২৫
গভীর রাত পেরিয়ে ভোরের আলো ফুটতে না ফুটতেই ট্রেন এসে থামল গোয়ালন্দ ঘাট স্টেশনে। ট্রেনের দুলুনিতে দেহ মন অর্ধেক ক্লান্ত, তবু চোখেমুখে এক অদ্ভুত দৃঢ়তা নিয়ে নামল ভুবনমণি। রেলগাড়ির সিংহভাগ লোকই চলেছে আসামে চা-কুলি হয়ে, বিপুল সেই জনস্রোত অনুসরণ করে ও জাহাজঘাটের দিকে চলতে শুরু করল।
ঘাটের চারপাশে মানুষের ভিড়, কোলাহল, আর সস্তা খদ্দেরের খোঁজে ঘুরে বেড়ানো লোকদের দল। আড়কাঠিরা ঘিরে ধরছে একলা যাত্রীদের। নানা ছলনায় ভোলাতে চাইছে।
‘অ মেমসাহেব, চা খাবেন? তাজা চা! আসেন আসেন।’
‘বাবু, আসাম যাবেন? মজার খাসি মাংস আর রুটি আছে, খান একবার।’
‘এই যে দিদি, কোথায় যাবেন? আমি পৌঁছে দেব চা বাগানে। একদম নিরাপদ। তাও আবার মাগনায়। আইসেন।’
ভুবনমণি মনকে শান্ত রাখার চেষ্টা করল। মাথার ঘোমটা আরও টেনে নামিয়ে দিল। তবে এত সহজে ওকে ওরা ছাড়বে না। কয়েকজন লোক ওর দিকে এগিয়ে এল। একজন তো হাতও ধরার চেষ্টা করল। ভুবনমণি তীব্র কণ্ঠে বলল, ‘ছাড়ুন!’
লোকটা একটু পিছু হটল ঠিকই, কিন্তু সেই ঘোলাটে চোখের দৃষ্টি পিছনে সরে গেল না।
ওর চারপাশে এখন প্রায় পাঁচ-ছয়জন লোক দাঁড়িয়ে গেছে। সবাই আড়কাঠি বা মাঝি শ্রেণীর লোক। প্রত্যেকের মুখে কুৎসিত হাসি। কেউ কেউ আবার ভুবনমণিকে ঘিরে নানান কথা বলতে শুরু করেছে।
‘এই বউঠান, তোমাকে দেখে তো মনে হচ্ছে তুমি একলা এসেছ। ভয় নেই, আমি পৌঁছে দেব তোমাকে চা বাগানে। একদম কম পয়সায়। আর তোমার খাওয়ার বন্দোবস্তও করে দেব।’
‘না। আমি কারো সাহায্য চাই না।’ ভুবনমণির কণ্ঠস্বর দৃঢ়। চোখে চোখ রেখে উত্তর দিল সে। কিন্তু তাতে লোকগুলোকে তাড়ানো গেল না। বরং যেন ওদের মধ্যে উৎসাহ বেড়ে গেল।
‘তুমি নির্ঘাত কুলি? পালিয়ে এসেছ!’
ভুবনমণি ফুঁসে উঠল, ‘কুলি তো কাগজ দেখিয়ে পুলিশকে ধরে নিয়ে যেতে বলুন। বাধা দিচ্ছে কে?’
বেগতিক দেখে ওরা কথা ঘোরাল, ‘তবে একলা মেয়ে হয়ে এইরকম পথে বেরিয়েছ কেন?’
‘কেন, দেশের কোন আইনে লেখা আছে যে মেয়েরা একা পথ চলতে পারে না?’
‘আহা, রাস্তা হারালে কী হবে? এদিকে এসো, আমি ভালা মানুষ। আমার সঙ্গে গেলে নিরাপদেই পৌঁছে যেতে পারবে।’ একটা মোটা চেহারার লোক বলল। তার গালে বড় বড় বসন্তের দাগ আর চোখে শেয়ালের মতো চাউনি।
‘ভয় নেই দিদি, আপনি শুধু আমার কথামতো চললেই হল। ভালো ভালো খাবার খেতে পাবেন, নিরাপদে চা বাগানে পৌঁছে দেব। সেখানে কাজ নেই মোটে, খালি পায়ের ওপর পা তুলে বসে থাকা।’ আরেকজন সুর করে বলে উঠল।
ভুবনমণি এসব কথা শুনেও শুনল না। বছরকয়েক আগে হলেও ও কারুর না কারুর কথায় প্রভাবিত হয়ে তাকেই অনুসরণ করে ফেলত। কিন্তু ‘নির্ভীক নারী’র সম্পাদিকাকে টলানো অত সহজ নয়।
কাঁধের ঝোলাটাকে শক্ত করে ধরে ও গটগট করে হেঁটে চলল স্টিমার ঘাটের দিকে। মাথার ভেতর কেবল একটাই নাম ঘুরপাক খাচ্ছে। মরামাটিয়া চা বাগান।
ওর এমন নিরাসক্ত ভাব দেখে একটা লোক উচ্চস্বরে বলে উঠল, ‘বউঠান, জাহাজে উঠতে চাও? আমাদের সঙ্গেই যেতে হবে। অন্যরা কিন্তু সব ঠগবাজ। আমার সঙ্গেই থাকো। আমি পৌঁছে দেব।’
ভুবনমণি রাগে, ক্লান্তিতে, হতাশায় টলছে। কিন্তু চোখেমুখে তার একটা কঠিন দম্ভ ফুটে রয়েছে। একসময় হাঁটতে হাঁটতে ও পৌঁছে গেল স্টিমার ঘাটের কাছে। ঝোলা থেকে পয়সা বের করে টিকিট কাটল। ভিড়ের মধ্যে নিজেকে সরিয়ে রাখতে চেষ্টা করল, কিন্তু আড়কাঠিদের চোখ থেকে নিজেকে লুকিয়ে রাখা খুব সহজ কাজ নয়।
স্টিমারের গায়ে রোদ পড়ে চিকচিক করছে। ভুবনমণি তার পুঁটুলি শক্ত করে ধরে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে লাগল। মাথার ঘোমটা আরো নামিয়ে দিল। লোকের ভিড়ের মধ্যে নিজেকে ঢেকে রাখতে চাইছে ও। তবু মনে মনে সতর্ক। যেন কেউ পিছু না নেয়।
স্টিমারের কোলাহলধ্বনি মিলিয়ে যাচ্ছে নদীর বুকে। বিশাল ব্রহ্মপুত্রের বুকে ছোট্ট একটা ভাসমান কাঠামোর মতো মনে হচ্ছে স্টিমারটাকে। ভুবনমণি ক্লান্ত দেহে কাঠের তক্তার ওপর বসে পড়ল। চোখেমুখে অনিশ্চয়তা লেগে আছে। তবু ভয় পায়নি। বরং ওর বুকের ভেতর থেকে এক অজানা সাহস মাথা তুলছে। নতুনদাদাকে খুঁজে বের করতেই হবে!
চারপাশে কুলিরা ব্যস্ত। কেউ পাথরের বোঝা নামাচ্ছে, কেউ বস্তা সাজিয়ে রাখছে। ঘর্মাক্ত শরীরে তাদের চেহারাগুলো কেমন ম্লান হয়ে আছে। তবে তাতে ভুবনমণির কাজ সহজ হয়েছে। কেউ ওর দিকে তেমন মনোযোগ দিচ্ছে না। নিজেকে কুলিদের মতো করে সাজিয়ে চুপ করে বসে আছে এক কোণে।
নদীর বাতাস যেন অন্যরকম। এখানে বিশুদ্ধতার চেয়ে রহস্যের গন্ধ বেশি। বদ্ধ ঘাটের ভ্যাপসা গন্ধ মিলিয়ে গিয়ে জলের ভেজা মাটির গন্ধ মিশছে হাওয়ায়। ভুবনমণি সেই হাওয়ার স্পর্শে যেন নতুন করে নিজেকে খুঁজে পাচ্ছিল। শীতল হাওয়া ওর ক্লান্তিকে একটু হলেও কমিয়ে দিচ্ছিল।
‘অ্যাই মেয়ে, এখানে বসে আছিস কেন?’
একটা কর্কশ গলা শুনে চমকে উঠল ভুবনমণি। সামনে দাঁড়িয়ে রয়েছে এক মাঝবয়সি মহিলা। গায়ের রং তামাটে, চোখে-মুখে রোদ-ঝলসানো দৃঢ়তার ছাপ। পরনে মলিন কাপড়, মাথায় কাপড় জড়ানো। তবে কণ্ঠস্বরে যেন মায়ার ছোঁয়া।
‘কোথায় যাচ্ছিস, বল তো?’ মহিলা চোখ কুঁচকে তাকিয়ে আছে ওর দিকে।
‘ম…মরামাটিয়া চা বাগান।’ ধরা গলায় বলল ভুবনমণি।
মহিলা হাসল, ‘মরামাটিয়া? সেখানে তো এখন আগুন জ্বলছে।’
‘মানে?’
‘কিছু না। ওখানে কাজ করতে যাচ্ছিস?’
‘হ্যাঁ…মানে…একজনের খোঁজ করার আছে সেখানে।’
মহিলার ভ্রু কুঁচকে কিছুক্ষণ ভাবল। তারপর বলল, ‘আমি ফুলমতী। এইসব নৌকো আর স্টিমারে কামিনদের দেখভাল করি। খাবার জোগাই। তুই একলা মেয়ে, চা বাগানে কাকে খুঁজতে যাচ্ছিস বল তো?’
ভুবনমণি চুপ করে রইল। অচেনা অজানা এই মহিলাকে অবশ্যই খুলে বলা উচিত হবে না।
ফুলমতী যেন ওর দ্বিধা অনুমান করল, ‘বুঝেছি। বলবি না। তবে তোর চোখেমুখে যা লেখা আছে, তাতে বোঝা যায় তুই ভয় পাচ্ছিস না। কিন্তু সাবধান হয়ে চলতে হবে তোকে। এইসব রাস্তায় শিয়াল কুকুরের ছড়াছড়ি, একটু বেখেয়াল হলেই কুলি হয়ে চালান হয়ে যাবি।’
‘তবে কী করব?’ ভুবনমণি ইতস্তত করে বলল।
‘আপাতত এখন তোর লুকিয়ে থাকা ছাড়া কিছু করার নেই। সকালের দিকের এই স্টিমারগুলোয় না ওঠাই ভালো। গরুভেড়ার মতো সবাইকে কুলি করে নামিয়ে দেয়। বিকেলের স্টিমার যখন ছাড়বে, তখন আমার এক চেনা সারেঙ আছে, তাকে বলে দেব। চুপিচুপি উঠে পড়িস। একেবারে খোলে ঢুকে বসে থাকবি। না টের পাবে কোম্পানি, না ঘাটের সর্দারগুলো। কারুর কথায় ভুলবি না। জানবি, সব মিথ্যে। বুঝলি?’
ভুবনমণি মাথা নেড়ে সায় দিল। ছোট্ট পুঁটুলিটা শক্ত করে চেপে ধরল।
ফুলমতী বলল, ‘খেয়েছিস কিছু? পেটে তো মনে হচ্ছে, ক’দিন ভাত পড়েনি।’
ভুবনমণি ম্লানমুখে চোখ নামাল।
‘বুঝেছি। এক কাজ কর। আমার সঙ্গে নেমে আয়। ভয় পাস না। আমি আড়কাঠি নই।’
ফুলমতীর পিছু নিল ভুবনমণি। স্টিমার থেকে নামার সময় দু’একজন খালাসি জিজ্ঞাসুচোখে তাকাল বটে, কিন্তু ফুলমতী সংক্ষেপে বলল, ‘আমার লোক।’
স্টিমার যেখানে দাঁড়িয়ে আছে, যেদিক থেকে ঘাটে দলে দলে লোক আসছে, তার উলটোপথে চলতে শুরু করল ফুলমতী। হাঁটছে তো হাঁটছে। হাঁটা আর শেষ হয় না। ভুবনমণি পিছু চলছে। দুপুরের সূর্য মাথার ওপর উঠে আসছে। ঘামে ভিজে যাচ্ছে ওর চুলের গোছা, কিন্তু পথ শেষ হয় না।
‘আর কত দূর?’ একটু হাঁপিয়ে বলল ভুবনমণি।
‘কাছাকাছি চলে এসেছি,’ ফুলমতী বলল, কিন্তু মুখের অভিব্যক্তিতে ক্লান্তির লেশমাত্র নেই।
ভিড় ক্রমশ পাতলা হয়ে আসছিল। এদিকের ঘাটগুলো একেবারে জনশূন্য। লোকজন নেই বললেই চলে। কেউ স্নান করছে। কেউ মাছ ধরছে। ভুবনমণির বুকের ভেতরটা ধকধক করছিল। ওর ধীরে ধীরে সন্দেহ বদ্ধমূল হচ্ছিল যে, ফুলমতীও আড়কাঠিই, অন্য কিচ্ছু নয়। জাল দাসখতের কাগজ করিয়ে ওকে চালান দেবে।
একবার ও ভাবল, ছুটে পালায়। কিন্তু এতদূরে চলে এসেছে ও বন্দর থেকে, সেই উপায় আর নেই।
হাঁটতে হাঁটতে ফুলমতী চলে এল এক সরু খাঁড়ির ধারে। সেখানে বাঁধা রয়েছে ছোট্ট একটা ডিঙি নৌকা। চারপাশ নির্জন এদিকটায়, শুধু কিছু বুনো পাখির ডাক শোনা যাচ্ছে।
‘আয়, উঠে বোস।’ ফুলমতী দাঁড় তুলে নিল হাতে।
‘নৌকো করে কোথায় যাব?’
‘তোর বাপের বিয়ে খেতে। চল চল!’
ভুবনমণি দ্বিধাগ্রস্তভাবে নৌকোয় পা রাখল। নড়বড়ে কাঠের ছইতে উঠতেই ফুলমতী দক্ষ হাতে বৈঠা চালাতে শুরু করল। নৌকা ধীরে ধীরে খাঁড়ির জল কেটে এগিয়ে যেতে লাগল।
‘এদিকে তো কোথাও কোনও লোকজন নেই!’ ভুবনমণি চারপাশ দেখে বলল।
‘না। এই পথ বেশিরভাগ মানুষ এড়িয়ে চলে। তোর যাওয়ার জায়গা মরামাটিয়া চা বাগান, তাই তো?’
ভুবনমণি মাথা নাড়ল।
‘তোকে একটা কাজ করে দিতে হবে আমার।’
‘কী?’
‘একটা ওষুধ দেব তোর হাতে। তারপর তোকে মরামাটিয়ায় পৌঁছে দেবে এক মাঝি। কিন্তু সে পুরো বাগান অবধি যেতে পারবে না। গেলেই তাকে ধরবে।’
ভুবনমণি কিছুই বুঝতে পারছিল না। তবু ও বাধা দিল না।
‘বাকি পথটুকু তোকে সাঁতরে যেতে হবে। সেই বাগানে কাজ করে এক পাহারাদার। তার নাম নবীন। সেই নবীনের ছেলের খুব অসুখ। তোকে সেই ওষুধটা গিয়ে তাকে দিতে হবে। পারবি?’
‘কেন পারব না? সে বুঝি তোমার কেউ হয়?’ ভুবনমণি কৌতূহল সামলাতে পারল না।
ফুলমতী ঝংকার দিল, ‘তোর অত জেনে কাজ নেই। মরামাটিয়ায় পৌঁছতে চাইছিস, সেটা পারবি। তবে ওখানে এখন খুব বাজে অবস্থা। যাকগে, এখন আমার ডেরায় চল। চাড্ডি ভাত খা। তারপর মাঝির নৌকোয় তুলে দেব।’
প্রায় আধঘণ্টা চলার পর নৌকো ধীরে ধীরে একটা অন্ধকার তীরে ভিড়ল। তীর নয়, একটা চড়া। তবে সেখানে অনেক গাছগাছালি, অন্ধকার হয়ে রয়েছে। একটু দূরেই পাতার ছাউনি।
ফুলমতী নৌকো নোঙর করে সেদিকে নিয়ে গেল ভুবনমণিকে।
ছাউনির ভেতর নানা বয়সের কয়েকটা মেয়ে বসে আছে। না বসে আছে বলা ভুল। তারা গোগ্রাসে ভাত গিলছে। চোখেমুখে ভয়, ক্ষুধা আর ক্লান্তির ছাপ। শরীরের হাড়জিরজিরে গড়ন দেখে বোঝা যায়, কতদিন ধরে পেটভরে খেতে পায়নি ওরা।
ছাউনির এক কোণায় গবগব করে উনুনে ফুটছে ভাতের হাঁড়ি। মেয়েগুলোর মধ্যে কেউ কেউ গিয়ে পারলে সেই ফুটন্ত হাঁড়ি থেকেই ভাত নিয়ে আসে।
ওকে দেখে মেয়েগুলো মুখ তুলে তাকাল। একজন বলল, ‘এ কে গো?’
‘তোদের অত জেনে কাজ কী? চুপচাপ খা। এখুনি বিষগুঁড়ির নৌকো চলে আসবে। হাতে সময় বেশি নেই। আঁধার নামার আগে অনেকটা এগিয়ে যেতে পারলে নিশ্চিন্তি।’ ফুলমতী বলল।
মেয়েগুলোর মুখে আবার কালো ছাপটা স্পষ্ট হয়ে উঠল। ফুলমতী উনুনের কাছে গিয়ে হাঁড়ি থেকে একটা শালপাতায় ভাত বাড়ল, তারপর দুটো লঙ্কা দিয়ে ভুবনমণিকে ডাকল, ‘কীরে মেয়ে? এখনো ভাবছিস, আমি তোকে চালান দেব? ভাব ভাব। তবে তার আগে ভাতটা খেয়ে নে দিকি। আমি ওদিকটা দেখে আসি।’
ভুবনমণির সাদা থান, চলাফেরায় এমন এক পরিশীলিত ভাব, ফুলমতী চলে যেতেই মেয়েগুলো ঝাঁপিয়ে পড়ল।
‘তুমি কে গো?’
‘এই নরকে কেমন করে এলে?’
‘তোমার সাথে কেউ নাই?’
একেবারে সামনের মেয়েটির চোখ মুখ কী কাটা কাটা, এককালে যে খুব সুন্দরী ছিল, তা বোঝা যায়। সে বলল, ‘আমি মোতি। তোমার নাম কী?’
