মগ্ননারাচ – ১৯

১৯

নেপালে কাদম্বিনী পৌঁছেছেন সপ্তাহখানেক হল। নেপাল যেন হিমালয়ের কোলে এক অদ্ভুত মায়ারাজ্য। দুর্গম পাহাড়ি পথ পেরিয়ে কাঠমান্ডুতে পৌঁছানো সহজসাধ্য নয়। কলকাতা থেকে রেলপথ। তারপর অনেকটা পথ রাজবাড়ির পাঠানো সুসজ্জিত ঘোড়ার গাড়িতে যেতে যেতে হয়েছে। যাত্রার ধকলে পরিশ্রান্ত হয়ে পড়লেও কাদম্বিনী একদিনও বিশ্রাম নেননি। এসেই রাজমাতার চিকিৎসা শুরু করে দিয়েছেন।

নেপালের রাজপ্রাসাদটা যেন কোনও স্বপ্নপুরী। প্রাসাদের সামনে বিশাল সিংহদ্বার। সোনার জল ছোঁয়া নকশা করা কাঠের তৈরি প্রকাণ্ড দরজা। দু’পাশে সিংহমূর্তি। রক্ষীরা নিজেদের জায়গায় কঠোর পাহারায় দাঁড়িয়ে। এটাই কাঠমান্ডুর বিখ্যাত নারায়ণহিটি দরবার। ‘নারায়ণ’ অর্থাৎ বিষ্ণু আর ‘হিটি’ হল জলস্রোত।

রাজপ্রাসাদটা একসময় চৌতরিয়া পরিবারের দখলে ছিল। নানা রক্তাক্ত রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব আর ষড়যন্ত্রের পরে মালিকানা পরিবর্তিত হতে হতে এখন রাজা শমশের জঙ বাহাদুরের হাতে এসেছে। বছরদশেক আগে তিনি পুরনো প্রাসাদটার খোলনলচে বদলে একেবারে নতুন করে তৈরি করেছেন।

সব দেখেশুনে কাদম্বিনী হাঁ হয়ে গিয়েছিলেন। অতিথিশালায় বরাদ্দ তাঁর মহলটি আয়তনে সমগ্র কর্ণওয়ালিশ স্ট্রিটের বাড়ির চেয়েও বড়। আসলে এই প্রাসাদ তো শুধু রাজার বাসভবন নয়, রাজ্যের রাজনীতির কেন্দ্রও বটে। নানান ষড়যন্ত্র ও ক্ষমতার লড়াইয়ের সাক্ষী এই প্রাসাদের দেওয়ালগুলো। কাদম্বিনী মহলের ভৃত্যদের মুখে শুনেছেন, দশবছর আগে, এই রাজপ্রাসাদের দক্ষিণ প্রান্তেই তখনকার রাজা রণদীপ সিং কুনওয়ারকে হত্যা করা হয়েছিল।

কাদম্বিনীর বরাবর ব্রাহ্ম মুহূর্তে শয্যাত্যাগ করা অভ্যাস। ভোরবেলায় যখন নিজের মহলের বারান্দায় এসে দাঁড়ান, তখন দূর পাহাড়ের ফাঁকে সবে সূর্যদেব দেখা দিতে শুরু করেন। প্রচণ্ড ঠান্ডা। বরফে ঢাকা হিমালয়কে দেখতে দেখতে কাদম্বিনী সূর্যকে নমস্কার করেন। চুপচাপ দাঁড়িয়ে কত কী ভাবেন। স্বামীর কথা। ছেলেমেয়েদের কথা। দেখেন, ধীরে ধীরে কীভাবে সূর্যের আলো এসে পড়ছে প্রাসাদের সাদা পাথরে। দূরে পাহাড়ের বুক চিরে আঁকাবাঁকা পথ চলে গেছে সামনের দিকে। পথের ধারে ছোট ছোট গ্রাম। ঘন অরণ্যের নিস্তব্ধতা।

তাঁর মতো একজন বাঙালি নারীর এই অভিজাত পরিবেশে নিজেকে মানিয়ে নেওয়া সহজ নয়। থরে থরে সুগন্ধী। প্রসাধনী। সবসময় খাবার আসে সোনা কিংবা রুপোর বাসনে। কাদম্বিনী সংকুচিত হয়ে ওঠেন। কিন্তু বোঝেন, এখানে এটাই রেওয়াজ।

রাজপরিবারের মেয়েরা পুরোপুরি অন্তঃপুরবাসিনী। কাদম্বিনী দৈবাৎ তাঁদের দেখা পান। আর তখনই তাঁদের চোখের অভিব্যক্তিতে বোঝেন, তাঁকে ওরা ভাবে বুঝি কোনও ভিনগ্রহের প্রাণী। তা হোক, এই সব নজরে তিনি বহুদিন ধরে অভ্যস্ত।

বেলা বাড়লে এলাহি প্রাতরাশের আয়োজন থাকে প্রতিদিন। যদিও কাদম্বিনী খান যৎসামান্য। তারপর তাঁর দিন শুরু হয় রাজমাতার কক্ষে গিয়ে। সকালবেলাতেই একবার গিয়ে দেখেন, সারারাত রোগিণীর অবস্থা কেমন ছিল। সঙ্গে থাকেন রাজপরিবারের বৈদ্য ও রাজমাতার ব্যক্তিগত পরিচারিকারা। কাদম্বিনীর নির্দেশে রাজমাতার ঘরের ব্যবস্থা এখন সম্পূর্ণ পাল্টে দেওয়া হয়েছে। খোলামেলা জানালা, যার বাইরে পাহাড়ের নির্মল বাতাস এসে লাগে। দিনের পর দিন নিয়ম মেনে শুরু হয়েছে নতুন ওষুধপত্র।

এখানে আসার পরেরদিনই তাঁর সঙ্গে দেখা করেছিলেন স্বয়ং রাজা জঙ বাহাদুর। তাঁর পরনে ছিল গাঢ় নীল রেশমের রাজকীয় নেপালি পোশাক। মাথায় রত্নখচিত সোনার মুকুট। গলায় মুক্তোর মালা। খুব বিনয়ের সঙ্গে তিনি বলেছিলেন, ‘আপনার খ্যাতি বহু শুনেছি। আমার মাকে বাঁচাতে পারলে আমি চিরকৃতজ্ঞ থাকব। আপনি যা প্রয়োজন বলবেন, সব ব্যবস্থা করা হবে।’

‘কিন্তু রাজমাতার কী অসুখ হয়েছে? চিঠিতে স্পষ্টভাবে আমায় কিছু বলা হয়নি।’ কাদম্বিনী জানতে চেয়েছিলেন, ‘আপনার মন্ত্রী পারিষদরা আমার আতিথেয়তার কোনও ত্রুটি রাখেননি। কিন্তু রোগের বিষয়ে আমি এখনো অন্ধকারে।’

‘সেটাই তো কেউ বলতে পারছেন না। কিছু ডাক্তার এসেছিলেন, কিন্তু কোনও ওষুধেই কাজ হয়নি। মাও রক্ষণশীল অন্তঃপুরবাসিনী, তাঁদের সামনে ঠিক স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেননি। এদিকে দিনদিন অত্যন্ত দুর্বল হয়ে পড়ছেন। আপনাকেই সারিয়ে তুলতে হবে।’

‘রোগের নাম না জেনেই চিকিৎসা তো সম্ভব নয়। আমায় এক সপ্তাহ সময় দিন।’ কাদম্বিনী বলেছিলেন।

সেদিনই তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল রাজমাতার মহলে। রাজমাতাকে দেখে কাদম্বিনী চোখ ফেরাতে পারেননি।

অসংখ্য কারুকাজ করা দেওয়াল। সাদা মার্বেলের মেঝে। দীপ্তিময় ঝাড়বাতির নরম আলোয় ভেসে যাওয়া এক পরম রাজসিকতা। তারই মাঝে বিশাল পালঙ্কের ওপর বসে ছিলেন এক মহিলা। বয়স অন্তত সত্তর। কিন্তু সেই বয়সের চিহ্ন যেন মরিয়া চেষ্টা করেও সৌন্দর্যকে ম্লান করতে পারেনি। তাঁর সাদা আর রুপোলি চুল যেন জ্যোৎস্নার মতো উজ্জ্বল হয়ে জ্বলছিল। গায়ের রং একেবারে দুধের মতো ফর্সা। নীলকান্তমণির মতো গভীর দুটি চোখে এক অদ্ভুত দ্যুতি। এক অভিজাত আভা যেন পুরো শরীরের ওপর মাখামাখি হয়ে ছিল। পরনে রেশমের ঢিলাঢালা সবুজ শাড়ি, ওপরে সোনালি জরির কাজ।

তাঁকে দেখে রাজমাতা হেসেছিলেন। আর তখনই কাদম্বিনীর ডাক্তারি চোখ বুঝতে পেরেছিল, তাঁর শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম।

পাশেই কয়েকজন পরিচারিকা সেবায় রত ছিল। তারা হাঁ করে দেখছিল তাঁকে।

‘আপনি কি কলকাতা থেকে এসেছেন?’ রাজমাতা ক্ষীণ কণ্ঠে বলেছিলেন।

‘হ্যাঁ। রানিমা। আমি কাদম্বিনী গঙ্গোপাধ্যায়। ডাক্তার।’ কাদম্বিনী বিনয়ের সঙ্গে উত্তর দিয়েছিলেন।

‘মেয়েমানুষ ডাক্তারবাবু!’ রাজমাতার চোখদুটো কেঁপে উঠেছিল, ‘আমার ছেলে বলছিল বটে। সবাই নিষেধ করেছিল। কিন্তু সে অনেক আশা করে তোমায় এনেছে। কায়েতের মেয়ে। বামুনের বউ। তা তুমি নাকি বিলেত থেকে পাশ দিয়ে এসেছ? ছেলেপুলে ক’টি?’

‘আজ্ঞে দশটি, রানিমা। যদি আজ্ঞা করেন, আপনাকে একটু পরীক্ষা করে দেখতে পারি?’

রাজমাতা কিছুক্ষণ নীরবে তাঁকে দেখেছিলেন। তারপর মৃদু হেসে বলেছিলেন, ‘বেশ। দেখো। অনেক রাজাগজা তো এল। এবার দেখি তুমি কী করো। তবে একটা কথা মনে রেখো। আমি রানিমা হলেও তোমারই বয়সি অনেকগুলো মেয়ের মা। তাই আমার সঙ্গে কোনও চালাকি চলবে না। রোগ না ধরতে পারলে বলে দেবে। মিছে ওষুধ দিয়ে আমার শরীর আরো খারাপ করবে না।’

কাদম্বিনী নম্রভাবে হেসেছিলেন, ‘ডাক্তারি পাশ করার সময় আমাদের শপথ নিতে হয়, রানিমা। আমার সততাই আমার সাহস।’

সেদিন থেকে কাদম্বিনীর দায়িত্ব শুরু হয়েছিল। পরীক্ষা করে তিনি বুঝেছিলেন, রাজমাতার ফুসফুস ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। তবে অসুস্থতা শুধু শারীরিক নয়, মানসিকও। পুরনো কষ্ট আর দুঃখের ছাপ যেন তাঁর সমস্ত শরীরকে গ্রাস করে রেখেছে। বাইরে কঠোর হলেও ভেতরটা ফুলের মতো কোমল।

তাঁদের কথাবার্তা ক্রমে ক্রমে আরও ঘনিষ্ঠ হচ্ছিল। রাজমাতা ওঁকে ডাকেন ‘ডাক্তারবাবু’ বলে। কাদম্বিনী ‘বাবু’ শুনে আপত্তি তুললে রাজমাতা কটমট করে চেয়েছিলেন, ‘তো কী বলব? ডাক্তারবিবি? শুনতে ভালো লাগবে? কেন, ডাক্তারবাবু তুই নোস? এই কথাটাও ব্যাটাছেলের জন্মগত অধিকার নাকি? ডাক্তারবাবু কথাটার মধ্যে একটা ওজন আছে। ভরসা আছে। আমি তোকে ডাক্তারবাবুই বলব।’

একদিন বললেন, ‘ডাক্তারবাবু, তুই আগের জন্মে নির্ঘাত আমার মেয়েই ছিলি। জানিস, আমার কতদিন ধরে এই অন্তঃপুরের বাইরে পা দেওয়া হয়নি?’

‘কেন?’ কাদম্বিনী বিস্মিত হলেন।

‘রাজবাড়ির মেয়েদের জায়গা তো এই চার দেওয়ালের মধ্যেই। রাজনীতি, যুদ্ধ, শাসন, সবকিছুই তো পুরুষদের জন্য। আমরা শুধু এই অন্তঃপুরেই সীমাবদ্ধ। জন্ম থেকে আমাদের একমাত্র কাজ ছিল, আয়নার সামনে নিজেকে সাজিয়ে তোলা। স্বামীর অন্য রানিদের সঙ্গে রূপের প্রতিযোগিতা করা। আর কিছু ভাবার সুযোগই হল না রে এ জীবনে!’

কাদম্বিনী চুপ করে রইলেন।

রাজমাতা আবার বললেন, ‘তোকে দেখি আর অবাক হয়ে ভাবি। এই যে লোকেরা বলে, মেয়েরা লেখাপড়া শিখলে সমাজ উচ্ছন্নে যায়। কই, তুই তো স্বামী সংসার সবই সামলাচ্ছিস। আবার কত মানুষের প্রাণ বাঁচাচ্ছিস। ডাক্তারবাবু, এত পুণ্যি তুই রাখবি কোথায়?’

কাদম্বিনী স্টেথোস্কোপ কানে হেসে ফেললেন, ‘কী যে বলেন রানিমা!’

‘ঠিকই বলছি। মেয়েমানুষও যে মাথা উঁচু করে বাঁচতে পারে, তাকে দেখেও যে হাজারো পুরুষ সম্মানে মাথা নোয়াতে পারে, তা এই বয়সে তোকে দেখে জানলাম। তুই আমার মেয়ে। সত্যিই তুই আমার মেয়ে। আমার মেয়েগুলোও তো আমার মতোই ঘরের মধ্যে কাটিয়ে দিল, আমার নাতনিগুলোর একটাও যদি তোর মতো হয়, কী যে আনন্দ পাব!’ রাজমাতা হাঁপাচ্ছিলেন।

কাদম্বিনী মৃদু বকুনি দিলেন, ‘আপনাকে বলেছি না, টানা কথা বলবেন না!’

রাজমাতা শিশুর মতো হাসেন। বলেন, ‘এই জানলাগুলো খুলে দিয়ে যে কী উপকার করেছিস আমার! জানিস, এই জানলাগুলো দিনের পর দিন বন্ধ থাকত। মনে হত যেন একটা খাঁচার মধ্যে বন্দি হয়ে আছি। আমি ভাবিনি, মুক্ত হাওয়া আমায় এত আনন্দ দিতে পারে!’

কাদম্বিনী মৃদু হাসলেন, ‘আমি বিশ্বাস করি, ফুসফুসের অসুখে সুস্থ হওয়ার জন্য মুক্ত বাতাসের চেয়ে বড় ওষুধ আর কিছু নেই। পশ্চিমের ডাক্তাররাও এখন সেটাই বলছেন।’

রাজমাতা ধীরে ধীরে মাথা নাড়লেন। তাঁর চোখের কোণে অশ্রু চিকচিক করছে, ‘খাঁচা লোহার হোক কি সোনার, খাঁচা খাঁচাই। এখন মনে হচ্ছে আমি সত্যিই ভালো হয়ে উঠছি। তোকে দেখে যে নতুন করে বাঁচার আশা জেগেছে।’

একটু থেমে তিনি আবার বললেন, ‘আমার আরেকটা কাজ করে দিবি ডাক্তারবাবু?’

‘কী?’

‘আমায় একদিন বাইরে বেড়াতে নিয়ে যাবি।’

‘বাইরে মানে? অন্য রাজ্যে?’

‘মরণ দশা! এই প্রাসাদের বাইরে। সেই যে কতবছর আগে বিয়ে হয়ে এসে ঢুকেছিলাম, তারপর থেকে কতদিন যে খোলা আকাশ দেখিনি! আমাদের যে সূর্যের আলোয় যাওয়া মানা। জানিস, মহলের জানলা থেকে ওইটুকু পাহাড়ের চূড়া দেখতে দেখতে পাহাড়ের গোটা চেহারা কেমন, তা ভুলে গেছি। ছোটবেলায় মেঘের খেলা দেখতে আমার কী যে ভালো লাগত! আকাশের রং বদল, মেঘের হাসি, বৃষ্টির ফোঁটা…সব মনে হয় স্বপ্নের মতো। সব ভুলে গেছি। একদিন আমায় বাইরে নিয়ে যাবি?’

কাদম্বিনী স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। তাঁর ইচ্ছে হল, এই অসাধারণ আভিজাত্যের অন্তরালে থাকা এই অসূর্যম্পশ্যা নারীটিকে জড়িয়ে ধরে মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে। অর্ধশতকেরও বেশি যিনি চার দেওয়ালের মধ্যে কাটিয়েছেন, কতটা অসহায়তা, কতটা একাকিত্ব, কতটা বঞ্চনার শিকার এই রাজমাতা! না, শুধু রাজমাতা নন। রাজপরিবারের সব অন্তঃপুরিকারাই। সূর্যালোকের অধিকারও কি পুরুষদের একচেটিয়া?

চোখের জল সামলে কাদম্বিনী বললেন, ‘আমি কথা দিচ্ছি, আমি চলে যাওয়ার আগে একদিন আপনাকে নিয়ে যাব। খোলা আকাশের নিচে।’

‘চলে যাবি? তুই চলে যাবি কেন?’ রাজমাতা যেন আর্তনাদ করে উঠলেন। পরক্ষণেই নির্মল হাসলেন, ‘ওহ্‌, তাই তো। তোর ছোট ছেলেটা তো একেবারে কোলের। মায়ের জন্য তার প্রাণ কত না জানি কাঁদছে। আমিও কেমন স্বার্থপর দ্যাখ। আচ্ছা, তোর ছেলেমেয়েগুলো কি তোর মতোই দস্যি আর একরোখা?’

দিন কাটছিল। রাজমাতাও ভালো হয়ে উঠছিলেন দ্রুত। তারই মাঝে ভুবনমণির চিঠির জন্য উদ্গ্রীব হয়ে উঠছিলেন কাদম্বিনী। এখনো সে তার নতুনদাদার কোনও সন্ধান পায়নি। দ্বারকানাথের নিজেরও কোনও চিঠি আসেনি। তবে, একটাই আশার কথা, বেঙ্গলি পত্রিকায় সেই বেনামে প্রবন্ধ নিয়মিত প্রকাশিত হয়ে চলেছে। ভুবনমণি গগনচন্দ্রকে বেঙ্গলি পত্রিকায় খোঁজ নিতে পাঠিয়েছিলেন। তারা জানিয়েছে, দ্বারকানাথ নিয়মিত প্রবন্ধ পাঠাচ্ছেন।

চিঠিতে সেই কথা জেনে কাদম্বিনী আরো চিন্তিত হয়ে পড়েছেন। প্রবন্ধ লিখছেন, তবে বাড়িতে চিঠি লিখছেন না কেন? গোপনীয়তার স্বার্থে?

তারমধ্যে মেজমেয়ে জ্যোতির্ময়ী কলেজে যাওয়া শুরু করেছে। সে খুব সাহসী। বাবামায়ের মতোই একরোখা। এখনই জানিয়ে দিয়েছে, বিয়ে থা করবে না। দেশের সেবা করবে।

কাদম্বিনী নিজের মনেই ছটফট করেন। সংসারের জন্য তাঁর মন অধীর হয়ে ওঠে। তবে সমান্তরালে রাজমাতার প্রতিও এক অদ্ভুত টান অনুভব করেন। শুধু রাজমাতা কেন, তিনি ক্রমশই বুঝতে পারছিলেন, রাজপরিবারের মেয়েদের মধ্যেও তাঁর উপস্থিতি নতুন আলোড়ন তুলেছে। আজকাল প্রতিদিন চিকিৎসার ফাঁকে কোনও না কোনও রাজবধূ বা রাজকন্যা তাঁর কাছে এসে দাঁড়ায়। কেউ চুপ করে তাকিয়ে থাকে। কেউ নিজের অসুখের কথা বলে। কেউ শুধুই কথা বলতে চায়।

একদিন সকালে কাদম্বিনী অতিথিমহলের ভেতরের বাগানে বসে ওষুধের খতিয়ান লিখছিলেন। এখানে থাকার প্রয়োজন তাঁর দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। তবে, তাঁর অনুপস্থিতিতে একজন অ্যালোপ্যাথি চিকিৎসককে নিয়মিত এসে দেখে যেতে হবে। সদ্য পাশ করা হলেও চলবে। রাজা কথা দিয়েছেন, কলকাতা থেকে তেমন কাউকে স্থায়ী চিকিৎসক করে আনবেন।

এমন সময় নরম পায়ে এসে দাঁড়াল এক কিশোরী। তার বয়স তেরো কি চোদ্দ। মুখখানা বড় মায়াবী। চোখে অপার কৌতূহল। কাদম্বিনী হাসিমুখে তার দিকে তাকালেন। মাঝেমধ্যেই অলিন্দে একে তিনি দেখেছেন।

‘আপনি কি সত্যিই একজন ডাক্তার?’ কিশোরীটি প্রশ্ন করল।

‘হ্যাঁ।’ কাদম্বিনী সস্নেহে বললেন, ‘তুমি কে গো?’

‘আমার নাম মেঘলাদেবী। আমি রাজমাতার ভাইঝি। আপনার সঙ্গে কথা বলতে খুব ইচ্ছে করে।’

‘তা বেশ তো। বোসো এখানে। বলো, কেমন আছ তুমি?’

মেঘলা কী বলবে বুঝতে পারল না। এই প্রশ্ন ওকে এর আগে কেউ কখনো করেনি। ও আড়ষ্টভাবে বলল, ‘আমার বিয়ে ঠিক হয়ে আছে থাপা রাজকুমারের সঙ্গে।’

কাদম্বিনী হাসি চেপে বললেন, ‘সে তো বুঝলাম। কিন্তু তুমি কী করো?’

‘কী করি মানে?’

‘মানে…।’ কাদম্বিনী একটু ভেবে বোঝাতে চাইলেন, ‘তোমার কী করতে ভালো লাগে?’

মেঘলা চুপ করে রইল। ওর ভাইদের মধ্যে কারুর লেখাপড়া ভালো লাগে। কারুর তরোয়াল চালাতে ভালো লাগে। কিন্তু ওর নিজের কী করতে ভালো লাগে, সেটা তো এই কয়েকবছরের জীবনে কখনো ভেবে দেখেনি।

কাদম্বিনী নরমস্বরে বললেন, ‘তুমি পড়তে পারো, মেঘলা?’

মেঘলা দু’পাশে মাথা নাড়ল।

‘তোমার এই পৃথিবীটাকে জানতে ইচ্ছে করে না? কত দেশ, কত লোক, কতরকমের কথা, গল্প, গান, ইতিহাস!’

‘ইচ্ছে তো করে। কিন্তু…আমার তো বিয়ে হয়ে যাবে। তারপর…’ মেঘলার কাচের মতো সরু গলা আরো নেমে এল।

‘তারপর তুমি সেখানে গয়না পরে বসে থাকবে, তাই তো?’ কাদম্বিনী মৃদু হেসে বললেন, ‘কিন্তু পৃথিবী তো তার বাইরেও অনেক বড়, মেঘলা। তুমি জানো, এই রাজপ্রাসাদের বাইরেও বিশাল এক জগত আছে। সেখানে মেয়েরা শুধু ঘরের মধ্যে সেজেগুজে বসে থাকে না। তারা বই পড়ে, গান গায়, ছবি আঁকে, মানুষকে সাহায্য করে। আমি যেমন চিকিৎসা করি। তুমি যদি পড়তে শেখো, তাহলে তুমি নিজের ইচ্ছেমতো জীবন বেছে নিতে পারবে।’

মেঘলার চোখ বড় বড় হয়ে গেল। বলল, ‘আমি কি তখনও বিয়ে করতে পারব না?’

‘তা কেন? অবশ্যই পারবে। কিন্তু বিয়েটাই কি সব নাকি?’

মেঘলা থ’ হয়ে শুনছিল। বিয়ে ছাড়া জীবনে আর কিছু যে থাকতে পারে, সেই কথাই কেউ কখনো ওকে বলেনি।

‘বিয়েটা জীবনের একটা অধ্যায় মেঘলা। জীবন নয়। তুমি তোমার নিজের পছন্দে জীবনকে ঢেলে সাজাবে। নিজের ভালোমন্দ বোঝার মতো শক্তি অর্জন করবে। সেটা তুমি অন্যকে সাহায্য করেও করতে পারো। যেমন আমি করছি। ডাক্তার হয়ে এসেছি এখানে রাজমাতাকে সুস্থ করতে।’

মেঘলা চুপ করে বসে রইল। তারপর ধীরে ধীরে বলল, ‘আমার ভাইরা পড়ে। আমারও পড়তে ইচ্ছে করে। গল্পের বই। কিন্তু আমায় কেউ শেখাবে না।’

‘তুমি যদি সত্যিই শিখতে চাও, তাহলে আমি চেষ্টা করব তোমায় শেখাতে।’ কাদম্বিনী হাসলেন, ‘দুপুরের পর থেকে আমি ফাঁকাই থাকি। তুমি আমার কাছে চলে আসবে। আমি তোমায় পড়াব। তবে তার আগে একটা শপথ করতে হবে। তুমি কখনো হাল ছাড়বে না।’

মেঘলা একমুহূর্ত চুপ থেকে বলল, ‘আমি…আমি চেষ্টা করব।’

‘চেষ্টা নয়, মেঘলা। তুমি পারবে। আমি জানি।’ কাদম্বিনীর মনটা কেমন যেন অস্থির হয়ে উঠছিল। এইসব মেয়েরা যে অন্তঃপুরের আড়ালে কী অসহায় জীবনযাপন করছে, তা তিনি স্পষ্ট বুঝতে পারছিলেন। বললেন, ‘মেঘলা, তোমাদের মধ্যে প্রতিভা আছে, জ্ঞান অর্জনের ক্ষমতা আছে। কেবল সুযোগের অভাব। এভাবে জীবনটাকে হেলায় নষ্ট করো না তোমরা!’

‘জীবন কীভাবে নষ্ট হয়? জীবন কি ফলমূল? যে পচে যাবে?’

কাদম্বিনী হাসলেন। মেয়েটির প্রত্যুৎপন্নমতিত্বে মুগ্ধও হলেন, ‘ঠিক তাই। ফলমূল পচে গেলে যেমন তার কোনও উপকারিতা থাকে না, আমাদের জীবনও তেমন। আমরা যদি তাকে যত্ন না করি, নিজের ইচ্ছেমতো গড়ে না তুলি, নিজের পরিচয় না গড়ে তুলি, তাহলে তো আমাদের জীবনের কোনও মানে নেই। পচা ফলের মতোই তা তখন মূল্যহীন। গুরুত্বহীন। আমাদের সবার জীবনে একদিন না একদিন মৃত্যু আসবে। কিন্তু সেই শেষ সময়ে যেন নিজের জীবনকে গুরুত্বহীন না মনে হয়। তুমি কি সেভাবেই একদিন মরে যেতে চাও, মেঘলা?’

মেঘলা দুদিকে মাথা নাড়ল, ‘না। চাই না।’

‘তবে নিজের মনকে খোলা রাখো। কোনও অবস্থাতেই নিজের ক্ষমতাকে ছোট করে দেখবে না। বিশ্বাস করতে শেখো, তুমি কারুর চেয়ে কম নও। তুমি পারবেই।’ কাদম্বিনী হাসিমুখে লম্বা শ্বাস নিলেন, ‘কাল দুপুর থেকে চলে এসো, কেমন!’

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *