২৩
রেলের বগিতে কুঁজো হয়ে মাথায় ঘোমটা টেনে বসে আছে ভুবনমণি। চারপাশে লোকজনের কোলাহল। কেউ ঝিমোচ্ছে। কেউ গল্প করছে। তবে সকলেরই নজর কিছুক্ষণ পরপর এই বিধবা তরুণীর ওপর পড়ছে। এভাবে হিন্দু বিধবা একাকী রেলগাড়িতে করে কোথাও যাচ্ছে, তাও আবার বই পড়তে পড়তে, খুবই বিরল দৃশ্য। দু-একজন গায়ে পড়ে ভাব জমাতে এসেছিল, ভুবনমণি গুরুত্ব দেয়নি। বইয়ে মন দিয়েছে।
একটু আগেই একটা চিমড়েমার্কা বয়স্ক লোক বিনা অনুমতিতে ওর পাশে এসে বসে গম্ভীর গলায় বলেছে, ‘হরি হরি! কী দিনকাল এল! মেয়েরাও আজকাল একলা বেরিয়ে পড়ছে। তা কোথায় যাওয়া হচ্ছে?’
ভুবনমণি প্রথমে চুপ করে ছিল। কিন্তু লোকটার প্রশ্নের সুরে মিশে থাকা মুচকি হাসির আভাস ওর সহ্য হল না। সংক্ষেপে বলল, ‘কোথায় যাচ্ছি, সেটা আপনার জানার দরকার নেই।’
‘বাবা, দেমাক দেখো! এত রাগ কীসের? আমি তোমার মঙ্গল চাই বলে শুধোচ্ছি।’
‘আমার মঙ্গল আমি নিজেই দেখতে পারি। আপনি আপনার জায়গায় গিয়ে বসুন।’
লোকটা অদ্ভুত মুখচোখ করতে করতে সরে গিয়েছিল। কিন্তু তার বিদ্বেষী দৃষ্টি যেন বগিতে ঘুরে বেড়াচ্ছিল। নিজের চেয়ারে গিয়ে সে ফিসফিস করে কী বলল বাকিদের, অন্যরা অশ্লীলভাবে হেসে উঠল।
ভুবনমণি অন্যদিকে মন ঘোরাল। ট্রেনের চাকার ঘর্ষণে একঘেয়ে খটখট আওয়াজ হচ্ছে। জানলার বাইরে ছুটে চলা দিগন্ত। দূরের গাছপালা, ফসলের মাঠ, মাটির বাড়ির আঙিনায় খেলতে থাকা ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা। সেদিকে তাকাতেই ভুবনমণির মনে পড়ে যাচ্ছে বাড়ির বাচ্চাগুলোর কথা।
ছোট্ট তাতা আর বুবু কী করছে? বিধুমুখী একা সামলাতে পারবে তো? অবশ্য সুখলতা, লোপামুদ্রা আর সুরমাও আছে। রামকুমার বিদ্যারত্ন সন্ন্যাসী হয়ে গেছেন বহুদিন হল। তাঁর নতুন নাম স্বামী রামানন্দ ভারতী। তিনি এখন হিমালয়ের দুর্গম অঞ্চলে নাকি থাকেন। তাঁর বড় মেয়েকে পাঠানো হয়েছে বোর্ডিং স্কুলে। আর ছোট মেয়ে সুরমাকে দত্তক নিয়েছেন উপেন্দ্রকিশোর আর বিধুমুখী। মা মরা পিতা হারা সুরমা যেন নতুন জীবন পেয়েছে কর্ণওয়ালিশ স্ট্রিটের এই বাড়িতে।
উপেন্দ্রকিশোর বিধুমুখীর মনে মনে ইচ্ছা, উপেন্দ্রকিশোরের কনিষ্ঠ ভাই প্রমদারঞ্জনের সঙ্গে সুরমার বিয়ে দেবেন। প্রমদারঞ্জনও বড় ভালো ছেলে। শিবপুর থেকে সদ্য পাশ করে বেরিয়েছে। দুটোতে বিয়ে হলে অনেকদিন পর বাড়িতে আনন্দের সানাই বেজে উঠবে। নতুন বউদিদি নেপাল থেকে ফিরছেন, নতুনদাদা ভালোয় ভালোয় আসাম থেকে বাড়ি এলেই প্রস্তুতি শুরু হবে।
সংসারের সুখ-দুঃখের কথা ভাবতে ভাবতে ভুবনমণির মন আনন্দে দুলে উঠল। সত্যিই সংসার কী অপার মায়া! যেন এক সূক্ষ্ম সোনালি জালের মতো, যেখানে প্রতিটি সুতো বুনে গেছে ভালোবাসা, ত্যাগ, অভিমান আর আশা নিরাশার গল্প। কখনো মনে হয়, এ এক গভীর মোহ, যা মানুষকে আবদ্ধ করে রাখে, আবার কখনো মনে হয়, এ-ই তো জীবনের আসল স্বর্গ, যেখানে প্রত্যেক অনুভূতির মূল্য আছে। যত ঝড়-ঝাপটাই আসুক, এই সংসারের মায়াবী টানেই মানুষ আবার ফিরে আসে, নতুন করে ভালোবাসতে শেখে, নতুন স্বপ্ন আঁকে, নতুন আশায় পথচলা শুরু করে।
ভুবনমণির নিজের কোনও সংসার হয়নি, হবেও না। কিন্তু তাতে ওর কোনও দুঃখ নেই। আশ্চর্য এক টানে ও যেন এই মায়ার মোহে ডুবে রয়েছে। এই আবেগময় আবর্তনে ঘুরপাক খাচ্ছে। হৃদয় যেন এক অনন্ত ভালোবাসার সংসার বয়ে বেড়াচ্ছে, যেখানে স্মৃতি, স্বপ্ন, আর একরাশ না পাওয়ার হাহাকার মিশে আছে একসঙ্গে। শুধু দাদা-বউদিদির খোঁজটা পেলেই…।
রেলগাড়ির ঝাঁকুনিতে হঠাৎ টাল সামলাতে না পেরে সামনে ঝুঁকে গেল ও। সামনের লোকটা কুৎসিত ইঙ্গিত করে চলেছে তখন থেকে। এদিকের রেলগাড়িতে কোনও ভদ্রমেয়েরা চড়ে না। থার্ড ক্লাসে তো নয়ই।
ভুবনমণি শক্ত মুখে বইয়ের দিকে চোখ ফেরাল। সত্যি বলতে কী, ওর নিজেরও যে ভয় করছে না, তা নয়। গগনচন্দ্র জানতে পারলে কিছুতেই ওকে আসতে দিতেন না। সেইজন্য দুখানা চিঠি লিখে ও বেরিয়ে এসেছে। একটা বিধুমুখীকে, অন্যটা গগনচন্দ্রকে।
দুটোরই বয়ান সংক্ষিপ্ত ও প্রায় এক।
‘নতুন বউদিদি বারবার নতুনদাদার খোঁজ আমায় রাখতে বলে গেছেন। নতুনদাদার কিছু হলে আমি মুখ দেখাতে পারব না তাঁকে। নেপাল থেকে নতুন বউদিদি ফেরার আগে যেভাবে হোক, নতুনদাদার খবর আমায় নিয়ে আসতেই হবে।’
চিঠিদুটো লিখতে গিয়ে ভুবনমণির চোখ ভিজে গিয়েছিল। কিন্তু সেটা নিজের মনকে শক্ত করতেই সাহায্য করেছিল। ভুবনমণি আবার ক্লান্তচোখ ফেরালো কামরার দিকে।
কেউ কেউ খেতে শুরু করেছে। লুচির গন্ধ নাকে এসে লাগছে। ওর নিজের জন্য খাবার বলতে শুধু একটা শুকনো মুড়ির পুঁটুলি। তাও খিদে তেমন পাচ্ছে না। একটা অদ্ভুত শূন্যতা আর ভয়ের মিশেল যেন বুকের মধ্যে কাঁপুনি ধরিয়ে দিচ্ছে।
নতুনদাদা ঠিক আছেন তো? এতদিন কেন কোনও সংবাদ নেই?
নিজেকে একটু স্বাভাবিক করার চেষ্টা করল ভুবনমণি। কিন্তু মন যে অবাধ্য। কত কী যে মনে পড়ছে। ছোটবেলার সেই প্রায় না মনে পড়া বিয়ে, গ্রামের লোকের দলবদ্ধ চিৎকার, বাল্যবিধবা হওয়ার সেই অভিশপ্ত মুহূর্ত। মশাট গ্রামের পিতৃহীন, মাতৃহীন এক মেয়ে, যার জীবনের প্রথম পরিচয়ই হয়ে গেল ‘বিধবা’। তবু সে কোল পেল দাদা-বউদিদির কাছে।
কিন্তু তারপর এল সেই দুপুর। পুকুরপাড়ে স্নান করতে গিয়েছিল সে, একা। আর সেই সুযোগে দুজন দুষ্কৃতী অত্যাচার চালাল ওর শরীরটার ওপর। তারপর কত লাঞ্ছনা। কত অপমান। দাদা-বউদিদির হাত ধরে কলকাতায় আসা। আড়কাঠির খপ্পরে পড়ে কুলিডিপোয় ওঠা। সেখান থেকে একটুর জন্য রক্ষা পেয়ে শেষমেশ কর্ণওয়ালিশ স্ট্রিটের এই বাড়ি। ওর নতুন জীবন। পড়াশুনো, ভাবতে শেখা, জানতে শেখা, আর সৌরেন্দ্র…!
শেষ নামটা মনে পড়তেই দু’চোখ ছাপিয়ে জল এল। আজও সৌরেন্দ্রর ছোঁয়া কিছু বই ও নিজের কাছে রেখে দিয়েছে সযত্নে। সেইসব বইয়ের পাতায় পাতায় সৌরেন্দ্রর নিজের হাতে লেখা কিছু নোট। অব্যক্ত অনুভূতির ইশারা লুকিয়ে আছে প্রতিটি বাক্যে। আর সেই অক্ষরগুলোর মধ্যে খুঁজে পায় ভুবনমণি ওর নিজের রুদ্ধ হৃৎপিণ্ডের স্পন্দন।
গভীর রাতে যখন চারপাশের নিস্তব্ধতা গাঢ় অন্ধকারের মতো ওকে ঘিরে ধরে, তখন বিছানার পাশে রাখা সেই পুরোনো বইগুলো বের করে আনে সে। মলিন মলাটের ভাঁজে সৌরেন্দ্রর স্পর্শ খুঁজে ফেরে ও। কখনো তর্জনী বুলিয়ে চলে পাতার ওপর, যেন সেই অক্ষরগুলো স্পর্শের মধ্যেই জীবন্ত হয়ে উঠবে।
সৌরেন্দ্রর একটা ডায়েরিও আছে ওর কাছে। সেখানে মেডিকেল কলেজের ক্লাস, নির্ভীক নারী পত্রিকার কাজকর্ম, সহবাস সম্মতি নিয়ে আন্দোলন ছাড়াও এক নির্জন রাতে ভুবনমণি আবিষ্কার করেছিল কয়েকটা বাক্য।
‘পড়াশোনা শুধু মনের ক্ষুধা মেটায় না, ভুবন। তোমার বইয়ের ঝোঁক দেখে আমি অবাক হই। তুমি নিজের পথটা নিজেই তৈরি করে নেবে একদিন। ভুবন, তোমার মনের দুঃখের চাদরটাকে একদিন ছিঁড়ে ফেলতে হবে। আমার বিশ্বাস, তুমি পারবে। আমি তোমার পাশে হয়তো চিরকাল থাকতে পারব না, কিন্তু আমার আশীর্বাদ থাকবে সবসময়। কারণ তুমিই আমার ভুবন।’
প্রথম যেদিন লালকালিতে লেখা এই বাক্যগুলো দেখেছিল, সারারাত ঘুমোতে পারেনি। অঝোরে কেঁদেছিল।
রেলগাড়ির ঝাঁকুনির সঙ্গে দুলতে দুলতে ভুবনমণি আবার নিঃশ্বাস ফেলল। সৌরেন্দ্র যে তার জীবন থেকে চলে গিয়েছে, সেই অদৃষ্টকেও মেনে নিয়েছে।
কিন্তু ভুবনমণি জানে, সৌরেন্দ্রর ছোঁয়া শুধু ওই ডায়েরির পাতায় নেই। আছে ওর মনে, ওর আত্মায়। এই একতরফা ভালোবাসার জটিল গিঁট কখনোই খুলবে না। সৌরেন্দ্র বেঁচে থাকুক কিংবা না থাকুক, ওর ভালোবাসা রয়ে যাবে চিরকাল। আর তাই তো, কঠিন এই পথচলায় ওকে শক্তি দেয় সেই স্মৃতির ছায়া।
আজও সেইসব নোটের ওপর ভুবনমণি হাত বোলায়। অনুভব করতে চায় ওর মরুজীবনের একমাত্র প্রেমকে।
সৌরেন্দ্র হারিয়ে গেছে চিরতরে, কিন্তু ভুবনমণি তাকে হারায়নি। ওর স্মৃতির আঁচলে সৌরেন্দ্র আছে, থাকবে। জীবনের শেষদিন পর্যন্ত।
ভাবতে ভাবতে সাদা থানের খুঁটে চোখের জল মোছে ভুবনমণি। এভাবে কাঁদলে হবে না। ওকে এখন শক্ত থাকতে হবে। নতুনদাদার খোঁজ না পাওয়া পর্যন্ত কোনওভাবেই দমে গেলে চলবে না। দ্বারকানাথ আর কাদম্বিনী ওকে নতুন জীবন দিয়েছেন। তাঁদের বিপদে ও এইটুকু করবে না?
ভুবনমণি দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সন্ধ্যা নেমে এসেছে। বাইরের পৃথিবীকে একধরনের অন্ধত্বে ডুবিয়ে দিয়ে রেলগাড়িটা ছুটে চলেছে। সারাদিনের ক্লান্তিতে উদ্বেগে চোখের পাতা ভারী হয়ে আসছে। কিন্তু ওর বুকের ধুকপুকানি আরো বাড়ছে।
সমান্তরালে নিজের মনের সঙ্গে লড়াই চলছে ওর। দ্বারকানাথকে খুঁজে না পেলে কী হবে? যদি একেবারে শূন্য হাতে ফিরতে হয়? যদি নিজেই আর না ফিরতে পারে? এই ভয় তাকে অস্থির করে দিচ্ছে। তবু তার মনে হচ্ছে, কিছুতেই হেরে যাওয়া যাবে না। যেভাবে হোক, মরামাটিয়া চা বাগানের সন্ধান করতেই হবে। নতুনদাদাকে ফিরিয়ে আনতেই হবে।
ভুবনমণি জোর করে চোখ খুলল। হাত দিয়ে আঁচলের কোণটা মুঠো করে ধরল। কিছু টাকা রয়েছে সেখানে। নির্ভীক নারীর তহবিল থেকে নিয়ে এসেছে। সম্বল বলতে এইটুকুই। কিন্তু এই দিয়েই ওকে আসাম পৌঁছতে হবে।
