২২
চা পাতা ছিঁড়ে টুকরি ভরে রোদে নিয়ে গিয়ে চালনিতে মেলে শুকোচ্ছিল মোতি, লম্বোদরী, নিস্তারিণী আর পুঁটিবালা। সকাল গড়িয়ে দুপুর হয়ে এসেছে। পৌষ মাসের রোদও নরম হচ্ছে দ্রুত। শীতের কামড় যেন হাড়ের ভেতর পর্যন্ত প্রবেশ করছে। উত্তর থেকে আসা হিমেল বাতাস সমস্ত শরীরকে কাঁপিয়ে দিচ্ছে। আকাশে কুয়াশা ভরা মেঘের দাপট, যেন সূর্যের আলোকে গিলে খেতে এসেছে। চারপাশে ঘন সবুজ চা বাগান, কিন্তু তার মধ্যেও শীতের রুক্ষতা চেপে বসেছে। মাটি শক্ত হয়ে গেছে। ঘাসের উপর জমে থাকা শিশির বিন্দু এখনো শুকোয়নি।
মোতির আঙুল জমে আসছে ঠান্ডায়। পাতাগুলো সযত্নে চালনিতে ছড়িয়ে দিচ্ছে সে। নিঃশ্বাসের ধোঁয়া মুখ থেকে বেরিয়ে আসছে মেঘের মতো। মুঠো মুঠো করে পাতাগুলো ধরে চালনিতে মেলে দিচ্ছে মোতি। ওর হাতের কসরত দেখলে মনে হয়, পাকা কামিন। যেন কতদিন ধরে এই কাজ করছে। শুকোনো পাতাগুলো চালনির ওপর মেলে দেওয়ার সময় আঙুলের কড়াগুলো ঠেকে গিয়ে কুঁচকে ওঠে। সেই হতশ্রী আঙুলগুলো দেখলে কেউ স্বপ্নেও কল্পনা করতে পারবে না, একদিন এই আঙুল ছিল চাঁপার কলি। এর এক টানে শত সুর বেজে উঠত।
লম্বোদরী কাজের ফাঁকে মাঝে মাঝে হাত ঘষে নিচ্ছে। নিস্তারিণী নিজের একমাত্র ছেঁড়া চাদরটা বারবার গায়ে মুড়িয়ে নিচ্ছে। কিন্তু ঠান্ডা ক্রমশই তার নরম মাংসকে কামড়ে ধরছে। হাত-পা অবশ হয়ে আসছে। মাঝে মাঝে এক হাত দিয়ে আরেক হাত গরম করতে হচ্ছে।
পুঁটিবালা একটু দূরে একপাশে বসে। তার হাতও চলছে সমান তালে।
এই কাজের জন্যই একমাত্র বাগান পেরিয়ে অনেকটা দূরে আসতে হয়। তখন সঙ্গে দেওয়া হয় পাহারাদার। কিন্তু ওভারশিয়ার নীলকণ্ঠ আর নতুন পাদ্রি রেভারেন্ড দত্ত আজকাল স্বেচ্ছায় কামিন তদারকির দায়িত্ব নিয়েছেন। তাতে ছোটসাহেব পিটার আর বাঘ বলরাম খুশিই হয়েছে। এমনিই বাগানে পাহারাদার অপ্রতুল, পুরুষ কুলিরা সুযোগ পেলেই মাটি খোঁড়া বা অন্য কাজে ফাঁকি মারে। সেখানে নজর রাখাটা অনেক বেশি দরকার। আর বড়দিনের আগে অবধি তো নতুন পাদ্রির সত্যিই কোনও কাজ নেই। মাগনা মাইনে নেবেই বা কেন?
কিছুক্ষণ পর নিস্তারিণী হঠাৎ বলে উঠল, ‘অন্য কোনও মেয়েকে বলতে হবে না। আমিই যাব অফিস ঘরে।’
‘তুমি পারবে?’ পুঁটিবালা ফিসফিস করে বলল, ‘কেউ যদি দেখে ফেলে?’
‘দেখলে দেখবে। এমনিতেও বড়দিনের পরই আমার ডাক পড়বে ছোটসাহেবের ঘরে। তার আগে মরণকামড়টুকু দেব না?’
লম্বোদরী আর পুঁটিবালা চোখাচোখি করল।
রেভারেন্ড মণিময় দত্তের বেশভূষায় দ্বারকানাথের চোখমুখ ততক্ষণে উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে, ‘সাবাস! এই নাহলে আমার বাংলার মেয়ে! পারবে তুমি। ঠিক পারবে।’
‘কিন্তু অফিসঘরে যদি আমাদের কাগজগুলো না থাকে?’
‘সেখানেই আছে। আমি সব দেখে নিয়েছি। তবে হ্যাঁ। হাওড়ার কুলিডিপোতেও এক কপি করে রাখা আছে। সে থাক। হাওড়ার ডিপো থেকে কাগজ আসতে আসতে আমি তোমাদের সবাইকে পার করে দেব। শিয়ালদায় নেমেই তোমরা অন্য ভেক ধরবে।’
শিয়ালদা! নিস্তারিণীর বুক উত্তেজনায় কেঁপে ওঠে। সত্যি আবার নিজের বাড়ি যেতে পারবে ও? কোলের মেয়েটাকে দেখতে পাবে? ও মুখ তুলে দেখে, বাকিদেরও মুখের ভাব বদলে গেছে।
সত্যি কথা বলতে, গত পরশু সুরেনের মুখে সবকিছু শুনে বাকিদের মতো ওরও বিশ্বাস হয়নি পুরোপুরি। পাড়াগাঁয়ের বধূ হলেও নিস্তারিণী নানা বিষয়ে খোঁজখবর রাখত। তাই কলকাতা শহরের মেয়ে ডাক্তার কাদম্বিনী আর তার স্বামীর কথা সে শুনেছিল। কিন্তু বাগানের দিশী পাদ্রিই যে দ্বারকানাথ, তা ভাবতে কষ্ট হচ্ছিল ওর। বলেছিল, ‘তবে উনি আমাদের পেছনে লাগেন কেন?’
‘আহ, ওটা তো সামনে দেখাতে হয়। সেজন্যই তো এত জলদি সাহেবদের নেকনজরে এসেছে। এই যে বড়দিনের আগে অবধি কোনও মেয়েকে রাতে নিয়ে যাওয়া যাবে না, এটা যে ছল, তা বুঝছ না?’ সুরেন ওদের বুঝিয়েছিল।
মোতি, নিস্তারিণী, পুঁটিবালাদের বোঝাতে খুব বেশি বেগ পেতে হয়নি। যারা অচেনা মানুষের কথায় ভুলে কুলি হয়ে যেতে পারে, তাদের সঙ্গে এতদিন এক কুলিলাইনে থেকে সুরেন ওরফে সৌরেন্দ্র এটুকু বিশ্বাস অর্জন করতে পেরেছে।
কাজের ফাঁকে ফাঁকে আরো নানারকম শলাপরামর্শ চলল। রাতে কৃষ্ণসুন্দর আবার এলেন দ্বারকানাথের বাংলোয়। বললেন, ‘পেছনে ফেউ লেগেছে দ্বারিকা!’
‘কী করে বুঝলে?’
‘এতদিন এখানে আছি। আর বুঝব না? তোমায় সন্দেহ করছে বাঘ বলরাম। আজ আমায় অনেক রকম প্রশ্ন ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে জিগ্যেস করছিল। এমনিতেই সব চা বাগানে নতুন লোকদের ওপর নজরদারি চলছে। কেউ তো ভেতরের কথা সব লিখে পাঠাচ্ছে কাগজে, সেটা কে। তার ওপর ওই ‘মৌ’ কাগজও তাতে ইন্ধন জোগাচ্ছে।’
‘মৌ কাগজ মানে সেই অসমিয়া পত্রিকা? মাসে মাসে বেরোয়? দুই ভাই মিলে চালায়?’
‘হ্যাঁ। কাগজটা বেরোয় ছোট ভাই হরনারায়ণ বোরার নামে। কিন্তু চালায় আসলে বড় ভাই বলীনারায়ণ। তিনি ব্রিটিশ সরকারের ইঞ্জিনিয়ার, তাই ব্রিটিশ সরকারের খিদমৎগারি তো করতেই হবে।’
দ্বারকানাথ চিন্তিত কণ্ঠে বললেন, ‘ওই কাগজটা আমি দেখেছি। সমাজ উন্নয়নের আলোচনা করে, কিন্তু ব্রিটিশ সরকারের তাঁবেদারিও করে। আমার মনে আছে, কয়েকবছর আগে নারী শিক্ষা আন্দোলনে আমরা যখন সবাই মাঠে নেমেছি, ওই কাগজেই লেখা হয়েছিল, অসমের মানুষকে ব্রহ্মদেশীয়রা লন্ডভন্ড করেছিল। কিন্তু ভাটি সভ্যতার লন্ডভন্ড তার চেয়েও বেশি হবে, যদি অসমিয়া মহিলারা পণ্ডিত হতে চায়।’*
‘ওরাই এখন আবার লিখছে যে, অসমে যদি কোনও শ্রেণীর মানুষ থেকে থাকে, যাদের ধন দিনদিন বৃদ্ধি পাচ্ছে, তবে তা কুলিরা। কুলিরা খেতে চাইলেই খেতে পায়। অসুস্থ হলেই ওষুধ পায়। ভালো বাড়িতে থাকতে পায়। পরিষ্কার জল পায়। সরকার কুলিদের নিজের পুত্রের মতো লালন পালন করে।’
দ্বারকানাথ কিছুক্ষণ নির্বাক রইলেন। তারপর বললেন, ‘স্বদেশীয় হয়ে স্বদেশীয়দের প্রতি এমন মিথ্যাচার কী করে কেউ করতে পারে, তা আমার কল্পনার বাইরে।
‘বিষয়টা স্বদেশীয়ানার চেয়েও বড় হয়ে উঠেছে বাঙালি বিদ্বেষ। কাল জাহাজঘাটায় গিয়ে দেখলাম, এবারের সংখ্যায় লিখেছে, চা বাগানের জন্য অসমের অনেক উপকার হচ্ছে। কাল্পনিক কথার প্রচার করে মিথ্যে আন্দোলন করে যে মানুষরা এসে এই বাগানগুলো ভাঙার চেষ্টা করছে, তারা আসলে অসমের ঘোর শত্রু। বাঙালিরা মিছিমিছি আমাদের জন্য মাথা ঘামাচ্ছে।’
দ্বারকানাথ বললেন, ‘তুমি জানো সুন্দরদা, ওরা আগেও এরকম লিখেছে। রামকুমার বিদ্যারত্ন যখন এখানে এসে প্রথমবার সব চা বাগানের কুকীর্তি ফাঁস করেছিলেন, তখন থেকেই হইচই পড়েছিল। তখনো এই কাগজের জন্ম হয়নি। তার কয়েকমাস পর আমি এলাম। তারপরই তড়িঘড়ি এই কাগজটা বেরোনো শুরু হল। যাকগে, এরকম সরকারের ধামাধরা কাগজ সব প্রদেশেই আছে। ওদের কথা ভেবে লাভ নেই।’
কৃষ্ণসুন্দর বললেন, ‘কিন্তু আমি একটা কথা কিছুতেই বুঝে উঠতে পারি না। অসমে তো খেটে খাওয়া লোকের অভাব নেই। তাদের না নিয়ে এসে এত দূর দূর থেকে আড়কাঠি মারফৎ কুলি নিয়ে আসা হয় কেন?’
‘সেটা বুঝতে হলে তোমায় আমার এবারের প্রবন্ধটা পড়তে হবে।’ দ্বারকানাথ বললেন, ‘বছর চল্লিশ আগে যখন আসামে প্রথম চা বাগান শুরু হয়, তখন স্থানীয় শ্রমিকদেরই কাজে নেওয়া হত। খুব অল্পদিনে এই চা ব্যবসা ফুলে ফেঁপে ওঠে। ১৮৫০ সালে গোটা আসামে মাত্র একখানা চা বাগান, সেটাই একুশ বছর পর ১৮৭১ সালে বেড়ে হচ্ছে ২৯৫ টা চা বাগান। তখনকার কুলিরা ছিল স্থানীয়, নিজেদের মধ্যে ঐক্যভাব ছিল। প্রায় দিনই বেতন বৃদ্ধি বা অন্যান্য সুযোগ সুবিধা আদায়ের জন্য ধর্মঘট করত। তখন চা-কর সাহবেরা ভাবল, বাইরে থেকে কুলি ধরে আনলে তারা এখানে সেভাবে কিছু চেনেও না, জোটও বাঁধতে পারবে না, আর অনেক সস্তায় কাজও করবে। প্রথমে ওদের নজর ছিল আদিবাসীদের ওপর। তারা কঠোর পরিশ্রম করতে পারে। অসুখবিসুখ কম হয়। আর তারা পরিবারসমেত কাজে আসে। এভাবেই কামিনরা আসতে শুরু করল। তারপর আরো কুলির চাহিদা হতে দেশজুড়ে শুরু হল আড়কাঠিদের উপদ্রব। ভেদাভেদ মুছে গেল শিক্ষিত, অশিক্ষিতে। যেভাবে হোক, যেখান থেকে হোক, ফুঁসলে নিয়ে এসে রেজিস্ট্রি করে দিলেই হল। এখন আসামের সব চা বাগান মিলিয়ে মোট কুলি রয়েছে প্রায় দু’লক্ষ, তার মধ্যে পাঁচ শতাংশ মোটে অসমীয়া।’
‘হুম। অসমীয়া কামিন এতদিনে একজনও দেখিনি।’
‘দেখবে কী করে। এখানে মেয়েরা বিধবা হলে বিয়ে করতে পারে। বাইরে খেটে খেতে হয় না।’ দ্বারকানাথ নিঃশ্বাস ফেললেন, ‘আর আমি যখন আগেরবারে এসেছিলাম, তখনো অনেক ঝামেলা হয়েছিল। সেবার শিবনাথের সঙ্গে দেখা করে ডিব্রুগড়ে সভা করতে গেছিলাম, ডেপুটি কমিশনার এসে হাজির হয়েছিল। এবারে সেই অসুবিধা নেই।’
‘কিন্তু অনেকের মুখেই তোমার নাম ঘোরাফেরা করছে দ্বারিকা। বেঙ্গলি কাগজে লেখার ঢঙে কি বুঝতে পারছে, দ্বারকানাথ গাঙ্গুলি আবার আসামে এসেছেন?’
‘মনে হয় না।’ দ্বারকানাথ মাথা নাড়লেন, ‘বেঙ্গলি কাগজে Slavery in British Dominion নামের যে কলামটা লিখছি, তাতে ইচ্ছে করেই ভাষা বদলেছি।’
‘তা ভালো। তবে আগের কিস্তিতে সিলেটের চেরাগাঁওয়ের যে খবরটা দিয়েছিলে, ওখানে প্রতি হাজার কুলিতে নাকি ৫৫০ জন মরছে, সেটার জল অনেকদূর গড়িয়েছে। অনেক বাগানে নাকি মরে গেলেও তাকে পলাতক দেখানো হচ্ছে।’
‘হচ্ছে তা তো তুমি আমার থেকে ভালো জানো। হ্যাঁ, আমি লিখেছিলাম, sometimes fictitious registers are kept and dead persons are returned as deserters. প্রতিটা বাগানেই কেরানিরা এই গরমিল করে মৃত্যুর হার কম দেখাচ্ছে। কুলিদের স্বাস্থ্যের প্রতি কোনও নজর নেই, চিকিৎসার কোনও ব্যবস্থা নেই, আর অত্যধিক শ্রম। অর্থনৈতিক, শারীরিক, যৌন, তিনরকম ভাবে শোষণ চলছে। আমি তো ঘুরে ঘুরে বেড়াই। স্থানীয় জনজাতির মেয়েদের পর্যন্ত ছাড়ছে না সাহেবরা। এরা আবার নিজেদের বাইবেলভক্ত বলে দাবি করে।
‘প্রশাসনও ঠুঁটো জগন্নাথ হয়ে বসে আছে। শোনো সুন্দরদা, ওই বলীনারায়ণের কাগজ যতই পেছনে লাগুক, আমাকে দমানো অত সহজ নয়। কারণ আমি একা নই। তুমি, সৌরেন্দ্র আমার সঙ্গে আছ। ওই পুঁটিবালা, নিস্তারিণীরাও আছে। আমরা জিতবই।’
‘বড়দিনের আর মাত্র সাতদিন বাকি।’ কৃষ্ণসুন্দর চোখে চোখ রাখলেন।
‘জানি। তার আগেই মরামাটিয়া আর বিষগুঁড়ি চা বাগান শেষ হবে।’
‘বিষগুঁড়ি?’ কৃষ্ণসুন্দর অবাক।
‘হ্যাঁ। বউঠান সেখানকার দায়িত্ব নিয়েছেন।’
কৃষ্ণসুন্দর নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারলেন না। বিষগুঁড়ি চা বাগানে প্রথমবার তিনি নিয়ে গিয়েছিলেন দ্বারকানাথকে। তারপর থেকে দ্বারকানাথ প্রায়ই চলে যান সেখানে। সাহেবরা এমনিতেই এখানে নিজের ভাষায় গল্প করার বেশি লোক পায় না, দ্বারকানাথ সহজেই তাই হাত করে নিতে পারেন বাগানের সাহেবদের। কিন্তু তাই বলে ব্রহ্মময়ী কুলিদের মধ্যে বিদ্রোহের বীজ পুঁতছেন!
‘তোমার বউঠান সুস্থ আছেন এখন?’
‘হ্যাঁ। অনেকটাই। তবে, তাঁর আসল যন্ত্রণা তো শরীরের নয়, মনের ভিতর লুকিয়ে থাকা সেই দহন। সুন্দরদা, তাঁর বুকের মধ্যে যে রাগ, যে ক্রোধ আগ্নেয়গিরির মতো জমে রয়েছে, তা বেরোতে না পারার যন্ত্রণাই তাঁকে ধীরে ধীরে কুরে কুরে খাচ্ছে। সেই দহনকে যদি আমি আলো বাতাসে আনতে না পারি, দাবানল না করে তুলতে পারি, তবে তিনি নিজেই ছাই হয়ে যাবেন। তাঁর সব কিছু কেড়ে নিয়েছে এই ইনডেনচারড ব্যবস্থা। ছেলে। মেয়ে। সংসার।’
‘তুমি তাকে অপালার কথা বলেছ?’
‘বলেছি। দিব্যসুন্দর চলে যাওয়ার পরেও তিনি শোক পেয়েছেন। ওই বাগানে একটা মেয়েকে ভালোবেসেছিলেন, তার ওপর সেখানকার লম্পট এক সাহেব চূড়ান্ত অত্যাচার চালিয়েছে, মেয়েটি গর্ভবতী হয়ে পড়ার পর তার শিশুটিকে আছড়ে মেরেছে। মেয়েটি জঙ্গলে পালিয়ে গিয়েছিল। তার বেঁচে থাকার আর কোনও সম্ভাবনা নেই। অপালার কথা শুনে তিনি কতক্ষণ যে কাঁদলেন! তবে শোক একবারে পেয়ে যাওয়াই ভালো। তাতে তাঁর আগুনের তেজ আরো বেড়েছে। যাদের ষড়যন্ত্রে সব কিছু হারালেন, তাদেরই এখনো বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়াতে দেখছেন। সেই লম্পট সাহেব নাকি আবার ফেরত আসছে বিষগুঁড়িতে।’
‘জানি। জিমের মতো বিকৃতকাম আর শয়তান টি-প্ল্যান্টার দুটো নেই।’
‘বউঠান তাকে শেষ না করে শান্তি পাবেন না।’
কৃষ্ণসুন্দরের গলা ধরে আসছিল। নিজেকে সামলে তিনি বললেন, ‘সে নিজমুখে বলেছে এই কথা?’
‘সবকিছু মুখে বলতে হয় না সুন্দরদা। চোখেও পড়া যায়। তিনি প্রতিশোধ চাইছেন! শেষ হাসি হাসতে চাইছেন দেবী দুর্গার মতো, যারা তাঁর সমস্ত সুখ কেড়ে নিয়েছে তাদের ধ্বংসের সাক্ষী হতে চাইছেন। সেই প্রতিশোধের আগুনই এখন তাঁকে বাঁচিয়ে রেখেছে।’ দ্বারকানাথ জ্বলন্ত চোখে তাকালেন, ‘সব পরিকল্পনা তৈরি আছে। আর মাত্র তিনদিন অপেক্ষা করো। বিষগুঁড়ির বড়সাহেব ফিরে গেছেন। ওই বদমাশ সাহেব আজকাল করেই নামবে। বড়দিনের আগেই বিসর্জন দিতে হবে সবকটা শয়তানকে।’
কৃষ্ণসুন্দর নির্বাক হয়ে চেয়ে রইলেন। কিছুক্ষণ পর বললেন, ‘কিন্তু দ্বারিকা, সাহেবরা তো শুধু চা বাগানের মালিক নয়, তারা দেশের শাসকও বটে।’
‘তো কী? ভারতের মতো উপনিবেশগুলোয় তারা যে কী নির্যাতন চালাচ্ছে, সেটা ইংল্যান্ডের পার্লামেন্টেও পৌঁছেছে। এখানকার সাহেবদের ভণ্ডামি মুখোশ খুলে যাচ্ছে। শুধু দেশে নয়, বিলেতেও অনেক শুভবুদ্ধির সাহেব এগুলোর নিন্দা করছেন। একদিন এই শোষণের যাঁতাকল বন্ধ হবেই। যারা অত্যাচার করে তাদের সিংহাসনকে টলাতে পারে একটাই শক্তি। সত্য। আর তুমি আমি আমরা সবাই সেই সত্যের পক্ষেই লড়ছি।
‘আমরা পুরো পরিকল্পনাটা ভাগ করে নিয়েছি সুন্দরদা। মরামাটিয়ায় সৌরেন, নিস্তারিণী, পুঁটিবালারা আছে। আর বউঠান বিষগুঁড়ি চা বাগানে কাজ করছেন। ওখানকার কুলিদের তিনি একত্র করে মনের মধ্যে সেই ক্ষোভের আগুন জ্বালিয়ে দিতে পেরেছেন। এখন ওরা সবাই অপেক্ষা করছে কেবল সঠিক মুহূর্তের জন্য।’
‘কিন্তু এ দুটো বাগানের মধ্যে বিদ্রোহ করলেই তো হবে না। তা হলে খবরদুটো স্রেফ চেপে দেওয়া হবে। এখানে তিনশোরও বেশি চা বাগান। দরকার একটা ব্যাপক বিপ্লব। যাতে সারা আসামের কুলি মহল্লাগুলো একযোগে গর্জে ওঠে।’
‘তুমি ঠিক বলেছ। এই দুটো চা বাগানে আমরা সরাসরি কাজ করছি। বাকিগুলোর কুলিদেরকেও ধীরে ধীরে বোঝানো চলছে। তুমি জানো কি, কিছু সাহেবেরও এই অত্যাচারের পদ্ধতির উপর ঘৃণা জন্মেছে। আমাদের সঙ্গে তারা গোপনে হাত মিলিয়েছে।’
‘সাহেবরা?’ কৃষ্ণসুন্দর যেন বিশ্বাস করতে পারলেন না।
‘হ্যাঁ, একজন ব্রিটিশ মিশনারি আছে, নাম জন ক্লেমেন্স। সে আসামে এসেছিল শিক্ষা ও ধর্মপ্রচারের জন্য। কিন্তু এমন ভয়ানক অত্যাচার দেখে সে কুলিদের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে। অনেক কষ্টে তাকে আমাদের দলে টেনেছি। তবে তাকে পরে কাজে লাগবে। আগে লক্ষ্য এই দুটো বাগানকে শেষ করা।’
‘তারপর? তুমি কি আবার আসবে?’
‘আসতে তো আমায় হবেই!’ দ্বারকানাথের চোখের দৃষ্টি যেন আরো তীক্ষ্ণ হয়ে উঠল। ‘যতদিন না এই প্রথা চিরতরে ভারতবর্ষ থেকে নির্মূল হচ্ছে, আমি ছেড়ে দেব না।’
