১২
বছরখানেকের মধ্যে কাদম্বিনী যেদিন বিলেতের জাহাজে চড়ে বসলেন, তার কিছুদিন পরেই আসামে পৌঁছলেন দ্বারকানাথ। এর আগেও তিনি আসামে এসেছেন, কিন্তু এবারে তাঁর পরিকল্পনা অনেক সুগঠিত। তাঁর পোশাক এবং ভাবভঙ্গি এখন একেবারে অন্যরকম। সাদা কোট। মাথায় টুপি। গলায় ঝোলানো কাঠের ক্রস। ঘন কাঁচাপাকা রঙের চওড়া দাড়ি আর গোঁফের পরচুলাখানা এমন নিখুঁত, পরিচিতরাও দেখলে তাঁকে চট করে চিনে উঠতে পারবে না।
দ্বারকানাথের সঙ্গে রামকুমার ভট্টাচার্যেরও আসার কথা ছিল, কিন্তু বছরখানেক আগে তাঁর জীবনে হঠাৎ ভয়ংকর দুর্যোগ ঘটে গেছে। তাঁর স্ত্রী শিশুপুত্র প্রসবের সময় মারা গেছেন। তারপর থেকে এই ঘটনা রামকুমারকে যেন আমূল বদলে দিয়েছে। আগের মতো আর ব্রাহ্মধর্মপ্রচারে তাঁর উৎসাহ নেই। আগ্রহ নেই প্রবন্ধ রচনাতেও। দিনরাত তিনি আধ্যাত্মিক বইপত্রে ডুবে থাকেন।
কাদম্বিনী যাওয়ার আগে একদিন দ্বারকানাথকে প্রশ্ন করেছিলেন, ‘বড়ঠাকুর কি আর কখনো স্বাভাবিক হবেন না?’
রামকুমার দ্বারকানাথের চেয়ে বছরআষ্টেকের বড়, দ্বারকানাথ কাদম্বিনীর ব্রাহ্মমতে বিবাহের পুরোহিতও ছিলেন তিনি। সেই সম্পর্কে কাদম্বিনী তাঁকে নিজের ভাসুরের মতো শ্রদ্ধা করেন।
দ্বারকানাথ মাথা নেড়েছিলেন, ‘বুঝতে পারছি না। রামদাদা যেন একজন অন্য মানুষ। আগে কত হইহই করতেন, আমাদের আসর মাতিয়ে রাখতেন। এখন নিজের ঘর থেকে বেরোতেই চান না।’
কাদম্বিনী বলেছিলেন, ‘সাময়িক ডিপ্রেশন থেকে হতে পারে। আমি ভালো একটা ওষুধ লিখে দিতে পারি। তাতে হয়ত অবসাদটা কাটিয়ে উঠবেন। কিংবা মেডিকেল কলেজে আমার স্যারের কাছে…।’
দ্বারকানাথ দ্রুত মাথা নেড়েছিলেন, ‘অ্যালোপ্যাথি ওষুধ রামদাদা খাবেন? তুমি কি পাগল হলে? জানো না, আয়ুর্বেদ ছাড়া উনি কিচ্ছু বিশ্বাস করেন না। তাছাড়া আজ সকালেই উনি আবার নর্মদা চলে গেছেন।’
‘কিছুদিন আগেই তো সেখান থেকে ফিরলেন!’
‘হুম। আবার রওনা দিয়েছেন। আমাকে সেদিন বলছিলেন। একমাত্র এখন ওখানেই উনি নাকি শান্তি খুঁজে পান। কোন এক সাধু আছেন। রামদাদার এমন বৈরাগ্য আগেও একবার এসেছিল। সেই যেবার মধুসূদন দত্ত মারা গেলেন।’
‘মাইকেল কি ওনার বন্ধু ছিলেন?’
‘বন্ধু নন। মাইকেলকে রামদাদা সংস্কৃত শিখিয়েছিলেন হাতে ধরে। তখন মধুসূদন থাকতেন উত্তরপাড়ার জমিদার জয়কৃষ্ণ মুখুজ্জের বাড়িতে। রামদাদার তো শ্বশুরবাড়ি ওখানেই, উনি ওঁকে পড়াতে যেতেন। ভীষণ ভালোবাসতেন। মাইকেলের মদ্যপান ছাড়ানোর অনেক চেষ্টাও করেছিলেন। পারেননি। তাই মারা যাওয়ার পর অনেকদিন খুব উদাস থাকতেন। কিন্তু তারপর ধীরে ধীরে ব্রাহ্মসমাজের কাজে ফিরেছিলেন। এবারের মতো নয়।’ দ্বারকানাথ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেছিলেন, ‘যাকগে, তোমায় একখানা কথা জানিয়ে রাখি।’
‘আমি জানি কী কথা।’ কাদম্বিনী স্থির প্রতিমার মতো তাকিয়েছিলেন, ‘ভুবনের দাদার ব্যাপারে তো?’
দ্বারকানাথ বিস্মিতচোখে তাকিয়েছিলেন স্ত্রীর দিকে। প্রথম যখন এই নারীকে তিনি দেখেছিলেন, তখন সে কিশোরী, ভাগলপুর থেকে পড়তে এসেছিল কলকাতার মেয়েদের স্কুলে। সেই আপাতগম্ভীর মেয়েটি যে কয়েকবছর পর এতটা ব্যক্তিত্বময়ী, বুদ্ধিমতী হয়ে উঠবেন, কেউ ভেবেছিল?
বিস্ময় কাটিয়ে তিনি হেসে বলেছিলেন, ‘সেদিন শিবনাথের বাড়িতে একখানা চমৎকার গল্প পড়লাম। দ্য ক্রনিক আর্গোনটস। এইচ জি ওয়েলস নামের এক নতুন ব্রিটিশ লেখকের লেখা। ডক্টর নেবোগিপেল নামের এক বিজ্ঞানী একটা অদ্ভুত যন্ত্র আবিষ্কার করেছেন, তাতে করে ভবিষ্যৎ কিংবা অতীত, যেখানে ইচ্ছে চলে যাওয়া যায়।’
‘সে আবার কী!’
‘হ্যাঁ। বেশ গল্পটা। যন্ত্রটার নাম ক্রোনোনট।’ দ্বারকানাথ হাসিমুখে তাকিয়েছিলেন, ‘ওই যন্ত্রখানা আমার কাছে থাকলে একজন ভদ্রলোককে অতীত থেকে উড়িয়ে আনতাম এখানে।’
‘কাকে?’
‘যিনি বলেছিলেন, স্ত্রীণাং ধর্মিককর্মসু, রাজকার্যেষু বা, গম্ভীরনির্ণয়েষু চ সহভাগিতাধিকারঃ নাস্তি। নারীদের কোনও ধর্মীয় কার্যকলাপে, রাজকর্মে বা গুরুতর সিদ্ধান্তে অংশগ্রহণের অধিকার নেই। তাদেরকে নাকি অনুগত রাখতে হবে।’
কাদম্বিনী জানতে চেয়েছিলেন, ‘কে বলেছিলেন, মনু?’
‘হুম। মনুস্মৃতির মতো কিছু অপভ্রংশ পড়ে মানুষ আজও বিশ্বাস করে, মেয়েমানুষের বুদ্ধি কম। আমার ইচ্ছে করে, তাদের ঘেঁটি ধরে এনে দেখাই তোমাকে। খুব কম পুরুষমানুষেরই তোমার মতো বুদ্ধি আছে, কাদম্বিনী!’
কাদম্বিনী লজ্জায় মুখ নিচু করে বসে ছিলেন। মনে মনে বোধ হয় ভাবছিলেন, এই হলেন তাঁর স্বামী। প্রকাশ্যে বা একান্তে, দ্বারকানাথ যেন কখনোই স্ত্রীর অকুণ্ঠ প্রশংসা না করে থাকতে পারেন না।
দ্বারকানাথের সবেতেই বাড়াবাড়ি। কাদম্বিনীর কি সবই ভালো? কিছুই কি খারাপ নেই নাকি!
আরক্তমুখে তিনি বলেছিলেন, ‘না না। তেমন কিছু নয়। ভুবন সেদিন জিগ্যেস করছিল আমায়। বলছিল, যদি কোনও খোঁজ দিতে পারি। আমি কী বলব বুঝতে পারলাম না। মেয়েটাকে এমন অন্ধকারে রাখাটা কি ঠিক হচ্ছে?’
দ্বারকানাথ দৃঢ়কণ্ঠে বলেছিলেন, ‘হ্যাঁ হচ্ছে। অন্ধকারে রাখতে হচ্ছে ওদের ভালোর জন্যই। সেই জাহাজে করে যারা এসেছিল, তাদের একজনকেও রাখা গেছে? সব্বাইকে মারতে মারতে ব্রিটিশ সিপাইরা ফের জাহাজে তুলেছিল। আমি যদি ওইসময়ে সুন্দরদাদাকে না সরাতাম, ওর অবস্থাও ওদের মতো হত!’
‘তা সেটা ভুবনকে জানালেই তো বেচারি এত কষ্টে থাকে না!’
‘ওর আনন্দে থাকার চেয়েও বড় কথা, সুন্দরদাদার নিরাপদ থাকা। ভুবন জানতে পারলে আবেগের আতিশয্যে যদি জানাজানি হয়ে যায়, কী হবে বুঝতে পারছ? আসামের ওই চা বাগান থেকে হিড়হিড় করে টেনে নিয়ে এসে তুলবে জাহাজে!’ দ্বারকানাথ একটু থেমে যোগ করেছিলেন, ‘একেই তাঁরা স্বামী-স্ত্রী আলাদা বাগানে রয়েছেন। কতরকম সমস্যা!’
কাদম্বিনী তারপর চুপ করে ছিলেন। আর কোনও কথা বলেননি। ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন নিজের লেখাপড়ায়। এমনিতেও তিনি প্রয়োজনের অতিরিক্ত শব্দ উচ্চারণ করেন না। তাঁদের স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক বড় অদ্ভুত। সারাদিন দুজন দুজনের কাজ নিয়ে ব্যস্ত, অথচ এক অদৃশ্য সুতো বেঁধে রেখেছে আষ্টেপৃষ্ঠে।
অতীতের কথা ভাবতে ভাবতে দ্বারকানাথ জাহাজ থেকে নেমে একটা নিঃশ্বাস ছাড়লেন। পড়াশুনো, লেখালেখি, কাজকর্ম সবই করছেন, কিন্তু মনের মধ্যে চলছে এক অদ্ভুত অস্থিরতা। কাদম্বিনী ইংল্যান্ডে পৌঁছলে তিনি একটু স্বস্তি পাবেন।
ধুবড়ির ঘাট লোকে লোকারণ্য। ভেড়ার পালের মতো সারি দিয়ে নামছে কুলিরা। পাহারাদারদের হাঁকডাক, মুহুরিদের হিসেব আর চাপরাশিদের রেজিস্টারের মাঝে কান পাতা দায়।
দ্বারকানাথ অবশ্য হোল্ডিংটা শক্ত করে ধরে ঘাটে নেমে এদিক-ওদিক তাকাতেই কাঙ্খিত মানুষটিকে দেখতে পেলেন। এবং দেখে চমকে উঠলেন।
এ কে! এই কি সেই ব্যক্তি, যাকে বছরখানেক আগে কালিকট থেকে একরকম অপহরণ করে এনেছিলেন তিনি! এই কি সেই মশাট গ্রামের কৃষ্ণসুন্দর চট্টোপাধ্যায়? ওর সুন্দরদাদা?
হ্যাঁ। চোখটা যে একই। শুধু শরীর আরো ভেঙে গেছে। চোয়াল মাংসশূন্য। গায়ের রঙ রোদে পুড়ে তামাটে।
কাছাকাছি আসতেই লোকটা ঈষৎ হেসে ঝুঁকে অভিবাদন করল, ‘আসুন পাদ্রিসাহেব। আমিই মরামাটিয়া বাগানের ওভারশিয়ার। আমার নাম নীলকণ্ঠ মহাপাত্র। আমাকেই সাহেব পাঠিয়েছেন আপনাকে নিয়ে যাওয়ার জন্য।’
দ্বারকানাথ অপাঙ্গে তাকাতেই অদূরে দাঁড়িয়ে থাকা মরামাটিয়া চা বাগানের লাঠিয়ালদের দেখতে পেলেন। তারা কুলিদের দিকে নজর রাখছিল ঠিকই, কিন্তু মাঝে-মাঝে এদিকেও তাকাচ্ছিল। তিনি খাঁটি খ্রিস্টানদের ভঙ্গিতে বুকে ক্রস আঁকলেন। তারপর বললেন, ‘গুড আফটারনুন, নীলকণ্ঠ!’
‘গুড আফটারনুন সাহেব!’
‘তোমাদের বাগানে কি গির্জা আছে?’
‘গির্জা নেই, তবে একখানা ছোট বাঁশের চ্যাপেল আছে। বড়সাহেবের ইচ্ছা, আপনি মাসে কুড়িটা করে কুলিকে খ্রিস্টান করতে পারলে মিশনারি ফান্ড থেকে টাকা জোগাড় করে সামনের বছরেই একখানা চার্চ বানিয়ে ফেলবেন আজ্ঞে!’ নীলকণ্ঠ হাসল।
‘মাসে কুড়িটা!’ দ্বারকানাথ মন্থর কণ্ঠে বললেন, ‘তাহলে কাজটা তো সহজ হবে না। কুলিদের মনের কথা তো জানতে হবে। বোঝাতে হবে তাদের।’
‘তা তো বটেই, সাহেব। কুলিদের মধ্যে যারা নতুন এসেছে, তাদের মধ্যে যদি ধর্মের আলো পৌঁছে দেওয়া যায়, তাহলে বড়সাহেব খুব খুশি হবেন।’
‘সাহেবরা তো খুব খুশি হতে চাইবেই। বড়সাহেব তো আমাকে অনেক ভরসা করেছেন।’ দ্বারকানাথ মৃদু হাসলেন, ‘আমার কাজ হবে তাদের মনে ভগবান যিশুর শান্তি ও আশীর্বাদের বাণী পৌঁছে দেওয়া। ঈশ্বরের বাণী যে শোনে, সে শান্তি পায়। তবে কষ্টের গভীরে যদি সেই বাণী পৌঁছানো না যায়, তাহলে কেমন করে তাদের মুক্তি ঘটবে?’
কুলিদের গাদাগাদি করে তোলা হচ্ছে বাগানে যাওয়ার জাহাজে। দেশীয় পাদ্রিসাহেবের জন্য আলাদা ডিঙি নৌকো দাঁড়িয়ে আছে। নীলকণ্ঠ সাবধানে দ্বারকানাথকে সেখানে তুলল।
নৌকো ঘাট থেকে কিছুটা উজানে এসে চলতে শুরু করলে দ্বারকানাথ ছই থেকে বেরিয়ে এলেন। নৌকোর অপর প্রান্তে মাঝি দাঁড় টানছে। সেদিকে আলগোছে তাকিয়ে ধীর স্বরে বললেন, ‘আমি তোমায় চিনতেই পারিনি, সুন্দরদা! এ কী চেহারা হয়েছে তোমার!’
‘খারাপ তো হবেই, দ্বারিকা! বিদেশী সাহেবদের চেয়ে আমাদের দিশী সাহেবদের অত্যাচার আরো বেশি। আমি তো তবু কুলি নই, ওভারশিয়ারের কাজ করি, তাতেই এই দশা। তাহলে কুলিদের অবস্থা একবার ভেবে দেখো!’
‘ওরা কর্মচারীদেরও পেট ভরে খেতে দেয় না?’
‘দেয়। যারা ওদের মতোই কুলিকামিনদের গরুছাগলের চোখে দেখে, ইচ্ছেমতো ভোগ করে, তাদের দেয়। সেই পথের পথিক তো আমি নই! আর তোমায় একটা কথা বলে রাখি। এখানে যা বলার বলে নাও। মাঝি আমাদের লোক। ওর নাম ভ্যাবাপদ। কিন্তু বাগানে চা পাতাগুলোরও কান আছে। সেখানে তুমি আমায় নীলকণ্ঠ বলেই ডেকো। আমি তোমায় রেভারেন্ড সাহেব বলে ডাকব।’ কৃষ্ণসুন্দর একটানা বলে কাষ্ঠ হাসলেন।
দ্বারকানাথ সামান্য মাথা নাড়লেন। তারপর চাপা স্বরে বললেন, ‘তাই হবে। আপাতত আমায় বলো, এতদিন তো এখানে সাহেব পাদ্রিরাই থাকত, হঠাৎ করে দিশীদের দিকে বাগানের মালিকদের নজর পড়ল কেন?’
‘খরচ বাঁচাতে, আবার কী!’ ফিসফিস করলেন কৃষ্ণসুন্দর, ‘সরকারের গোপন নির্দেশ, কুলিদের যত পারা যায়, খ্রিস্টান করতে হবে। তবেই বাগানগুলোকে নানা সুযোগসুবিধা দেবে। এখন সব বাগানের সাহেবরাই দেখছে, সাহেব পাদ্রিরা এলে খরচও বেশি, এদিকে তাদের কথাবার্তাও কুলিরা কিছু বুঝছে না। তার চেয়ে দিশী কনভার্ট হওয়া পাদ্রিরা এলে বাংলায়, হিন্দিতে বোঝাতে পারবে, আর তাদের পোষাও সস্তা। একূল ওকূল দু’কূলই রক্ষা। আমায় লোক দেখতে বলেছিল। আমি বলেছি, তুমি তিনবছর হল রেভারেন্ড হয়েছ। রেভারেন্ড মণিময় দত্ত। বর্ধমানের দিকে নিবাস। সেখানকারই গির্জায় খ্রিস্টান হয়েছ। দেখো, কথার নড়চড় যেন না হয়।’
‘নিশ্চিন্ত থাকো। কাজের কথা শোনো। বেঙ্গলিতে লেখা পাঠাব। প্রতি সপ্তাহে। তোমার কাজ হবে শুধু সেটাকে ঠিকমতো ডাকে পাঠানো। সঙ্গে আরো অনেক বাতিল কাগজ ঢুকিয়ে দেবে। যাতে কেউ বুঝতে না পারে।’ দ্বারকানাথ মুখের একটাও রেখা না কাঁপিয়ে নিরাসক্ত কণ্ঠে বলে যাচ্ছিলেন, ‘আর আমি ওই হামচুপামূহাফ পড়তে জানি না। তুমি গোপনে কোনও চিরকুট দিতে চাইলে আগে আমায় শিখিয়ে দিও।’
কৃষ্ণসুন্দর ঘাড় নেড়ে কিছুক্ষণ নিরুত্তর রইলেন। তারপর বললেন, ‘ভুবন কেমন আছে?’
‘ভালো আছে। এন্ট্রান্স পরীক্ষায় খুব ভালোভাবে পাশ করেছে। এবার এফ এ-তে ভর্তি হবে।’
কৃষ্ণসুন্দর বিস্মিতচোখে তাকিয়ে রইলেন। নিজের গ্রাম্য বাল্যবিধবা সহোদরাটি যে পড়াশুনো শিখছে, তা তিনি জানতেন। কিন্তু সে এন্ট্রান্স পাশ করেছে? এ যে অবিশ্বাস্য ঘটনা! অস্ফুটে বললেন, ‘আর লোপামুদ্রা?’
‘সেও পড়ছে। এন্ট্রান্সে বসবে বছরদুয়েকের মধ্যেই।’
কৃষ্ণসুন্দরের কণ্ঠস্বর রুদ্ধ হয়ে এল, ‘তোমরা না থাকলে…!’
‘থাকব নাই বা কেন? ওসব কথা বাদ দাও। বউঠানের কী খবর?’
কৃষ্ণসুন্দরের মুখটা ম্লান হয়ে গেল, ‘একবারই বিষগুঁড়ি গিয়েছিলাম, তখন দেখা হয়েছিল। ওদের বাগানেও এক দুর্বৃত্ত লম্পট সাহেব আছে, তবে সে কামিনদের ছাড়া অন্য মেয়েদের দিকে নজর দেয় না। যার বাড়িতে ও রান্না করে, সেই বড়সাহেব বয়স্ক, তোমার বউঠানকে ভালোবাসেন। কিন্তু সে যেন পাথর হয়ে গেছে। আসলে দিব্যর চলে যাওয়াটা ওকে বোবা করে দিয়েছে। তাও তো অপালার খবরটা জানে না।’
দ্বারকানাথ চুপ করে রইলেন। সত্যিই, এক জীবনে মানুষ কত শোকসন্তাপ যে পায়! এখানে আসার পর ম্যালেরিয়ায় ভুগে কৃষ্ণসুন্দরের একমাত্র পুত্র দিব্যসুন্দর মারা গেছে।
দ্বারকানাথের চোখ দেখে কৃষ্ণসুন্দরও যেন পলকে বুঝে নিলেন মনের ভাবনা। নদীর মাতাল হাওয়া কেটে ভাবনা চলল অতীত উজিয়ে! তরঙ্গ বেয়ে আসতে লাগল হাজার হাজার অনুভূতি। মায়া। মমতা। কষ্ট। দুঃখ। শোক।
সুরিনামের পারামারিবো থেকে যে একখানা ছোট জাহাজ এসে কালিকট বন্দরে ভিড়েছে, আর সেই জাহাজে যারা রয়েছে তারা যে সব চুক্তিবদ্ধ গিরমিট কুলি, এমন আশঙ্কা করে সংবাদ মুদ্রিত হয়েছিল দক্ষিণ ভারতের একটি কাগজে। মাদ্রাজের এক ব্রাহ্মসমাজের সদস্য সেই সংবাদ টেলিগ্রাম করে দ্বারকানাথের কাছে জানতে চেয়েছিলেন, লিখিত এগ্রিমেন্টের জোরে অসহায় সেই কুলিদের হয়ত দু-একদিনের মধ্যেই পুলিশ ধরে নিয়ে যাবে, এরমধ্যে কি কোনওভাবে তাদের উদ্ধার করা সম্ভব?
খবর পেয়ে একটুও বিলম্ব করেননি দ্বারকানাথ। কালিকটের কিছু স্থানীয় ব্রাহ্ম তরুণকে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। তাদের কঠোর নির্দেশ দেওয়া ছিল, কৃষ্ণসুন্দরদের যদি খুঁজে পায়, তবে দ্রুত রেলগাড়িতে চাপিয়ে হাওড়ার আসাম কুলিডিপোর অফিসে নিয়ে আসতে হবে।
ছেলেগুলোর মুখে সেই প্রস্তাব শুনে কৃষ্ণসুন্দর নাকি প্রথমে সম্মত হননি। এক বিভীষিকাময় কুলিজীবন ছেড়ে আরেক কুলিনরকে প্রবেশ কেউ স্বেচ্ছায় করে নাকি? ওখানে আখ, এখানে চা, জীবন তো সেই দাসবৃত্তিরই!
ছেলেগুলো তখন দ্বারকানাথের কথামতো বুঝিয়েছিল। আসামের কুলিডিপোয় কুলি হিসেবে নয়, কৃষ্ণসুন্দররা যাবেন কর্মচারী হিসেবে। আজ না হোক কাল, কলকাতায় থাকলে আখকোম্পানির লোক ঠিক হদিশ পেয়ে কোমরে দড়ি বেঁধে আবার জাহাজে তুলবে। তার চেয়ে কয়েকবছর আসামে কাজ করলে ধীরে ধীরে ভুলে যাবে। কেউ ভাবতেই পারবে না, সুরিনাম থেকে পালিয়ে এসে আবার কেউ আসামে যেতে পারে।
কৃষ্ণসুন্দর তখন বিভ্রান্ত মুখে জানতে চেয়েছিলেন, ‘কী কাজ করব?’
‘দ্বারিকবাবুর চেনা লোক আছে ডিপোতে। ওই রেজিস্টারিতে নাম তুলে দেবে। আপনি কুলিদের কাজের দেখভাল করবেন। আর গোপনে সেখানকার অবস্থা জানাবেন চিঠিতে।’
দ্বারকানাথ নিজেও স্বহস্তে এই কথাগুলোই লিখে পাঠিয়েছেন ছেলেগুলোর হাত দিয়ে। কৃষ্ণসুন্দর আর ব্রহ্মময়ী তখন দিশেহারা প্রায়। এতদিনের সমুদ্রপীড়ায় দিব্যসুন্দরের ক’দিন ধরেই ঘুসঘুসে জ্বর। দ্রুত তাকে ডাক্তার দেখাতেই হবে। কিন্তু এই জাহাজে থেকে তা কীভাবে সম্ভব?
অতএব রাতের অন্ধকারে নিঃসাড়ে পালাতে হল নোঙর বাঁধা জাহাজ থেকে। কালিকট থেকে মাদ্রাজ। মাদ্রাজে এক দক্ষিণ ভারতীয় চিকিৎসকের ওষুধে কিছুটা ভালো হয়ে উঠল দিব্যসুন্দর। মাদ্রাজ থেকে ট্রেনে চেপে হাওড়া। তারপর হাওড়া স্টেশনের পার্শ্ববর্তী আসাম কুলিডিপো অফিসে গিয়ে চাকরি নেওয়া। আসাম আসা।
দ্বারকানাথের নির্দেশমতো শিক্ষিত কৃষ্ণসুন্দরকে ওভারসিয়ারের কাজে আর ব্রহ্মময়ীকে পাচিকার কাজে ঢোকাতে পারলেও এক চা বাগানে সম্ভব হল না। কৃষ্ণসুন্দর চলে এলেন এই মরামাটিয়া চা বাগানে। আর ব্রহ্মময়ী দিব্যসুন্দরকে নিয়ে পা রাখলেন বিষগুঁড়িতে। দুটো দিকের পৃথিবী সম্পূর্ণ আলাদা হয়ে গেল। দিব্যসুন্দরের সেই জ্বর এখানকার স্যাঁতসেঁতে আবহাওয়ায় মশার কামড়ে ম্যালেরিয়ায় পরিণত হল, একসপ্তাহ ভুগে সে মারাও গেল। কিন্তু জন্মদাতা কৃষ্ণসুন্দরের কাছে সেই সংবাদ এসে পৌঁছল পাক্কা দু’মাস পর। চা বাগানের নিচু তলার কর্মীরাও কিছুটা কুলিরই মতো, বললেই যেখানে সেখানে যেতে পারে না। কৃষ্ণসুন্দর একদিন বড়সাহেবের তল্পিবাহক হয়ে চা বাগানের ম্যানেজারদের একটা মিটিংয়ে যেতে মুখোমুখি পড়ে গেলেন ব্রহ্মময়ীর।
ওহ! সে কী হৃদয়বিদারক ঘটনা! আজও মনে পড়লে কৃষ্ণসুন্দরের চোখ দিয়ে ঝরঝর করে অশ্রু ঝরে, ঠোঁট কাঁপে।
দিনটা ছিল বর্ষার শেষ ভাগ। মরামাটিয়া চা বাগানের নীলচে সবুজ গাছগাছালির মধ্যে দিয়ে লালচে মাটির রাস্তায় বড়সাহেবের পালকি চলছিল। পালকির পেছনে হাঁটছিলেন কৃষ্ণসুন্দর। চোখে মুখে শ্রান্তি, কিন্তু মনটা উত্তেজনায় টগবগ করে ফুটছে। কতদিন পর স্ত্রী-পুত্রের কাছাকাছি এসেছেন। একবার কি দেখা হবে? না। কারুর সামনে বোঝানো যাবে না, তাঁরা স্বামী স্ত্রী। তবু চোখে চোখে কথা তো হবে! সেটুকুই যথেষ্ট!
কৃষ্ণসুন্দর হাঁটতে হাঁটতে আকাশপাতাল ভাবছিলেন। ছেলেটার কি শরীরটা একটু মজবুত হয়েছে? দ্বারকানাথ চিঠিতে জানিয়েছেন, সুরিনামের তিনজন কুলিকে খোঁজা এখন অনেকটাই স্তিমিত। আর বছরখানেক এভাবে কাটিয়ে দিতে পারলেই ব্যস। সকলকে নিয়ে চলে যাবেন স্বগ্রামে। সেদিনের অল্প বৃষ্টি আর মাটির সোঁদা গন্ধ যেন তাকে আরও বেশি উজ্জীবিত করেছিল।
ঠিক সেইসময়ে বিষগুঁড়ি বাগানের বড়সাহেবের বাংলোর বাইরে মুখোমুখি পড়ে গেলেন ব্রহ্মময়ীর। আজও ভাবলে কেঁপে ওঠেন কৃষ্ণসুন্দর। মনে হয়, কেন দেখা হল? না হলে তো অন্তত এই দুঃসংবাদটা অবিদিতই থাকত। ক্ষতি তো হত না কিছু!
ব্রহ্মময়ী জঙ্গল থেকে রান্নার কাঠ নিয়ে আসছিলেন, চোখাচোখি হতেই যেন পাথর হয়ে গেলেন। কৃষ্ণসুন্দর দেখলেন, তাঁর স্ত্রীর দৃষ্টিতে অবিশ্বাস আর হতবাকের ছাপ। কয়েক মুহূর্ত মাত্র। তারপর সেখানে ধীরে ধীরে ফুটে উঠল ক্রূরতা।
এতবছরের সংসারে শান্ত বিচক্ষণ স্ত্রীর মুখে এই অভিব্যক্তি কখনো দেখেননি কৃষ্ণসুন্দর। ভেবেছিলেন আবেগের আতিশয্য বুঝি। চোখের ইশারায় জানতে চেয়েছিলেন। সাহেব যখন মিটিংয়ে ব্যস্ত থাকবেন, জঙ্গলের কোথাও কি দেখা করা যায়?
ব্রহ্মময়ী থমকে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তারপর অপ্রত্যাশিতভাবে সবাইকে অবাক করে দিয়ে উন্মাদিনীর মতো হেসে উঠেছিলেন। সেই হাসি ছিল বিভীষিকাময়।
বিষগুঁড়ি বাগানের কর্তারা বিব্রত চোখে একে অন্যের দিকে তাকাচ্ছিলেন।
কিন্তু ব্রহ্মময়ীর তাতে কোনও ভ্রুক্ষেপ নেই। তার সেই আকাশ কাঁপানো হাসির শব্দ যেন চারদিকে প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল। জীর্ণ শরীরখানা কাঁপছিল হাসির ঝাঁকুনিতে।
ওহ! কী অসহ্য সেই হাসি! হাসির প্রতিটি ঝলকে যেন ছলকে পড়ছিল ব্যথা। যন্ত্রণা।
কৃষ্ণসুন্দর হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন। পালকি থেকে বেরিয়ে মরামাটিয়ার বড়সাহেব হতবাকচোখে তাকাতেই বিষগুঁড়ি বাগানের এক কর্মচারী এগিয়ে এল। বিনীতমুখে বলল, ‘কিছু মনে করেন না সাহেব। ই বামনি হেন আমাগো বড়সাহেবের বাড়ি রাঁধে। রন্ধনের হাতখানা খাসা, কিন্ত প্যাটের ছেলেটা মরি যাওয়ার পরেই মাঝেমাঝে একটু খেপে উথে। আ-আপনি আহুন। অ্যাই, তুই ভেতরে যা।’
কৃষ্ণসুন্দরের কর্ণকুহরে যেন কথাগুলো পৌঁছেছিল আগুনের ফুলকির মতো। জ্বালিয়ে দিয়েছিল অন্তরাত্মা। চোখের সামনে ভেসে উঠল দিব্যসুন্দরের ছোট্ট হাসি, দুষ্টুমি ভরা চোখ। কানের মধ্যে যেন যেন ঝিঁঝিপোকার ডাক। তালা লেগে যাওয়ার উপক্রম। এক বিশ্রী ছন্দে কারা যেন বলে চলেছে, ‘দিব্যসুন্দর আর নেই। নেই। নেই।’
ব্রহ্মময়ী হাসি থামিয়ে চুপ করে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তারপর চোখের কোণ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ল। কিন্তু সেই জল স্বাভাবিক কান্নার মতো ছিল না, ছিল যেন রক্তের মতো পুঞ্জীভূত বেদনা।
কৃষ্ণসুন্দরের ইচ্ছে হচ্ছিল, ছুটে গিয়ে জড়িয়ে ধরেন স্ত্রীকে। তারপর আত্মার গভীরতম পাক থেকে বের করে আনেন কাতর আর্তনাদ!
কিন্তু কিছুই পারলেন না। দ্বারকানাথ বারবার সতর্ক করে দেন চিঠিতে। সাহেবদের কাছে ধরা পড়ে গেলে নিজেদের তো সর্বনাশ হবেই, কলকাতায় লোপামুদ্রা আর ভুবনমণিও বিপদে পড়তে পারে।
বুকে সাতমণ পাথর চেপে কৃষ্ণসুন্দর ব্রহ্মময়ীর দিকে শান্ত চোখে তাকিয়েছিলেন। কয়েক মুহূর্ত। আর সহ্য করতে পারলেন না সেই চোখের তেজ। চোখ নামিয়ে পিছু নিয়েছিলেন পালকি থেকে নামা বড়সাহেবের। স্ত্রীর সঙ্গে সেই শেষ দেখা। ভেবেছিলেন, দেখা হলে অপালার খবরটা দেবেন। পারেননি। শোক এসে পলি দিয়েছে শোকের ওপরে।
আজও গভীর রাতে সেই সন্তানহারা মায়ের অট্টহাস্য শুনে কৃষ্ণসুন্দর ঘুম ভেঙে জেগে ওঠেন। দরদর করে ঘামেন। হাঁউহাঁউ করে কাঁদেন। পুত্রহারা পিতার কান্নায় রাতচরা পাখিগুলোও যেন গলা মেলায়। উহ, কী অসহ্য এই বেঁচে থাকা! যে জীবনে নিজের স্ত্রীর সঙ্গে নিজের পুত্রশোক যাপন করা যায় না, সেই জীবনের চেয়ে যন্ত্রণাময় আর কিছু হয় কি?
হঠাৎ ঝাঁকুনিতে সম্বিত ফিরে পেয়ে কৃষ্ণসুন্দর বাস্তবে ফিরে এলেন। দ্বারকানাথ শক্ত করে এসে কৃষ্ণসুন্দরের কাঁধদুটো ধরেছেন। দেশ কাঁপানো নেতা দ্বারকানাথের চোখেও জল। দাঁতে দাঁত চেপে বলছেন, ‘কেঁদো না সুন্দরদা! অপালাকে মারার শাস্তি নবকিশোর দত্ত পেয়েছিল। এই সাহেবরাও শাস্তি পাবে। আমি ব্রাহ্ম, তোমাদের মতো তেত্রিশ কোটি দেবদেবীকে মানি না। সর্বশক্তিমান ঈশ্বরকে মানি। কিন্তু, আমি আজ বলছি, যদি ঈশ্বর চুপ করে থাকেন, আমি এদের শাস্তি দেব। নিজের হাতে। টুঁটি চিপে মারব এই অত্যাচারী চা-কর সাহেবদের!’
মরামাটিয়ার ঘাট এসে পড়েছে। নৌকো ধীরে ধীরে নোঙর করছে ঘাটে। আর ঝুঁকি নেওয়া চলে না। দ্বারকানাথের রুদ্রমূর্তি দেখে মাঝিও তাকাচ্ছে ভয়ে ভয়ে।
কৃষ্ণসুন্দর দ্রুত সরে এলেন। মুখ ঘোরালেন ঘাটের দিকে। তারপর আকাশের দিকে তাকিয়ে রুদ্ধকণ্ঠে বললেন, ‘শান্ত হও দ্বারিকা! আমি জানি, তুমি পারবে। আরেকটা কথা জানিয়ে রাখি। বিষগুঁড়ি বাগানেও পাদ্রির খোঁজ চলছে। তুমি পারলে সেখানেও লাইন করো।’
