১০
এন্ট্রান্স পরীক্ষার ফল বেরোতে কর্ণওয়ালিশ স্ট্রিটের বাড়িতে উৎসাহের জোয়ার বয়ে গেল। ভুবনমণি খুব ভালোভাবে পাশ করেছে শুধু তাই নয়, মাত্র তিন নম্বরের জন্য প্রথম বিভাগ পায়নি। দ্বারকানাথ কাদম্বিনী আনন্দে আত্মহারা হয়ে গেলেন।
বাড়ির বিপরীতেই সাধারণ ব্রাহ্মসমাজের উপাসনামন্দির। সেখান থেকে সব সভ্য তো ছুটে এলেন। বাড়ির অন্যান্য অংশের বাসিন্দা গগনচন্দ্র, উপেন্দ্রকিশোর, রামকুমার বিদ্যারত্ন সকলেই আনন্দে অধীর হয়ে উঠলেন।
আশপাশের বাড়ির লোকেরা, সঞ্জীবনী প্রেসের কর্মীরাও শুভেচ্ছা জানাতে এসেছেন। কেউ আবার এসে অবাক হয়ে তাকিয়ে আছেন ভুবনমণির দিকে। যেন এই মেয়ে একটা অলৌকিক কাজ করে দেখিয়েছে।
পাশের বাড়ির থান পরা ছোট ছোট মেয়েগুলো ভিড় জমিয়ে দাঁড়িয়ে আছে দরজার কাছে। তাদের চোখে বিস্ময় আর মুগ্ধতার মিশেল। তারা ফিসফিস করে বলছে, ‘গাঙ্গুলিমশাইয়ের পরিবার তো ছোট থেকেই লেখাপড়া করেছিল। কিন্তু এই মেয়ে তো ক’দিন আগেই এল পাড়াগাঁ থেকে, তায় আবার বিধবা। একেবারে আমাদের মতো। এও এন্ট্রান্স পাশ করে ফেলল? সব ওই বাড়ির জাদু!’
পাশের মেয়েটা চোখ বড়বড় করে বলছে, ‘চল, আমরাও পড়া শুরু করি। তাহলে আমাদের জন্যও লোকে এত খাবার আনবে। কী মজাই না হবে!’
সত্যিই তাই। লাহাবাড়ির দোতলার রান্নাঘরে যেন মহাযজ্ঞের আয়োজন চলছে। হাঁড়ি কড়াইয়ের ধোঁয়া আর ঘি মশলার গন্ধ মিশে ম-ম করছে। একদিকে ভাঁড়ারে সার বেঁধে সাজানো হচ্ছে জিলিপি, মতিচুরের লাড্ডু, সন্দেশ, গজা, নারকেলের নাড়ু, ক্ষীরের পুলি, আর হরেকরকমের মণ্ডা মিঠাই। বেশিরভাগই এসেছে বিভিন্ন ব্রাহ্ম পরিবার থেকে।
এত মিষ্টি এসেছে যে মিষ্টির পাহাড় তৈরি হয়ে গেছে। পুণ্যলতা, সুকুমার, লোপামুদ্রা, নিরুপমাদের খুশি দেখে কে! কেউ বিশাল পিতলের থালা হাতে করে মণ্ডা এনে সাজাচ্ছে, কেউ আবার মাটির হাঁড়ি থেকে লাড্ডু তুলে তুলে সটান মুখে ভরছে। বিধুমুখী রেগে যাচ্ছেন, কিন্তু কেউ তাতে ভ্রুক্ষেপ করছে না।
মেঝেতে সাদা কাপড় বিছিয়ে সেখানে ছোট ছোট ছেলে-মেয়েগুলোকে বসিয়ে দেওয়া হয়েছে। খাওয়ার থেকেও যেন তাদের মজা লেগেছে নিজেদের মধ্যে ধাক্কাধাক্কি করতে আর মিষ্টি নিয়ে ঠাট্টা করতে।
সুখলতা আর সুকুমার দুই ভাইবোন এর ওর গালে জিলিপির রস মাখাচ্ছে। তারপর দুজনেই আধো আধো স্বরে নালিশ ঠুকছে বড়দের কাছে। লোপামুদ্রার গালে আবার মতিচুরের গুঁড়ো লেগে আছে। নির্মলচন্দ্র সন্দেশের টুকরো এক কামড়ে মুখে পুরে মুখ ভরে হাসছে। সুবিনয় ছোট বাটিতে নারকেলের নাড়ু নিয়ে মুখের সামনে এনে গন্ধ শুকছে। মজার ব্যাপার হল, এদের চোখেমুখে খাওয়ার আনন্দের পাশাপাশি একটা গর্বও ফুটে উঠছে। এন্ট্রান্স পরীক্ষা কী, তাদের অধিকাংশেরই বোঝার বয়স হয়নি, কিন্তু এটুকু বুঝেছে যে, তাদের প্রিয় পিসিমা একটা দারুণ কিছু করে ফেলেছে।
উত্তেজনায় কেউ রেকাবি হাতে করে এদিক-ওদিক দৌড়াচ্ছে, কেউ কাউকে ধাক্কা দিয়ে বলছে, ‘ওই, আমার লাড্ডুটা কে নিলি?’
আবার কেউ মাটিতে বসেই খিলখিলিয়ে হেসে উঠছে, ‘ওরে, তোর মুখে পুরো মতিচুরের রং লেগে গেছে! হি হি!’
কাদম্বিনী বেশ কিছুক্ষণ ধরে এই আনন্দময় দৃশ্য দেখছিলেন। কতদিন পরে এই বাড়িতে এমন প্রাণচাঞ্চল্য এল। তবে তারমধ্যেও তিনি চোখে চোখে রাখছেন, যাতে কোনো বাচ্চার পেট খারাপ না হয়।
মণ্ডা মিঠাইয়ের পাহাড় ধীরে ধীরে নিচে নেমে আসছে। যেন সত্যিই কেউ পাহাড়ের চূড়া কেটে সমতলভূমিতে পরিণত করছে।
কাদম্বিনী কপট রাগে বকে উঠলেন, ‘খেটেখুটে রাতজেগে পড়ে লিখে পাশ করল ভুবন, আর তোরা ওকে না দিয়ে খেয়ে নিচ্ছিস?’
‘আহা, খাক না।’ ভুবনমণি হাঁ-হাঁ করে ওঠে, ‘ওরা খাবে না তো আমি খাব?’
‘তা বটে। তুই তো তিনকাল পেরোনো বুড়ি কিনা।’ কাদম্বিনী হাসলেন, ‘এখানে বস দেখি। চুলটা বেঁধে দিই। ও বিধু, একটু দ্যাখ মা, ছেলেপুলেগুলোর পেট খারাপ না হয়।’
ভুবনমণি আবেগ গিলে নিয়ে নতুন বউদিদির সামনে বসল। ওর বুকের ভেতর উথালপাথাল হচ্ছে। এ খবর ব্রহ্মময়ী জানলে খুশিতে আত্মহারা হয়ে যেতেন।
আর একজনের কথাও বড় মনে পড়ছে ওর। মনে পড়ামাত্র দু-চোখ উজিয়ে জল আসছে। সেই মানুষটা ওকে হাত ধরে স্বপ্ন দেখতে শিখিয়েছিল। ‘বীর নারী’ হওয়ার সাহস জুগিয়েছিল।
কাদম্বিনী একটু আগেই হাসপাতাল থেকে ডিউটি করে ফিরেছেন। তবু কোনও ক্লান্তি নেই। সংসারের চারদিকে তাঁর চোখ। দু-তিনরকম তেল মিশিয়ে নিয়ে এসে তিনি খাটে বসলেন, চুলে তেল মাখাতে মাখাতে বললেন, ‘তোর নতুনদাদাকে বলেছি। এবারের সঞ্জীবনীতে তোর পাশ করার খবর ছাপা হবে।’
‘এমা, কেন?’
‘লজ্জা পাওয়ার কিছু নেই ভুবন। তোকে বড় দেখাতে খবর বেরোবে না। তোকে দেখে গ্রামবাংলার আরো পাঁচটা মেয়ে যাতে লেখাপড়া করতে এগিয়ে আসে, সেইজন্যই লেখা হবে। এতদিন সবাই ভাবত, শহুরে মেয়েরাই বুঝি এন্ট্রান্স পাশ করতে পারে। তুই তাদের ভুল প্রমাণিত করেছিস। এবার আমি বিলেত থেকে ফিরে এলে তোকে শুধু এফ এ-টা পাশ করতে হবে। ব্যস। তারপরই মেডিকেল কলেজ।’
ভুবনমণি ধরা গলায় কিন্তু কিন্তু করল, ‘বউদিদি। তোমায় আগেও বলেছি। ডাক্তার হওয়ার ইচ্ছে আমার আর নেই।’
‘আবার সেই এক কথা?’ কাদম্বিনী বকুনি দিলেন, ‘কতবার বলব তোকে, সে ডাক্তারি পড়েছিল, কিন্তু মানুষকে সেবা করার সুযোগ পায়নি। তাই সেই দায়িত্বটা তোর। এক কথা কেন বলিস? আচ্ছা, তুই নাকি তোর “নির্ভীক নারী”-তে তোর নতুনদাদার নাটক “বীর নারী”র টীকা লিখছিস কয়েকমাস ধরে?’
‘হ্যাঁ। একটু করে ছাপাই, আর নীচে সহজ ভাষায় সেটাকে লিখি, যাতে সব মেয়েরা বুঝতে পারে।’ ভুবনমণি ঢোঁক গিলে বলল, ‘সৌরেন্দ্রর ধ্যানজ্ঞান ছিল এই নির্ভীক নারী। বারবার বলত, সাহিত্যপ্রতিভা দেখিয়ে লাভ নেই ভুবন। আমাদের আগে প্রতিটি মেয়ের কাছে তার মতো করে পৌঁছতে হবে। তাই এটা শুরু করেছি।’
‘খুব ভালো করেছিস। নাটকটা পড়লেই মনে কোথা থেকে একরাশ সাহস জমা হয়, তাই না!’
‘তা তো বটেই। তবে, নতুনদাদা যে তোমায় ভেবেই বীর নারী লিখেছিলেন, তা বুঝতে কারুর বাকি নেই।’ ভুবনমণি টিপ্পনি কাটল।
‘আবার পাকা পাকা কথা? কোত্থেকে এসব ছাইপাঁশ শুনিস? উনি কত আগে ওই নাটক লিখেছেন, জানিস? তখন আমি হয়ত কলকাতাতেই আসিনি।’
‘আহ, না আসো। এ তো সাতজন্মের বন্ধন গো। নতুনদাদা তখন থেকেই স্বপ্নে তোমায় দেখতেন যে! ওই যে নাটকে যেখানে দেবকী বলছে, আমি ধন্বন্তরি হব কেমন করে?
সুরঙ্গমা উত্তর দিচ্ছে, কেন, চিকিৎসা শাস্ত্র পড়ে।
দেবকী অবাক হয়ে বলছে, পোড়া মেয়েমানুষের জাতকে পড়াবে কে?
তখন সুরঙ্গমা হেসে জবাব দিচ্ছে, ‘ইচ্ছে থাকলেই পথ পাওয়া যায়।’
ভুবনমণি নাটকের ঢঙে সংলাপগুলো বলে পেছনে তাকাল, ‘তুমিই বলো, তখন কেউ ভাবতে পারত, বাঙালির মেয়ে ডাক্তার হবে? তখন থেকেই নতুনদাদা বুঝে গিয়েছিলেন যে উনিই হলেন তোমার সেই পথ…উহ…উহ…উহ…ছাড়ো…লাগছে! ঘাট হয়েছে…ছাড়ো!’
কাদম্বিনী জোরে ভুবনমণির কানদুটো মুলে দিয়েছেন। হাসি চেপে বললেন, ‘হ্যাঁ, তুই তখন হামাগুড়ি দিতে দিতে এসে দেখে গেছিস কিনা! মুখপুড়ি কোথাকার।’
ভুবনমণিও হাসছিল। হঠাৎ নীচে কী শোরগোল শোনা গেল।
কাদম্বিনী সচকিত হয়ে উঠলেন, ‘কী হল রে?’
বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হল না। লোপামুদ্রা দুদ্দাড় করে ছুটে এল ওপরে। হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, ‘সব্বনাশ হয়ে গেছে গো!’
‘কী হল?’
‘ওই যে বিদ্যাসাগর…!’
কাদম্বিনী শক্ত গলায় বললেন, ‘কী হয়েছে বিদ্যাসাগরমশাইয়ের?’
‘তিনি আর নেই। আজ ভোররাতে মারা গেছেন। রাস্তার দিকের জানলায় গিয়ে দেখো খুড়িমা, বুড়োবুড়ি ছোঁড়া, কেউ বাকি নেই। সবাই কাঁদতে কাঁদতে ছুটে যাচ্ছে। উল্টোদিকের মহলানবীশদের বাড়িতে মেয়েবউরা কাঁদছে, শুনতে পাচ্ছ না?’
এ কী দুঃসংবাদ!
ভুবনমণি করুণ চোখে তাকাল কাদম্বিনীর দিকে। দুঃখে শোকে মুখের রেখাগুলো বেঁকেচুরে যাচ্ছে ওর। কবে থেকে, কতদিন ধরে মানুষটার কাছে যাওয়ার স্বপ্ন মনে মনে লালন করেছে ও। কিন্তু ভাবলেই কুঁকড়ে গেছে। বিদ্যার জাহাজের কাছে কি অন্তত এন্ট্রান্সটুকু পাশ না করে যাওয়া যায়?
বড় দেরি হয়ে গেল!
কাদম্বিনী নির্বাক হয়ে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলেন। সব আনন্দ যেন ব্লটিং কাগজের মতো শুষে নিয়েছে কেউ। তাঁর চোখের কোণ বেয়ে একফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল। তাঁর শৈশব কেটেছে বিহারের ভাগলপুরে। বাবার কাছে ছোট থেকে শুনতেন, কলকাতায় একজন আছেন, যিনি মেয়েদের জন্য লড়ছেন। মেয়েদের পড়াশুনোর জন্য দুঃখ কষ্ট ঘোচানোর জন্য যুদ্ধ করছেন।
এত বড় এক যুগের অবসান! বিদ্যাসাগরমশাইয়ের মতো মানুষ একবার চলে গেলে কি আর ফিরে আসে?
তাঁর প্রভাব, তাঁর আদর্শ, তাঁর শিক্ষা…সবকিছু যেন এক মুহূর্তেই অনাথ হয়ে গেল।
এই শুভদিনে এত বড় অশুভ সংবাদে ভুবনমণির মুখ দিয়ে কথা সরছিল না। তবু ও অনেক কষ্টে বলল, ‘বউদিদি!’
‘হ্যাঁ…আমি জানি।’ কাদম্বিনী একটু থেমে মৃদু গলায় বললেন, ‘মানুষটার কাছে যাওয়া আর হল না তোর। কিন্তু ওঁর শিক্ষা তো তোকে পথ দেখিয়েছে, ভুবন।’
‘বউদিদি, বিদ্যাসাগরমশাইকে সামনে থেকে একবারও দেখতে পেলাম না…’ ভুবনমণির গলার স্বর কাঁপছিল, ‘একটা কথা বলতে চেয়েছিলাম ওঁকে। শুধু বলতে চেয়েছিলাম যে…যে পথ দেখিয়েছেন, সেই পথ ধরেই চলতে চাই আমি।’
‘তোর কথাটা ওঁর কানে পৌঁছে গেছে রে।’ কাদম্বিনী হালকা করে ভুবনমণির মাথায় হাত রাখলেন, ‘ওঁর ঘাম রক্ত ঝরিয়ে তৈরি করা রাস্তায় তুই হাঁটতে শুরু করেছিস সবে। এখনই থেমে যাস না, বুঝলি!’
ভুবনমণি চোখের জল মুছল। নতুন করে যেন দৃঢ়তা ফিরে পেল। রুদ্ধস্বরে বলল, ‘বউদিদি, এবার আমি আরও মন দিয়ে পড়ব। এফ এ তো পাশ করবই, তারপর মেডিকেল কলেজেও ভর্তি হব। আমি আমার স্বপ্নকে আর পেছনে ফেলে আসব না।’
কাদম্বিনী ভিজে চোখে ওর হাত ধরলেন, ‘এই তো আমার ভুবনমণি। তুই সফল হবিই। আর শুধু নিজের জন্য নয়, তোর মতো আরো অনেকের জন্য পথ তৈরি করবি। এখন চল, বাদুড়বাগানের বাড়িতে যেতে হবে। আজকের দিনটা গোটা সমাজের জন্য এক বিশাল ক্ষতি রে। শেষবারের মতো পায়ের ধুলো নিতেই হবে। বিধুকে খবর দে। আজ আর রেঁধে কাজ নেই।’
