মগ্ননারাচ – ১৭

১৭

বামুনমা ভোরবেলা উঠে ঘরের কাজ সারেন। তারপর স্নান পুজো সেরে চলে আসেন বড়সাহেবের বাংলোয়। রান্না করেন। বিষগুঁড়ি চা বাগানের একপ্রান্তে তরিতরকারির চাষ। সেখান থেকে টাটকা সবজি পাওয়া যায়।

বড়সাহেবের নাম জোনাথন মেকালিস্টার। বয়স ষাটের কাছাকাছি। শরীরে বার্ধক্যের ছাপ পড়েছে, কিন্তু মনের দিক থেকে এখনো কঠোর শৃঙ্খলাবদ্ধ। সকালে উঠে প্রার্থনা করেন, তারপর বাইবেল পড়েন, দুপুরে একটু কাজে বসেন, আর সন্ধ্যা হলে নিজের বারান্দায় বসে গম্ভীর মুখে চা খান। আসামের অন্যান্য চা বাগানের সাহেবদের মতো মদ বা নারীসঙ্গ তার অভ্যাস নয়। নিজের কাজ, বাইবেল আর ঈশ্বরচিন্তার মধ্যেই জীবন সীমাবদ্ধ রেখেছেন। স্ত্রী মারা গেছেন বেশ কয়েকবছর হল। একমাত্র ছেলে ইংল্যান্ডে চাকরি করে।

জোনাথন সাহেব বহু বছর কলকাতায় ছিলেন, ভাঙা বাংলায় তিনি বামুনমার সঙ্গে গল্প করেন, ‘বুঝলে বামুনমা, আর ফোর ইয়ার্স। চার বছর। তারপরই রিটায়ারমেন্ট। ফিরে যাব ইংল্যান্ডে, আমার গ্রামে। সেখানে চাষবাস করব। শান্তিতে থাকব। এখানে কুলিদের কষ্ট আর দেখতে পারি না।’

বামুনমা হাসেন। বলেন, ‘আমাদের বাংলায় একখানা গল্প আছে। দৈত্যকুলে প্রহ্লাদ।’

‘হোয়াটস দ্যাট?’

‘পরে একদিন শোনাব আপনাকে। আপনি হলেন চা বাগানের প্রহ্লাদ, সাহেব!’

জোনাথন সাহেব কপট গম্ভীর মুখে বলেন, ‘জানি না বাপু, ভালো বললে না খারাপ বললে। তবে এটা ঠিক, আমি তোমার হাতের রান্না মিস করব। বাই দ্য ওয়ে, তোমার হাজব্যান্ডের কোনও খোঁজ পেলে?’

বামুনমা নীচের ঠোঁটটা কামড়ে ধরেন, ‘না, সাহেব!’

সাহেব দুঃখিত মুখে তাকান। বিড়বিড় করেন, ‘সত্যি ভেরি স্ট্রেঞ্জ! জাহাজে উঠে কিনা মিসিং হয়ে গেল? স্যাড। ভেরি স্যাড!’

বড়সাহেবের বাংলোর পিছনেই রান্নাঘর। পাঁজি দেওয়া উনুন, মাটির হাঁড়ি, আর একপাশে একটা পুরনো কাঠের তাক, যেখানে থালাবাটি গুছিয়ে রাখা থাকে। বড়সাহেবের খাওয়াদাওয়া খুব সাধারণ। সকালে চা বিস্কুট, দুপুরে সেদ্ধ সবজি, রুটির সঙ্গে মাংস। আর রাতে এক বাটি স্যুপ। তাঁর খাবারে কোনও তেলমশলার বাহুল্য নেই। বামুনমা জানেন, সাহেব একটু বেশি ঝাল পেলেই বিরক্ত হন।

সকালের আলো যখন পুরোপুরি ফুটে ওঠে, বামুনমা তখনই ব্যস্ত হয়ে পড়েন। বড়সাহেবের প্রাতঃরাশ বানাতে হবে। চিনি ছাড়া এক মগ কালো চা, দু’টো টোস্ট, আর সামান্য মাখন। উনুনে যখন রুটি সেঁকা হয়, তখন গরম মাখনের গন্ধ রান্নাঘরে ছড়িয়ে পড়ে।

বড়সাহেব সেদিন বিকেলে ফিরে বারান্দায় বসে বাইবেল পড়ছিলেন। বামুনমা ট্রে-তে চায়ের কাপ এনে সামনে ধরলেন।

‘আমার সময় ফুরোল, বামুনমা!’ বাইবেল থেকে চোখ না তুলেই বললেন বড়সাহেব।

বামুনমা বুঝতে পারলেন না। বললেন, ‘সময় ফুরোল মানে?’

জোনাথন মুখ তুলে শিশুর মতো হাসলেন, ‘ভেবেছিলাম, এখানে রিটায়ারমেন্ট অবধি থাকতে হবে। কিন্তু না। টি-বোর্ড আমার কাজে সন্তুষ্ট নয়। আমায় ফিরে যেতে বলছে।’

‘সেকি, সাহেব! আপনি চলে গেলে এখানকার বাগান সামলাবে কে?’

জোনাথন বললেন, ‘কারুর জন্য কিছু আটকে থাকে না, বামুনমা। আমার কাজে বোর্ড খুশি নয়। প্রোডাকশন কমে যাচ্ছে। তাই এবারে জিমকেই বড়সাহেব করে পাঠাচ্ছে আবার।’

শেষ বাক্যটা শুনে বামুনমা স্থবির হয়ে গেলেন। কী বলবেন, বুঝতে পারলেন না।

চায়ে এক চুমুক দিয়ে বড়সাহেব মাথা নেড়ে বললেন, ‘বড্ড কড়া হয়েছে গো আজ!’

বামুনমা দিশেহারা স্বরে বললেন, ‘অত কিছুর পরেও জিম সাহেব আবার আসবেন?’

‘এখানে সবাই একটা জিনিসই বোঝে, বামুনমা। বিজনেস। আর সেই ব্যাপারে যে জিম আমার চেয়ে পোক্ত, তাতে কোনও ডাউট নেই। আমি বুড়ো মানুষ, সব কুলির মধ্যে আমার ছেলেকে দেখতে পাই। কিন্তু জিম হল তেজি ঘোড়া। যাকগে। কবে থেকে চেষ্টা করছিলাম, এই বাগানে একজন পার্মানেন্ট পাদ্রি আনার, একজনকে পেয়েছি। তিনি মরামাটিয়ায় কাজে জয়েন করেছেন। আমি চলে যাওয়ার আগে যদি তাঁকে এখানেও সপ্তাহে এক-দুদিন করে আনানোর ব্যবস্থা করতে পারি, ভালো হবে।’ জোনাথন নিজের মনে বলতে বলতে হঠাৎ তাকালেন, ‘আচ্ছা, আমি চলে গেলে তুমি কার বাড়িতে রান্না করবে, বামুনমা?’

বামুনমার মুখে কথা জোগাচ্ছিল না। রাতের জন্য ঝোল চাপিয়ে এসেছেন উনুনে। তাতে নুন, গোলমরিচ, রসুন দিতে হবে। বড়সাহেবের কাছে বিদায় নিয়ে উনি দ্রুত রান্নাঘরে ফিরে এলেন।

রান্না সেরে বামুনমা প্রথমেই চলে গেলেন অফিসঘরে। সেখানে নগেনবাবুর কাছ থেকে জিগ্যেস করে জানতে পারলেন, খবরটা একেবারে নির্ভুল। পিয়াজুর সদ্যোজাত সন্তানকে খুন আর পিয়াজুর নিরুদ্দেশ চাপা পড়ে যেতেই চা বাগান অ্যাসোসিয়েশন থেকে আবার জিম সাহেবকে ফেরত নিয়ে আসার তদ্বির গিয়েছিল। অবশেষে বোর্ড সেটা মঞ্জুর করেছে। কয়েকজন সদস্য যে একেবারেই গাঁইগুঁই করেনি তা নয়, কিন্তু বাকিরা বলেছে, ‘জিম কত কাজের, তা জানো! একাই প্রোডাকশন ডাবল করে দিয়েছিল। না না। ওকে ফিরিয়ে আনতেই হবে।’

সেদিন সন্ধ্যায় ছুটকি কোয়ার্টারে আসতেই বামুনমা চাপা স্বরে বললেন, ‘ছুটকি! তোকে এখান থেকে পালাতে হবে।’

‘পালাতে হবে! কেন?’

‘সেই শয়তান জিম সাহেব আবার ফেরত আসছে। বাচ্চা বাচ্চা সুন্দর মেয়েদের প্রতি ওর ভীষণ লোভ।’ বামুনমা ঢোঁক গিলে বলেছিলেন, ‘আমার পেটের মেয়েদুটো কেমন আছে, জানি না। যাকে পেটে ধরিনি, সেও হারিয়ে গেছে। তোকে আর হারাতে চাই না।’

ছুটকি হিমচোখে তাকিয়ে রইল। বিষগুঁড়ি চা বাগানের আনাচে-কানাচে কান পাতলে এখনো জিম সাহেবের কথা শোনা যায়। তার প্রসঙ্গ উঠলেই আতঙ্ক চেপে বসে কামিনদের মুখে।

জিম সাহেবকে নিয়ে এই বাগানে যত ভয়াবহ গল্প ছড়িয়ে আছে, তার সবকটাই সত্যি। সে শুধু অত্যাচার করত না, তার অত্যাচার ছিল এক নিষ্ঠুর খেলায় মোড়া। পূর্ববঙ্গ থেকে আসা কামিন রোজিনাকে মাঝরাতে তার কুঁড়েঘর থেকে টেনে বের করেছিল জিম। তার স্বামী হাতজোড় করে কাকুতি-মিনতি করেছিল। কিন্তু জিমের আদেশ ছিল স্পষ্ট।

‘ওকে নিয়ে যাচ্ছি, তুমি দাঁড়িয়ে দেখো!’

পরদিন সকালে রোজিনাকে পাওয়া গিয়েছিল কয়েক মাইল দূরে নালার ধারে। রক্তে ভেজা ছেঁড়া শাড়ি, শরীর নিথর। কেউ জানে না, সেদিন রাতে ঠিক কী হয়েছিল, কারণ রোজিনা আর কোনওদিনই কথা বলেনি। এরকমই রমনা, সৌদামিনীর মতো কিছু কামিনকে বাগানের বড় গাছের ডালে ঝুলতে দেখা গিয়েছিল। বিষগুঁড়ির সব পুরুষ কুলিরা ধরেই নিয়েছিল, তাদের স্ত্রী মানেই তার শরীরের ওপর জিমেরও অধিকার। সবার রাগে গা নিশপিশ করত। কিন্তু কেউ কিছু করতে পারত না।

ছুটকি শুনেছে, বছরদুয়েক আগে সুমতি বলে একটা দশ বছরের মেয়ে ছিল। তার মা ছিল কামিন, কাজে গেলে সে ছোট ভাইটাকে কোলে করে ঘুরত। একদিন জিম ঘোড়ার পিঠে চেপে এসে নামল। ওর দিকে তাকিয়ে বলেছিল, ‘ওই মেয়েটা, গায়ের রং বেশ মিষ্টি! নিয়ে চলো!’

দু’জন সাহেবের দালাল এসে সুমতিকে টেনে তুলেছিল ঘোড়ায়। সুমতি কাঁদছিল, ছোট ভাইটা কোলে ছিল বলে শক্ত করে আঁকড়ে ধরেছিল। কিন্তু জিম তার ভাইকে ঠেলে ফেলে দিয়ে সুমতিকে টেনে নিয়ে গিয়েছিল বাংলোয়। তিনদিন পর পাওয়া গিয়েছিল তাকে, ঝোপের মধ্যে। প্রায় বিবস্ত্র, মুখ থেঁতলানো। তার মা অনেক ছুটোছুটি করেও কিছু করতে পারেনি। ইংরেজ আদালত জিমের স্বপক্ষেই রায় দিয়েছিল।

তবে সবচেয়ে ভয়ংকর ছিল পিয়াজুর ঘটনা। তার সদ্যোজাত সন্তানকে একটানে তুলে নিয়ে গাছের গুঁড়িতে আছড়ে ফেলেছিল জিম। পিয়াজু উন্মাদিনীর মতো ছুটে গিয়েছিল সন্তানের দিকে, কিন্তু তার আগেই শিশুটির নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। সেই রাতেই পিয়াজু নিখোঁজ হয়েছিল।

এইসব শুনতে শুনতে ছুটকির নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসত। মনে হত, জিম শুধু কোনও মানুষ নয়, সে যেন এক দানব, যার ছায়া বিষগুঁড়ির বাগান জুড়ে বিস্তৃত হয়ে আছে এখনো।

সেই জিম কিনা আবার ফিরে আসছে? ওকে যে তার আগে পালাতেই হবে!

কিন্তু পালাবে কোথায়? আশপাশের গ্রামগুলোও চা বাগানের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। সবখানেই বাগানবাবুদের দাপট, কুলি কামিনদের মধ্যে খবর ছড়িয়ে পড়ে।

ছুটকি পাথরের মতো বসে রইল।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *