১১
মরামাটিয়া চা বাগানে মোতি, লম্বোদরী, নিস্তারিণীদের যা অবস্থা, তার সঙ্গে বিষগুঁড়ি চা বাগানে ছুটকির অবস্থার তেমন কোনও তফাত নেই। সেখানেও একইরকম স্যাঁতসেঁতে কুলিলাইন। অকথ্য পরিশ্রম। শুধু পার্থক্য বলতে, বিষগুঁড়ি বাগানটা পাথুরে এলাকায়। ঘন অরণ্য দূরে, কিন্তু বাগানের মাটি খুব পাথুরে। ফলে শ্রমিকদের পরিশ্রম অনেক বেশি।
বিষগুঁড়ি চা বাগান আসামের এক কোণায় পড়ে থাকা একটা পুরোনো চা বাগান। এই বাগানের বাতাসে চায়ের পাতার ঘ্রাণের চেয়েও বেশি ঘনিয়ে থাকে গোপন কথা।
বাগানের পুরোনো কামিনরা ফিসফিস করে, এখানে আগে যেসব মেয়ে একটু বেশিদিন থাকত, তারা হয় গায়েব হয়ে যেত, নয়ত কোনও এক রাতে চুপচাপ মরে পড়ে থাকত ছোট নদীর ধারে। আর তার পেছনে যে নারীমাংসলোলুপ বিকৃত মানুষটি ছিল, তার নাম ছিল জিম। সে ছিল এই বাগানের ম্যানেজার। কিন্তু মাসকয়েক আগে বড় গন্ডগোলে ফেঁসে গিয়েছিল। তাই আইনের প্যাঁচ থেকে বাঁচাতে তাকে তড়িঘড়ি পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে বিলেতে। তারপর থেকে এখানকার কামিনরা হাঁপ ছেড়ে বেঁচেছে। এখন বাগানে একজনই সাহেব, তিনি বড় ম্যানেজার। বয়স্ক। শান্তশিষ্ট। বাইবেল আর কাজকর্ম নিয়ে থাকেন।
এই বাগানের দারোয়ানদের মধ্যে আছে গোমুখ। লম্বা, রুক্ষ চেহারার এক দেহাতী লোক, যে কথায় কথায় লাঠি তোলে। গালাগালি দেয়। আর রাতের অন্ধকারে কাদের সঙ্গে কী সব লেনদেন করে, কেউ তা জানে না।
আছে পাহারাদার গুণাভিরাম। বয়স্ক হলেও চোখের দৃষ্টি তীক্ষ্ণ, কামিনদের জীবন-মরণ তার কথাতেই নির্ভর করে। বাগান দফতরের বড়বাবু নগেনবাবু, বাইরে থেকে ভদ্রলোক মনে হলেও, আসলে তার হাতেই সব সুতো বাঁধা। তার সামান্য ইশারায় কতজন উধাও হয়ে যায়, আর কতজনের মুখ বন্ধ হয়ে যায়, কেউ জানে না, কেউ জানতে চায়ও না।
তবে মন্দের ভালো এই যে, এদের কারুরই মেয়েমানুষের লোভ নেই। এরা কুলিদের মধ্যে মোটা টাকায় আফিম বেচে। কুলিরা যেটুকু উপার্জন করে, তার সিংহভাগ দেয় ধার মেটাতে, বাকিতে আফিম খেয়ে সারা রাত ঝিমিয়ে পড়ে থাকে। তখন আবার গুণাভিরাম লাঠি দিয়ে পেটাতে পেটাতে তাদের ডেকে তোলে। পরিস্থিতি আরো বেগতিক হলে মজু সর্দারের চাবুক তো আছেই।
তবে, ছুটকিকে মজু সর্দার প্রথমদিকে খুব বেশি কঠিন কাজ দিল না। তার কারণ আছে। নিয়মমতো, পনেরো বছরের নীচের কামিনকে খাটানো যায় না। ছুটকির বয়স এগ্রিমেন্ট কাগজে বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে ঠিকই, তবু সাবধানের মার নেই। এমনিই জিমসাহেবের কুকীর্তির পর বিষগুঁড়ি এখন সবার নজরে।
প্রথম কয়েকদিন ছুটকিকে দেওয়া হল চা পাতা তোলার কাজ। সূর্য ওঠার আগেই তার মতো অল্পবয়সি কামিনরা চলে যায় বাগানের এক প্রান্তে। গাছে নতুন কুঁড়ি আর কচি পাতা চিনতে শিখিয়ে দেওয়া হয়েছে। বলে দেওয়া হয়েছে কোনটা তুলতে হবে, কোনটা ফেলে রাখতে হবে। সারাদিন মাটির হাঁড়িতে জল নিয়ে কাজ করতে হয়। এক সপ্তাহেই পাথুরে মাটিতে হাঁটতে হাঁটতে পায়ের তালু ক্ষতবিক্ষত হয়ে গেল। হাতের আঙুলে কালচে দাগ পড়ে গেল।
দু’সপ্তাহ পর থেকে ছুটকিকে অন্য কাজেও লাগানো হল। সকালে চা পাতা তোলা, দুপুরের পর সেগুলো শুকনোর জন্য বাঁশের চাটাইতে বিছিয়ে দেওয়া। সন্ধের আগে সেগুলোকে আবার গুদামে নিয়ে যাওয়া। মাঝে মাঝে ওকে ভারী বস্তাও টানতে হত, তবু ছুটকি অতটা ভেঙে পড়ল না। তার কারণ দুটো।
এক, এখানে সাহেব বা দেশী, কোনও কর্মচারীই সেভাবে কামুক প্রকৃতির নয়।
দ্বিতীয় কারণটিই মুখ্য। বাপ-মা মরা ছুটকি এখানে এসে একটা মা পেয়েছে। স্নেহ, মায়া, মমতায় পরিপূর্ণ এক প্রৌঢ়া। পরনে সুতির কাপড়। মাথায় ডগডগে সিঁদুর। হাতে শাঁখাপলা। তিনি বড়সাহেবের বাংলোয় রান্না করেন। সবাই তাকে বামুনমা বলে ডাকে। সেই বামুনমা খুব অল্পদিনে ছুটকিকে বড় ভালোবেসে ফেলেছেন।
নিয়ম অনুযায়ী ছুটকির কুলিলাইনে থাকার কথা, কিন্তু বামুনদিদির কথায় সে প্রায়দিনই থাকতে শুরু করল তার কোয়ার্টারে। বামুনদিদি রোজ তার জন্য যত্ন করে রাঁধেন। চুল বেঁধে দেন। আরো কতরকম গল্প করেন। শুনতে শুনতে ছুটকির তাক লেগে যায়। বামুনদিদিও বাঙালি, তবে বাড়ি কোথায়, জিগ্যেস করলে কিছুতেই বলেন না। শুধু তাঁর সুন্দর মুখখানায় কালো মেঘ জমে।
রোজ বিকেলে ঘেমেনেয়ে ক্লান্ত হয়ে ছুটকি যখন ফেরে, বামুনমা তখন ওর জন্য মুড়ি মেখে রাখেন। সঙ্গে লঙ্কা, বাদাম, ছোলা। নিশ্ছিদ্র আঁধার নামার আগে কোয়ার্টারের দাওয়ায় বসে ছুটকি থালার শেষ মুড়িটুকু গোগ্রাসে খায়। খেতে খেতে আড়চোখে তাকায়, ‘যাই বলো, লাইনে সবাই আমার ওপর খুব চটে যাচ্চে।’
‘কেন রে?’ বামুনমা হেসে জিগ্যেস করেন।
‘এই যে! ওরা খাচ্ছে শুধু নুন-ভাত, আর তুমি আমায় জামাই আদর কোচ্চ, তাই!’
‘ওরে পাগলি! কে কী খাবে, তা তো বিধাতাই ঠিক করে দেন! তিনি আমাকেও খাওয়ান, তোকেও খাওয়ান।’
‘বাহ, তবে উনি তোমার মাথায় তেল মাখিয়ে দেন না কেন?’
বামুনমা একটু চুপ থেকে হেসে ফেলেন, ‘কে বলল, দেন না!’
ভোরের কুয়াশায় ছুটকি যখন বাগানে কাজে পৌঁছোয়, তখন রোজ টের পায়, কিছু একটা ফিসফিসানি হচ্ছে। কুলি লাইনের অন্য কামিনদের চোখে চাপা আগুন। রাগ। হিংসে। তারা মুখে কিছু বলে না ঠিকই, কিন্তু শুষ্ক ঠোঁট কামড়ে, গলার স্বর চেপে কথা বলে, যেন ইচ্ছে করেই ওর কানে কিছু পৌঁছতে দিচ্ছে না।
কেউ কেউ আবার চোখাচোখি হতেই বাঁকা হাসে, ফিসফিসিয়ে বলে ওঠে, ‘বামুনদিদি অপয়া, জানিস তো? পেটের ছেলেটা এসেই মরেছিল, তারপর যাকে আপন করেছিল সেও বিদেয় হল। এবার তুইও মরবি!’
আরেকজন মাথা নাড়তে নাড়তে যোগ করে, ‘আমগো কুনু ভয় নাই বাপু! লোভ টোভ করিনে। গরিবের কথা বাসি হলি সঠিক হয়!’
ছুটকি কিছু বুঝতে পারে না। এখানে কাজে আসার পরই যে বামুনমায়ের ছেলে জ্বরে ভুগে মারা গেছিল, সেকথা ও বামুনমায়ের মুখেই শুনেছে। কিন্তু দ্বিতীয়জন কে?
বামুনমা চুপ করে হাঁড়ির ভাত নাড়ছিলেন। ছুটকি এসে ওর কাঁধে হাত রাখে, ‘বলো না গো! তুমি কাউকে আপন করেছিলে, সেও আর নেই। কে সে?’
প্রশ্নের উত্তরে বামুনমায়ের চোখে জল উপচে আসে, ‘আমার তিনটে মেয়েই হারিয়ে গেছে। দুটোকে পেটে ধরেছিলাম, একটাকে ধরিনি। এখানে এসে সে আমার কাছে এসেছিল। তোর চেয়ে বড়। তবে ফুলের মতো সুন্দর ছিল।’
‘তোমার মেয়ে? কিন্তু তুমি তো…?’
‘রক্তের সম্পর্ক থাকলেই কি শুধু মা হওয়া যায়? ওকে বুকের দুধ খাওয়াইনি, কিন্তু মায়ের মতোই আগলে রেখেছিলাম। অকে নিয়ে পালিয়ে যেতে চেয়েছিলাম। পারিনি।’
‘কেন?’
বামুনমায়ের চোখে আগুন ঝরে, ‘এখানে এক সাহেব ছিল। এখন সে দেশে ফিরে গেছে। সেই জিম সাহেব ওকে চোখে চোখে রাখত। রাতে দরজা আটকে রাখতাম, তাও রেহাই দিত না। একদিন দেখি ওর পেটে বাচ্চা এসেছে। পোয়াতি দশাতেও ছুটি দেয়নি ওকে। তারপর যেদিন ফুটফুটে ছেলেটা হল, ওর বুক থেকে টেনে নিয়ে শাল গাছের গুঁড়িতে ছুড়ে ফেলে দিল।’
‘কী বলছ গো!’ ছুটকি আতঙ্কে কেঁপে ওঠে।
‘হ্যাঁ।’ বামুনমায়ের মুখ কান্নায় বেঁকেচুরে যায়, ‘তারপর ও ছুটে পালাল জঙ্গলের মধ্যে। তখন সন্ধে হয়েছে। কেউ তাড়া করার সাহস পেল না। তারপর থেকে আর কোনও খোঁজ নেই। আর থাকবেই বা কী করে। ওই জঙ্গলে বাঘ, গন্ডার, বুনো মোষ আছে। তারা কি আর ওকে আস্ত রেখেছে?’
ছুটকি গায়ে হাত বুলিয়ে দেয়, ‘কেঁদো না বামুনমা!’
বামুনমা থামেন না, কাঁদতে কাঁদতে চলেন, ‘আমি জানি, কামিনরা আমায় অপয়া বলে। আর বলবে নাই বা কেন, আমার ছেলেটাকেও তো এখানে নিয়ে এসে বেশিদিন রাখতে পারিনি! পিয়াজুকে পেয়ে আমার পেটের ছেলেকে ভুলে ছিলাম, সেও চলে গেল। আইন আদালতে কিচ্ছু শাস্তি হল না জিম সাহেবের। সে বহাল তবিয়তে দেশে ফিরে গেল।’
ছুটকি চমকে ওঠে, ‘কী নাম বললে?’
‘পিয়াজু।’ কান্নার দমকে ফোঁপাতে থাকেন বামুনমা, ‘পিয়াজুকে যে জিম সাহেব কী কষ্ট দিয়েছে, তা চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না।’
‘পিয়াজু?’ ছুটকি চেঁচিয়ে ওঠে, ‘ফরসা, খুব সুন্দর দেখতে? বাঁ গালে একখানা লাল তিল?’
‘হ্যাঁ, তুই কী করে চিনলি তাকে?’
ছুটকি আর কোনও কথা বলতে পারে না। ওর চোখের সামনে ভেসে ওঠে মেটিয়াবুরুজের মেহফিলে পিয়াজুবাইয়ের নাচের ঝংকার। মনে পড়ে যায় প্রৌঢ়া লম্বোদরীর মুখ। যে নিজের পালিতা কন্যার খোঁজে নিজে থেকে ছুটে এসেছে এই নরকে।
