কত টাকার নোট ছিল? একটা সুটকেসে কি ৬৭ লক্ষ টাকা ধরতে পারে? যদি ধরাতেই হয় তাহলে নোটের বিন্যাস কেমন হওয়া উচিত? অর্থাৎ ১০০ টাকার নোট? নাকি ৫০০ টাকার নোট? ৭ নম্বর রেস কোর্স রোড অর্থাৎ প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনে স্পেশাল প্রোটেকশন গ্রুপ দুটি জিনিস কখনওই অ্যালাউ করে না। ১) কোনো বন্ধ সুটকেস নিয়ে কেউ ভিতরে যেতে পারবে না। আর ২) দর্শনার্থীদের নিজের গাড়িতে সোজা প্রাইম মিনিস্টারের অফিসের লবিতে যাওয়ার অনুমতি নেই। হর্ষদ মেহতা এর কোনোটাই মানেননি। এটা হতে পারে? ১৯৯২ সালে শেয়ার কেলেঙ্কারিতে হর্ষদ মেহতা নামের রাজকোটের এক ব্যক্তি সরকারি ব্যাংকিং ব্যবস্থার বজ্র আঁটুনি ফসকা গেরো আর চরম দুর্নীতির স্বরূপটি প্রকাশ করে ফেলার পর যতটা না সেই দুর্নীতির তদন্ত নিয়ে সাধারণ মানুষ কিংবা সংবাদ মাধ্যমের আগ্রহ ছিল, তার থেকে ঢের বেশি কৌতূহল হয়ে দাঁড়াল প্রধানমন্ত্রী নরসিংহ রাও কি এক কোটি টাকা ঘুষ নিয়েছেন হর্ষদের থেকে? নাকি নেননি? হর্ষদ সত্যি বলছে? নাকি প্রধানমন্ত্রী সত্যি বলছেন? কী হয়েছিল সেদিন? ৪ নভেম্বর ১৯৯১? সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ হল টাইমিং। অর্থাৎ সকাল ১০ টা বেজে ৪৫ মিনিট। সিবিআই এবং যৌথ সংসদীয় কমিটির কাছে হর্ষদ মেহতা যা বলেছিলেন তা হল, বম্বে থেকে আনা হয়েছিল দুটি সুটকেস। দিল্লির হোটেলে এসেই একটি সুটকেসের ৬৭ লক্ষ টাকা এবং অন্যটির ৩৩ লক্ষ টাকা বের করে সিঙ্গল একটি সুটকেসে ভরা হল। তিনি এবং তাঁর ভাই নিজেদের গাড়িতে পৌঁছলেন প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনে। সঙ্গে সৎপাল আর সুনীল মিত্তল। প্রথমেই তাঁদের নিয়ে যাওয়া হয়েছিল আর কে খান্ডেলকরের চেম্বারে। এই সেই ব্যক্তি যিনি প্রাইম মিনিস্টারের ব্যক্তিগত সচিব। আর এই খান্ডেলকরের সঙ্গেই ফোনে কথা হয়েছে হর্ষদের। তাঁকেই দেওয়া হল সুটকেস। এক কোটির। চারজন যাওয়া হল প্রধানমন্ত্রীর চেম্বারে। না। নেই প্রধানমন্ত্রী। তবু আসবেন। একটু পরে। চারজনই অপেক্ষা করছিলেন কখন আসবেন প্রধানমন্ত্রী। সেদিন ছিল সোমবার। অর্থাৎ রীতি অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর দেখা করার দিন। সুতরাং সকালেই বেরিয়ে গিয়েছেন নরসিংহ রাও। কিছুক্ষণের প্রতীক্ষা। হ্যাঁ। অবশেষে ফিরলেন প্রধানমন্ত্রী। লাঞ্চের জন্য। এবং চেম্বারে ঢোকার আগে তাঁদের আঙুল দিয়ে ইশারা করলেন ভেতরে আসতে। খান্ডেলকর বললেন, আপনারা এগোন। আমি এখনই আসছি। ঠিক সেই সময় প্রধানমন্ত্রীর চেম্বারে ঢুকছেন এমন এক ব্যক্তি যিনি একঝাঁক সরকারি ব্যাংকের টাকা বন্ড কেনার নাম করে নিজের অ্যাকাউন্টে ঢুকিয়েছেন। আর মাঝপথে সেই টাকায় বেনামী শেয়ার কিনে সেইসব শেয়ারের দাম চড়িয়ে দিয়েছেন কৃত্রিমভাবে। সম্পূর্ণ মাছের তেলে মাছ ভাজা। নাম তার হর্ষদ। আদরের নাম বিগ বুল। প্রাথমিক আলাপচারিতার মধ্যে ঘরে ঢুকলেন আবার খাল্ডেলকর। সঙ্গে একটি সুটকেস। সেই সুটকেস দেওয়া হল প্রধানমন্ত্রীকে। রাও ব্যস্ত। তাঁকে আবার অফিস যেতে হবে। সুতরাং তাঁর পক্ষে আর বেশিক্ষণ সময় দেওয়া সম্ভব নয়। মিটিং শেষ। কিন্তু ওই কয়েকটি মুহূর্তই কি ভারতের রাজনীতির প্রতি এক চির বিশ্বাসহীনতার প্রশ্ন উত্থাপন করে চলে গেল? কারণ খোদ হর্ষদ যখন জানালেন আর কাউকেই নয়, স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীকে তিনি এক কোটি টাকা ঘুষ দিয়েছেন শেয়ার কেলেঙ্কারির লাইসেন্স হিসাবে। গোটা দেশে আগুনের মতো ছড়িয়ে গেল সেই সংবাদ। মিডিয়ায় তোলপাড়। বিরোধীরা আখ্যা দিলেন চোর প্রধানমন্ত্রী। আর এখানেই চমক। কারণ হর্ষদের এই দাবির সঙ্গে অসংখ্য ঘটনাপঞ্জি আর প্রটোকল মিলছে না। তদন্ত যতই এগোল আর আদালতে শুনানির সময় দেখা গেল হর্ষদের বক্তব্যে প্রচুর ফাঁক থেকে যাচ্ছে। এবং আশ্চর্যজনকভাবে ফাঁক রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর হয়ে সরকারপক্ষের সওয়ালেও। কী জানাল সরকারপক্ষ?
প্রধানমন্ত্রীর সিডিউল। সোমবার ৪ নভেম্বর ১৯৯১। দিল্লি পুলিশের ভিভিআইপি মুভমেন্টের লগবুকে দেখাচ্ছে প্রধানমন্ত্রী বাসভবন থেকে বেরিয়েছেন সকাল ৯টা ১২ মিনিট। কারণ সেদিন সোমবার। প্রধানমন্ত্রীর ব্রেকফাস্ট মিটিং ছিল রাষ্ট্রপতির সঙ্গে। ঠিক ৯টা ১৬-তে প্রধানমন্ত্রী পৌঁছলেন রাষ্ট্রপতি ভবন। ৯টা ৫৫। ব্রেকফাস্ট মিটিং শেষ। প্রধানমন্ত্রী বেরিয়ে গেলেন সাউথ ব্লক অর্থাৎ তাঁর অফিসের উদ্দেশে। রাষ্ট্রপতি ভবনের লাগোয়া সেই অফিস। টাইম লাগল এক মিনিট। ৯টা ৫৬। দুপুর ১টা ১২ মিনিট। প্রধানমন্ত্রী বাসভবনে চলে গেলেন। ১টা ১৬, পৌঁছলেন বাসভবন। লাঞ্চ আর বিশ্রাম। বিকেল ৪টে ৫০, আবার প্রধানমন্ত্রী অফিস গেলেন। এবং সাউথ ব্লক পৌঁছলেন ৪টে ৫৫। এরপর আর কোথাও যাননি। সাউথ ব্লক থেকে রাত ৮টা ২৭ মিনিটে নরসিংহ রাও বাসভবনে ফিরে যান। এটি হল তাঁর মুভমেন্টের খুঁটিনাটি। এবার দেখা যাক যতক্ষণ তিনি সাউথ ব্লকে ছিলেন সেখানে কী কী করলেন। সকাল ১০টা, ক্যাবিনেট কমিটি অফ পলিটিক্যাল অ্যাফেয়ার্সের মিটিং। রাষ্ট্রপতি ভবন থেকে ফিরে। একে বলা হয় সিসিপিএ মিটিং। সেটি শেষ হয়েছিল সাড়ে ১০টায়। পাকিস্তানের একটি ডেলিগেশন দলের সঙ্গে অ্যাপয়েন্টমেন্ট। ১১টা ১৫। যে দলের নেতৃত্বে ছিলেন পাকিস্তানের বিদেশমন্ত্রী আগা শাহি। সিসিপিএ মিটিং শেষ হয়েছিল সাড়ে ১০টায়। আর পাকিস্তানের নিধিরা ১১টা পাঁচের মধ্যেই ঢুকে গিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রীর চেম্বারে। তাহলে হর্ষদের সঙ্গে কখন দেখা করতে গেলেন তিনি? এই বক্তব্যটি সঠিক ধরতে হলে মেনে নিতে হবে প্রধানমন্ত্রী নরসিংহ রাও ওই এক কোটি টাকার জন্য এতই আকুল ছিলেন যে, দুটি মিটিং এর মাঝখানের আধঘণ্টার মধ্যে তিনি আবার বেরিয়ে গিয়েছিলেন অফিস থেকে? এবং বাসভবনে গিয়ে হর্ষদের সঙ্গে দেখা করে টাকা ভর্তি দুটি সুটকেস নিয়ে কোনো একটি গোপন স্থানে রেখে আবার ফিরে এসেছিলেন অফিসে? আর তারপরই স্বাভাবিকভাবে পাকিস্তানের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক? এটা কি হয়েছিল? এটা কি সম্ভব? সরকার অস্বীকার করে। হর্ষদের আইনজীবী রাম জেঠমালানির পুত্র মহেশ জেঠমালানি বলেছিলেন, রেস কোর্স রোডের লগবুক দেখানো হোক। অর্থাৎ সকাল ১০টা ৪৫-এ সেদিন কারা এসেছিলেন সেটা নিশ্চয়ই থাকবে। কারা তাঁরা? এখানেই ধোঁয়াশা। কারণ স্পেশাল প্রোটেকশন গ্রুপ জানাচ্ছে, ভিজিটরদের লগবুক দু’মাসের জন্য আপডেট করা থাকে। রেখেও দেওয়া হয়। তারপর আর সেটি রক্ষিত করার ব্যবস্থা নেই। কী বলেছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরসিংহ রাও? বলেছিলেন, “আমি রামায়ণের সীতা মায়ের মতো অগ্নিপরীক্ষা দিতে রাজি আছি। অগ্নিপরীক্ষাতেও পাশ করে যাবো।” এটা ঠিকই যে হর্ষদের ওই দাবি কোনোভাবেই প্রধানমন্ত্রীর শিডিউলের সঙ্গে মানানসই নয়। আবার এটাও ঠিক হর্ষদ ঠিক তার আগের কয়েকদিন ধরে পাগলের মতো টাকা তুলেছেন একের পর এক ব্যাংক থেকে। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করার কথা ৪ নভেম্বর। সিবিআই এর রেকর্ড থেকে দেখা যাচ্ছে, ২ নভেম্বর হর্ষদ এ এন জেড গ্রিন্ডলেজ ব্যাংক থেকে তুলেছেন ১০ লক্ষ টাকা। সেটি ছিল ফোর্ট ব্রাঞ্চ। এরপর সেদিনই স্টেট ব্যাংক অফ ইন্ডিয়ার বম্বে মেইন ব্রাঞ্চ থেকে ৩০ লক্ষ টাকা। ওই টাকার পাশাপাশি হর্ষদের নিজের সোর্স থেকে যোগাড় হয়েছে ১৫ লক্ষ টাকা। এটাও তো প্রশ্ন তিনি এত টাকা কেন তুললেন? আর কাকেই বা দিলেন?
৪ নভেম্বর ১৯৯১। আইসি ১৮৩। ইন্ডিয়ান এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট। দুই প্যাসেঞ্জারের নাম হর্ষদ মেহতা এবং অশ্বিন মেহতা। হর্ষদের ভাই। সিট নম্বর জে ১১ এবং ১২। জে ক্লাস। মানে বিজনেস ক্লাস। কত ছিল তাঁদের লাগেজের ওজন? সিবিআই সূত্রে জানা যাচ্ছে ৬৭ কেজি। দুটি সুটকেস। ৫৫ লক্ষ টাকা। সেই যে হিন্দিতে বলা হয় না “কাহানি মে টুইস্ট?” এবার সেটা হবে। কারণ সেদিন বিকেলের ফ্লাইটে আবার দুই ভাই ওই একই ফ্লাইটের রিটার্ন জার্নিতে বম্বে ফিরে এসেছিলেন। অর্থাৎ আইসি ১৮৪। এবং কী আশ্চর্য। দিল্লি যাওয়ার সময় সঙ্গে থাকা দুটি সুটকেস বম্বেতে ফেরার সময় ছিল না!! এয়ারপোর্টে বোর্ডিং পাস রেকর্ড চেক করে দেখা গেল এটা সত্যিই। কোথায় গেল সেই দুটি সুটকেস? ঠিক কী হয়েছিল সকাল ১০ টা ৪৫ মিনিটে দিল্লি তথা ভারতের সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ ঠিকানায়? ৭ নং রেস কোর্স রোডে? আজও অজানা।
ঠিক কী ছিল ১৯৯২ সালের কেলেঙ্কারি? গুজরাতি জৈন পরিবারে জন্মগ্রহণ করা হর্ষদ মেহতার বাবা মুম্বইয়ের কান্দিভিলিতে ব্যবসায় বিশেষ সুবিধা করতে না পেরে মধ্যপ্রদেশের রায়পুরে চলে এসেছিলেন (তখনও ছত্তিশগড় হয়নি)। হোলি ক্রস বায়রন বাজার হাই স্কুলের ছাত্র হর্ষদ মোটেই পড়াশোনায় ভালো ছিল না। পরিবারটি ফিরে আসে বম্বে। নিউ ইন্ডিয়া অ্যাসুরেন্স সংস্থার সামান্য বিমা বিক্রেতা হিসাবে কেরিয়ার শুরু করা হর্ষদের প্রবেশ ঘটল শেয়ার মার্কেটে ১৯৮০ সালে। বি অম্বালাল অ্যান্ড সনস্ নামের একটি ব্রোকারেজ সংস্থায় ডেইলি ডিল ডেস্কে। এবং মাত্র ১০ বছরের মধ্যে তাঁকে বলা হল শেয়ার মার্কেটের অমিতাভ বচ্চন। কারণ ১৯৯০ সালের মধ্যে তাঁর নিজের ফার্ম গ্রো মোর রিসার্চ অ্যান্ড অ্যাসেট ম্যানেজমেন্টের মাধ্যমে নামীদামি মানুষ ও সংস্থা শেয়ার কেনাবেচায় যুক্ত হয়েছিলেন। তখন রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক সরাসরি কোনো শেয়ার কিনতে পারত না মার্কেট থেকে। তাদের নিয়ম ছিল বন্ড ক্রয় করা অথবা অন্য ব্যাংকের সিকিউরিটিজ আর বন্ড কেনাবেচা অনুমোদিত ছিল। হর্ষদ এটাই ধরলেন। ব্যাংকগুলিকে তিনি বললেন বেশি সুদ পাইয়ে দেবেন। তাঁর সংস্থার মাধ্যমে যদি কেনা হয়। আর রিটার্নও দারুণ। সেই টোপে পা দিয়েছিল একাধিক ব্যাংক। হর্ষদ সহজ একটি পন্থা নিলেন। ব্যাংকের টাকায় বন্ড কেনার আগে সেই টাকা নিজের অ্যাকাউন্টে চালান করে দিলেন। আর বিভিন্ন বাছাই করা শেয়ার বিপুলভাবে কিনতে শুরু করে দিলেন। যার ফলে ওইসব সংস্থার শেয়ারের দাম চড়তে শুরু করল। যার প্রধান উদাহরণ অ্যাসোসিয়েটেড সিমেন্ট কোম্পানি। অর্থাৎ এসিসি সিমেন্ট। ১৯৯১ সালে যে সংস্থার
শেয়ারের দাম ছিল ২০০ টাকা, সেটি মাত্র তিন মাসের মধ্যে পৌঁছে গেল ৯ হাজার টাকায়। এবার বিক্রির পালা। একই সঙ্গে আর একটি পন্থা ছিল ‘বি আর’। অর্থাৎ ব্যাংক রিসিপ্ট। জাল ‘ব্যাংক রিসিপ্ট’ ইস্যু করে বাজার থেকে টাকা তোলা। জীবনে কেউ নাম শোনেনি এরকম দুটি ব্যাংককে বেছে নেওয়া হয়েছিল। ব্যাংক অফ কারাদ। এবং মুম্বই মার্কেন্টাইল কো অপারেটিভ ব্যাংক। এই দুই ব্যাংকের রিসিপ্ট হাতে পেয়েই লগ্নিকারীরা বিশ্বাস করল তাঁদের টাকা জমা হয়েছে বাজারে। যার মধ্যে ব্যাংকও আছে। আসলে হয়নি। ঠিক যখন তিনি তুমুলভাবে বিক্রি শুরু করে দিলেন তাবৎ শেয়ার, সেদিনই দেউলিয়া হয়ে গেল বহু ব্রোকার আর লগ্নিকারী। শেয়ার মার্কেট ব্যাপকভাবে ক্র্যাশ করল। ৬৮৬৮ কোটি টাকার দুর্নীতি। স্টেট ব্যাংকের লোকসান ৬৭০ কোটি টাকা…ইউকো ব্যাংক ৩৯ কোটি টাকা…ব্যাংক অফ সৌরাষ্ট্র ১৭৯ কোটি টাকা….একের পর এক ব্যাংক আবিষ্কার করল তাদের সম্পূর্ণ বোকা বানানো হয়েছে সিকিউরিটিজ কেনার নামে। আর ততদিনে হর্ষদ মেহতার স্ট্যাটাস কী? মুম্বইয়ের ওরলিতে সি ফেসিং একটি পেন্টহাউসে থাকেন। ১৫ হাজার স্কোয়ার ফুট। যার মধ্যে আছে মিনি গলফ কোর্স আর দুটি সুইমিং পুল। গ্যারাজে টয়োটা লেক্সাস, টয়োটা সেরা আর করোলা স্টারলেট এবং মার্সিডিজ সিরিজের দুটি মডেল। যা সেই বিশ্বায়নের আগের ভারতে কজনের কাছে ছিল? অন্তত জানা যাচ্ছে হর্ষদ মেহতার বাড়ি ওরলি থেকে অনতিদূরে। বান্দ্রার এক বাসিন্দার কাছেও নাকি ছিল না এতগুলো বিদেশি গাড়ি। পরে অবশ্য সেই বান্দ্রার ভদ্রলোক ধনী শিল্পপতি হওয়ার ব্যাকরণটাই পালটে দিয়েছিলেন। ভদ্রলোকের নাম মুকেশ আম্বানি! আসল প্রশ্ন অন্য। এই বিপুল অঙ্কের টাকার লেনদেন কখনও সরকার ও ব্যাংকিং ব্যবস্থার কর্তাদের অলক্ষে সম্ভবই না। কারণ ঠিক আগের বছরই মার্চ মাসে দেখা গিয়েছে ভারতের এক আয়কর দাতা আগাম ইনকাম ট্যাক্স দিয়েছেন ২৬ কোটি টাকা! সরকারের একবারও মনে হল না কেন যে নামটির সঙ্গে এই বিপুল আয়কর দেওয়ার কোনো আগের রেকর্ড নেই, সেখানে আচমকা ১৯৯১ সালের মার্চ মাসে ২৬ কোটি টাকা অ্যাডভান্স ইনকাম ট্যাক্স দেওয়ার মধ্যে একটা রহস্য আছে? জানা যাচ্ছে, আয়কর দপ্তরের মধ্যে থেকেই হর্ষদকে আগাম পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল এরকম করার। অর্থাৎ গোটা ঘটনায় আয়কর দপ্তর জড়িত ছিল। ২৭ লক্ষ শেয়ারের লেনদেন হয়েছে স্রেফ ব্যাংক নোট লেনদেনে। যেসব ব্যাংক নোট (বিআর) আদৌ বৈধ ছিল না। এই বিপুল পরিমাণ শেয়ারের মূল্য ছিল ২৫০ কোটি টাকা। আর মাত্র কয়েকমাসের মধ্যে হর্ষদ মুনাফা করেছিলেন আড়াই হাজার কোটি টাকা।
প্রশ্নটি হল একজন সাধারণ শেয়ার বাজারের ব্রোকার ফার্মের মালিক কীভাবে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে অ্যাপয়েন্টমেন্ট পেতে পারেন? তার আগে তো হোমওয়ার্ক ছিল। অবশ্যই ছিল। রামেশ্বর ঠাকুর ছিলেন অর্থমন্ত্রকের রাষ্ট্রমন্ত্রী। তাঁর সঙ্গে হর্ষদের মিটিং হয়েছিল। এই যোগাযোগ কীভাবে? যাঁর নাম সিবিআই এর তদন্তে উঠে এসেছিল তিনি হলেন লুধিয়ানার এক পানের দোকানের মালিকের নাতি। বাবা ছিলেন রাজনৈতিক নেতা। তিনবারের রাজ্যসভার নেতা। সত্যপাল মিত্তল। তাঁর পুত্রের নাম? সুনীল মিত্তল। হর্ষদের ট্যাক্স কনসালট্যান্ট সিবিআইকে বলেছিলেন ইনকাম ট্যাক্স রেইড আটকানোর জন্য অর্থমন্ত্রকের দ্বারস্থ হতেই হয়েছিল। সেই সংযোগ নাকি ঘটিয়েছিলেন সুনীল মিত্তল। সুনীল মিত্তল সম্পূর্ণ অস্বীকার করেন। তিনি বলেছিলেন রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে কারও যোগাযোগ করিয়ে দেওয়া আমার কাজ নয়। সিবিআই তাঁকে বলেছিল আপনার আর হর্ষদের মধ্যে টেলিফোনে কথা হয়েছিল। হর্ষদ নিজেই সেই ফোনালাপ রেকর্ড করে রেখেছে। এটা কি সত্যি যে হর্ষদ আপনাকে বলছে প্রাইম মিনিস্টারের পি-এর সঙ্গে একবার কথা বলে ডেট ফিক্সড করতে? সমস্যা হল অডিও রেকর্ড আদালতে গ্রাহ্য নয়। যে নোটগুলি নিয়ে এক কোটি টাকা ভরা হয়েছে, একটি সুটকেসে সেটির ওজন হবে ৭০ কেজি। পার্লামেন্টে যৌথ সংসদীয় কমিটির সামনে আসা হর্ষদকে প্রশ্ন করা হল আপনি ৭০ কেজি ওজনের সুটকেস বয়ে নিয়ে গেলেন কীভাবে? হর্ষদ উত্তর দিলেন, আমি তো বলিনি আমি একা বয়ে নিয়ে গিয়েছি। আমরা চারজন ছিলাম। সিবিআই ডিরেক্টর এস কে দত্ত জানতে চেয়েছিলেন একটাই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। কেন হঠাৎ একটি সুটকেসে ভরতে গেলেন? দুটিতে নিলে হালকা হয়ে যেত তো? আর এটা বিশ্বাসযোগ্য আপনার সুটকেস চেক করে দেখা হয়নি প্রাইম মিনিস্টারের অফিসে? হর্ষদ হাসতে হাসতে বলেছেন, কেন করা হল না চেক? আপনারাই জানতে চান দিল্লি পুলিশ আর প্রধানমন্ত্রীর অফিসে। কেন আমার গাড়ি একেবারে পোর্টিকোতে যেতে দেওয়া হল? জিজ্ঞাসা করুন প্রাইম মিনিস্টারকে। আর কার কার সঙ্গে তার আগে দেখা করেছি বলব? সব দলেরই নেতা আছে। আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ল রাজনৈতিক মহলে। তাহলে কি বিরাট বড় ঘুষের জাল ছড়িয়ে ফেলেছিল হর্ষদ? কারা কারা আছে সেই তালিকায়? আসল ধন্দ রয়েই গেল। একটি সুটকেস? নাকি দুটি?
মোট ২৮ টি মামলা যখন ধীরে ধীরে গুটিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে, ততদিনে কেটে গিয়েছে ৯ বছর। বেশ কিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য আর কানেশকন হাতে আসছে সিবিআইয়ের। হর্ষদ জেলে। তাঁকে নতুন করে জেরা করা হবে ঠিক হয়েছিল। কারণ রাজনীতির বেশ কিছু রাঘববোয়ালের নাম অজানা এন্ট্রিতে পাওয়া যাচ্ছে। তাঁদের সঙ্গে কী সম্পর্ক ছিল হর্ষদের? সিবিআই যখন থানে জেল কর্তৃপক্ষকে বলেছিল যে একবার হর্ষদের সঙ্গে কথা বলতে হবে। সময় চাই। থানে জেল থেকে বলা হয়েছিল, পরের মাসে আসুন। তার কিছুদিনের মধ্যেই আচমকা জানা গেল হর্ষদের বুকে প্রচণ্ড যন্ত্রণা দেখা দিয়েছে। জেল হাসপাতালে পাঠানো হল। বলা হল হার্ট প্রবলেম। ২০০১ সালের ৩১ ডিসেম্বর। ৪৭ বছর বয়সে আচমকা রাতে মারা গেলেন হর্ষদ মেহতা। আর তাঁকে জেরা করা হল না। জানা গেল না আরও কারা যুক্ত এই হাজার হাজার কোটি টাকার কেলেঙ্কারিতে। কাদের নাম ছিল? তাঁরা আজও রাজনীতিতে বিদ্যমান এবং শিল্পসংস্থাতেও। একঝাঁক ব্র্যান্ডনেম সেলেব্রিটি! এসবকে ছাপিয়ে যে রহস্যটি অজানা রয়ে গেল সেটি হল ইউনিট ট্রাস্ট অফ ইন্ডিয়া এবং ন্যাশনাল হাউজিং ব্যাংকের চেয়ারপার্সন এম জে ফেরওয়ানির মৃত্যু রহস্য। হর্ষদ মেহতার গডফাদার ছিলেন এই ফেরওয়ানি। তাঁর ব্যাংক ১ হাজার কোটি টাকার ব্যাংক নোটস প্রথম ইস্যু করে। কার নির্দেশে? সেই তদন্ত যখন সবেমাত্র শুরু হবে, ঠিক তখনই একদিন মুম্বইয়ের অ্যাপার্টমেন্টে এম জে ফেরওয়ানির মৃতদেহ উদ্ধার হল। সম্পূর্ণ সুস্থ মানুষ। আগের দিন অফিস করেছেন। সিবিআই তাঁকে ফোন করে বলেছিল যে, পরদিন তাঁর অফিসে একটি টিম যাবে। সব কাগজপত্র যেন তিনি রেডি রাখেন। সেইমতোই সব বন্দোবস্ত করেছিলেন ফেরওয়ানি। অফিসের সেক্রেটারিকে বলে এসেছিলেন কিছু নোটের টাইপ করে রাখতে। পরদিন আসছে সিবিআই। কিন্তু ঠিক আগের রাতে ফেরওয়ানির রহস্যজনক মৃত্যু হয়ে গেল! স্বাভাবিক মৃত্যু? নাকি হত্যা? সিবিআই তদন্ত জাল যখন বহু বছর পর প্রায় গুটিয়ে এনেছিল এবং পাওয়া গিয়েছিল বেশ কিছু আচমকা নতুন বিস্ফোরক তথ্য। হর্ষদ মেহতাকে আবার জেরা করে কয়েকটি গোপন নাম জানার জন্য প্রস্তুত হচ্ছিল সিবিআই। তখন কেন্দ্রে এনডিএ সরকার। লালকৃষ্ণ আদবানির হাতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক। সিবিআই থানের কারাগারে যাবে। নতুন বছর আসছে। ২০০২ সাল। তারিখ স্থির হয়েছে ৫ জানুয়ারি। হর্ষদ রাজি নতুন করে সিবিআইকে প্রশ্নের জবাব দিতে। কিন্তু ৩১ অক্টোবর সকালে হর্ষদের বুকে হঠাৎ ব্যথা। কী হল? অসহ্য যন্ত্রণা। প্রথমে সিভিল হাসপাতালে। এরপর জেজে হাসপাতালে যাওয়ার কথা। সেই সুযোগই পাওয়া গেল না। বুকে যন্ত্রণার কিছু ঘণ্টার মধ্যেই মৃত্যু হল। মাত্র ৪৭ বছর বয়সে। হর্ষদ মেহতা যখন এভাবে মহারাষ্ট্রের থানের জেলে বন্দি হয়ে অনেক অজানা সংযোগ খোলাখুলি বলার প্রস্তুতি নিতে নিতেই আচমকা রহস্যময় হার্ট অ্যাটাকে মারা যাচ্ছে, সেই সময় মাত্র ৩০ কিলোমিটার দূরে দক্ষিণ মুম্বইয়ের টোপাজ ডান্স বারে আর এক ব্যক্তি মাধুরী দীক্ষিতের মতো দেখতে এক ডান্সারকে লক্ষ্য করে নিউ ইয়ার্সের রাতে ৯৩ লক্ষ টাকা উড়িয়েছিল!! এভাবেই টাকা উড়িয়ে সে গোটা মহারাষ্ট্র, মধ্যপ্রদেশ, দিল্লির বহু রাজনৈতিক নেতাদের কিনে ফেলেছিল মাত্র ২ বছরে। এক অভিনব দুর্নীতির আবিষ্কার করে সে ২০ হাজার কোটি টাকার এক বিপুল সাম্রাজ্য গড়ে তোলে! এবার শুনব সেই অত্যাশ্চার্য কাহিনি!
