৯
মরামাটিয়া চা বাগানে কিছুদিনের মধ্যেই মোতি পুঁটিবালারা কালোকে কালো, সাদাকে সাদা বুঝে ফেলল। প্রতিদিনই পুরো সময় ধরে পাতা তুলেও মোটে সিকি রোজের কাজ হতে লাগল। মাসিক মাইনে চারটাকা, সিকি রোজের হিসেবে দিনে দু’পয়সা পেল, এদিকে চালের খরচ পাঁচ পয়সা। অতএব, প্রথম দিন থেকেই ওদের একেকজনকে তিন পয়সা করে দেনা করে ভাতসেদ্ধ খেতে হল। যত দিন যায়, সেই ঋণের পরিমাণ বাড়তে লাগল।
সকাল হলে ওরা দল বেঁধে পাহাড়ের গায়ে উঠে পড়ে। হিমেল বাতাসে চায়ের পাতার সোঁদা গন্ধ ছড়িয়ে থাকে, কিন্তু মোতির মনে পড়ে যায় অন্য এক জীবন। সেই জীবন যেখানে সে সেতার হাতে নিয়ে সূর্যোদয়ের প্রথম আলোয় রাগ ভৈরবী তুলত। এখন ভোরের আলোয় সে আর সুর খোঁজে না, খোঁজে কচি পাতা।
দিনশেষে, ক্লান্ত শরীরে যখন মাথা নিচু করে নিজের হাতের দিকে তাকায়, তখন ধুলোমাখা, কড়া পরা আঙুলগুলো দেখে নিজেরই বিস্ময় জাগে। তার কণ্ঠের মায়াজাল ছড়িয়ে থাকত মেটিয়াবুরুজের মুশায়রায়, মেহফিলে, জমকালো সুলতানখানায়। রুদ্রসরের ঝংকারে তার কোমর দুলত, ঘুঙুরের ঝংকারে মিলেমিশে যেত গজলের প্রতিটি শব্দ।
কিন্তু সে সবই যেন পূর্বজন্মের কথা!
শরীরে ইতিমধ্যেই জীর্ণতার ছাপ পড়েছে। দেখে মনে হয়, ওরা যেন শতাব্দীর দুঃখ বয়ে নিয়ে চলছে। চোখের নিচে জমাট বাঁধা ক্লান্তির ছাপ। বিবর্ণ ধুলো মলিন ত্বক, ঠোঁট ফেটে চৌচির। শরীরের প্রতিটি রেখায় লেখা দারিদ্র্যের নির্মম ইতিহাস।
রবিবার চা বাগানে ছুটির দিন। খ্রিস্টানদের বিশ্রামের বার। সাহেবরা সকাল থেকেই মদের বোতল আর গ্লাস নিয়ে বসে পড়েন। খানসামা আর বাবুর্চিরা ভালোমন্দ খাবার রেঁধে জোগান দেয়। তারপর বিকেলবেলা সমস্ত ভৃত্য সমভিব্যহারে সাহেবরা গির্জায় গিয়ে পুণ্যলাভ করে আসেন।
সপ্তাহের এই দিনে কুলিরা একটু নিঃশ্বাস ফেলার সুযোগ পায়। সংসারের জন্য হাটবাজার করতে পারে। রবিবার দিন সকাল হতে না হতেই তাই কুলিলাইনে যেন উৎসব লেগে যায়। বেত্রাঘাতের দাগ, অপমানের জ্বালা, অর্ধাহারের কষ্ট সবকিছু একদিনের জন্য বিস্মৃত হয়ে কুলিরা ভালোভাবে স্নান করে, তেল মাখে, কামিনরা চুল বাঁধে। তারপর কামিনরা দল বেঁধে সবাই হাটে যায়। মনের সুখে তেল, পান, তামাক কেনে। কুলিরা বসে বসে বিড়ি ফোঁকে, দুটো সুখ-দুঃখের কথা কয়।
সকাল থেকে সাজো সাজো রব চলে। শিশুরা প্রাণ খুলে নাচে, গায়, হাসে। ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এসেছে তারা। কেউ কারুর ভাষা বুঝতে পারছে না। কিন্তু তাতে তাদের খেলাধুলো আটকায় না।
পাশের ঘরের সরস্বতী এসে ডাকল, ‘হাটে যাবি তো?’
এই কয়েকদিনেই যা দেনা হয়ে গেছে, মোতি আর পুঁটিবালা বেরোতে চাইছিল না। গেলেই কিছু খরচ হয়ে যাবে। কী দরকার। কিন্তু সরস্বতী হল উৎসাহের ঝাঁপি। সে অভিজ্ঞ কামিন, তিনবছর ধরে মরামাটিয়ায় খাটছে। এত অত্যাচারে শোষণে লাঞ্ছনাতেও কোনও এক জাদুবলে তার মুখের হাসিখানি এখনো অদৃশ্য হয়নি। বয়স ত্রিশের কোঠায়। বাড়ি নাকি রাঢ়বাংলার দিকে। সে চোখ বড় বড় করে বলল, ‘শোনো কতা। আমি থাকতে তোরা পয়সা দিয়ে তেল কিনবি কেন?’
‘না না। তুমি কেন কিনবে?’ পুঁটিবালা কিন্তু কিন্তু করছিল।
সরস্বতী হলুদ দাঁত বের করে হাসল, ‘কারণ আমার দেনার বোঝা তোদের চেয়ে কম। তোরা তো নতুন এসেচিস! চল চল, হাটে ঘোরাটাই সুখ। কেনাটা নয়। কুলিলাইন উজার হল বলে।’
মোতি পুঁটিবালা নিস্তারিণী আর আঙুরমণি বেরিয়ে দেখল, সত্যিই তাই। কেউ শিশু কোলে, কেউ মলিন লেংটি পরে, কেউ খোঁড়াতে খোঁড়াতে হলেও চলেছে বাগান পেরিয়ে সারি দিয়ে। যেন এই কয়েকঘণ্টার স্বাধীনতা চেটেপুটে খেয়ে নিতে চায় সবাই।
ওদের বেরিয়ে আসতে দেখে কানি এগিয়ে এল। সে এরমধ্যেই রঙিন ওড়না, কাঁচুলি পরে প্রস্তুত। চুলটাকে বেশ করে বেঁধেছে। মুখে মেখেছে হালকা রঙ। মোতি হাঁ হয়ে গেল। পুঁটিবালা কাল রাতেই বলছিল, কানিকে নাকি গুনগুন করে গান গাইতে শুনেছে। এই পরিবেশে গান আসে?
পুঁটিবালা হাঁটতে হাঁটতে বলল, ‘মোতিদিদি! আগেকার দিনে নীলকর সাহেবরা ছিল, শুনেচ?’
‘না। কারা তারা?’
‘নীল চাষ করত। তাদের নীলের দাদন তিন চার পুরুষেও শোধ হত না।’ পুঁটিবালা ঢোঁক গিলে বলল, ‘তেমনই এইসব চা বাগানের এগ্রিমেন্ট পাঁচ বছর কেন, কুড়িবছরেও শেষ হবে না। এরা দৈনিক রোজের যা কাজ দেয়, তা পাঁচদিনের কাজ। কেউ একা একদিনে করতে পারে না। তাই আমাদেরও এখানেই সারাজীবন পচে মরতে হবে।’
‘জীবনের কথা এখনো ভাবিস তুই? বছর ঘুরলে বাঁচলে হয়।’ আঙুরমণি ডুকরে কেঁদে উঠল, ‘সারাদিনে শুধু দুবেলা লবণভাত খাচ্চি।’
‘ইহ্, আগে কি দু’বেলা গাওয়া খি খেতে নাকি?’ কানি শুনতে পেয়ে শরীর নাচাল, ‘এমন ভাব কচ্ছ, যেন নবাববাড়ির বিবি ছিলে!’
আঙুরমণি কিছু বলার আগে নিস্তারিণী সরুচোখে তাকাল, ‘আমরা নবাববাড়ির বিবি ছিলুম না। তবে তোর মতো লাইনের বেবুশ্যেও ছিলাম না।’
কানি খরচোখে তাকাল, ‘কী!’
‘যা বলচি ঠিকই বলচি। আমাদের গাওয়া ঘি জুটত না রোজ। তবে গরম ভাতের গন্ধে ভরা দুপুর ছিল। ডাল ছিল। কলাপাতা ভরা মাছের মাথা দিয়ে শাক ছিল। লাউ শাকের ডগা ছিল। সরষে দিয়ে কই মাছ ছিল। বিলে ভরা জল ছিল। ভরা সংসার ছিল। দুঃখ ছিল, কিন্তু সুখও ছিল।’ বলতে বলতে নিস্তারিণীর চোখে জল চলে এল।
‘আমি রোজ মেয়েটাকে স্বপ্নে দেকি। দুধ পাচ্চে কোথা থেকে? শীতের সকালে কুয়াশা ঠেলে মাছ ধরতে যাওয়া, বটতলার হাটে নাওয়া-খাওয়া ভুলে ছেলেটার তালপাতার বাঁশি কেনার সুখ। আর এখন? এক থালা লবণভাতের জন্য সারাদিন পিঠের ছাল তুলে খাটতে হচ্ছে! আমাদের গাঁয়ে পুকুরভরা মাছ, মাঠভর্তি ধান, গাছে গাছে ফল। তবু কি ছেলেমেয়েগুলো ভালো আছে? যাদের মায়ের এমন দুর্মতি হয়, গঙ্গাস্নান করতে এসে কুলি হয়ে যায়, তারা কি ভালো থাকতে পারে? কোথায় তাদের কে চালান করেছে কে জানে? আর তাদের মায়েরই বা বেঁচে থেকে কাজ কী? না পারবে রাতের বেলা সাহেবের ঘরে যেতে, না পারবে সর্দারকে খুশি করতে।’
মোতি আর পুঁটিবালা চোখাচোখি করল। কথায় আছে, ঢেঁকি স্বর্গে গেলেও ধান ভানে। কানির হয়েছে তাই। মেটিয়াবুরুজেও সে ছিল সস্তা বারবনিতা, নাচগানের প্রতিভা ছিলও না, শেখার ইচ্ছেও ছিল না। নবাবের সেরেস্তাদার, খানসামা, বাবুর্চিদের সঙ্গে রাত কাটিয়ে উপার্জন করত। মোতিদের মতো উচ্চাঙ্গ বাইজিরা ওদের সঙ্গে কথাই বলত না। কিন্তু এখানে এসে মুড়ি মুড়কি সব এক দর হয়ে গেছে।
কানিও এখানে আসার পরপরই কাজ শুরু করে দিয়েছে। লম্বোদরী বলছিল, ফি রাতেই কোনও না কোনও কোঠায় ডাক আসে। তার সুফলও হাতে হাতে পাচ্ছে সে। ভালো বখশিশ, কম খাটনির কাজ। কাল রাতেই সরস্বতী খবর দিয়েছে, কানি আর বাগানে কাজ করবে না। কর্তাদের বাড়ি ঝাড়পোঁছ করবে।
নিস্তারিণীর চাবুকের মতো কথায় কানি ফোঁস করে উঠল, ‘ইঁহ, আমি আর যাইহোক খ্যামটা নাচতে এসে তোদের মতো ঘোমটা টানি না। এসেছে কুলিগিরি করতে, আবার কিনা সতীপনা দেখাচ্চে। কতদিন এই গুমোর থাকবে, আমিও দেকব।’
নিস্তারিণী ক্রুদ্ধ বাঘিনীর মতো কী একটা জবাব দিতে যাচ্ছিল, সরস্বতী থামিয়ে দিল, ‘এই তোরা থাম তো! হপ্তায় একদিন ছুটি মেলে, সেদিনও কি চুলোচুলি করে মরবি নাকি? ওই দ্যাক, সামনেই হাট।’
যতই অর্থকষ্ট থাক, হাটের মধ্যে প্রবেশ করতেই মেয়েরা একসঙ্গে হইহই করে উঠল। কেউ তেল কিনছে, কেউ পিঁয়াজের দরদাম করছে, কেউ আবার গলায় ঝোলানোর কাচের মালা দেখে দাঁড়িয়ে পড়েছে। যত না কেনাকেনি হল, তার চেয়ে বেশি দরাদরি, হা হা হো হো হি হি।
লম্বোদরী গায়ে দেওয়ার একখানা কাঁথা দর করছিল, সরস্বতী ওর গায়ে গিয়ে হেসে গড়িয়ে পড়ল, ‘ওরে তোরা দেখে যা লো। বারো হাত কাঁকুড়ের বিচি কিনা তেরো হাত। বলি, আমাদের ঘরগুলো মানুষ থাকার জন্য তৈরি হয়েচিল নাকি? গরু ভেড়ার আবার কাঁথা!’
লম্বোদরী দমল না, দর করতে করতেই নিচু গলায় জিগ্যেস করল, ‘হ্যাঁ গা, তুমি তো অনেক হাটে ঘুইরো। একটা সুন্দর মাইয়া, যেইমন নাচে, সেইমন গায়, নাম পিয়াজু। তুমিও কি দেখছ কোনও বাগানে?’
কাঁথাবিক্রেতা দুদিকে মাথা নাড়ে। সে দেখেনি।
মোতি একটা তেলের দোকানের সামনে গিয়ে দোকানির দিকে তাকিয়ে বলছে, ‘ও দাদা, এক ছটাক তেলের দাম কত?’
দোকানি একবার তাকিয়ে বলল, ‘এক পয়সা। কি করিবা, লন নেকি?’
সরস্বতী সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল, ‘এক পয়সা? এত দাম! এই তেল তো গেল হপ্তাতেও দেখলাম আধ পয়সায় বিকোচ্ছিল।’
দোকানি ঠোঁট উলটে বলল, ‘কাল আর আজ এক নে মাই, বাজার উঠছে। কিন্তি হলে কিন, নইলে জায়গা ছাড়।’
সরস্বতী ছাড়বার পাত্রী নয়, চোখ বড় বড় করে বলল, ‘কী কইলে? আমরা কি গাছত পয়সা পাড়ি? ঠিক আছে, মোতি, চল, অন্য দোকান থেকে দেখি।’
লম্বোদরী এদিকে তাকিয়ে হেসে ফেলল, ‘ওরে বাবারে, এইভাবে দরাদরি করবি নাকি? আমি তো কই, তেল কেনার দরকার কী! সর্ষের তেল ছাড়া চুল বাঁধন যায় না নাকি?’
পুঁটিবালা মাথা নেড়ে বলল, ‘শুধু তেল কেন? মোতিদিদি, দেখো তো, ওই লাল টুকটুকে চুড়িগুলো কেমন লাগে?’
মোতি তাকিয়ে বলল, ‘আচ্ছা! কিনবি নাকি?’
নিস্তারিণী বাঁধা দিল, ‘কিনিস না। আমাদের হাত কি চুড়ি পরার জন্য আর আছে রে? সারাদিন মাটি ঘাঁটায় কাটে, চুড়ি পরলে ভেঙে যাবে।’
পুঁটিবালা একগাল হাসি হেসে বলল, ‘তবু একটু সাজতে ইচ্ছে করে, তাই না? চলো না, দরদাম করি।’
ওরা দরাদরি করতে করতে সামনের দোকানের দিকে এগোল। হাট মুখর হয়ে উঠল ওদের হাসি, কথা আর দরাদরিতে। দোকানিরাও নড়েচড়ে বসেছে। তারা এ হাট সে হাট ঘুরে ঘুরে সওদা করে। স্থানীয় সব চা বাগানের কুলি কামিনরাই ওদের খদ্দের। নগদে কেউই কিনতে পারে না। ধারবাকিতে কাজ চালায়।
একটা জায়গায় মাছ বিক্রি হচ্ছে। আঙুরমণি দাঁড়িয়ে পড়ল। দোকানির সামনে রাখা বাঁশের ডালায় টাটকা মাছ নড়ছে। মাছের গা থেকে রোদে চিকচিক করছে রুপোলি ঝিলিক। ওর মুখ দিয়ে আফসোসের শব্দ হল, ‘আহাগো, আমার ছেলেটা মাছ খেতে কী ভালোবাসে!’
পুঁটিবালা জিগ্যেস করল, ‘এই মাছ কত?’
দোকানি তাকিয়ে বলল, ‘কোনটা? এই বড়টা বারো পাই, ছোটগুলো তিন পাই।’
মোতি ফিসফিস করল, ‘ইতনা মেহেঙ্গা? আমাদের বুরবক পেয়েছে।’
সরস্বতী দোকানির দিকে খরচোখে তাকাল, ‘দাদা, এই মাছগুলা তো কালও ছিল, এক্কেবারে টাটকা নেকি?’
দোকানি বলল, ‘আসামি নদীত ধরিছো মাই! কালেক নয়।’
নিস্তারিণী চোখ সরু করে বলল, ‘নদীর মাছ হলে তো আর দাম এত বেশি হয় না! ঠিক বলছি কি না?’
দোকানি একটু গলা নামিয়ে বলল, ‘ও বোন, তোমরা তো সব জানো। ঠিক আছে, দু’পাইয়ে লও, বেশি দরদাম করো নেকি।’
এদিকে কেউ খেয়াল করেনি, পাশ থেকে একটা বেড়াল সড়সড় করে এসে ডালার নীচ থেকে একটা মাছ টেনে নিয়ে পালিয়ে গেল।
সবাই একসঙ্গে চিৎকার করে উঠল, ‘আরে ধর! ধর!’
কিন্তু বেড়ালের গায়ে কেউ হাত দিতে পারল না।
দোকানি পাংশু মুখে বলল, ‘এই জন্যই দাম বাড়াই! মাছ শুধু কুলিরা না, চা বাগিচার হাড়হাভাতে বেড়ালগুলোও বেশি বেশি খেতে চায়!’
সরস্বতী চোখ পাকিয়ে বলল, ‘বেড়াল মা ষষ্ঠীর বাহন। কোথায় খুশি হবে, তা না, তুমি কিনা ইচ্ছে করে আমাদের লুঠছ?’
হাসাহাসির মধ্যে মাছ কেনা হয়ে গেল। হাটের একপাশে বাদাম ভাজা আর ঘুগনির গন্ধে সবাই কলকল করে উঠল, ‘চল। একটু বাদামভাজা খাই!’
ওরা গোল হয়ে বসে এক পয়সা দিয়ে গরম বাদাম আর খইগুড়ের নাড়ু কিনল। মোতি খেতে খেতে চারদিক দেখছিল। একটুখানি জায়গা জুড়ে বসেছে এই হাট। চারপাশে অরণ্য। খাওয়া হলেই আবার সেই অরণ্যপথ দিয়ে ফিরতে হবে সেই দোজখে। ভাবতেই ওর বুকের ভেতরটা ছ্যাঁত করে উঠল।
হঠাৎ বাঁ দিকে তাকাতেই মোতি জাহাজের সেই লোকটাকে দেখতে পেল। এখন লোকটার হাতেপায়ে কোনও শিকল নেই। একটা পা সামান্য টেনে টেনে সে হাটের পসরাগুলো দেখছে। মোতি পুঁটিবালার কোমরে খোঁচা দিতেই পুঁটিবালা চঞ্চলচোখে বলল, ‘ওই কয়েদি এখানে কেন, মোতিদিদি?’
সবাই গল্পে মত্ত, মোতি উঠে ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল। বেগতিক দেখে পুঁটিবালাও ওর পিছু নিল।
লোকটার চোখে একরাশ বিরক্তি। অথচ মুখে একটা স্থিরতা খেলা করছে। মলিন জীর্ণ জামার ফাঁক দিয়ে উঁকি দিচ্ছে পেশিবহুল হাত, যেন বছরের পর বছর কঠোর পরিশ্রমের সাক্ষী। নিম্নাঙ্গের নেংটিটার দিকে তাকালে লজ্জা হয়। চওড়া বুকের ওপর উঁচু হয়ে আছে হাড়ের গাঁটগুলো। পায়ে গভীর ক্ষতের দাগ। মুখে চাপা দাড়ি। এদিক-ওদিক কী যেন দেখছে উঁকিঝুঁকি মেরে।
মোতি সামনে গিয়ে চাপাস্বরে বলল, ‘তোমার পায়ে শিকল বাঁধা ছিল কেন জাহাজে?’
লোকটা বিস্মিত চোখে পিছু ফিরল। তারপর মোতি আর পুঁটিবালার পরিচ্ছদ দেখে বুঝি আশ্বস্ত হল। তেজি কণ্ঠে বলা শুরু করল, ‘কারণ আমি মানুষ, মালপত্র নই। যদিও ওরা আমাদের তাই ভাবে। ভাবে, মালপত্রের মতো আমাদের শরীরগুলোও ওদের সম্পত্তি। তবে মালপত্র তো পালাতে পারে না। আমরা পারি। তাই শিকল পরায়। শিকল পরে ফিরে এসে আবার স্যাঁতসেঁতে ঘরে শুই। শীতকালে পায়ের নিচে বরফের মতো ঠান্ডা লাগে। বর্ষায় ছাউনির খড় চুইয়ে জল পড়ে, কাদায় আঠালো হয়ে ওঠে মেঝে। গরমের দিনে শরীর ঘেমে চুপচুপে। ঘরের কোণে জল জমে থাকে। তাতে ব্যাঙ, পোকামাকড় সবাই-ই থাকে। বাইরে নড়বড়ে খড়ের বেড়া। একটু জোরে ঝড় এলেই টালমাটাল হয়ে যায়। কোনো দরজা নেই, শুধু চটের আড়াল। রাত হলে সাপ, ইঁদুর ঢোকে। শেয়ালও ঢোকে কোনও কোনও দিন। এভাবেই দিন কাটে। মাস কাটে। বছর ঘোরে।’
লোকটার মুখের পরিষ্কার শহুরে উচ্চারণ শুনে মোতি থমকে গেল। বলল, ‘তুমি বুঝি আগে এখানকার কুলি ছিলে?’
‘হ্যাঁ।’
‘পালানোর চেষ্টা করেছিলে?’
‘হ্যাঁ।’ লোকটা হাসল, কিন্তু সেই হাসির মধ্যে দুঃখ, তাচ্ছিল্য আর জেদ মিলেমিশে এক অদ্ভুত অভিব্যক্তি, ‘পালিয়েছিলাম, কী আর করব? খাঁচার পাখি জানে, জানলা খোলা থাকলে কী করতে হয়। কিন্তু সব পাখির ভাগ্যে উড়ান জোটে না।’
পুঁটিবালা এতক্ষণ চুপ করে শুনছিল, এবার বলল, ‘তোমার বাড়ি কোথায় গো?’
‘সে আর জেনে কী করবে? সন্ন্যাসীর পূর্বাশ্রমের মতো কুলিরও জানতে নেই।’ লোকটা হাসল বটে, কিন্তু মোতি স্পষ্ট দেখল, ওর চোখদুটো যেন ভিজে গেল।
চারদিকে আরেকবার তাকিয়ে নিল মোতি। লম্বোদরী, সরস্বতীরা অন্য এক কামিনের কোলের বাচ্চাকে নিয়ে ব্যস্ত। তাকে হাসাচ্ছে, আদর করছে। মোতি মুখ ফিরিয়ে ফিসফিস করল, ‘পালিয়েছিলে কী করে? কউনো রাস্তা জানা আছে?’
লোকটা এবার সন্দিগ্ধচোখে তাকাল, ‘তোমায় বলব কেন?’
মোতি একটু থমকাল। তারপর বলল, ‘বলবে কিঁউকি, আমাদেরও তোমার মতো সাহস আছে। পালানোর রাস্তা শুধু ইচ্ছেয় খোলা যায় না। লাগে সাহস। লাগে সঙ্গী। একা একা পালানো যায় না। মরতে হলে একসঙ্গে মরতে হবে, বাঁচতে হলে একসঙ্গেই বাঁচতে হবে। তুমি কি সেই সাহস রাখো?’
লোকটা উত্তর দিল না। কেবল, ওর চোয়ালটা শক্ত হয়ে উঠল, ‘আমার নাম সুরেন। নামটা মনে রেখো। কুলিলাইনে ফিরে পেছনের খালপাড়ে আসবে। রাতের বেলা।’
