মগ্ননারাচ – ৬

শ্রাবণ মাসের দুপুর গড়িয়ে বিকেল। অঝোরে বৃষ্টি পড়ছে। কলকাতার আকাশ কালো মেঘে ঢেকে গেছে। সূর্যের আলো প্রায় নেই বললেই চলে।

মধ্য কলকাতার এক রাজপথ। একপাশে লোহার রেলিং দেওয়া ফুটপাথ, অন্যপাশে সারি সারি বাড়ি। রাস্তার ধারের নিকাশির নালা উপচে উঠেছে, জলের তোড়ে ভেসে যাচ্ছে গাছের পাতা। ছেঁড়া কাগজ। আর এদিক-ওদিক ছুটোছুটি করা পথশিশুদের পায়ের ছাপ। দূর থেকে ভেসে আসছে রিকশার ঘণ্টি। ছাতা হাতে, পা গুটিয়ে পথচারীরা জল এড়িয়ে হাঁটছে।

মাঝে মাঝে বৃষ্টির মধ্যেই এক আধটা ঘোড়ার গাড়ি ছুটে যাচ্ছে। তাদের চাকায় উড়ে যাচ্ছে কাদা।

রাস্তার ধারে ছোট ছোট দোকানপাটগুলো একে অপরের গায়ে লেগে আছে। তাদের টিনের ছাদে বৃষ্টি একটানা ঝমঝম শব্দ তুলছে। এক পাশে একখানা লেপ তোশকের দোকান, সামনে লাল কাপড়ের ছাউনি টাঙানো, তার নিচে ভিজতে থাকা কাপড়ের গাদার ওপর মালিক গুটিয়ে বসে আছেন।

পাশেই অঞ্চলের প্রসিদ্ধ মিষ্টির দোকান। কাঠের তাকের ওপরে কাচের কৌটায় রাখা মিষ্টিগুলো আজ একটু গুমোট লাগছে। দুধ দইয়ের হাঁড়িগুলো একপাশে সরিয়ে রাখা হয়েছে। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা দুই খদ্দের খাস্তা কচুরি আর গরম গরম সিঙাড়ার জন্য অপেক্ষা করছে।

এর ঠিক পাশেই সেই ‘লাহাবাবুদের বাড়ি’। উঁচু কাঠের সদর দরজা, পাথরের সিঁড়ি, জানালার পাল্লায় ধাতব গ্রিল। বৃষ্টির জল পড়ছে ছাদের কার্নিশ থেকে। নীচের উঠোনে জল জমে ছোটখাটো জলাশয় তৈরি হয়েছে। দোতলা থেকে ভেসে আসছে কড়াইয়ে কিছু ভাজার শব্দ। হালকা মশলার গন্ধ। কোথা থেকে শোনা যাচ্ছে উদাত্ত কণ্ঠস্বরে উচ্চারিত বেদমন্ত্র।

গগনচন্দ্র হোম হনহন করে হেঁটে আসছিলেন। তাঁর সঙ্গে ছাতা নেই, ভিজে একেবারে চুপচুপে হয়ে গেছেন। সদর দরজার সামনে পৌঁছে একটু দম নিলেন, তারপর একপাশে টাঙানো লেটারবক্স থেকে চিঠির তাড়াখানা বের করে একতলায় সঞ্জীবনীর দপ্তরে ঢুকে পড়লেন।

দ্বারকানাথ একমনে কী লিখছিলেন। দরজায় শব্দ পেয়ে মুখ না তুলেই বললেন, ‘এহ, একেবারে কাকভেজা ভিজেছ নিশ্চয়ই?’

‘তা আর বলতে। এমন সময়ে বৃষ্টিটা এল!’ গগনচন্দ্র চশমার ভিজে কাচখানা জামার খুঁটে মুছলেন। তারপর সিক্তবসনেই চিঠিগুলো দেখতে শুরু করলেন।

অধিকাংশই দপ্তরের চিঠি। ১৩ নম্বর কর্ণওয়ালিশ স্ট্রিটের এই বাড়িতে এই মুহূর্তে রয়েছে দু’খানা সংবাদপত্রের অফিস। একটা হল সঞ্জীবনী, যেটা দ্বারকানাথ ও কৃষ্ণকুমার মিত্র যৌথভাবে চালান। অন্যটি হল ‘নির্ভীক নারী’। সৌরেন্দ্রর মৃত্যুর পর যেটা চালায় ভুবনমণি। ওকে সবরকম সহায়তা করেন গগনচন্দ্র হোম। গগনচন্দ্রের মতো অবশ্য ব্রাহ্মসমাজের অনেকেই আছেন, যারা দুটো পত্রিকাকেই অকুণ্ঠ সাহায্য করে চলেছেন।

আর এই দুটো পত্রিকাই এখন গোটা বাংলায় শোরগোল ফেলে দিয়েছে। ‘সঞ্জীবনী’তে সাপ্তাহিক আকারে প্রকাশিত হয়ে চলেছে আসামের চা বাগানের কুলিদের বিস্ফোরক দুর্দশার আখ্যান। কে লিখছেন, তা জানা যাচ্ছে না, তবে সেই নামগোত্রহীন সেইসব অত্যাচারের সত্যকাহিনি লিখে নাড়িয়ে দিয়েছে সরকারকে। অন্যদিকে ‘নির্ভীক নারী’তে লেখা হচ্ছে বাংলার মেয়েদের মর্মন্তুদ জীবনের আখ্যান। সহবাস সম্মতি আইনের স্বপক্ষে সওয়াল। মেয়েদের হয়ে এর আগে দ্বারকানাথ তাঁর ‘অবলাবান্ধব’ পত্রিকায় কলম ধরেছিলেন বটে, কিন্তু ‘নির্ভীক নারী’র লেখা এমন সহজ সরল, এত মায়ায় ভরা, যে গ্রামবাংলার মেয়েরা উদ্গ্রীব হয়ে থাকে।

দুটো পত্রিকাই জনপ্রিয়তার তুঙ্গে।

গগনচন্দ্র দ্রুত চিঠিগুলো আলাদা করছিলেন। আলো খুবই কমে এসেছে। তার আগেই এই কাজটা সেরে ফেলতে হবে। পরপর ঝাড়াইবাছাই করতে করতে একখানা চিঠিতে তাঁর চোখ আটকে গেল। চোখের সামনে তুলে বললেন, ‘আসাম থেকে কোনও এক নীলকণ্ঠ মহাপাত্র চিঠি পাঠিয়েছেন দেখছি আপনাকে!’

দ্বারকানাথ ত্বরিতে মুখ তুললেন। তাঁর মুখের অভিব্যক্তি বদলে গেছে। বললেন, ‘দেখি দেখি!’

গগনচন্দ্র একটু বিস্মিত হয়ে চিঠিখানা দিলেন। আসাম থেকে কিছু মাস আগে অবধিও রামকুমার বিদ্যারত্ন লেখা পাঠাতেন। কুলিদের ওপর অত্যাচারের সেই লেখা নিয়ে মাদ্রাজ শহরে জাতীয় কংগ্রেসের অধিবেশনে প্রস্তাবও এসেছিল, কিন্তু প্রাদেশিক সমস্যা বলে সরকার পাশ কাটিয়ে গেছে। তারপর থেকে তো আর সেভাবে কোনও লেখা বেরোয়নি। আর রামকুমারও এখন ফিরে এসেছেন বাংলায়।

তবে কি এই নীলকণ্ঠ মহাপাত্র আসামের ব্রাহ্মসমাজের কেউ?

গগনচন্দ্র লক্ষ্য করলেন, চিঠিটা খুলে দ্বারকানাথ পড়লেন না, বরং ঝুঁকে চিঠিটা বাড়িয়ে দিলেন, ‘এই নাও। পড়ো গগন।’

গগনচন্দ্র কাগজটা মেলে ধরে মাথামুন্ডু কিছুই বুঝতে পারলেন না।

গোটা পাতা জুড়ে অদ্ভুত সব অক্ষর।

হা উ লা ফা কু হা পু ফা মা হা।

না আ গা হা উ মা হা লা ফা পু হা উা হা মা হা রা লা।

বা হা লা ফা হা হা না পু হা রা হা ফা কু লা পু হা হা।

লাা গা হা উা মা হা লা ফা পু হা উা হা মা হা রা লা।

সা লা ফা পু হা উা মা হা লা ফা পু হা উা হা মা হা রা লা।

হা রা হা হা পু হা ফা হা হা লা ফা পু হা উা হা মা হা রা লা।

এরকম প্রচুর অর্থহীন হরফ।

দ্বারকানাথ সহাস্যে চেয়েছিলেন, ‘সেকী হে! তোমার স্মৃতি এত দুর্বল তা তো জানতুম না! ভালো করে তাকিয়ে দেখো, কিছুই কি মনে করতে পারছ না?’

গগনচন্দ্র আবারও সন্দিগ্ধ চোখে তাকালেন চিঠিটার দিকে। কিছুক্ষণ একদৃষ্টে চেয়ে থাকার পর এবার ধীরে ধীরে যেন তাঁর মুখ আলোকিত হয়ে উঠতে থাকল। চোখ তুলে তিনি বিস্ফারিতচোখে বললেন, ‘হামচুপামূহাফ! এতদিন পর?’

দ্বারকানাথ সহাস্যে বললেন, ‘মনে পড়েছে তাহলে!’

গগনচন্দ্র মাথা চুলকে বললেন, ‘বছর পনেরো আগে এই ভাষায় শেষ কথা বলেছিলাম!’

‘হুম। তার কিছুদিন আগেই আমি ঢাকা থেকে এসেছি। মাথা গোঁজারও ঠাঁই নেই এতবড় কলকাতা শহরে। তারপর শিবনাথ একখানা বেডের ব্যবস্থা করে দিল ব্রাহ্ম মেসে। সেখানেই শুনেছিলাম তোমাদের এই কর্মকাণ্ডের কথা।’

গগনচন্দ্র কিছু না বলে চুপ করে রইলেন। কত কী মনে পড়ে যাচ্ছে একলহমায়! তখন তিনি স্কুলের উঁচু ক্লাসের ছাত্র। সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় বিলেত থেকে ব্যারিস্টারি পাশ করে এসে ওকালতিতে না গিয়ে স্বদেশী আন্দোলন শুরু করে হইচই ফেলে দিলেন। গগনচন্দ্রের মতো স্কুল কলেজের ছাত্ররা মেতে উঠল স্বদেশচেতনায়। শোষক ইংরেজকে দেশ থেকে বহিষ্কার করতেই হবে। ঘরে ঘরে শুরু করতে হবে স্বদেশী দ্রব্যের ব্যবহার। আর এইসব উদ্দেশেই তখন ছাত্রদের মধ্যে গড়ে উঠল ছোট ছোট অনেক গুপ্তসমিতি।

সেরকমই এক গুপ্ত সমিতি জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ির জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর ও রাজনারায়ণ দত্ত দু’জনে মিলে তৈরি করলেন। উদ্দেশ্য স্বদেশীয়ানাকে দেশবাসীর মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়া। ইতালির ‘কারবোনারি’ গুপ্ত সংস্থার অনুপ্রেরণায় নিয়ম হল, সদস্যদের সবাইকে কথা বলতে বা লিখতে হবে এক গুপ্ত সাঙ্কেতিক ভাষায়। সেই ভাষা তৈরি করলেন জ্যোতিরিন্দ্রনাথ নিজেই। সভার নাম দেওয়া হল, সঞ্জীবনী সভা। সাংকেতিক নাম হামচুপামূহাফ।

গগনচন্দ্র একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। কতবছর আগের কথা। তখন তাঁর বয়স উনিশ কি কুড়ি। সেই হামচুপামূহাফের অফিস খোলা হয়েছিল এই ঠনঠনিয়া অঞ্চলেরই এক অন্ধকারাচ্ছন্ন পোড়ো বাড়িতে। আসবাব বলতে ভাঙা টেবিল-চেয়ার, হেলে পড়া টানাপাখা আর টিমটিমে তেলের প্রদীপ। সে কী রহস্যময় পরিবেশ! সবার চোখেমুখে উত্তেজনা। সবাই প্রায় সদ্যতরুণ, কিছু কিশোরও ছিল। জ্যোতিরিন্দ্রনাথের ভাই রবীন্দ্রনাথের বয়স ছিল মোটে চোদ্দো-পনেরো। সেও সোৎসাহে সদস্য হয়েছিল।

এই সদস্য হওয়ার প্রক্রিয়াটা মনে পড়তেই হাসি পেয়ে গেল গগনচন্দ্রের। সদস্যদের দীক্ষাদান হত ঋকমন্ত্রে। এখনো মনে আছে ঋগ্বেদের সেই মন্ত্র।

সং গচ্ছধ্বং সং বদধ্বং সং বো মনাংসি জানতাম্।

দেবা ভাগং যথা পূর্বে সঞ্জানানা উপাসতে।।

সমানো মন্ত্রঃ সমিতিঃ সমানী সমানং মনঃ সহ চিত্তমেষাম্।

সমানং মন্ত্রমভিমন্ত্রয়ে বঃ সমানেন বো হাবিষা জুহোমি।।

সমানী ব আকূ্তিঃ সমানা হৃদয়ানি বঃ।

সমানমস্ত্ত বো মনো যথা বঃ সুসহাসতি।।

এখন এই মধ্যবয়সে এসে সেগুলোকে বালখিল্যতা মনে হয় বটে, কিন্তু সেইসময় আবেগে কোনও খামতি ছিল না। মন্ত্রোচ্চারণের সময় এমন পরিবেশ তৈরি করা হত, আপনা থেকেই দীক্ষাগ্রহীতার মনে উত্তেজনা বাঁধ ভাঙত। গভীর রাত্রে অগ্নিকুণ্ডের সামনে, বুকচিরে রক্ত দিয়ে বটপাতায় লিখে দিতে হত মন্ত্রগুপ্তির প্রতিজ্ঞা। তারপরে সেই রক্তলেখা বটপাতা পোড়ানো হত পবিত্র হোমাগ্নিতে। ভাঙা টেবিলের দু’পাশে দুটো কঙ্কালের মাথা থাকত, তার চক্ষুকোটরদুটোয় আবার দুটো মোমবাতি বসানো ছিল। জ্যোতিরিন্দ্রনাথ গম্ভীর স্বরে ওদের বুঝিয়েছিলেন, মড়ার মাথাটা হল মৃত ভারতের সাঙ্কেতিক চিহ্ন। মোমবাতি প্রজ্বলন হল সেই মৃত ভারতে প্রাণসঞ্চার করার প্রতীক।

জীবনের বাইশ তেইশ বছর অবধি এমনিই সবকিছুতেই মানুষ উত্তেজনায় ফুটতে থাকে। সেইভাবেই গগনচন্দ্র, ব্রজনাথ, নবগোপালরা দ্রুত ওই গুপ্ত সমিতির সদস্য হয়ে গিয়েছিলেন। ছোটখাটো কাজ শুরুও করেছিলেন। চাঁদা তুলে স্বদেশী দেশলাই তৈরির কারখানা হয়েছিল। স্বদেশী কাপড় বোনার চেষ্টা হয়েছিল। কিন্তু অভিজ্ঞতার অভাব ও অপরিণামদর্শিতার জন্য কিছুদিন পরেই হামচুপামূহাফ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল।

তারপর কেটে গেছে প্রায় চোদ্দ পনেরো বছর। কতকিছু পালটে গেছে। রবীন্দ্রনাথের এখন বেশ নামডাক, তরুণ কবি হিসেবে তার প্রসিদ্ধি এখন বাংলা জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে। সবসময় উত্তেজনায় ফুটতে থাকা জ্যোতিরিন্দ্রনাথ তাঁর স্ত্রীর আকস্মিক আত্মহত্যায় কেমন যেন হয়ে গেছেন। জাহাজের ব্যবসায় নেমেছিলেন, তাতেও বিশেষ সুবিধা করতে পারেননি। তাঁকে দেখলে এখন বিশ্বাস করা কষ্টকর যে একসময়ে এই মানুষটা অমন প্রাণচঞ্চল ছিলেন।

কিন্তু সে যাইহোক, এতদিন পর কে সেই গুপ্ত ভাষায় চিঠি পাঠালেন? কেনই বা পাঠালেন? গগনচন্দ্র ভেবেও কোনও কিনারা করতে পারছিলেন না।

দ্বারকানাথ এতক্ষণ অপেক্ষা করছিলেন। গগনচন্দ্রকে স্মৃতি রোমন্থনের সুযোগ করে দেওয়ার জন্যই বোধ হয়। গগনচন্দ্র চিন্তার ঘোর কাটিয়ে উঠে জিজ্ঞাসু চোখে তাকাতে দ্বারকানাথ বললেন, ‘তুমি কী ভাবছ আমি জানি। না, তোমাদের কোনও পুরনো সদস্য এই চিঠি পাঠাননি। যে পাঠিয়েছে, তাকে তোমাদের ওই ভাষা শেখানো হয়েছে।’

‘শেখানো হয়েছে! কে শিখিয়েছেন? কেনই বা শিখিয়েছেন?’ অবাক হলেন গগনচন্দ্র।

দ্বারকানাথ বয়সে গগনচন্দ্রের পিতৃতুল্য না হলেও খুড়োর তুল্য তো বটেই। সঞ্জীবনীর অন্য সমস্ত সক্রিয় শুভাকাঙ্ক্ষীদের মতোই গগনচন্দ্রও ওঁকে গাঙ্গুলিমশাই বলে ডাকেন। দ্বারকানাথও ওদের সঙ্গে খুব যে গাম্ভীর্য নিয়ে মেশেন তা নয়, তবে ওঁর চরিত্রের মধ্যে যে সহজাত ব্যক্তিত্বটা প্রোথিত রয়েছে, সেটার জোরে কখনোই একটা সীমার পর আর অতিক্রম করা যায় না।

এখনো সেটাই হল।

দ্বারকানাথ লেখার দিকে মুখ ফেরালেন, ‘সময় হলে সব জানতে পারবে গগন। আপাতত এই চিঠিটা আমায় পড়ে শোনাও। চিঠিটা আমার হাতে পড়লেও তোমার জন্যই রেখে দিতাম।’

গগনচন্দ্র চিঠির দিকে তাকালেন। এক যুগেরও বেশি কেটে গেছে, সেই গুপ্ত ভাষার চর্চা নেই। মনে আছে কি আদৌ?

গগনচন্দ্র একটা কাগজ আর কলম টেনে নিলেন, ‘আমায় একটু সময় দিন দ্বারিকবাবু।’

‘স্বচ্ছন্দ্যে।’ দ্বারকানাথ আবার লিখতে আরম্ভ করলেন।

গগনচন্দ্র মনে করে করে লিখছিলেন। জ্যোতিরিন্দ্রনাথ প্রতিটা হরফকেই পালটে দিয়েছিলেন। যেমন ‘আ’ থাকলে লিখতে হবে ‘অ’। তেমনই ক খ গ ঘ হয়ে যাবে গ ঘ ক খ। ঠিক তেমনই,

আ = অ | অ = আ | ই = উ | ঈ = উ |

উ = ই | উ = ঈ | এ = ঐ | ঐ = এ | ও = ঔ | ঔ = ও

ক খ গ ঘ = গ ঘ ক খ | চ ছ জ ঝ = জ ঝ চ ছ | ট ঠ ড ঢ = ড ঢ ট ঠ

ত থ দ ধ = দ ধ ত থ | প ফ ব ভ = ব ভ প ফ | শ ষ স = হ

হ = স | র = ল | ল = র | ম = ন | ন = ম

পরবর্তী কুড়ি মিনিট ধরে আঁকিবুঁকি কেটে পুরো তালিকাটা মনে করে করে লিখে গগনচন্দ্র থামলেন। তারপর আবার লিখলেন,

স ন্ জী ব নী স ভা = হা ম্ চু পা মূ হা ফ্

‘হ্যাঁ, এই তো হয়েছে। সঞ্জীবনী সভার সাংকেতিক নাম ছিল হামচুপামূহাফ।’ গগন যেন যুদ্ধ জয় করেছেন, সোল্লাসে তাকালেন দ্বারকানাথের দিকে।

‘বেশ। এবার চিঠিটা উদ্ধার করো।’

পাক্কা একঘণ্টা পর ঘর্মাক্ত মুখে গগনচন্দ্র একখানা সাদা পৃষ্ঠা তুলে দিলেন দ্বারকানাথের হাতে। ততক্ষণে তার ভিজে জামা গায়েই শুকিয়ে গিয়েছে প্রায়।

ততক্ষণে ভুবনমণি চলে এসেছে। পাশের টেবিলে বসে কাজ শুরু করেছে ‘নির্ভীক নারী’র। পত্রিকাটা এখন পাক্ষিকভাবে প্রকাশিত হচ্ছে, কিন্তু ওর খুব ইচ্ছা, এটাকে প্রতি সপ্তাহে বের করার। কত দূরদূরান্ত থেকে চিঠি আসে। কত মেয়ের কতরকম প্রশ্ন, তারা অপটু হাতে ভুল বানানে লেখে। ভুবনমণি প্রত্যেককে যত্ন করে উত্তর দেয়।

বৃষ্টি থেমে গেছে অনেকক্ষণ। বাতাসে বেশ ঠান্ডা আমেজ। তবু যেন চাপা গরম। গগনচন্দ্র চোখদুটো জ্বলজ্বল করছিল। এতক্ষণের পরিশ্রমে তিনি ক্লান্ত বটে, কিন্তু তার ঠোঁট কাঁপছে উত্তেজনায়। ভিজে পোশাকে থেকে জ্বর আসবে নির্ঘাত।

দ্বারকানাথ জোরে জোরে পড়তে শুরু করলেন,

‘প্রায় প্রতিটি চা বাগানেই চাবুক সব কর্মচারীদেরই অপরিহার্য সঙ্গী। বড়সাহেব, ছোটসাহেব, ম্যানেজার থেকে শুরু করে কেরানি, ডাক্তার, কুলি সর্দার, মুহুরি সকলেই চাবুক আস্ফালনে অভ্যস্ত। তারা পুরুষ নারী, বৃদ্ধ শিশু কোনও বাছবিচার করে না। কারণ তারা জানে, আদালত কিছুই করবে না। আমি এই চিঠি যখন লিখছি, বাইরে থেকে আর্তনাদ ভেসে আসছে। ম্যানেজার একজন কুলিকে চাবুক মেরে চলেছে। তার অপরাধ, সে তার পত্নীকে গতকাল রাতে সাহেবের কোঠায় পাঠায়নি। গতকালও এক গর্ভবতী কুলিকে এমন লাথি মেরেছে, তার অবস্থা অত্যন্ত সঙ্গীন, গর্ভপাত তো হয়েইছে, সে এখন জেলা হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করছে। কেউ কিছু বলে না। চোখ বন্ধ করলেও কান বন্ধ রাখতে পারি না। তাদের কাতর চিৎকার ভেসে আসে। জীবন্ত নরকে রয়েছি। আজ আবার একটা নতুন দল আসছে…।’

দ্বারকানাথ নির্বিকার ভঙ্গিতে পড়ছিলেন, কিন্তু ভুবনমণি কাজ থামিয়ে শুনছিল। চিঠিটা সুদীর্ঘ এবং তার ছত্রে ছত্রে এমন মর্মান্তিক বীভৎসতা যে একটা সময় ও আর সহ্য করতে পারল না, ‘উঃ!’ বলে কানে আঙুল চাপা দিল। বলল, ‘এই চিঠি কে পাঠিয়েছেন, নতুন দাদা?’

দ্বারকানাথ তৎক্ষণাৎ উত্তর দিলেন না। চিঠিটা শেষ করে তেরচা চোখে তাকালেন, ‘কেন? তোর জেনে কাজ কী?’

‘কাজ আছে। বলুন না।’ ভুবনমণি ঝুঁকে চিঠিটা টেনে নিতে গিয়েও পারল না।

দ্বারকানাথ দ্রুত ওর হাতের নাগাল থেকে সরিয়ে নিলেন চিঠিটা। কড়া গলায় বললেন, ‘আজ বাদে কাল তোর এন্ট্রান্স পরীক্ষা, কোথায় তাড়াতাড়ি পত্রিকার কাজ সেরে পড়তে চলে যাবি, তা না। এখানে বসে বসে এই সব গিলছিস কী জন্য?’

ভুবনমণি দমে গেল। নতুনদাদা একেকসময় এমন ব্যবহার করেন, ওর মুখে কথা জোগায় না। তবু ও তর্ক করতে ছাড়ল না, ‘আমার জেনে কাজ নেই বুঝি? তা তোমরা আসামের কামিনদের নিয়ে লিখেছ, আর আমি “নির্ভীক নারী”-তে লিখব না? কেন, আসামে মেয়েরা বুঝি খুব ভালো আছে?’

দ্বারকানাথ চোখ বড় বড় করে কৃত্রিম অবাক হওয়ার ভান করলেন, ‘ওহ, তুই যে সম্পাদকের কান দিয়ে শুনছিস, তা তো বুঝতে পারিনি!’

‘হুম। তা বুঝবেন কেন? আপনাদের পত্রিকাটা পত্রিকা। আর আমারটা কি ছেলেখেলা?’

‘না না। তা কেন? তোর জ্বালায় তো এবার এই প্রেসে লালবাতি জ্বলবে!’

‘বেশ তো জ্বলুক, আমি বাইরের ছাপাখানা থেকে ছাপাব। আর শুনুন, সকাল থেকে টানা পড়েছি। এরিথমেটিক। ইংরেজি। লজিক। এই সবেমাত্র উঠে এলাম। পত্রিকার কাজ সারছি। এবার যাব নতুন বউদিদির সঙ্গে রুগি দেখতে। কল এসেছে কাশীপুর থেকে। আমি শুয়ে-বসে থাকি না।’

‘সত্যি, পুরো দেশ উদ্ধারের ভার তো তোর ওপর! তা সবই হচ্ছে, কেবল আমার পানের খিলিটা টাইমে টাইমে সাজা হচ্ছে না।’

‘কেন, মঙ্গলা দিয়ে যায়নি? ওকে তো সেই কখন বলেছি।’ ভুবনমণি রাগতমুখে উঠে এল, ‘এখুনি গিয়ে দেখছি।’

গগনচন্দ্র হেসে ফেললেন। তুতো সম্পর্কের দাদাবোনের এই ঝগড়া নিত্যকার দৃশ্য। দ্বারকানাথ সুযোগ পেলেই ভুবনমণিকে তিরস্কার করেন, আর সেও কোমর বেঁধে ঝগড়া করে। এ যেমন খোঁচা মেরে চাপান দেয়, ও তেমনই উতোর দেয়। এই চাপান উতোরের বহর দেখলে কে বলবে, এদের একজন হলেন দেশবিখ্যাত সমাজ সংস্কারক স্বয়ং দ্বারকানাথ! তবে দুজনের মধ্যে ভাব গলাগলিও তেমনি। ভুবনমণি তার নতুনদাদাকে প্রাণ দিয়ে ভক্তি করে, আর দ্বারকানাথও ‘ভুবন’ বলতে অজ্ঞান।

‘আমি পান সেজে পাঠিয়ে দিচ্ছি।’ ভুবনমণি মুখ বেঁকিয়ে চলে যেতে গিয়েও ফিরে এল, ‘দুটো কথা বলে যাই।’

‘বলে ফেল।’

‘নতুন বউদিদিকে নালিশ করব, আপনি যতই ভালোমানুষ সাজুন, আসলে একটা হিংসুটে লোক।’

‘কী!’

‘হ্যাঁ। নিজের পত্রিকার চিঠি বোনকে পড়তে দেন না। আর শুনুন, আপনি যতই কাজ দেখান, আসলে কোনও কম্মের নন।’

‘এত বড় কথা?’ দ্বারকানাথ ছদ্ম ক্রোধ দেখিয়ে বললেন, ‘কেন শুনি?’

‘আমার দাদা বউদিদি ভাইপোর এখনো কোনও সন্ধান জোগাড় করতে পারলেন না। এতগুলো মাস কেটে গেল। তারা যে জাহাজে চড়ে সেখান থেকে পালিয়ে আসছিল, সে খবর তো আপনি নিজেই দিয়েছিলেন। তাহলে তারপর তারা গেল কোথায়? ভোজবাজির মতো উবে গেল? কীসের আপনার এত লোকলশকর, জানাশোনা বুঝি না! আসলে আপনার কথা কেউ শোনে না। হুঁহ!’

ভুবনমণি বেণী দুলিয়ে গটগট করে চলে গেল।

গগনচন্দ্র হাসতে হাসতে বললেন, ‘এ কিন্তু আপনার ভারি অন্যায় দ্বারিকবাবু। চিঠিখানা ওকে দেখালে কী ক্ষতি হত?’

‘ওসব এখন থাক।’ দ্বারকানাথও হাসছিলেন, কিন্তু এখন সেই হাসি অন্তর্হিত, ‘ভেবেছিলাম রামকুমার বিদ্যারত্নমশাইয়ের ধারাবাহিক প্রবন্ধের পর একটু হলেও সেখানে অবস্থার উন্নতি হবে, কিন্তু এখন তো দেখছি, দিনদিন আরো খারাপ হচ্ছে পরিস্থিতি। আসলে টি-প্ল্যান্টাররা বুঝে গেছে, যে ওরা অত্যাচার করে খুন করে ফেললেও ইংরেজ আদালত ওদের বাঁচিয়ে দেবে।’

‘কিন্তু আপনি একা আর কত লড়বেন?’ গগনচন্দ্র কিন্তু কিন্তু করলেন, ‘জাতীয় কংগ্রেসও তো এটাকে রিজিওনাল প্রবলেম বলে পাশ কাটিয়ে দিল। আমার মনে হয়, এতে নারীশিক্ষা নিয়ে আপনার আন্দোলন অভিমুখ হারাবে।’

দ্বারকানাথের চোখ যেন জ্বলে উঠল। কণ্ঠস্বর হয়ে গেল গম্ভীর, ‘গগনচন্দ্র, অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই কখনো একা হয় না। একমাত্র আগুনের শিখাই প্রথমে একা জ্বলে, তারপর তার আলোয় দৃষ্টিশক্তি ফিরে পায় হাজার হাজার মানুষ। জাতীয় কংগ্রেস পাশ কাটিয়ে গেছে? যাক! কিন্তু আমার বিবেক তো পাশ কাটাতে শেখেনি। সারা দেশ যখন নারীশিক্ষার বিরুদ্ধে ছিল, আমি লড়েছি। অনেকদূর এগিয়েওছি। কিন্তু তাই বলে নারীশিক্ষা ছাড়া অন্য সব ক্ষেত্রে চোখ বন্ধ করে কীভাবে থাকব? শিক্ষা মানে তো শুধু স্কুল, কলেজের গণ্ডি নয়। শিক্ষা মানে নিজের অধিকারের বোধ, অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর শক্তি!’

গগনচন্দ্র নতমুখে শুনছিলেন।

‘তুমি কি সত্যিই মনে করো, চুপ করে থাকলেই সব ঠিক হয়ে যাবে? যুগ যুগ ধরে যা চলছে, সেটাই যদি চিরন্তন সত্য হয়, তবে সমাজ এগোবে কীভাবে? সতীদাহ বন্ধ করতে রামমোহনকে লড়তে হয়েছিল। বিধবা বিবাহ আইন পাশ করতে বিদ্যাসাগরমশাই লড়েছেন। সমাজ বদলাতে গেলে লড়তে হবেই। সমাজ বদলানোর পথ কখনো মসৃণ হয় না গগন, তাতে পাহাড়প্রমাণ বাধা থাকবেই। তবু লড়ে যেতে হবে। কারণ আমি চাই, এই লড়াই যেন ভবিষ্যতে আর কাউকে লড়তে না হয়। তাই যতদিন দম আছে, আমি এই লড়াই চালিয়ে যাব।

‘এই যে কুলিরা, ওরা কি মানুষ নয়? ওদের ঘামরক্তেই তো গড়ে উঠছে এই সমাজ! অথচ ওদেরই কণ্ঠরোধ করা হচ্ছে, পায়ের নিচে পিষে ফেলা হচ্ছে! এই অন্যায় সহ্য করা মানে কাপুরুষতা। আমি কাপুরুষ নই, গগনচন্দ্র! আর প্রাদেশিক সমস্যা কী করে হয়? সারা দেশ থেকে, সমস্ত রাজ্য থেকে কুলি পাচার করা হচ্ছে। যদি একা লড়তে হয়, তবু আমি লড়ব! একা হাঁটতে শুরু করলে একসময় কেউ না কেউ সঙ্গে আসবে।’

গগনচন্দ্র মুগ্ধ হয়ে শুনছিলেন। এবার অস্ফুটে বললেন, ‘বুঝেছি।’

‘কী বুঝেছ?’

‘বিদ্যারত্নমশাই ফিরে আসার পর থেকে এত হুমকি পেয়েছেন বলে আপনি এখন গোপনে ওখানে কাউকে পাঠিয়েছেন। যে আপনার অতি বিশ্বস্ত লোক। সে ওই চা বাগানেই রয়েছে, সম্ভবত কোনও কর্মচারী সেজে, আর আপনাকে লুকিয়ে এইভাবে সব তথ্য জানাচ্ছে।’

‘হুম। তুমি বুদ্ধিমান তা আমি জানি।’ দ্বারকানাথ উঠে দাঁড়ালেন, পায়চারি করতে করতে বললেন, ‘ঠিকই ধরেছ। যে ওখানে রয়েছে, সে খুবই বিশ্বাসী। কিন্তু তার একার পক্ষে এই অত্যাচার থামানো সম্ভব নয়। এবার আমায় যেতে হবে। সময় উপস্থিত হয়েছে।’

‘আপনি যাবেন?’ গগনচন্দ্র হতভম্ব হয়ে তাকালেন পঞ্চাশ ছুঁই ছুঁই প্রৌঢ়ের দিকে।

‘হ্যাঁ। ছদ্মবেশে যাব। চিন্তিত হয়ো না। সেখানে আমার আরো লোক আছে। তারা আমায় সাহায্য করবে। তারপর আমি সেখান থেকে রিপোর্ট পাঠাব। এবার আর ঘরের কাগজ সঞ্জীবনীতে নয়, একেবারে ‘বেঙ্গলি’ পত্রিকায়। ইংরেজিতে বেরোয়, ফলে সারা দেশ জানবে। দেখি, তারপরেও কী করে প্রাদেশিক সমস্যা বলে এড়িয়ে যায়!’

‘কিন্তু…কিন্তু বউঠানও তো বিলেত যাবেন খুব শীগগির!’

‘তো কী হয়েছে?’

‘এতগুলো ছেলেপুলে, বাপ মা ছাড়া থাকতে পারবে? কাঁদবে না?’

দ্বারকানাথ এবার বিরক্ত হলেন, ‘কাঁদবে কেন? তোমরা রয়েছ। ভুবন রয়েছে। বিধু রয়েছে। তাছাড়া ওরা ছোট থেকেই বুঝবে, শুধু নিজেদেরটুকু নিয়ে পৃথিবীটা নয়। জানবে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোই জীবনের সত্যিকারের শিক্ষা। যে সমাজ কুলিদের পায়ের নিচে পিষে ফেলতে চায়, যে সমাজ নারীদের মানুষ বলে মানতে চায় না, যে সমাজ মনে করে নারীরা লেখাপড়া শিখলেও গৃহবন্দিই থাকবেন, সেই সমাজের পরিবর্তন আনতেই তো আমরা কাজ করছি।

‘তোমার বউঠানও বিলেতে গিয়ে হায়ার ডিগ্রি নিয়ে আসবেন। আর আমিও গিয়ে দেখব, কীভাবে এই অত্যাচারের শিকড় চিরতরে উপড়ে ফেলা যায়। তুমি ভয় পেয়ো না, গগনচন্দ্র! সমাজ বদলের আগুন কখনো নেভে না, এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে। আমরা সবাই সেই আগুনের অংশ।’

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *