কৃষ্ণসিন্ধুকী – দেবারতি মুখোপাধ্যায়
কৃষ্ণসিন্ধুকী – দেবারতি মুখোপাধ্যায়
প্রথম প্রকাশ – জুন ২০২৪
প্রচ্ছদ – স্বর্ণাভ বেরা
কুড়ির গোড়ায় থাকা দুই ছটফটে তরুণ
ইন্দুভূষণ ও উল্লাসকর
যারা ছড়িয়ে আছে এই ‘কৃষ্ণসিন্ধুকী’র আনাচে কানাচে
.
আলো-আঁধারি
গর্ব করে বলতে এক সময়ে ‘ভাল’ লাগত অমুকচন্দ্র স্যার, অমুকচন্দ্র লর্ড, বড়লাট, ছোটলাট। এমনি করে একদিন ভারতের হর্তাকর্তাবিধাতাও একদিন হলেন এক লর্ড—লর্ড কর্নওয়ালিশ। এমনি লর্ড কার্জন। এমনি করেই আমাদের দেশটাকে ভাগ করার কুচক্র। এর শুরু কখন করতে হবে— আমরা ঠিক জানি না।
আসলে সাম্রাজ্যবাদের একটা বড় লক্ষণ হল গ্রাস করার লোলুপতা। লোলুপতা থেকে শাসন করার একটা ‘বিগবসি’ চরিত্র অনিবার্য গড়ে ওঠে। শাসন থেকে তাকে কায়েম করার জন্যে জাগে নিপীড়নের লিপ্সা। নিত্যনতুন ফাঁদ তৈরি। কতকগুলি কার্যকরী শব্দ ক্রিয়াশীল। বেত্রাঘাত, আটক, হাজত, জেল, চাবুক, ঘানি পেশা থেকে একেবারে শেষের দাঁড়ি। ফাঁসি দিয়ে আতঙ্কবাদের প্রতিষ্ঠা। মূলকথা শাসিতের রক্তশোষণ। বিশাল একটা যন্ত্রণার যন্ত্র নির্মাণ। তারই একটা বিপুল আয়োজনের নাম কারাযন্ত্রণা।
এটা শুধুমাত্র ব্রিটিশ রাজত্বের ধর্ম ছিল না। মনুসংহিতা তো এর একটা শাসন শুধু নয় একটা অত্যাচারের বীজমন্ত্র। তারই আধুনিক রূপায়ণ হল আন্দামানের সেলুলার জেলের চারশো সেল। চেষ্টা হয়েছে সেই সেলের বন্দিদের, অত্যাচারের একটা ইতিহাস লেখা। স্মৃতিকে জাগিয়ে রাখতে এই ইতিহাস প্রয়োজন। কিন্তু যা লেখা হয়েছে তার চেয়ে অলিখিত অংশটাই আকারে-প্রকারে অনেক দীর্ঘ, অনেক অজানা।
জেলকে নিয়ে ইতিহাস লেখা সেই কবেকার! বিশেষত আন্দামান দ্বীপের অন্ধকারাচ্ছন্ন বনভূমি, তার পরিবেশ, জারোয়াদের বিষমাখা তির। তিলে তিলে চিহ্নিত অপরাধীদের নিরাপদ বাসভূমি নির্মাণ। আহারের জন্য নতুন ‘রেস্টুরেন্ট’, সেখানের নিত্য-নতুন রেসিপি, শরীরী ব্যভিচার। জাহাজভর্তি করে আসে ব্রিটিশ কালচার। আমার সৌভাগ্য হয়েছে সেই ইতিকথার আঁদি-সুঁদি জানতে চেষ্টা করার। মদনমোহন ভৌমিক টানা দশ বছর আন্দামানের ‘ব্রিটিশ গৌরব’। পুষ্পরা সেখানকার মেয়েদের নিয়ে বেয়াদবির উজ্জ্বল উদাহরণ। হেমচন্দ্র কানুনগো—যিনি বিদেশে গিয়ে বোমা তৈরি শিখে এলেন। অবিনাশ ভট্টাচার্য বিদেশে ব্রিটিশদের ভয়াল-ভয়াবহ নিপীড়নের সাক্ষ্য, অরবিন্দের ভাই বারীন ঘোষ— আসলে শুধুমাত্র নামপঞ্জি করতে গেলে এনসাইক্লোপিডিয়ার শতখানেক খণ্ডই পর্যাপ্ত হবে না। উপেন বাঁড়ায্যে, অমলেন্দু দাশগুপ্ত, হেমচন্দ্র কানুনগো নামের তালিকা করা অসার চেষ্টা।
অপরাধী, অপরাধ, শাস্তি দান থেকে মৃত্যুর একটা বড় খতিয়ান জুড়ে আছেন বিপ্লবী বা বিপ্লব নামধারীরা। একেবারে হাল আমলে তাই নিয়ে একটি মনোরম উপন্যাস-কল্প গ্রন্থ লিখেছেন দেবারতি মুখোপাধ্যায়। একেক সময়ে তাঁর একেক রকম আশ্রয়। ভাল লেগেছে তাঁর গ্লানির্ভবতি ভারত, নারাচ, শিখণ্ডী ইত্যাদি চারুপাঠ্য মননশীল পুস্তকরাজি। এখন চলছে স্বাধীনতা প্রাপ্তির পঁচাত্তর বছর পূর্তি। হয়তো সেকথা মনে রেখেই এই ‘কৃষ্ণসিন্ধুকী’র রচনা। উপন্যাসে নায়ক-নায়িকা, খলনায়ক-নায়িকা ইত্যাদি চরিত্র গঠন করা সমান্তরালে এখানে বিপ্লব মণ্ডলী থেকে দেবারতি বেছে নিয়েছেন যাঁদের, তাঁদের মধ্যে তাঁর সুনির্বাচন উল্লাসকর দত্ত। এমন বিচিত্র চরিত্র প্রায় দুর্লভ। বোমা তৈরি থেকে পণ্ডিচেরি আশ্রম গঠনে অরবিন্দ ঘোষ থেকে উল্লাসকরী উন্মাদনা আর এক ইতিহাস।
লেখিকা নামটি ভিন্নতর দিয়েছেন— ‘কৃষ্ণসিন্ধুকী’। এখানে শাস্তিপ্রাপ্ত মেয়েদের যেটা প্রথম হরণ করা হয়, তা তাদের চরিত্র। দেবারতি সৃষ্টি করেছেন একটি অপূর্ব শক্তিশালী নারীচরিত্র। নাম তারনীলা।
‘সিন্ধুকীরা কী করত জানো?’
‘কী?’
‘যে বাড়িতে সুন্দরী গুণবতী মেয়ে থাকত, তাদের লুঠ করে নিয়ে যেত।… আমাদেরও তো সিন্ধুকীরাই এখানে এনেছে বলো চাঁদু মাসি, আমরা কেউই তো এখানে স্বেচ্ছায় আসিনি। আমার সোয়ামি এই দ্বীপের একটা নাম দিচ্ছেন, জানো!’
‘কী নাম?’
‘কৃষ্ণসিন্ধুকী। আন্দামান তো কালাপানি। কালো মানে কৃষ্ণ। আবার সিন্ধু নামে সাগর। আন্দামানে তো আমাদের লুঠই করে এনেছে। আর আমাদের এখানে এনেছে বলেই এই কালাপানিতে গ্রাম হচ্ছে। ফুল ফুটছে।’
কী করে যে দেবারতি বিপ্লবীদের জীবনের আনাচে-কানাচে ঢুকলেন! পঁচাত্তর বছর পেরিয়ে আন্দামানের শত বছরের ইতিহাসকে লিখতে গিয়ে দীপ আরতির আয়োজন করেছে। শুভেচ্ছা গুহায়িত ইতিহাসকে ইতিকথা না করার জন্যে।
বারিদবরণ ঘোষ।
.
লেখকের কৈফিয়ত
গৌরচন্দ্রিকা দীর্ঘায়িত না করেই বলি, আন্দামান প্রথম গিয়েছিলাম ২০১১ সালে। তখন আমি ইঞ্জিনিয়ারিং চূড়ান্ত বর্ষের ছাত্রী। তার কয়েকদিন আগেই কলেজ ক্যাম্পাসিং -এ একটি বহুজাতিক সংস্থায় চাকরি জুটে গিয়েছে, তাই কিছুটা নিশ্চিন্ত। বাবার অবসরগ্রহণের আর বছর দুয়েক বাকি। তার আগে সেটা ছিল এক নিছকই পারিবারিক ভ্রমণ। আর সেই ভ্রমণেই আমি প্রথম মুখোমুখি হয়েছিলাম সেলুলার জেলের।
বাঙালিদের কাছে আন্দামান একটি জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্র। ভারতবর্ষের শেষ ভূখণ্ড। আকাশে ঝকঝকে মেঘ। নীল কাঁচের মতো ঝকঝকে আকাশ। নীচে নীল, ঘন নীল, শীতল সবুজ সমুদ্র। মাঝে মাঝে ঝিনুকের মতো জেগে থাকা দ্বীপ। আকাশ আর সমুদ্রের সীমারেখা খুঁজতে গেলে মুগ্ধ চোখ হারিয়ে যায় প্রকৃতির সমারোহে। সাধারণত আন্দামান ঘুরতে গেলে পর্যটক পরিকল্পনা ছকে রাখা থাকে। পোর্ট ব্লেয়ার। হ্যাভলক আইল্যান্ড। নীল আইল্যান্ড। রস আইল্যান্ড। আরও বিশদে ঘুরতে চাইলে মায়াবন্দর। আমরাও সেভাবেই ঘুরেছিলাম। তবে অপরূপ প্রকৃতি আমার মনে ততটা ছাপ ফেলতে পারেনি, যতটা ছাপ ফেলেছিল সেলুলার জেল।
ছাপ না বলে দীর্ঘস্থায়ী ক্ষত বলাই ভাল। সেলুলার জেলের প্রায়ান্ধকার কুঠুরি দেখতে দেখতে, লাইট অ্যান্ড সাউন্ড শেষে যখন গিয়ে দাঁড়িয়েছিলাম সেলুলার জেলে নির্বাসিত বন্দিদের তালিকার সামনে, আজ এতবছর পরেও সেই বর্ণনা দিতে গিয়ে আমার কণ্ঠস্বর কাঁপছে। আবেগে। দুঃখে। লজ্জায়। তালিকার সত্তরভাগই ছিলেন বাঙালি, এবং তাঁদের অধিকাংশেরই বয়স কুড়ির কোঠায়। কেউ ফিরে আসতে পেরেছেন, কেউ পারেননি। তার চেয়েও বড় কথা, তাঁরা হারিয়ে গেছেন ইতিহাসের গর্ভে। আমরা তাঁদের মনে রাখিনি। কী অপরিসীম লজ্জা!
ফিরে এসেছিলাম অতৃপ্ত ভারাক্রান্ত মন নিয়ে। সময়ের সঙ্গে যা হয়, সব অনুভূতিতেই পড়ে প্রলেপ। ফিকে হয়ে যায় সেই গভীরতা। আবেগ। ততদিনে নতুন চাকরির পোস্টিং দিয়েছে দক্ষিণ ভারতের চেন্নাই শহরে। সেখানেই ট্রেনিং। চাকরি।
একদিন এক স্থানীয় বাঙালি ক্লাবের রবীন্দ্রজয়ন্তীর অনুষ্ঠানে আলাপ এক প্রবাসী বাঙালির সঙ্গে। তিনি তিনপ্রজন্মের মাদ্রাজ বাসিন্দা, কর্মসূত্রে মাদ্রাজ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক। কথায় কথায় বললেন, ‘তুমি জানো, উল্লাসকর দত্ত এই মাদ্রাজ শহরেরই পাগলা গারদে দীর্ঘদিন চিকিৎসাধীন ছিলেন?’
উল্লাসকর! পলকে আমার মনে ফ্ল্যাশব্যাকে ভিড় করে সেলুলার জেলের স্মৃতি। উল্লাসকর। যিনি কিনা প্রাণশক্তিতে ভরপুর এক মেধাবী যুবক ছিলেন! এমন কী হয়েছিল, যে তিনি পাগল হয়ে গিয়েছিলেন?
অন্বেষণের সেই শুরু। কাকতালীয়ভাবে তারপরই আমার কলকাতায় ট্রান্সফার এবং একটু থিতু হয়েই বইপাড়ায় হানা দেওয়া।
‘উল্লাসকর তো আলিপুর বোমা মামলার আসামি ছিল।’ এক পুরনো বইয়ের দোকানের প্রবীণ বিক্রেতা বললেন।
‘আলিপুর বোমা মামলা মানে অরবিন্দ ঘোষ যাতে আসামি ছিলেন?’ তখন সদ্য সিভিল সার্ভিস পরীক্ষার প্রস্তুতি শুরু করেছি।
‘হ্যাঁ। অরবিন্দ ঘোষ তো ছাড়া পেয়েছিলেন। কিন্তু বাকিরা আন্দামানে বন্দি ছিল। ওরা এগারো-বারোজন ছিল দলে। সবই উচ্চশিক্ষিত যুবক। সকলেরই প্রায় আত্মজীবনী রয়েছে।’ বৃদ্ধ ধূসর চোখে আমার দিকে তাকান, ‘লাগবে?’
লাগবে মানে! উত্তেজনায় আমার বুকে দ্রিমি দ্রিমি শব্দ শুরু হয়, ‘সব ক’টা চাই কাকু।’
এভাবেই একে একে হাতে আসা উল্লাসকর দত্তের আত্মজীবনী Twelve Years of Prison Life, উপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘নির্বাসিতের আত্মকথা’, হেমচন্দ্র কানুনগো’র বাংলায় বিপ্লব প্রচেষ্টা, বারীন ঘোষের দ্বীপান্তরের কথা। সেগুলো ঠিক বই নয়, একেকটা আগুনের গোলা। কী আবেগ, কী সততা, কী প্রচণ্ড নিষ্ঠা সেই বইগুলোর পাতায় পাতায়।
যত পড়ি, তত খিদে বেড়ে চলে। যত জানি, তত অজানার প্রতি কৌতূহল জন্ম নেয়। এই বই থেকে আরও কিছু বই, সেখান থেকে আরও। এইভাবে জানতে পারি, এক চমকপ্রদ তথ্য। ব্রিটিশ সরকারের বন্দি উপনিবেশ আন্দামানে শুধুই যে পুরুষ বন্দিরা ছিলেন, তা নয়। মহিলা বন্দিও ছিলেন। প্রচুর পরিমাণে ছিলেন।
হাতে আসে ভারতীয় ইতিহাস কংগ্রেসের ৭০ তম অধিবেশনের একটি গবেষণাপত্র। গবেষকের নাম হাবিব মঞ্জের এবং আশফাক আলি। পেপারটির নাম FEMALE CONVICTS AND ANDAMANS PENAL SETTLEMENT DURING SECOND HALF OF THE NINETEENTH CENTURY.
তাঁরা বিশদে লিখেছেন, কীভাবে আন্দামানে গ্রাম গড়ে তোলার তাগিদে দেশের নানা প্রান্তের জেলে বন্দি মহিলাদের আমদানি করা হয়েছিল আন্দামানে। প্রাক সেলুলার পর্বে তাঁরা বাকি পুরুষ বন্দিদের মতো খোলা আকাশের নীচেই থাকতেন। কিছুদিন পরই তাঁদের স্বয়ংবর আয়োজন করা হত। বিপ্লবী, রাজবন্দিদের সঙ্গে সঙ্গে আন্দামানে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত ছিল খুন ধর্ষণের মারাত্মক আসামিরা। তাদের মধ্য থেকে বেছে নিতে হত স্বামী। তারপর নতুন সংসার পাততে হত স্বাবলম্বন গ্রামে। এই গোটা পর্বে তাঁদের সামাজিক নিরাপত্তা সহজেই অনুমেয়।
হাতে এল আরও একটি সরকারি রিপোর্ট। সে’খানা ১৮৮৭ সালের। রিপোর্টটির কয়েকটি তালিকা এখানে দিতেই হবে।
আন্দামানে বিভিন্ন সময়ে বন্দি থাকা মহিলা কয়েদিদের সংখ্যা :
| তারিখ | আন্দামানে মহিলা কয়েদিদের সংখ্যা |
| ১ এপ্রিল ১৮৮৩ | ৫১১ |
| ১ এপ্রিল ১৮৮৪ | ৪৮৫ |
| ১ এপ্রিল ১৮৮৫ | ৪৫৫ |
| ১ এপ্রিল ১৮৮৬ | ৩৯৭ |
| ১ নভেম্বর ১৮৮৬ | ৩৫৪ |
Source- Deportation of Female Life Convicts to Andaman S Report-
1887V Proceeding of the GOI, Home Dept., Port Blair, 1887, National
Memorial Cellular Jail, Port Blair
ব্রিটিশ সরকার যতই পেনাল সেটলমেন্টে ‘যৌনতার রাজনীতি’ করে চলুক, মহিলা বন্দিদের ক্রমহ্রাসমান সংখ্যাই অনেক কিছুর প্রমাণ দিয়ে দেয়।
ওই একই রিপোর্ট থেকে আরেকটি তালিকা দিই।
আন্দামানে থাকা মহিলা কয়েদিদের পরিণতি :
| পরিণতি | ১৮৮৩-৮৪ | ১৮৮৪-৮৫ | ১৮৮৫-৮৬ |
| বিবাহ | ৬৫ | ৭৪ | ৭১ |
| মৃত্যু | ৮ | ৪ | ৬ |
| মুক্তি | ৪ | ৭ | ৮ |
আরও একটি পরিসংখ্যান। ১৮৯৭ সালে আন্দামানের ‘স্বাবলম্বন’ গ্রামে ২৪৪৭ জন পুরুষ থাকলেও মহিলা ছিল মাত্র ৩৬৩ জন। পুরুষদের অবসাদ সহজেই অনুমান করা যায়। আলিপুর বোমা মামলার বিপ্লবী অবিনাশ ভট্টাচার্যও তাঁর অপ্রকাশিত ডায়েরিতে লিখে গিয়েছেন ফ্রি টিকিট পেয়ে পাত্রী মনোনয়নের সাড়ে আটটাকা ফি দিয়ে পুরুষ বন্দিদের বিয়ের জন্য আবেদনের কথা।
এগুলো যত পড়ছিলাম, জানছিলাম, মানসচক্ষে যেন দেখতে পাচ্ছিলাম সেইসব মেয়েদের। যারা জানত, দেশের কোন প্রান্তের জেল থেকে মুক্তি পেলেও পরিবার তাদের আর কোনদিনও ফিরিয়ে নেবে না। অধিকাংশেরই অপরাধ ছিল, তরুণী বা বিধবা হয়েও গর্ভধারণ, গর্ভপাত কিংবা নির্যাতন আর সহ্য করতে না পেরে স্বামীহত্যা।
তারা জানত, দেশে ফিরে গেলেও কেউ তাদের ফিরিয়ে নেবে না ঘরে। তারা জানত, পুরুষপ্রধান গ্রামে বন্দিদের ‘সংসার’ খেলার সঙ্গে অবশ্যম্ভাবী ঝুঁকি। তবু তারা সেভাবেই লড়েছে। সেভাবেই বেঁচেছে। নিজেদের অভিযোজিত করেছে।
তাদের কথা কেউ মনে রাখেনি। শত শত বিপ্লবীর মতও এই মেয়েগুলোও হারিয়ে গেছে ইতিহাসের গর্ভে।
‘কৃষ্ণসিন্ধুকী’ উপন্যাস লেখার পেছনে এতগুলো বিষয়ও যদি যথেষ্ট না হয়, তবে আর কী হবে? তবু চটজলদি লিখতে বসিনি। সময় নিয়েছি অনেক। আরও পোক্ত করেছি কলমকে, ভাবনাকে, কল্পনাকে। উল্লাসকর, ইন্দুভূষণদের নিয়ে লিখতে গেলে আগে নিজের যোগ্যতাটুকুও পরখ করে নেওয়া বড় প্রয়োজন যে!
এরপর আমার দীর্ঘ অসুস্থতা। বিরতি। তারপর হঠাৎই একদিন popular lecture দেওয়ার আমন্ত্রণ পেলাম ডঃ মহেন্দ্রলাল সরকারের প্রতিষ্ঠা করা দেশের প্রথম সারির বিজ্ঞান প্রতিষ্ঠান Indian Association for Cultivation of Science থেকে। বিশেষ কোন বিষয়ের ওপর পপুলার লেকচার দেওয়া সহজ কথা নয়, তাও আমার মতো নন অ্যাকাডেমিক মানুষের পক্ষে। তখন ‘কৃষ্ণসিন্ধুকী’ উপন্যাস লেখার প্রস্তুতি চলছে। কী মনে হল, ঔপনিবেশিক আন্দামানে মহিলা বন্দিদের জীবন নিয়েই দুরুদুরু বক্ষে সেখানে দিলাম পপুলার লেকচার।
বক্তৃতাশেষে ছাত্রছাত্রীদের মুগ্ধ হাততালি ও প্রচুর প্রশ্ন আমায় বুঝিয়ে দিল, এই প্রজন্ম এখনও হারিয়ে যাওয়া ইতিহাসকে জানতে চায়। না। তারপর আর কোন দ্বিধা কাজ করেনি মনে। লিখে গেছি একমনে। প্রথম কয়েকটি পর্ব প্রকাশিত হয়েছে শারদীয়া বসুমতীতে। তারপর থেকে অগণিত পাঠকের প্রশ্নের সম্মুখীন হয়েছি। এই উপন্যাসের প্রকাশ নিয়ে সমাজমাধ্যমে ক্রমবর্ধমান কৌতূহলের পরিমাণ দেখে আমি নিজেও অবাক হয়েছি। তারও প্রায় এক বছর পর অবশেষে পূর্ণরূপে প্রকাশিত হচ্ছে আমার ‘কৃষ্ণসিন্ধুকী’।
‘কৃষ্ণসিন্ধুকী’ উপন্যাসের সময়পট খুব দীর্ঘ নয়। ১৯০৯ থেকে ১৯১২ সাল। এই তিন-চার বছরের উত্তাল জাতীয়তাবাদী আন্দোলন থেকে মোহনবাগানের ঐতিহাসিক জয়, দিল্লিতে রাজধানী স্থানান্তরের মতো সমসাময়িক ঘটনাও রেখেছি এই কাহিনিতে।
তবে আরও একটি স্বীকারোক্তি করতেই হবে। ‘কৃষ্ণসিন্ধুকী’ ইতিহাস আধারিত উপন্যাস, ইতিহাস নয়। মূল কাঠামো সত্যঘটনাশ্রিত হলেও এখানে আমার কল্পনার তুলিতে আঁকা নীলামণি, পুষ্প, গৌরীপ্রসন্ন, মকবুল, রহমানরা মিলেমিশে গেছে সত্যকাহিনির সঙ্গে। ১৯১৩ সালে আন্দামানের বিপ্লবীরা যে সত্যিই বাইরে বোমা বেঁধেছিল, ষড়যন্ত্র করেছিল সেলুলার জেল উড়িয়ে দেওয়ার, কিন্তু লালমোহন সাহা নামে এক বিশ্বাসঘাতকের জন্য তা ভেস্তে যায়, তা একাধিক সূত্রে উল্লেখিত। অন্যদিকে ইন্দুভূষণের মৃত্যু হয় ১৯১২ সালের ২৮ এপ্রিল। এইটুকু লিটেরারি লাইসেন্স প্রয়োগ ছাড়া আমার এই উপন্যাসে Anacronism প্রায় নেই।
কৃষ্ণসিন্ধুকী উপন্যাসের মুখবন্ধ লিখেছেন বিশিষ্ট গবেষক অধ্যাপক ডঃ বারিদবরণ ঘোষ মহাশয়। বার্ধক্য ও অসুস্থতা সত্ত্বেও যেভাবে গোটা উপন্যাসটি পড়ে তাঁর মূল্যবান মুখবন্ধটি তিনি লিখেছেন, তাতে আমার কৃতজ্ঞতা জানানোর ভাষা নেই। এমন বিশিষ্ট সুপণ্ডিত মানুষের আশীর্বাদধন্য এই উপন্যাস, এ আমার অনেক পুণ্যের ফল। তাঁকে আমার সশ্রদ্ধ প্রণাম।
উপন্যাসের নামকরণের ব্যাখ্যা গল্পের মাঝেই দিয়েছি, তার আর পুনরাবৃত্তি করলাম না। যাদের কথা না বললেই নয়, এবার তাঁদের কথা বলি।
প্রথমেই বলব, আমার অফিসের সিনিয়র সহকর্মী, আমার অগ্রজপ্রতিম পার্থপ্রিয় মুখোপাধ্যায়ের কথা। পার্থদা’র মতো একই সঙ্গে সুপণ্ডিত, সুরসিক মানুষ খুব কমই দেখেছি। ঘণ্টার পর ঘণ্টা তিনি চায়ের আসরে যেমন ঝড় তুলতে পারেন, তেমনই দেশবিদেশের সাহিত্য ও সিনেমা নিয়ে অগাধ পড়াশুনো। পার্থদা এই উপন্যাসের পাণ্ডুলিপি অবস্থার প্রথম পাঠক। মাত্র তিনদিনের মতো খুঁটিয়ে পড়ে গুরুত্বপূর্ণ কিছু মতামত দিয়ে, প্রয়োজনীয় সংশোধন করিয়ে আমায় চিরকৃতজ্ঞতাপাশে ঋদ্ধ করেছেন পার্থদা। এই উপন্যাস যখন পাঠকের হাতে পৌঁছবে, তখনও আমরা অফিসে একসঙ্গে চা খেতে খেতে হয়তো আলোচনা করব, আরও কী কী সংশোধন করা যেত।
দ্বিতীয় কৃতজ্ঞতা যথারীতি আমার জীবনসঙ্গী সুরজিতকে, যে আমার প্রতিটি উপন্যাসের প্রথম খসড়ার নির্মম সমালোচক। প্রথম খসড়া পেরিয়ে পঞ্চম খসড়াতে গেলেও কোনওদিন আমি যাকে তুষ্ট করতে পারিনি। প্রতিবারই সে বলে, ‘ভাল হয়েছে, তবু অমুক জায়গাটা যেন কেমন লাগছে, ওখানটা আরেকটু খেলানো দরকার ছিল।’ এবারেও তার অন্যথা হয়নি।
তৃতীয় কৃতজ্ঞতা আমার দাদাভাই রাজা ধীরাজ ভট্টাচার্যকে। এই উপন্যাসের বেশ কিছু উর্দু ও হিন্দি সংলাপ প্রাণ পেয়েছে তাঁরই হাতে।
চতুর্থ কৃতজ্ঞতা আমার বাবা -মা শেখর মুখোপাধ্যায় ও ক্ষমা মুখোপাধ্যায়কে। তাঁরাই আমায় লিখতে, পড়তে শিখিয়েছেন, এই পৃথিবীর রূপ রস গন্ধ আহরণ করতে শিখিয়েছেন, আর তাঁরাই আমায় প্রথম আন্দামান নিয়ে গিয়েছিলেন। তাঁদের প্রতি আমার রইল আভূমি প্রণাম।
সবশেষে, কৃতজ্ঞতা আমার পঞ্চমবর্ষীয় পুত্র ঐতিহ্যকে। যে অফিসফেরত মায়ের তার জন্য বরাদ্দ সময় উদারচিত্তে দান করেছে এই উপন্যাসকে। মা’কে লিখতে দিয়েছে। শুধু তাই নয়, আমার ‘কৃষ্ণসিন্ধুকী’ লেখার যাত্রাকালে উল্লাসকর, বারীন ঘোষ, হেমচন্দ্রদের গল্পও সে একাধিকবার শুনে ফেলেছে। তাকে তার মতো করে স্বাধীনতা আন্দোলনের গল্প বলেছি আর সবিস্ময়ে লক্ষ্য করেছি, শুনতে শুনতে তার নিষ্পাপ চোখদুটোও ভিজে যাচ্ছে কেমন। কে বলেছে, শিশুদের আবেগ নেই?
এই উপন্যাসের বাকি সমস্ত চরিত্রের মাঝে নীলামণি চরিত্রটি প্রধান, আপন স্বকীয়তায় উজ্জ্বলতম। নীলা আমার সঙ্গে দীর্ঘদিন ছিল। নীলাকে তৈরি করতে করতে আমি নিজেও যেন মিশে গিয়েছি তার সঙ্গে।
উপন্যাসের শেষে নীলামণির পরিণতি কী হল, তা হয়তো পাঠককে ভাবাবে। ভাবাবে উল্লাসকরদের পরবর্তী জীবন অভিমুখও। ঈশ্বর স্বাস্থ্য ও পরিবেশ সহায় থাকলে দ্বিতীয় পর্বে আশা করি সেই কৌতূহলের নিরসন হবে। যদিও কৃষ্ণসিন্ধুকী নিজে স্বতন্ত্র ও পূর্ণাঙ্গ উপন্যাস, তবু নীলামণিকে আরও একবার ফিরিয়ে আনাই যায়।
তাছাড়া উল্লাসকর দত্ত! তিনি এমন এক অসাধারণ চরিত্র, যে তাঁকে নিয়ে যেন হাজার পংক্তি লেখাও অপ্রতুল। পরবর্তী উপন্যাস যদি লিখে উঠতে পারি, তাতে থাকবে ত্রিশের দশকের সেলুলার জেল ও কলকাতায় ফেরার পর উল্লাসকরের প্রেমিকসত্তার উথালপাথাল কাহিনি, যা বলিউডি প্রেমের ছবিকেও হার মানায়। বিস্তৃত পরিসরে থাকবেন ঋষি অরবিন্দও।
আর বেশি লিখব না। এই উপন্যাস লিখতে যে গ্রন্থ, গবেষণাপত্রের সাহায্য নিয়েছি, তার একটা অসম্পূর্ণ তালিকা নীচে দিলাম। হয়তো উৎসাহী পাঠকরা তাতে উপকৃত হবেন। আগেই বলেছি, এই উপন্যাসের বীজবপন আমার মনে এত বছর আগে শুরু হয়েছে যে, সম্পূর্ণ তালিকা দেওয়া সম্ভব নয়।
আশা করব, আপনি যদি আন্দামান ভ্রমণে যান, ‘কৃষ্ণসিন্ধুকী’ পড়ার পর আপনি অন্যচোখে সেই দ্বীপপুঞ্জকে দেখতে পাবেন। স্বজাতির গৌরবে গর্বিত হবেন।
যে কোনওরকম প্রতিক্রিয়া ভীষণভাবে কাম্য।
দেবারতি মুখোপাধ্যায়।
১.৬.২০২৪
কলকাতা
.
সহায়ক গ্রন্থপঞ্জি :
১. FEMALE CONVICTS AND ANDAMANS PENAL SETTLEMENT DURING SECOND HALF OF THE NINETEENTH CENTURY, Habib Manzer and Ashfaque Ali, Indian History Congress, Vol. 70 (2009-2010), pp. 635- 642
২. Report: Deportation of Female Life Convicts to Andaman ( Report – 1887)
Proceeding of the GOI, Home Dept., Port Blair, 1887, National Memorial Cellular Jail, Port Blair..*
৩. কারাজীবনী, উল্লাসকর দত্ত।
৪. দ্বীপান্তরের কথা, উল্লাসকর দত্ত।
৫. নির্বাসিতের আত্মকথা, উপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় ।
৬. দ্বীপান্তরের কথা, বারীন চন্দ্র ঘোষ।
৭. বাংলায় বিপ্লব প্রচেষ্টা, হেমচন্দ্র কানুনগো।
৮. বিপ্লবী অবিনাশ ভট্টাচার্যের অপ্রকাশিত ডায়েরি, পত্রলেখা নাথ।
৯. আন্দামানে দশ বৎসর, মদনমোহন ভৌমিক।
১০. বিপিন চন্দ্র পাল, শিবদাস চক্রবর্তী।
১১. রুশ বিপ্লব ও প্রবাসী ভারতীয় বিপ্লবী, চিন্মোহন সেহানবীশ।
১২. অগ্নিযুগের আগ্নেয়াস্ত্র, অমলেন্দু বাগচী।
১৩. বাঙালির খেলাধুলা, শংকর সেনগুপ্ত।
১৪. ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে যুগান্তর পত্রিকার দান, হরিদাস মুখোপাধ্যায়, উমা মুখোপাধ্যায়।
১৫. মুক্তিতীর্থ আন্দামান, গণেশ ঘোষ।
১৬. উল্লাসকর স্মৃতি (দেশ পত্রিকা, ৫.২.১৯৬৬), শোভনা নন্দী।
১৭. সংসদ বাঙালি চরিতাভিধান, সাহিত্য সংসদ।
১৮. রাজযোগ, স্বামী বিবেকানন্দ।
১৯. Vedanta: Voice of Freedom, Swami Vivekananda.
২০. The Story of My Transportation for Life, V.D. Savarkar.
২১. The Heroes of Cellular Jail, S.N.Aggarwal.
২২. Cellular Jail of Andaman and Nicobar Islands, Amit Rai Jain.
২৩. কালাপানি আন্দামান, অমিত রায়।
২৪. Unsung Heroes of Freedom Struggles in Andamans, Rashida Iqbal.
২৫. Wahabi Movement, Balkhani Fashiluddin.
২৬. Viper Islands, Gour Chandra Pandey.
২৭. Tarikh – i -Ajim Kalapani ( Urdu), Moulana Jafar Thaneshwari.
২৮. Black Days in Andaman and Nicobar Islands, Rabin Roy Chowdhury.
২৯. Synthesis of Yoga, Sri Aurobinda.
৩০. The Life Divine, Sri Aurobinda.
৩১. Women of India, Swami Vivekananda.
৩২. Such is Life, An Autobiography, Niranjan Pal.
৩৩. Indian Revolutionaries in Conference, J.C.Chatterji.
৩৪. The Swadeshi Movement in Bengal 1903-1908, Sumit Sarkar.
৩৫. The Bomb in Bengal, Peter Heehs.
৩৬. Terrorism in India, Tegart.
৩৭. কলকাতা শহরের ইতিবৃত্ত, বিনয় ঘোষ।
৩৮. গীতাঞ্জলী, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
৩৯. বঙ্গীয় শব্দকোষ, হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় ।
৪০. বাঙ্গালা শব্দকোষ, যোগেশচন্দ্র রায় বিদ্যানিধি।
৪১. Khechari Mudra & Shambhavi Mudra (Verses from Upanishads
৪২. WOMEN PRISONERS: AN UNADDRESSED ENTITY IN THE
PENAL HISTORY OF INDIA, Manika Kamthan
৪৩. Engendering Resistance and Power In Women Prisons, Mary Bosworth
৪৪. Women in Prison- An Insight Into Captivity & Crime, Suvarna Cherukari.
৪৫. Discipline and Punish: The Birth of the Prison, Michel Foucault.
৪৬. The Power to Punish- Contemporary Penality and Social Analysis,
David & Peter Young Garland.
৪৭. Punish And Critique- Towards a Feminist Analysis of Penality, Adrian Howe.
৪৮. From Government to Governance- A Brief Survey of the Indian
Experience, Kuldeep Mathur.
৪৯. Prisoners and Human Rights, S.K. Pachauri.
৫০. Punishment and the Prison: Indian and International Perspetives, R.D.
ShankarDass.
৫১. Women Prisoners in Custody, Jayasree Lakkaraju
৫২. Prison as a Social System, R.N. Datir.
৫৩. Children of Women Prisoners in Jails: A Study in Uttar Pradesh – A study conducted by Pandit Govind Ballabh Pant Institute of Studies in Rural Development, Lucknow (2004)
৫৪. Socio Economic Profile of Women Prisoners, A Report on A Minor Research Project by Dr. M. Nagesh Kumari submitted to UGC (2005- 2007)
৫৫. Community Participation in Prisons – A Civil Society Perspective – A Report prepared by CHRI Prayas ( a field action report of TISS 2008).
৫৬. Report of the All India Committee on Jail Reforms (1980-83) ৫৭. Report of the National Expert Committee on Women Prisoners (1986- 87) ইত্যাদি।






Leave a Reply