১৪
উপেন্দ্রকিশোর ও বিধুমুখীর ছেলে সুকুমার এখন বছরপাঁচেকের। ছোট্ট তাতা একতলায় খেলে। মাসকয়েক হল সে স্কুল যাওয়া শুরু করেছে। স্কুল অবশ্য বাড়িতেই, একতলায় ব্রাহ্ম বালিকা শিক্ষালয়ে ছেলেরাও বারোবছর বয়স অবধি পড়তে পারে। তবে এই ব্যবস্থা তাতার মোটেও পছন্দ নয়। প্রায়ই সে ঠোঁট ফুলিয়ে বড়দের নালিশ করে।
‘এই ঘর থেকে বেরিয়ে ওই ঘর। এটা ইশকুল হল বুঝি?’
বিধুমুখী শুনে হেসে অস্থির হন। পিসিমা ভুবনমণি ঘাড় নেড়ে সায় দেয়, ‘ঠিকই তো। এ কেমন ইশকুল তোমাদের? হাঁটতে হয় না, গাড়ি চাপতে হয় না। বাড়ির মধ্যে কখনো ইশকুল হয়?’
তাতা এসব শুনে আরো রেগে যায়। ছোট ছোট হাত বাতাসে নাড়িয়ে বলে, ‘আমি ঘোড়ায় চেপে অনেকদূরের ইশকুলে যাব।’
কাদম্বিনী বিলেত গেছেন বেশ কয়েক মাস হল। বাড়ি এখন গমগম করছে ছোট ছোট ছেলেপুলেতে। বিধুমুখীর চার সন্তান সুখলতা, সুকুমার, সুবিনয় ও পুণ্যলতা। ওদিকে বিমাতা কাদম্বিনীর প্রথম কয়েকটি সন্তান নিরুপমা, নির্মলরা একটু বড় হলেও জ্যোতির্ময়ী, প্রভাতচন্দ্ররা সুকুমারের চেয়ে বছরখানেক কি বছরদুয়েকের ছোট। ওদিকে রামকুমার বিদ্যারত্ন সংসার ত্যাগ করে পাকাপাকিভাবে চলে গেছেন কিছুদিন হল, তাঁর মা-মরা ছোট মেয়ে সুরমাও এখন এই বাড়িতেই থাকে। এছাড়া ভুবনমণির ভাইঝি লোপামুদ্রাও রয়েছে।
এরা কেউই এখনো দশ বারোর গণ্ডি পার করেনি। ১৩ নম্বর কর্ণওয়ালিশ স্ট্রিটের এই প্রকাণ্ড বাড়িতে সকাল হতেই উৎসব লেগে যায়। দোতলায় বিধুমুখী আর ভুবনমণি সংসারের তদারকি, রান্নাবান্না নিয়ে ব্যস্ত থাকে। একতলার সামনের দিকে ‘সঞ্জীবনী’ পত্রিকার দপ্তরে কাজ শুরু হয়, ওদিকে ব্রাহ্ম বালিকা শিক্ষালয়ে আরম্ভ হয় পঠন-পাঠন। সাবেক স্কুল নয়, পশ্চিমের কিন্ডারগার্টেনের আদলে মোটে তিনঘণ্টার স্কুল বসে। কিছু সময় পড়াশুনো। তারপর হুটোপুটি ছুটোছুটি। কিছুক্ষণ পরই ছুটি হয়ে যায়।
একতলার পেছনের দিকেও অনেক ঘর ভাড়াটে থাকে। তাদের সবাইকে তাতারা ভালো করে চেনেও না। চেনার দরকারটাই বা কী! একতলায় রান্নাবাড়ির উঠোনের পাশেই সেই ভাড়াটেদের প্রকাণ্ড চৌবাচ্চা। এত বড় যে, তার মধ্যে ওই ভাড়াটেরা মাছ জিইয়ে রেখে দেয়। শাকের আঁটি, ডাব, পান ভাসে। তারই মধ্যে একতলার বাসিন্দারা ডুব দিয়ে স্নানও করে নেয়। তাতাদের হাঁ করে তাকিয়ে থাকতে দেখে, কখনো একটা ডাব কেটে দেয়। ওরা সবাই মিলে বসে ডাবের শাঁস খায়। আর ঠিক তখনই দোতলার রান্নাঘর থেকে একটি শিশুর অবোধ কান্না ভেসে আসে।
তাতা অমনি একটু শাঁস নিয়ে কাঠের চওড়া সিঁড়ি বেয়ে দুদ্দাড়িয়ে ওপরে উঠে যায়। পিছু পিছু ছোটে লোপামুদ্রা আর পুণ্যলতাও।
রান্নাঘরে বিধুমুখী আর ভুবনমণি ব্যস্ত। তার পাশে জানলার ধারে বসে আপনমনে খেলে চলেছে কাদম্বিনীর বছর আড়াইয়ের শিশুপুত্র প্রভাতচন্দ্র। সে মায়ের খুব ন্যাওটা ছিল, মা চলে যাওয়ার পর কেঁদে কেঁদে তিনদিন চোখ ফুলিয়েছিল। তারপর বিধুমুখী আর ভুবনমণি তাকে স্নেহে আদরে খাইয়েছেন দাইয়েছেন, যত্ন করেছেন। এখন সে বড়দিদি আর পিসিমার এমন ন্যাওটা হয়েছে, যে, সারাদিন রান্নাঘরে বসে থাকে।
তাতা এসে মুখে ডাবের নরম শাঁস ঢুকিয়ে দিয়ে বলল, ‘মামা খাও খাও।’
দু’বছরের ছোট মামা প্রভাতচন্দ্র জলভরা চোখে হেসে ফেলল খিলখিল করে।
ভুবনমণি বলল, ‘ওই দ্যাখ। চোখে জল। মুখে হাসি। ওরে বুবু, আজ তোর মা আসবেন।’
বুবু অর্থাৎ প্রভাতচন্দ্রের মুখে কোনও ভাবান্তর হল না। তার মা যখন বিলেত গেছিলেন, সেই মাসছয়েক আগের স্মৃতি তার ক্ষুদ্র মস্তিষ্ক থেকে মুছে গেছে। এখন সেই স্থান নিয়েছে সামনের দুই মাতৃপ্রতিমা। এদের কোলেই সে ঘুমোয়, খায়, গল্প শোনে। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে সে আধো আধো স্বরে বিধুমুখীর দিকে আঙুল তুলে বলল, ‘ওই তো মা!’
ভুবনমণি হেসে বলল, ‘ও তো তোর বড়দিদি। মা হবে কেন?’
প্রভাতচন্দ্র তাতার দিকে ইশারা করে বলল, ‘তাতার মা। আমারও মা।’
বিধুমুখী হাসিমুখে এগিয়ে এসে ছোট্ট বিমাতাপুত্রকে কোলে তুলে নিয়ে গালে চুমু খেলেন। বললেন, ‘দিদি তো মা-ই!’
আজ সকাল থেকেই সাজো সাজো রব। গগনচন্দ্র হোম ঘোড়ার গাড়ি নিয়ে চলে গেছেন জাহাজঘাটে। কাদম্বিনী বিলেত থেকে ফিরছেন আজ। ভাবলেই শিহরিত হয়ে উঠছে ভুবনমণি।
কাদম্বিনী কলকাতায় ডাক্তারি পাশ করে চিকিৎসা করার অনুমতি পেলেও পাননি স্বাধীনভাবে কাজ করার অধিকার। একদিকে ইউরোপীয় চিকিৎসকদের স্নিগ্ধ অবজ্ঞা, অন্যদিকে স্বদেশীয় শিক্ষিত সমাজের কটাক্ষ। কাদম্বিনীও তেমনই জেদি, কিছুতেই থাকতে চাননি ইউরোপীয় ডাক্তারদের আধিপত্যে। দ্বারকানাথ তাঁকে সবসময় উদ্বুদ্ধ করতেন, ‘বিদেশি ডিগ্রি না নিয়ে এলে তুমি সেই রেসপেক্ট পাবে না। বিলেত তোমায় যেতেই হবে!’
সেইমতো ফেব্রুয়ারি মাসে সেই বিলিতি বৃদ্ধা মিস প্যাশের অ্যাটেনডেন্ট হয়ে কাদম্বিনী চলে গিয়েছিলেন বিলেতে। দ্বারকানাথ আসাম থেকে চিঠিতে ভুবনমণিকে জানিয়েছিলেন বিশদ। কাদম্বিনী পৌঁছে এক ফোঁটা সময় নষ্ট করেননি। ১৩ই এপ্রিল ট্রিপল ডিপ্লোমা পাওয়ার জন্য এডিনবার্গে নাম রেজিস্টার করেছেন। তারপর তিনমাস পাঁচদিন টানা ক্লাস করে পাশ করেছেন তিনটে পরীক্ষাই। এই খবর টেলিগ্রামে এখানে আসতে তাতেও সমাজের কত লোকের কত সমস্যা! সত্যিই তিনখানা কঠিন ডিপ্লোমা মাত্র তিনমাসে পাশ করা যায়? সন্দেহ। অবিশ্বাস। চিকিৎসক মহলের উপহাস। কাগজে লেখালিখি। কাদম্বিনী সব শুনে সংক্ষেপে উত্তর দিয়েছিলেন, তর্ক করে লাভ কী? গিয়ে সার্টিফিকেট দেখাব। মিটে গেল।
ভুবনমণি সেসব যুদ্ধের কথা পরপর সংখ্যায় হাত খুলে লিখে গেছে তার ‘নির্ভীক নারী’ পত্রিকায়। বারবার তার কলম দিয়ে বেরিয়েছে, ‘নির্ভীক নারীরা, তোমরা আর অবলা নারী নও। তোমরা নারাচ হও। নারাচ বাণের মতো গুঁড়িয়ে দাও পথের সব বাধাবিপত্তি। তোমরা প্রথম বাঙালি মহিলা চিকিৎসক ডাঃ কাদম্বিনী গঙ্গোপাধ্যায়কে দেখে শেখো। ভুলে যেও না, উত্তিষ্ঠিত জাগ্রত। এই সমাজের চোখে নারীর জ্ঞান আহরণের ক্ষমতা বরাবরই প্রশ্নবাণে বিঁধেছে। একদল মানুষ মনে করে, নারীর জ্ঞানের সীমা শুধু হেঁসেলের আগুনেই ফুরিয়ে যায়। কিন্তু কাদম্বিনী প্রমাণ করে দিয়েছেন, যে আগুন দিয়ে খাদ্য রন্ধন হয়, সেই আগুনের তেজও নারীর অন্তরে বিদ্যমান। সে আগুন জ্বালিয়ে রাখতে হলে শুধু ইচ্ছে নয়, প্রয়োজন দৃঢ় সংকল্প। আর কাদম্বিনীর সেই সংকল্প আজ শুধু তাঁর নিজের নয়, আমাদের সকলের। সত্যিই দ্বারকানাথের “বীর নারী” কাব্যের সেই নামভূমিকায় বাস্তবে আছেন কাদম্বিনী নিজে।’
ভাবতে ভাবতে নির্জন রান্নাঘরে ভুবনমণির চোখ জলে ভরে উঠছিল। নারী যে কত ভ্রুকুটি, কত প্রতিবন্ধকতা উপেক্ষা করে পৃথিবী জয় করতে পারে, তা কাদম্বিনীর সংস্পর্শে না এলে বিশ্বাস হত না প্রতিমুহূর্তে তিনি প্রেরণা জোগাতে পারেন বাংলার হাজার হাজার অবলা নারীকে। তবে সমালোচনা করেছে যত না সংবাদপত্র, সংখ্যায় কম হলেও কয়েকটা কাগজ প্রশংসায় ভরিয়েও দিয়েছে।
মেয়েদের কাগজ ‘বামাবোধিনী’ সগর্বে জানিয়েছে, ‘কাদম্বিনী গঙ্গোপাধ্যায় কেবলমাত্র স্বীয় কল্যাণ চিন্তাতেই নিবিষ্ট থাকেন নাই। বঙ্গের গৃহস্থ নারীগণের হস্তশিল্প সঙ্গে লইয়া তিনি ইংল্যান্ড প্রদেশে গমন করিয়া ছিলেন। তথাকার রাজপরিবারের নারীগণ কেবল ইহার প্রশংসাই করেন নাই, প্রিন্সেস ক্রিশিয়ানো নামের রাজকুমারী সেগুলি আমেরিকার চিকাগো নগরীতে প্রেরণ করিবার ব্যবস্থাও করিয়াছেন। শীঘ্রই উক্ত নগরীতে নাকি কেবলমাত্র নারীগণের হস্তশিল্পের এক বিশ্বমানের অভিনব প্রদর্শনী আয়োজিত হইবে। আহা, কী অপূর্ব সৌভাগ্য বঙ্গদেশের! অতি সাম্প্রতিককালে চিকাগোয় বঙ্গের তরুণ সন্ন্যাসী স্বামী বিবেকানন্দ ভারতের মুখ উজ্জ্বল করিয়াছেন। আর এবার কাদম্বিনীর কৃতিত্বে বঙ্গলক্ষ্মীদের হস্তশিল্পও সেখানে স্থান লাভ করিবে। ইহাই প্রকৃত উন্নয়নের পথ। এক নারীকে অপর নারীর পাশে দৃঢ়ভাবে অবস্থান করিতে হইবে। তবেই সর্বাঙ্গীণ উন্নতি সাধন সম্ভব হইবে।’
নীচের উঠোন থেকে হঠাৎ লোপামুদ্রার সুরেলা গলা শোনা গেল, ‘এসে গেছে। এসে গেছে।’
‘অ্যাই, গেছে কী, গেছেন বল!’ বলতে বলতে ভুবনমণি ছোঁ মেরে কোলে তুলে নিল প্রভাতচন্দ্রকে, তারপর একরকম উড়ে উড়ে নামতে লাগল সিঁড়ি বেয়ে।
সারা বাড়িতে হইচই জুড়ে গেছে। একতলার বিহারি ভাড়াটে পরিবারগুলো অশিক্ষিত, তবু তারা আনন্দে ডগোমগো।
ভুবনমণি হাঁপাতে হাঁপাতে সদরদরজায় গিয়ে দেখল, এরমধ্যেই বাড়ির সামনে ছোটখাটো একটা মেলা বসে গেছে যেন। একতলার স্কুলে ছুটি দিয়ে দেওয়া হয়েছে। ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা দরজার আশেপাশে জটলা পাকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ওদের চোখে কৌতূহল, অবাক বিস্ময়। যেন রূপকথার কোনও রানি এসে নামছেন তাদের সামনে। রাস্তার উল্টোদিকের সাধারণ ব্রাহ্মসমাজের সদস্যরাও এগিয়ে এসেছেন। তাঁদের হাতে ফুলের মালা।
‘সঞ্জীবনী’ প্রেসের কর্মীরাও দপ্তর থেকে বেরিয়ে এসেছে। সবার চোখে বিস্ময়। কৌতূহল। মুগ্ধতা। ব্যস্ত কর্ণওয়ালিশ স্ট্রিটের রাজপথ দিয়ে ঘণ্টি বাজিয়ে ছুটে যাওয়া রিকশাওয়ালাগুলোও দাঁড়িয়ে দেখছে সুন্দর লেসের ফুলহাতা ব্লাউজ ও শাড়িতে অভিজাত কাদম্বিনীকে।
দরজার একেবারে সামনে দাঁড়িয়ে বিধুমুখী। তাঁর হাতে বরণডালা। তাতে সুন্দর করে সাজানো প্রদীপ, ধান, ফুল আর কাদম্বিনীর প্রিয় মিষ্টি। বিধুমুখীর মুখে হাসি। কিন্তু সেই হাসির পেছনে লুকিয়ে আছে একরাশ আবেগ, ভালোবাসা আর গর্ব। চোখের কোণে টলমল করছে অশ্রু।
নিজের গর্ভধারিণী মাকে তাঁর আর মনে পড়ে না, জ্ঞান ইস্তক যে স্নেহময়ী নারীকে তিনি ‘মা’ বলে ডেকে এসেছেন, নিজের চেয়ে বছরকয়েকের মাত্র বড় সেই ‘ছোট মা’ আজ সারা কলকাতার মুখ উজ্জ্বল করেছেন। বিলাতফেরত ডাক্তার হয়েছেন!
কাদম্বিনী ঘোড়ার গাড়ি থেকে নেমে সামান্য দম নিচ্ছিলেন। তাঁর মুখে ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট। চোয়ালগুলো কেমন যেন আরও বেশি সূক্ষ্ম হয়ে গেছে। চোখের নীচে কালি। এই কয়েক মাসের নিরলস পরিশ্রম, মানসিক চাপ, আর অনিয়মিত খাওয়াদাওয়া তাঁকে অনেকটাই শীর্ণ করে তুলেছে।
বিধুমুখী হাতে ধরা বরণডালা কাদম্বিনীর মুখের সামনে এগিয়ে দিলেন। প্রদীপের স্নিগ্ধ আলোয় কাদম্বিনীর মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। কপালে ছোট্ট করে চন্দনের ফোঁটা আর সিঁদুর পরিয়ে খাইয়ে দিলেন একটা মিষ্টি। তারপর নিচু হয়ে প্রণাম করলেন। এই বাড়িতে এভাবেই শুভকাজের জন্য বরণ করা হয়।
‘এসো মা, আমাদের বাড়ির লক্ষ্মী তুমি। এতদিন পর ফিরলে!’
‘এ তো আমার বিয়ে বাড়ির বরণ হয়ে গেল রে বিধু!’ কাদম্বিনী হেসে ফেললেন।
‘না মা, এটা তোমার বিজয়ের বরণ। তুমি আমাদের সকলের গর্ব!’
এতক্ষণ পেছনে দাঁড়িয়ে ছিলেন উপেন্দ্রকিশোর। এবার তিনি এসে শ্বশ্রূমাতাকে প্রণাম করলেন সাষ্টাঙ্গে।
কাদম্বিনী হাসছিলেন বটে, কিন্তু তাঁর চোখের দৃষ্টি কেন যেন কাউকে খুঁজছে ভিড়ের মধ্যে। খুঁজতে খুঁজতে তা স্থির হল ভুবনমণির কাছে এসে। ভুবনমণি বুঝল, কাদম্বিনী কোলের প্রভাতচন্দ্রকে খুঁজছেন। ভিড় ঠেলে ও দ্রুত এগিয়ে গেল।
সামনাসামনি যেতেই কাদম্বিনী বললেন, ‘সতীশ কোথায় রে? ও ভালো আছে তো?’
ভুবনমণি কী বলবে বুঝতে পারল না। সতীশ কাদম্বিনীর সতীনের পুত্র। সে জন্ম থেকেই বিকলাঙ্গ। কাদম্বিনী সতীশ অন্ত প্রাণ। তাই বলে নিজের পেটের ছেলেমেয়ের আগে তার কথা মনে পড়বে?
কাদম্বিনী বোধ হয় ওর মনের ভাব বুঝতে পারলেন। প্রভাতচন্দ্রকে হাত বাড়িয়ে কোলে নিতে চাইলেন, ‘আসলে আমার বড়ছেলেটা তো অসুস্থ, তাই ওকে নিয়ে খুব চিন্তা হত।’
‘সতীশ ভালো আছে। ওপরের ঘরে রয়েছে।’ বিধুমুখী বলল, ‘কিন্তু তোমার ছেলে তো তোমার কোলে যাচ্ছে না।’
সত্যিই তাই। প্রভাতচন্দ্র আঁকড়ে ধরে রয়েছে পিসিমাকে। সামনে দণ্ডায়মান এই নারী তার কাছে অপরিচিত।
কাদম্বিনীর চোখ এবার বাষ্পে ভেসে গেল, ‘বুবু! আমি তোর মা!’
তাতা আর লোপামুদ্রা হাততালি দিয়ে উঠল, ‘এ বাবা, নিজের মা কে চেনে না!’
বিধুমুখী কপট রাগে বললেন, ‘ও কী হচ্ছে বুবু? তোমার মা তো, মনে নেই?’
কে শোনে কার কথা। প্রভাতচন্দ্র ঘাড় বেঁকিয়ে আঁকড়ে রইল পিসিকে।
কাদম্বিনীর চোখ দিয়ে টপটপ করে জল পড়তে শুরু করল। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা বছরতিনেকের পুণ্যলতা হাঁ করে দেখছে তার ডাক্তার দিদিমাকে। কবে থেকে শুনে আসছে, দিদিমা বিলেত গেছেন। কিন্তু সেখান থেকে কি ওর জন্য রঙচঙে খেলনা এনেছেন মনে করে?
বিধুমুখী গিয়ে জড়িয়ে ধরলেন, ‘আহা, এমন শুভদিনে কাঁদতে আছে, মা? ও দুধের ছেলে। ভুলে গেছে। ক’দিন দেখলেই আবার মনে পড়ে যাবে। ছেলে মাকে চিনবে না, তা কি হয়? চলো, ভেতরে চলো। মুখ হাত ধোও। কত পরিশ্রম করে এসেছ। মুখে কিছু দাও। তারপর ওকে কোলে নাও, অমনি দেখবে ব্যাটা ঠিক মায়ের গন্ধ চিনতে পেরেছে।’
কাদম্বিনী ম্লান মুখে পা বাড়ালেন বাড়ির অন্দরমহলে। তাঁর স্বামী যে এখানে নেই, ছদ্মবেশে রয়েছেন আসামে, সে কথা তাঁর অবিদিত নয়। তাতে তাঁর কোনও দুঃখ নেই। বরং স্বামী যে মহান কাজে ব্রতী হয়েছেন, তার জন্য তিনি কৃতজ্ঞ।
কিন্তু নিজের গর্ভজাত পুত্রের কাছে তিনি আজ অপরিচিতা? নিজের কেরিয়ারের কথা ভাবতে গিয়ে কোথাও সন্তানদের থেকে দূরে সরে যাচ্ছেন না তো তিনি?
দীর্ঘশ্বাস ফেললেন কাদম্বিনী।
