মগ্ননারাচ – ২৬

২৬

ফুলমতী যখন আবার ফিরে এল, ততক্ষণে ভুবনমণির সঙ্গে মোতি, নিস্তারিণী লম্বোদরীদের গল্প জমে উঠেছে। মরামাটিয়ায় যে ভুবনমণির নতুনদাদাই ওদের দিশী পাদ্রি হয়ে সেজেছিলেন, সেকথা বুঝতে ওদের বেশি সময় লাগেনি।

নতুনদাদার খোঁজ পাওয়ামাত্র ভুবনমণির চোখে আলো জ্বলে উঠেছে। এতদিনের ক্লান্তি, পরিশ্রম, কষ্ট সব যেন ধুয়েমুছে সাফ।

লম্বোদরী চোখ কপালে তুলে বলেছে, ‘মাগো, কী দস্যি মাইয়া! হেই কলকাতা থাইকা একলা একলা আহি পড়ছে আসামত দাদারে খুঁজতে? ভয়ডর কিচ্ছু নাই নাকি তোর? রাস্তাঘাটে কতরকমের বিপদ, জানস? যদি কিছু অইয়া যাইত? দুনিয়াত সব মানুষ কি ভালা অয় নাকি?’

‘জানি। কিন্তু কী করব? আমার বউদিদি ফিরে এলে আমি তাঁর কাছে মুখ দেখাতে পারব না। তোমরা ঠিক বলছ, আমার নতুনদাদা সত্যিই ঠিক আছেন?’

নিস্তারিণী ভুবনমণির হাতে হাত রাখল, ‘হ্যাঁ গো। তোমার কপাল রাজরানির মতো। ঠিক মানুষের দেখা পেয়ে একেবারে ঠিক জায়গায় এসেছ।’

‘দাদার কোনও খোঁজ পাচ্ছিলাম না তাই…!’

‘হ।’ মাথা দোলাল লম্বোদরী, ‘মরামাটিয়াত যাইতেও হইব না তোর, তোর দাদা আইতাছেন অগেই, বিষগুঁড়ির কয়জনরে লইয়া।’

‘আসছেন যে কেমন করে তুমি জানলে লম্বোদিদি?’ মোতি বলল, ‘এসে থেকে তো এই গর্তে ঢুকে বসে আছ। বাইরে কে এসেছেন না এসেছেন, সেই খবর রাখো? সুরেনদেরও তো কোনও খবর নেই। কোথায় গেল সব? আমি যাই, একটু দেখে আসি।’

পুঁটিবালা আর নিস্তারিণী চোখ চাওয়াচাওয়ি করল। দুজনেরই চোখে কৌতুক। পুঁটিবালা বলল, ‘ও মোতিদিদি, দেখো, এখান থেকে আবার তার সঙ্গে পালিয়ে যেও না। আসামের বে’ টেকে না। হি হি!’

‘যাহ্, কী আজেবাজে বকিস?’ কপট রাগে মোতি ফুঁসে উঠল। তারপর উঠে দাঁড়িয়ে ভুবনমণির দিকে তাকিয়ে বলল, ‘তুমিও এসো। চলো, দেখে আসি। তোমার দাদা এলেন কিনা।’

ছাউনির বাইরে বেরিয়ে পিছল মাটিতে হাঁটতে লাগল ওরা দুজন। কিছুদূরে আবার একটা ছাউনি। ভুবনমণি সেদিকে হাঁটতে হাঁটতে বলল, ‘সুরেন কে গো?’

‘আমার নাগর।’ মুখ টিপে হাসল মোতি।

পাশ দিয়ে বয়ে গেছে ব্রহ্মপুত্রের শাখানদী। তার রং কাদামাখা সবুজ। নদীর কোলঘেঁষে এই ছোট চরা, যেখানে প্রকৃতি যেন তার সমস্ত শোভা ঢেলে দিয়েছে। ঘন সবুজ বনানীর মাঝে লতাগুল্ম জড়িয়ে আছে। ঝোপের আড়ালে লুকিয়ে আছে অচেনা বুনো ফুল। বাতাসে ভাসছে নাম না জানা কোনও গাছের মিষ্টি গন্ধ।

এই চরার বুক চিরে গেছে সরু মাটির পথ, যেখানে দিনের আলো সেভাবে পৌঁছোয় না। পথের দু’পাশে উঁচু বাঁশঝাড়ের সারি, মাঝে মাঝে দোল খাচ্ছে অগোছালো ডালপালা। কোথাও কোথাও বড় বড় শাল আর কাঁঠাল গাছ মাথা উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তাদের মোটা মোটা শেকড় মাটির উপর বেরিয়ে এসে পথ আগলে রেখেছে। শুকনো পাতার ওপর দিয়ে হাঁটলেই মচমচ শব্দ ওঠে, যেন কেউ গোপনে নজর রাখছে।

এই নির্জন জায়গায় কি সত্যিই শুধু ফুলমতী একা থাকে?

ভুবনমণির মনে অনেকরকম প্রশ্ন উঁকি দিয়ে যাচ্ছিল।

দ্বিতীয় ছাউনির কাছাকাছি আসতেই ফুলমতীকে দেখতে পেল ও। খাওয়া শেষ, বাইরে এসে নদীতে হাত ধুচ্ছে। ওদের দিকে তাকিয়ে সংক্ষেপে বলল, ‘আমি যাচ্ছি। পরের স্টিমারের টাইম হয়ে এল।’

ভুবনমণি বলল, ‘ওষুধটা দিলে না?’

ফুলমতী বলল, ‘তোকে ওষুধটা একজন বুঝিয়ে দেবে।’

তারপর গলা চড়িয়ে ডাকল, ‘সুরেন। অ্যাই সুরেন!’

মোতির মুখের রং বদলে গেল, স্পষ্ট দেখতে পেল ভুবনমণি।

সুরেন কে? ফুলমতীর মাঝি?

ফুলমতী আবার বাজখাঁই গলা চড়াল, ‘কোথায় গেলি রে তোরা?’

ভুবনমণি কিছু একটা জিগ্যেস করতে যাচ্ছিল, কিন্তু কথাটা ঠোঁটের কিনারায় এসেই থেমে গেল। কারণ ঠিক সেই মুহূর্তে ফুলমতীর ছাউনির ভেতর থেকে আস্তে আস্তে সরতে লাগল শুকনো পাতার পর্দা।

ছাউনির অন্ধকারের মধ্যে থেকে দুটো ছায়া এগিয়ে এল।

ভুবনমণি প্রথমে ঠিক বুঝতে পারল না, বিকেলের ফিকে আলোয় মুখ দুটো স্পষ্ট হচ্ছিল না। কিন্তু তারপর ছায়াদুটো পড়ন্ত সূর্যের আলোর নীচে এসে দাঁড়াল।

আর ঠিক তখনই যেন ভুবনমণির সমস্ত শরীরের রক্ত বরফ হয়ে গেল।

ও যেন শ্বাস নিতে ভুলে গেল। চারপাশের পৃথিবী হঠাৎ স্তব্ধ হয়ে গেল। গাছের পাতাগুলোও থমকে দাঁড়াল বাতাসের তালে দুলতে দুলতে। পায়ের তলার মাটি যেন নড়ে উঠল। মাথার ভেতরটা কেমন ফাঁকা হয়ে গেল।

এ কী দেখছে ও? সামনে এসে দাঁড়িয়েছে কারা?

দুজনেই যে ওর বড় চেনা, বড় আপন!

একজনের সঙ্গে ও কাটিয়েছে শৈশব, কৈশোর। ধমনীতে বইছে একই রক্ত। যে সহোদর ছোটবেলায় ওকে ঘাড়ে তুলে নিত। যার হাত ধরে ও গ্রামের নদীর ধারে ছুটে খেলে বেড়াত। দৌড়ে পালাত কাদামাখা মেঠো পথ ধরে। বৃষ্টিতে ভিজত একসঙ্গে।

আর অন্যজন? সে যে জাহাজডুবিতে হারিয়ে যাওয়া সৌরেন্দ্র! ভুবনমণির সৌরেন্দ্র!

তবে কি মৃত্যুর অতল সমুদ্র থেকে ফিরে এসেছে সে?

রোদে পুড়ে তামাটে হয়ে গেছে গায়ের রং। এক সময়কার মাখনের মতো মসৃণ ত্বক এখন শুধুই রুক্ষ খরখরে চামড়া। চোয়াল শক্ত হয়ে গেছে, একপাশে গভীর দাগ। মনে হচ্ছে যেন শারীরিক কষ্ট তাকে ধাতু দিয়ে নতুন করে গড়ে তুলেছে। মেডিকেল কলেজের সেই শান্তশিষ্ট ছেলেটার কপালের ওপর আজ লম্বা ক্ষতচিহ্ন।

তবু সেই চোখ! সেই গভীর দিঘির মতো দুটি চোখ, যার মধ্যে তাকিয়ে ভুবনমণি এক আকাশ ভরসা খুঁজে পেত, তা এখনও একইরকম রয়ে গেছে।

সেই চাহনিতে কী আছে? বিস্ময়? অভিমান? নাকি হারিয়ে ফেলার যন্ত্রণা?

তবে জাহাজডুবির পর কী হয়েছিল? কোথায় ছিল সে এতদিন? কতটা লড়াই করেছে বেঁচে থাকার জন্য?

ভুবনমণির চোখ ঝাপসা হয়ে আসছে। ও যেন বিশ্বাস করতে পারছে না। হাত বাড়িয়ে ছুঁতে চাইছে সৌরেন্দ্রকে, কিন্তু ভয় করছে খুব। যদি এই মুহূর্তটা মিথ্যে হয়ে যায়? যদি ওই চেনা মুখ ছায়ার মতো মিলিয়ে যায়?

বিস্ফারিতচোখে তাকিয়ে রইল ভুবনমণি। ও কি কোনও স্বপ্ন দেখছে? জীবনের সুন্দরতম স্বপ্ন? যে স্বপ্ন ওকে ফিরিয়ে দিয়েছে জীবনের প্রিয়তম দুই পুরুষকে?

কৃষ্ণসুন্দর আর সৌরেন্দ্রও বিস্ময়ে স্থবির। সৌরেন্দ্রর হাত পা অবশ হয়ে আসছে। শরীরের রক্ত চলাচল থমকে গেছে মনে হচ্ছে। গলা শুকিয়ে কাঠ। কিছু একটা বলতে চাইছে, কিন্তু পারছে না! দু’ চোখ ভরে সে শুধু দেখছে ভুবনমণিকে। সময় থমকে গেছে। এই মুহূর্তে দুনিয়ার সব শব্দ যেন স্তব্ধ হয়ে গেছে, কেবল তিনটি হৃদয়ের তীব্র ধুকপুকানি ছাড়া।

ভুবনমণির শরীরের কাঁপুনি বেড়ে যাচ্ছে আরো, হাত দুটো মুঠো হয়ে আসছে নিজের অজান্তেই।

এ কি সত্যি? নাকি মরীচিকা? নাকি মৃত্যু ওকে ভুল করে স্বর্গের দরজায় এনে ফেলেছে?

ওর চারপাশের পৃথিবী যেন এক ঝটকায় ঘুরতে শুরু করল। ধীরে ধীরে অন্ধকার হয়ে আসছে দৃষ্টির চারপাশ।

চেতনা হারিয়ে যাওয়ার আগের মুহূর্তে ও শুধু শুনতে পেল, কৃষ্ণসুন্দর চেঁচিয়ে উঠলেন, ‘ভুবন! তুই এখানে এলি কী করে?’

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *