজা এসে লাগল অ্যাসিস্ট্যান্ট কমিশনার অফ পুলিশ কে শর্মার মাথায়। মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়লেন। গলগল করে রক্ত বেরোচ্ছে। এরকম একটি এসিপি র্যাংকের অফিসারকে এভাবে জখম হতে দেখে পুলিশ কিছুটা দিশাহারা। তাঁকে চিকিৎসার জন্য সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। এবং সেই যাওয়ার পথে আবিষ্কৃত হল ডি সি বিনোদ মেহতার গাড়ি রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু তিনি নেই। কোথায় গেলেন বড়সাহেব? চালক জানালেন, সাহেব ভেতরে! সর্বনাশ! ভিতরে মানে? এই অন্তহীন সর্পিল রহস্যময় গলিগুলির ভিতরে? যেখান থেকে দলে দলে যুবক বেরিয়ে আসছে বোমা আর ইট নিয়ে? সঙ্গে কি ফোর্স আছে? চালক জানালেন কোনো বড় ফোর্স তিনি দেখেননি। শুধু বডিগার্ড মোক্তার। সঙ্গে আরও কিছু পুলিশ কর্মী আছেন। তাঁরা ওই সামনের দিকে প্রথমে গিয়ে তারপর আবার অন্য গলির মধ্যে ছুটেছেন। গোটা পুলিশ বাহিনীর মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল। কারণ গলিতে এখন আর ঢোকাও যাচ্ছে না। কমপ্লিট ব্যারিকেড। হ্যান্ড মাইক আনো। বললেন, এক অফিসার। হ্যান্ড মাইকে ঘোষণা করা শুরু হল আমাদের ভিতরে ঢুকতে দিন…আইন নিজের হাতে নেবেন না… আমাদের সঙ্গে সহযোগিতা করুন…এসব কথার কথা। কেউ শুনছে না। একের পর এক গলি তখন দুর্গ। বাইরে প্রহরা। ভিতরে কী চলছে? তখন ফতেপুরী ভিলেজ রোডের লাগোয়া রমানজান রোডে ছুটছেন বিনোদ মেহতা। মাথায় হেলমেট। প্রথমে ঢোকার পরই সামনের ভিড় থেকে বোমা আর ইটবৃষ্টি শুরু হয়ে যায়। এবং মোক্তার আলি তৎক্ষণাৎ গুলি চালান। একটি আর্তনাদ শোনা গেল। কিন্তু কার গায়ে লাগল সেই গুলি? কিছু বোঝার আগেই আচমকা পাশের একটি গলি থেকে একঝাঁক জনতা বেরিয়ে এসে তাড়া করল। তাদের হাতে রড, তলোয়ার এবং কান্ট্রিমেড রিভলবার। এরা কোনোভাবেই থামবে না। অতএব আগে বাঁচতে হবে। বিনোদ মেহতা পিছু হটলেন। তিনি ধরে রেখেছেন এখনই আর কিছুক্ষণের মধ্যেই এসে যাবে বাকি ফোর্স। থানা আসছে না কেন এখনও? মোক্তার কোথায় গেল? দুটো ইট এসে লাগল বিনোদের কাঁধে আর পায়ে। তিনি আরও জোরে দৌড়োচ্ছেন। পিছনে উন্মত্ত একদল লোক। মুখে আওয়াজ মার ডালো…সামনেই মসজিদ। একমিনিটও ভাবার সময় নেই। মসজিদ চত্বরে ঢুকে পড়লেন বিনোদ। কিন্তু নিমেষের মধ্যে গোটা মসজিদ ঘিরে ফেলা হল। মানা হল না কোনো রীতিনীতি। বোমা বৃষ্টি চলছে। মসজিদ লক্ষ্য করেই। এরকম অবস্থায় মসজিদ-এর মধ্যে লুকিয়ে লাভ নেই। এখনই ওই জনতা ঢুকে আসবে। বিনোদ একটি জানালা থেকে রাস্তায় লাফ মারলেন। গার্ডেনরিচ রোডের দিকে বাত্তিকল। আর একটু দূরে যেতে পারলে গার্ডেনরিচ রোডে যাওয়া যাবে। কিন্তু জনতা পিছনে চলে এসেছে। সবথেকে বড় আতঙ্ক হল সংখ্যাটা বাড়ছে। প্রতিটি গলি পেরনোর সময় আরও দু চারজন করে তাড়া করতে শুরু করেছে। সামনেই হাউস নম্বর ২২৮ বাই থ্রি। ইতিমধ্যেই সেখানে সাহেবের কাছে চলে এসেছেন মোক্তার। তিনি সামনে রুখে দাঁড়ালেন। সাহেবকে বললেন, স্যার আপনি পালান। আমি দেখছি। বিনোদ পাগলের মতো হাত ধরে টানছেন মোক্তারকে। মোক্তার পাগল হয়ে গেলে নাকি? তুমি একা কী করবে? চলো আমার সঙ্গে। গোটা ঘটনাটি দেখছে ভয়ে সিঁটিয়ে যাওয়া এই সরু গুলির নিরীহ কিছু সাধারণ বাসিন্দা। তারা জানে নিজেদের ঘরে আশ্রয় দিলে তাদেরও সঙ্গে সঙ্গে প্রাণে মেরে ফেলা হবে। কারা আছে ওই দলে? এলাকার একের পর এক নটোরিয়াস ক্রিমিনাল। বিনোদ মেহতা জোর করে মোক্তারকে সঙ্গে নিয়ে আবার ছুটলেন। গার্ডেনরিচের বন্দর এলাকায় এক গলির গলি তস্য গলিতে ভরদুপুরে চলছে মরণপণ এক চেজিং। কোথায় আর বেশিদূর যাবেন? উপায় নেই। এবার আবার সামনে পেলেন দুটি বাড়ি। মোক্তার ঢুকলেন সামনের বাড়িতে। বিনোদ ঘটনাচক্রে যে বাড়িতে ঢুকেছেন সেটি এক পুলিশ কনস্টেবলের বাড়ি। আবদুল লতিফ খান। দরজা ধাক্কা দিতেই দরজা খুলে দিয়েছিল মহম্মদ হাদিস খান। আবদুল লতিফ খানের পুত্র। বিনোদ হাঁফাচ্ছেন। তিনি এতক্ষণে পিছনে আসা জনতার কয়েকজনকে চিনে গিয়েছেন। নামকরা গুন্ডা। আর আচরণ থেকেই পরিষ্কার জনতার হাতে গণপিটুনির নামে এদের আজকের প্ল্যান তাঁকে হত্যা করা। মহম্মদ হাদিস খান কাঁপছে ভয়ে। খাকি পোশাক। মাথায় হেলমেট। হাতে পিস্তল। গোটা শরীর ঘামছে। মাথায় যেন সামান্য রক্তের ছাপ। বিনোদ মেহতা কোনোমতে বললেন, ভেতরে ঢুকতে দাও…আমাকে মেরে ফেলতে আসছে..। হাদিস সরে এল দরজা ছেড়ে। দ্রুত ঘরে ঢুকে এলেন বিনোদ। কেউ কি দেখেছে তাঁকে এই বাড়িতে ঢুকতে? তিনি নিঃশ্বাস নিচ্ছেন না। পাছে বাইরে থেকে শ্বাসের শব্দ পাওয়া যায়! শুধু কোনোমতে দরজা বন্ধ করে দিতে বললেন। কাঁপতে কাঁপতে দরজা বন্ধ করেছে হাদিস। একটুক্ষণের স্বস্তি। এক সেকেন্ড……তিন সেকেন্ড….এক মিনিট…প্রতিটি মুহূর্ত যেন একটি করে ঘণ্টা। হঠাৎ হো হো হো হো করে শব্দ। খুঁজছে ওরা। এই বাড়ির বাইরে এসে পড়েছে। কী করবেন এখন বিনোদ? বিনোদ চাপা স্বরে জানতে চাইলেন বাথরুম কোনদিকে? তিনি নিজেকে এখানে নিরাপদ বোধ করছেন না। জানেন যে কোনো মোমেন্টে অ্যাটাক করবে। কারণ এই বাড়িতে তাঁকে ঢুকতে অনেকেই দেখেছে। তারা ভয়ে হোক বা ইচ্ছা করেই হোক বলে দেবেই। একটি হেরে যাওয়া লড়াইয়ের শেষ দৃশ্যের যেন অভিনয় সম্পাদিত হচ্ছে। কারণ বাথরুমে ঢুকে ভিতর থেকে দরজা বন্ধ করে দিয়ে বাঁচতে চেয়েছিলেন বিনোদ মেহতা। এক মিনিটের পরই দরজায় প্রবল ধাক্কা। তাঁকে টেনে বের করে আনা হল। কিচেনের সামনে দাঁড় করানোর পর বিনোদ মেহতা প্রথমেই বললেন, আমি ডিসি পোর্ট। তুমলোগ বহোত বড়ি এক গলতি কর রহে হো…মুঝ পর আঁচ আনে সে কেয়া হো সাকতা হ্যায় পাতা হ্যায় তুমহে?… খাকি ড্রেস, মাথায় হেলমেট। পুলিশ তো বোঝা গেল। ডিসি যে তার প্রমাণ কী? দুষ্কৃতীরা ভাবল বাঁচার জন্য ডিসি সাজছে। আসলে ডিসি. নয়। অতএব মারো! কিছু একটা পকেট থেকে বের করতে যাচ্ছিলেন বিনোদ। হয়তো আই কার্ড। কিন্তু সেই সুযোগ পাননি। প্রথমেই মাথায় একটি লোহার রড দিয়ে মারা হল। ওই ধাক্কা সামলাতে পারেননি বিনোদ। মাটিতে পড়ে যান। এবং তৎক্ষণাৎ হেলমেট খুলে আসে। লোহার রডটি ছিল নাসিমের হাতে। আশেপাশে জড়ো হওয়াদের মধ্যে রয়েছে লোকমান, পুত্তন, চৌধুরী আর আখতার আর আলি। হেলমেট খুলে যেতেই খোলা মাথায় দ্বিতীয়বার লোহার রড দিয়ে মারা হল। যাতে মাথাটি চৌচির হয়ে যায়। বিনোদ মেহতাকে ঘিরে তখন উন্মত্ত কিছু হত্যাকারী। বিনোদ তখনও জানেন না একটু আগেই মোক্তার আলিকে আশ্রয় নেওয়া বাড়ি থেকে বের করে কুপিয়ে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। পা কেটে নেওয়া হয়েছে। শরীরের কয়েকটি অংশ ছিন্ন করা হয়েছে। আর এবার রডের দ্বিতীয় আঘাতে বিনোদের মাথা ফেটে গেল। ফিনকি দিয়ে রক্ত বেরোচ্ছে। এরপর বাকিদের পালা। তলোয়ার আর ড্যাগার চালানো হল। কেউ পেটে। কেউ পিঠের দিক থেকে। বুকের বাঁদিক লক্ষ্য করে একবার ছুরি ঝলসে উঠল। একটুখানি কেঁপে নিথর হয়ে গেলেন বিনোদ মেহতা। তবে তাঁর চোখটি তখনও খোলা। সেটিকে ছুরি দিয়ে কেটে দেওয়া হল। এখানেই সমাপ্ত নয় এই রক্তলীলা। কলকাতার বুকে হোলির দিন এক আইপিএস অফিসারের শরীর থেকে এরপর পুলিশের ইউনিফর্ম খুলে নিয়ে নগ্ন করা হল। তাঁকে ওই সরু গলির পাশের নর্দমায় পা দিয়ে ঠেলে ঠেলে নিয়ে গিয়ে ফেলে দেওয়া হল। আর বডিগার্ড মোক্তারের ভাগ্যে কী ঘটল? তাঁর ছিন্নভিন্ন শরীরে স্রেফ আগুন ধরিয়ে দিল একঝাঁক উন্মাদ। কলকাতা পুলিশ, রাজ্য সরকার এবং ইনটেলিজেন্স ব্রাঞ্চের কাছে কলঙ্কদাগ হয়ে গেল ডিসি পোর্ট বিনোদ মেহতা হত্যাকাণ্ড।
মাত্র ১৯ বছর বয়স ছিল বীণার। বিয়ে হয়েছিল মাত্র ২৪ বছরের যুবকের সঙ্গে। ছেলেটি ছিল পাঞ্জাবি পরিবারের এক নিখাদ ভালোমানুষ। আইপিএস পরীক্ষা দিয়ে সবেমাত্র নতুন পোস্টিং। কী সুন্দর এই বাংলাটা তাই না? লোকগুলো একেবারে আমাদের পাঞ্জাবের মতো জানো তো? অতিরিক্ত আবেগপ্রবণ জাতি। বিনোদ এভাবেই প্রতিদিন খাবার টেবলে গল্প করত। জেলাগুলোয় পাওয়া যেত এক নিরালা নির্জনতার সময়। অবসরে বই পড়ত বিনোদ। কোনোদিন সেভাবে অপরাধ জগতের কাহিনি কিংবা কোন অপারেশনে তাঁকে কতটা বিপদে পড়তে হয়েছিল এসব কথা বলেনি বিনোদ। বীণা মন্ত্রমুগ্ধ ছিলেন এই লোকটিকে পাশে পেয়ে। দুজনের সময় কীভাবে কাটত? বিনোদের প্রিয় শখ ছিল হর্স রাইডিং আর সুইমিং। কিন্তু একা নয়। ছুটির দিন সকালে বীণাকে জলদি ঘুম থেকে তুলে বিনোদের একমাত্র কাজ ছিল তাঁকে রাজি করানো একসঙ্গে হর্স রাইডে যাবে। কলকাতাকে বিশ্বের সেরা শহর লাগে বিনোদের। কারণ একটাই। এই যে ময়দান। এরকম এক মন ভালো করা সবুজের সমারোহ আর কোথায় আছে? ভালো লাগে কলকাতা। ভালো লাগে কলকাতার মানুষগুলোকে।
কতবার তো বাড়ি থেকে বলছিল দিল্লিতে ডেপুটেশনে চলে আসতে। তাহলে আত্মীয়স্বজনের কাছে থাকা সম্ভব। কিন্তু না। বিনোদ যাবেন না কলকাতা ছেড়ে। ৯ বছরের পুত্র ঋশুকে সঙ্গে নিয়ে এই দম্পতিটি ছিল সুখী পরিবারের একটি ফোটোফ্রেম। তাই ১৯৮৪ সালের ১৮ মার্চের পর বীণা মেহতার পৃথিবীটি দুলে উঠেছিল। বিনোদকে এভাবে কেউ হত্যা করতে পারে? বিনোদকে? সম্ভব নাকি? বিশ্বাসই করেননি বীণা। তিনি চলে গিয়েছিলেন এক অতল ডিপ্রেশনের অন্ধকার জগতে। দিনের পর দিন চলেছে চিকিৎসা। পুত্র ঋশুকে নিয়ে এক অবসাদগ্রস্ত মায়ের সেই লড়াই চলেছিল মাসের পর মাস বছরের পর বছর। কলকাতা পুলিশে নিয়মমাফিক চাকরি হয়েছিল। কিন্তু ২৯ বছর কোনো প্রমোশন হয়নি। বিনোদ মেহতার স্ত্রী। এই পরিচয়টি হয়ে উঠেছিল যেন এক মিউজিয়মে দ্রষ্টব্য বস্তু। সেই বীণা আর বিনোদের পুত্র পরবর্তী সময়ে অস্ট্রেলিয়ার নাগরিক। পুত্র অনেকবার বলেছিলেন মাকে সেখানে চলে যেতে। কলকাতা তো তাঁদের হৃদপিন্ডকে কেড়ে নিয়েছে। তাহলে কেন কলকাতায় থাকব আমরা? কিন্তু বীণা কলকাতা ছেড়ে যেতে চাননি। বিনোদ এই শহরকে ভালোবেসেছিল। এই শহরে বিনোদ আছে। কিন্তু এই শহর কী মনে রেখেছে বিনোদ মেহতাকে?
১৯৮৪ সালে গার্ডেনরিচের একাধিক স্থানে অভিযান আর সার্চ অপারেশন হবে এরকম আগেই ঠিক ছিল। তাহলে সেদিনই বেছে বেছে দাঙ্গা বাঁধানোর উপক্রম হয়েছিল কেন? কেনই বা নকল দাঙ্গার আতঙ্ক ছড়িয়ে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়েছিল গুন্ডাবাহিনী? অপারেশনের ঠিক আগের দিনই কেন একের পর এক পুলিশ অফিসার ছুটির দরখাস্ত দিয়ে ছুটি নিয়েছিলেন? অন্যতম প্রধান অভিযুক্ত ইদ্রিশ আলিকে এত কষ্ট করে গয়া থেকে গ্রেপ্তার করে আনা হল। অথচ লালবাজারের পুলিশ লক আপে তাঁকে মৃত অবস্থায় পাওয়া গেল। কেন? জেরার সময় ঠিক কোন কোন রাজনীতিকের নাম ফাঁস করেছিল ইদ্রিশ আলি? শুধুই মাফিয়া অথবা স্মাগলার? নাকি এদের পিছনে থাকা সেই রাজনীতিকদের সাজানো বাগানে হানা দিয়েছিলেন বিনোদ মেহতা। তাই কি তাঁকে সরিয়ে দেওয়ার প্ল্যান? এসব প্রশ্নের উত্তর মেলেনি কিন্তু! কে ছিল সেই হানিফের ‘সাহাব’? জানা গেল না আজও….।
