৮
ভুবনমণি ভেবেছিল, এন্ট্রান্স পরীক্ষা দেওয়ার পর কয়েকদিন একটু বিশ্রাম করবে। কিন্তু সেই সুযোগ হল না। কাদম্বিনী বিদেশ যাত্রার জন্য জোরদার প্রস্তুতি শুরু করেছেন। একইসঙ্গে চলছে তাঁর ডাফরিন হাসপাতালে চাকরি। ডাফরিন হাসপাতালে শিশুদের আলাদা বিভাগ খোলা নিয়ে সরকারকে চিঠি লিখেছেন। তাতেও ক্ষান্ত হননি, তহবিল জোগাড় করতে নিজে পথে নেমে তুলে ফেলেছেন চব্বিশ হাজার টাকা। আর এইসব কিছুতেই ভুবনমণি তাঁর ছায়াসঙ্গী হয়ে থেকেছে।
এদিকে মাসকয়েক আগেই কাদম্বিনীর আরেকটি পুত্র জন্মেছে। ওদিকে উপেন্দ্রকিশোর আর বিধুমুখীর তিনটি সন্তান। সুখলতা, সুকুমার, পুণ্যলতা। তিনজনেই ছোট ছোট। উপেন্দ্রকিশোরের সন্তানরা, কাদম্বিনীর ছেলেমেয়েরা, সব মিলে ১৩ নম্বর কর্ণওয়ালিশ স্ট্রিট রমরম করছে। এরা সকলেই ‘পিসিমা’ বলতে অজ্ঞান। এত কচিকাঁচার ভিড়ে ভুবনমণির মাঝে মাঝেই মনে পড়ে দিব্যসুন্দর আর অপালার কথা। অপালার মৃত্যু কতদিন যে দুঃস্বপ্নে ঘুরেফিরে এসেছে ওর কাছে!
আর দিব্যসুন্দর? ভাবলেই ওর বুক ভারী হয়ে যায়। কৃষ্ণসুন্দর, ব্রহ্মময়ী আর দিব্যসুন্দর! ল্যাটিন আমেরিকার সেই দেশ থেকে নাকি জাহাজে করে পালিয়েছিলেন তাঁরা। কিন্তু তারপর কোথায় গেলেন? সেই ব্যাপারে নতুনদাদা থেকে গগনচন্দ্র কেউ কোনও হদিশ দিতে পারেননি।
আনমনে ভাবতে ভাবতে নতুন বউদিদির ঘরে ঢোকে ও, ‘মুড়ি চিঁড়ে মুড়কি সব গুছিয়ে দিয়েছি। আর কী দেব, বউদিদি?’
কাদম্বিনী চেম্বারে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হচ্ছিলেন। তিনি শাড়ি পরেন পার্সি মহিলাদের আদলে, বাঁ কাঁধে পিন দিয়ে এঁটে নেন আঁচল। পায়ে লম্বা জুতো আর মোজা। আজই তাঁর শেষ চেম্বারে বসার কথা। আগামীকাল তিনি চলে যাবেন বোম্বাই, বিদেশযাত্রার জন্য ফান্ড জোগাড় করতে। ব্যস্ততা তুঙ্গে। তবু তিনি লঘু স্বরে বললেন, ‘আর কিছু দিতে হবে না তোকে। অনেক করেছিস। এবার একটু শান্ত হয়ে বোস। বুবু ঘুমোল?’
‘হ্যাঁ।’ ভুবনমণি একটু থেমে বলল, ‘তুমি চলে গেলে বুবু কিন্তু খুব কাঁদবে, বউদিদি। সবেমাত্র আটমাসের দুধের ছেলে।’
কাদম্বিনী নীচের ঠোঁটটা কামড়ে ধরলেন, ‘জানি। তবে ও তোর বেশি নেওটা। আমি জানি, তুই ওকে ঠিক সামলে নিবি। ওর চেয়েও বেশি আমার চিন্তা সতীশকে নিয়ে। সে তো শুধু চেহারাতেই বড় হয়েছে, মনটা তো শিশু রয়ে গেছে। আমার হাতে ছাড়া কারুর কাছে খেতে চায় না। বিধুও বাচ্চাদের নিয়ে ব্যস্ত! আমি বিলেত যদি যেতে পারি, যে ক’মাস থাকব না, সতীশের চেহারাটা না ভেঙে যায়।’
ভুবনমণি চোখ তুলে তাকাল। কাদম্বিনীর এই কথাগুলোয় যে এক শতাংশও কৃত্রিমতা নেই, তা ও এতদিনে বুঝে গেছে। মাঝেমাঝে ওর মনে হয়, ওর সামনে যে নারী স্বাভাবিকভাবে চলছেন, ফিরছেন, হাঁটছেন, তিনি কোনও রক্তমাংসের নারী নন। নিজের গর্ভজাত পুত্রের চেয়েও যিনি সপত্নীপুত্রের চিন্তায় বিহ্বল হন, তিনি দেবী ছাড়া আর কী?
ব্রাহ্মসমাজের অনেকেই বলেন, কাদম্বিনী নাকি শিক্ষক দ্বারকানাথকে বিয়ে করেছিলেন সতীশের প্রতি দুর্বলতা থেকেই। সেকথা সত্যি না মিথ্যে জানে না ভুবনমণি, তবে কাদম্বিনী যে দ্বারকানাথের প্রথম পক্ষের পুত্র কন্যাকে প্রাণ দিয়ে ভালোবাসেন, তা ও বেশ বোঝে। বিধুমুখী তো নিজেই বিমাতার চেয়ে বছরকয়েকের মাত্র ছোট। বিমাতাকন্যার সম্পর্ক এত সুন্দর আগে কখনো দেখেনি ভুবনমণি। বিধুমুখীর ছেলেমেয়েরাও ‘দিদিমা’ বলতে পাগল।
ও বলল, ‘তোমায় কিচ্ছু চিন্তা করতে হবে না, আমি যতদিন রয়েছি। তোমার নাতি নাতনিরাও মন খারাপ করবে খুব।’
কাদম্বিনী ব্যথিত কণ্ঠে বললেন, ‘জানি। এমন ভরা সংসার ফেলে যাওয়া…। কিন্তু কী করব! বিদেশ থেকে ডিপ্লোমা আমায় আনতেই হবে। নাহলে এত কষ্ট করে ডাক্তারি পাশ করলাম, তবুও এখানে কেউ আমায় ডাক্তার বলে স্বীকৃতি দিচ্ছে না, দেখছিস তো! ডাঃ কোটসের রেকমেন্ডেশনে ইডেন হাসপাতালে চাকরি পেলাম বটে, কিন্তু ডাক্তারি করতে পারছি কই? আমায় দিয়ে নার্সিংয়ের কাজ করাচ্ছে। আমাদের সমাজ এখনো মেয়ে ডাক্তারদের পুরুষ ডাক্তারদের সমতুল্য মনেই করছে না। ভাবছে, মেয়ে ডাক্তার মানেই সে শুধু ডেলিভারিটুকুই করাতে পারে।’
‘তুমিও তো সেই কাগজকলমের ডিগ্রির কথাই বলছ। কাগজে লেখা হলেই তা সমাজ মেনে নেয়? এই যে তুমি রুগি দেখার “কল” পেয়ে গিয়ে তাদের সারিয়ে তুলছ, তোমায় তো ওরা দেখছে সেই ধাইয়ের চোখেই। আগেকার দিনে যেমন ধাইমা’রা আঁতুড় তুলত। ডাক্তারের সম্মান পাচ্ছ কী? আসলে আইন আইনের জায়গায়, সমাজ সমাজের জায়গায়।’ বলতে বলতে ভুবনমণি চমকে উঠল।
অনেকদিন আগে এই একই কথা ও বলেছিল সৌরেন্দ্রকে। সৌরেন্দ্র তখন সহবাস সম্মতি আইন নিয়ে খুব লড়ছে। ‘নির্ভীক নারী’-তে ঝড় তুলে দিচ্ছে। ভুবনমণি তখন তর্ক করেছিল, আইন পাশ করলেই কি তা সমাজের চোখেও তৎক্ষণাৎ স্বীকৃত হয়? তবে, বিদ্যাসাগরমশাই বিধবা বিবাহ আইন পাশ করিয়েছেন ত্রিশ বছরেরও বেশি হল। এখনো বিধবা কন্যার বিবাহ শুনলেই লোকে রে রে করে আসে কেন?
সেদিন সৌরেন্দ্রর চোখে স্পষ্ট দেখেছিল মুগ্ধতা। কবেকার কথা। যেন কয়েকজন্ম আগের স্মৃতি! তবু কী ভীষণ জীবন্ত!
কাদম্বিনী বললেন, ‘তা ঠিক। তবু থামলে তো হবে না ভুবন। আজ যদি আমি লড়াই করি, আজ থেকে পঞ্চাশ বছর পরে অনেক মেয়েকে হয়ত এই লড়াইটা লড়তে হবে না। ইংল্যান্ডের ডিগ্রি থাকলে আমায় ডাক্তারের ডিউটি দিতে বাধ্য হবে। তারপর বাকিটা আমার হাতযশ।’
‘এখন যে বোম্বাই যাচ্ছ, বিলেতে থাকার ব্যবস্থা করতে?’
‘হ্যাঁ। আমার দাদা কয়েকজনের ঠিকানা দিয়েছেন। দেখি, যদি তাঁরা সাহায্য করেন।’
‘বিলেত যাওয়ার জাহাজভাড়াটাও তো পাবে না। ওই কোনও এক মেমসাহেবের সঙ্গী হয়ে যেতে হবে।’
কাদম্বিনী একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। সত্যিই, অর্থকষ্ট এমন জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে যে, নিজের যাতায়াতের ভাড়াটুকু পর্যন্ত তিনি জোগাড় করতে পারছেন না। কী করেই বা পারবেন? দ্বারকানাথ এখন আসামের চা বাগানের কুলিদের দুর্দশা নিয়ে ব্যস্ত। সংসারে এতগুলো মানুষ। জামাতা উপেন্দ্রকিশোর কবে থেকে একখানা প্রকাশনা সংস্থা খুলতে চাইছে, সেটাও অর্থাভাবে হচ্ছে না। যদিও এই বাড়ির একজনও বিত্তে নয়, কর্মে বিশ্বাসী, তবু সবকিছুতেই তো অর্থ যেন পাহাড়প্রমাণ প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়ায়।
কলকাতার এক নিঃসঙ্গ ধনী ইউরোপীয় বৃদ্ধা প্রতিবছর স্বদেশে গিয়ে কয়েকমাস কাটিয়ে আসেন। সঙ্গে নেন কোনও অ্যাটেন্ডেন্টকে। সেই অ্যাটেন্ডেন্টের যাতায়াতের অর্থভার তিনিই বহন করেন, শুধু তাঁকে অতগুলো দিন জাহাজে যত্নে দেখভাল করতে হয়। এই খবর পাওয়ামাত্র কাদম্বিনী আর বিলম্ব করেননি। মিস প্যাশকে চিঠি লিখে পরের বছরের অ্যাটেন্ডেন্ট হওয়ার জন্য নিজের আগ্রহ প্রকাশ করেছেন।
মিস প্যাশ এখনো ‘হ্যাঁ’, ‘না’ কিছু বলেননি, তবে মৌখিক আশ্বাস দিয়েছেন। তাতে কিছুটা হলেও অর্থের সুরাহা হবে। এখন তাঁর লক্ষ্য, যত অল্পসময়ে হোক, যত বেশি সংখ্যক ডিপ্লোমা নিয়ে ফেরত আসা।
এত সন্তানসন্ততি নিয়ে ভরা সংসার, সাংসারিক দায়দায়িত্ব পুরোমাত্রায় সামলে ডাক্তারি প্র্যাকটিস, সমান্তরালে জাতীয় কংগ্রেসের হয়ে স্বদেশী কাজ, এত কিছু করে কাদম্বিনী কবেই হাঁপিয়ে যেতেন, যদি না স্বামী দ্বারকানাথ ঢালের মতো তাঁর পাশে দাঁড়িয়ে থাকতেন। দ্বারকানাথ সবসময় বলেন, ‘একমাত্র মরামাছই স্রোতের সঙ্গে ভাসে। তুমি মরা মাছ নও। তোমাকে স্রোতের উল্টোদিকে যেতে হবে, কাদম্বিনী। প্রমাণ করে দিতে হবে, মেয়েরাও ভালো ডাক্তার হতে পারে। ছেলেমেয়ে সব আমার দায়িত্ব, তোমায় ওদের নিয়ে ভাবতে হবে না।’
স্বামীর কথা ভাবতে ভাবতে চোখে জল চলে এল কাদম্বিনীর। লোকে বলে, তিনি বড় গম্ভীর মহিলা, কাঠখোট্টা, আবেগ কম। আসলে কেউ জানে না, নিজের ভেতরের সমুদ্রসম আবেগকে তিনি সযত্নে লুকিয়ে রেখেছেন। এই সমাজে মেয়েরা বেশি প্রগল্ভা হলে লোকে পেয়ে বসে। উল্টোটাও হজম করতে পারে না।
এমনিতেই সমাজ তাঁর দিকে বারবার আঙুল তুলেছে। তাঁর রেজাল্ট নিয়ে বারবার হাসিঠাট্টা হয়েছে। ডাক্তার হওয়ার পরও তা চলছে। কিছুদিন আগেও বঙ্গবাসী পত্রিকার সম্পাদক মহেশ চন্দ্র পাল তাঁকে ‘চরিত্রহীনা’ পর্যন্ত লিখতে কুণ্ঠাবোধ করেননি। দ্বারকানাথ বন্ধু শিবনাথ শাস্ত্রী ও ডাক্তার নীলরতন সরকারকে সঙ্গে নিয়ে মানহানির মামলা করেছিলেন, মামলায় জিতেছিলেন। মহেশ পালের একশো টাকা জরিমানা আর ছ’মাস হাজতবাসও হয়েছিল, কিন্তু ওই অবধি। নারীকে অপমান কি বন্ধ হয়েছে?
আনমনে তিনি নিজেই নিজের হয়ে যেন এখন সওয়াল করলেন। বললেন, ‘তোর নতুনদাদা যে সম্পাদকের বিরুদ্ধে মামলাটা করেছিলেন, তার আগে কিন্তু মেয়েমানুষকে অপমান করলে যে প্রতিবাদ করা যায়, এমন নজির এই বাংলায় ছিল না।’
‘নজির তৈরি করেই বা কী হল বউদিদি! লোকটা জেল খাটল। জরিমানা হল। তোমাকেও লোকে বাড়াবাড়ি বলে উপহাস করল। তোমার আর নতুনদাদার নামে মামলাবাজ থেকে শুরু করে কত কী অপবাদ দিল। এখনো দিয়ে চলেছে। শিয়ালদের হুক্কা হুয়া কি বন্ধ হয়ে গেছে?’
‘না। বন্ধ হয়নি। রাতারাতি এসব বন্ধ হয় না ভুবন। তবু বিন্দু বিন্দু করে সিন্ধু তৈরি করতে হয়। অপবাদ আসে। আবার ঝরেও যায়। লেগে থাকে না। তুই জানিস, আগেকার দিনে কত বিধবাকে বিনাদোষে দুর্নাম দিয়ে আত্মীয়রা বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিত। কেউ প্রতিবাদ করেছে? করেনি। প্রতিবাদ না করতে করতে সেটাই কিন্তু রেওয়াজ হয়ে যায়। মানুষ তখন অন্যায়টাকেই স্বাভাবিক ধরে নেয়। তাই অপবাদ বন্ধ হোক না হোক, এই প্রতিবাদ চালিয়ে যেতে হবে।’
‘তাহলে কি অন্যায়কে থামানোর একমাত্র পথ প্রতিবাদ?’
কাদম্বিনী মাথা নাড়লেন, ‘প্রতিবাদ আর কাজ, দুটোই একসঙ্গে করতে হয়, ভুবন। শুধু কথা বললে লাভ নেই, কাজও করতে হবে। এই যে আমি যখন মেডিকেল কলেজে ডাক্তারি পড়েছি, কত অসুবিধে হয়েছে। তুই যখন পড়বি, দেখবি, একটু হলেও সেসব সমস্যা মিটেছে। এভাবেই জগদ্দল পাথর সরে।’
ভুবনমণি নিঃশ্বাস ফেলল। নতুনদাদার মতো বউদিদিও ধরেই নিয়েছেন, ও ডাক্তার হবে। কিন্তু যার স্বপ্ন ছিল ডাক্তার হয়ে দীনদুঃখীদের সেবা করার, ওর সেই প্রাণের সৌরেন্দ্রই যখন ডাক্তার হতে পারেনি, ও কী করে হবে?
কাদম্বিনী যেন ওর মনের কথা বুঝতে পারলেন। ওর কাঁধদুটো ধরে নরম স্বরে বললেন, ‘সৌরেন্দ্রর জন্যই তোকে আরো বেশি করে ডাক্তার হতে হবে ভুবন। তার অধরা স্বপ্ন তুই পূরণ করবি। সেটাই তো আসল ভালোবাসা! আমার এক স্যার কী গল্প করেছিলেন, জানিস?’
‘কী?’
‘এক বনেদি বাড়ির কর্ত্রীর ভীষণ বুকে ব্যথা। স্যারকে কল দেওয়া হয়েছে ঠিকই, কিন্তু স্টেথোস্কোপ স্পর্শ করা যাবে না। রোগিণীকে দেখতেও হবে পর্দার আড়াল থেকে। স্টেথোর ডগায় একখানা দড়ি বাঁধা হল, বাড়ির দাসী সেই দড়ি নিয়ে গিয়ে রাখল গৃহিণীর বুকে। স্যার হতভম্ব। ওভাবে কি চিকিৎসা হয়? পরেরদিনই সেই রোগিণী মারা গেলেন। বুঝতে পারছিস, বাংলার মেয়েদের জন্যই মেয়ে ডাক্তার কত দরকার?’
ভুবনমণি চুপ করে রইল।
কাদম্বিনী বললেন, ‘তোর পরীক্ষার রেজাল্ট বেরোলে আমি আর তুই একদিন বাদুড়বাগানে যাব।’
ভুবনমণি কাঁপা স্বরে বলল, ‘বিদ্যাসাগরমশাইয়ের বাড়িতে?’
‘হ্যাঁ। ইদানীং ওঁর শরীর প্রায়ই খারাপ থাকে। তাই সাঁওতাল পরগণার বাড়ি ছেড়ে এখানেই নাকি থাকছেন। সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করে পায়ের ধুলো নিয়ে আসব দুজনে। আমি আর চন্দ্রমুখী যখন এন্ট্রান্স পাশ করেছিলাম, উনি চন্দ্রমুখীকে অনেক বই উপহার পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু আমায় কিছু পাঠাননি।’ কাদম্বিনী অভিমানী গলায় বললেন, ‘আমি জিগ্যেস করব, কেন আমায় আশীর্বাদ পাঠাননি উনি। তাঁকে প্রণাম করে তারপর যাব বিলেত। আর তুই দিবি এফ এ।’
ভুবনমণি কাদম্বিনীকে জড়িয়ে ধরল।
কাদম্বিনী সস্নেহে ওর চুলে বিলি কেটে দিতে লাগলেন। নিজের এই দূরসম্পর্কের ননদটিও তাঁর কাছে কম বিস্ময়ের বস্তু নয়। যে মেয়ে প্রথম এ বাড়িতে এসেছিল, সে ছিল যেন ভীতসন্ত্রস্ত এক শুঁয়োপোকা। মলিন, নির্বাক, সমাজের অনুশাসনে লাঞ্ছিতা এক ছায়ামূর্তি। সমাজ তাকে ত্যাগ করেছিল, অপমান করেছিল, নিজের করে নেওয়ার কেউ ছিল না। অথচ আজ সে পরিণত হয়েছে এক দীপ্ত নারীতে। মুখ ফুটে প্রশ্ন করছে। অন্যায়ের প্রতিবাদ করছে। গড়গড়িয়ে ইংরেজি বাংলা উপন্যাস পড়ছে। অংক করছে। সবথেকে বড় কথা, আস্ত একখানা পত্রিকা চালাচ্ছে। সমাজকে পাল্টানোর স্বপ্ন দেখছে। শুধু স্বপ্নই দেখছে না, সেই স্বপ্নকে বাস্তবের মাটিতে গেঁথে দেওয়ার চেষ্টা করে চলেছে।
কাদম্বিনী ওর মুখটা দু’হাতে তুলে ধরে মৃদু হেসে বললেন, ‘তুই জানিস, তোর এই বদলটা আমার কাছে কত আনন্দের?’
ভুবনমণি একটু লজ্জা পেয়ে বলল, ‘আমি কিছুই করিনি, বউদি। তুমি আর নতুনদাদা না থাকলে…।’
কাদম্বিনী স্নেহভরে ওর কাঁধে হাত রাখলেন। ‘সে তো কাউকে না কাউকে থাকতেই হয়, রে! আলো যতই উজ্জ্বল হোক, যদি জানলা খোলাই না থাকে, তবে সেই আলো ঘরে আসবে কী করে? আমরা শুধু জানলা খুলে দিয়েছি, যাতে তুই আকাশ দেখতে পারিস। কিন্তু উড়তে তো তোকে নিজেকেই শিখতে হয়েছে, তাই না? আলোকিত পরিবেশ পেলে যে সব মেয়েই প্রজাপতি হতে পারে, তুই তার উজ্জ্বলতম উদাহরণ।’
‘আমার নিজের বউদিও এমনই ছিলেন গো!’ ভুবনমণি ধরা গলায় বলল, ‘তুমি তো তাঁকে দেখোনি। তিনি তো শুধু আমার বউদি ছিলেন না, ছিলেন আমার মা। সারা গ্রাম যখন আমায় লাঞ্ছনা করতে উঠেপড়ে লেগেছিল, উনি একা রুখে দাঁড়িয়েছিলেন। আমার জন্যই তাঁর সংসারটা জ্বলে পুড়ে খাক হয়ে গেল!’
কাদম্বিনী নিরুত্তর রইলেন। ওর দাদা-বউদির কথা উঠলেই ভুবনমণি অনুশোচনায় দগ্ধ হতে থাকে। কাদম্বিনী আর বিধুমুখী অনেক বুঝিয়েছেন ওকে, লাভ হয়নি সেভাবে। তার চেয়ে শোকপ্রকাশে বাধা না দেওয়াই ভালো। দুঃখ চেপে রাখার থেকে অনর্গল বের করে দেওয়া উত্তম।
ভুবনমণি চোখ মুছে বলল, ‘নতুনদাদাকে তো বলে বলে হাঁপিয়ে গেলাম, তুমি একটু দেখো না গো!’
‘কী দেখব?’
‘আমার দাদা-বউদিদি! কোথায় গেলেন তাঁরা? সেই যে খবর পেলাম, তাঁরা ওই দূরদেশ থেকে পালিয়ে আসছেন, তারপর তো কোনও খবরই পেলাম না!’
‘তোর দাদা-বউদিদির সঙ্গে যারা ছিল, তোতারাম না কী যেন নাম, তারা তো ঠিকঠাকই ফিরেছিল।’
‘হ্যাঁ। কলকাতায় নামতেই তো তাদের পুলিশ ধরে ফেলেছিল। তারপর আবার চালান দিয়েছিল পরের জাহাজে। কিন্তু তারা তো আমার দাদা-বউদিদির খোঁজ দিতে পারেনি! কেবল বলেছিল, কালিকটে নেমেই নাকি ওদের আর দেখতে পায়নি কেউ। হতেও তো পারে, দাদা-বউদি লুকিয়ে বোম্বাই চলে গেছেন!’
‘তোর দাদা-বউদি যেখানেই আছেন, ভালো আছেন ভুবন।’ বলতে বলতে থেমে গেলেন কাদম্বিনী। তারপর অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে বললেন, ‘আমি বোম্বাইতে সবাইকে বলব, ভুবন। চিন্তা করিস না। তোর নতুনদাদাও দেখছেন।’
ভুবনমণি সজল চোখে তাকাল, ‘দাদা-বউদিদির সঙ্গে দেখা হলে বলব, আমার জন্য তোমাদের ভিটেমাটি গেল, বড়মেয়েটা গেল, কিন্তু ছোটটাকে আমি মানুষের মতো মানুষ করছি। সে ব্রাহ্ম ইশকুলে পড়ছে। দু’বছরের মধ্যেই এন্ট্রান্স দেবে।’
