মগ্ননারাচ – ২০

২০

দ্বারকানাথ লাঠি ঠুকে ঠুকে হাঁটছিলেন পাথুরে মাটিতে। কিছুটা করে হাঁটার পরই দাঁড়িয়ে দম নিতে হচ্ছিল। তাঁর বয়স পঞ্চাশ ছুঁই ছুঁই, কিন্তু অতিরিক্ত দৈহিক আর মানসিক পরিশ্রম তাঁর শরীরকে অনেক আগেই ভেঙে দিয়েছে। একসময় নিয়মিত শরীরচর্চায় শক্তপোক্ত গড়ন ছিল, কিন্তু এখন কাঁধগুলো সামান্য ঝুঁকে গেছে। তার ওপর কিছুদিন ধরে যকৃতের অসুখে ভুগছেন। পেটে বড় ব্যথা হয়।

তাঁর চোখের নীচে গাঢ় কালি, ক্লান্তির চিহ্ন স্পষ্ট। তবুও মনের জোর অটুট। এমন মনের জোর যে, তিনি চাইলে এই শীতল পাহাড়ের শৃঙ্গও জয় করতে পারেন। দম নিতে নিতেই বললেন, ‘শেষ যেবার এসেছিলাম, অবস্থা এত খারাপ ছিল না। তখন সারা দেশ থেকে কুলি আসত না, এখানকারই সিংফো, অসমিয়া, নাগাদের গ্রামে ঘুরে ঘুরে মদ খাইয়ে টাকা ধার দিয়ে চা-কর সাহেবদের লোকেরা কুলি জোগাড় করত। নতুন ইনল্যান্ড ইমিগ্রেশন আইনের পরে সেসব ল্যাঠা চুকেছে।’

কৃষ্ণসুন্দর আর সৌরেন্দ্র তাঁর পেছনে চুপচাপ হাঁটছিলেন। গত দুদিনে সুরেন ওরফে সৌরেন্দ্রর জীবনে অনেক কিছু ঘটে গেছে। সেদিন রাতে রেভারেন্ড মণিময় দত্তর ছদ্মবেশে দ্বারকানাথকে দেখে প্রথমে নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারেনি।

দ্বারকানাথেরও একই অবস্থা হয়েছিল। তিনি ঘরের মধ্যে নিয়ে এসে ওকে জড়িয়ে ধরেছিলেন। তাঁর মতো আপাতরাশভারী গম্ভীর মানুষেরও গলা আবেগে কাঁপছিল। বারবার বলছিলেন, ‘তুই…তুই বেঁচে আছিস? তবে যে জাহাজ কোম্পানি থেকে বলেছিল, সবাই মারা গেছে! কত খুঁজেছি, কত ছুটেছি আমরা!’

সৌরেন্দ্রর গলাতেও কী যেন দলা পাকাচ্ছিল অবিরত। যেন সেই মুহূর্তে সব কথা গলা দিয়ে বের করতে কষ্ট হচ্ছিল। তবুও কথাগুলোকে চেপে রাখতে পারছিল না ও। রুদ্ধ কণ্ঠে বলেছিল, ‘সরকারি রিপোর্টে তো কাউকে পাওয়া যায়নি, বাবামশাই। সেদিন জাহাজ যখন তীব্র ঝড়ে পড়ে উল্টে গেল, আমি ছিটকে পড়েছিলাম বঙ্গোপসাগরের জলে। চারপাশে শুধু জল আর জল…অন্ধকারের মধ্যে মাথা তুলতেই দেখলাম, আশেপাশে আরো কিছু মানুষ ছিটকে পড়েছে। কিন্তু কেউই কারো নাগাল পাচ্ছিল না।’

‘তারপর কী হল?’

‘তারপর…তারপর স্রোত আমাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছিল অন্যদিকে। প্রথমে তো ভাবছিলাম সবকিছু শেষ। কিন্তু জানেন বাবামশাই, মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে কীভাবে যেন মনের মধ্যে একটা জেদ চেপে বসল। আমি তখন শুধুমাত্র সাঁতার কেটে চলেছি। ঘণ্টার পর ঘণ্টা কেটে গেল… আমার মতো আরও কয়েকজন ছিল। আমরা কেউ কাউকে দেখতে পাচ্ছিলাম না, শুধু একেকজনের কণ্ঠস্বর শুনতে পাচ্ছিলাম দূরে কোথাও। কিন্তু তারা কে কোথায় আছে, জানতাম না!’

সৌরেন্দ্র থামল একটু। চোখের কোণ থেকে জল গড়িয়ে পড়ল, কিন্তু ও মুছল না, ‘উঃ, কী বিভীষিকাময় রাত! হাত-পা যেন চলতে চাইছিল না আর। স্নায়ুগুলো অবশ হয়ে আসছিল। সেইসময়ে সবচেয়ে বড় ভয়টা ছিল ঘুমিয়ে পড়ার। শরীর ক্লান্ত, অবশ হয়ে আসছে। চোখ বন্ধ হয়ে আসছিল বারবার। কিন্তু মনের মধ্যে শুধু একটাই কথা ঘুরছিল। আমাকে ফিরতে হবে। বেঁচে থাকতে হবে।’

দ্বারকানাথ বিস্ময়ে চুপ করে শুনে যাচ্ছিলেন। তাঁর চোখের কোণে আবারও জল জমতে শুরু করেছে। ভেজা গলায় বললেন, ‘তুই বেঁচে আছিস, শুধু এটা জানলেই তো আমি শান্তি পেতাম। কিন্তু কীভাবে বেঁচে থাকলি এতদিন? মেডিকেল কলেজের ছাত্র হয়ে তুই কিনা এখানে কুলিগিরি করছিস? কী করে এলি এখানে?’

‘বলছি বাবামশাই। প্রায় টানা একদিন সাঁতার কেটে বঙ্গোপসাগর থেকে মহানদীতে পড়লাম। তারপর যে ডাঙায় পৌঁছলাম, সেটা প্রথমে বুঝতে পারিনি কোথায়। খিদে তেষ্টায় শরীর চলছিল না। স্থানীয় লোকেদের কাছ থেকে জানতে পারলাম জায়গাটা কটকের কাছাকাছি। একটা লোক খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে অনেক প্রশ্ন করছিল। তারপর অনেকটা গুড় চিঁড়ে খেতে দিল। খিদের জ্বালায় গপগপ করে খেলাম। তারপর আর কিছু মনে নেই। জ্ঞান যখন ফিরল, দেখলাম আমি জাহাজে করে ভেসে আসছি আসামের দিকে। চিৎকার করে পালাতে চাইলাম। কেউ শুনল না। সবাই এগ্রিমেন্টের কাগজ দেখাল। আড়কাঠি লোকটা আমার নাম শুনতে ভুল করেছিল। সুরেন নামেই গিরমিটের কাগজ সই হয়েছে। সইটাও আমার নয়। কিন্তু সেই কাগজের জোরেই বারবার পালিয়ে গেলেও আমায় ফিরিয়ে আনা হয়। এখানকার আইন আদালত, পুলিশ সব এদের হাতে। চোখের সামনে কুলিদের খুন করা হচ্ছে, কামিনদের ধর্ষণ করা হচ্ছে, কোনও বিচার হচ্ছে না। আস্তে আস্তে আমি নিজের পরিচিতি ভুলে গেছি, ব্রাহ্মসমাজকে ভুলে গেছি, পড়াশুনো আন্দোলন সব স্মৃতি থেকে মুছে গেছে। দিনরাত অসুরের মতো খাটতে খাটতে আমি আর পাঁচজনের মতোই হয়ে গেছি, বাবামশাই!’ সৌরেন্দ্র এক নিঃশ্বাসে বলে যাচ্ছিল।

দ্বারকানাথ ওকে আবার জড়িয়ে ধরেছিলেন, ‘কোনও চিন্তা করিস না। সুন্দরদাদা আমায় এখানে একবার যখন ঢোকাতে পেরেছে, তোদের সবাইকে আমি উদ্ধার করব।’

সৌরেন কৌতূহলীচোখে তাকাল, ‘সুন্দরদাদা কে?’

‘তোদের এই ওভারশিয়ার নীলকণ্ঠ মহাপাত্র আমার দাদা। কৃষ্ণসুন্দর চট্টোপাধ্যায়। ওর পরিবারকেও ইনডেনচারড কুলি করে পাঠানো হয়েছিল ল্যাটিন আমেরিকার আখের খেতে। অনেক কৌশলে ও ফিরে এসেছে।’ হঠাৎ কী মনে পড়তে দ্বারকানাথ কৃষ্ণসুন্দরের দিক থেকে চোখ সরিয়ে সৌরেন্দ্রর দিকে তাকিয়েছিলেন, ‘তোর ভুবনকে মনে আছে?’

সৌরেন্দ্রর হৃদপিণ্ডটা যেন লাফ দিয়ে উঠল, ‘ভুবন? ভুবনমণি?’

‘হ্যাঁ। ও-ই তো এখন নির্ভীক নারীটা চালায়। ইনি ভুবনের আপন দাদা।’

বিষগুঁড়ি চা বাগানে যাওয়ার সুদীর্ঘ পথে হাঁটতে হাঁটতে সেদিনের কথা মনে পড়তে সৌরেন্দ্রর মুখে আবারও একরাশ রক্ত এসে জমা হল। মনকে ঘোরাতে ও বলল, ‘আমাদের আজ কাজটা কী হবে এই বাগানে?’

‘বলছি।’ দ্বারকানাথ একটা গাছের তলা দেখে বসে পড়লেন, ‘এখানে কিছুক্ষণ বসে যাই। তাড়াহুড়ো করে গিয়ে তো কোনও লাভ নেই।’

সৌরেন্দ্র সতর্কচোখে চারপাশটা দেখে নিল। মরামাটিয়া চা বাগান থেকে ওরা অনেক দূরে চলে এসেছে। চারপাশে ঘন জঙ্গল আর কাঁটাগাছের জটলা। পাতাঝরা গাছের শুকনো পাতা মাটির উপর গালিচার মতো ছড়িয়ে আছে। সেই পাতার ওপর দিয়ে হাঁটলে কড়মড়ে শব্দ হচ্ছে। গাছের ডালপালার আড়ালে সূর্যের আলোও ঢুকতে পারছে না ঠিকমতো। সবকিছু একটা মলিন সবুজ আভায় মোড়া। মাটিটা খানিকটা আর্দ্র, জায়গায় জায়গায় কাদা জমে আছে।

এখনও বিষগুঁড়ি প্রায় ঘণ্টা দুয়েকের পথ। এই অঞ্চলে লোকবসতি নেই বললেই চলে। ব্রহ্মপুত্রের শাখানদীটা ডান দিক বেয়ে চলে গেছে, স্রোতের শব্দটা মৃদু হলেও স্পষ্ট। নদীর জল বয়ে যাওয়ার শব্দের সঙ্গে মাঝে মাঝে শালিক বা কাকের ডাক মিশে যাচ্ছে।

‘খুব সাবধানে কথা বলতে হবে।’ সৌরেন্দ্র ফিসফিসিয়ে বলল। ‘তবে এই পথে খুব একটা লোকজন আসে না।’

কৃষ্ণসুন্দরও বসে পড়লেন, ‘সাহেবের চররা যে কোথায় আসে আর কোথায় আসে না তার কোনও হিসেব নেই। জঙ্গলগুলো ওদের হাতের তালুর মতো চেনা। তবে হ্যাঁ, ঝুঁকি কম।’

দ্বারকানাথ বললেন, ‘ভালো করে শোন। বিষগুঁড়ি চা বাগানে এখন কোনও পাদ্রি নেই। শেষ যিনি ছিলেন, তিনি ইংল্যান্ড ফিরে গেছেন। ফলে ছ’মাস ধরে এখানে চার্চের কাজ ব্যহত হচ্ছে। কনভার্সনও হচ্ছে না। আমি সেখানকার ফিলিপসাহেবকে প্রস্তাব দিয়েছিলাম, যদি আমি এখানেও আসতে পারি। বিষগুঁড়ির সাহেব নাকি ভালো, সে আবার ফিলিপের বন্ধু। খবর পেয়েই আসতে বলেছে। আমাকে এখানে থাকতে হবে না। কিন্তু সপ্তাহে এক দু-দিন এসে খ্রিস্টধর্ম প্রচার করব।’

কৃষ্ণসুন্দর ইতিমধ্যেই বিষগুঁড়ি চা বাগানে এসেছেন কয়েকবার, কিন্তু সৌরেন্দ্রর জন্য এটা প্রথমবারের অভিজ্ঞতা। রাস্তার দু’পাশে ঘন চা বাগানের সবুজ গালিচা। মাঝে মাঝে রোদ পড়ে ঝিকিমিকি করছে। কুয়াশা এখনো পুরোপুরি মিলিয়ে যায়নি, মাঝে মাঝে পথের বাঁকগুলোর ওপর ঝুলে রয়েছে সাদা ধোঁয়ার মতো।

‘কী সৌরেন্দ্রবাবু! পাহাড়ি পথ পছন্দ হচ্ছে তো?’

সৌরেন্দ্র কুণ্ঠিত মুখে তাকাল। গতকাল অবধিও এই মানুষটা তাকে ‘তুইতোকারি’ করেছেন। আজ হঠাৎ ‘বাবু’ ডাক অস্বস্তিকর।

কৃষ্ণসুন্দর বোধহয় বুঝতে পারলেন তার মনের ভাব। সামান্য হেসে বললেন, ‘তা আবার হয় নাকি! অজান্তে বিষ খেলেও তাতে দোষ হয় না। তুমি মেডিকেল কলেজের ছাত্র ছিলে, আমাদের গর্ব!’

‘তা হলেই বা। আপনি বাবামশাইয়ের দাদা।’

‘আচ্ছা বেশ। তোমায় আমি সৌরেন বলেই ডাকব নাহয়!’

সৌরেন্দ্র নিচু স্বরে বলল, ‘আপনার প্রশ্নের উত্তরটা দেওয়া হল না। পথটা বেশ সুন্দর, কিন্তু ভীষণ ঠান্ডা লাগছে।’

‘এটা কিছুই না। বিষগুঁড়ি পৌঁছানোর পর দেখবে আসল রূপ। একেবারে পাহাড়ের ঢালে তো, আমাদের মরামাটিয়ার চেয়ে ঢের বেশি শীত। যাকগে… তোমার কাজ হবে এখানকার কুলিদের বোঝানো। কী বোঝাতে হবে, তুমি কি অনুমান করতে পারছ?’

সৌরেন্দ্র কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, ‘একটা আধটা শয়তান ম্যানেজার বা কুলিসর্দারকে মেরে কিছু হবে না। শিকড় উপড়ে ফেলতে হবে।’

‘শিকড়টাই তো পচে গেছে! ব্রিটিশ সরকারের ইনল্যান্ড ইমিগ্রেশন অ্যাক্টের গোটাটাই তো চা-কর সাহেবদের স্বার্থরক্ষায় তৈরি।’ দ্বারকানাথ মন্তব্য করলেন।

‘বাবামশাই, আমরা যদি কুলিদের এককাট্টা হয়ে কাজ বন্ধ করে দেওয়ার জন্য উদ্বুদ্ধ করতে পারি?’

‘তা কি সম্ভব? কেউ রাজি হবে? অত্যাচার আরো বাড়বে। খিদের জ্বালায় মারের হাত থেকে বাঁচতে সবাই কাজ করতে সম্মত হবে।’

সৌরেন্দ্র একটু থেমে তারপর বলল, ‘বাবামশাই, একবার ভাবুন। একশো বছর আগে এই পদ্ধতিতেই আমেরিকানরা বিপ্লব করেছিল। সেখানেও ভিলেইন ছিল এই চা। ইংরেজরা আমেরিকায় চা আমদানির ওপর ভারী কর চাপালো। আমেরিকার জনগণ সেই কর দিতে বাধ্য হচ্ছিল, অথচ ব্রিটিশ পার্লামেন্টে তাদের কোনও প্রতিনিধিত্ব ছিল না। ওরা বলত “No Taxation Without Representation”। চা তো ছিল প্রতীক, বাবামশাই! সেটা ওদের অধিকার রক্ষার লড়াই ছিল।’

দ্বারকানাথ ভ্রু কুঁচকে বললেন, ‘তা তো জানি। কিন্তু আমেরিকানরা তো ছিল শিক্ষিত, স্বাধীনতার জন্য তৈরি। ওরা শুধু রাজনৈতিক অধিকার চাইছিল। আর এখানে এই কুলিদের মধ্যে কুসংস্কারের ভয় গেঁড়ে বসে আছে। ওরা নিজের অধিকার কী, সেটাই বোঝে না।’

‘কেন বুঝবে না? সাহেবরা ওদের অজ্ঞতার সুযোগ নিচ্ছে। ওদের শেখানো হয়েছে, ওদের জন্ম হয়েছে পরিশ্রম করার জন্য, লাঠির বাড়ি খাওয়ার জন্য। কিন্তু ভাবুন তো, যদি ওদের বোঝানো যায় যে ওরা নিজেরাই নিজেদের জীবনের মালিক? যেমন আমেরিকায় হয়েছিল। ১৭৭৩ সালের ১৬ ডিসেম্বর। বস্টন হারবারের ঘটনা। সেই রাতে স্যামুয়েল অ্যাডামসের নেতৃত্বে জনতা ইংরেজ চা কোম্পানির জাহাজে উঠে ৩৪২ কন্টেইনার চা সমুদ্রে ফেলে দিল। কারণ ওরা বুঝতে পেরেছিল, অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে না দাঁড়ালে অবিচার কেবল বাড়বে।’

‘কিন্তু তুমি একটা জিনিস বুঝতে পারছ না, সৌরেন্দ্র। আমেরিকানরা তো নিজেদের স্বাধীন রাজ্য গঠন করেছিল। ওদের হাতে ছিল অস্ত্র, ছিল শিক্ষা। আর এই কুলিরা? না আছে শিক্ষার আলো, না আছে কোনও সংগঠন। তোমার কথা কানে নেবে কেন ওরা?’

‘বাবামশাই, আমারও সেই প্রশ্ন ছিল। কিন্তু যত ভেবেছি, তত বুঝেছি, শক্তি আসে চেতনা থেকে। ইংরেজরা চা বাগানের মজুরদের নিয়ে একরকম দাসত্বের ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে। আর সেই ব্যবস্থার মূল কারণ হচ্ছে ওদের অজ্ঞতা আর ভয়। ভয়টা দূর করতে হবে। ভয় দূর করতে না পারলে চেতনা কখনো জাগবে না।’

‘কিন্তু ভয় দূর করবে কীভাবে? কথায়? সেই চেষ্টা আমি বহুবছর ধরে করে চলেছি। বারবার ভারতসভা থেকে জাতীয় কংগ্রেসের অধিবেশনে এই প্রসঙ্গ উত্থাপন করেছি। এখনো লিখে চলেছি বেঙ্গলিতে। সাধারণ মানুষ জানছে, রাগছে, কিন্তু বাস্তব বদলাচ্ছে না।’

সৌরেন্দ্র বলল, ‘শুধু লিখে হবে না বাবামশাই।’

‘তবে তুমি কি বলতে চাইছ, কুলিদের নিয়ে সশস্ত্র বিদ্রোহ শুরু করতে হবে?’

‘না, বাবামশাই! আমি সশস্ত্র লড়াইয়ের কথা বলছি না। অস্ত্র তো সাহেবদের হাতে আছে। আমার পরিকল্পনা সম্পূর্ণ অন্য।’ সৌরেন্দ্রর গলা দৃঢ় শোনাল। ‘আমরা যদি কুলিদের নন কো-অপারেশন ব্যাপারটা বোঝাতে পারি? যে পথে কয়েকবছর আগে আয়ারল্যান্ডে বিদ্রোহ করেছিল কৃষকরা। ক্যাপ্টেন চার্লস বয়কট নামের একজন নিষ্ঠুর ইংরেজ জমিদারকে সামাজিকভাবে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়েছিল। চাষিরা তার সাথে কাজ করা বন্ধ করেছিল।’

কৃষ্ণসুন্দর এতক্ষণ চুপচাপ শুনছিলেন। এবার অবাক চোখে বললেন, ‘নন কো-অপারেশন কি আমাদের দেশে সম্ভব, সৌরেন্দ্র? কুলিরা সাহেবদের ভয় পায়, লাঠির বাড়ির ভয়, খিদের ভয়। এ ওর নামে নালিশ করে। নিজেদের মধ্যে খেয়োখেয়ি করে। অসহযোগের জন্য যে ঐক্য দরকার, সেই বোধটাই তো ওদের মধ্যে নেই!’

‘সেই বোধটাই তো আনতে হবে। চা-কর সাহেবদের অর্থনীতি দাঁড়িয়ে আছে চা বাগানের মুনাফার ওপর। আর এই মুনাফা আসে কুলিদের ঘাম ঝরানো পরিশ্রম থেকে। যদি ওরা হঠাৎ করেই একসঙ্গে কাজ করা বন্ধ করে দেয়, পুরো ব্যবস্থা ভেঙে পড়বে। অর্থাৎ, অস্ত্র তরোয়াল, চাবুক বা বন্দুক নয়, ওদের হাতে থাকা শ্রমটাই আসল অস্ত্র। শুধু ওদের বোঝাতে হবে যে ওরা একত্র হয়ে কাজ না করলেই সাহেবদের ক্ষমতা কেঁপে যাবে।’

দ্বারকানাথ অল্প হেসে বললেন, ‘এ তো শুনতে বেশ সহজ। কিন্তু বাস্তবে? ওদের ভয় দেখালেই তল্পিতল্পা গুটিয়ে কাজ করতে লেগে যাবে। কতরকম ভয়। পাপের ভয়। জাত যাওয়ার ভয়। ধর্ম নষ্ট হওয়ার ভয়। সর্দারদের রক্তমাখা লাঠির ভয়। মেয়েদের ইজ্জতের ভয়। খিদের ভয়। এমনকী হাজার রকম দেবতার অভিশাপেরও ভয়।’

কৃষ্ণসুন্দর সম্মতির ভঙ্গিতে মাথা নাড়লেন, ‘একদম ঠিক। ওরা তো বিশ্বাস করে, মালিকের হুকুম অমান্য করলে দেবদেবী আল্লাহ্ও রুষ্ট হবেন। অশিক্ষার সুযোগ নিয়ে এই ভয়গুলোকে আরো বাড়িয়ে তোলা হয়েছে। সাহেবদের চর আর দালালরা গুজব ছড়ায়। কাজ বন্ধ করলে ঠাকুর অসন্তুষ্ট হবেন, অনাহারে ও মরণব্যাধিতে ভুগতে হবে। আবার শাস্ত্রের ভয় দেখিয়েও বোঝানো হয়, মালিকের হুকুম পালন না করা মহাপাপ। কারণ, মালিকই তো ওদের ভাতের জোগানদার। এতগুলো ভয় নিয়ে কেউ কী করে বিদ্রোহের কথা ভাবতে পারে, বলো?’

সৌরেন্দ্রর মুখ গম্ভীর হয়ে গেল। ও বলল, ‘এই ভয়গুলোকেই ওদের সাহস দিয়ে জয় করতে হবে। ভয় হল শিকল। আর সাহস হল মুক্তি। সাহেবদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর জন্য প্রথমে ওদের এই ভয়ের পাঁচিল ভাঙতে হবে।’

‘তার চেয়ে আরেকটা সহজ রাস্তা আমার মাথায় এসেছে। সেটা বলি?’ কৃষ্ণসুন্দর বললেন, ‘এখানে কুলিদের আটকে রাখার একমাত্র জোর হল গিরমিটের এগ্রিমেন্টের কাগজ। সেই কাগজের জোরেই এদের এত বোলবোলাও। পালালেও আইনের বলে হিড়হিড় করে টেনে আনা। সেই কাগজই যদি না থাকে?’

‘কীভাবে?’

কৃষ্ণসুন্দর কাঁধ ঝাঁকালেন, ‘অনেক কিছুই হতে পারে। আগুন লেগে পুড়ে যেতে পারে। হয়তো কারো অসাবধানতায় লম্ফ উলটে পড়ে গেল। হয়ত কেউ অফিসঘরের চিমনির আগুন জ্বলন্ত অবস্থায় ফেলে চলে গেল।’

‘আপনি রেজিস্ট্রারের দপ্তরটাই জ্বালিয়ে দেওয়ার কথা ভাবছেন?’

‘আমি শুধু সম্ভাবনার কথা বলছি। আমাদের কথা তো কেউ শুনবে না। যারা এদের জীবনটাকে বন্দী করে রেখেছে সেই কাগজের জোরেই, সেই কাগজকেই যদি চিরতরে শেষ করে দেওয়া যায়, তাহলে কুলিদের মুক্তির একটা পথ তৈরি হবে। একবার কাগজের শিকল ছিঁড়ে গেলে সাহেবদের আর কোনো অধিকার থাকবে না ওদের ওপর।’

‘কিন্তু এটা তো বিশাল ঝুঁকি। সাহেবরা যদি বুঝে যায় যে আমরা এর পেছনে আছি?’

‘তাই তো সরাসরি কিছু করা যাবে না। এটা এমনভাবে করতে হবে যেন মনে হয়, পুরো ঘটনাটা একটা দুর্ঘটনা। কোনওরকম সন্দেহ যাতে আমাদের দিকে না আসে।’

সৌরেন্দ্র গভীরভাবে চিন্তা করছিল। ওর চোখের সামনে ভেসে উঠছিল লাঠির ঘায়ে বুটের তলায় পিষ্ট হওয়া মুখগুলো। সারাদিনের খাটুনিতে ক্লান্ত মলিন শরীর, খালি পেটে কাজ করতে করতে চোখের নীচে কালি পড়ে যাওয়া ক্লান্ত মহিলা কুলিদের রাতজাগা মুখ। ও বলল, ‘এরকম একটা দুটো চা বাগানে হলেই তো ওরা কৌশলটা ধরে ফেলবে। সব বাগানে এমন করা যাবে না।’

‘হ্যাঁ, সৌরেন্দ্র ঠিক বলেছে। এই দুটো পথই আমাদের কৌশলে ব্যবহার করতে হবে।’ দ্বারকানাথ বললেন, ‘তার জন্য আমাদের আরো লোক দরকার। কুলিদের মধ্যে বিশ্বস্ত কিছু জন। কামিন হলে আরো ভালো।’

‘আমি পারব।’ সৌরেন্দ্র তৎক্ষণাৎ বলল, ‘দু-তিনদিন সময় দিন আমায়, বাবামশাই!’

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *