মগ্ননারাচ – ১

তরুণীটি কে? কীভাবে সে এই দুর্ভেদ্য অরণ্যে এল? কেনই বা তার সন্তান ভূমিষ্ঠ হতে না হতে তাকে বাধ্য করা হল ধরাধামত্যাগে? এই সমস্ত প্রশ্নের উত্তর পেতে হলে রাত্রি শেষে হওয়া অবধি অপেক্ষা করতে হবে। প্রতীক্ষা করতে হবে নতুন ভোরের।

সদ্যসন্তানহারা তরুণীটির বয়স আন্দাজ পঁচিশ। উন্নত নাসা, ধারালো চিবুক ও টানা টানা আঁখিপল্লবে এককালে সে যথেষ্ট আকর্ষণীয়া ছিল। কিন্তু এখন তার লেশমাত্র অবশিষ্ট নেই। একসময় যে মুখ ছিল শ্যামল মাধুর্যে দীপ্ত, আজ সেখানে শুধুই শূন্যতার ছায়া।

এককালে আলো ঝলমলে নাচঘরে যার কণ্ঠের মায়াজাল ছড়াত মেটিয়াবুরুজের মুশায়রায়, মেহফিলে, জমকালো সুলতানখানায়, সেতারের তারে নাচানো তার সেই সরু আঙুল আজ মাটির ঘ্রাণ নেয়। কাঁচা চায়ের পাতার রস শুষে নেয় চামড়ার গভীরে। একদিন যে আঙুলে ঝংকার তুলত রাগ দরবারী, আজ সেগুলো এই প্রত্যন্ত চা বাগানে গাঁইতি আর দা চালায়। পাতা ছেঁড়ে। খড়ের বোঝা বয়ে নিয়ে যায় নিজের কুঁড়েঘরে।

তার হাতের তালুতে এখন মোটা কড়া। আঙুলের ডগায় চায়ের পাতার সবুজ দাগ। মেহফিলের আলো ঝলমলে দিনগুলো থেকে সে এখন লক্ষ যোজন দূরে। এখন তার ঘাম ঝরে পড়ে বুকের খাঁজে, পিঠ ভিজে যায় কাঠফাটা রোদে, আর দুপুরের গরমে মাথা ঝিমিয়ে পড়ে একবেলার খাবারের অপেক্ষায়।

এককালে এই তরুণী ছিল আমাদের মেটিয়াবুরুজের এক সুন্দরী চপলা বাইজি। যে ছিল অযোধ্যার নির্বাসিত নবাবের মজলিশের সবচেয়ে নামকরা নৃত্যশিল্পী।

ভারতবর্ষের শেষ নবাব ওয়াজেদ আলী শাহ্, যার মতো প্রেমিক গোটা পৃথিবীতে মেলে কিনা সন্দেহ। রাজ্যশাসনে কোনওদিনই মন ছিল না তাঁর, গানবাজনা, প্রেম, রমণী নিয়েই কাটত তাঁর জীবন। উনিশ শতকের মাঝামাঝি ব্রিটিশ সরকার অপদার্থতার দোহাই দিয়ে অযোধ্যার সাম্রাজ্য কেড়ে নিলে ওয়াজেদ আলী শাহ্ সাঙ্গোপাঙ্গো সহ নির্বাসিত হলেন কলকাতায়। মাসিক এক লক্ষ টাকার মোটা পেনশনে গঙ্গার তীরে মেটিয়াবুরুজে গড়ে তুললেন তাঁর স্বপ্নের ছদ্ম সাম্রাজ্য।

চোখ ধাঁধানো ইমারত, নহবত, ইমামবাড়া, চিড়িয়াখানা কী নেই সেখানে! মেটিয়াবুরুজ ছিল আনন্দের নগরী। পতপত করে উড়ছে অযোধ্যার নবাবদের জোড়া মাছের পতাকা। প্রতিটি অলিতে গলিতে চলছে মুরগিবাজি, বটেরবাজি, মুশায়েরা, আফিম, ফানুস, ঘুড়ি, মেহেফিল। হিন্দুস্থানের বাঘা বাঘা ওস্তাদরা এসে ভিড় জমাচ্ছে সেখানে, শিল্পকলার প্রকৃত সমঝদার আর কে আছে এই উপমহাদেশে!

নবাব ওয়াজেদ আলী শাহ্ এভাবেই রসে বশে উৎসবে মেতে কাটিয়ে দিলেন ত্রিশ বছর। ব্রিটিশ সরকার এই আপনভোলা নবাবের মৃত্যুর জন্যই যেন অপেক্ষা করছিল। তারপরই হু-হু করে মুছে দেওয়া হতে থাকল নবাবের সমস্ত স্মৃতি। বহু উত্তরাধিকারীর লড়াইয়ে বসল পেনশন কমিটি। বিকোতে লাগল তাঁর চিড়িয়াখানার পশুপ্রাণীরা। বড় বড় ইমারত নিলাম হতে লাগল। কিছু কিনল বেঙ্গল নাগপুর রেলওয়ে কোম্পানি, কিছু কিনল জুট মিলগুলো।

নবাব মারা যাওয়ার মাত্র একবছরের মধ্যে ১৮৮৮ সালের ডিসেম্বর মাসে ‘দ্য স্টেটসম্যান’ কাগজে বিজ্ঞাপন দেওয়া হল। তখনো সব জন্তুজানোয়ার বিক্রি হয়নি, তাই সেই দায়িত্ব নিয়েছে মেসার্স মিলটন কোম্পানি। সকাল ১১টায় বিক্রিবাটা শুরু হবে। ক্রেতাদের জন্য বিশেষ ট্রাম চালানোর ব্যবস্থা করা হচ্ছে। থাকছে জলপানের শিবিরও। প্রথম দিনই বিক্রি হয়ে গেল কুড়ি হাজার দুষ্প্রাপ্য পায়রা।

আরো দু’বছর পর ১৮৯০ সালের ২৩ ডিসেম্বরের ‘দ্য স্টেটসম্যান’ থেকে জানা যাচ্ছে, বিক্রি হয়ে গেল ভূতপূর্ব নবাবের ২৫৭ বিঘা জমিও। এভাবেই কয়েকবছরের মধ্যে মুছে দেওয়া হয়েছিল লক্ষনৌয়ের সব গন্ধ।

জমিজিরেত, পশুপাখি, আসবাব, অলংকার নাহয় নিলাম হল, কিন্তু যে ‘মামুলি’ মানুষগুলোর দিন গুজরান হত নবাবী জাদুকাঠির ছোঁয়ায়, তারা কোথায় গেল?

নবাব মারা যাওয়ার সময়ে মেটিয়াবুরুজে জনসংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছিল প্রায় চল্লিশ হাজার। তার মধ্যে নবাবের সেপাই-ই ছিল প্রায় হাজারজন। পাঁচশোর বেশি ছিল মকানদার, যারা ওই বড় বড় প্রাসাদগুলোর তত্ত্বাবধান করত। মুহুরি ছিল শ’খানেক। আমীর ওমরাহ গোছের উচ্চপদস্থ কর্মচারী ছিল জনাপঞ্চাশ। আর নবাবের সাধের চিড়িয়াখানার যারা দেখভাল করত, সেই জানোয়ারবাজ ছিল আটশোরও বেশি। এছাড়া ছিল চাপরাশি, হরকরা, পিয়াদা, ছাপাখানার কর্মী, পায়রার খেলা দেখানো পতঙ্গবাজ, মৌলবীর দল।

ধর্মমতে ‘নিকাহ্’ করা নবাবের বৈধ বেগম ছিলেন বেশ কয়েকজন। এছাড়াও ছিল নবাবের প্রায় আড়াইশো জন মুতআ বিবি। ধর্মপ্রাণ শিয়া মুসলমান ছিলেন নবাব। যে মেয়েকে মনে ধরত, কিছুদিনের জন্য তাঁকে ‘মুতআ’ বিবাহ না করে কাছে টানার গুনাহ্ করতেন না। সে ভিশতিনি হোক বা ঝাড়ুদারনি, যাকে ভালো লেগেছে, মুতআ করে কয়েকদিন বা কয়েকঘণ্টার জন্য শাদি করেছেন নবাব। তাদের নিয়ে আবার গড়েছেন নাচগানের দল, পরিখানা। কোথায় গেল সেই সব পরির দল?

বাড়িগুলো দ্রুত বিক্রি করে দেওয়া হচ্ছে, মালকিনদের খোঁজ রাখে কে? অবশ্য তার কিছুটা হলেও রেখেছিলেন গভর্নর জেনারেল লর্ড ডাফরিনের স্ত্রী লেডি ডাফরিন। নবাব মারা যাওয়ার কয়েক মাসের মধ্যে তিনি স্বামীর সঙ্গে পরিদর্শন করতে গেলেন নবাবের এস্টেট, ফিরে এসে দুঃখ করে ডায়েরির পাতায় লিখলেন—

‘নবাবের বেগমরাও সংখ্যায় তাঁর পোষা জানোয়ারদের মতোই। অসংখ্য, যাকে বলে কাতারে কাতারে। যারা বৈধ “নিকাহ্” বেগম, তাদের দেখভালের দায়িত্ব ব্রিটিশ সরকার নিয়েছে, তাঁদের সন্তানদের পেনশনের জন্যও কমিটি বসেছে। কিন্তু পঙ্গপালের মতো যে মুতআ বিবিরা ছড়িয়ে আছে এই এস্টেটের আনাচে-কানাচে, তাদের অবস্থা শোচনীয়। বেশিরভাগকেই বাড়ি পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে। কেউ যোগ দিচ্ছে ভিনরাজ্যের মেহফিলে, কেউ শহরেরই পতিতাদের লাইনে নাম লেখাচ্ছে। কেউ আবার পাশের জাহাজঘাটা থেকে চলে যাচ্ছে কুলির কাজ নিয়ে। আর যারা কিছুই করতে পারছে না, তাদের ছিঁড়েখুঁড়ে খাচ্ছে লোকে।’

কোথায় গেল খাজাঞ্চি আসগর আলী, নাচনেওয়ালি পিয়াজুবাই, লক্ষনৌয়ের যমুনা থেকে মেটিয়াবুরুজের গঙ্গা অবধি নবাবের ছায়াসঙ্গী বৃদ্ধ কাফি খাঁ কিংবা খুশনবিশ হাফিজ নুরুল্লা?

আর প্রাণোচ্ছল মোতি? যে জন্মেছিল নবাবেরই এক মুতআ বিবির গর্ভে, কৈশোর পেরোতে না পেরোতেই যাকে নিতে হয়েছিল বাইজির পেশা? নিজের বাঁধা বাবু নবকিশোর দত্তের ধর্ষকামী অত্যাচারে নিষ্পেষিত হতে হতে যে মন দিয়েছিল নবাবেরই এক হিন্দু কলাকার চন্দ্রনাথকে?

হতভাগ্য চন্দ্রনাথ যেদিন জানতে পেরেছিল, মোতি তার নিজের মায়ের পেটের বোন, নিজের সহোদরার সঙ্গে সঙ্গমের লজ্জায়, আত্মগ্লানিতে সে মেটিয়াবুরুজ ছেড়ে চলে গিয়েছিল জাহাজঘাটায়। ভেবেছিল খালাসির চাকরি নিয়ে চলে যাবে দূরদেশে। স্যার জন লরেন্স জাহাজে সওয়ার হয়েছিল। আর তারপর ঘটেছিল ঔপনিবেশিক ইতিহাসের সেই অন্যতম মর্মান্তিক জাহাজডুবি।

নিজের ক্ষমতার চেয়ে অনেক বেশি যাত্রী নিয়ে সামলাতে না পেরে সলিল সমাধি হয়েছিল সেই বিলাসবহুল জন লরেন্স জাহাজের, মারা গিয়েছিল সাড়ে সাতশোরও বেশি মানুষ। ব্রিটিশ জাহাজ কোম্পানির দোষ ঢাকতে সুকৌশলে ইতিহাসের গর্ভে চাপা দেওয়া হয়েছিল সেই সংবাদ। লাশের পর লাশ ভেসে উঠেছিল বঙ্গোপসাগরে।

অদৃষ্টের লিখনে চন্দ্রনাথ হয়ত মরে গেল, কিন্তু তার প্রেমিকা মোতি? তার কী হল? সে যে জানতেও পারল না চন্দ্রনাথের হঠাৎ নিরুদ্দেশের কারণ। অধীর অপেক্ষায় তৃষ্ণার্ত চাতকের মতো সে মাসের পর মাস অপেক্ষা করল। ভাবল, আর পাঁচজনের মতো চন্দ্রনাথ তো শুধু তার শরীরকে ভালোবাসেনি, বেসেছে তার মনটাকে। নিশ্চয়ই একদিন সে ফিরে আসবে।

কিন্তু চন্দ্রনাথ ফিরে এল না। বরং মাসপাঁচেকের মধ্যেই ইন্তেকাল হল নবাবের। চিরতরে অস্তমিত হল মেটিয়াবুরুজের সূর্য। কর্নেল প্রিদো নিলেন মেটিয়াবুরুজকে ‘সাফ’ করার ভার। তাঁর আদেশে ব্রিটিশ ফৌজ ঢুকে এল মঞ্জিলে মঞ্জিলে, নরমে গরমে ফাঁকা করে দিতে লাগল এদিক-ওদিক ছড়িয়ে থাকা মানুষগুলোকে।

হট যাও! সব হট যাও!

সবাই চলে যাও। এই নগরের মৃত্যু হয়েছে। আমরা নতুন করে বানাব। সেই নতুন শহরে তোমাদের জায়গা নেই।

রাজা এসে রাজার দখল নিল, উলুখাগড়ারা পালাতে শুরু করল। কেউ চলে গেল পশ্চিমে, কেউ উত্তরে। ততদিনে মেটিয়াবুরুজ রং বদলাতে শুরু করেছে। নবাবের সুলতানখানা থেকে ছোট বড় মঞ্জিল, ইমারত সব বিক্রি হয়ে গেছে। কোথাও বসেছে রেলের অফিস, কোথাও সরকারবাহাদুরের। বাগিচাগুলো সব সাফ হয়ে যাচ্ছে। সেখানে গজিয়ে উঠছে পাঁচমিশালি কারবার, পাটকল, বিদেশে ‘কুলি’ চালান দেওয়ার জেটি।

নবাবের শৌখিন কলাকাররা কেউ কেউ চুক্তিনামায় ছাপ দিয়ে সেই জেটি থেকে চড়ে বসছে ল্যাটিন আমেরিকার জাহাজে। চলে যাচ্ছে সুরিনাম, ফিজি, জামাইকার আখের খেতে। কেউ আবার ভোল পালটে নামছে নতুন ব্যবসায়। এখন আর কেউ কথায় কথায় লক্ষনৌওয়ালি নানাবিধ শায়েরি অলঙ্কারে সাজিয়ে মিষ্টি ভাষায় আলাপ করে না। তার বদলে দ্রুত দখল নিচ্ছে কর্কশ হিন্দি আর কথ্য বাংলা।

মোতি প্রথমে স্থির করতে পারেনি, সে মেটিয়াবুরুজ ছেড়ে চলে যাবে কিনা। তার কিশোরী পরিচারিকা ছুটকি বুদ্ধি দেয়, ‘চলো, আমরাও জাহাজে চেপে চলে যাই দিদি!’

‘দিমাগ খারাপ হল নাকি তোর?’ মোতি মাথা নাড়ে, ‘উয়ো আয়েগা!’

‘কৌন? তুমহারা উয়ো চন্দরনাথ? আরে উয়োহ ভাগ গয়া দিদি।’

প্রথম প্রথম ছুটকির ওই কথা শুনে তেলেবেগুনে জ্বলে উঠত মোতি। মুখ দিয়ে ছুটত অশ্রাব্য গালিগালাজের ফোয়ারা। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই তেজ যেন কমে আসছিল ওর। নবাব মারা যাওয়ার পর থেকে মাসমাইনে বন্ধ হয়ে গেছে। ওদিকে বাঁধা বাবু নবকিশোর দত্তেরও কোনও খোঁজ নেই। মোতির ভাঁড়ারে ক্রমশই টান পড়ছে। ফতেহ চকে ইমামবাড়ার পেছনে তার আবাসটিও দিনদিন নিষ্প্রভ হয়ে পড়ছে। একের পর এক অলংকার বন্ধক দিতে হচ্ছে। তবলচি আসা বন্ধ করেছে কবেই। বাড়িওয়ালা বারবার তাগাদা দিয়ে যাচ্ছে।

মেটিয়াবুরুজ যে এক অন্য পৃথিবী। সেখানে বসে মোতি কেমন করে জানবে যে, নবকিশোর দত্ত আর চন্দ্রনাথ দুজনেই ছিল সেই অভিশপ্ত জন লরেন্স জাহাজের সওয়ারি? জীবদ্দশায় তারা যতই প্রতিদ্বন্দ্বী থাক, এখন হয়ত হাত ধরাধরি করে ঘুমিয়ে আছে অতল জলের নীচে।

ওদিকে মেটিয়াবুরুজের অবস্থা যত বেসামাল হচ্ছে, শকুনিদের নজর তত বাড়ছে। আগে যেসব তল্লাট গমগম করত গানবাজনা মেহফিলে, সেইসব এলাকা যেন শুনশান। ঘুরে বেড়ায় সরকারি সিপাই, অচেনা লোকজন।

একদিন গভীর রাতে মোতির বাড়িতে ঢুকে পড়ল দুই মদ্যপ সাহেব। কোনওমতে লাঠির ভয় দেখিয়ে মোতি আর ছুটকি তাদের তাড়াল বটে, কিন্তু ভয়ে ওদের মুখ পাংশু হয়ে গেল। মেটিয়াবুরুজের নব্বই ভাগ মেয়েই বারবনিতা, কিন্তু স্বেচ্ছায়। এখানকার সব অধিবাসীদের মধ্যেই ছিল শিল্পীসত্তা, কোনও পুরুষ জোরাজুরি করত না, কোনও নারী জোরাজুরি সইতও না। কিন্তু নবাব মারা যাওয়ার পরপরই কয়েকজন নর্তকী বলাৎকারের শিকার হল। দুজনকে নৃশংসভাবে খুনও করা হল। তাদের সকলেরই বাড়ির মূল্যবান সব জিনিস উধাও।

সবাই বুঝল, বহিরাগত দুষ্কৃতীদের কাজ। নবাবী আমলের সিপাইরা আর নেই, গোটা তল্লাটে কোনও প্রতিরক্ষার ব্যবস্থাও নেই। মুমূর্ষু এই রাজ্যে অরাজকতা তুঙ্গে, যে যেভাবে পারছে লুঠতরাজ চালাচ্ছে।

একের পর এক পাড়া দ্রুত ফাঁকা হয়ে যাচ্ছিল। মোতিদের মতো মেয়েদের নিরাপত্তা আর অর্থ দুই-ই তলানিতে। গান শুনতে একেবারেই যে কেউ আসে না তা নয়, তবে তারা সবাই মধ্যবিত্ত বাঙালি কিংবা নিম্নবিত্ত সাহেব। তারা উচ্চাঙ্গসঙ্গীত বোঝে না, বোঝে শুধু চটুল বিনোদন। বাধ্য হয়ে মোতি বাংলা শিখতে শুরু করল। কিন্তু তাতেও খুব যে লাভ হল, তা নয়।

যেদিন পেটের দায়ে ওকে সাধের সেতারটা বিক্রি করে দিতে হল, সেদিন মোতি প্রস্তরবৎ বাইরের দালানে বসে ছিল। সেতারটা ওর কাছে নিছক কোনও বাদ্যযন্ত্র ছিল না। মা মারা যাওয়ার আগে পর্যন্ত উস্তাদ রেখে শিখিয়েছিল। এই সেতারে তোলা রাগেই ও শিখেছিল মুজরো করা। এই সেতার ছিল চন্দ্রনাথেরও শেষ স্মৃতি। কত খুনসুটি, কত মান অভিমান। চন্দ্রনাথ চোখ বুজে শেখাত একের পর এক রাগ। আঙুলের মৃদু স্পর্শে ছুঁয়ে দিত তার। ছুঁয়ে দিত মোতির অন্তরাত্মাকেও। মোতির দু’চোখ বেয়ে অশ্রুধারা নামে।

পৃথিবীতে সব পুরুষরাই কি একরকম?

নিশ্চুপে কাঁদছিল মোতি, এমন সময় ঘরে প্রবেশ করল ছুটকি। এই একজনই কেবল শত বিপদেও মোতিকে ছেড়ে যায়নি। ছুটকি হিন্দুবাড়ির মেয়ে, ওর মা এই মেটেবুরুজেই ধোপাওয়ালির কাজ করত। মা মরে যেতে মোতির কাছে কাজ নিয়েছিল। তারপর থেকে হিন্দুপাড়া ছেড়ে মোতির কাছেই থাকে। গত কয়েকমাস মাইনে চায়নি, দুটো ভাত ফুটিয়ে দুজনে ভাগাভাগি করে খেয়েছে। মোতির মুখের দিকে একঝলক তাকিয়েই মনের ভাব বুঝে গেল ছুটকি। স্বাভাবিক স্বরে বলল, ‘হিঁদুপাড়ার কদলীরাও আজ চলে যাচ্চে গো।’

‘কোথায়?’ অন্যমনস্কভাবে জিগ্যেস করে মোতি।

‘জাহাজে চেপে। সেই যে আখের খেতে কাজ করতে।’ ছুটকি মোতির দিকে তাকাল, ‘তোমায় বলেচিলাম কতবার! ক’বচ্ছর খেটে নিলেই ব্যস। অনেক পয়সা জমিয়ে আবার ফিরে আসবে।’

মোতি তীক্ষ্ণভাবে মাথা নাড়ল, ‘বললেই তো হল না। বুড়ো আসগরচাচা আমায় আসল খবর দিয়েছে।’

‘আসগরচাচা মানে দিনরাত যে খবরের কাগজে মুখ ডুবিয়ে বসে থাকে?’

‘হ্যাঁ। এই যারা যাচ্ছে, তারা আর ফিরবে না। ওখানেই সারাজীবন পচে মরতে হবে। না পাবে পয়সা, না পাবে ইজ্জত।’ মোতি জোরে জোরে মাথা ঝাঁকাল, ‘আমার আব্বু আম্মু এই মেটেবুরুজেই মরেচে, আমিও মরলে একেনেই মরব।’

‘মরার একনো অনেক দেরি। পেট চলবে কী করে, সেটা ভেবেচ? নাচগানের সবকিছুই বেচে দিলে। মুজরোও করবে না বলচ…!’

‘কোথায় করব? এই শ্মশানে?’

‘আহ, একেনে কেন? মেটেবুরুজই তো দুনিয়া নয়। একেন থেকে বেরোও, কলকেতায় যাই চলো। সেকেনেও তো বাবুরা আচেন, সেকেনেও রঙ্গ হয়, মেহফিল বসে, বাইজির আসর জমে।’ ছুটকি বোঝানোর ভঙ্গিতে বলে চলেছিল, ‘একেনে দেখচ তো দিনদিন কীসব হচ্চে। বাইরে বেরোলে বুজতে পারি। একগাদা লোক ঘুরচে। কী মতলব তাদের কে জানে! রোশনি বলচিল, কাল রাতেও ইমামবাড়ার পেছনের বাড়ি থেকে একটা মেয়েকে তুলে নিয়ে গেচে। মুখে ন্যাকড়া গুঁজে কাঁধে তুলে কয়েক পা ছুটলেই তো গঙ্গা। সেকেনে নৌকো বাঁধা থাকে, নিয়ে গিয়ে উঠে পড়চে। সব দালালদের কাজ।’

‘তারপর?’

‘তারপর আর কী! লাইনে নামাচ্চে। কিন্তু তুমি তো সেসব করবে না। তুমি তো হলে কলাকার!’

মোতি ছুটকির কথার শ্লেষটাকে ধরতে পারল না, ঝাঁঝিয়ে উঠল, ‘কলাকারই তো! আমি কি লাইনের বেবুশ্যে নাকি? জানিস, আমার গজল শুনে নবাবের কত উস্তাদ তারিফ করতেন?’

‘কলাকার যখন, তবে আসাম চলো। এই মরা মেটেবুরুজে কেন?’ ছুটকি একটু থেমে বলল, ‘এই তো পুঁটিবালাও যাচ্চে। আরো অনেকজনকে জুটিয়েছে।’

‘আসাম! যে দেশে ওই পিয়াজুবাই চলে গেছে?’

‘হ্যাঁ। তোমায় তো বলেছিলাম। শেফালি আর যমুনা বলে মাগিদুটো নিয়ে গিয়েছিল পিয়াজুবাইকে। তারা তো আবার ফিরে এসেচে হিঁদুপাড়ায়। বাবা, কী ভালো কাপড়-চোপড়, দামি-দামি গয়না। যেমন তাদের ঠাটবাট, তেমনই ঠমক চমক। কবে নাকি তারা একেনেই থাকত। তারাই তো পুঁটিবালাদের মতো অনেককে নিয়ে যাচ্চে আসাম।’

‘কেন, আসামেও কি নাচগানের সমঝদার কোনও নবাব আচেন নাকি?’

‘বাহ্, সেকেনে চা বাগান হয়েচে না? প্রতিদিন সন্ধেয় সেই চা বাগানে মজলিশ বসে। চা বাগানের সাহেবরা শোনে। পিয়াজুবাই সেকেনে রোজ দিন ঝড় তুলচে নাকি!’

মোতি চোখ কপালে তুলে বলল, ‘সাহেবরা আমাদের এই হিন্দুস্থানী গান শোনে?’

ছুটকি মুখ বেঁকাল, ‘তা শোনে কিনা সেটা ওই শেফালি আর যমুনাকে শুধোলেই পারো। পিয়াজুকে দেকলে নাকি চিনতে পারবে না। গায়ের রং নাকি আরো খোলতাই হয়েছে, চেহারাও ভালো হয়েছে। প্রতি সন্ধ্যায় তো তারা সেই গুণকীর্তনই গেয়ে চলেচে।’

ছুটকির কথা যে মিথ্যা নয়, তা সন্ধ্যা না গড়াতেই মোতি টের পেল। ছুটকি গিয়ে খবর দিতেই শেফালি আর যমুনা চলে এল ফতেহ চকে। বাড়ির বাইরের দালানে ঢুকেই তাদের একজন কান এঁটো করে হাসল, ‘ওমা, মোতি, তুই এত বড় হয়ে গেচিস লো!’

মোতি অপ্রস্তুতভাবে হাসল। দুজন মহিলারই বয়স চল্লিশের আশেপাশে, শরীরের গড়ন আঁটসাঁট। পরনে ঝলমল করছে কাপড়। গলা বেয়ে নেমেছে হার। কানে দুলছে ঝুমকো। মোতির অভিজ্ঞ চোখ চিনতে ভুল করল না। এককালে এমন কত সোনার গয়না নবকিশোর দত্তের থেকে পেয়েছে সে!

দুই মহিলার মধ্যে একজন এবার এগিয়ে এসে মোতিকে জড়িয়ে ধরল, ‘জানি লো জানি, চিনতে পারবি নে। ওরে, আমরা তোর আম্মুর সই ছিলুম যে! তোর আম্মুকে যখন নবাব মুতআ করে বিবি করল, আমরাই তো সব জোগাড়যন্ত্র করেচিলুম! তোর আম্মুর সে কী নজ্জা!’

মোতির চোখ আলোকিত হয়ে উঠল, ‘কই, তোমাদের তো মনে করতে পারচি নে!’

‘এই দ্যাকো। যকন একান থেকে চলে গেচি, তখন যে তুই হামা টানতিস লো। আমরা যে আজ পনেরো বচ্ছর দেশছাড়া, যখন মেটেব্রুজ ছেড়েছিলুম, তখন সবেমাত্র নবাব জাঁকিয়ে বসেচেন একেনে। একের পর এক মঞ্জিল উটছে। বলি, আমাদের হিঁদুপাড়ার বুড়োবুড়িরাই আমাদের চিনতে পারে না, সেকেনে তুই তো সেদিনের ছুঁড়ি।’ শেফালি আর যমুনা এ ওর গায়ে হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়ে।

‘তোমরা এতদিন কোতায় ছিলে গা?’

‘সে অনেক দূরে, আসামে।’

মোতি আবার তাদের কাপড়চোপড়-গয়নার দিকে তাকায়, ‘সেকেনে গেলেই এমন হওয়া যায় নাকি?’

এবার শেফালি ইঙ্গিতপূর্ণ হেসে বলল, ‘তা যায় বৈকি! এই দ্যাক না, দু’বেলা কেবল চা বাগানে বেড়াতে বেরোলেই মাসে পাঁচটাকা। তারপর এট্টু গানবাজনা করে সাহেবদের খুশি করতে পারলে চলতে ফিরতে দশ-বিশ টাকা মেলে। তোদের পিয়াজু তো পাঁচশোটাকা জমিয়ে ফেলেচে।’

পাঁচশো টাকা! এত টাকা একসঙ্গে কারুর কাছে থাকতে পারে!

‘আর সেকানকার জলবাতাস এত ভালো, কোনও ব্যারাম হয় না লো।’

ছুটকির চোখ চকচক করছে, মোতির তা দৃষ্টি এড়ায় না। ও বলে, ‘তা তোমরা সেকেনে কী করো? মেহফিল?’

‘না, আমাদের কি আর সে বিদ্যে আচে? আমরা সেকেনে ধোপাওয়ালি, ভিশতিনীর কাজ করি। কিন্তু তুই তো হলি নাচনী, তোকে পেলে সাহেবরা মাতায় করে রাকবে। যেমন পিয়াজুকে রেখেচে।’

মোতি আবার সন্দিগ্ধস্বরে বলল, ‘সাহেবরা গজল, ঠুংরি শোনে?’

এবার যমুনা গালে হাত দিয়ে চোখ বড়বড় করল, ‘বলিস কী লো! ওকানে এমনি হেঁড়ে গলার নাচনীরাই পায় মাসে কুড়ি টাকা। সেকেনে তোর গায়ে মেটেব্রুজের ছাপ, সেতার বাজাস, হেসেখেলে ত্রিশ টাকা পাবি।’

ত্রিশ টাকা! মোতির ঘোর লেগে যায়। নবকিশোর দত্ত মাঝেমাঝে গয়না গড়িয়ে দিত, কিন্তু সে তো সোনার খাঁচায় পাখির শেকল! নিজে টাকা উপায় করার স্বাধীনতা? উঁহু, কোনওদিনও পায়নি সেই স্বাদ।

ছুটকি এতক্ষণ চুপ করে শুনছিল, এবার এসে মোতির পায়ে পড়ে গেল, ‘চলো না দিদি, আমরাও সেকেনে চলে যাই। এই মুর্দা গোরস্থান আর ভালো লাগচে না!’

মোতিও যেন মনস্থির করে ফেলেছিল। এতদিন নানাজনের উপদেশেও ও মেটিয়াবুরুজ ছাড়ার কথা ভাবেনি। কিন্তু এই শেফালি আর যমুনা ওর মায়ের সই। এরা যখন ওখানে এত ভালো আছে, পিয়াজু যখন গানবাজনা করেও এত পয়সা কামাচ্ছে, এই সুযোগ ছাড়লে চলবে না।

কিন্তু চন্দ্রনাথ? মুহূর্তে মোতির বুকের রক্ত ছলকে ওঠে। সে যদি কোনওদিন ফিরে আসে? কী করে জানবে, মোতি তাকে ভুলে যায়নি। কেমন করে বুঝবে, তার মোতি রয়েছে আসামে?

ভাবতে ভাবতে ও বলল, ‘আমরাও যাব। তোমরা কি আমাদের নিয়ে যাবে?’

শেফালি বলল, ‘শোনো কতা। তুই হলি আমাদের সইয়ের বেটি। তুই মুখ ফুটে যেতে চাইলে না নিয়ে গিয়ে পারি? কাল ভোরবেলা তৈরি থাকিস, আরো অনেকে যাবে।’

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *