মগ্ননারাচ – ৩

গোয়ালন্দ ঘাট থেকে জাহাজে উঠে চারদিন পর সেই জাহাজ গিয়ে ভিড়ল ধুবড়িতে। সেখান থেকে আবার নতুন জাহাজে ওঠা। ধুবড়ি থেকে প্রতিদিন বিকেলে ছাড়ে ডাক জাহাজ। আর এই ডাক জাহাজে করেই আসামে শয়ে শয়ে চালান দেওয়া হয় কুলি।

মোতি পুঁটিবালারা ওঠার কিছুপরেই জাহাজ ছেড়ে দিল। গম্ভীর গর্জনে বাষ্প বেরিয়ে এল স্টিমারের চিমনি দিয়ে। দমদম শব্দ তুলে ধোঁয়ার কুণ্ডলী পাকিয়ে আকাশে উঠল, জল কেটে এগোতে লাগল সেই অর্ণবপোত।

বিশাল ব্রহ্মপুত্র নদ, দু’পাশে মাথা উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা পাহাড়। সবুজে মোড়া, অজানা গাছপালায় ঢাকা, যেন নদী আর আকাশের মাঝে এক অপার্থিব জগৎ।

এই জাহাজটাও দোতলা। আয়তনে আরো বড়। ওপরে কুলি আর নিচে মালপত্র ও সাধারণ যাত্রীরা। আবার জাহাজের দু’পাশে ভেসে চলেছে বিশাল দুটি ফ্ল্যাট, সেগুলোও বোঝাই মালপত্রে। কখনো কখনো কুলি বেশি হয়ে গেলে তাদের সেখানেও তুলে দেওয়া হয়, জলের ওপর দুলতে দুলতে তারা জাহাজের সমান্তরালে ভেসে যায়।

সাধারণ যাত্রীরা জাহাজের মধ্যে যেখানে সেখানে যেতে পারে, কিন্তু কুলিদের এক পা-ও নড়ার উপায় নেই। তাদের চারপাশে রয়েছে পাহারাদাররা। এছাড়া রয়েছেন কুলিদের ডাক্তারবাবু।

পুরুষ কুলিরা কেউ বিড়ি টানছে, কেউবা ঘুমিয়ে পড়েছে মালপত্রের গাদায় হেলান দিয়ে। মহিলা কুলিরা এক কোণে গাদাগাদি করে বসেছে। কারও কোলে আধখোলা কাপড়ে মোড়ানো শিশু, কেউ শুকনো ফাঁকা চোখে নদীর দিকে চেয়ে আছে। পুঁটিবালা, মোতি আর ছুটকি একটা কোণের দিকে সরে এল। লম্বোদরী তাদের সঙ্গে গা ঘেঁষে বসল বটে, কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই নদীর হাওয়ায় ঘুমিয়ে পড়ল। এখন তার নাক ডাকছে ভুরভুর করে।

পুঁটিবালা নিজের শাড়িটা একটু আঁটসাঁট করে নিয়ে মোতির দিকে তাকাল। ‘মোতিদিদি, তোমার কী মনে হচ্চে? ওই শেফালি আর যমুনা বলে মেয়েমানুষদুটো আমাদের ঠকালো না তো?’

মোতি ভ্রু কুঁচকে ছুটকির দিকে তাকাতেই ছুটকি ধমকে উঠল, ‘তোকে দেখে এলাম, আর তুই এইসব আজিব বাত বলছিস পুঁটিবালা।’

পুঁটিবালা কাঁচুমাচুমুখে প্রসঙ্গ পরিবর্তন করল, ‘কী বিরাট নদী দ্যাকো! এ তো গঙ্গার চেয়েও বড় দেখছি! সমুদ্দুরের মতো লাগছে একেবারে!’

প্রৌঢ়া লম্বোদরী শুনতে পেয়ে মনে মনে হাসল। সে আসামেরই মেয়ে, বহুদিন আগে চলে গিয়েছিল কলকাতায়। মেটিয়াবুরুজে পিয়াজুকে ও নিজের মেয়ের মতো মানুষ করেছিল। নাচগান শিখিয়েছিল। কিন্তু নবাব মারা যাওয়ার পর পিয়াজু অস্থির হয়ে উঠেছিল। গানবাজনা করতে পারত না। তাই নিজের দেশ থেকে যখন পিয়াজুর ডাক এল, তার চলে আসাকে পূর্ণ সমর্থন করেছিল লম্বোদরী। বলেছিল, ‘তুই যা গা। তারপর আইসা মোরে লইয়া যাইবি।’

কিন্তু সে এল কই! নবাবের ইন্তেকাল হল, মেটিয়াবুরুজের রং বদলাল, কিন্তু পিয়াজু ফিরে এল না।

সে মেয়ের কোনও খোঁজই নেই! তাই এখন লম্বোদরী নিজেই চলেছে পিয়াজুর খোঁজে। শেফালি আর যমুনা ওকে বলেছে, পিয়াজুর চা বাগানেই ওকে নিয়ে যাবে।

এতদিন পর স্বদেশে ফিরছে বলে লম্বোদরীর মুখে পুলকের ছাপ। হালকা হেসে বলল, ‘গঙ্গার চেয়ে বড় বইকি! ব্রহ্মপুত্ররে নদী বললে ভুল হইব, এ হল রাক্ষস! কত মাইনসেরে গিলে খাইসে। এহানে আইসা ডরাইলে চলব নায় পুঁটিবালা, সামনে আরও কত কী যে দেখতি হইব!’

পুঁটিবালা মুখ ফিরিয়ে বলল, ‘মেটেব্রুজের থেকেও কি খারাপ থাকব এখানে?’

‘বলা বহুত মুশকিল আছে।’ মোতি বিড়বিড় করল, ‘ক্যা পতা! তবে আমরা তো আর কুলি নই। আমরা যাচ্ছি নাচাগানায়। মনে হয় না, খারাব হবে।’

জাহাজের সামনে থেকে ভেসে আসছে খালাসিদের নানারকম চিৎকার চেঁচামেচি।

‘ওহে! মাল ঠিক করে বাঁধো, জলে পড়লে বাঁচাবে কে?’

‘এই কুলিরা! বেশি নড়াচড়া করলে কিন্তু মাল তলিয়ে যাবে!’

আর একজন সারেঙ ধমকের স্বরে বলছে, ‘সব ঠান্ডা হয়ে বসো! বেশি গোলমাল করলে মাঝনদীতেই নামিয়ে দেব!’

ওরা চারদিকে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছিল। সব কুলিদেরই মুখে দুশ্চিন্তার ছাপ স্পষ্ট।

মোতির চোখ পড়ল ডান দিকে। একজন লোক এক কোণে বসে আছে, পায়ে মোটা লোহার শিকল বাঁধা। দু’পাশে দুই কনস্টেবল দাঁড়িয়ে পাহারা দিচ্ছে। লোকটার চোখ দুটো জ্বলজ্বল করছে, যেন সে পুরো জাহাজটাকে খেয়ে ফেলবে। মুখ থমথমে। মাঝারি গড়নের হলেও পেশিবহুল চেহারা, চামড়ার রং রোদে পোড়া তামাটে। ঘাড়টা মোটা, শিরাগুলো স্পষ্ট ফুটে আছে। হাতদুটো লম্বা আর শক্ত, মনে হচ্ছে যেন একসময় কঠোর পরিশ্রম করত বা ভয়ংকর মারপিটে দক্ষ। বুকের ওপর কিছু পুরোনো দাগ জেগে আছে।

কাঁধেও কিছু পুরনো কাটা দাগ, সম্ভবত দড়ির দাগ বা কোনো শাস্তির চিহ্ন। চোখদুটো তীক্ষ্ণ, ভিতর থেকে আগুন জ্বলছে। মনে হচ্ছে এই শিকল ছিঁড়ে ফেলতে পারলে এক মুহূর্তও এখানে বসে থাকবে না। মোটা ভ্রুজোড়া কুঁচকে আছে, যেন গভীর চিন্তায় ডুবে আছে। হাঁটু গেড়ে বসে আছে। মাঝে মাঝে লোহার শিকল টেনে দেখছে, যেন পরখ করছে কতটা মজবুত সেগুলো। গায়ে একটা ছেঁড়া ধুতি, ময়লা আর ঘামে চপচপে, অনেকদিন ধোয়া হয়নি। তার চেহারায় ভয়, হতাশা বা অনুতাপ নেই। আছে একধরনের ঠান্ডা দৃষ্টি।

মোতি পুঁটিবালার দিকে তাকাতেই দেখল, সেও লোকটার দিকে নির্নিমেষ তাকিয়ে রয়েছে। চোখাচোখি হতে পুঁটিবালা ফিসফিস করল, ‘ও লোকটা কে গা?’

‘সেটাই ভাবছিলাম। পায়ে শিকল কেন?’

লম্বোদরী ঠোঁট উল্টোল, ‘কুনু দাগি আসামি অইবো।’

‘না। গলায় দেখো, কুলির চাকতি।’ মোতি মাথা নাড়ল।

সবাই দেখল, সত্যিই তো। লোকটা কুলি বলেই মনে হচ্ছে। কিন্তু তাকে বাঁধা আছে কেন?

লম্বোদরী একটু চুপ করে থেকে বলল, ‘দুই পুলিশ পাহারা দিচ্ছে, এমনি এমনি না! পাগল হয়ে গেসে নাকি?’

মোতি সটান সামনের কনস্টেবলটার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘বাবুজি, এই লোক কে?’

কনস্টেবল কড়া চোখে তাকিয়ে বলল, ‘কুলি মাগিদের নজর দ্যাখো! তোদের জানার দরকার কী! নিজের জায়গায় গিয়ে বস।’

মোতি ফুঁসে উঠল। সে মেটিয়াবুরুজের নর্তকী, ইজ্জত দিয়ে কথা বলতে অভ্যস্ত, কথায় ইজ্জত পেতে অভ্যস্ত। এমন তুইতোকারি করার স্পর্ধা অচেনা পুলিশের হয় কী করে? সে তীক্ষ্ণসুরে বলল, ‘তমিজসে বাত কিজিয়ে জনাব। আমি কুলি নই।’

‘কুলি নোস?’ পুলিশটা অদ্ভুত মুখব্যাদান করল, ‘তবে তুই কী? সাহেবের রাঁড়?’

‘আমি বাইজি। নাচাগানা আমার কাজ। কুলিগিরি করা নয়।’ মোতি ডাঁটো গলায় আরো অনেক কিছু বলতে যাচ্ছিল, হঠাৎ কোথা থেকে এক প্রৌঢ়া এসে হেসে গড়িয়ে পড়ল, ‘আচ্ছা বেশ। তোমরা সবাই রানি। আমরা কুলি। হয়েছে? এখন চুপ করে বোসো দেখি। বেশি কথা কয়ো না। এইসব পুলিশগুলো বড় বেরসিক।’

পুলিশটা চোখ পাকাল, ‘অ্যাই ফুলমতী, তুই চুপ কর।’

‘আমি চুপ করলে তোমাদের ব্যবসা চলবে?’ ফুলমতী নামক মহিলাটি ঝংকার দিয়ে উঠল, ‘তোমরা চুপ করো। তোমাদের দারোগা আমায় দেখে সমঝে চলে, আর তোমরা কোন লাটসাহেব এলে হে? চুপ করার জন্য আমায় জাহাজে তোলা হয় না, বুঝলে?’

মোতি আর লম্বোদরী বুঝতে পারল, এই হল সে, মহিলা কুলি চালান দেওয়ার সময় জাহাজে যাকে আইনমাফিক রাখতে হয়। পুঁটিবালা সাগ্রহে বলল, ‘ও মাসিমা, আমরা কিন্তু কুলি নই। সত্যি। আমরা নাচগান করতে যাচ্ছি।’

ফুলমতী খরচোখে তাকিয়ে বলল, ‘নাচগান? সে আবার কোথায় হবে?’

‘কেন, চা বাগানে?’

ফুলমতী বড় বড় চোখ করে গালে হাত দিল, ‘ওরে দুধের বাছা রে, তোদের তাই বলে এনেছে বুঝি? উঃ, এই আড়কাঠিগুলোর বুদ্ধি বলিহারি যাই!’

মোতি বিভ্রান্তমুখে কী একটা জিগ্যেস করতে যাচ্ছিল, এমন সময় জাহাজের ডেকে শোরগোল বেঁধে গেল।

একটা খালাসি এসে হাঁক দিল, ‘এ সব কুলি! সব লোক ঠিকঠাক বইসো! নেহি তো রাতমে খানা নেহি মিলেগা!’

কী হয়েছে? সবাই উঁকিঝুঁকি মারে। কেউই কিছু বুঝতে পারে না। হঠাৎ বাঁ দিকে চোখ পড়ল। একটু দূরে ডেকের কাছে দুই রমণী চিৎকার করছে। তাদের চোখ রক্তবর্ণ, চুল এলোমেলো। গলার শির ফুলিয়ে তারা বলছে, ‘মহারানির দোহাই। বিচার করো। আমাদের ফাঁকি দিয়ে আসাম নিয়ে যাচ্চে। সাহেব, তোমার পায়ে পড়ি। বিচার করো!’

পুঁটিবালা একটু এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করতেই পাশ থেকে পাহারাদার ধমকে উঠল। ও দ্রুত জড়সড় হয়ে সরে এল। কিন্তু ততক্ষণে সিঁড়ি বেয়ে উঠে এসেছেন দুই শ্বেতাঙ্গ। ধুবড়ি থেকে এই জাহাজে উঠেছেন তাঁরা। একজন ডাক্তার আর অন্যজন সিভিল সার্জন। একে একে কুলিদের কাছে যাচ্ছেন, পরীক্ষা করছেন, ওলাওঠা, বসন্ত বা অন্য কোনও সংক্রামক রোগ নিয়ে কোনও কুলি যাচ্ছে কিনা। থাকলে মাঝপথে নোঙর করতে হবে।

দুই মহিলা এতক্ষণ পরিত্রাহী চিৎকার করছিল, এবার সাহেব দুজন এগিয়ে আসামাত্র লাফিয়ে সাহেবদের পা জড়িয়ে ধরল। পাশ থেকে পাহারাদার আর খালাসিরা টানাটানি করেও তাদের ছাড়াতে পারছে না। ফুলমতী গিয়ে তাদের পিঠে হাত বোলাচ্ছে, কিন্তু তারা সরে গিয়ে হাপুস নয়নে কাঁদছে।

মোতি দেখল, সাহেব পা ছাড়ানোর চেষ্টা করছেন, সেই পা নাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে একজন মহিলার গোটা শরীরটা ছ্যাঁচড়াচ্ছে পাটাতনে, তবু তার কোনও ভ্রূক্ষেপ নেই। হাঁউমাউ করে সে বলছে, ‘আমরা কুলি নই গো! আমরা কুলি নই। বর্ধমানের ওদিকে গাঁ আমাদের। বামুন ঘরের বউ। কলকেতায় এসেচিলুম গঙ্গাস্নান করতে! আমাদের ফাঁকি দিয়ে নিয়ে যাচ্চে গো সাহেব! বড়বাজারের ঘাটে আমার কোলের ছেলেটা একা একা পড়ে আচে!’

শ্বেতাঙ্গ সিভিল সার্জন দুর্বোধ্য ইংরেজিতে কী বলছেন, মোতি বুঝতে পারল না।

‘আ মোলো যা!’ ফুলমতী কোমরে হাত দিয়ে জিগ্যেস করল, ‘গঙ্গাস্নান করতে এসে কুলি হয়ে গেলে কী করে?’

দ্বিতীয় মহিলাটি এবার কাঁদতে কাঁদতে বলল, ‘ঘাটে খাবারের দোকান খুঁজছিলাম, একটা হিন্দুস্থানী লোক এসে বলল, খাবারের দোকান অনেক দূর, আমায় পয়সা দাও, আমি খাবার এনে দিচ্ছি। আমরা পয়সা দিলাম, সে এক ঠোঙা খাবার নিয়ে এল। তারপর আর কিচু মনে নেই। কখন রেজিস্টারি হয়েচি, কখন কুলি ডিপোতে এসেচি, কিচুই মনে করতে পারচি নে। এই জাহাজে উঠে জ্ঞান হল, শুনলুম, আমরা নাকি কুলি হয়ে গেচি। আমাদের বাচ্চাদুটো ঘাটে পড়ে রয়েচে। আমার মেয়েটা একনো বুকের দুধ খায়।’

পাশের একটা পুরুষ কুলি এবার হাত নেড়ে বলল, ‘ওসব কেউ শুনবে না। হিন্দুস্থানি লোকটা হল গিয়ে আড়কাঠি। তার গলায় কি টিনের চোঙা ঝুলছিল?’

প্রথম মহিলা বিস্ফারিতচোখে বলল, ‘হ্যাঁ।’

‘ওই চোঙাতেই তো সালু কাপড়ে তারা লাইছেন্স ঝুলিয়ে রাকে! কুলি ধরার লাইছেন্স।’

এবার মহিলার মুখ ভয়ে সাদা হয়ে গেল, ‘তারা তো আমাদের গাঁয়ে-গঞ্জে গিয়ে ফুঁসলে লোক আনে গো! আমরা বলি, জাদুকর। তারা একেনেও আচে?’

‘বাহ, তোমাদের গাঁয়ে হানা দেয়, আর কলকেতায় থাকবে না? আর কিচু করার নেই। রেজিস্টেরি যখন হয়ে গেছে, এরা যমের দুয়ার থেকেও টেনে নিয়ে আসবে।’ পুরুষ কুলি হাত নেড়ে বলল।

এবার প্রথম মহিলাটি হাঁপাতে হাঁপাতে পাগলের মতো মাথা নাড়াতে লাগল, ‘না! আমরা কিচুতেই চা বাগানে যাব না। তার চেয়ে আমাদের ফাঁসি দাও। যা খুশি করো। ওগো সাহেব, আমাদের মেরে ফেলো গো!’

গোলমাল ক্রমশই বেড়ে চলেছিল, এমন সময় ধুপধাপ শব্দে সিঁড়ি বেয়ে উঠে এল দশাসই চেহারার একখানা লোক। শাল গাছের মতো একহারা শরীর, পেশিবহুল বাহু, রোদে পোড়া তামাটে গায়ের রং, চোখদুটো ধূর্ত অথচ হিংস্র, যেন কোনও শিকারির নজর। ভারী গোঁফের ডগাগুলো কুঁচকে আছে, মোটা ঠোঁটের ফাঁকে ধরা রয়েছে থেলো হুঁকোর মুখ। লম্বা নল বেয়ে সে মাঝে মাঝে টান দিচ্ছে, আর প্রতিবার সেই টানের সঙ্গে সঙ্গে হুঁকোর ভেতর থেকে বুদবুদ ফুটে উঠছে। কাঁধের ওপর এলোমেলোভাবে ঝুলছে একটা মোটা গামছা আর ঝোলা।

সে হল কুলি সর্দার, এই জাহাজের অর্ধেক কুলিই সে আড়কাঠি মারফৎ জোগাড় করেছে। তার নাম বলরাম, তবে কুলিরা তাকে পেছনে ‘বাঘ বলরাম’ বলেই ডাকে।

বাঘ বলরাম উঠে আসার সঙ্গে সঙ্গেই চারপাশে একটা চাপা স্তব্ধতা নেমে এল। যারা একটু আগে গলা ফাটিয়ে ঝগড়া করছিল, তারাই যেন মুহূর্তের মধ্যে শান্ত হয়ে গেল। বলরাম চোখদুটো একবার ঘুরিয়ে দেখে নিল। তারপর রাগত কণ্ঠে বলল, ‘এই সব কী হচ্ছে? তামাশা? মনে আছে, কার দয়ায় কাজে এসেছ?’

বাঘ বলরামের কথার প্রতিবাদ করার সাহস কুলিদের নেই। সে শুধু শক্তিতেই নয়, বুদ্ধিতেও তুখোড়। তার এক ডাকে জাহাজের অর্ধেক মানুষ উঠে দাঁড়ায়, তার এক ইঙ্গিতে গায়ের রক্ত জল করে খাটতে বাধ্য হয় কুলিরা।

তবু ওই চিৎকার করতে থাকা মহিলাদুজনের একজন মিনমিন করল, ‘আমরা…আমাদের ওষুধ খাইয়ে নিয়ে এসেচে। আমরা কুলি কী, তাই জানি নে।’

দ্বিতীয় মহিলা ঝরঝর করে কেঁদে ফেলল, ‘আমাদের গাঁয়ে জমিজিরেত, ছেলেপুলে, স্বামী নিয়ে ভরা সংসার। আমার কর্তা পাঠশালার পণ্ডিতমশাই। উঠোনে তুলসী মঞ্চ, পাশে গোয়ালে দুটো গরু, একটার দুধ খায় আমার ছোট ছেলেটা। সকালে স্বামী পাঠশালায় যান, আমি হেঁশেলে হাঁড়ি চড়িয়ে দিই, ছেলে উঠোনে খেলে। সন্ধ্যায় প্রদীপ জ্বেলে ভাত বেড়ে দিই, কর্তা ফিরে এসে খান। ছোট ছেলেটাকে কোলে নিয়ে গল্প বলি, সে আমার গলায় মুখ গুঁজে ঘুমিয়ে পড়ে… আমাদের সুখ নেই, কিন্তু শান্তি আছে। আমি কুলি কী, তাই জানি নে গো! আমি বাড়ি যাব, আমার কর্তার কাছে, আমার ছেলেটার কাছে… আমাদের ছেড়ে দাও গো!’

মহিলার গলায় এমন কিছু ছিল, শুনতে শুনতে মোতিদের সবার চোখেই জল এসে গেল। মহিলাটির নিজেরও কণ্ঠ কাঁপছিল, বুক ধুকধুক করছিল, আর চোখের কোণে শুকনো লোনা জমছিল। সে কাঁপা কাঁপা হাতে নিজের সঙ্গিনীর বাহু চেপে ধরল, যেন তাকে ধরে রাখতে পারলেই সব ঠিক হয়ে যাবে।

মোতি জলভরা চোখে দেখছিল। এরা দুজন কি সম্পর্কে বোন?

অন্য মহিলাটিও এবার ফুঁপিয়ে উঠল, ‘আমার ছোট বাচ্চা আছে গো! দুধের মেয়েটার কাঁদতে কাঁদতে গলাটা বসে যাবে। তার বাপকে এত্তেলা দাও, আমাদের নিয়ে যেতে বলো! আমরা কুলি না, আমরা মরতে চাই না গো!’

হু-হু করে নদীর বাতাস বইছে। তাদের আর্তনাদ যেন সেই বায়ুতরঙ্গকেও কাঁপিয়ে দিচ্ছে। কিন্তু বলরামের চোখের একটা পাতাও কাঁপল না। হুঁকোর ধোঁয়া ভারী হয়ে উঠল, সে ধীরে ধীরে ঝোলা থেকে একতাড়া কাগজ বের করল। তার চোখে কোনও সহানুভূতি নেই, বরং আছে একরকম নির্লিপ্তি। সে যেন বহুবার এমন দৃশ্য দেখেছে। কান্নাকাটি, মিনতি, আর শেষে চুপ করে মেনে নেওয়া। কাগজ ওল্টাতে ওল্টাতে বলল, ‘কী নাম তোদের?’

ব্রাহ্মণ ঘরের বধূদুটি সটান ‘তুই’ সম্বোধনে একটু যেন ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল, তারপর বলল, ‘আমার নাম নিস্তারিণী দাসী। ও-ওর নাম আঙুরমণি।’

‘হুঁ। নিস্তারিণী আর আঙুরমণি দুটো নামই রেজিস্টারিতে আছে। আঙুলের টিপছাপও।’ বলরাম কাগজটা তুলে দেখাল। তারপর সুর করে করে বলল, ‘বামুন ঘরের বউ? জমিজিরেত? ছেলেপুলে? সে সব তো থাকল গাঁয়ে। দাসখতে ছাপ যখন দিয়েছিস, এখন তোরা শুধুই কুলি। ওসব ভুলে যা। এইখানে তোদের নতুন জীবন শুরু হবে! আজ রাতে দুজনেই আমার ঘরে আসবি। মনে থাকে যেন।’

নিস্তারিণী আর আঙুরমণি বিস্ফারিতচোখে কেঁদেকেটে কী বলতে যাচ্ছিল, বলরাম চিবিয়ে চিবিয়ে বলল, ‘আর একবার যদি টুঁ শব্দটি শুনি, ডেপুটি কমিশনারকে বলে ফাটকে পাঠাব। তারপর যখন বেরোবি, এই মাঝনদীর চরে পুঁতে দেব। মনে রাখিস, আমার নাম বলরাম সর্দার। চুপচাপ বসে থাক। অ্যাই ফুলমতী, এদের দ্যাখ তো!’

বলরাম কাগজটা ঝোলায় পুরে নীচে নেমে গেল। এদিক-ওদিক দাঁড়িয়ে থাকা খালাসিরা অশ্লীলচোখে নিস্তারিণী আর আঙুরমণির দিকে তাকাতে লাগল। টুকটাক কু ইঙ্গিত। ইশারা। কামিনদের চা বাগানে পৌঁছে দেওয়া অবধি এই দিনকয়েকের সুখ জাহাজের সারেঙ থেকে খালাসি, সকলে নেয়। এমনকী কোনও কোনও জাহাজে ডাক্তারও বাদ যায় না। তবে সর্দারদের কড়া নির্দেশ, জাহাজের সব কামিনদের ভোগ করা যাবে না। একটা আধটা ঠিক আছে।

মোতি হিমচোখে দেখল, ভদ্রঘরের বধূদুটোর আর্তনাদ গলাতেই চেপে গেল, শুধু বাতাসের মধ্যে মিলিয়ে গেল নীরব কান্না। ও দিশেহারা হয়ে পুঁটিবালার দিকে তাকিয়ে জোরে জোরে মাথা ঝাঁকাল, ‘নাচাগানা না ছাই, আমাদেরও কুলি বানাবে।’

‘কী করে বুঝলে দিদি?’

‘অনেক আগেই বোঝা উচিত ছিল। নাচাগানা করতে যাচ্ছি, আর সেতার তানপুরা কিচুই নিতে দিল না।’ মোতি সাদা চোখে বলল, ‘ওই শেফালি আর যমুনা হল আড়কাঠি। আমরা সবাই কুলি হব, পুঁটিবালা!’

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *