৭
মরামাটিয়ার এই অরণ্য ভয়ংকর বললেও কম বলা হয়। চারপাশে ঘন গহিন বনে এই পড়ন্ত বেলাতে সূর্যের আলো পৌঁছচ্ছে না। সূর্যাস্তের পর তো কথাই নেই, চারপাশে যেন ঘুটঘুটে অন্ধকারের আধিপত্য। ঝোপঝাড়ের ফাঁকে ফাঁকে জোঁকের দল লকলকে জিহ্বা বের করে অপেক্ষা করছে কখন শরীরের উষ্ণতার স্পর্শ পাবে। মাটির নিচে কী আছে, তা জানার সুযোগ নেই। যেকোনো মুহূর্তে বেরিয়ে আসতে পারে কিলবিল করা বিষাক্ত সাপ, লুকিয়ে থাকা বিষাক্ত বিছে বা অন্য কোনো মারাত্মক কীটপতঙ্গ।
মোতি, পুঁটিবালা, লম্বোদরীদের বুক ধুকপুক করছিল। ক্লান্তির চূড়ান্তেও স্নায়ুগুলো সচকিত হয়ে উঠছিল ওদের। যত ভেতরে ঢুকছিল, ততই যেন প্রকৃতির অদ্ভুত সব আওয়াজ কানে আসছিল। শালিকের ডাকের মতো শোনালেও সেটা কোনো পাখির ডাক নয়, বনের গহিনে ঘুরে বেড়ানো অজানা জন্তুদের ফিসফাস। কোনও ঝোপ থেকে আচমকা উঠে আসছে কোনও লম্বা কানওয়ালা মরিচ রঙের বন্য খরগোশ। ছায়ার আড়াল থেকে যেন আড়ালে সরে যাচ্ছে চিতাবাঘ।
এমন পরিবেশে পা ফেললেই বুক কেঁপে ওঠে, মনে হয় যেন কেউ পেছন থেকে লক্ষ্য করছে, ঝোপের আড়ালে লুকিয়ে থেকে প্রতিটি নড়াচড়া পর্যবেক্ষণ করছে।
তবু ওরা চুপচাপ হেঁটে চলেছিল পরিশ্রান্ত দেহে। কেউ পা টেনে টেনে হাঁটছে, কারণ পেছনে ফেরার পথ নেই। কেউ জীবনের সব চাওয়া পাওয়া বিসর্জন দিয়ে এসেছে, শুধুই বেঁচে থাকার জন্য। কেউ খুঁড়িয়ে হাঁটছে। অনেকে আবার বাঁকানো কোমর সোজা করতে পারছে না। কেউ কারো দিকে তাকাচ্ছে না, তাকানোর প্রয়োজনও নেই।
আসলে কেউই তো স্বেচ্ছায় আসেনি এখানে। কেউ প্রতারণার শিকার, কেউ লোভের ফাঁদে পা দিয়ে, কেউ বা নিছক পেটের তাড়নায়। কী কাজ, কেমন মজুরি, কেমন জীবন অপেক্ষা করছে, তা কেউই জানে না। শুধু জানে, এখান থেকে পালানোর পথ নেই।
অনেকদূর সেই দুর্ভেদ্য বনবীথিকায় হাঁটা পথে এগোনোর পর বেশ কিছুটা উন্মুক্ত ক্ষেত্র দৃশ্যমান হল। অনেকটা জায়গা পরিষ্কার করে কেটে সাফ করা হয়েছে। দূরে দেখা যাচ্ছে, সবুজের সমুদ্রের মতো বিস্তৃত চা বাগান। সারি সারি ছোট ছোট চা গাছ এক অদ্ভুত শৃঙ্খলায় সাজানো, যেন কেউ পরম যত্নে তাদের একটি নির্দিষ্ট ছন্দে রোপণ করেছে। নরম উজ্জ্বল সবুজ পাতার উপরে শিশিরের কণা জমে রয়েছে, হালকা বাতাস এলেই তা কাঁপতে কাঁপতে ঝরে পড়ছে। তবে এই সুন্দর সবুজের আড়ালেই লুকিয়ে আছে নির্যাতনের ইতিহাস।
বাগানের একেবারে কেন্দ্রবিন্দুতে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে রয়েছে বড়সাহেবের বাংলো। বিশাল কাঠের দোতলা অট্টালিকা। ছাদে লাল টালি, চারপাশে সাজানো বাহারি ফুলের বাগান। বাংলোর সামনে ফোয়ারার মতো একটি জলাশয়, যেখানে ফুটে রয়েছে নীল সাদা পদ্ম। এখানে আলো ঝলমলে, সন্ধ্যা হলেই গ্যাস লাইট জ্বলে ওঠে, যেন চাঁদের আলো থেকেও উজ্জ্বল।
বাংলোর পাশেই কিছুটা দূরে ছোটসাহেবের বাংলো, ডাক্তার, ক্লার্ক, মোক্তারদের কোঠাবাড়ি। এগুলো তুলনামূলক ছোট, তবে বেশ পরিপাটি। আরেকটু দূরে চায়ের গুদাম, সর্দারদের বাসা। সবমিলিয়ে সুঠাম একটি রাজ্য যেন!
কিন্তু বড়সাহেবদের এই ঝলমলে সাম্রাজ্যের একেবারে কিনারায়, যেখানে তাদের গ্যাসবাতির আলো পৌঁছয় না, সেখানেই লুকিয়ে আছে চা বাগানের আসল চেহারা। কুলিলাইন।
বাগানের কোণ ঘেঁষে জঙ্গলের দিকে এগোলেই দেখা মেলে সেই কুলিলাইনের। সারি সারি ছোট ছোট মাটির কুঁড়েঘর, যেগুলোকে ঠিক ঘর বলা চলে না, যেন কোনওরকমে মাথা গোঁজার ঠাঁই মাত্র। বাঁশ, কাঠ আর মাটির দেয়াল দিয়ে বানানো। উপরে শুকনো খড়ের ছাউনি। বর্ষার সময় সেই ছাউনি দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ে, ভিজিয়ে দেয় ভেতরের মাটির মেঝে। প্রতিটা ঘর একেবারে গায়ে গায়ে লাগানো, যেন এখানে মানুষ নয়, গবাদিপশু রাখা হয়েছে।
এরকমই একেকটি ছোট ঘরের ভেতর গাদাগাদি করে থাকে পুরো পরিবার। স্বামী স্ত্রী, সন্তান, কখনো শ্বশুর শাশুড়িও। কেউ কেউ আবার একই ঘরে ছাগল মুরগিও রাখে, কারণ বাইরে চুরি হওয়ার ভয়। রাতে বাতাস ঢোকার জন্য কোনো জানালা নেই, ফলে ভেতরে এক দমবন্ধ করা পরিবেশ তৈরি হয়। ঘরের বাইরে বাঁশের খুঁটির সঙ্গে বাঁধা থাকে কিছু শুকনো পোশাক, আর মাটিতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে থাকে কাঠের পাত্র। কিছু কলসি। এক চিলতে চুলো। সেখানে জল গরম করার জন্য কাঠ বা শুকনো পাতা পোড়ানো হয়।
কুলিলাইনের ঠিক পেছনে রয়েছে একটা খাল। তার জল কালো সবুজ, পচা গন্ধে দম বন্ধ হয়ে আসে। শীতের সময় এই খাল একটু শুকিয়ে যায়, তখন পচা কাদার উপরে পোকামাকড়ের আস্তানা তৈরি হয়। গরমের সময় তা হয়ে ওঠে মশার প্রজননক্ষেত্র। কলের জল এখানে বিলাসিতা, তাই সবাই এই পচা জলেই স্নান করে, জামাকাপড় ধোয়, কখনো কখনো খেতেও বাধ্য হয়। এর ফলে কলেরা, ম্যালেরিয়া, টাইফয়েডের প্রকোপ লেগেই থাকে।
সকাল হতে না হতেই কুলিলাইন থেকে ভেসে আসে একসঙ্গে অনেক কণ্ঠের গুঞ্জন। নারীদের হাঁকডাক, শিশুদের কান্না, বৃদ্ধদের দীর্ঘশ্বাস। ভোর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই কুলিরা কাজে বেরিয়ে পড়ে। নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবাই সারাদিন ঝুঁকে চা পাতা তোলে, চৈত্রের প্রখর রোদে বা শ্রাবণের ঝুম বৃষ্টিতে দাঁড়িয়ে থাকতে হয় ঘণ্টার পর ঘণ্টা।
সন্ধ্যায়, ক্লান্ত কুলি কামিনরা যখন কাজ শেষ করে কুলিলাইনে ফেরে, তখন তাদের শরীরের প্রতিটি পেশিতে ব্যথা, কিন্তু বিশ্রামের সময় নেই। কেউ ঘরের বাইরে বসে জ্বালানি কাঠ কেটে রাখছে, কেউ রান্নার আয়োজন করছে, কেউ আবার ঘরের সামনের উঠোনে বসে সর্দার বা ম্যানেজারের বেত্রাঘাতের কথা বলছে। কিছু কুলি ব্যথা ভুলতে দেশী মদ খেয়ে ফেলে, তারপর সেই মদ থেকেই শুরু হয় ঝগড়া, মারামারি।
রাত গভীর হলে কুলিলাইন আর চা বাগানের সীমানার মাঝে একটা অদৃশ্য বিভাজন তৈরি হয়। এক পাশে আলো উৎসব আমোদপ্রমোদ, অন্য পাশে নিকষ কালো অন্ধকার, ক্ষুধা, যন্ত্রণা আর নিঃশব্দ অভিশাপ। চা বাগানের কুলিলাইন যেন এক জ্বলন্ত লাশকাটা ঘর, যেখানে জীবিত মানুষের দেহ পড়ে আছে।
এভাবেই মরামাটিয়া, বিষগুড়ি, নাহারকাটিয়া, লখীমপুর, ডিঘলতরাং, হাজো-র মতো অসংখ্য ছোটবড় চা বাগানে দিনের পর দিন, বছরের পর বছর কাটে। সময়ের চাকা ঘোরে, কিন্তু কুলিদের ভাগ্য বদলায় না। একেকটি প্রজন্ম হারিয়ে যায়, আর তাদের জায়গা নেয় নতুন মুখ। কুঁড়েঘরগুলো সাক্ষী থাকে শত বছরের শোষণের, চোখের জলে ভেজা ইতিহাসের।
ক্লার্কের কাছে সব কুলিদের কাগজপত্র সইসাবুদ সেরে ঘরে ঢুকতে ঢুকতে রাত ঘনিয়ে এল।
মোতি, নিস্তারিণী আর পুঁটিবালার জন্য বরাদ্দ হয়েছে একখানা ঘর। পাশের ঘরটা লম্বোদরীদের। তাই নিয়ে অভাব অভিযোগ করার মতো শারীরিক ক্ষমতাও ওদের ছিল না। দিনের পর দিন জাহাজে করে সেই কলকাতা থেকে এই মরামাটিয়ায় এসেছে, তারপর বালির রাস্তা পেরিয়ে, অবশেষে পায়ে হেঁটে চা বাগানের এই অন্ধকার কোণে পৌঁছেছে। শরীরে আর বিন্দুমাত্র শক্তি অবশিষ্ট ছিল না। অকাতরে ঘুমিয়ে পড়ল তিনজনেই।
ঘর বলতে চার হাত লম্বা, তিন হাত চওড়া, খড়ের বেড়া দিয়ে মোড়া একখানা ছোট কুঠরি। মেঝে স্যাঁতসেঁতে, এক কোণে কাঠের তক্তার ওপর পড়ে আছে তিনখানা ময়লা চাদর। এটাই ওদের বিছানা। বাইরে থেকে তালা দেওয়া হয়নি, তবে দরজাটা ভারী কাঠের, যা একবার বন্ধ হলে সহজে খোলে না। খড়ের ফাঁক দিয়ে রাতের ঠান্ডা বাতাস ঢুকছে, দূরে কোথাও শেয়াল ডাকছে।
ভোর হতে না হতেই ওদের ঘুম ভাঙল ঘণ্টাধ্বনিতে। কারা যেন ভীষণ জোরে নাগাড়ে ঘণ্টা বাজিয়ে চলেছে।
মোতির চোখ খুলতেই খানিকক্ষণ ঘোরের মধ্যে পড়ে রইল। কিছুক্ষণের জন্য ভুলে গেছিল সে কোথায় আছে। মেটিয়াবুরুজের সেই বাড়ি? নাকি ঘাটের ধারের গলির ছোট ঘর? পরমুহূর্তেই মনে পড়ল। এ তো মরামাটিয়ার চা বাগান!
ওর মুখের ঝুঁকে পড়ে কে যেন ডাকছে।
‘ওঠো। ওঠো। আর শুয়ে থাকলে রক্কে নেই!’
মোতি ধড়মড় করে উঠে বসল।
নিস্তারিণী নামের সেই ব্রাহ্মণ বধূটি। হাতমুখ নেড়ে বলছে, ‘আর কত ঘুমুবে? এবার যে সর্দার বেত হাতে ঘরে ঢুকে আসবে।’
‘কেন?’ মোতি ফ্যালফ্যাল করে তাকাল।
‘ওমা, আবার বলে কেন?’ নিস্তারিণী বড় বড় চোখে গালে হাত দিল, ‘সবাই তো কাজে বেরিয়ে গেচে, আমি ভাবলাম, বেরোনোর আগে তোমায় একবার ডেকে দেকি।’
বলতে বলতে বাইরে আবার হাঁকডাক শোনা গেল, ‘আর কে আছিস, এবার না এলে আজকের রোজ পাবি না!’
‘ওই দ্যাকো, আবার এসেচে কুলি সর্দার। চলো চলো!’ নিস্তারিণী মোতিকে সামান্য প্রস্তুত হওয়ারও সময়টুকু দিল না, হাত ধরে টেনে আনল বাইরে।
সত্যিই বাইরে কাউকে দেখা যাচ্ছে না। বাগানে হন্তদন্ত হয়ে গিয়ে পৌঁছনোমাত্র ওদের দুজনের হাতে একটা করে টুকরি ধরিয়ে দেওয়া হল। জাহাজে যে পুরুষ কুলিগুলো ওদের সঙ্গে এসেছিল, তাদের প্রায় সবারই হাতে কোদাল। তাদের সামনে যমদূতের মতো দাঁড়িয়ে রয়েছে কুলি সর্দার বাঘ বলরাম। মুখে একখানা চোঙা নিয়ে বলে চলেছে, ‘তোদের সবাইকে একটা করে জমির ভাগ বুঝিয়ে দিয়েছি। আজকের মধ্যে ওই ভাগটুকু কুপিয়ে ফেলতে হবে। বারোটার সময় খাবার ঘণ্টা বাজবে। খেয়ে এসে আবার কোপানো শুরু করবি। শেষ করতে পারলে এক রোজের হাজিরা মিলবে। শেষ করে বাড়তি জমি কোপালে ডবল হাজিরা। বোঝা গেল?’
কে কী বুঝল, তা জানা গেল না, তবে কিছু কুলির মুখ আলোকিত হয়ে উঠল। একজন আরেকজনকে ফিসফিস করল, ‘বাহ, বেশি কাম করলি বেশি ট্যাকা! ভালোই নিয়ম হইছে কিন্তু। না রে, পয়সাকড়ি মন্দ মিলব না, সাহেবদের বাগান তো!’
দ্বিতীয়জন তাচ্ছিল্যের ভঙ্গিতে বলল, ‘আরে তুই চুপ থাক! জমির পরিমাণটা দেখছস? অত বড় জমি একা হাতে কোপাইব, কহনো সহজ কাম? কম করিয়া তিন দিন লাগব! হুঁ!’
‘নিজেদের মধ্যে ফুসফুসানি বন্ধ কর!’ গর্জে উঠল বাঘ বলরাম।
সবাই অমনি চুপ। সামনে দাঁড়িয়ে থাকা একটা রোগা লম্বা ছেলে শুধু চেঁচিয়ে উঠল, ‘আমারে যে বলা হল, খাতা লেখার কাজ?’
বাঘ বলরাম যেন শুনতেই পেল না ছেলেটার কথা। সে তর্জনী তুলল, ‘কোপানো শুরু করে দে সবাই।’
ছেলেটা আবার বলল, ‘থার্ড ক্লাস অবধি পড়েছি, কায়েতের ছেলে হইয়া কুলিগিরি করতে পারব না।’
এবার বাঘ বলরাম ওর দিকে তাকাল। হিমশীতল রক্ত জল করে দেওয়া দৃষ্টি। তারপর ধীর পায়ে এগিয়ে এল, যেন শিকারের উপর ঝাঁপ দেওয়ার ঠিক আগের মুহূর্ত।
‘ওই ব্যাটা, কায়েতের ছেলে তুই? কুলিগিরি করবি না?’
ছেলেটা গলা শক্ত করতে চাইল, কিন্তু গলাটা যেন শুকিয়ে কাঠ! ‘আমারে হিসেবের কাম দিবার কথা ছিল!’
বলরাম হাসল, ঠোঁটের কোণে বাঁকা বিদ্রুপ। ‘হিসেব? ব্যাটার আবার হিসেব? তা বটে। হিসেবের কামই তোকে দিচ্ছি বটে!’
এই বলে এক ধাক্কায় ছেলেটাকে ফেলে দিল মাটিতে। তারপর তার পেট লক্ষ্য করে এমন এক লাথি মারল, ছেলেটা ককিয়ে উঠল, চোখ মুখ বুজে তলপেটটা চেপে ধরে ছটফট করে লাগল।
‘পেলি হিসেব? আরো বেশি বকবক করলে বেতের হিসেবও লাগাব, বুঝলি?’ বলরামের গলা গরগর করে উঠল।
চারপাশের সবাই নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে দেখছিল। প্রত্যেকের অভিব্যক্তি পালটে যাচ্ছিল দ্রুত। মোতি টুকরিতে চা পাতা ভরবে কী, হতবাকচোখে স্থবির হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এ কোথায় এসে পড়ল ও!
পুঁটিবালা ফিসফিস করল, ‘ও দিদি, এ যে সাক্ষাৎ নরক গো!’
নরক কী, তা স্বল্প বাংলাজ্ঞানে জানে না মোতি। ও দ্রুত মাথা নাড়ল, ‘নেহি। এ হল জাহান্নাম!’
তবে ওদের হতবাক হওয়ার যে সবে শুরু, তা যত সময় এগোতে লাগল, টের পেল। এখানে কোনও বাছবিচার নেই, কুলি সর্দার থেকে শুরু করে ছোটসাহেব বড়সাহেব বেমালুম কামিনদের শারীরিক নিগ্রহ করে থাকে। আঙুরমণি দুপুরে কিছুতেই ভাত খেতে চাইছিল না। কারণ জিগ্যেস করলে বলছিল, ‘সব কুলিরা যেকেনে খাচ্চে, সেকেন আমি কেমন করে খাব। আমি যে বামুন, আমার জাত, কুল সব যাবে!’
তাকে দু-একবার খাওয়ার আদেশ দেওয়া হল, কিন্তু সে কর্ণপাত না করতে খবর পেয়ে চলে এলেন ছোটসাহেব।
মরামাটিয়া চা বাগানের ছোটসাহেবের নাম পিটার। জাতিতে স্কটিশ। বয়স খুব বেশি নয়, তিরিশ পেরিয়েছে কি পেরোয়নি। তবু তাঁর দাপটে বাগানের মাটি পর্যন্ত কেঁপে ওঠে। তাঁর নারীলোলুপতার কথা বাগান তো বটেই, গোটা আসামেই সুবিদিত। বাগানের বড়সাহেব ফিলিপ পঞ্চাশ ছুঁই ছুঁই। তাঁর আবার অন্য ব্যারাম। সেকথা পরে বলা যাবে নাহয়।
পিটার লম্বা, ছিপছিপে গড়নের মানুষ। হাঁটুর ওপরে ওঠা ধুলোমাখা খাকি শর্টস, সাদা হাফহাতা শার্টের বোতাম গলা পর্যন্ত লাগানো, কোমরে চামড়ার বেল্ট। মরামাটিয়ার জোঁকদের হাত থেকে রেহাই পেতে সর্বক্ষণ মোটা মোজা আর হাঁটু অবধি কালো গামবুট পরে ঘোড়ায় চড়েন। হাঁটেন। মাথায় সাদা রোদচশমা, চোখের ঠিক ওপরে বসানো কড়া কিনারের ফেল্ট হ্যাট, যেন দুপুরের চড়া রোদ চোখে না লাগে। ঘোড়া থেকে লাফিয়ে নেমে হাতের চামড়ার চাবুকখানা বাতাসে দু’বার দুলিয়ে তিনি জড়ানো ইংরেজিতে বললেন, ‘কী হয়েছে?’
ছোটসাহেবের সঙ্গে আসা এদেশীয় ওভারসিয়ার আধা বাংলা আধা ইংরেজিতে বললেন, ‘শি ইজ বামুন ওম্যান, স্যার! শি উইল নট ইট উইথ অল।’
‘হোয়াই? হোয়াটস্ দ্য প্রবলেম?’
বয়স্ক ওভারসিয়ার আমতা আমতা করছিলেন। তারপর ভেবেচিন্তে বললেন, ‘হার জাত উইল বি গন, স্যার!’
‘হোয়াট ইজ জাত?’ ছোটসাহেব তাঁর তীক্ষ্ণ নাকটা কুঁচকোলেন, ‘ইউ টেল দেম। আ কুলি হ্যাজ নো জাত। কুলি ইজ কুলি।’
বয়স্ক ওভারসিয়ার কিছু বলতে যাচ্ছিলেন, তার আগেই ছোটসাহেব বাঘ বলরামকে ইশারা করলেন।
এই ইঙ্গিত বলরামের চেনা। সে চোঙা মুখে বলল, ‘নতুন যে কামিনরা কাল এসেছ, সব সার দিয়ে দাঁড়াও-ও-ও!’
দূরে পুরনো কুলিরা কাজ করছে। পুরুষরা ক্যানাল খুঁড়ছে। খোঁড়া মাটি ঝুড়িতে ভরলে কামিনরা সেই ঝুড়ি মাথায় তুলে ক্যানালের ওপাশে ফেলে আসছে। তারা যন্ত্রের মতোই কাজ করছিল। হঠাৎ বলরামের আদেশ দূর থেকে ভেসে আসতে অজান্তেই তাদের হাতে ধরা ঝুড়িগুলো বুকের সামনে আড়াল হয়ে গেল।
মোতি, পুঁটিবালা, নিস্তারিণী, আঙুরমণি, লম্বোদরীরা সব সার দিয়ে দাঁড়াল। দুপুরের খাঁ-খাঁ রোদে শরীর ঝলসে যাচ্ছে। মাথার তালুতে যেন আগুন ধরে গেছে। কেউ চোখ নামিয়ে রেখেছে। কেউ আবার কাপড়ের খুঁটের প্রান্ত টেনে শরীর ঢাকার বৃথা চেষ্টা করছে।
ছোটসাহেব পিটার ধীর পায়ে একে একে সবার সামনে গিয়ে দাঁড়াচ্ছেন। তাঁর তীক্ষ্ণ দৃষ্টি কামিনদের শরীর জরিপ করে চলেছে আপাদমস্তক। কোথাও থেমে থাকছে। কোথাও হাড়সর্বস্বতায় বিরক্ত হয়ে দ্রুত সরছে।
পুঁটিবালার বুকের ভেতর হাতুড়ি পিটছিল যেন কেউ। আঙুরমণি আঁচলের ছায়ায় নিজেকে লুকোতে চাইছে, অথচ বেশ টের পাচ্ছে, পিটারসাহেবের নজর কাপড়ের বাধা গলিয়ে গভীরে পৌঁছে যাচ্ছে অবলীলায়।
মোতি নিঃশ্বাস বন্ধ করে দাঁড়িয়ে আছে, যেন নিজের অস্তিত্ব মুছে ফেলতে চায়।
জুতোর মসমস শব্দ এসে থেমে গেল মোতির কিছু আগে। নিস্তারিণীর সামনে। ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি ফুটিয়ে ছোটসাহেব বললেন, ‘হোয়াট ইজ ইয়োর নেইম?’
নিস্তারিণী বিবর্ণচোখে তাকাল বাঘ বলরামের দিকে। বলরাম বলল, ‘তোর নাম কী হুজুর শুধোচ্ছেন।’
‘নি-নি-নিস্তারিণী দাসী। নিবাস বর্ধমান।’
ছোটসাহেব চুপচাপ নিরীক্ষণ করলেন। নিস্তারিণীর ঢলোঢলো লাবণ্যমাখা দেহ। বাংলার পল্লীগ্রামের বধূ। গায়ের রং হালকা শ্যামলা। মাথায় একঢাল চুল এখন অগোছালো হয়ে রয়েছে। সীমন্তে টকটক করছে রক্তিম সিঁদুর। গলায় কালো পুঁতির মালা। আদুল গায়ে জড়ানো মলিন কাপড়। সংকোচে বারবার আঁচল টানছে। শরীরের ভাঁজ নতুন মাতৃত্বের চিহ্ন বহন করছে। চোখে একরাশ অনিশ্চয়তা আর ভীরুতা।
কয়েক মুহূর্ত নিশ্চল রইলেন ছোটসাহেব। তারপর চোখ সরে গেল অন্য মেয়েদের দিকে। ফতেমা। রোশনারা। কানি। পুঁটিবালা।
কানি মেটিয়াবুরুজের অভিজ্ঞ বারবনিতা, চোখাচোখি হতেই সে বুকের কাঁচুলি আলগোছে সরিয়ে নীরবে ইশারা করল। অতিপরিচিত সেই আহ্বান।
ছোটসাহেবের চোখদুটো জ্বলে উঠল। মনে পুলক।
এর আগের লটে যে কামিনগুলো এসেছিল, সব হাড্ডিসার, শরীরের মেদের বালাই ছিল না। এবারে তাই পরিষ্কার হুকুম দেওয়া ছিল, ভালো দেখে বেছে আনতে। বলরাম লোকটা কাজের আছে। এবার ওর বখশিশ বাড়িয়ে দিতে হবে।
ছোটসাহেব চোখ ফিরিয়ে ঘোড়ার দিকে ফিরে গেলেন। ঘোড়ার পিঠে ওঠার আগে বাঘ বলরামের দিকে তাকিয়ে গর্জন করে উঠলেন, ‘টেল দেম টু স্টার্ট ওয়ার্ক। জলদি!’
