মগ্ননারাচ – ৪

মোতিদের জাহাজ যখন আসামের দিকে এগোচ্ছে, তখন কলকাতার দিকে মুখ ফেরানো যাক।

মধ্য কলকাতার ঠনঠনিয়া অঞ্চল। জমজমাট কর্ণওয়ালিশ স্ট্রিট। রাস্তার ওপরেই সাধারণ ব্রাহ্ম সমাজের উপাসনা মন্দির ও সমাজভবন। তার প্রায় বিপরীতেই যে ১৩ নম্বর বিশাল বাড়িটা মাথা তুলে দাঁড়িয়ে রয়েছে, এলাকায় তা ‘লাহাবাবুদের বাড়ি’ নামেই পরিচিত।

স্যার জন লরেন্স জাহাজ ডুবে যাওয়ার প্রায় মাসপাঁচেক পরে সেই বাড়ির দোতলায় একটি নবজাতক শিশুর কান্না শোনা গিয়েছিল। দুর্গাপুজো তখন সবেমাত্র মিটেছে। মা দুর্গার বিসর্জন হলেও এই বাড়িতে বাজছিল আবাহনের আনন্দসুর।

শিশুটি ছিল দ্বারকানাথের কন্যা বিধুমুখী ও জামাতা উপেন্দ্রকিশোরের পুত্রসন্তান। তার নাম রাখা হয়েছিল সুকুমার। ডাক নাম তাতা।

এরপর তাঁদের আরো একটি কন্যা জন্মেছে। তার ভালো নাম রাখা হয়েছে পুণ্যলতা। ডাক নাম হাসি। নাতি নাতনির দুটো ডাকনামই রেখেছেন দিদিমা কাদম্বিনী। বছরখানেক আগে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নতুন উপন্যাস ‘রাজর্ষি’ প্রকাশিত হয়েছে। সেই উপন্যাসেরই দুটো চরিত্র হাসি আর তাতা।

রবীন্দ্রনাথ আগে এই বাড়িতে প্রায় রোজই আসতেন। মাঘোৎসবের মহড়ায়, নানা আসরে। এখন তাঁর নামডাক হয়েছে, ব্যস্ততা বেড়েছে। অতটা সময় পান না। তবে উপেন্দ্রকিশোরের সঙ্গে তাঁর হৃদ্যতা এখনো অটুট আছে।

লাহাবাবুদের এই বাড়ি শুধু আয়তনেই সুবিশাল নয়, এখানে নানা অংশে ভাড়ায় থাকেন সমাজের নানারকম গণ্যমান্য মানুষ। অধিকাংশই ব্রাহ্মসমাজের লোকজন। দোতলায় থাকেন উপেন্দ্রকিশোর আর বিধুমুখী। তিনতলার বাইরের দিকের অংশ মেসের আদলে অনেক পুরুষ মানুষের দখলে। থাকেন ব্রাহ্মনেতা গগনচন্দ্র হোম, ব্রাহ্মধর্মের প্রচারক রামকুমার বিদ্যারত্ন। বাড়ির একতলায় রয়েছে দ্বারকানাথের ‘সঞ্জীবনী’ পত্রিকার দপ্তর আর প্রেস। একতলার অন্যদিকে মেয়েদের স্কুল ‘ব্রাহ্ম বালিকা শিক্ষালয়’, দোতলার কিছু অংশ নিয়ে রয়েছে সেই স্কুলের মেয়েদেরই বোর্ডিং। বিখ্যাত এই বাড়িতে অহরহ হয়ে চলে নানারকমের সভা, সমাবেশ, বৈঠক। কত স্মৃতি। কত বিপ্লব। কত ঘটনা।

তিনতলার ভেতরের অংশে থাকেন দ্বারকানাথ ও কাদম্বিনী। তাঁদের সঙ্গে থাকে দ্বারকানাথের দূর সম্পর্কের মাসতুতো বোন ভুবনমণি। সে আমাদের অতিপরিচিতা। বছরকয়েক আগে এই দুঃসাহসিনীই ভয়ংকর প্রতিকূল অবস্থা থেকে উদ্ধার করে এনেছিল তার ভাইঝি লোপামুদ্রাকে। অভিশপ্ত সেই রাতেই তার সঙ্গে শেষ দেখা হয়েছিল সৌরেন্দ্রর। তারপর সাড়ে সাতশো নরনারী সমেত সলিল সমাধি হয়েছিল বহু আলোচিত সেই স্যার জন লরেন্স জাহাজের।

সংবাদ পেয়ে শোকে দুঃখে পাথর হয়ে গিয়েছিল ভুবনমণি। দ্বারকানাথ, গগনচন্দ্র জাহাজ কোম্পানিতে বন্দর থানায় অনেক চেষ্টা করেও কোনও সন্ধান পাননি সৌরেন্দ্রর। মেডিকেল কলেজের মেধাবী ছেলেটির ওই মর্মান্তিক পরিণতি কেউই মেনে নিতে পারেননি।

ভুবনমণির জীবনের প্রথম সতেরোটা বছর কেটেছিল হুগলির মশাট গ্রামে। অকালবৈধব্য, আততায়ীদের হাতে পাশবিক ধর্ষণ, তারপর গোটা সমাজ উঠেপড়ে লেগেছিল তাকে বিবস্ত্রা করতে। দাদা কৃষ্ণসুন্দর আর বউদিদি ব্রহ্মময়ী ওর জন্যই বাধ্য হয়েছিলেন রাতারাতি গ্রাম ছাড়তে। ফল হয়েছিল আরো মারাত্মক। গ্রামের পণ্ডিতদের লালসার হাত থেকে বাঁচতে তাদের গোটা পরিবার পড়েছিল আড়কাঠির খপ্পরে। ভুবনমণিকে সুকৌশলে দ্বারকানাথের বাড়িতে পাঠিয়ে দিতে পারলেও কৃষ্ণসুন্দরকে তার স্ত্রী পুত্রের সঙ্গে পাড়ি দিতে হয়েছিল সুদূর ল্যাটিন আমেরিকায়, আখের খেতে ইনডেনচারড লেবারার হয়ে। এদিকে কৃষ্ণসুন্দরের জ্যেষ্ঠা কন্যা অপালাকে প্রাণ দিতে হয়েছিল ডিপোমালিক ধর্ষকামী নবকিশোর দত্তের অত্যাচারের শিকার হয়ে। কনিষ্ঠা কন্যা লোপামুদ্রার ভাগ্যেও সেটাই হত, যদি না সপত্নী দয়াময়ী, ভুবনমণি ও সৌরেন্দ্র মিলে তাকে উদ্ধার করত।

সৌরেন্দ্র! নামটা নিজের মনে উচ্চারণ করলেই কেঁপে ওঠে ভুবনমণি। কিছু কিছু ছবি দু’চোখের মাঝে গেঁথে যায় চিরতরে। সৌরেন্দ্রর সরল, নিষ্পাপ মুখখানিও যেন ওর স্মৃতিতে পাথরের মতো স্থায়ী হয়ে গেছে। ওর হাসি, ওর স্বপ্ন, জাহাজের সিঁড়িতে টাল সামলাতে না পেরে স্পর্শ, সব টুকরো টুকরো দৃশ্য হয়ে ভাসে চোখের সামনে। কতদিন হয়ে গেল!

তবু আজও গভীর রাতে যখন ঝড় ওঠে, যখন নির্জন ঘরে চাঁদের আলো এসে পড়ে, তখন ভুবনমণির মনে হয়, সৌরেন্দ্র ফিরে এসেছে। ফিসফিসিয়ে বলছে, ‘তুমি পারবে, ভুবন! আমাদের স্বপ্নটা বাঁচিয়ে রাখবে তুমি।’

ভুবনমণি তাকিয়ে থাকে শূন্য চোখে। নিজের সঙ্গে নিজেই কথা বলে।

‘আমি কি সত্যিই পারব?’

‘পারবে।’

‘কিন্তু আমি তো এখন আর কিছু চাই না, মৃত্যু ছাড়া।’

‘তাই কি? তবে কেন আজও “নির্ভীক নারী”র প্রতিটি সংখ্যা হাতে লিখে সাজিয়ে দাও? কেন আজও এই সমাজের অন্যায় দেখলে রাগে হাত কাঁপে তোমার?’

ভুবনমণি চুপ করে থাকে। সত্যিই তো! ও কি থেমে যেতে পারবে? অপালার মতো শিশুকে ধর্ষণ করে মেরে ফেলার দগদগে ক্ষত কি ও ভুলতে পেরেছে? লোপামুদ্রার নির্বাক চোখের ভাষা কি ওর মন থেকে মুছে গেছে? সমাজের পাষণ্ডরা সমাজপতিরা যখন ওর ধর্ষিতা ক্ষতবিক্ষত দেহটাকে নতুন করে ভোগ করার ষড়যন্ত্র করেছিল, তখন যে কষ্ট হয়েছিল, তা কি আজও অনুভব করে না?

এতদিন অবধি জীবন যেন ওকে কিচ্ছু দেয়নি, শুধু কেড়ে নিয়েছে। একের পর এক দুর্যোগ, বাড়ি ছাড়া হওয়া, সমাজের লাঞ্ছনা, স্বজনদের হারানো, নিঃসঙ্গতা। তারপর ওকে হাতে ধরে পাঁক থেকে তুলে এনেছিলেন দ্বারকানাথ। বুঝিয়েছিলেন, ওকে হতে হবে মহাভারতের সেই ‘নারাচ’ অস্ত্র। সেই অস্ত্রে ছিন্নবিচ্ছিন্ন করে ফেলতে হবে সব বাধাবিপত্তিকে।

নারাচ বরিষে কত অতি খরসান। অর্ধচন্দ্র ক্ষুরপাদি আর নানা বাণ!

সত্যিই আজ নারাচের মতো এক ইস্পাতের ফলা হয়ে উঠেছে সে।

কিন্তু মরুরও তো তৃষ্ণা জাগে!

সৌরেন্দ্র একদিন বলেছিল, ‘বাবামশাই তো ঠিকই বলেছেন। বাধ্য মেয়ে হয়ে থাকলে কোনও বাধাই ডিঙোতে পারবে না এই সমাজে। তোমায় হতে হবে মগ্ননারাচ।’

‘সেটা আবার কী? কই, মহাভারতে তো পাইনি!’

‘নারাচের মতো সব বাধাবিপত্তিকে তো তুমি ঘায়েল করবেই, কিন্তু তা করতে হবে গোপনে। উচ্চকিতস্বরে নয়। তোমায় জমাট বাঁধতে হবে সকলের অলক্ষ্যে, কিন্তু যখন প্রকাশিত হবে, তখন হয়ে উঠবে বিধ্বংসী। বুঝলে?’ সৌরেন্দ্র দুষ্টুমিভরা চোখে তাকিয়েছিল, ‘এই শব্দটা আমার তৈরি। ব্যাসদেবের কাছে তো ভুবন ছিল না, তাই তিনি লেখেননি।’

এসব মনে পড়লেই ভুবনমণির চোখ ভিজে আসে। সৌরেন্দ্র ভালোবেসেছিল ওকে, ধীরে ধীরে ওর ক্ষতগুলো সারিয়ে তুলেছিল। আর তারপর? ওকে আবার একা করে দিয়ে চলে গেল, একেবারে চিরতরে।

কিন্তু আজ আর কান্নার সময় নেই। ভুবনমণি চোখ বন্ধ করে। সৌরেন্দ্রর কণ্ঠ যেন আবার ভেসে আসে, ‘তুমি পারবে, ভুবন। তুমিই আমার নারাচ। “নির্ভীক নারী”-কে কেউ থামাতে পারবে না।’

ভুবনমণি রাতজেগে পড়ে। সামনেই ওর এন্ট্রান্স পরীক্ষা। দূরের জোড়া গির্জায় ঢং ঢং করে ঘণ্টা বেজে চলে। ও অস্থির চিত্তে পায়চারি করে মাঝে মাঝে। চোখ পড়ে সামনে পড়ে থাকা কাগজের দিকে। লণ্ঠনের নিভু নিভু আলোয় স্পষ্ট দেখতে পায় প্রথম পাতাটা।

“নির্ভীক নারী”। বাংলার নারীদের সত্য, সাহস ও সম্মানের পত্রিকা।

হঠাৎ করেই একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজেই জোরে জোরে বলে ওঠে, ‘হ্যাঁ, আমি পারব। ঘরে ঘরে মেয়েরা পড়াশুনো শিখবে। নিজের পায়ে দাঁড়াবে। মেয়েরাও মাথা উঁচু করে বাঁচবে, পুরুষের পায়ের তলায় নয়!’

ওর উত্তেজনার প্রাবল্যে বিছানায় অঘোরে ঘুমোতে থাকা ছোট ভাইঝির ঘুম ভেঙে যায়। রাতবিরেতে পিসিমার এই ভূতুড়ে কাজকর্মে লোপামুদ্রা আগে ভয় পেত, এখন আর পায় না। শুধু ঘুম ভেঙে তাকায়, ‘শুয়ে পড়ো পিসিমা। অনেক রাত হল!’

ভুবনমণি সস্নেহে ভ্রাতুষ্পুত্রীর পাশে এসে বসে। দু’চোখ উপচে জল আসে তার। দাদা আর বউদিদি ল্যাটিন আমেরিকা থেকে লুকিয়ে ফিরতে পেরেছিলেন, শুধু সেই খবরটুকুই তার কাছে আছে, আর কোনো খোঁজ নেই। এত বড় পৃথিবীতে একেবারে নিজের বলতে এই মেয়েটিই একমাত্র! ঘুমের মধ্যেও আঁকড়ে ধরে আছে ওর আঁচল। যেন ভুবনমণির মধ্যেই লুকিয়ে আছে তার সমস্ত নিরাপত্তা।

পরমুহূর্তে নিজের প্রতি ধিক্কারে কুঁচকে যায় ও। ছি ছি! নিজের মানে কি শুধু সহোদরকেই বোঝায়? রক্তের সম্পর্কই কি একমাত্র সত্য নাকি?

মোটেই না। দূর সম্পর্কের দাদা হয়েও নতুনদাদা দ্বারকানাথ ওর জন্য যা করেছেন, তার কি কোনও তুলনা হয়? ওর মতো অশিক্ষিত পাড়াগেঁয়ে মেয়ের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন শিক্ষার আলো, দিয়েছেন কুসংস্কার বর্জনের উদার পাঠ। শিখিয়েছেন নীরবে না মেনে নিয়ে চোখ তুলে প্রশ্ন করতে।

আর কাদম্বিনী? নতুন বউদিদির জন্য কোনও বিশেষণই যথেষ্ট নয়। বিস্ময়নারী তিনি! শুধু নিজে ডাক্তার হননি, সংসার সামলে চলেছেন পুরোমাত্রায়, কন্যা হিমানীর অকালমৃত্যুর পর যেন হয়ে উঠেছেন ধীর স্থির এক দৃঢ়প্রতিমা। তাঁকে দেখলেই মনে জোর পায় ভুবনমণি। কাদম্বিনী যেন প্রতিপদে ওকে শেখান, নারী শুধুই সহ্য করে না, নিজেকেও মানুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে।

ডাক্তার হয়েও এখনো তাঁর লড়াই শেষ হয়নি। বরং বেড়েছে কয়েকগুণ। এতদিন অবধি পুরুষ সমাজের একাংশ প্রগতিশীল নারীদের ভরিয়ে দিচ্ছিল কটূক্তিতে, উপহাসে। মেয়েরা আবার লেখাপড়া শিখবে কি? বিদ্যাসাগর, ড্রিংকওয়াটার বেথুন, কেশবচন্দ্র সেনের মতো মানুষরা যত নারীশিক্ষার পক্ষে সওয়াল করছিলেন, ততই পড়তে চাওয়া মেয়েদের প্রতি ধেয়ে আসছিল কটূক্তি। অনেকবছর আগেই ঈশ্বর গুপ্ত লিখে ফেলেছিলেন—

আগে মেয়েগুলো ছিল ভাল, ব্রত ধর্ম কোর্তো সবে।

একা বেথুন এসে শেষ করেছে, আর কি তাদের তেমন পাবে?

যত ছুঁড়ীগুলো তুড়ী মেরে, কেতাব হাতে নিচ্চে যবে

তখন এ বি শিখে বিবি সেজে, বিলাতী বোল কবেই কবে।

কিন্তু সেসব উপহাসে কর্ণপাত না করে চন্দ্রমুখী, কাদম্বিনীর মতো মেয়েরা ঝপাঝপ এন্ট্রান্স পাশ করে ফেললেন। পাশ করে ফেললেন ফার্স্ট আর্টস পরীক্ষাও। দু-তিনজন করে হলেও ইউরোপীয় মেয়েদের পাশাপাশি ভারতীয় মেয়েরাও এগিয়ে আসছিল পড়াশুনোর দিকে। ঠাকুরবাড়ির কন্যা স্বর্ণকুমারী লিখছেন একের পর এক উপন্যাস, সেই বাড়িরই পুত্রবধূ জ্ঞানদানন্দিনী প্রস্তুত হচ্ছেন একাকী বিদেশ যাত্রার। শুধু শহরেই নয়, সুদূর গ্রামে বসে লেখাপড়া শিখে রাসসুন্দরী নামে গৃহবধূ লিখে ফেলেছিলেন আত্মকথা ‘আমার জীবন’, কুমিল্লায় বসে প্রেমের কাব্য ‘রূপজালাল’ লিখছেন জমিদারনী নবাব ফয়জুন্নেসা চৌধুরানি।

নারীশিক্ষার বিরুদ্ধে প্রাথমিক ঝড় যখনই প্রশমিত হল, যখনই মেয়েদের লেখাপড়া শেখাটা একটু একটু করে স্বাভাবিক হতে শুরু করল, তখনই শুরু হল, দ্বিতীয় পর্যায়ের সমস্যা। শিক্ষিত হওয়া এক জিনিস, আর উচ্চশিক্ষা অর্জন করে স্বাবলম্বী হওয়া আরেক জিনিস। আর এই পার্থক্যেই বিরাট মতানৈক্য দেখা দিল উদারপন্থীদের মধ্যেও।

এতদিন মেয়েদের শিক্ষিত করে তোলার পেছনের উদ্দেশ্য ছিল পরিষ্কার। বাড়িতে শিক্ষিতা বউ থাকলে সে আরো ভালোভাবে সংসার পরিচালনা করতে পারে, সংসারের হিসেবপত্র রাখতে পারে, সন্তানদের প্রাথমিক শিক্ষাটুকু দিতে পারে, সর্বোপরি নব্যশিক্ষিত স্বামী তার সঙ্গে মনের ও সমাজের দুটো কথা বলে শান্তি পেতে পারেন। সংসার সুখের হয় রমণীর গুণে, আর শুধুমাত্র এইসব কারণেই যে মেয়েদের শিক্ষা প্রয়োজন, এই পুরুষশাসিত ভাবনা ছিল সমাজের প্রায় সর্বত্র। এমনকী, যারা নারীশিক্ষার জন্য আন্দোলন করছিলেন, তাঁদের বরিষ্ঠভাগেরই উদ্দেশ্য ছিল মেয়েদের জন্য শিক্ষিত সুপাত্র পাওয়া। বাংলা, ইংরেজি, প্রাথমিক অংক, ইতিহাস, ভূগোলের জ্ঞান। ব্যস যথেষ্ট।

এমনকী দ্বারকানাথের ‘বঙ্গ মহিলা বিদ্যালয়’ এ শিবনাথ শাস্ত্রী যখন মেয়েদের জ্যামিতি, লজিক, মেটাফিজিক্স পড়াতে চাইলেন, তখন ব্রহ্মানন্দ কেশবচন্দ্র সেন স্বয়ং আপত্তি তুলে বললেন, ‘জ্যামিতি? মেয়েরা আবার জ্যামিতি পড়ে কী করবে?’

এভাবেই ১৮৭৭ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় মেয়েদের জন্য উচ্চশিক্ষার অনুমতি দিল বটে, সঙ্গে এটাও নিয়ম করা হল যে, মেয়েরা তো অংক পারবে না, তার বদলে তারা বোটানি নিতে পারবে।

যে সমাজ তখনো ধরেই নিচ্ছে, নারী অংক পারে না, পুরুষের তুলনায় নারীর মস্তিষ্ক নিকৃষ্ট, সেই সমাজ যখন দেখল, মেয়েরা শিক্ষিত হয়েই নিরস্ত হল না, বরং তাদের কেউ কেউ উচ্চশিক্ষা শেষ করে উপার্জন করার মতো সম্মানজনক পেশার পথে এগোচ্ছে তখন তো তাদের টনক নড়লই।

এবার আর বিদ্যাবুদ্ধি নিয়ে ছড়া, ব্যঙ্গ বা উপহাস নয়, কিছু পুরুষ সরাসরি শিক্ষিতা মেয়েদের প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখতে শুরু করল। তারা ভাবতে শুরু করল, মেয়েরা এসে প্রতিযোগিতা আরো কঠিন করবে। সেক্ষেত্রে যেসব মেয়েরা উচ্চশিক্ষা শেষ করে শিক্ষিকার পেশায় গেলেন, তাঁদের অতটা বাধার সম্মুখীন হতে হল না, কারণ তাঁরা মূলত অভিজাত অন্তঃপুরে পড়াতে গেলেন। কিন্তু যে মেয়েরা ডাক্তারি পাশ করলেন, তাদের প্রথমেই দাঁড়াতে হল নারী বিদ্বেষী অসুস্থ প্রতিযোগিতার সামনে। মেয়েরা ধাত্রী হবে, বড়জোর নার্স হবে, মাস্টারনি হবে, সেই অবধি মানা যায়, ডাক্তার হবে আবার কি?

সেই কারণেই যখন কলকাতা মেডিকেল কলেজ মেয়েদের ডাক্তারি পড়ার অনুমতি দিচ্ছিল না, তখন দুর্গামোহন দাশের কনিষ্ঠা কন্যা অবলা মেডিকেল পড়তে চলে গিয়েছিলেন সুদূর মাদ্রাজে। পিতৃবন্ধু শিবনাথ শাস্ত্রী তাঁকে চিঠি লিখেছিলেন, ‘নাবিক সমুদ্রে জাহাজ পাঠিয়ে যেমন অধীর হয়ে অপেক্ষা করে, তোমায় মাদ্রাজ পাঠিয়ে আমরাও তেমনই অপেক্ষা করছি।’

কিন্তু সেই অপেক্ষা সফল হয়নি। অবলা ফাইনাল ইয়ারে পড়া ছেড়ে চলে এসেছিলেন, বিয়ে করেছিলেন জগদীশচন্দ্র বসুকে।

কাদম্বিনী কিন্তু দমেননি।

এগুলো ভাবলেই গর্বে বুক ভরে ওঠে ভুবনমণির। এই দানবসম প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে গিয়ে নতুন বউদিদি কাদম্বিনী ডাক্তার হয়েছেন!

শুধু তাই নয়, এতগুলো সন্তান সামলে, ঘরসংসার সেরে ইডেন হাসপাতালে কাজ করছেন তিনি, বেনিয়াটোলা লেনে চেম্বারও খুলেছেন। আবার বিলেত থেকে আরো ডিগ্রি নিয়ে আসার পরিকল্পনা করছেন।

কাদম্বিনী ওকে সবসময় বলেন, ‘ভুবন, যত পড়বি, যত জানবি, মন পরিণত হবে। বুদ্ধি খুলবে। কুযুক্তি কুসংস্কার দূরে সরে যাবে। তোকে সংসারের কাজে অত মন দিতে হবে না, পরীক্ষাটা ভালো করে দে। তোকে নিজের পায়ে দাঁড়াতেই হবে।’

মেয়েরা আবার নিজের পায়ে দাঁড়ায় নাকি! বেশ্যাবৃত্তি ছাড়া যে মেয়েরা কোনরকম সম্মানজনক উপায় উপার্জন করতে পারে, এই ধারণাটাই ছিল না ওর। শুধু ওর কেন, ওদের মশাট গ্রামের কারুরই কি ছিল?

এই নিশুতি মধ্যরাতে ভুবনমণি তন্ময় হয়ে ভাবে। চোখ উপচে ঝরে অশ্রু। ওর জীবন আগে ছিল মধ্যযুগের এক অন্ধকার গুহার মতো। যেখানে শ্বাস নেওয়ারও অনুমতি ছিল না। দ্বারকানাথ কাদম্বিনী এসে যেন প্রবল কুঠারাঘাতে সেই গুহার দেওয়াল ভেঙে দিয়েছেন!

ভুবনমণির কপালে একটা নরম হাত এসে ঠেকে।

লোপামুদ্রা। ঘুমের ঘোরে হাই তোলে। বড় বড় চোখ মেলে দেখে পিসিকে। বারো-তেরো বছর বয়স হলেও সে একটু শিশুসুলভ। সংসারের কুটিলতা জটিলতা বোঝে না তেমন। কাদম্বিনীরা বুঝতে দেনও না। নীচের ব্রাহ্ম বালিকা শিক্ষালয়েই পড়ে সে।

‘ও পিসি, তুমি কাঁদছ?’

ভুবনমণি হাসে। না, ও কাঁদছে না। কারণ কান্নায় কিছুই বদলায় না। বদলায় শুধু চোখে চোখ রেখে চালিয়ে যাওয়া সংগ্রামে।

লোপামুদ্রা অবাক চোখে তাকিয়ে আছে ওর দিকে। ত্বরিতে চোখ মুছে ভাইঝিকে বুকে টেনে নেয় ও, ‘ধুর বোকা! কাঁদব কেন?’

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *