মগ্ননারাচ – ১৮

১৮

রেভারেন্ড মণিময় দত্তের ছদ্মবেশের মধ্যে দ্বারকানাথ এমন ঢুকে পড়েছেন, মাঝে মাঝে নিজেও ভুলে যান, যে তিনি খ্রিস্টান নন, ব্রাহ্ম। তাঁর পড়ার টেবিলের সামনেই যিশুখ্রিস্টের একটি আবক্ষ তৈলচিত্র। দ্বারকানাথ তাঁর প্রতিদিনের ব্রহ্ম উপাসনা ওই ছবির সামনেই করেন।

এই কথা একটি চিঠিতে উল্লেখ করাতে গগনচন্দ্র অবশ্য ভারি বিস্ময় প্রকাশ করেছিলেন।

দ্বারকানাথ ওরফে রেভারেন্ড মণিময় দত্ত তাতে খুব একটা আমল দেননি। চিরকালই তিনি একাগ্রচিত্তের মানুষ। যেটাতে লক্ষ্য স্থির করেন, সেটা তাঁর কাছে এমন অর্জুনের সেই পাখির চোখ হয়ে ওঠে, চলার পথে বাকি সবকিছুই তখন তাঁর কাছে গুরুত্বহীন। সেটা নিজের স্ত্রীকে বিলাতফেরত ডাক্তার বানানো হোক, কৈশোরে নিজের বাল্যবিধবা বিমাতাকে গ্রামের সকলের বিরুদ্ধে গিয়ে আবার বিয়ে দেওয়া হোক কিংবা এই আসামের কুলিদের অত্যাচারমুক্ত করা হোক। এই হাজার হাজার মানুষকে মুক্তির প্রতিজ্ঞা তিনি যখন করেছেন, তার জন্য যা করতে হয় করবেন।

আর ব্রাহ্ম ধর্ম মানে তো একেশ্বরবাদী। ঈশ্বর নিরাকার। যিশুর সামনে বসে তাঁর কথা ভাবতে তো কোনও অসুবিধা নেই!

তিনি লঘু চালে চিঠিতে গগনচন্দ্রকে সেই রাতে চিঠি লিখছিলেন, ‘এই তো কয়েকমাস আগে নরেন্দ্রনাথ শিকাগোয় গিয়ে বক্তৃতা দিয়ে হইহই ফেলে দিয়েছে। এই নরেন আগে আমাদের মাঘোৎসবে গান গাইতে আসত, মনে পড়ে তোমার? রক্ষণশীল হিন্দু সন্ন্যাসী হয়ে সে যদি খ্রিস্টানদের বাড়ি থাকতে পারে, তাদের ভাইবোন ডাকতে পারে, আমাদের তা করতে অসুবিধা কোথায়? আসলে মানুষের মধ্যেই ঈশ্বর গগনচন্দ্র, মানুষের সেবা করার চেয়ে বড় উপাসনা আর নেই। আর যিশু তো নিরাকার ঈশ্বরও নন। তাঁর রক্তমাংসের শরীর ছিল। কিন্তু তিনি যা প্রচার করেছিলেন, তা তো আমাদের ব্রাহ্ম ধর্মের সঙ্গে সম্পূর্ণ মিলে যায়। ভালোবাসা, ক্ষমা, সহানুভূতি, এই শিক্ষাগুলো তো আমরা নিজেরাই প্রচার করে আসছি। কিন্তু হিন্দুদের মধ্যে যে সংকীর্ণতা জন্ম নিয়েছে, তা দূর করার জন্যই আমাদের ব্রাহ্মধর্ম। যিশুর সামনে বসে ঈশ্বরের কথা ভাবতে আমার তাই একটুও দ্বিধা হয় না। কারণ ঈশ্বর তো সর্বত্রই আছেন। যে যিশু বলেছিলেন, “পিতার রাজ্য তোমাদের মধ্যেই আছে’, তিনি তো আসলে সেই নিরাকারের কথা বলেছিলেন, যা আমাদের ধর্মেও প্রচারিত। আমার এই প্রার্থনা শুধু যিশুর উদ্দেশে নয়, বরং সেই এক ঈশ্বরের কাছে, যিনি সকলের মধ্যে রয়েছেন। আমার মনে হয়, আমার এই ভাবনার সঙ্গে আমাদের অনেক সদস্যই একমত হবেন।’

এমন তন্ময় হয়ে লিখছিলেন, খেয়ালই করেননি, রাত গভীর হয়েছে। মরামাটিয়া চা বাগানের পাদ্রির জন্য বরাদ্দ এই কোঠাবাড়িটা খুব বড় নয়। চারপাশে কাঠের বারান্দা। সেখানে বসার জন্য লাল রঙের বেতের চেয়ার আর ছোট টেবিল। বাড়ির দেয়ালগুলো সাদামাটা, ছোপ ছোপ সবুজ শ্যাওলার দাগ। ভেতরে দুটো মাঝারি আয়তনের ঘর।

সদর দরজা দিয়ে ঢুকেই বসার ঘর। ভেতরে শয়ন কক্ষ। দুটো ঘরের দেওয়ালেই ঝুলছে দুটো তৈলচিত্র। একটা যিশুখ্রিস্টের, অন্যটা ভার্জিন মেরির। ঘরের কোণায় বড় একটা কাঠের আলমারি। তাতে বেশ কিছু পুরোনো বাইবেল আর খ্রিস্টান ধর্মগ্রন্থ সযত্নে সাজানো।

ভেতরে শয়নকক্ষ। এই ঘরটাতেও সাদামাটা আসবাবপত্র। চওড়া কাঠের খাট। পাতলা তোশক। তার ওপরে কম্বল।

কোঠাবাড়ির বাইরে চা বাগানের সবুজ বিস্তারের মধ্যে একটা নির্জনতা রয়েছে। তাই সেই নৈঃশব্দ্যের মধ্যে ‘খুট’ করে একটা শব্দ হতেই দ্বারকানাথ সচকিত হয়ে উঠলেন।

ওদিকে ততক্ষণে বারান্দায় লাফিয়ে বসে পড়েছে সুরেন। তার সর্বাঙ্গ কালো চাদরে মোড়া। মিশমিশে কালো অন্ধকারে সে মিশে রয়েছে। না। সে রেভারেন্ড মণিময় দত্তকে সাবাড় করতে আসেনি। এসেছে অন্য কাজে। সত্যিই কি ওভারশিয়ার নীলকণ্ঠের সঙ্গে এই রেভারেন্ডের অন্য কোনও ব্যাপার আছে?

এরমধ্যে অনেক কিছু ঘটে গেছে। কলকাতাসহ দেশের সমস্ত শহরে নাকি এই চা বাগানগুলোর অত্যাচার নিয়ে খুব লেখালেখি চলছে। পরপর দু’বার চা বাগানের ম্যানেজারদের অ্যাসোসিয়েশনের মিটিং হয়ে গেছে এই মরামাটিয়াতেই। আশপাশের বাগানের প্রায় কুড়িজন ম্যানেজার এসেছিল। সেখানে পিটারকে জড়ানো ইংরেজিতে চেঁচাতে শুনেছে সুরেন, ‘এখান নকার একটা বাগানে ডেফিনিটলি কোনও স্পাই আছে। নাহলে এত ডিটেইলড রিপোর্ট বেঙ্গলি কাগজ পায় কী করে?’

অন্য এক চা বাগানের ম্যানেজার তর্ক জুড়েছে, ‘আমরা যে গিরমিটির মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ার পরেও কুলিদের রিলিজ করি না, সেটাও তো লিখেছে। এই খবর কুলিদের মধ্যে গেলে তারা আরো খেপে উঠবে।’

পাশ থেকে আরেকজন বলছে, ‘আর বানবানের কথাটা ভুলে গেলে? সেটাও তো ছাপিয়েছে। চারবছর আগের ঘটনা, এতদিন পর কী করে বাইরে বেরোয়?’

‘বানবান মানে মিঃ বানবান? তাঁর আবার কী ঘটনা?’

‘ওহ্‌, তুমি তো নতুন এসেছ!’ পাশ থেকে একজন সাহেব ব্যঙ্গাত্মক মুখে বলছেন, ‘কয়েকবছর আগে বানবানসাহেব তার বাগানে একটা কামিনের কোল থেকে তার বাচ্চাকে ছুড়ে ফেলে দিয়ে মেয়েটাকে জঙ্গলের মধ্যে নিয়ে গিয়ে রেপ করেছিল। বাচ্চাটা মারা গেল। কিন্তু রেপ বা মার্ডারের কোনওটার জন্যই বানবানের কোনও শাস্তি হয়নি। উল্টে বাগানের ছোটসাহেব কোর্টে মিথ্যে সাক্ষী দিল। বানবান নাকি কিছুই করেনি। একেবারে নির্দোষ। ওই কামিনই মিথ্যে অভিযোগ এনেছে। বিচারকও তেমনই, বানবান বেকসুর খালাস পেল। এদিকে সন্তানহারা সেই কামিনটির মোটা জরিমানা হল। এখনো সে সেই ঋণ শোধ করে যাচ্ছে বাগানে খেটে।’

এই বাগানের পিটার এবার বিরক্তমুখে বলছে, ‘ওহ জোনাথন, আপনার এই সিমপ্যাথি আপনি অন্য জায়গায় দেখান। এত দয়ামায়া দেখালে আর কুলিদের থেকে কাজ বের করতে হবে না।’

‘উলটো বললে পিটার।’ জোনাথন নামক বৃদ্ধ সাহেবটি শান্তস্বরে বলছেন, ‘যদিও তোমরা সবাই এটাই বিশ্বাস করো। কিন্তু আমি এখনো মনে করি, কুলিদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার না করলেই সবথেকে বেশি কাজ পাওয়া সম্ভব। এই বিদেশবিভূঁইয়ে আমরা তাদের অভিভাবক, সেই খেয়ালটুকু রাখলে ক্ষতি কী? এতে তো তারাই আমাদের প্রতি আরো লয়্যাল থাকবে। কাজও করবে ভালোবেসে।’

এরপর সেদিন আর তেমন কিছু শুনতে পায়নি সুরেন। সব সাহেবরা রে রে করে থামিয়ে দিয়েছে সেই বৃদ্ধ সাহেবকে। তাদের কারুর দূরতম কল্পনাতেও আসেনি, এই বাগানের কোনও কুলি সেইসব উত্তপ্ত কথোপকথন আড়ি পেতে শুনছে। আর শুনলেও ইংরেজি ভাষা যে কোনও অশিক্ষিত কুলির বোধগম্য হতে পারে, তা তাদের ধারণার বাইরে।

রাতের নিস্তব্ধতায় ঝিঁঝির ডাক স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে। সুরেন আরও একবার চারপাশটা দেখে নিল। না, কোনও পাহারাদার এদিকে আসে না টহল দিতে। ওর কাছে পাকা খবর আছে। আজ রাতে ওভারশিয়ার বুড়ো নীলকণ্ঠ আসবে রেভারেন্ডের সঙ্গে দেখা করতে।

কেন আসবে নীলকণ্ঠ? ওকে কখনোই সাহেবদের ধ্বজাধারী মনে হয়নি। তবে কি ওকে এখন কেউ কিনে নিয়েছে? এই ‘কেউ’টা যদি রেভারেন্ড মণিময় দত্ত হয়, তাহলে ব্যাপারটা মোটেও সরল নয়।

প্রচণ্ড মশার কামড়ে ক্ষতবিক্ষত হতে হতে সুরেন ঘাপটি মেরে বসে ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করছিল। মাঝে-মাঝে উঁচু হয়ে দেখছিল, রেভারেন্ড একইভাবে লিখে চলেছে। এই বারান্দাটা ঘরের একেবারে পেছনদিকে। তাই রেভারেন্ডের সাদা জামাটাই শুধু দৃশ্যমান।

এত কী লিখছে লোকটা?

সদর দরজায় একটা শব্দ হতেই সুরেন উৎকর্ণ হয়ে উঠল। ওই তো, ঘরের মধ্যে এসে হাজির হয়েছে নীলকণ্ঠ মহাপাত্র।

নিচু স্বরে কী যেন আলোচনা করছে দুজনে। এখান থেকে একেবারেই বোঝা যাচ্ছে না। তবে রেভারেন্ড দত্তর গলায় প্রায়ই চাপা হাসি ভেসে আসছে। নীলকণ্ঠের মুখেও হাসি। কখনো আবার গম্ভীর মুখ।

সুরেন কিছুই বুঝতে পারছিল না। এদের দুজনকে দেখে মনে হচ্ছে দীর্ঘদিনের পরিচয়। কিন্তু কী সূত্রে?

অনেকক্ষণ কথা বলে চললে আপনা থেকেই মানুষের সতর্কভাব একটু শিথিল হয়ে পড়ে। এদের দুজনেরও কথা এখন টুকরো টাকরা শুনতে পাচ্ছে সুরেন।

নীলকণ্ঠ মাথা নেড়ে বলছে, ‘তেমন কাকে তুমি এখানে পাবে বলো তো? কুলিদের মধ্যে নেতা গোছের আছে, কিন্তু লেখাপড়া জানা নেতা এমন কেউ নেই। না। ভুল বললাম। একজন আছে। কিন্তু সে একটু খ্যাপা গোছের।’

‘কে?’

‘একবার পালিয়েছিল। আবার পুলিশ তাকে ধরে এনেছে। কথাবার্তায় খুব শিক্ষার ছাপ! কিন্তু জিগ্যেস করলে কিছুতেই ভেঙে বলে না এখানে কীভাবে এল।’

শুনতে শুনতে সুরেন জানলার অনেকটা কাছে এসে পড়েছিল, হঠাৎ একটা মশার আকস্মিক প্রচণ্ড কামড়ে হাতটা সহজাত প্রতিবর্ত ক্রিয়ায় সরে গেল। অন্ধকারে খেয়াল করেনি, জানলার এপাশে রাখা ছিল একটা তেলের কুপি। সেটা উল্টে গিয়ে মাটিতে পড়ল। মুহূর্তে ধাতব ঝনঝন শব্দে চারদিকে নৈঃশব্দ্য খানখান হয়ে গেল।

সুরেন এক পলকের জন্য কী করবে বুঝতে পারল না, তারপরেই বিদ্যুৎগতিতে লাফিয়ে বারান্দাটা এক লাফে ডিঙিয়ে বাগান দিয়ে দৌড়ে জঙ্গলে ঢুকে পড়তে গেল। কিন্তু পারল না। তার ঠিক আগের মুহূর্তে ওর চোখ পড়ে গেল ঘরের দিকে।

শব্দ পেয়ে রেভারেন্ড মণিময় দত্ত উঠে দাঁড়িয়ে এদিকে ফিরেছেন। তাঁর দাড়ি গোঁফ এখন অদৃশ্য। যে চোখজোড়াকে দূর থেকে বড় চেনা লাগত সুরেনের, সেই চোখ তাকিয়ে রয়েছে এদিকে। নীলকণ্ঠও উঠে দাঁড়িয়েছে। দুজনেই এগিয়ে আসছেন বারান্দার দিকের দরজা খুলতে।

সুরেন যেন পাথর হয়ে গেল। পালানো তো দূর, চোখের পাতা পড়াও বন্ধ হয়ে গেল ওর। কাকে এগিয়ে আসতে দেখছে ও? ও কি ঠিক দেখছে?

রেভারেন্ড মণিময় দত্ত ওর কাছাকাছি এসে লম্ফটা তুলে ধরলেন। কয়েক মুহূর্ত।

তারপর চোখেমুখে একরাশ বিস্ময় ফুটিয়ে বলে উঠলেন, ‘সৌরেন্দ্র! সৌরেন্দ্র, তুই বেঁচে আছিস?’

সুরেনের গোটা শরীরটা কাঁপছিল থরথর করে। কত জন্ম পর নিজের পিতৃদত্ত নামটা শুনল ও? ছেঁড়া ছেঁড়া স্মৃতি যেন এসে ধাক্কা দিচ্ছে ওকে। উল্কার গতিতে স্মৃতিকোষ ছুটে চলেছে পেছনদিকে। আসামের চা বাগান, জাহাজ ডুবি, কর্ণওয়ালিশ স্ট্রিটের বাড়ি, অবলাব্যারাক, মেডিকেল কলেজ, নির্ভীক নারী…ভুবন। ভুবনমণি!

হঠাৎ যেন ওর ভীষণ জ্বর এসে গেছে। এখুনি মাথা ঘুরে পড়ে যাবে।

দুর্বল কণ্ঠে ও শুধু বলতে পারল, ‘বাবামশাই!’

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *