মগ্ননারাচ – দেবারতি মুখোপাধ্যায়
প্রথম প্রকাশ – জুলাই ২০২৫
অলংকরণ – রঞ্জন দত্ত
MAGNA NARACH
A Historical Novel by Debarati Mukhopadhyay
বাঙালির অন্যতম তেজস্বী পুরুষ
দ্বারকানাথ গঙ্গোপাধ্যায়ের
স্মৃতির উদ্দেশে
.
কৈফিয়ত
২০২০ সালের মাঝামাঝি, অর্থাৎ ঠিক পাঁচ বছর আগে যখন ‘নারাচ’ গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়, তখন গোটা পৃথিবী কোভিড অতিমারিতে আক্রান্ত। সেই অনিশ্চিত সময়ে ‘নারাচ’ যে পাঠকমহলে এমন প্রভাব ফেলবে, তা আমার দূরতম কল্পনাতেও ছিল না। ‘নারাচ’ ঔপন্যাসিক হিসেবে আমায় অন্য পরিচিতি দিয়েছিল। শুধু আন্তর্জাতিক স্তরে অনুবাদ বা বিবিধ পুরস্কার নয়, বাংলা সাহিত্যের অর্বাচীন সেবক হিসেবে আত্মবিশ্বাস জুগিয়েছিল।
বছরসাতেক আগের অলস ছুটির দুপুরে জাতীয় গ্রন্থাগারের পুরোনো সংবাদপত্র বিভাগে আবিষ্কার করা এক চমকপ্রদ খবর দিয়ে এই কাহিনীর বীজ আমার মনে প্রোথিত হয়। ‘নারাচ’-এ চরিত্ররা পরিণতি পায়নি। সেজন্যই হয়তো পাঠকরা জানতে চাইছিলেন, “নারাচের দ্বিতীয় খণ্ড কবে আসছে?”
হয়তো আমার নিজের অবচেতনেও ফিরিয়ে আনার ভাবনাই ছিল। সেইজন্যই কিছু সুতো খোলা ছিল সচেতনভাবে। কিন্তু এ’কথাও বলতে চাই, পাঠকের অনুরোধে আমি তাড়াহুড়ো করিনি। ‘নারাচ’ উপন্যাসের ভুবনমণি, সৌরেন্দ্র, মোতি কিংবা কাদম্বিনীদের আমি গড়ে ছিলাম পরম মমত্বে, একটু একটু করে। ‘প্রিম্যাচিওর ডেলিভারি’ হলে শুধু যে চরিত্রগুলোর বিশালতার অপমান হবে, তাই নয়, অপরিণত বিকাশও হবে। আমি তা চাইনি। প্রথমে দীর্ঘদিন কেটেছে পরবর্তী কাহিনী সাজাতে, তারপর চরিত্রবিন্যাসে। তবে যখন শুরু করেছি, দ্রুত শেষ করেছি।
নারাচ একটি পৌরাণিক অস্ত্র। মহাভারতে উল্লেখিত এই লৌহপ্রহরণে ধরাশায়ী করা যেত একাধিক মানুষ অর্থাৎ ‘নর’কে।
এবার সেই ‘নারাচ’ আরও শক্তিশালী, তবে সোচ্চার নয়। ‘মগ্ননারাচ’ এক স্তব্ধ আগ্নেয়গিরি, যার ভেতরে বিপুল অগ্নি পাক খাচ্ছে নীরবে, রয়েছে স্ফোটনের অপেক্ষায়।
নারাচ শেষ হয়েছিল ১৮৮৭ সালের মর্মন্তুদ এক জাহাজডুবি দিয়ে। ‘মগ্ননারাচ’ শুরু হচ্ছে তার পরে। ‘নারাচ’-এ যেমন ছিল ল্যাটিন আমেরিকায় বেআইনিভাবে পাচার করা হাজার হাজার ইনডেনচারড শ্রমিকদের কথা, এই উপন্যাসে তেমনই রয়েছে একইরকম প্রলোভন দেখিয়ে আরও কিছু প্রান্তজনের কথা। আসামের চা বাগানে শ্রমিক নির্বাসন ও তাঁদের ওপর হওয়া অকথ্য অত্যাচার; কাদম্বিনীর ‘ডাক্তার কাদম্বিনী’ হওয়ার পরেও অক্লান্ত সংগ্রাম; নবাব ওয়াজেদ আলী শাহর পরবর্তী মুমূর্ষু মেটিয়াবুরুজ।
এই উপন্যাসেও কাদম্বিনী, দ্বারকানাথ, গগনচন্দ্রের মতো সত্য চরিত্রের সঙ্গে মিলেমিশে গেছে কাল্পনিক চরিত্ররা। ভুবনমণি তো আছেই, এসেছে আরো কিছু নতুন চরিত্র। কোথাও গিয়ে একাকার হয়ে গেছেন নেপালের রাজমাতা ও ভুবনমণি।
‘মগ্ননারাচ’-এর অন্যতম শক্তিশালী ঐতিহাসিক চরিত্র হল দ্বারকানাথ গঙ্গোপাধ্যায়, যিনি বাংলা ইতিহাস এবং সাহিত্যে অতীব underrated আমি তাঁকে যোগ্য সমাদর করতে পেরেছি কিনা, তা পাঠক বিচার করবেন।
‘নারাচ’ এর মতোই তুলনামূলক অনালোচিত ঘটনাবলীর পরিকাঠামোয় গড়ে উঠেছে ‘মগ্ননারাচ’। এসেছেন উপেন্দ্রকিশোর, এসেছেন নেপালের রাজপরিবার। এঁদের নির্মাণে আমি যথাসম্ভব ইতিহাসনিষ্ঠ থেকেছি, তবু ‘মগ্ননারাচ’ উপন্যাস, ইতিহাস নয়।
এই ধরনের উপন্যাসের বিশালত্বের জন্য তথ্যভারাক্রান্ত হয়ে পড়ার ভয় থেকেই যায়। যতদূর সম্ভব সচেতন থেকেছি সেই ব্যাপারে। দুরুদুরু বুকে পাঠকের প্রতিক্রিয়ার অপেক্ষায় রইলাম।
বইটি লেখার সময় যে সমস্ত গ্রন্থের সাহায্য নিয়েছি, ইংরেজি ও বাংলা মিশিয়ে তার কিছু নাম এই বইয়ের শেষে আগ্রহী পাঠকদের জন্য দেওয়া হয়েছে।
২৭শেমে ২০২৫
দেবারতি মুখোপাধ্যায়






Leave a Reply