মগ্ননারাচ – ১৩

১৩

পুঁটিবালা টুকরিতে চা-পাতা তুলতে তুলতে ফিসফিস করল, ‘চিনি না জানি না। লোকটাকে দেখলেই কেমন ভয় করে। রাতবিরেতে খালপাড়ে যাওয়াটা ঠিক হবে?’

মোতি হাসল, ‘সাহি গলতের জায়গায় আমরা এখনো আছি?’

খাঁ খাঁ রোদে টানা কাজ করতে করতে ওদের কাপড়গুলো ঘামে ভিজে শরীরে লেপ্টে গিয়েছে। মোতির কথা শুনে পুঁটিবালা আর নিস্তারিণী চুপ করে রইল। মোতির কথাটা মিথ্যা নয়। তিনদিন ধরে শুরু হয়েছে উপদ্রব। সারাদিন হাড়ভাঙা খাটুনি, তারপর সন্ধ্যাবেলা চারটে ভাত রান্না করে খাওয়া। যেই সবাই গভীর রাতে কোনওমতে ভিজে মাটিতে চাদর পেতে শুচ্ছে, দরজায় ঠকঠক। ছোটসাহেব পিটারের চাকর। এখুনি যে কোনও একজনকে ছোটসাহেবের বাংলোয় যেতে হবে।

নিস্তারিণী প্রথমে শুনে চমকে উঠেছিল, ‘মানে!’

‘মানে আবার কী!’ ভাবলেশহীন স্বরে বলেছিল সেই ভৃত্য, ‘এখানে এ-ই নিয়ম। চলো চলো। কেন, তোমাদের ওই নতুন মেয়েটা তো অ্যাদ্দিন যাচ্ছিল। তাকে দিয়ে আর চলবে নে।’

আঙুরমণি লম্বোদরী নিস্তারিণী মোতিরা একে অন্যের দিকে বিবর্ণচোখে তাকিয়েছিল। কানি এরমধ্যেই পুরনো হয়ে গেল?

লম্বোদরী উদ্ধতভাবে বলেছিল, ‘কেন? আমরা কি মানুষ নই? রোজ রোজ আমাগো ডাক পড়বে ক্যান? আমরা খাটতে আইছি, এইরকম নষ্ট কাম দিবার লাইগা আই নাই।’

দরজা থেকে গাঢ় অন্ধকারে, আধো আলোয় ভৃত্যটির লালচে চোখদুটো যেন গর্তের ভিতর থেকে উঁকি দিয়েছিল, ‘বটে? বুড়ি মাগির চোপা দেখো! খুব সাহস না! চল। আজ তুই-ই যাবি।’

বাঘ বলরাম এসে উপস্থিত হয়েছিল কিছুক্ষণের মধ্যেই। তারপর লম্বোদরীকে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। মোতি, পুঁটিবালা, নিস্তারিণীরা মিলে পারেনি চারজন প্রহরীর সঙ্গে। সারা রাত ওদের কেটেছিল আতঙ্কে। আঙুরমণি শুধু একবার স্বগতোক্তি করেছিল, ‘হা ভগবান! ও তবু নাহয় লাইনের মাগি, আমরা ভদ্র গেরস্থঘরের বউ!’

মোতি ফুঁসে উঠেছিল, ‘কেয়া বাত করতাছো তুম! ইজ্জত কি একটাই মাপ দিয়ে হোতা হ্যায়? মাগি হোক বা ঘরের বউ, রাজি না থাকলে জোর করে কাউকেই বিছানায় লেয়া যায় না। ইয়ে জুলুম হ্যায়, জুলুম!’

নিস্তারিণী মাথা নিচু করেছিল। সত্যিটা অনেক বড় হয়ে দাঁড়িয়েছিল ঘরের মাঝে। এইখানে বেশ্যা আর গৃহস্থবধূ বলে কিছু নেই। সকলেই পণ্য। সাহেবদের জন্য। তাদের চাকরদের জন্য। এই চা বাগানগুলোর অন্ধকার বাগিচায় যারা রক্ত মাখা পয়সা কামায়, তাদের জন্য।

সকালে লম্বোদরী ফিরেছিল।

ও তখন হাঁটছিল না, টলছিল। পায়ের পাতাগুলো যেন মাটি ছুঁতে চাইছিল না, শরীর নিঃশব্দে কাঁপছিল। গায়ের কাপড় এলোমেলো। একপাশে ছেঁড়া। মাথার সামনের দিকে কাটা দাগ, চোখের নিচে কালশিটে পড়ে গিয়েছিল।

‘লম্বোদিদি!’ পুঁটিবালা দৌড়ে গিয়ে ওর পাশে বসেছিল। হাত ধরেও চমকে ছেড়ে দিয়েছিল। হাতটা বরফের মতো ঠান্ডা। লম্বোদরী চোখ বুজেই ছিল।

মোতি নিচু স্বরে বলেছিল, ‘কুছু নেহি বোলেগি, তাই না?’

লম্বোদরী চোখ খোলেনি, ওইভাবেই বলেছিল, ‘জল দে।’

আঙুরমণি কাঁপা হাতে জলের ঘটিটা এগিয়ে দিয়েছিল। লম্বোদরী ধীরে ধীরে চুমুক দিতে শুরু করেছিল। তারপর হাঁ করে ঢকঢক করে গিলছিল। পুরো ঘটিটা নিঃশেষ করে একটা লম্বা নিঃশ্বাস ছেড়েছিল। তারপর অস্ফুটে বলেছিল, ‘সাহেবডা আমার পোলার বয়সি প্রায়। আমারেও ছাড়ল না!’

ঘরজুড়ে মৃত্যুনীরবতা নেমে এসেছিল।

তারপর থেকে পরপর তিন রাত্রি লম্বোদরীকে যেতে হয়েছে ছোটসাহেবের বাংলোয়। প্রতিদিন সকালেই নিঃস্ব রিক্ত হয়ে ফিরেছে লম্বোদরী। তারপর সামান্য বিশ্রামও জোটেনি, রওনা দিতে হয়েছে বাগিচার ডিউটিতে। শত জিজ্ঞাসাতেও সে ভেঙে কিছু বলেনি। শুধু বলেছে, ‘সাহেব তেরাত্তিরের বেশি এক মেয়েতে থাকে না।’

‘কী করে জানলে?’

‘চাকরবাকরগুলো বলাবলি করছিল। সাহেবের তিনরাত ফুরোলে নাকি ভাগ পায় বলরাম। তারপর একে একে মুহুরি, কেরানিরা সব…।’ লম্বোদরী আর কথা বলতে পারেনি, চোয়াল ঝুলে পড়েছিল, শুধু কোনওমতে বলেছিল, ‘তোরা পালা!’

কোথায় পালাবে ওরা? কীভাবে পালাবে?

আগে থেকে খবর পাঠানো ছিল। কানি, লম্বোদরী, আঙুরমণিরা যখন নিঃসাড়ে ঘুমোচ্ছে, তখন মোতিরা সন্তর্পণে বাইরে বেরিয়ে এল।

সেদিনের সেই লোকটার সঙ্গে আলাপচারিতার কথা নিস্তারিণী ছাড়া আর কাউকে বলেনি মোতি আর পুঁটিবালা। আঙুরমণি যে পাঁকে পড়ে ওদের সঙ্গে থাকছে, সেটা তার প্রতিটা কথাতেই বোঝা যায়। তার কাছে নর্তকী আর বেশ্যার কোনও পার্থক্য নেই। তাই মোতি আর কানি দুজনেই তার চোখে সমান। মুখে কিছু না বললেও কথাবার্তার ফাঁকে বেরিয়ে পড়ে তার ঘৃণা।

কিন্তু গ্রামের বধূ হলেও নিস্তারিণী বেশ উদারমনা। বুদ্ধিমতী, ধীর স্থির। আঙুরমণির মতো সহজেই উত্তেজিত হয়ে কান্না জোড়ে না। সব শুনে শুধু বলেছিল, ‘লোকটাকে কেমন দেখতে বল তো!’

কুলিলাইনের পেছনেই পচা খাল। গভীর রাত। খালের জল থমথমে, কালো। যেন নিঃশব্দ কোনো অভিশাপের ধারা। চারদিকে স্যাঁতসেঁতে কাদা। পচা পাতা। আর জলে জেগে থাকা আধডোবা গাছের শেকড়ের বীভৎস অবয়ব। হালকা কুয়াশার আস্তরণে পরিবেশ আরও রহস্যময়।

হঠাৎ গাছের ফাঁক দিয়ে যেন অজানা কোনো পশুর ছায়া সরে গেল। দূরে শেয়ালের হুক্কাহুয়া ডাক শোনা যাচ্ছে। যেন এই আঁধার রাতে ওরাই সাক্ষী।

সুরেন যেন ভোজবাজির মতো উদয় হল কোথা থেকে। মাথায় চাদরমুড়ি দেওয়া। অন্ধকারের সঙ্গে মিশে আছে। কেবল তার জ্বলজ্বলে চোখদুটো যেন জ্বলছে। সে চাপা গলায় বলল, ‘বলো, কী জানতে চাইছিলে তোমরা!’

নিস্তারিণীরা একে অন্যের দিকে তাকাল। তারপর মোতি ঢোঁক গিলে বলল, ‘সত্যিই কি পালানোর কোনও তরিকা আছে?’

সুরেন ওর দিকে তাকাল, মুখে একটা তাচ্ছিল্যের ভাব ফুটিয়ে বলল, ‘পালানোটা কঠিন নয়। কঠিন হল, পালিয়ে গিয়ে অন্য কোথাও দিনের পর দিন টিকে থাকা। আজ অবধি চা বাগান থেকে যারা চেষ্টা করেছে, এদিক-ওদিক দিয়ে সবাই পালাতে পেরেছে। কিন্তু বাঘ বলরামের লোকরা তাদের খুঁজে এনেছে আশপাশের গ্রাম থেকে। তারা না পারলে জেলার পুলিশরা নেমে পড়েছে। তারপর তাদের ফিরিয়ে এনে কী করেছে জানো?’

‘কী?’

‘টানা একদিন গাছের সঙ্গে বেঁধে পিটিয়েছে। আমাকেও পেটাত, যদি না…।’ সুরেন প্রসঙ্গ বদলাল, ‘যাক সেকথা। পালাতে গেলে জঙ্গলের পথ ধরলে চলবে না। ওরা ঠিক ধরে ফেলবে।’

‘তবে?’ নিস্তারিণী কাঁপা স্বরে বলল।

‘তোমরা সাঁতার জানো?’ সুরেন প্রশ্ন করল।

নিস্তারিণী বলল, ‘পাড়াগাঁয়ের মেয়ে, সাঁতার জানব না? দামোদর এপার ওপার করতাম।’

পুঁটিবালাও ঘাড় নাড়ল। সে-ও জানে।

‘আমি জানি না।’ মোতি দু-দিকে মাথা নাড়ল। মেটিয়াবুরুজে তার দিন কেটেছে রেওয়াজ করে, রাগ রাগিণী শিখে আর পাখোয়াজ সেতারের সঙ্গে সঙ্গত করে। সাঁতার শেখার কথা মনেও আসেনি। সেই চলও মেটিয়াবুরুজের বাইজিদের মধ্যে নেই।

সুরেন কিছুক্ষণ ভাবল। তারপর বলল, ‘আচ্ছা ভেবে দেখছি। সামনের সপ্তাহে আগে তোমরা চার্চে যাও, ওদিকটা মিটুক। আমিও একটু ভাবি।’

‘চার্চ? মানে গির্জা?’

‘হুঁ। কিছুদিন বন্ধ ছিল। এখন নতুন পাদ্রি এসেছে। আবার শুরু হবে খ্রিস্টান করা।’

নিস্তারিণী চোখ কপালে তুলল, ‘কী! আ-আমি আমার জাত খোয়াব না। মান যাক, ইজ্জত যাক, তাও ভালো। ধর্ম খোয়ালে বংশের নাম পুড়বে।’

সুরেন করুণচোখে হাসল। তারপর থেমে থেমে বলল, ‘সত্যি, তোমরা মেয়েরা এখনো সেই ধর্ম থেকে বেরোতে পারলে না, তাই না! ঠিক আছে, এখন যাও। পরে আমি আবার ডেকে নেব।’

পুঁটিবালা এতক্ষণ একটাও কথা বলেনি। হঠাৎ বলল, ‘ধর্ম বদলালে কী হয় সুরেনদা?’

অচেনা কিশোরীর মুখে ‘দাদা’ শুনে সুরেনের মুখের কিছু ভাঁজ যেন বদলে গেল। সে একটু থেমে বলল, ‘অনেক কিছু বদলে যায়, বোন। মাটি বদলালে গাছের ফলন পাল্টায় না? তেমনই ধর্ম বদলালে মানুষও বদলে যায়। আবার অন্যদিকে দেখলে, মানুষ নিজেও ধর্মকে বদলে ফেলতে পারে।’

পুঁটিবালা হয়ত কিছু বুঝল না। অস্ফুটে বিড়বিড় করল, ‘কিন্তু আমরা তো মাটি না। আমরা মানুষ।’

সুরেনের গলায় স্নেহ ঝরে পড়ল, ‘ঠিক বলেছিস বোন। কিন্তু মানুষের মনটা অনেকটাই মাটির মতো। তাকে যেমন তৈরি করা হয়, তেমনই গড়ে ওঠে। এই যেমন অনেকেই ধর্ম ধর্ম করে হেদিয়ে মরে। এই ধর্মের সংজ্ঞা প্রত্যেকের কাছে আলাদা। কেউ ভাবে, ধর্ম মানে গঙ্গা স্নান, সোমবারের উপোস। কারুর কাছে ধর্ম মানে মানুষের সেবা।’

‘মানুষ কি আল্লাহ্ না শিব যে তার সেবা করলে ধর্ম হবে?’ মোতি তীক্ষ্ণকণ্ঠে প্রশ্ন করল।

সুরেন হাসল। তারপর একটা লম্বা শ্বাস ছেড়ে বলল, ‘অনেকদিন আগে আমি একটা ছেলেকে চিনতাম। তার হাতে থাকত মোটা বইপত্র, কাঁধে ঝুলত খাকি রঙের ব্যাগ। বড় ডাক্তার হবে বলে সে গ্রাম থেকে সব ছেড়েছুড়ে পালিয়ে এসেছিল। পড়াশোনায় নিজেকে উজাড় করে দিয়েছিল। গোঁড়া রক্ষণশীল ধর্মের সংজ্ঞা তার কাছে পাল্টে গিয়েছিল। গরিবের সেবা করবে, তাদের বিনা পয়সায় চিকিৎসা করবে, এটাই ছিল তার কাছে ধর্ম।’

‘আ-আমি যদি খ্রিস্টান হই, তাহলেও কি সব পাল্টে যাবে?’ পুঁটিবালা ভয়ে ভয়ে জিগ্যেস করল।

সুরেন মাথা নাড়ল, ‘সব পাল্টাবে না। কিন্তু কিছু জিনিস হয়ত সহজ হবে। কাজ পাওয়া যাবে, পেট ভরে খাওয়া মিলবে। সেটা সাময়িক। কিন্তু তার জন্য কি তুই নিজেকে পাল্টাতে চাস? তুই যা, তা তোর অন্তরে আছে, তা যদি ঠিক থাকে, তাহলে বাইরের নাম বদলে কিছু আসে যায় না। আসল ধর্ম তো ভেতরে থাকে।’

ওরা তিনজন বিস্মিতচোখে মশার কামড় খেতে খেতে সুরেনের কথা শুনছিল। সব যে বুঝতে পারছিল তা নয়, তবে শুনতে বড় ভালো লাগছিল যেন!

নিস্তারিণী বলল, ‘তোমায় দেখে তো লেখাপড়া জানা মনে হয় গো! এই যমের দুয়ারে এলে কেমন করে?’

সুরেন হাসল, ‘লোকের কপাল পোড়ে, আমার কপাল জলে ডুবেছে।’

‘মানে?’

‘কিছু না। আজ আসি। তোমরা চোখ কান খোলা রাখো। সবকিছু বুঝিয়ে হয় না। আমি আবার ডেকে নেব’খন।’

সুরেন চলে যেতেও মোতি দাঁড়িয়ে রইল। ওর বুকের ভেতর অদ্ভুত অনুভূতি হচ্ছিল।

সুরেনের চেহারা প্রথম দেখাতে সাধারণ কুলিদের মতোই, কিন্তু একটু ভালো করে তাকালে বোঝা যায়, সে আর পাঁচটা কুলির মতো নয়। তার মুখের গড়ন মসৃণ, অথচ কঠোর জীবনযাপনের ছাপ। যেভাবে শব্দগুলোকে সাজিয়ে কথা বলছিল, এ কোনও সাধারণ মানুষ নয়।

মোতির যেন বহুযুগ পর মনে পড়ছিল মেটিয়াবুরুজের সেই তরুণ হিন্দু কলাকারকে। যাকে ও ভালোবেসে নিজের সব উজাড় করে দিয়েছিল। ওর জীবনের একমাত্র ভালোবাসা।

না। চন্দ্রনাথের সঙ্গে এই লোকটার চেহারায় কোথাও মিল নেই। কিন্তু অভিব্যক্তিতে যেন সামান্য সাদৃশ্য।

নিস্তারিণী আর পুঁটিবালা নিজের মধ্যে ফিসফিস করতে করতে হাঁটছিল। পেছনে চুপচাপ চলছিল মোতি।

চন্দ্রনাথের হাবভাবে ছিল দুর্দমনীয় ইচ্ছাশক্তি। তার চোখ দেখে মনে হত সে অনেক বড় কিছু হওয়ার স্বপ্ন দেখে। নবাব জুহুরি ছিলেন, তিনি তাই দ্রুত হিরেকে চিনেছিলেন।

ভালো করে ভেবে মোতি বুঝতে পারল, এই সুরেন নামের লোকটাও হয়ত কোনও অতীতে আকাশচুম্বী স্বপ্ন দেখেছিল। আজ সেই স্বপ্ন ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে।

কিন্তু তার মনের গভীরে সেই স্বপ্নের ভস্মাবশেষ বোধ হয় এখনও জ্বলছে ধিকিধিকি।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *