মগ্ননারাচ – ০

গভীর নিশুতি রাত। এই ঘন অরণ্যে আঁধার যেন চলমান ছায়ার মতো সবকিছুকে গ্রাস করে রেখেছে। আকাশের কালো মেঘে মাঝে মাঝে বিদ্যুতের ক্ষীণ আলো ঝলসে উঠছে। আর সেই আলোয় মুহূর্তের জন্য আলোকিত হয়ে উঠছে শাল, নিম, গর্জনের ডালপালা। গাছের গুঁড়িগুলোকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরেছে পরগাছা লতার দল। পাতার ওপর ঝিরঝিরে বৃষ্টি ঝরে চলেছে নিঃশব্দে।

দূর থেকে ভেসে আসছে বুনো হাতির ডাক। কাছেই ঝোপের মাঝে শুকনো পাতার ওপর চাপা গর্জন শোনা যাচ্ছে। হয়ত প্রকাণ্ড কোনও বাঘ। অথবা চতুর চিতা। অধীর ব্যস্ততায় শিকারের সন্ধানে ঘুরে বেড়াচ্ছে। অন্ধকারের গভীরে জ্বলতে থাকা কতগুলো চোখ বিদ্যুতের আলোয় প্রতিফলিত হয়ে আবার মিলিয়ে যাচ্ছে।

বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে ভেজা মাটির সোঁদা গন্ধ। জঙ্গলের কোণে কোথাও শেয়ালের দীর্ঘ হুক্কাহুয়া ডাক প্রতিধ্বনিত হয়ে ফিরছে, দূরে নিশাচর প্যাঁচা ডানা মেলে উড়ে যাচ্ছে নিঃসীম অন্ধকারের অতলে। হালকা বৃষ্টির ধারায় মিশে যাচ্ছে বনের উষ্ণ নিঃশ্বাস। বাতাস কখনো ভারী, কখনো নিস্তব্ধতায় মোড়া।

এ এক ছমছমে, ভয়াল সৌন্দর্য। যেখানে প্রকৃতি যেন এক বিশাল, নির্জন, রহস্যে ঘেরা রাজ্য, যার বুকে মানুষ কেবলই ক্ষণিকের অতিথি!

এভাবেই কেটে যেত গোটা রাত। পূর্বদিকে প্রতিদিনের মতো আগমন ঘটত সূর্যদেবের। হঠাৎই ছন্দপতন। সামনের পায়ে হাঁটা ক্ষীণ বনবীথিকাটির দু’পাশে যে গভীর প্রশস্ত অরণ্য, সেখানে ছোটখাটো যুদ্ধ শুরু হল।

একটা বাঘ তাড়া করেছিল একটা বুনো মোষকে। বুনো মোষেরা দলবদ্ধ প্রাণী, ছেড়ে দেওয়ার পাত্র নয়, স্বজাতির বিপদে সবাই তীব্র আস্ফালনে ঝাঁপিয়ে পড়েছে বাঘের ওপর।

আকস্মিক এই আক্রমণ বাঘ একেবারেই আশা করেনি, তার সোনালি কালো ডোরা কাটা দীর্ঘ শরীরটায় মেঘলা আকাশের চাঁদের ক্ষীণ আলো পড়ে যেন আগুনের রেখা জ্বালিয়ে দিয়েছে। তাকে চারদিক থেকে আঘাত হেনে চলেছে ছয় সাতটা বুনো মোষ। তাদের লালচে চোখে জ্বলছে ক্রোধ, গা থেকে ধোঁয়া উঠছে। যেন যুদ্ধের সূচনাতেই উত্তপ্ত হচ্ছে তাদের শরীর।

বাঘ হার মানল না, যে মোষটা ছিল তার প্রথম শিকার, তার ওপর দ্বিগুণ বেগে বিদ্যুতের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ল। কিন্তু এই ঝুঁকি আগে থেকেই আন্দাজ করেছিল শক্তিশালী পশুগুলো। চারদিক থেকে বিশাল শিং বাগিয়ে ধেয়ে এল মোষের দল। ধাক্কা সামলে নিলেও, এক মুহূর্তের জন্য পেছনে সরে গেল বাঘটা। তার চোখের দৃষ্টি ঠিকরে বেরোচ্ছে অসীম তেজ। আর অবিশ্বাস।

মোষদের দল বৃত্তাকারে ঘিরে ফেলছে বাঘটাকে। তাদের খুর মাটিতে আঘাত করছে অনবরত, ধুলো উড়ছে, বাতাসে মিশছে ভেজা কাদামাটির গন্ধ। বাঘ আবার গর্জন করল। এইবার এক লাফে উঠে পড়ল অন্য এক প্রবীণ মোষের পিঠে। ধারালো নখের আঘাতে খুবলে দিল মোটা চামড়া। কিন্তু তার আগেই আরেকটা মোষ শিং বাড়িয়ে তাকে আঘাত করতে এল। দ্রুত লাফিয়ে নেমে এল বাঘ। ঠিক তারপরই সজোরে থাবা বসাল আক্রমণকারী মোষের গলায়।

ঘটনার ঘূর্ণিতে কয়েক মুহূর্ত কেটে গেল। বাতাস ভারী হয়ে উঠল নোনতা রক্তের গন্ধে। আহত মোষের দিক থেকে অন্যরা এগিয়ে এল, শিং নামিয়ে চারপাশ থেকে আক্রমণের চেষ্টা করল। কিন্তু বাঘ জানে, একবার যদি সে মাটিতে পড়ে, তবে তার আর বাঁচার সুযোগ নেই।

বিদ্যুৎগতিতে এক লাফে নিরাপদ দূরত্বে চলে গেল সে। অন্ধকারে মিলিয়ে যাওয়ার আগে একবার হিমচোখে তাকিয়ে দেখল রক্তাক্ত যুদ্ধক্ষেত্র।

মাটিতে শুয়ে আছে তার শিকারের ক্ষতবিক্ষত দেহ, আর তার সঙ্গীরা একত্রে দাঁড়িয়ে ফুঁসছে প্রতিশোধের প্রতীক্ষায়।

বনের গভীরে বাঘের গর্জন মিলিয়ে গেল। আর বুনো মোষের দল নিজেদের সাহসী লড়াইয়ের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে থাকল। যেন অরণ্যের অন্তরালে দুর্বলদের ঐক্যের শক্তির জয়গাথা লেখা হল এই মধ্যরাতে।

কিছুক্ষণের ভয়ানক তর্জন গর্জন বন্ধ হতেই আবার সেই নিস্তব্ধতা। আর তখনই সেই শব্দহীনতার বুক চিরে ভেসে এল কারো অট্টহাসি, নাকি কান্না? এই দুর্ভেদ্য অরণ্যে মানুষ!

হঠাৎই অন্ধকার আকাশ ফেটে পড়ল ভয়ংকর শব্দে। কড় কড় কড়াৎ! বিদ্যুতের তীব্র আলো যেন এক মুহূর্তের জন্য অরণ্যের সমস্ত গোপন ক্ষতকে উন্মোচন করে ফেলল।

সেই বিদ্যুতের ঝলকে দেখা গেল, অদূরের এক বনস্পতির গুঁড়ির আড়ালে লুকিয়ে কুঁকড়ে বসে আছে এক অবয়ব।

অবয়বটি নিঃসন্দেহে মানুষের, অথচ মানবীয় কিছুই নেই তাতে।

আরো খুঁটিয়ে দেখলে বোঝা যায়, সে এক নারী। অথচ তার শরীরের কোথাও কোনও নারীত্বের পরিচয় নেই। নেই কোনও পেলবতা, নেই কোনও সুডৌল কমনীয়তা। তার পাঁজরার হাড় স্পষ্ট হয়ে ফুটে উঠেছে, যেন চামড়ার নিচে শুধু কঙ্কালের কাঠামো। চোখদুটো কোটরের অতল গভীরে তলিয়ে গেছে। চুল শণের মতো রুক্ষ, বৃষ্টিভেজা বাতাসে উড়ে উড়ে যেন ধুলো হয়ে যাবে।

পরনে শতচ্ছিন্ন একখণ্ড মলিন কাপড়, যা কোনো মতে তার বহু নির্যাতিত গোপনাঙ্গ ঢেকে রেখেছে। কিন্তু ঢেকে রাখতে পারেনি অপমানের ইতিহাস। তার নিম্নাঙ্গ থেকে ক্রমাগত ঝরে চলেছে টাটকা তাজা রক্ত। তার দু’পায়ের ফাঁক গলে ঝরতে থাকা সেই শোণিতধারা ভিজিয়ে দিচ্ছে তার ছেঁড়া কাপড়খানাকে।

মাত্র কয়েকঘণ্টা আগেই সে সন্তান প্রসব করেছিল। তারপর এতখানি দৌড়ে এসেছে। শরীরে আর এতটুকু শক্তি অবশিষ্ট নেই। ক্রমাগত রক্তক্ষরণে চোখ বুজে আসছে। তারমধ্যেই সে যেন অতিকষ্টে সোজা হয়ে বসল।

গতকাল অবধি সে ভেবেছিল, এই দুঃসহ পৃথিবীতে তার নিজেরও কিছু থাকবে। যে শরীর তার কাছে এতদিন লালসা আর অপমানের স্মারক হয়ে ছিল, আজ সেই শরীরই জন্ম দিয়েছিল একটা প্রাণ। রক্তমাখা ক্ষুদ্র শরীরটাকে যখন বুকে তুলে নিয়েছিল, তখন মনে হয়েছিল, এই প্রথমবার, সম্ভবত এই কারণেই বেঁচে থাকা যায়। একটা ছোট্ট দেহ নড়ছিল তার হাতে। সে যে কী আনন্দের!

কিন্তু সেই আনন্দের মেয়াদ ছিল কয়েক মুহূর্ত! তার চোখের সামনেই সদ্যোজাত শিশুটাকে আছড়ে ফেলা হয়েছিল একটা গাছের মোটা গুঁড়িতে। ঠিক যেভাবে ধোপারা পাথরের ওপর কাপড় পেটায়।

কচি হাড় ভাঙার শব্দ। নিষ্পাপ চোখের একবার কুঁচকে যাওয়া। সামান্য নড়াচড়া তারপর নিথর হয়ে যাওয়া…!

ভাবতে ভাবতে মেয়েটার আবার জোরে হেঁচকি শুরু হল। দম নিতে কষ্ট হচ্ছে তার। দ্রুত তা সামলাতে না সামলাতেই তার পেট গুলিয়ে যেন উঠে এল অট্টহাসি।

ভয়ানক এক শব্দের রোল উঠল অরণ্যে!

হা হা হা হা! হা হা হা হা!

মেয়েটা নিজের মনেই হাসছে। এ কি কোনো মানবীর হাসি? না কোনো অভিশপ্ত প্রেতিনীর?

বিদ্যুৎ, ঝড়, বনপোড়া ধোঁয়া সব যেন হাত মিলিয়েছে তার ওই হাসির সঙ্গে। এই জঙ্গল, এই রাত, এই পৈশাচিক পৃথিবী যেন এখন শুধুই তার কাছে তামাশার মঞ্চ।

বিদ্যুতের ঝলকানিতে তার দেহের ছায়া ক্রমশ লম্বা হয়ে উঠছে। যেন সে একা নয়, তার সঙ্গে দাঁড়িয়ে আছে আরও শত শত কঙ্কালসার, নিপীড়িত, অভিশপ্ত মানুষ। যারা যুগ যুগ ধরে শোষিত হয়েছে। তাদের সম্মিলিত অট্টহাস্য ক্রমে যেন বদলে যাচ্ছে কান্নায়। সেই কান্না, সেই আর্তনাদে বনের পশুরাও যেন দূরদূরান্ত থেকে সচকিত হয়ে উঠছে।

কয়েক মুহূর্ত মাত্র। মেয়েটি ঘষটে ঘষটে পেছনদিকে সরে গেল। এতক্ষণ সে মৃত্যুর প্রতীক্ষায় ছিল। ভেবেছিল কোনও হিংস্র বন্য জন্তুর হাতে সঁপে দেবে নিজেকে। কিন্তু আর নয়। ওই বুনো মোষগুলো তার চোখ খুলে দিয়েছে।

রক্তমাখা সেই অসহায় নশ্যাৎপ্রসূতিকা লম্বা শ্বাস নিল। ভালো করে খুঁটিয়ে দেখল, তার মধ্যকুড়ির রুগ্ন শীর্ণ দেহখানা। যেন খুঁজতে চাইল বছরকয়েক আগের সেই মেয়েটিকে। কোথায় হারিয়ে গেল সেই হাস্যোজ্জ্বল যুবতী?

চা বাগানের কত সাহেব, কত কেরানি, কত কুলি সর্দারের লোলুপ হাত তার এই শরীরটাকে খুবলেছে। নিষ্পেষিত করেছে স্তন, পেট, নিতম্ব। চলেছে লাথির পর লাথি। আঁচড়ে কামড়ে নিঃশেষ করে দিয়েছে দেহটা। আত্মাটাকে গিলে খেয়েছে। সে যেন আর মানুষ নেই, আজ সে দাঁড়িয়ে রয়েছে কালান্তক এক অশরীরী হয়ে।

কিন্তু আজকের এই রাত শুধুই নিপীড়িত হওয়ার রাত নয়। আজকের রাত বদলের রাত।

তরুণীর কঙ্কালসার শরীরটা যেন বিদ্যুতের ঝলকের মতো কেঁপে উঠল।

এতদিন সে ভেবেছিল, সে একা। কিন্তু যদি সে একা না হয়? যদি তার মতো আরো শত শত শোষিত লাঞ্ছিত অপমানিত অত্যাচারিতরা এক হয়ে দাঁড়ায়? তবে কি তারাও একদিন মানুষরূপী বাঘকে তাড়িয়ে দিতে পারবে না?

তরুণী আবার দম নিল। ক্রমাগত রক্তক্ষরণে দুর্বল হয়ে পড়ছে সে। না, কোনওমতেই আজকের রাত তার জীবনের শেষ রাত হতে পারে না। জোরে জোরে মাথা ঝাঁকাল সে।

বিদ্যুতের আলো আবারও ঝলসে উঠল।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *