৫
অনেক ঘাট পেরিয়ে জাহাজ যখন মাকড়িপুর ঘাটে ভিড়ল, তখন বেলা দ্বিপ্রহর। জাহাজঘাট ভিড়ে ভিড়। আজ এখানে মরামাটিয়া আর বিষগুড়ি চা বাগানের কুলিরা নামবে। দুই চা বাগান থেকেই দু’জন করে চাপরাশি আর দু’জন করে মুহুরি এসে দাঁড়িয়ে আছে। জাহাজের ডাক্তার আর সিভিল সার্জেন মহাব্যস্ত, তাদের পাশে হাতজোড় করে দাঁড়িয়ে কাগজপত্র বুঝে নিচ্ছে কুলিসর্দার বলরাম আর মজু।
এই দু’জনই বছরভর মরামাটিয়া আর বিষগুড়ি চা বাগানে কুলি চালান দিয়ে থাকে। বাঘ বলরামের মতো মজুর পুরো নাম আবদুল মজিদ, লোকের মুখে মুখে সে হয়ে গেছে মজু সর্দার।
স্টিমারের কুলি এজেন্ট দাঁড়িয়ে রয়েছে। মুহুরিরা থেকে থেকে হুইসল বাজাচ্ছে। একেকজন করে কুলি জাহাজ থেকে হস্তান্তর করা হচ্ছে বাগানের চাপরাশির কাছে, সঙ্গে তার এগ্রিমেন্টের কাগজ। মরামাটিয়া আর বিষগুড়ি—দুই বাগানের জন্য একশো করে কুলি। বকশিশের বখরা বাঘ বলরাম আর মজু সর্দারের আধা-আধি।
নিস্তারিণী আর আঙুরমণি উদাস চোখে ঘোমটা টেনে মাটিতেই বসে আছে। কাল রাতে বাঘ বলরাম তার ঘরে যেতে বললেও শেষমেশ ফুলমতী তা রুখেছিল। বলেছিল, আগে কবে নাকি এই নিয়ে খুব ঝামেলা হয়েছে। জাহাজে এইসব চলবে না। তোমরা বাগানে গিয়ে যা খুশি করো।
ওদের দুজনের বুকে দ্রিমি দ্রিমি শব্দ হচ্ছে। সত্যিই কি নিজেদের মান ইজ্জত সব দিয়ে দিতে হবে চা বাগানে গিয়ে?
মোতি, পুঁটিবালা, লম্বোদরী এদেরকে সার দিয়ে দাঁড় করানো হয়েছে মরামাটিয়া বাগিচায় যাওয়ার লাইনে। লম্বোদরী অনেক খুঁজেও শেফালি আর যমুনার কোনও হদিশ পায়নি। এদিকে তারা ওকে স্পষ্ট বলেছিল, মাকড়িপুর ঘাটে নেমে পিয়াজুর নাম বললেই তারা লম্বোদরীকে সেই বাগানে নিয়ে যাবে।
আকুলচোখে লম্বোদরী যাকে পারছে তাকে শুধোচ্ছে, ‘হ্যাঁগো, পিয়াজু নামের একডা খুব সুন্দুর মাইয়া, নাচগান করে হেইডা। বিষগুঁড়ি না মরামাটিয়া, কোন বাগানে আছিল, হেইডা তুমি জানোনি? আমি অই বাগানেই যাইমু গো! মুই হেইডার মা, এতদূর হেইডার লাগিই আইছি!’
কেউ ভ্রুক্ষেপ করে না সেই কাতর আর্তিতে। জিগ্যেস করতে করতে একসময় লম্বোদরী হাঁপিয়ে যায়। ম্লান মুখে চোখ ছলছল করে।
শুধু ওর নয়, প্রত্যেকেরই চোখমুখ থমথমে। শুকনো। পাটাতনের ওপর থেকে কুলিরা এখনো গাদাগাদি করে নামছে। শরীরে ক্লান্তি আর ভয়ের ছাপ। উপরে সাহেবদের কড়া নজর, আর পাশে পাহারাদারদের চাবুকের ভয়।
হঠাৎ স্টিমার এজেন্ট ছুটকির দিকে তাকিয়ে ইশারা করল, ‘এ লেড়কি, তু উস লাইনপে যা।’
মুখ থেকে আদেশ খসার অপেক্ষা মাত্র। দুই পাহারাদার এসে তাকে টেনে নিয়ে যেতে লাগল বিষগুঁড়ি বাগানের লাইনে।
মোতি এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল। ওদের সবাইকে মরামাটিয়ায় নিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু ছুটকিকে বিষগুড়ি নিয়ে যাবে কেন? তবে কি সত্যিই ওরা নাচগান করবে, আর ছুটকিকে কুলিগিরি করাবে?
সম্বিত ফিরে পেতেই ও ধড়ফড় করে ছুটে গেল, ‘নেহি! ও হামারা সাথ হ্যায়! আমরা সবাই কলাকার! নাচগান একসাথ করব! ছুটকিকে আমাদের সাথে দাও!’
পাহারাদারদের একজন বিরক্ত মুখে তাকাল, পাশ থেকে এক চা বাগানের মুহুরি তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বলল, ‘কলাকার না ছাই! হইছস তো কুলি! যা ভাগ! বেশি বাড়াবাড়ি করলে চাবুক খাইতে হইব!’
‘ছুটকি কুলি নেহি হ্যায়।’ মোতি মরিয়া হয়ে বলল, ‘উয়োহ্ বাচ্চি হ্যায়, ছোটি হ্যায়, কাইসে কুলিকা কাম করেগা?’
যতই বাংলা অভ্যেস করুক, উত্তেজিত হলে আজও মোতির মুখ দিয়ে উর্দুমেশানো হিন্দি বুলি বেরোয়। কিন্তু ওর কথা কেউ শুনল না। ছুটকির ছোট্ট মুখটা ভয় আর আকুলতায় কুঁচকে গিয়েছে। তার চোখে জল চিকচিক করছিল, কিন্তু ভয়ে কাঁদতে পারছে না। সভয়ে তাকাচ্ছে মোতির দিকে। যেতে যেতে চেঁচিয়ে কেঁদে উঠল সে, ‘মোতিদিদি, আমায় নিয়ে যাও। আমি তোমাদের সঙ্গে নাচগান করব। কুলির কাজ করব না।’
পাশে দাঁড়িয়ে থাকা পুঁটিবালা কাঁপতে কাঁপতে বলল, ‘কিছু করো মোতিদিদি!’
লম্বোদরী এতক্ষণ চুপ ছিল। এবার কঠিন গলায় বলল, ‘তোর কি মাথা খারাপ হইসে? চুপ কর, মোতি! নইলে তোদেরও টানবে! কুলি হইলে আপনজন চেনা লাগে না, ওরা মা বেটিই বুঝে না!’
‘নেহি! ও আমার বহিন!’ মোতি মরিয়া হয়ে ছুটকির হাত ধরে টান দিতে গেল।
আর ঠিক তখনই পাহারাদারদের একজন মোতির গালে এসে সটান একটা চড় বসিয়ে দিল।
‘চুপ শালি! বেশি কথা বললে তোকে এই নদীর চরেই পুঁতে দেব!’
চড়ের প্রাবল্যে মোতি পড়ে গেল। মুখের একপাশে লাল দাগ বসে গেল। শারীরিক আঘাতের চেয়েও এই অপ্রত্যাশিত বিস্ময় ওকে মূক করে দিল।
অন্য পাহারাদারটা সরস গলায় বলল, ‘আড়কাঠি মাগিগুলো তো খুব সরেস, এই রন্ডিগুলোকে এইসব গুপি দিয়ে পাঠিয়েছে! ওরে, এখানে সবাই তোরা কুলি। নাচাগানা সব হাওয়া! বুঝলি?’
পুঁটিবালা, লম্বোদরী, ফতেমা সবাই স্তব্ধবাক। শুধু জাহাজের সেই নিস্তারিণী নামের ব্রাহ্মণবধূটি ঘোমটা খুলে রুদ্ধস্বরে বলল, ‘তা এরা যখন দিদি-বোন, এক বাগানেই রাখো না গো বাবু!’
রসিকতা করা পাহারাদারটা এবার নিস্তারিণীর কথা বলার ঢং কে নকল করে সুর করে বলল, ‘ওরে ঠাকরুনদিদি এলেন রে! আমাদের কি দিদি-বোন, দাদাভাই, ভাতার-মাগ দেখলে চলবে? কোনও বাগানের বড়সায়েব কচি ফুল চায়, কোনও সায়েব পাকা ফল চায়, সেটা দেখতে হবে না? সাহেবদের আবার নানান ধাত! কেউ কচি আম চাখতে চায়, কেউ পাকা জাম। কেউ গোবরে ধোয়া তুলসীপাতা চায়, কেউ চায় পাকা কলা! কেউ আবার দুটোই চাখে! যা যা বেশি বাড়াবাড়ি করিস নে, নইলে কোন বাগানের কোন কোণে তোর ঠাঁই হবে, তা নিজেও বুঝবি নে, আর খোঁজার লোকও পাবি নে!’
মোতির মাথাটা ঝিমঝিম করছিল। টলতে টলতে ও উঠে দাঁড়াল।
গিণতি হয়ে গিয়েছিল। বিষগুড়ি চা বাগানের চাপরাশিরা একশো কুলিকে নিয়ে হাঁটা লাগল। অনেক দূর পথ। সন্ধে হয়ে যাবে পৌঁছতে।
ছুটকি ওর হাতটা নাড়াচ্ছিল। চোখ দিয়ে ক্রমাগত জল ঝরছিল।
মোতির মুখ থমথমে, চোখ শুকনো। ও শুধু দাঁড়িয়ে রইল। ছুটকি ওর মায়ের পেটের বোন নয়। কিন্তু তার চেয়েও বেশি। সবাই মোতিকে ছেড়ে চলে গেছে। ছুটকি যায়নি।
আর কি কোনদিন ওর সঙ্গে দেখা হবে?
উত্তেজনাপূর্ণ দৃশ্যগুলো পুরুষ কুলিরা এতক্ষণ থ’ হয়ে দেখছিল। নাটকের যবনিকা পতনে হতাশ হয়ে নিজেদের মধ্যে বলাবলি শুরু করল।
‘এই মাইয়াডা রে দেখ, মুখে বড় সাহস! কিন্তু তাতে কুনো কাম হইব?’
‘হ, কুলি হইলেই আর মানুষ নাই! কথা কওনেরও দাপট নাই!’
‘ছোট মাইয়াডা কাঁদতেছে। কিন্তু এইখানে কান্নার দাম আছে নাকি?’
‘চুপ করগা! বেশি বাড়াবাড়ি করলে আমাগোও সেই লাইনে ধইরা নিয়া যাবে!’
জাহাজঘাট অনেকটা ফাঁকা হয়ে গেল। নদীর বাতাসে এখনো ভেসে চলেছে কাঁচা কাঠ আর মানুষের ঘামের গন্ধ। জলতরঙ্গের একটানা কলরোলের মাঝে হুইসলের শব্দ যেন কানে বড় লাগছে।
মরামাটিয়া চা বাগানের মুহুরিরা এবার বাঁশি বাজিয়ে কুলিদের হাঁটতে ইশারা করল। কেউ ধীর পায়ে এগোচ্ছে। কেউ হোঁচট খাচ্ছে। কেউ তাকিয়ে দেখছে বিষগুড়ির দিকে চলে যাওয়া সঙ্গীদের শেষবারের মতো।
পাহারাদাররা একেকবার চাবুক ঠুকছিল হাতে। যেন মনে করিয়ে দিচ্ছে, এখানে মন কেমন করলে চলবে না, আবেগ দেখানোর জায়গা নেই। চাবুকের সপাৎ সপাৎ শব্দ শরীরের চেয়ে বেশি দাগ কেটে যাচ্ছে মনে।
মোতি পুঁটিবালা লম্বোদরী আঙুরমণিরা কেউ মুখ নিচু করে হাঁটছিল। কেউ ফিসফিস করে বলাবলি করছিল। কেউ চোখের জল চেপে রেখে পা বাড়াচ্ছিল মরামাটিয়ার দিকে।
আকাশের রঙ একটু একটু করে বদলে যাচ্ছে। সূর্যের আলো নদীর জলে ঝলমল করছে, কিন্তু সেই আলোয় উষ্ণতা নেই। রয়েছে বিষণ্ণতা, রয়েছে বন্দিত্বের ছায়া।
‘জলদি পা চালাও। জলদি! মরামাটিয়া বহত দূর হ্যায়!’
লম্বোদরী হাঁটতে হাঁটতে ধীরে ধীরে বলল, ‘আজতেগো লইগ্যা আমগোর কোনও ভাইবোনের সম্পর্ক নাই। কোনও মা মাইয়া নাই। পিয়াজুও কুলিগিরি করতাছে, আমরাও কুলিগিরি করমু! কুলির কোনও মায়া নাই, কুলির মা বাপ নাই, কুলির কাঁদনের অধিকার নাই, হাসনেরও অধিকার নাই। কুলির রক্ত লাল না, ঘামও নুনা না। সব এক রঙের, সব এক দামের। সব এক সাপের কামড় খাওয়া জীবন!’
লম্বোদরীর কণ্ঠে যেন কোনো রাগ নেই। আসামের ভূমিকন্যা হিসেবে সে যেন জানত ওদের সকলের এই অবশ্যম্ভাবী পরিণতির কথা। তবে সে এল কেন? শুধু পালিতাকন্যার দেখা পাওয়ার জন্য?
লম্বোদরী আবার বিড়বিড় করল, ‘কুলি যদি কাঁদে, চাবুক পড়ে। কুলি যদি হাসে, কপালে দাগ জোটে। কুলির ঘর নাই, আপনজন নাই, নাম ধরে কেউ ডাকে না। শুধু সংখ্যায় গোনা হয়, কন্ট্রাকে লেখা থাকে, শালবনে হারিয়ে গেলে কেউ খোঁজে না।’
মোতি কোনও কথা বলল না। দীর্ঘশ্বাস ফেলে একবার ফিরে তাকাল। পিছনে পড়ে রয়েছে নদী, সামনে অনিশ্চিত পথ। ওর হঠাৎ চোখ পড়ল একটা মানুষের দিকে। তার পায়ে শেকল। শেকল পরানো অবস্থাতেই সে টলে টলে হাঁটছে। পুলিশের ডিউটি শেষ, ফিরে গেছে তারা। এখন তার দু’পাশে কড়া চোখে হাঁটছে পাহারাদাররা।
জাহাজের সেই কয়েদি লোকটা! সে মরামাটিয়ায় যাচ্ছে কেন?
মোতি কিছুই বুঝতে পারে না। পাশে লম্বোদরী নিজের মনে বকে যেতে থাকে। একটা কথাই বারবার এসে ঝাপটা মারতে থাকে মোতির কানে।
‘আজ থেইকা আমাগো আর মানুষ ধরা হইবো না রে, আমরা হইলাম খালি একটা করে সংখ্যা।’
