মগ্ননারাচ – ২৭

২৭

বিস্ময় মানুষকে যতই স্তব্ধ করে দিক, সময় কখনো স্থবির হয় না। সে একমুখী, এগোতেই থাকে। ভুবনমণি যখন কৃষ্ণসুন্দর আর সৌরেন্দ্রকে দেখে প্রচণ্ড উত্তেজনায় সংজ্ঞা হারিয়েছে, ঠিক সেইসময়েই দ্বারকানাথ, ব্রহ্মময়ী, ছুটকি আর কয়েকজন কুলি কামিনকে নিয়ে নৌকো পাড়ি দিয়েছে।

বিষগুঁড়ি চা বাগানেও কাল রাত থেকে আগুন জ্বলছে, তবে তার তীব্রতা মরামাটিয়ার চেয়ে অনেক বেশি। ব্রহ্মময়ী আটদশজন কুলিকে প্রভাবিত করতে পেরেছিলেন। তারাই নেমেছিল আটঘাঁট বেঁধে। তবে ব্রহ্মময়ী শুধুমাত্র রেজিস্ট্রি অফিসে আগুন লাগিয়েই ক্ষান্ত হননি, জিম সাহেবের পুনরাগমনের সুসংবাদে নিজের হাতে সুপ রেঁধে পাঠিয়েছেন জোনাথন সাহেবের তরফ থেকে। আসামের জঙ্গলের কুখ্যাত বিষফল ডাবুর খুঁজেপেতে এনে সৌরেন্দ্র পাঠিয়েছিল দ্বারকানাথের হাত দিয়ে।

বলে দিয়েছিল, ‘ওই গাছের নাম Cerbera odollam। ফলে থাকে Cerberin. মারাত্মক বিষ, খেলে অবধারিত চার পাঁচঘণ্টার মধ্যে মৃত্যু। বউঠান, আপনি তিন চারটে ফল বেটে মিশিয়ে দেবেন সুপে।’

ব্রহ্মময়ী তাই করেছিলেন। মধ্যরাতে যখন বিষগুঁড়ি বাগানের রেজিস্ট্রি অফিসে মরামাটিয়ার ধাঁচেই আগুন জ্বলছে, তখন নিজের বাংলোর পালঙ্কে যন্ত্রণায় ছটফট করছেন বিলেত থেকে সদ্য ফেরা জিম সাহেব।

দ্বারকানাথ অপেক্ষা করছিলেন পাহাড়ের ঢালে। ব্রহ্মময়ী, ছুটকি আর তিনচারজন বিশ্বস্ত কুলিকামিন চলে আসতেই তিনি তাদের নিয়ে হাঁটতে শুরু করেছিলেন। বিষগুঁড়ি বাগানের পাশেই নদী নয়। চার পাঁচ ক্রোশ হাঁটতে হয়। সেই দীর্ঘপথ হেঁটে যখন সবাইকে নিয়ে নৌকোয় উঠেছিলেন, তখন সূর্যদেব পূর্ব দিকে সবে দেখা দিয়েছেন। জিম সাহেবের প্রাণবায়ু বেরিয়ে গেছে, বিলীন হয়ে গেছে পঞ্চভূতে।

শান্তি পেয়েছে দিব্যসুন্দরের আত্মা। মুক্তি পেয়েছে অরণ্যে পশুদের শিকার হওয়া নর্তকী পিয়াজু আর তার খুন হওয়া সদ্যোজাতর আত্মাও!

দ্বারকানাথ নৌকোর ছইতে বসে চারপাশ ভালো করে দেখছিলেন। অনন্ত চরাচর, যেন কেউ কোথাও নেই। চারদিক তখনও আঁধারে ঢাকা, কুয়াশার আস্তরণ ধীরে ধীরে পাতলা হচ্ছে। বিষগুঁড়ি বাগানের আগুন হয়তো এই দূর থেকেও দেখা যেত, যদি না জঙ্গলের ঘনত্ব এত বেশি হতো। আকাশের রং তখনও পুরোপুরি লাল হয়নি, তবে পশ্চিম দিগন্তে একটা চাপা আভা ছড়িয়ে পড়েছে। এই সময়ই সবচেয়ে বিপজ্জনক। শত্রুরা এখনই খোঁজ শুরু করবে, এখনই পলায়নের মোক্ষম মুহূর্ত।

ব্রহ্মময়ীর কোলের কাছে শক্ত হয়ে বসে রয়েছে এক কিশোরী। তার নাম ছুটকি। সে মাঝেমাঝেই ফিসফিস করছে, ‘বামুনমা! ওরা আমাদের ধরতে পারবে না তো!’

ব্রহ্মময়ী ছুটকিকে সাহস যোগাচ্ছিলেন, কিন্তু একইসঙ্গে এদিক সেদিক পর্যবেক্ষণ করছিলেন। তাঁর চোখের গভীরে উত্তেজনা। অস্ফুটে বললেন, ‘ভুবন, লোপা…ওরা কেমন আছে, ঠাকুরপো?’

‘ভালো আছে। পড়াশুনো করছে। আর কয়েকদিনের মধ্যেই তাদের দেখতে পাবেন।’

ব্রহ্মময়ীর চোখ জলে ভরে উঠল। কত শোক সেই অশ্রুতে। দিব্যসুন্দর, অপালা, পিয়াজু…উহ! এক জীবনে মানুষ এত আঘাতও পেতে পারে?

দ্বারকানাথ গম্ভীর কণ্ঠে বললেন, ‘নবুমাঝি, জোরে চালাও বৈঠা! পুলিশের নৌকো যেন টের না পায়!’

‘সব্বোনাশ!’ ব্রহ্মময়ীর পাশ থেকে দুজন জোয়ান কুলি বলে উঠল, ‘বাউনমায়ের ভরসায় এলুম, মারা পড়ব না তো?’

‘আগে কি তোমরা জ্যান্ত ছিলে নাকি?’ দ্বারকানাথ বিরক্তমুখে কথাটা বলে মাঝির দিকে ফিরলেন, ‘তুই তো পথ চিনিস। ব্রহ্মপুত্রের সেই চড়ায় পৌঁছতে পারবি তো?’

‘ফুলমতীর ডেরায়?’

‘হ্যাঁ।’

‘পারব কর্তা।’

দ্বারকানাথ একটা নিঃশ্বাস ফেললেন। প্রতি সংগ্রামেই কত নীরব বিপ্লবী থাকে। যেমন ভেবাপদ মাঝি। নবু মাঝি। জাহাজঘাটার ফুলমতী। ভেবাপদ মাকড়িপুর ঘাট থেকে ধুবড়িতে নদী পারাপার করে। নবু মাঝিও তাই। আর ফুলমতী কাজ করে জাহাজঘাটায়। তার ছেলে বাবার সঙ্গে থাকে মরামাটিয়ায়। ফুলমতীর বর নবীন বাগানের গুডস কেবিনের দারোয়ান। ওদের একমাত্র ছেলে যখন একেবারে কোলের, একটা ভারী অসুখ করতে তারা দেখাতে গিয়েছিল কলকাতার মেডিকেল কলেজে। সেই থেকে পরিচয়। ছেলেটা আজও ভারি রুগ্ন। খুব ভোগে।

নবু মাঝির ডিঙি নৌকো যখন সেই চরায় গিয়ে নোঙর করল, তখন রোদ খাঁ-খাঁ করছে।

দ্বারকানাথ চরায় উঠে কিছুটা এগিয়ে আসতেই দেখতে পেলেন এক আশ্চর্য দৃশ্য।

চরার একদিকে একটা পিপুল গাছের নীচে চুপ করে বসে আছে সৌরেন্দ্র।

পাশে ওটা কি ভুবনমণি?

দ্বারকানাথের রাগে শরীর উত্তপ্ত হয়ে উঠল। ভুবনমণি যে তাঁর খোঁজে এতদূর এসেছে, তা তিনি পলকে বুঝে গেলেন। ওর সাহস দেখে বিস্মিতও হলেন। কিন্তু মুখে কিছু প্রকাশ করলেন না।

চরা পেরিয়ে ছাউনিতে ঢুকে কৃষ্ণসুন্দরকে দেখতে পেয়ে বললেন, ‘এখুনি পালাতে হবে। দেরি করলে চলবে না। দুটো বাগানের অফিসে একসঙ্গে আগুন। ওরা বুঝতেই পারবে, পরিকল্পিত চক্রান্ত। তারমধ্যে আমাদের খুঁজে পাবে না। খবর পাওয়ামাত্র ধুবড়ি, গোয়ালন্দর মতো জাংশন পয়েন্টের পুলিশরা অ্যালার্ট হয়ে যাবে।’

‘তবে আমরা কী করে যাব?’ কৃষ্ণসুন্দর দ্বিধাগ্রস্থ মুখে তাকালেন।

ততক্ষণে ব্রহ্মময়ীর বুকে গিয়ে ঝাঁপিয়ে অঝোরে কাঁদতে শুরু করেছে ভুবনমণি। ছুটকি গিয়ে জড়িয়ে ধরেছে মোতিকে।

আর নিস্তারিণী, লম্বোদরী, পুঁটিবালারা অবাক হয়ে প্রত্যক্ষ করে চলেছে একের পর এক নাটকীয় দৃশ্য।

কেউ কিছু বলার আগেই ফুলমতী এগিয়ে এল, ‘আমি সব ঠিক করে রেখেছি। দ্বারিকদাদা, তুমি আমার সঙ্গে এসো।’

দ্বারিকদাদা! সৌরেন্দ্র জিজ্ঞাসুচোখে তাকাতেই দ্বারকানাথ বললেন, ‘ফুলমতী আসামে আমাদের ব্রাহ্মসমাজের সক্রিয় কর্মী। আগেরবার যখন রামকুমারদাদা আর আমি এসেছিলাম, তখন থেকে সে আমাদের সাহায্য করে চলেছে। আমাদের জন্যই ও জাহাজঘাটায় কাজ করে।’

ফুলমতী চরার পেছনদিকে নিয়ে গেল ওদের। সেখানে একটা বড় নৌকো বাঁধা। তাতে রাশি রাশি ফল। আনারস। কাঁঠাল। কলা। পেয়ারা। কী নেই। ও বলল, ‘এই নৌকোয় সবাই উঠে পড়ো এক এক করে।’

‘এত ফল…জায়গা হবে তো?’

ফুলমতী দ্বারকানাথের চোখের দিকে তাকাল, ‘ফল শুধু ওপরে। ঝুড়ির নীচে ফাঁকা। সেই ঝুড়িগুলোয় তোমরা একেকজন লুকিয়ে পড়ো।’

ফুলমতীর বুদ্ধি দেখে দ্বারকানাথ চমৎকৃত হলেন। কিন্তু সৌরেন্দ্র একটু সংশয়ে পড়ে গেল। বলল, ‘কিন্তু পুলিশের নজর পড়বে না তো?’

ফুলমতী হাসল, ‘একটা নৌকোয় যদি কাঁঠাল, আনারস আর কলার স্তূপ থাকে, পুলিশ সেটা দেখে কি আর সন্দেহ করবে? ওরা তো কুলি ধরতে চায়, ফল নয়!’

সিদ্ধান্ত হয়ে গেল। কৃষ্ণসুন্দর, সৌরেন্দ্র, ব্রহ্মময়ী, ছুটকি, আর ক’জন কুলিকামিন সাবধানে বড় বড় ঝুড়ির নিচে ঢুকে গেল। চারপাশে ফলের স্তূপ দেওয়া হল। দ্বারকানাথ শেষবার চারপাশ দেখে নিয়ে ফলের গাদা সরিয়ে নিজেও এক জায়গায় ঢুকে পড়লেন।

চারদিকে চাপা উত্তেজনা। নৌকো ধীরে ধীরে মাঝনদীতে এগিয়ে চলল। এই নৌকোটা বেশ বড়, একা দাঁড় টানা শক্ত, তবু ভেবাপদ মাঝি অভিজ্ঞ হাতে বৈঠা চালাচ্ছে। তার চোখে ভয় নেই। যদিও সে জানে, এই নৌকো ধরা পড়লে তার প্রাণও রেহাই পাবে না। তার পাশেই বসে আছে ফুলমতী।

নিস্তারিণী আর লম্বোদরী দু’জনেই নিঃশ্বাস আটকে বসে আছে। ছুটকি পুঁটিবালা আর মোতি পাশাপাশি গুটিসুটি মেরে বসে আছে ঝুড়ির তলায়। কৃষ্ণসুন্দরের চোখ বন্ধ, ঠোঁট নড়ে চলেছে। তিনি নিশ্চয়ই কোনও মন্ত্র পাঠ করছেন। ব্রহ্মময়ী নীরবে চোখের জল মুছছেন। মনে হচ্ছে, এতদিন আসামের আকাশে বাতাসে দিব্যর নিঃশ্বাস মিশে ছিল। এখান থেকে পালানোর সঙ্গে সঙ্গে তিনি পালিয়ে যাচ্ছেন তাঁর মরা ছেলেটার থেকেও!

দ্বারকানাথ চোখ বন্ধ করে শুয়ে আছেন, কিন্তু এক মুহূর্তের জন্যও তিনি নিরস্ত্র নন। কোমরের কাছে ছুরি লুকিয়ে রেখেছেন।

ওদের থেকে কিছু তফাতে ফলের আড়ালে বসে ছিল সৌরেন্দ্র আর ভুবনমণি। দুজনের মুখেই কোনও কথা নেই। খালি অপলক তাকিয়ে থাকা।

সৌরেন্দ্র খুব আস্তে ফিসফিস করে বলল, ‘তুমি বাবামশাইকে খুঁজতে এতদূর এসেছ, ভুবন? আ-আমি যে ভাবতেই পারছি না! তুমি সত্যিই আমার সেই মগ্ননারাচ হয়ে উঠেছ!’

‘মগ্ননারাচ আমি নই, তুমি। যেভাবে এতগুলো মানুষকে তুমি জোটবদ্ধ করেছ, তুমিই সেই অস্ত্র, সৌরেন্দ্র!’ ভুবনমণি নিঃশব্দে তাকিয়ে রইল সৌরেন্দ্রর দিকে। ওর চোখে জল, তবে তা কষ্টের নয়। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে ও অস্ফুটে বলল, ‘তবে আমি ভাবতাম তুমি… তুমি আর নেই। জাহাজডুবির পর কোনওভাবেই তোমার খোঁজ পাওয়া গেল না…আমি ভেবেছিলাম…আ-আমি বিশ্বাস করেছিলাম, তুমি আর ফিরবে না!’

সৌরেন্দ্র গভীর শ্বাস ফেলল, ‘আমি নিজেও তো ভাবিনি, ভুবন। জাহাজডুবি থেকে বাঁচলাম, কিন্তু চা বাগান থেকে যে মুক্তি নেই, সেই বিশ্বাস দৃঢ় হয়েছে বারবার। কতবার পালাবার চেষ্টা করেছি। কতরকমভাবে। ধরা পড়ে গেছি। মার খেয়েছি। প্রচণ্ড পরিশ্রম। অকথ্য অত্যাচার।’

ভুবনমণি ভেজা চোখে বলল, ‘তুমি কি জানো, আমি কত রাত স্বপ্ন দেখে কেঁদেছি, আবার জেগে উঠে নিজেকে বুঝিয়েছি, তুমি আর নেই…ফিরবে না কোনওদিন!’

সৌরেন্দ্র কাঁপা হাতে ভুবনমণির হাত ধরল, ‘আমি জানতাম, যদি কোনওদিন ফিরতে পারি, তুমি ঠিক অপেক্ষা করবে আমার জন্য।’

ভুবনমণি সংকোচে চোখ নামিয়ে নিল।

সৌরেন্দ্র একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল, ‘আমি জানতাম না, ফিরে এসে তোমাকে খুঁজে পাব কিনা। জানতাম না, তুমি এখন কেমন আছ, কাকে নিয়ে বাঁচছ…আমি ভয় পেয়েছিলাম।’

‘ভয় পেয়েছিলে? ভেবেছিলে, আমি তোমায় ভুলে যাব?’

সৌরেন্দ্র কোনও উত্তর দিল না। নীরব বাতাসে শুধু নদীর ঢেউয়ের মৃদু শব্দ। বেলা পড়ে এসেছে।

‘এই গরমে বেশিক্ষণ থাকলে দম বন্ধ হয়ে যাবে, ভুবন!’

‘আরো কয়েক ঘণ্টা সহ্য করতেই হবে সৌরেন্দ্র।’ ভুবনমণি দৃঢ়কণ্ঠে বলল, ‘তোমার নির্ভীক নারী তোমার হাতে তুলে দিয়ে আমি নিশ্চিন্ত হতে চাই!’

সৌরেন্দ্র কিছু বলতে যাচ্ছিল, হঠাৎ ওপরে ভেবাপদ মাঝির গলা শোনা গেল।

‘পুলিশ…পিছু লিয়েচে!’

সবাই আতঙ্কে কাঠ হয়ে গেল। নৌকো ধীরে ধীরে থামল। বাইরে থেকে একটা চিৎকার শোনা গেল।

‘এই মাঝি! এই নৌকো কোথা থেকে আসছে?’

সৌরেন্দ্র ঝুড়ির ফাঁক দিয়ে দেখতে পাচ্ছিল, ভেবাপদ যুক্তকরে দাঁড়িয়ে রয়েছে গলুইয়ের ওপর।

‘বাবু! হাটে ফল বেচি। সেকেনেই যাচ্ছি।’

একজন লম্বাচওড়া পুলিশ একটা টর্চ বের করে ফলের স্তূপের দিকে ফেলল। ঝুড়ির নীচের চোখগুলো সন্ত্রস্ত হয়ে উঠল।

পুলিশটা বলল, ‘হুম। প্রচুর ফল আছে দেখছি। এত সওদা করলে তো রাতারাতি আমির বনে যাবি।’

পাশের কনস্টেবল বলল, ‘স্যার, ঝুড়িগুলো দেখব?’

ওরা সবাই কেঁপে উঠল। ভুবনমণি জড়িয়ে ধরল সৌরেন্দ্রকে।

ভেবাপদ কিছু বলার আগেই ফুলমতী এগিয়ে এসে একগাল হেসে বলল, ‘দেখবেন বইকি বাবুরা! তবে শুধু দেখলে তো হবে না, চাখতেও হবে। জলে টহল দিতে দিতে নিশ্চয়ই বড় খিদে পেয়েছে! এই নিন, পাকা পেয়ারা। দেখুন, এমন মিষ্টি, মনে হবে, মন্ডা খাচ্ছেন। আর দারোগাবাবু, আপনি একটু আনারস নিয়ে যান। দেখবেন গুড়ের চেয়েও মিঠে।’

পুলিশরা একটু থতমত খেল। একে অন্যের দিকে তাকাল। তারপর কর্তা গোছের পুলিশটা পেয়ারাটা নিয়ে কামড় দিল, ‘সত্যিই তো, দারুণ মিষ্টি।’

‘তবে আর বলছি কী?’ ফুলমতী হেসে বেঁকেচুরে গেল, ‘ওইজন্যই তো আমার ফলের এত কদর গো বাবু। এই যে দেখছেন, এত ফল নিয়ে যাচ্ছি, ফিরে আসবে একেবারে ফাঁকা নৌকো!’

বাকি পুলিশগুলোও তাড়িয়ে তাড়িয়ে পেয়ারা খাচ্ছিল।

পুলিশকর্তা বলল, ‘ঠিক আছে, যাও। তবে সাবধান, এদিকে একটা ডাকাতদল বেরিয়েছে!’

‘ডাকাতদল! কী বলছেন দারোগাবাবু!’

‘হ্যাঁ। দুটো বাগানে আগুন লাগিয়েছে। মাঝনদীতেই কোথাও আছে। তুমি সাবধানে যেও। দেখো, তোমার এত সওদার ফল, লুঠ না হয়ে যায়!’

পুলিশগুলো ফল খেতে লাগল। পুলিশের নৌকো ধীরে ধীরে দূরে সরে গেল।

ওদের নৌকো আবার চলতে শুরু করল। ভেবাপদ মাঝি দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

নিচে লুকিয়ে থাকা সবাই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল, কিন্তু শব্দ করল না কেউ। দ্বারকানাথ ফিসফিস করলেন, ‘ফুলমতী, তুমি আমাদের দ্বিতীয়বার প্রাণরক্ষা করলে!’

চরার কাছাকাছি এসে ফুলমতী বলল, ‘এখান থেকে তোমাদের ব্রহ্মপুত্র পার হলেই পথ সহজ হয়ে যাবে। আমায় বিদায় দিতে হবে এখানেই।’

দ্বারকানাথ ফুলমতীর মাথায় হাত রাখলেন, ‘তোর ঋণ কখনো শোধ করতে পারব না।’

ফুলমতী হাসল, কিন্তু তার চোখ জ্বালা করছে, ‘দ্বারিকাদাদা! আমার কোলের ছেলেটার যখন যায় যায় দশা হয়েছিল, মনে আছে, বউঠান তাকে কেমন করে যমের হাত থেকে বাঁচিয়ে এনেছিল? তখনো তো উনি ডাক্তারি পড়ছেন, পাশও করেননি। কে কার ঋণ শোধে, দাদা? তুমি যাও। এদের সবাইকে নিয়ে সাবধানে যাও।’

দ্বারকানাথের মতো রাশভারী মানুষের গলাও কেঁপে গেল, ‘তোর ওপর যদি সন্দেহ পড়ে?’

‘পড়লে পড়বে।’

দ্বারকানাথ বললেন, ‘ভয় পাস না। আমি এদের রেখে আবার ফিরে আসব।’ এবার আর আগুন ধরানো নয়। কংগ্রেসে বিল পাশ করিয়ে এনে পাকাপাকিভাবে বন্ধ করব কুলি আইন!’

‘তাই যেন হয়, দ্বারিকাদাদা। বউঠানকে আমার পেন্নাম জানিও।’ ফুলমতী আর দাঁড়াল না। নিচু হয়ে দ্বারকানাথের পায়ের ধুলো নিল। তারপর দ্রুত নৌকো থেকে নেমে সাঁতরে চলে যেতে লাগল ডাঙার দিকে। কয়েক মুহূর্তের মধ্যে সে মিলিয়ে গেল গহীন জঙ্গলের মধ্যে।

দ্বারকানাথ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। বললেন, ‘চলো!’

ওদের নৌকো ধীরে ধীরে এগিয়ে চলেছিল ব্রহ্মপুত্রের কালচে স্রোতের উপর দিয়ে। নদীর জল তখন গাঢ় নীল অন্ধকারে ঢেকে যেতে শুরু করেছে। আকাশের কোণে সূর্যের শেষ আভাসটুকু মিলিয়ে গিয়ে দিগন্তের প্রান্তর জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে লালচে কমলা রেখা। বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে নদীর সোঁদা গন্ধে, তার সঙ্গে মিশে গেছে দূরের অরণ্যে লুকিয়ে থাকা চা বাগানগুলোর মাটি ভেজা ঘ্রাণ।

আসামের পাহাড়ি মেঘে ঢাকা বনভূমির ছায়া ক্রমশ অস্পষ্ট হয়ে আসছে। দিনের শেষে সেসব পাহাড়, চা-বাগানের ধাপে ধাপে সাজানো সবুজ বিস্তার, বাষ্পে ঢাকা চায়ের গন্ধ। সবকিছুই যেন ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে এক অদৃশ্য অতলে। চা-বাগানের দীর্ঘ ইতিহাস, শ্রমিকদের ক্লান্ত দেহ, তাদের করুণ রক্ত ঘামের গল্প। সব মিলিয়ে যাচ্ছে সন্ধ্যার ধোঁয়াটে আলোর মধ্যে।

ওরা অবাক চোখে দেখছিল। জলের ছপছপ শব্দের মধ্যে নদীর ওপারে, কালো ছায়ার মতো দাঁড়িয়ে থাকা শত শত চা বাগান যেন এক নির্বাক ইতিহাসের সাক্ষী। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেইসব জায়গা হয়ে উঠেছে নিঃশব্দ শ্মশান, যেখানে বাতাসে আজও ভাসে কুলিদের মর্মান্তিক আর্তনাদ। ব্রিটিশ মালিকদের শোষণের ভারে নুইয়ে পড়া শ্রমিকেরা, যাদের দুর্দশা কোনও ইতিহাসের পাতায় লেখা হয়নি, তাদের কষ্টের গন্ধ আজও লেগে আছে সেই মাটির গভীরে।

বিভীষিকা থেকে যত দূরে সরে যাচ্ছিল, তত যেন নৌকোয় ঝুড়ির তলায় কান্না জোরালো হচ্ছিল ওদের।

ব্রহ্মময়ী কৃষ্ণসুন্দরের কাঁধে মাথা রেখে নাগাড়ে কেঁদে চলেছিলেন। সন্তানহারা মায়ের সেই কান্না যেন ছোঁয়াচে অসুখের মতো ছড়িয়ে পড়ছিল ঝুড়ি থেকে ঝুড়িতে।

নিস্তারিণী পুঁটিবালারা ফোঁপাচ্ছিল। বিশ্বাস করতে পারছিল না, দুঃস্বপ্ন সত্যিই শেষ হতে চলেছে।

নৌকোর অন্যপ্রান্তে কাঁদছে লম্বোদরীও। ছুটকির কাছ থেকে সে ইতিমধ্যেই জেনেছে তার আদরের কন্যা পিয়াজুর পরিণতি। আকাশের দিকে তাকিয়ে সে বুক চাপড়াচ্ছে, ‘যার লাইগা স্বদেশ ফিরে আইলাম, তাকেই আমার থেকে কাইড়া নিলি, তোদের নরকেও ঠাঁই হইব না!’

ধর্ষিতা, লাঞ্ছিতা, অপমানিত প্রৌঢ়া লম্বোদরী কী করে জানবে, জিম সাহেব মরলেও এই বর্বর প্রথা চলবে আরো কয়েক দশক! আরো কয়েক হাজার কুলি পাচার হয়ে যাবে আসামের চা বাগানে। কলকাতায় ফিরেই দ্বারকানাথের শরীরের দ্রুত অবনতি হবে। তাঁর আর কোনওদিনও ফিরে আসা হবে না আসামে।

ঝুড়ির অন্ধকারে সৌরেন্দ্র ধীরে ধীরে হাত বুলিয়ে দিচ্ছিল ভুবনমণির পিঠে। তার আঙুলের স্পর্শে নেই কোনও কামনা। নেই কোনও বাসনা। শুধু সেখানে ফুটে উঠছে এক অদ্ভুত স্নেহ। এক অমোঘ মায়ার টান।

ভুবনমণি স্থির হয়ে গুটিসুটি মেরে বসেছিল। ও বুঝতে পারছিল সৌরেন্দ্রর মনের গভীরে বয়ে চলেছে নদীর মতো নীরব অথচ খরস্রোতা আবেগ। ওরও চোখ ভিজে যাচ্ছিল বারবার।

এত যুগ পরে, এত জন্ম পরে সৌরেন্দ্র সত্যিই যেন ওর ‘নির্ভীক নারী’কে খুঁজে পেয়েছে। যত ঝড়ই আসুক, জীবনের সবচেয়ে বড় এই সম্পদটিকে আর কিছুতেই হারিয়ে যেতে দেবে না সে।

নিজেদের মধ্যে মগ্ন থাকা ওরা দুজনের কেউই খেয়াল করল না, কাছের ঝুড়ির ওপাশ থেকে একজোড়া চোখ অপলক চেয়ে রয়েছে ওদের দিকে। সেই চোখ দুটো বৃষ্টিভেজা সন্ধ্যার মতো আর্দ্র। মোতির বুকের ভেতর দুঃখের ঢেউ উথালপাথাল করে উঠছে। আজ যেন সমস্ত স্মৃতির ভারে ওর হৃদয়টা চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যাচ্ছে। চন্দ্রনাথকে মনে পড়ছে বড় বেশি। এই মুহূর্তে যদি একবার দেখতে পেত তাকে! যদি একবার বলে উঠতে পারত, ‘তুমি কোথায়, কলাকারবাবু?’

রাতের আকাশ ধীরে ধীরে আরো ঘন নীল হয়ে আসছে। সেই গাঢ় নীলের বিস্তারে একটার পর একটা তারা মিটমিট করে জ্বলে উঠছে, যেন অন্ধকারের বুক ছিঁড়ে একেকটি আলোকবিন্দু ছড়িয়ে পড়ছে মহাবিশ্বের শূন্যতায়।

মোতি ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে তারাদের দিকে। এর মধ্যে কোন তারাটা তার চন্দ্রনাথ? ওর আম্মু আব্বু কি আছে তার পাশে? সবাই কি পাশাপাশি জ্বলছে ওই দূর আকাশে?

রাতের বাতাসে শিরশিরে হিমেল পরশ বয়ে যায়, নদীর ঢেউয়ের সঙ্গে যেন মিশে থাকে অতীতের কান্না, হারিয়ে যাওয়া কণ্ঠস্বরের প্রতিধ্বনি। মোতি নিঃশব্দে চোখ বন্ধ করে। হয়তো এই আকাশের তারাদের মাঝেই কোথাও আছে তার প্রিয়জনেরা, আলো হয়ে, স্মৃতি হয়ে, মায়া হয়ে…।

বহুদিন পরে মেটিয়াবুরুজের কথা বড় মনে পড়তে থাকে মোতির। সেই আলো, সেই রোশনাই! সন্ধ্যা নামতেই দরবারভরা গান। উস্তাদদের সুরেলা কণ্ঠে গজল। রঙিন মশালের আলোয় জমে ওঠা জলসা।

মোতি চমকে আকাশের দিকে তাকায়! ওই তো! ওই তো আকাশের সব মেঘ কেটে স্পষ্ট হয়ে উঠছে সেই মেহফিল। লক্ষনৌয়ের সুগন্ধি আতরের গন্ধ ভরে উঠছে বাতাস। ওই তো হুকোর ধোঁয়ায় মোমবাতির নরম আলোয় স্পষ্ট হয়ে উঠছে তার ঔরসদাতার মুখ। নবাব ওয়াজেদ আলী শাহ্। সেই স্বভাবসিদ্ধ হাসি। সেই ভঙ্গিমা। তবু যেন চোখের কোনায় সেই পরিচিত বিষাদ লেগে আছে।

কিছু কিছু সুর যেমন কখনও নির্বাসিত হয় না, কিছু কিছু রাজত্ব সময়ের অতলে হারিয়ে যায় না কোনওদিনই।

নবাব এখন হয়ে উঠেছেন কবি আখতার পিয়া। গেয়ে চলেছেন একের পর এক গান। জোগিয়া। ঠুমড়ি। গজল। চারদিক থেকে ভেসে আছে, ‘ক্যা বাত! ক্যা বাত!’

‘বাবুল মোরা নাইহার ছুটো হি যায়ে…’

তন্ময় হয়ে গাইছেন আখতার পিয়া। গানের লয়ে স্পন্দিত হচ্ছে তাঁর কুঁচিতোলা জামা। মখমলের পালঙ্ক।

সেই সুরের প্রতিটি মোচড়ে কেঁপে উঠছে মোতির অন্তর।

ওই তো, পাশে বসে চন্দ্রনাথ গলা মেলাচ্ছে। হাফিজ নুরুল্লা কেমন খুশনবিসি করে চলেছে। নবাব গাইছেন, কখনো ঝরঝর করে কাঁদছেন। তাঁর সেই চেনা খেয়ালিপনা, বেদনায় ভরা। মাঝে মাঝে আঙুল ঘুরিয়ে চলছে পানমশলা। কখনো তাকিয়ার পাশে রাখা পেতলের গ্লাসে এক চুমুক শীতল শরবত।

‘হুজৌর! আজকের রাত ফিরোজা রঙে রাঙিয়ে তোলেন কুদরত!’ হাফিজ নুরুল্লা সেলাম ঠুকে বলছে।

মোতি অপলক তাকিয়ে রইল। চন্দ্রনাথ আর নবাবের যুগলবন্দীর সুরের লহরীতে হারিয়ে যাচ্ছিল ও। তবলা। সেতার। মেহফিলে আরও কত চেনা মুখ। এক কোণে রূপদাস মীর পানের কৌটো।

জলের শব্দ ছাপিয়ে যেন শোনা যাচ্ছে বাঁশির সুর! এক মুহূর্তের জন্য মনে হল, এই বুঝি মেটিয়াবুরুজের কোনও এক সুরেলা রজনী থেকে ভেসে এল সেই শব্দ।

মোতি চোখ বন্ধ করে ফেলল। পিয়াজুবাইয়ের আর্তনাদ এসে মিশে যাচ্ছে গানের সঙ্গে। ও শেষ বারের মতো দেখতে চাইল সেই পুরোনো রাতগুলোকে।

যেখানে আলো, গান, মশালের রোশনাইয়ের ফাঁকে ফাঁকে লুকিয়ে ছিল হারিয়ে যাওয়া একজোড়া চোখের কান্না!

শেষ

.

‘মগ্ননারাচ’ নির্মাণে সহায়ক কিছু গ্রন্থের তালিকা

1. Planter Raj to Swaraj: Freedom Struggle and Electoral Politics in A sam, 1826–1947—Amalendu Guha

2. Coolies of the Empire : Indentured Indians in the Sugar Colonies,  1830–1920—Ashutosh Kumar

3. Kadambini Ganguly : The First Indian Woman Doctor—Dr. Subrata  Dasgupta

4. Women in Colonial India : Essays on Politics, Medicine, and Histo riography—Geraldine Forbes

5. The Last King in India : Wajid Ali Shah—Rosie Llewellyn-Jones

6. Brahmo Samaj and the Making of Modern India—David Kopf

7. The History of Assam : From Yandabo to Partition, 1826–1947—  Priyam Goswami

8. India Against Itself : Assam and the Politics of Nationality—Sanjib  Baruah

9. North Eastern India: Geography, Archaeology, Forests, Flora, Religion  and Races—Edward A. Gait

10. Chains of Servitude/Bondage and Slavery in India, Patnaik, Utsa  patnaik, Manjari Dingwaney, 1985

11. Slavery in British India, D.R. Banaji, 1933

12. Kadambini and the Bhadralok, Malavika Karlekar, Economic and  Political Weekly

13. Colonial Women, Medicine and Medical Education in Bengal, 1884- 1940, Srila Chatterjee

14. Muslims of Calcutta, M.K.A. Siddiqui

15. The Raj, The Indian Mutiny and The Kingdom of Oudh 1801-1859,  John Pemble

16. কালজয়ী কাদম্বিনী, ডঃ সুনীতা বন্দোপাধ্যায়

17. অবলাবান্ধব, দ্বারকানাথ ও কাদম্বিনী, নারায়ণ দত্ত

18. উনিশ শতকের সামাজিক প্রেক্ষিতে বাঙালি মহিলা চিকিৎসক, সোমা বিশ্বাস

 এবং আরও অজস্র বই।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *