ব্ল্যাক করিডর ১.২৬

নাসিক হাইওয়ের উপর দিয়ে তীব্রবেগে ছুটছে নীল স্যান্ট্রো। থানে সেশন কোর্টে একটা কেস ছিল। বেল অ্যাপ্লিকেশনটা জরুরি। ওটা না হলে ক্লায়েন্টের খুব সমস্যা হয়ে যেত। অ্যাডভোকেট সুরেশ শেখের দুদিন ধরেই টেনশনে। গাড়ি চালাচ্ছেন নিজেই। যদিও সাবস্ট্যান্টশিয়াল এভিডেন্স এমন, যে এই টাকা তছরুপের কেস টিকবে না। মনে হচ্ছে ক্লায়েন্টকে সত্যিই ফাঁসানো হয়েছে। পিপির (পাবলিক প্রসিকিউটর) সঙ্গে কথা বলে আপাতত একটু নিশ্চিন্ত। তবে শেষ পর্যন্ত জামিন হয়েছে। ক্লায়েন্ট খুশি। এবার দেখা যাক। এটা তেমন জটিল ব্যাপার নয়। শেখরের কাছে বেশি চিন্তা হল দুজন দাঙ্গার চার্জের আসামি আছে। সেটা ঠিক ধরা যাচ্ছে না যে আসলে কী হয়েছিল। কেস ডায়েরিতে পুলিশ প্রায় নিখুঁত চার্জ আনছে বোঝাই যায়। কিন্তু দাঙ্গার সময় কখনও একহাতে তালি বাজে নাকি? বিশেষ করে যেখানে হয়েছে সেই বোরিভিলি পাডগা নটোরিয়াস ক্রিমিন্যালে ভর্তি। দুপক্ষেরই হিটম্যান আছে। সুতরাং একটু স্টাডি করা দরকার। জামিন কি হবে? নেক্সট ডেটের আগে আর একবার দেখতে হবে এফআইআর কপি। তবে আজ মনে হল পুলিশ সহজে ছাড়বে না। পলিটিক্যাল প্রেশার আছে। পি.সির (পুলিশ কাস্টডি) জন্য একটা চাপ তো থাকবেই। জামিন চাওয়া উচিত নাকি আপাতত জেল কাস্টডিতেই সন্তুষ্ট থেকে পরের হিয়ারিংয়ে নেক্সট স্টেপ নেওয়া উচিত? এসব ভাবতে ভাবতেই অ্যাক্সিলারেটরে চাপ দিচ্ছেন সুরেশ। রাস্তা ফাঁকা। দুপুর। তাই নাসিক হাইওয়েতে গাড়ির চাপ নেই। বাহুলি ভিলেজ ৪ কিলোমিটার দূরে। মাঝে মাঝে কিছু গাড়ি শোঁ শোঁ করে ওভারটেক করছে। সুরেশ ফিরছেন মুম্বই। একবার মুম্বই কোর্টেও যেতে হবে। তারপর রাতে একটা মিটিং আছে। অতএব আরও জোরে যাওয়া উচিত। রিয়ার ভিউ মিররে একটা অস্পষ্ট ছায়া। না ভুল হল। একটা নয়। দুটি। এতক্ষণ ছিল না। হঠাৎ করেই কোনো একটি ক্রসিং থেকে দুটি মোটরবাইক রাস্তায় উঠেছে। একবার দেখেই চোখ সরিয়ে নিলেন সুরেশ। মাথায় মামলার চিন্তা। সুরেশ শেখর মুম্বই আর থানের বেশ পরিচিত আর খ্যাতনামা আইনজীবী। একইসঙ্গে সোস্যাল অ্যাক্টিভিস্ট। বেশ কিছু সোস্যাল ইস্যুতে তিনি সর্বদাই সরব। অতএব কোর্টের বাইরেও তাঁর অনেক কাজ। নীল রঙের স্যান্ট্রো স্পিড বাড়িয়েছে। আশা করা যায় সন্ধ্যার আগেই পৌঁছনো যাবে মুম্বই। মোটরবাইক দুটিকে বেশ স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। অনেকটাই এগিয়ে এসেছে। স্যান্ট্রোর ঠিক পিছনে। বেশি সময় লাগল না স্যান্ট্রোকে টপকে যেতে। ওভারটেক করার নিয়ম হল ডানদিক থেকে। হাইওয়েতে তো অবশ্যই। কিন্তু এই মোটরবাইক দুটির একটি ডানদিক এবং অন্যটি বাঁদিক থেকে ওভারটেক করছে। ওভারটেক করেই আচমকা একটু এগিয়ে স্পিড কমাচ্ছে। এসব কী হচ্ছে? সুরেশ শেখর বিরক্ত হলেন। এসব ছেলেছোকরার দল কোনো নিয়মই মানে না। আশ্চর্য! তিনিও বাধ্য হয়ে স্পিড কমালেন। এবং মোটরবাইক দুটির পাশ থেকে যাওয়ার সময় বিরক্তির চোখে তাকালেন। সেই বিরক্তি বদলে গেল প্রথমে বিস্ময়ে। তারপর আতঙ্কে। কারণ বাইকের দুজনের হাতে কখন যেন উঠে এসেছে নাইন এমএম পিস্তল। স্যান্ট্রো চলছে। মোটরবাইকও চলছে। ওই চলন্ত অবস্থায় সেই দুই হেলমেট পরিহিত যুবক পরপর গুলি চালাল। ২৮ জানুয়ারি, ২০০২। তাই গরম নেই। বর্ষাও নেই। স্যান্ট্রোর জানালা খোলা ছিল। একঝাঁক গুলি লাগল বুকে, পেটে, গলায়। স্যান্ট্রোর ব্যালান্স হারিয়ে গেল। এবং গড়িয়ে গেল রাস্তার পাশে। বিপুল স্পিড তুলে চলে গেল মোটরবাইক দুটি। সুরেশ শেখর নিথর হয়ে পড়ে রইলেন ড্রাইভার সিটে!

অ্যাডভোকেট ললিত জৈন সব কিছুতেই আগ্রাসী। একটি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত হওয়ায় তাঁর আত্মবিশ্বাসও বেশি। ক্রিমিন্যাল ল ইয়ার হলেও পলিটিক্যাল ক্ল্যাশ কিংবা সোস্যাল ইস্যুর নানাবিধ মামলা তাঁর ঘাড়ে এসে পড়ে। ২৪ এপ্রিল, ২০০২। মুম্বই আদালতের অ্যাডভোকেট ললিত জৈন যাচ্ছিলেন একটা স্পেশাল মামলার শুনানিতে। নিজের গাড়িতে। আদালত এসে গিয়েছে। আর কয়েক মিনিট। তবে এই জায়গাটা একটু ভিড় আর যানজট হয়ে যায়। কোনো কোনো সময় ট্রাফিক পুলিশ থাকে না। এটা হল তিন বাত্তি মার্গ। ভিওয়ান্ডি। বাইক, অটো, গাড়ি, টেম্পো, সাইকেল আর ছোট ছোট ম্যাটাডরে ভর্তি এই ক্রসিং। তাই স্বাভাবিকভাবেই পাশে এসে দাঁড়ানো অটোরিকশকে সন্দেহ করেননি ললিত জৈন বা তাঁর ড্রাইভার। কিন্তু সেই অটোর মধ্যেই বসে ছিল তিন হত্যাকারী। নিখুঁত নিশানা। এবং বাঘের মতো তৎপরতা। কারণ অটো থেকে নিমেষের জন্য নেমে প্রায় পয়েন্ট ব্ল্যাংক রেঞ্জে গুলি চালিয়েছিল তারা। তৎক্ষণাৎ মৃত্যু হল ললিত জৈনের। সকাল ১১ টা ৪৫।

তারিক গুজ্জর। বোরিভিলি পাগাড়ার এক হোটেল ব্যবসায়ী। একইসঙ্গে পঞ্চায়েত সমিতির সদস্য। স্কুটারে চেপে যাচ্ছন ভাহিন্দার। তাছাড়া আর একটা কাজও আছে। তাই স্কুটার জোরে চালাচ্ছেন গুজ্জর। মুম্বই আগ্রা হাইওয়ে। পিছনে বসে আছেন রাজিন গ্যারেল। সবসময়ের সাথী। তারিক গুজ্জরের শত্রুর সংখ্যা কম নয়। কারণ তার দাদাগিরিসুলভ আচরণ। একটা জমি দখলের কেস আছে। মীরা রোডের এক ব্যবসায়ী ভাহিন্দরে জমি কিনেছে। সেই জমির দখল ছাড়বে না এলাকার কিছু যুবক। তারা ইতিমধ্যেই সেই জমি প্রশাসনের থেকে পাওয়ার আশ্বাস পেয়েছিল। সেখানে কমিউনিটি সেন্টার করার কথা। সেই নিয়ে টানাপোড়েন। অতএব ডাক পড়েছে তারিক গুজ্জরের। কিন্তু তারিক বেশিদূর পৌঁছতে পারলেন না। একটিমাত্র স্কুটারে চেপে দুটি ছেলে হঠাৎ মাঝপথে উঠে এসেছিল একটি চৌরাস্তার ক্রসিংয়ে। সন্দেহ করার প্রশ্ন নেই। এসব এলাকায় তারিকের প্রভাব প্রবল। অতএব সন্দেহ হয়ওনি। কিন্তু সেই অতি আত্মবিশ্বাসকে ভেঙে দিয়ে ছেলেদুটি ক্যাজুয়ালি এসে গুলি চালিয়েছিল। বেঁচে গেলেন শুধু রাজিন গ্যারেল। এবং তিনি সোজা থানায় গিয়ে একজনের নামেই এফআইআর করলেন। পাড়াগা পুলিশ স্টেশনকে বললেন, আমি সাক্ষী। আর আমার অভিযোগ এই খুন করিয়েছে আর কেউ নয়, একজনই। তার নাম সাকিব নাচান! কেন এই খুন? গ্যারেল জানালেন সাকিব হুমকি দিয়েছিল সম্প্রতি । জমি নিয়ে শত্রুতা। ওই এফআইআর করার সঙ্গে সঙ্গে, পরদিনই ১৮ জুলাই ২০০২ সালে বাড়ি থেকে গ্রেপ্তার করা হল সাকিব নাচানকে। তিনমাস কেটে গেল। কিন্তু পুলিশ চার্জশিট তৈরি করতে পারেনি। কারণ নাচানের বিরুদ্ধে কোনো এভিডেন্স তো প্রমাণ করা যাচ্ছে না। অক্টোবর মাসেই জামিন পেয়ে গেল সাকিব নাচান। নাচান জেল থেকে বেরনোর সময় বলেছিল আমাকে জেলে রাখতে হলে আইন আর ইনভেস্টিগেশন দুটোই একটু মন দিয়ে পড়াশোনা করতে হবে। বলেই হাসতে হাসতে জেল থেকে বেরিয়ে গেল।

মুম্বই সেন্ট্রাল স্টেশনের মধ্যেই ম্যাকডোনাল্ড আউটলেট। এয়ারকন্ডিশনার ডাক্টের মধ্যে রাখা হয়েছিল বোমা। ৬ ডিসেম্বর ২০০২। বিস্ফোরণ হল। বোঝা গেল এটা তেমন শক্তিশালী বোমা ছিল না। কারণ পাঁচজন আহত হলেন। প্রাণহানি ঘটেনি। কে এই বিস্ফোরণের পিছনে? পুলিশ তদন্ত করছে। কিন্তু ক্রু মিলছে না। তদন্তের মাঝেই ভিলে পার্লে রেল স্টেশনে আবার বিস্ফোরণ। একটা সাইকেলে ডিভাইস রাখা হয়েছিল। এবার এক সবজি বিক্রেতার মৃত্যু হল। ২৭ জানুয়ারি। ২০০৩। কিন্তু এবারও ক্লু নেই। এরকম তো হয় না। ক্রাইম ব্রাঞ্চের ইনফর্মাররা সম্পূর্ণ ব্যর্থ হবে এটা কি হতে পারে? ১৩ মার্চ। মুলুন্ড স্টেশনে ট্রেন ঢুকছে। সন্ধ্যা পৌনে আটটা। প্রবল ভিড়। অফিসযাত্রীরা বাড়ি ফিরছে। ট্রেন থামার মুহূর্তে ফার্স্ট ক্লাস লেডিজ কামরায় বিস্ফোরণ। প্ল্যাটফর্মে দাঁড়ানো ১০ জন যাত্রীর মৃত্যু। এবং সেই প্রথম বিদ্যুচ্চমকের মতো মাথায় এল একটা থিওরি। ৬ ডিসেম্বর সেন্ট্রাল স্টেশনে বিস্ফোরণে মনে করিয়ে দেওয়া হয়েছিল ১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বরকে? তারই বদলা? ২৭ জানুয়ারি ভিলে পার্লে স্টেশন। তার মানে প্রজাতন্ত্র দিবসের পরদিন বিস্ফোরণ ঘটিয়ে রাষ্ট্রকে চ্যালেঞ্জ ? আর ১৩ মার্চ মুলুন্ড স্টেশনে বিস্ফোরণের অর্থ হল ১৯৯৩ সালের মুম্বই ব্লাস্টের স্মৃতি ফিরিয়ে আনা? আর এভাবে যখনই কোনো চক্রান্তের জাল বোনা হয় তখন সেটার পিছনে থাকে জঙ্গি সংগঠনের মাস্টারমাইন্ড। কে সে? এই তিন বিস্ফোরণের নাম দেওয়া হল ট্রিপল ব্লাস্ট কেস!

রাত সাড়ে ৯ টা। ক্র্যাফোর্ড মার্কেটের মহারাষ্ট্র পুলিশ হেডকোয়ার্টারের ক্রাইম ব্রাঞ্চে ফোন বাজছে। এখন সেরকম বড় অফিসার কেউ থাকার কথাই নয়। ইনস্পেক্টর শচীন ভাজ একটা ফাইল ওয়ার্ক করতে করতে ফোন ধরলেন।

হ্যালো

কে?

সাব উয়ো যো মুলুন্ড মে ব্লাস্ট হুয়া থা উসকে পিছে হ্যায় নাচান!

ভুরু কুঁচকে গেল শচীন ভাজের। বললেন, তুম কওন?

ম্যায় তো এক ইন্ডিয়ান সাব!

এসব ফিল্মি ডায়লগে কান দেওয়ার সময় নেই। ধমকে উঠলেন শচীন। ক্যায়সে পাতা চলা!

সাব একটা অ্যাড্রেস নোট করুন।

লোকটা যে অ্যাড্রেস দিল সেটা মুম্বই শহর থেকে দূরের এক কলোনি এলাকা। ইনস্পেক্টর শচীন ভাজ গোটা ঘটনা জানালেন তাঁর কর্তা এক জয়েন্ট কমিশনারকে। তিনি বললেন, আজ রাতেই রেইড করো। কল্যাণের সেই ঠিকানায় অভিযান চালিয়ে সেদিনই ২১ মার্চ মধ্যরাতে গ্রেপ্তার হয়ে গেল দুই ব্যক্তি। আকবর আর কামিল। এই হাইড আউট যে পুলিশ খুঁজে বের করতে পারে তা কল্পনাই করা যায়নি। তাই আকবর আর কামিল বিস্মিত। জিপে তোলার পথেই তাদের ক্রাইম ব্রাঞ্চের এক অফিসার বললেন, বেশি টাইম নিবি না। কী কী করেছিস কবে থেকে প্ল্যান সব তাড়াতাড়ি বলবি। নয়তো শর্মা সাব ইন্টারোগেট করবে আকবর আর কামিলের মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল। কারণ শর্মা সাব জেরা করলে….। তাই তারা রিস্ক নিল না। পরদিন বিকেল পাঁচটার মধ্যে দুজনেই বিনা বাক্যব্যয়ে জানিয়ে দিল মুলুন্ড ব্লাস্ট করিয়েছে সাকিব নাচান! আরও তিনটি প্ল্যান আছে। ক্রাইম ব্রাঞ্চের সেই ইন্টারোগেশন রুমে এক স্তব্ধতা নেমে এল। আবার নাচান! কিন্তু এবারও যদি এভিডেন্স ফুলপ্রুফ না হয়? আবার তো ছাড়া পেয়ে যাবে নাচান! কিন্তু এই সুযোগ ছাড়া যাবে না। নাচানকে অ্যারেস্ট করতেই হবে। নাহলে একের পর এক ব্লাস্ট হয়েই যাবে। আর সবই আনসলভড। এভাবে চললে গোটা দেশে মুম্বই পুলিশের বদনাম হয়ে যাবে। কিন্তু কোথায় যেতে হবে তাকে ধরতে? বোরিভিলা পাগাড়া গ্রাম। সাকিব নাচানের দুর্গ। সেখানে সে এতই পপুলার যে তাকে স্পর্শ করা হলে যে কোনো সময় পালটা জনতার সঙ্গে সংঘর্ষ হতে পারে। সাকিব ভাই ওখানে স্বয়ং ঈশ্বর!

পুলিশ কমিশনার সত্যপাল সিংয়ের ঘরে মিটিং চলছে। সত্যপাল বললেন, জেন্টলম্যান, এবার আমাদের কোনো ভুল করলে চলবে না। বেস্ট অফিসার্সদের নিয়ে টিম করুন। ৬ জনের টিম হল। ইনস্পেক্টর শচীন ভাজ। সাব ইনস্পেক্টর সঞ্জীব গাওয়ারে। সাব ইনস্পেক্টর ভাচারে। ইনস্পেক্টর প্রদীপ শর্মা। সাব ইনস্পেক্টর দয়া নায়েক। পাগাড়া পুলিশ স্টেশনের ইনস্পেক্টর ইন চার্জ নীতীন প্যাটেল। সেই ইনস্পেক্টর প্রদীপ শর্মা যাঁর কথা শুনেই আকবর আর কামিল সময় নষ্ট না করে সব স্বীকার করে নিয়েছিল। কেন? ১০০ কেজির ওজন। লম্বা। বড়সড়। ট্রাইসেপ আর বাইসেপ। ২০০২ সালের ওই দিন পর্যন্ত প্রদীপ শর্মার ৯৫টি এনকাউন্টার হয়ে গিয়েছে। আর একজন দয়া নায়েক। তাঁর হাতে গুলি খেয়ে প্রাণ হারিয়েছে ৫১ জন অপরাধী। মুম্বই পুলিশের ক্রাইম ব্রাঞ্চের এঁরাই দুই সেরা এনকাউন্টার স্পেশালিস্ট। আর এই দুজন একই টিমে? তাও আবার একজনকে স্রেফ গ্রেপ্তার করার অভিযানে? সুতরাং বোঝাই যাচ্ছে নাচানকে নিছক জেরা করার জন্য গ্রেপ্তার করা কতটা কঠিন। এর আগে যখন সেই তারিক গুজ্জর হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়েছিল তখন পরিস্থিতি ছিল অন্য। কারণ খোদ প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষীর এফআইআর ছিল। তাই গ্রেপ্তারে কোনো আইনি জটিলতা নেই। আর আজ নাচানকে আবার গ্রেপ্তার করা কঠিন, কারণ আগের মামলায় তার বিরুদ্ধে কোনো এভিডেন্স ছিল না। জামিন দিতে হয়েছে বাধ্য হয়ে। এবার এভিডেন্স পাওয়া যাবে তো? এই টিমকে লিড করবে কে? পুলিশ কমিশনার সত্যপাল সিং জানিয়ে দিলেন ইনস্পেক্টর প্রদীপ শর্মা হবেন লিডার। তিনি আলাদাভাবে ডেকে নিলেন প্রদীপ শর্মাকে। আর যেটা বললেন সেটা শুনে প্রদীপ শর্মার মনে হল এর থেকে কঠিন কাজ অন্তত তিনি তাঁর এতদিনের দুর্ধর্ষ কেরিয়ারে করেননি কখনও। কারণ পুলিশ কমিশনার তাঁকে গোটা অপারেশনে একটাই শর্ত দিয়েছেন। সেটাই মারাত্মক তাঁর কাছে। শর্তটি হল সাকিব নাচানকে জীবিত ধরতে হবে এবং সম্পূর্ণ সুস্থ। কোনোভাবেই যেন সে আঘাতপ্রাপ্ত না হয়। প্রদীপ শৰ্মা শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন পুলিশ কমিশনারের দিকে। কারণ তাঁর অপারেশনের স্টাইল খুব সিম্পল। কোনো জটিলতা নেই। তিনি অপরাধীকে ধরতে যান। ওয়ার্নিং দেন সারেন্ডারের জন্য। একবার। দুবার। তিনবার। তারপর বেশি সময় নষ্ট করেন না। গুলি মারেন। সেই সিম্পল সিস্টেমের জন্যই তো প্রদীপ শর্মার নামের পাশে আজ ৯৫টি এনকাউন্টারের তালিকা। আর একজন দয়া নায়েক। তাঁকে যখন প্রদীপ শর্মা বললেন, নায়েক ডোন্ট শুট! অর্ডার আছে। নায়েক শুধু বললেন, তাহলে যাচ্ছি কেন! অন্য কেউ গেলেই তো হয়!! তারপর দুজনে হাসলেন পরস্পরের দিকে তাকিয়ে। কারণ এই গুলি না চালানোর সংযমটাই যে তাঁদের দুজনের সবথেকে কঠিন পরীক্ষা! তাঁদের জুটিকে মুম্বই পাবলিক আর মিডিয়া নামই দিয়েছে ট্রিগার হ্যাপি!

মারুতি জিপসি থেকে লাফ দিয়ে নামলেন ইনস্পেক্টর প্রদীপ শর্মা। তিনিই ছিলেন ফ্রন্ট সিটে। বোরিভালি। ২৭ মার্চ। ২০০৩। মুম্বই থেকে ৬৫ কিলোমিটার। সামনেই বিটুমিন রোড। উলটোদিকেই বাড়ি সাকিব নাচানের। গলিটা সরু। মুখোমুখি বাড়িগুলো। সাইকেল চলাচল পর্যন্ত ঠিক আছে। কিন্তু গাড়ি ঢোকার প্রশ্নই নেই। এমনকী দুটি মোটরবাইক হয়তো পরস্পরকে ক্রস করতে পারবে না। তৃতীয় বাড়িতে ঢুকতে হবে। ঢুকলেন প্রদীপ শর্মা। পিছনে দয়া নায়েক। একটি শিশুকে কোলে নিয়ে বসে আছে সাকিব নাচান। বসার ঘরে। প্রদীপ শর্মা বললেন, আইয়ে, আপকো একবার হামারে সাথ জানা হোগা। একটা মামলার ব্যাপারে। সাকিব নাচান কম কথা বলে। ঠান্ডা চোখে তাকায়। সেরকমভাবেই বলল কেন যাব? প্রদীপ শর্মা আরও শীতল। বললেন, আমাদের কিছু কথা জানার আছে। নাচান উঠছে না সোফা থেকে। এগিয়ে গেলেন দয়া নায়েক। এত সময় ওয়েস্ট তার পোষায় না। বাহুর কাছে শক্ত হাতে ধরে জোর করে তুললেন। বললেন, সব কোশ্চেনের আনসার দেওয়া হবে। কোনো প্রবলেম হবে না। সাকিব হাত ছাড়িয়ে নিয়ে বললেন, অ্যারেস্ট ওয়ারেন্ট আছে? দেখান! প্রদীপ শর্মা পয়েন্ট থার্টি এইট রজার্স রিভলবার বের করে সোজা সাকিবের মাথায় ঠেকিয়ে বললেন, চল, নেহি তো গোলি মার দুঙ্গা! এটাই ওয়ারেন্ট! চল..।

সাকিব নাচান নতুন ক্রিমিন্যাল নয়। ১৯৯১ সালেই টাডা আদালতের মাধ্যমে তার সাজা হয়েছিল যাবজ্জীবন। পাকিস্তানের K২ প্ল্যানের অন্যতম সদস্য ছিল সে। এরকমই অভিযোগ আনা হয়েছিল। কে টু মানে হল পাকিস্তানের প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট জেনারেল জিয়া উল হকের খলিস্তান-কাশ্মীর প্ল্যান। আশির দশক থেকে এই প্ল্যান কার্যকর। পাঞ্জাব আর কাশ্মীরকে ভারত থেকে বিচ্ছিন্ন করার জন্য তথাকথিত আজাদির লড়াইয়ে উদ্বুদ্ধ করে জঙ্গি সাপ্লাই। এটাই ছিল কে টু প্ল্যান। সেই সময় সাকিব আফগানিস্তান আর পাকিস্তান গিয়েছিল। আদালতের সাজা ঘোষণায় বলাই হয়েছিল ১৯৯১ সাল পর্যন্ত সাকিব পাকিস্তানে জঙ্গি ট্রেনিংয়ের জন্য যুবকদের পাঠাত। সেই কেসেই তার যাবজ্জীবন সাজা হয়। সেই জেল খেটে বেরনোর পরই ওই ২০০২ সাল থেকে আবার তার দিকে পুলিশের নজর পড়ল। আবার ফিরে এল নাচানের নাম গোয়েন্দাদের র‍্যাডারে।

সাকিব ভাইকে ধরতে পুলিশ এসেছে! চিৎকার করে দৌড়চ্ছে তিনটি ছেলে। গোটা এলাকায় খবর হয়ে গিয়েছে মুম্বই পুলিশ টিম এসেছে নাচানকে গ্রেপ্তার করতে। সেই টিমে আছে কুখ্যাত প্রদীপ শর্মা আর দয়া নায়েক। তার মানেই হল সাকিব ভাইকে এনকাউন্টার করা হবে। মাত্র ৪০ মিটার দূরে রাখা আছে পুলিশ জিপ। বাড়ি থেকে বেরিয়ে এক হাতে দয়া নায়েক সাকিব নাচানকে ধরে এগোচ্ছেন। পিছনে বাকি টিমের দুজন। আর বাকি তিনজন রয়েছে জিপের সামনে । গোটা টিমকে ব্যাকআপ হিসাবে কভার করার জন্য আছে একটি বিশেষ অপারেশন বাহিনী। যার নাম স্পেশাল অপারেশন স্কোয়াড! ওই ৪০ মিনিট পেরনোকে মনে হচ্ছিল তীব্র এক সংকট। কারণ ততক্ষণে সাকিবের বাড়ি ঘিরে গোটা গলিতে ভিড়ে ভিড়াক্কার। মহিলারা হাউ হাউ করে কাঁদছে। যুবকরা শক্ত মুখ করে দাঁড়িয়ে রাস্তা আটকে। পুলিশের দিকে কেউই তাকাচ্ছে না। সকলের চোখ নাচানের দিকে। তার চোখ কী বলছে? সেই চোখ যে অর্ডার করবে সেটাই করবে এই গোটা জনতা! পুলিশ টিম কোনোদিকে তাকাচ্ছে না। এগিয়ে যাচ্ছে। লক্ষ্য শুধু ওই ৪০ মিটার পথটুকু অতিক্রম করা। জায়গা নেই। মানুষের গায়ে ধাক্কা লাগছে। কেউ সরে জায়গা করে দিচ্ছে না। দাঁতে দাঁত চেপে দয়া নায়েক, প্রদীপ শর্মারা এগোচ্ছেন। আচমকা একটি শব্দ উঠল। কেউ একজন চিৎকার করছে, সাকিব ভাই কো ছোড় দো!! কাছে এসে গিয়েছে জিপ। তখনই নড়ে উঠল জনতা। তারাও এগোচ্ছে। সঙ্গে স্লোগান..ছোড় দো সাকিব ভাই কো! দয়া নায়েক আর সময় নষ্ট করলেন না। তিনি দুহাতে সাকিব নাচানকে তুলে ধরলেন, আর প্রায় ছুঁড়ে দিলেন জিপের পিছনের সিটে। সঙ্গে সঙ্গে যেন একটা ঝড়ের আভাস। সবার আগে সাকিব নাচানের আত্মীয় শোভান মোল্লা এগিয়ে এসে দয়া নায়েককে ধাক্কা দিল। দয়া নায়েকের চোখে বিস্ময়। তাঁকে ধাক্কা? এত সাহস? ৫২ নম্বর এনকাউন্টার করতে সত সময় লাগবে তাঁর? তাঁর হাত তৎক্ষণাৎ চলে গেল হোলস্টারে। সেখানে রিভলভার। কিন্তু ততক্ষণে বাকি জনতা এগিয়ে আসছে। মহিলারা দল বেঁধে আচমকা থুতু দিতে শুরু করেছে। বাচ্চারা ছুঁড়ছে কাদা আর ঢিল। চারজন যুবক ওই প্রবল ধাক্কাধাক্কির মধ্যে জিপের মধ্যে হাত বাড়িয়ে নাচানকে কোলে তুলে নিয়েছে। তাদের বাধা দিতে গিয়ে পুলিশের এসওএস টিম মেম্বাররা মহিলাদের ধাক্কা খেতে শুরু করলেন। নাচানকে বের করে আনা হয়েছে জিপ থেকে। আর সঙ্গে সঙ্গে সামনের গলির মাঝখানটা ফাঁকা হয়ে গেল। দুজন যুবক নাচানকে সঙ্গে নিয়ে দ্রুত গলির অভ্যন্তরে হারিয়ে যাচ্ছে। অর্থাৎ নাচানকে পুলিশের হাত থেকে ছিনিয়ে নিয়ে পালাচ্ছে জনতা। গোটা দৃশ্যটা দেখতে দেখতে প্রদীপ শর্মা অবশেষে রিভলভার উপরে তুলে ধরলেন। পাবলিক কিন্তু সরছে না সামান্যও। কেউ চোখের পাতাও ফেলছে না। শৰ্মা সামনের দিকে যেদিকে নাচান পালাচ্ছে সেখানেই রিভলভার তাক করলেন। তাঁর মুখ থমথম করছে। আঙুল ট্রিগারে। সেফটি ক্যাচ কি অন? বোঝা যাচ্ছে না! টকটক করছে মুখ। দয়া নায়েকের হাতে পিস্তল। কিন্তু সে তাক করেনি। উপরে তুলে ধরেছে। প্রবল ধাক্কা দিয়ে পিছনের ব্যাকআপ জিপটা এইমাত্র উলটে দেওয়া হল। কী করবেন প্রদীপ শর্মা? আজ পর্যন্ত গুলি চালাতে তাঁর এত সময় লাগেনি। এত ভাবতেও হয়নি। পুলিশ কমিশনার সত্যপাল সিং এর কথা মনে পড়ে গেল নাকি শর্মার। তিনি বলেছিলেন, ডোন্ট শুট প্রদীপ!! পাগাড়া পুলিশ স্টেশনে ততক্ষণে খবর পৌঁছেছে। সেখান থেকে খবর গেল ওই গ্রামেরই এক বৃদ্ধের কাছে। ওয়াকফ কমিটির নেতা। নাসের মোল্লা। তাঁকে বলা হল, পুলিশ টিমের সামান্য কিছু হলে গোটা গ্রাম কিন্তু আর থাকবে না। সবাই অ্যারেস্ট হবে। দরকার হলে গোটা মুম্বই ফোর্স আসবে। দোষী, নিদোষ সবাই জেলে যাবে। সিস্টেমের সঙ্গে লড়াই করবে এত স্পর্ধা দেখাবেন না। আপনি যান স্পটে। সবাইকে বোঝান। পুলিশের গায়ে যেন টাচ না করে কেউ! নাসের মোল্লা বৃদ্ধ । এবং বুঝদার মানুষ। তিনি দ্রুত ঘটনাস্থলে গেলেন। শোভান মোল্লার দাদা আদনান মোল্লাকে বললেন, তোমরা পাগল হয়ে গিয়েছ? এরা এখন এসেছে অল্প লোক। এরপর গোটা ফোর্স আসছে। দরকার হলে মিলিটারি আসবে। তোমরা সারাজীবনের জন্য জেলে যাবে? এই বৃদ্ধকে সবাই মান্য করে। গোটা পুলিশ টিমকে ঘিরে ধরা হয়েছে। ঠিক মাঝখানে প্রদীপ শর্মা আর দয়া নায়েক। দুজনের হাতেই রিভলবার। কিন্তু তাঁরা নীরব ও স্তব্ধ। কারণ এই প্রথম হাতে রিভলবার থাকা সত্ত্বেও তাঁদের খালি হাতে ব্যর্থ হয়ে ফিরতে হবে। হচ্ছেও। একটা ঠান্ডা চোখে শর্মা তাকালেন জনতার দিকে। অনেকক্ষণ। দয়া নায়েক যুবকদের দিকে তাকিয়ে। তাঁর চোখও স্থির। জিপ স্টার্ট দেওয়া হল। নিঃশব্দে তাঁরা উঠে বসলেন। ধরা হল না সাকিব নাচানকে।

ঠিক তিনদিন পর সংবাদপত্রে একটা খবর প্রকাশিত হল। তিনজন লস্কর ই তৈবা জঙ্গি পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে মারা গিয়েছে। তাদের মধ্যে একজন পাকিস্তানি। সেই প্রথম মুম্বই পুলিশের হাতে কোনো লস্কর জঙ্গি এনকাউন্টারে মারা গেল। যে দুজন ভারতীয় জঙ্গি ছিল তাদের নাম আকবর আর কামিল। এনকাউন্টার কাদের সঙ্গে হয়েছিল? প্রদীপ শর্মা আর দয়া নায়েক। এই সংবাদটি প্রকাশিত হওয়ার পর সেদিনই দুপুরে সাকিব নাচানের বাবা আবদুল হামিদ নাচান সোজা মুম্বই হাইকোর্টে এলেন। এবং প্রেয়ার দিলেন আমার ছেলেকে মুম্বই পুলিশ এনকাউন্টারে মেরে ফেলার প্ল্যান করেছে। পুলিশের হাত থেকে ছেলেকে বাঁচান জজসাহেব। আমার ছেলে আপনার সামনেই সারেন্ডার করতে রাজি। আকবর আর কামিলকে এনকাউন্টারে ফিনিশ করে বস্তুত প্রদীপ শৰ্মা সাকিব নাচানকে বার্তা দিলেন সময় আর সুযোগের অপেক্ষা! এরপর আর অ্যারেস্ট না। সত্যি এনকাউন্টারের জন্য সে প্রস্তুত থাকে। সেই চাপ নিতে পারেনি সাকিব। তাই সারেন্ডার। কিন্তু তারপর শুরু হল আর এক চমকপ্রদ অধ্যায়! যা মুম্বই পুলিশের কল্পনাতেই ছিল না।

শুধু মুলুন্ড ব্লাস্ট নয়। সাকিব নাচানের বিরুদ্ধে মুম্বই পুলিশ চার্জ নিয়ে এল আরও ভয়ংকর। সেই দুই আইনজীবীর হত্যার পিছনেও সাকিবের হাত। পাগাড়া এলাকার চারজন অপরাধীকে গ্রেপ্তার করার পর পুলিশ মামলা সাজানো শুরু করল। ট্রিপল ব্লাস্ট কেস। দুই আইনজীবী মার্ডার। বাড়ি থেকে একে ফর্টি সেভেন পাওয়া। আর কী চাই। সাকিবের নাম হল অ্যাডভোকেট কিলার। তার ফলে কী সমস্যা! সমস্যা হল ভিওয়ান্ডি আর থানের বার অ্যাসোসিয়েশন ঘোষণা করে দিল কোনো আইনজীবী সাকিবের হয়ে লড়াই করবেন না। কেউই সাকিবের কেস হাতে নেবেন না। যেহেতু সে অ্যাডভোকেট খুনের আসামি। নাচান কি ভেঙে পড়ল? আর তো বাঁচার উপায় নেই! একেবারেই না। বরং উলটো। সাকিব নাচান আবেদন করল আমার কেস আমিই লড়ব। সাকিব একজন কমার্স গ্রাজুয়েট। সে কিছুই জানে না আইনের। কিন্তু আদালতে আপিল করার সঙ্গে সঙ্গে যেই তার আবেদন মঞ্জুর হল সেদিন থেকে থানের জেলে তার কাজ হল সারাদিন ধরে পুলিশ ডকুমেন্ট, এফআইআর কপি, পুলিশের কেস ডায়েরির অভিযোগগুলি আর আইনের ধারা পড়াশোনা করা। প্রতিদিন তার সঙ্গে জেলে দেখা করতে আসা যুবকদের হাতে থাকত কোনো না কোনো বই। সবই আইনের। থানের জেলে প্রতিদিন রাত আড়াইটের সময় সাকিব নাচান ঘুম থেকে উঠে যায়। আর সেই রাত থেকেই কেস ফাইল পড়তে শুরু করে। এর সঙ্গে তার প্রধান কাজ হল নিয়ম করে রাইট টু ইনফর্মেশন আইন অনুযায়ী প্রতিটি খুঁটিনাটি বিষয়ে আবেদন করা। এ পর্যন্ত কতগুলি রাইট টু ইনফরমেশন আবেদন করেছে সাকিব? ৩১৪টি! এবং তার প্রত্যেকটি সরকারি উত্তর সে নিজের ডিফেন্স ডকুমেন্টে অ্যাটাচ করেছে। মাস যায়। বছর যায়। যত দিন যাচ্ছে সরকারি উকিল অর্থাৎ পাবলিক প্রসিকিউটর রীতিমতো চমৎকৃত এবং ক্রুদ্ধ। কারণ অভিযুক্ত সাকিব নাচান যেভাবে প্রত্যেকটা উইটনেস আর পুলিশ অফিসারদের ক্রস এক্সামিনেশন করছে এবং যে কোনো এভিডেন্সের কাউন্টার আরগুমেন্ট একেবারে আইনের মারপ্যাঁচ দিয়ে নথিপত্র প্রদান করে দিচ্ছে যে কোনো পুলিশের কেস দুর্বল থেকে দুর্বলতর হয়। সারারাত জেগে সাকিব কেস ফাইল তৈরি করে। সকালে তিন ঘণ্টা ঘুমোয়। জেলের মধ্যে বসে সাকিব যখন নিজের ডিফেন্স স্ট্রং করছে, তখন বাইরে তার নেটওয়ার্ক অন্য কাজে ব্যস্ত। সেটা হল সাক্ষীদের সম্পূর্ণ ঘুরিয়ে দেওয়া। একের পর এক পুলিশ সাক্ষী হোস্টাইল হয়ে যাচ্ছে। কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে আদালতে তারা বলছে পুলিশ শিখিয়ে দিয়েছে তাই এসব বলেছি। আসলে আমি কিছুই জানি না। পুলিশ দিশাহারা। আর কোনো উপায় নেই। এবার একমাত্র পথ সাকিবের সঙ্গে আরও যাদের বিরুদ্ধে মামলা চালানো হচ্ছে, যারা সহ অভিযুক্ত তাদের মধ্যে থেকেই রাজসাক্ষী করে দেওয়া। এটা যে কোনো পুলিশের পরিচিত খেলা। কোনো অপরাধের সারকামস্টেনশিয়াল এভিডেন্স না থাকলে অভিযুক্তদের মধ্যে থেকেই একজনকে বাছাই করা হয় রাজসাক্ষীর জন্য। তাকে আশ্বাস দেওয়া হয় যে সে মুক্তি পাবে। কিন্তু গোটা অপরাধের প্রধান সাক্ষী হয়ে ১৬৪ ধারায় ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে সে বিবরণ দিক ঘটনার। তাহলে বাকিদের কনভিকশন বা সাজা ঘোষণা করানো সম্ভব হবে। সে বেঁচে যাবে। এই টোপ সকলেই খাবে। কারণ চাচা আপন প্রাণ বাঁচা। এটাই শেষ চেষ্টা পুলিশের। সেইমতো বোমা বিস্ফোরণের অন্যতম অভিযুক্ত তনভির জামিনদারকে বলা হল তুমি রাজসাক্ষী হয়ে যাও। তোমাকে মুক্তি দেওয়া হবে সব কেস থেকে। সেই তনভির পুলিশকে বলেছে, আমার মাথায় একে ফিফটি সিক্স ঠেকান, আমার গায়ে বোমা বেঁধে দিন। আমার শরীরের উপর দিয়ে একটা ট্যাংক চালিয়ে দিন। তবুও আমি সাকিব ভাইয়ের বিরুদ্ধে কিছু বলব না। রাজসাক্ষী হওয়ার দরকার নেই। সাজা দিন আমাকে।

সাকিবের সামনে কোনো কেস টিকছে না। হতাশ পুলিশ। ২০০৮ সালের মধ্যে দুই আইনজীবী এবং সেই তারিক গুজ্জর মার্ডার কেসে তার নাম যুক্ত থাকার অভিযোগ মুম্বই পুলিশ প্রমাণই করতে পারল না। তিনটি মার্ডার কেস থেকেই সাকিব মুক্তি পেয়ে গেল। ২০১১ সালে ট্রিপল ব্লাস্ট কেস থেকে সাকিব জামিন পেয়ে গেল। কারণ সেই একই। একমাত্র মামলা বাকি অস্ত্র আইন। সাকিব কাঠগড়ায় দাঁড়ানো সাক্ষীদের এবং চার্জ তৈরি করা পুলিশ অফিসারদের এমনভাবে জেরা করেছে যে প্রত্যেকেই শেষ পর্যন্ত তার জেরার সামনে সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়েছে। তাকে জেল হেফাজতে রাখার কোনো শক্ত কারণই আদালতে জমা দিতে ব্যর্থ পুলিশ। গোটা সরকারি আইনজীবী মহল, গোটা মুম্বই পুলিশের ক্রাইম ব্রাঞ্চ, রাজ্য সরকারের আইনদপ্তর একজোট হয়েছিল। উলটোদিকে একজন জেলখাটা আসামি সাকিব নাচান। তা সত্ত্বেও তার আরগুমেন্টের সামনে কেউই দাঁড়াতে পারছে না। একের পর এক কেস থেকে সে মুক্ত হচ্ছে। অথবা যে কেসে জামিন পাওয়া অসম্ভব, তাও জামিন হয়ে যাচ্ছে তার নিজের তৈরি সুকৌশলী পেপার ওয়ার্কসে। জেলে বসে সে যে শুধু নিজেকে বাঁচানোর জন্য আইনি লড়াইয়ের কাগজপত্র তৈরি করছে তাই নয়। একটা আস্ত বই লিখেছে। যার নাম ‘দ্য রিয়াল ফেস অফ ইন্ডিয়ান জুডিশিয়ারি’। অথচ পুলিশ জানে প্রত্যেক কেসে সাকিব প্রকৃতই অপরাধী। কিন্তু সমস্যা হল একটা কেসেও তাকে জড়ানো যাচ্ছে না। কারণ তার অসম্ভব ভালো কাউন্টার ডিফেন্স। বস্তুত কোনো আইনজীবীকে না পেয়ে একা সাকিব কোর্টরুমে যেভাবে কেস লড়েছে তা আর কোনো পাশ করা আইনজীবী পারতেন কিনা তা নিয়ে সন্দেহ আছে।

২০১৬ সালে সাকিব নাচান একটিই মামলায় দোষী সাব্যস্ত হয়েছে। একটি একে ৫৬ রাইফেল তার কাছে পাওয়া গিয়েছে। ১০ বছরের জেল। যে সময়টা তার জেলেই কেটে গিয়েছে। ২০১৭ সালের নভেম্বর মাসে জেল থেকে মুক্তি পেল সাকিব নাচান। যানে জেলে থাকাকালীন তার সঙ্গে বহু অপরাধীর দেখা হয়েছে। কিন্তু কার সঙ্গে একদিন সকালে জেলে দেখা হওয়ার পর জেলপ্রাঙ্গণে স্বভাববিরুদ্ধভাবে হো হো হো হো করে অট্টহাসিতে ফেটে পড়েছিল শান্ত সাকিব? সেই লোকটিও জেল খাটতে এসেছে। নাম প্রদীপ শর্মা। মুম্বই ক্রাইম ব্রাঞ্চের এনকাউন্টার স্পেশালিস্ট। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ একটি ফেক এনকাউন্টারের। তাই জেল হেফাজতে আসতে হয়েছে। আর নিয়তির অদ্ভুত খেলা। তাঁকে যেখানে পাঠানো হয়েছে জেল খাটতে সেখানেই সাকিব নাচান বন্দি।

জেলের খাবার লাইনে দাঁড়িয়ে সাকিব নাচান ইনস্পেক্টর প্রদীপ শর্মার দিকে হাত বাড়িয়ে বললেন, সালাম আলাইকুম শর্মা স্যার! প্রদীপ শর্মা হেসেছিলেন! হাত বাড়াননি! শুধু বলেছিলেন, ক্যায়সে হো সাকিব! সাকিব বলেছিল, আপনাদের কেসগুলো প্রুফ করতে পারছেন না কেন? আমার তো সব অ্যাকিউটাল হয়ে যাচ্ছে! স্পষ্ট কটাক্ষ ছিল। প্রদীপ শর্মা হাসিমুখে বললেন, জেল থেকে বেরোতে তো পারলে না সাকিব? কোর্টে লড়েই যাচ্ছ। জীবনের ২০ বছর তো জেলেই কেটে যাচ্ছে! ফির কওন জিতা কওন হারা সাকিব? সাকিব নাচানের হাসি এবার একটু ম্লান হল! হাসছিলেন প্রদীপ শর্মা।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *